আমার দাদার বাড়ি থেকে নানার বাড়ি খুব বেশি দূরে ছিলনা, মাইল দশেক হবে বোধহয়।আমরা থাকতাম শহরে। প্রায় শীতে আমরা সহপরিবারে নানার বাড়ি যেতুম। বড় রাস্তা পেরিয়ে, দীর্ঘ দুর্বাঘাসের আইল পেরিয়ে নানা-বাড়ির কাঁচারি ঘর। আরো ভিতরে বাড়িঘর। বিশাল বাড়ি ছিল। আর নানাবিধ গাছপালা; আমি নাম জেনেও শেষ করতে পারতুম না, গননাতো অকল্পনীয়। নির্মল আনন্দের সব উপকরণ ছিল সেই বাড়িতে।
আমার এক মামা ছিল, নানার দ্বিতীয় বৌ'র ছেলে। আমার বড় নানু (মায়ের মা) মারা গিয়েছিল এক অলৌকিক ঘটনার পরমপরায়। এক নিশিথ রাতে তিঁনি গিয়েছিলেন প্রাকৃতিক কার্য সম্পাদনের নিমির্থে, বাগিচা পেরিয়ে বাড়ির কোণা'র পায়খানায়। আসার পথে তিঁনি সাদা কিছু দেখে তীব্র ভয় পান, এবং অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাঁর নিথর দেহ আবিষ্কার করেন আমার ছোট খালা, স্বর্ণা; তখন তিনি তের বছরের বালিকা মাত্র। নানীর বোধশূন্য দেহ ঘরে নিয়ে আসা হয় এবং রাত্তিরের দিকে তার জ্বর আসে; প্রলয়ীক জ্বর। তিনি প্রলাপ বকতে থাকেন এবং ভোর-রাত্রির দিকে দেহত্যাগ করেন। নিতান্ত আষাঢ়ে ঘটনা, কিন্তু ইহা ঘটেছিল। এইসব ঘটনা আমার মায়ের কাছে শোনা, তিনি তখন চৌদ্দ বছরের কিশোরী।
তারপর আমার নানা ছোট দু'মেয়ের কল্যাণার্থে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, যদিও সেই বিয়ে সুফল বয়ে আনেনি। যাই হোক, আমার একমাত্র মামার জন্ম হয় তারপর।
আমি যখন নানা-বাড়ি যেতুম রাহাত মামা ছিল আমার আবদারের মানুষ। শীতকালে তখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে হকাররা "মোল্লা" (মোয়া) বিক্রী করত ("মোল্লা" হল খেজুরের রসকে জ্বাল দিয়ে ঘন করে তাতে মুড়ি দিয়ে বানানো একধরনের খাদ্য - একে মোয়াও বলা হয়)। মামা আমাকে প্রায় কিনে দিত দু' টাকার মোয়া। আর বাজার করে ফিরে আসার পথে যদি আমার জন্য চকলেট না আনত তবে তার শাস্তি ছিল পুকুরে গলা সমান ডুবে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা; নড়াচড়া করার অনুমতি ছিল না। তিনি প্রায় ভুলে গিয়ে এই শাস্তি বরণ করতেন শান্ত, প্রফুল্ল চিত্ত। আমি খুদে দস্যুর মতন কাঁকর ছুঁড়ে মারতাম তার হাসিমাখা মুখ পানে আর চিৎকার করতুম, "হাসি বন্ধ কর। হাসি বন্ধ কর।" ছুড়ে দেয়া সেইসব কাঁকর তার গায়ে পড়ত না, কারণ, আমি নিখুঁত ভাবে নিক্ষেপ করতাম না; জানতুম, তার গায়ে পড়লে ব্যাথা পাওয়ার সম্ভবনা আছে।
মামা মারা গিয়েছে ঢ়ের কাল আগে, আমি আর নানা-বাড়ি যাই না তেমন। আলোকবর্ষ দূর যেন আমার এই ব্যস্ত শহর থেকে আমার নানা-বাড়ি। সেই পুকুর, ঘাস মাড়ানো পথ তবু মাঝে মাঝে এখনো চোখে ভেসে আসে। আমার চিৎকার করে কেঁদে বলতে ইচ্ছে করে, "মামা, হাসি বন্ধ করো না, হাসি বন্ধ করো না। কতদিন তোমার হাসি দেখিনি যে।"
দ্রষ্টব্য: এটা কিন্তু আমার নিজের জীবনে ঘটনা না। নিছক গল্প লেখা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

