অনেক গুলো ভাইবোনের একমাত্র ছোট ভাই হওয়ায় যতোখানি সুবিধা আদায় করে নেয়া যায়, সেরকম কিছু পাওয়া আমার হয়নি। এই না হওয়ার পিছনে মূল দায়ভার আমার নিজেরই। কখনোই তেমন জেদ করিনি তাদের কাছে, টুকটাক যা করেছি সেটা কি নিয়ে জেদ করলে লাভ হয় সেসব বুঝে ওঠার অনেক আগে। আমি কিছু না চাইতেই তারা আমাকে যা দিতো তাতেই আমি লাফিয়ে বেড়াতাম
বেশ ছোট বেলা থেকেই ঈদ মানেই একটা করে পান্জাবি বরাদ্দ, কখনো বেশি যে পাইনি তা না। তখন রং বেরংয়ের এতো পান্জাবীর চলন ছিলোনা, হয় সাদা সুতির উপর কিছু কাজ অথবা সিল্ক কালারের, খুব বেশি হলে বাটিক ধরনের। পান্জাবী কেনার সময় মেঝ ভাইয়া আমাকে নিউ মার্কেটে নিয়ে যেতো, কিংবা ডাকবাংলায়, আমার অবশ্য নিজের পছন্দ করার উপরে ভরসা ছিলোনা। তাই মিন মিন করে বলতাম, আপনি দেখেন....। আর সবচে বেশি কষ্ট পেতাম যখন কোন প্রিয় পান্জাবী পরের বছর ছোট হয়ে যেতো (আমি লম্বা হতাম এটা মনে করলে দোষ টা আমার ঘাড়েই পড়ে কিনা
আব্বা আর মেঝ ভাইয়ার ঈদে একটা রুটিন কেনাকাটা ছিলো, সেটা হলো কড়কড়ে লুন্গি আর ক্রোকোডাইল স্যান্ডো গেন্জি। একটু বড় হওয়ার পরে আমার জন্যও নিয়মিত হয়ে গেলো স্যান্ডো গেন্জি। খুব কম ঈদেই পান্জাবী ছাড়া সার্ট বা প্যান্ট কিনেছি। ওগুলো বছরের অন্য যেকোন সময় যে কোন আধিদপ্তর থেকে বরাদ্দ হতো। তবে আফসুস একটাই, ঘুম আর বাসায় কাটানো বাদে বছরের বেশির ভাগ সময়ই স্কুলের সাদা ড্রেস পরে কাটাতে হতো।
সবথেকে ঘাপলা বাঁধতো পায়জামা নিয়ে। কারণ রেডিমেড পায়জামা গুলো যারা বানায় তারা খুব সম্ভবত ঐ খান থেকে কাপড় বাঁচিয়ে ঘর সংসার চালায়। তাই ঐ পায়জামা পড়ে দুই চারটা লাফ দিলেই জায়গামতো ঘটনা ঘটে যেতো। তাই ছোট আপার উপর দায়িত্ব ছিলো কাপড় কিনে পায়জামা বানিয়ে দেয়ার। এই কাজটা করে দেয়ার সুবাদে আমাকে এহেন নাকানি চুবানি নাই যা সে খাওয়াইতোনা। চোখের পানি শুকিয়ে চন্দ্রপৃষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত পায়জামাটা বানানো শেষ করতো না। পরের সমস্যাটা হতো, আপা ইচ্ছা করে কখনোই ইলাস্টিক দিতোনা, ফিতা লাগিয়ে দিতো আর সেটা খোলা রাখতো, মানে দুই মাথা সিলাই করে দিতোনা। ফলে ঈদের সকালে অনিবার্যভাবে ফিতার এক মাথা ঢুকে যেতো পায়জামার মধ্যে, অতঃপর পুরোটা বের করে আবার সেফটিপিন দিয়ে ঢুকাতে হতো। আর যখন পায়জামার ফিতাটা ঠিকমতো বাঁধতে পারতাম না, এটার সুযোগ নিতে অনেকেই ছাড়তোনা।
আপা ভাইয়া চাকরি নিয়ে দূরে গেলো, সংসারী হলো, সব ঈদে আসতে না পরেলেই কুরিয়ারের কল্যানে আমার পান্জাবী আসতো সময় মতোই। অথবা আমি নিজে ঢাকা গেলেই কেনা কাটা পর্বটা শেষ হয়ে যেতো। একসময় চাকরিতে ঢুকলাম। কিন্তু ওরা এতোই ভালোবাসে আমাকে তখনও খোঁজ নিতো- কি কিনবি? জুতো লাগবে কিনা? অবশ্য এটার একটা কারনও ছিলো, তখনও জবটা পারমানেন্ট না। বেতন অনিয়মিত ছিলো।
যাইহোক একসময় জব শক্ত হলো, বিয়ে করলাম, বিয়ের পরে প্রথম ঈদ, হাতে বেতন আর ঈদ বোনাস। আমার পরিধি তখন ডাবল, তবুও সবার জন্য কিছু না কিছু কিনলাম। দুজনে মিলে ঘুরে ঘুরে পছন্দ করলাম, আব্বার জন্য পান্জাবী, মার জন্য শাড়ি, দুইবোন জব করে, ওদের জন্য অনেক পছন্দ করে দুটো শাড়ি কিনলাম। শাড়ি দুটো আমার খুবই পছন্দ হয়েছিলো, ওদের ও অনেক পছন্দ হয়েছিলো। আমার চোখের সামনে সেই দৃশ্যটা এখনও ভাসে। দুলাভাইদের জন্য আফটার শেভ, ভাইঝিটার জন্য জামা....... সেই ছোট বেলা থেকে শুধু আনন্দ পেয়েই এসেছি। রোজা রেখে ঘুরে ঘুরে ওদের জন্য কেনাকাটায় এতো আনন্দ লুকিয়ে ছিলো কে জানতো।
গত দুটো ঈদ কোরিয়ায় করেছি, সামনে আরও দুটো হয়তো করবো। এখানে কোন ঈদের সপিংএর হিড়িক নেই। নেই আলাদা করে ঈদের দিনের কোন আমেজ। নেই কারও জন্য কিছু কিনে নিজ হাতে দেয়ার আনন্দ। অন্য সবকটা দিনের মতোই ঈদগুলোও পার হয়ে যায়। এখন পাজামার ফিতাটা ভিতরে ঢুকে যায়না, পান্জাবীটাও ছোট হয়ে যায়না, সময়ের স্মৃতি গুলো কেবল পিছিয়ে যায় আরও দ্রুত গতিতে।
ছবি কৃতজ্ঞতা
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



