এই পোষ্টটা নুশেরা তাজরীনের এই পোষ্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। উনার পোষ্টে আমার মন্তব্য এবং উনার প্রতিমন্তব্যসহ সার্বিক পোষ্টটা সহায়ক হয়েছে। নুবুকে বিনীত ধন্যবাদ জানাচ্ছি পোষ্টটি প্রকাশ করে আমাকে কিছু বলে দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
কলকাতার লেখকদের গল্প, উপন্যাসকে নাট্যায়িত করার ফলাফল স্বরূপ যারা "জাত গেল, জাত গেল" শোরগোল তুলছেন তাদের আমি বিনয়ের সাথে বন্যবাদ জানাচ্ছি। কলকাতার লেখকরা অন্য কোন ভাষাতে লিখছেন না, তবে তাদের ভাষার ব্যবহার রীতি, প্রকরণটুকু আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন; এটা বিছিন্ন কিছু নয়- ধর্ম, দেশ, ভৌগলিক অবস্থান অনেক মুখ্য ভুমিকা পালন করছে। অন্যদের ভাল কিছু গ্রহণে আমার আপত্তি নেই। তা যদি না হয় তবে ফরাসী, ইংরেজ সাহিত্য আমাদের কাছে অমবস্যার চাঁদ হয়ে থাকবে।
আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা এটাকে কিভাবে কাজে লাগাচ্ছি। আমরা কি নিজেদের বিসর্জন দিচ্ছি নাকি তাদের উপকরণ ব্যবহার করে আমাদেরটুকু উন্নতর করছি।
বাণিজ্য সবকিছুতেই আছে। একালের লেখকদের ও বাঁচতে হয় দু'বেলা খেয়ে। কিন্তু সেটা যেন মুল্যবোধের সীমানাটুকু না ডিঙিয়ে যায়। লেখক মাত্রই পাঠকনির্ভর, কমবেশি সবাই। এটা লেখনীর ক্ষেত্রে অবদান স্বরূপ। পাঠককে দূরে সরিয়ে লেখা নয়, পাঠকই লেখকের মূল চালিকাশক্তি।
সুনীল কিংবা সমরেশের অনেক উপন্যাস, কবিতা বাংলা সাহিত্যের উপধা। "সেই সময়", "প্রথম আলো", পূর্ব-পশ্চিম", "অরণ্যের দিনরাত্রি, কালবেলা", বিবিধ লেখা বারবার লেখা হয় না। মধুর পরিমিত ব্যবহারই উৎকর্ষতা।
এপার বাংলায় ভাল লেখার কতটুকু মূল্য দেয়া হয়? নবীন একজন লেখকের কতটুকু স্বাধীনতা আছে? প্রতিভার বিকাশকে আমরা রুদ্ধ করে রাখছি। তাদের "দেশ", "আনন্দবাজার" ইত্যাদির মতন শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম আছে। আমাদের শুধু সাহিত্য নির্ভর কোন পত্রিকা বা ম্যাগাজিন আছে কি? বুদ্ধদেব বসু'র "কবিতা" কিংবা সুনীলের "কৃত্তিবাস" এর মতন কোন শক্তিশালী কবিতা প্রকাশের মাধ্যম এপার বাংলায় কোনকালে গড়ে উঠেনি। আমাদের বই প্রকাশকাল হল বিশেষ বিশেষ দিবস মুখী, সেখানে কলকাতায় সারাবছরই কিছু না কিছু প্রকাশ হচ্ছে। সাহিত্যনির্ভর পত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিন সাজসাজ রব তুলে বাজারে এসে হারিয়ে যায় মাস ছয়েক, বছর পরে; বড়জোর বছর দুয়েক থাকে স্থায়িত্বকাল।
এপার বাংলায় কয়জন স্বনামধন্য লেখক, কবি নবীন লেখক, কবিদের বিষয়ে বলে উঠেন? মুষ্টিমেয় কয়েকজন। আমরা প্রতিভার বিকাশ ঘটতে দিচ্ছি না। সর্ষেতে ভূত থাকলে সর্ষে মাখামাখি নিবুদ্ধিতার লক্ষণ। প্রতিভার মূল্য না দিলে প্রতিভা আকাশ থেকে পড়বে না।
আর বর্তমানে টিভি-চ্যানেলে যেসব নাটক, সিরিয়াল হয় অনেকাংশে সেগুলো প্রহসন তুল্য। ছোট কাহিনীকে তাল করা হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে তাল থেক নব্য চারা গজানোর গল্পও বলে যাওয়া হচ্ছে। এরচেয়ে ওপারের বাংলার ঘোলটুকুই মন্দের ভালো নয়? যেখানে আমাদের দুধেল গাভীর অভাব।
হুমায়ুন আহমেদ এক বাণিজ্যপ্রতিম। তিনি এখন আর লিখেন না, লেখাই তাকে লিখাই। তার মেরুদন্ড সোজা হলে নিজের লেখায় অন্যের কাঁচি চালানো অবলীলাক্রমে তিনি মেনে নিতেন না।
কৈশোরের দিনগুলিতে আমিও মাসুদ রানা কিংবা অন্যান্য বিদেশী সাহিত্য অনুবাদ পড়ে ভিন্ন সংস্কৃতিকে জেনেছি। এটা আমার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে ছিল অনবদ্য।
নুশেরা বলেছেন: "এরচেয়ে ওপারের বাংলার ঘোলটুকুই মন্দের ভালো নয়? যেখানে আমাদের দুধেল গাভীর অভাব।"--
আশরাফ, এই কথাটার দু'টি অংশের সঙ্গেই দ্বিমত পোষণ করছি। আমরা ফরমায়েশী লেখার ঘোলটাই খাব কেন? খাঁটি দুধটাই নয় কেন?
আর আমাদের দুধেল গাভীর অভাব, এটা ভেবে বলেছ তো! ঘরের গাভী ফেলে রেখে ইমপোর্টেড ঘোল খাবার প্র্যাকটিসে ক্ষতিটা কার???
"কৈশোরের দিনগুলিতে আমিও মাসুদ রানা কিংবা অন্যান্য বিদেশী সাহিত্য অনুবাদ পড়ে ভিন্ন সংস্কৃতিকে জেনেছি। এটা আমার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে ছিল অনবদ্য।"
এই "বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদে" কোথাও কি জোনাথন-কে জয়নুল করা হয়েছিল? পোস্টের মূলকথা কিন্তু ফরমায়েশী উৎপাদন-নির্ভর সাহিত্যের বদলে ভাল সাহিত্যেরই প্রোমোশন।
"দুধেল গাভী" কিংবা "ঘোল" শব্দদ্বয় আমি নাটক, সিরিয়ালের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছি। বিনয়ের সাথে অনুরোধ করছি আমার পুরো মন্তব্যে আবারও পাঠদান করতে। বাংলাদেশে এত্তো এত্তো চ্যানেলগুলোতে আজকাল কয়টা ভাল নাটক কিংবা সিরিয়াল হয়? কাহিনীর প্রবাহ কিংবা নাট্যরূপের রঙ্গখেলা বলা চলে একে। বলতে দ্বিধা নেই, নাটক কিংবা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে আমরা ওপার বাংলা থেকে পিছিয়ে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা সেয়ানে সেয়ানে। স্বয়ং হুমায়ুন আহমেদ তাঁর "মিসির আলি"'র একটা রহস্যোপন্যাস এর নাট্যরূপ দেখে আক্ষেপ করে বলেছিলেন তিনি এরকম মিসির আলির ব্যস্তবরূপ দেখতে চাননি (হুমায়ুনের আত্নকথন বই দ্রষ্টব্য)। ভাল কয়জন নাট্য নির্মাতা আছেন বাংলাদেশ বর্তমানে? আগে ছিল আমি জানি। কিন্তু এখন বাংলাদেশেও নাটক ব্যাপারটায় বাণিজ্যের এক কাঠি সরেস বিষয়।
আর ওপারের সাহিত্যকে আমি পরের ঘরের "বিষয়" বলতে নারাজ। কারণ, সর্বোপরি এটা বাংলা সাহিত্য। নজরুল, রবীন্দ্রনাথসহ প্রমুখ পুরোধার জন্ম কিন্তু ওপারেই।
বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ করতে হলে "জোনাথন"কে জয়নুল করতে হবে এই যুক্তি অন্তঃসারশূন্য। লেখা মাত্রই দেশ, মানুষ, অবস্থান নির্ভর কমবেশি। একটা উদাহরণ দিতে পারি - ধরুন কোন একটা ইংরেজি উপন্যাসে জোনাথন নামক এক কৃষক চরিত্রের একটা লাইন পেলেন এরকম: "অতঃপর জোনাথন এই মাঘশীতের রাতে নিজেকে উষ্ণ করার জন্য কয়েক পেগ মদ গলদকরণ করে বান্ধবীকে নিয়ে.......।" এখন এই লাইনটুকুর অনুবাদ আপনি "জয়নুল" নামে পরিবেশন করলে বাংলাদেশের একজন কৃষকের প্রেক্ষাপটে কতটুকু সামজ্ঞস্য হবে?
"কালবেলা" উপন্যাসটার কথাই বলি। রাজনৈতিক ঘটনা বিন্যাসে অনন্য এক প্রেমের গল্প। সেরকম রাজনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশে কখনো আসে নাই। এখন এই উপন্যাসের এপার বাংলা সংস্করণ কিভাবে করবেন আপনি? অনিমষ হয়ে যাবে কোন সর্বহারা দলের নেতা আর মাধবীলতা কোন মুসলমান সংস্কারমনা মেয়ে? উপন্যাসের পুরো আমেজটুকু লেজেগোবরে হয়ে যাবে।
ওপার বাংলায় বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল, বেতার ইত্যাদির প্রবেশ নেই। আমি বলব, এই ব্যাপারে আমাদের সাহিত্যিকদের চেয়ে বগাভন্ড আমলারা দায়ী। তাছাড়া, আমাদেরকে অনুষ্ঠানের মান উন্নয়ন করতে হবে। এখানে শিশুদের প্রতিভার বিকাশে নামে বাণিজ্য চলে, শৈশোর ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে অশ্লীল, বয়স-বেমানান গান গাইয়ে। এসব উপকরণ অবলম্বন করে ওপারের সীমানায় আমরা প্রবেশ করলেও বেশিদিন টিকতে পারব না এটা অনস্বীকার্য।
আমরা বাজারজাতকরণে (বাণিজ্যকরণ বলব না) অনেক পিছিয়ে। বইগুলো ছাপা হয় কমদামী, ভঙ্গুর কাগজে; সংগ্রহে রাখার জন্য কাঠ-খড় পুড়াতে হয়।
আমি বলতে চাই ফরমায়েশী লেখা নিপাত যাক। এটা হারিয়ে যাবে এমনিতেই, পাঠক খেলতে পছন্দ করে না। কিন্তু ফরমায়েশী লেখা কেন হচ্ছে? কারণ, মুষ্টিমেয় কিছু লেখক বাজার ধরে আছেন; শুধু লেখার জোরে না, বরং পরিচিতি, জনপ্রিয়তাকে অবলম্বন করে। এই স্রোতের প্রবাহ রোধ করতে হবে।
হুমায়ুন আহমেদ কিংবা ইমদাদুল হক মিলনের বর্তমান লেখার মত লেখা দিয়ে ওপারের বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করা ছেলের হাতে সোনার চামচ সদৃশ।
সবশেষে যেটুকু বলতে চাই তা হল- ভাল সাহিত্যের কোন জাত, দেশ নেই।
(সাধারণ পাঠকের অভিমত জানতে চাচ্ছি আমি।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

