তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি, আমরা দাদার মিলাদে দাদার বাড়িতে যাচ্ছিলাম, বাস থেকে নেমে নৌকায় যেতে হবে। নৌকা নদীর থেকে খালের মধ্যে ঢোকা মাত্রই আব্বুর চিৎকার শুরু হল, ঐ দেখ তোমার বড়ফুপুর ঘর.....ঐ দেখ...
১ ঘন্টা হয়ে যায় কিন্তু বড়ফুপুর বাড়ি আর আসে না, এভাবে প্রায় ৩ ঘন্টা নৌকায় চলার পর আমরা পৌছালাম আমাদের গন্তব্যে। তখন বর্ষাকাল ছিল তাই নৌকা ভিড়ল আমাদের বাড়ির ঘাটে। ঘাটে দাড়িয়ে চিৎকার করে সবাইকে ডাকছে সাইফুল ভাই (আমার চাচাতো ভাই) বর্ষাকালে দাদারবাড়িটা একটা দ্বীপের মত পানির মাঝে ভাসতে থাকে, চারপাশে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত আর মাটি দিয়ে উচু করা কিছুটা অংশ, সেখানে
মূলত আমাদেরই আত্নীয়স্বজনেরা থাকে। বলতে গেলে ছোট্ট গ্রামটা ওইটাই.....গ্রামের
সবাই প্রায় আমাদের আত্নীয়স্বজন। অনেকগুলো পুকুর আছে যেগুলো বর্ষাকালে পানিতে ভরে বিলের সাথে মিশে যায়......চারিদিকে শুধু পানি আর পানি.....সেদিকে তাকালে শুধু শাপলা ফুল সাদা...গোলাপী....বেগুণি.....আর মাঝেমাঝে কচুরিপানার বেগুনীফুল। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে গেলে নৌকা লাগে...তাই প্রায় সবারই নিজস্ব নৌকা আছে।
যে কথা বলছিলাম, সাইফুল ভাই আমার বড়বোনের বয়সী। দাদার বাড়িতে গেলে আমরা একসাথেই ঘোরাফেরা করতাম। আমরা ছোট ছিলাম তাই যারা একটু অপেক্ষাকৃত বড় ছিল বিশেষ করে আপুরা আমাদের অপমান করে সবখান থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষে সাইফুল ভাই বলল, চল আমরা নৌকায় করে ঘুরতে যাই। আমরা ছোটরা নাচতে নাচতে রাজী হয়ে গেলাম, আমাদের ৭/৮ জনের একটা দল। নৌকা যখন পুকুর পেরিয়ে বিলের মধ্যে গেল আমরা শাপলা ফুল তোলা শুরু করলাম....এর আগে আমি কখনও বেগুনী শাপলা দেখি নি......তারপর পানির দিকে তাকালে দেখলাম পানির মধ্যের গাছগুলোয় শ্যাওলা পড়ে আরো সুন্দর লাগছে.....নৌকায় বসে আমরা এটা সেটা গল্প করছি, সাইফুল ভাই তার ছোটবোনের উপর কি কারণে যেন একটু রেগে গেল, নৌকার বৈঠা দিয়ে দিল মাথায় হালকা বাড়ি। সাথে সাথে সে বিলের মধ্যে নেমে পুকুর সাতরিয়ে বাড়ি চলে গেল। আমরা ওকে থামাতে গেলাম...সাইফুল ভাই বলল, ওকে যেতে দে...আমরা আর কিছু বললাম না..শেষে আমাদের না নৌকায় ফেলে ও পালায়।
ভূতের ভয় দেখানোর যে কাহিনী নিয়ে সবাই লাফালাঝি করছে সেটাও সাইফুল ভাইই আমাদের শিখিয়েছিল। কিন্তু সেখানে আমরা ট্রায়াল দিতে পেরেছিলাম না কারণ আমাদের সব দাদীরাই ততদিনে এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ সাদা শাড়ি পরে না।
এর কিছু দিনপর সাইফুল ভাই ফুটবল খেলতে যেয়ে পা ভেঙ্গে ডাক্তার দেখাতে খুলনায় আসলো। আমরা তখন দিনরাত লুডু খেলায় মেতে থাকতাম। বুবু আর ও ছিল বিশিষ্ট চোরটা। ওরা একদলে যেত আর আমি আর আমার মামাতোবোন একদলে যেয়ে অনেস্ট প্লেয়ার হবার জন্য হারতাম
এরই মধ্যে সাইফুল ভাইয়ের বড়বোনের বিয়ে ঠিক হল। আমাদের বাসায় অনুষ্ঠান হবে......তখন টিভিতে বিশ্বনাটক হয়েছিল একটা বানরের ঠ্যাং নিয়ে কিছু একটা ঠিক মনে নাই। ওই নাটক দেখে আমরা অনেক ভয় পেলাম, গায়েহলুদের দিন সবাই নীচে ব্যস্ত আমরা উপরে বসে রাতের বেলায় টিভি দেখছি, সাইফুল ভাই বাথরুমে গেল, বুবু দরজা বাইরে থেকে আটকে রেখে বাথরুমের লাইট বন্ধ করে চিল্লাতে লাগলো, ওরে কে কোথায় গেলি...ভয় লাগছে...কারেন্ট চলে গেলে..ওরে সাইফুল ভাই তুই কই? সাইফুল ভাই দরজা আটকানো দেখে বুঝল সব বুবুর শয়তানি...কিছুক্ষণ পরে আমরা লাইট জ্বালিয়ে যখন দরজা খুললাম..দেখলাম ভয়ে রাগে সাইফুল ভাই চোখ লাল করে বের হল...কিন্তু কাউকে কিছু বলল না। ও অনেক মজার মজার ছড়া বানাতে পারতো....যেমন আমরা আমাদের আরেক চাচাতো ভাইকে ক্ষেপাতাম...রিগ্যান কহে টুম্পামনি সাজিয়ে দাও আমায়..বানিজ্য করিতে যাবো সুদূরপানে...চীন দেশে...(তারপরে ভূলে গেছি
অনেকদিন আমাদের সাথে থাকার পর সাইফুল ভাই সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেল। তার ৫/৬ মাস পরে সাইফুল ভাই আবার আসলো ডাক্তার দেখাতে। ঠিক সেইসময় আমার মেজচাচার মেয়েরাও আসলো বেড়াতে। এদের সাথে অনেকদিন পরে দেখা হওয়ায় আমরা এদের সাথে গল্পে এত মত্ত হয়ে গেছিলাম যে সাইফুল ভাই কে নিচে যেয়ে কেমন আছো জিজ্ঞেস করে আর কোন কথা না বলেই আবার আমরা উপরে এসে গল্প করতে লাগলাম। রাত ৯টার দিকে সাইফুল ভাইকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হল...তখনও আমরা খেয়াল করলাম না। রাত সাড়ে দশটায় ফোন করে আরিফ ভাই (সাইফুল ভাইয়ের বড়ভাই) বলল, সাইফুল ভাই মারা গেছে। আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না...কিভাবে এসব হল...শুধু এটুকুই জানলাম গ্রামে ওর বেশ কিছুদিন ধরে জ্বর থাকতো তাই এখানে ওকে ভাল করে দেখাতে আনা হয়েছিল। কি যে হয়েছিল তা আল্লাহই জানেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



