somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নটরডেমিয়ান ১: নবীনবরনের ব্যবচ্ছেদ (ব্যাচ '৯৯)

৩১ শে মে, ২০০৭ ভোর ৬:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নটরডেমের গেটের কাছে দাড়িয়ে বিতৃষ্ণা নিয়ে ভেতরে তাকাই। বাবা-মার পীড়াপীড়িতে নটরডেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, আমার ইচ্ছা ছিল ঢাকা কলেজে পড়ার, স্কুলের সব বন্ধুরাও ঢাকা কলেজেই। বাবা-মার ধারনা আমি যে রকম ট্যাটন, ঢাকা কলেজে ঢুকে গোল্লায় চলে যাব। আমার জন্য দরকার শক্ত হাতের শক্ত তদারকি।

কলেজটা লাল-নীল কাগজে বেশ ভালই সাজিয়েছে। ভেতরে কয়েকজন দোস্ত থাকার কথা। ঢোকার পথেই বিপত্তি। দু'জন শিশুসুলভ সিনিয়র ভাই গলায় ঢালাও মমতা নিয়ে বললেন, "ভাইয়া, নতুন ব্যাচ?"
আমি "জ্বী" বলেছি কি বলিনি তারা একটা "স্বাগতম হে নবীন" লেখা কাগজের টুকরো পিন দিয়ে আমার শার্টে আটকাতে গিয়ে পিন আমূল আমার বুকে ঢুকিয়ে দিল। সে এক রক্তারক্তি কান্ড। আমি এতটাই বিহবল যে টু শব্দটাও গলা দিয়ে বেরুলো না, দেখলাম এক ফোঁটা রক্ত শার্টে মিশে গেল। গর্দভ বড় ভাই দু'টো চরম বিব্রত হয়ে "স্যরি ভাইয়া, স্যরি ভাইয়া" করতে লাগলেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই হচ্ছে কলেজের ছাত্রদের অবস্থা! এই কলেজেই পড়তে হবে দু'দুটো বছর!

কলেজের মাঠে প্যান্ডেলের মত সাজানো হয়েছে। ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলে পড়েছি, ঢাকা কলেজের নবীন বরনে কনসার্ট দেখতে (পড়ুন মারামারি করতে) কম যাওয়া হয়নি। এখানে সিন দেখি পুরা উল্টা। সবাই বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে সপরিবারে উপস্থিত। আমি শামিয়ানায় ঢুকে দোস্তদের খোঁজ করি। ইমতিয়াজ, ফয়সাল, রনি, নিয়াজ, বনি আরও অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যায়।
রনি কানে কানে বলে, "দোস্ত, এখনও সময় আছে, ঢাকা কলেজে যাই গা চল।"
আমি গা লাগাই না।
নিয়াজ গোমড়া মুখে বলে, "বাবা-মা আসতে চাচ্ছিলেন, আমি দিয়েছি ঝাড়ি, বলেছি নবীন বরনে গার্জিয়েনরা যায় নাকি! এখানে অবস্থা দেখেছিস, স্টুডেন্টদের চেয়ে গার্জিয়েন বেশী!"
ওকে আর কি বলবো, আমারও বাসায় একই কাহিনী হয়েছে।
ইমতিয়াজ বলে, "দোস্ত অনেকে বোন নিয়ে এসেছে। ঐ কর্ণারে সবুজ জামা পড়া মেয়েটাকে দেখ... চরম না?"

এরই মাঝে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। নটরডেম যে কেবল ভাল ছাত্র বানায় না, শুদ্ধ মানুষও বানায় সেটাই ইনিয়ে বিনিয়ে সবাই বললেন। স্টেজে লম্বা সাদামাটা ফাদার পিশাতো উঠে চমৎকার বাংলায় নিজের বক্তব্য রাখলেন। এরপর শুরু হয়ে গেল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ-গান-আবৃত্তি উপভোগ করছি, এমন সময় স্টেজে আসলেন নাদুস নুদুস মায়া মায়া মার্লিন ক্লারা পিনেরু। টইটম্বুর গলায় বললেন, "এবার একটা অবাক কান্ড হয়েছে! প্রতিবার আমাদের পুরানো ছাত্ররা পারফর্ম করে। এবার তোমাদেরই একজন আমাকে একটু আগে বলেছে সেও কিছু করতে চায়। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই স্টেজে উঠছে, ওকে অনেক, অনেক হাততালি।"
স্টেজে উঠে এলো হাড়গিলে এক ছেলে, টাইট জিন্স আর লাল রঙের শার্ট পড়া। মাথায় আবার ফুটকি মারা লাল ব্যান্ডানা।
ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি পারফর্ম করবে?"
ছেলেটি মেয়েলি গলায় বলল, "ক্লাসিকাল ড্যান্স!"
আমি মনে মনে বললাম, হে ধরণী, দ্বিধা হও!
ছেলেটি মনে হয় পকেটে সব সময় ক্যাসেট নিয়ে ঘুরে, সেটা বের করে ম্যাডামকে দিয়ে বলে, "এটাতে মিউজিক আছে আপা!"
গান শুরু হতেই আমার পিলে চমকে উঠলো, চটুল হিন্দি গান, "গোরে গোরে মুখরেপে কালে কালে চশমা..."
আর সেই সাথে খ্যামটা নাচ। দর্শকরা দু'ভাগে ভাগ হয়ে শামিয়ানার নিচে বসে ছিল। বাম দিকে নতুন ছাত্ররা, ডান দিকে গার্জিয়েনরা। আমি দেখলাম খ্যামটা নাচের সাথে সাথে ডান দিকের সবার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। ছেলেটির কেরামতি আছে বলতে হবে, দেহের প্রতিটা অঙ্গ গরলের মত ওঠানামা করছে। দেখা গেল ছেলের আগ্রহটা আসলে গার্জিয়েন সাইডের বড় আপাদের দিকে। সোজা ঐ দিকে তাকিয়ে তার কোমড় সঞ্চালনের বিশেষ পারদশিতা পুরোদমেই প্রকাশ্যমান। নাচের ফাঁকে কাবিল ছেলে আবার মাথার ব্যান্ডানাটা খুলে নিখুঁত নিশানায় সবুজা জামা পড়া আপুর দিকে ছুঁড়ে দিল। আমি মুগ্ধ চোখে ছেলেটার হাতের টিপ দেখছি, ইমতিয়াজ কানে কানে বলল, "কান্ডটা দেখলি? হারামজাদার পুঁইতা ফালামু আজ।"
হঠাৎই গান বন্ধ হয়ে যায়। আমরা দেখি মিশকালো ঠোটের শ্যামলা রাগী চেহারার একজন মানুষ স্টেজে উঠে আসেন। কান ধরে ছেলেটিকে স্টেজের পাশে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান যেখানে সাবাই তাদেরকে দেখতে পাবে ঠিকই কিন্তু মনে হবে তিনি কাজটা আড়াল করার চেষ্টা করছেন। কিছু বোঝার আগেই ছেলেটার গালে গুনে গুনে পাঁচটা বিরাষি শিক্কার চড় পড়ে। আমাদের সেই প্রথম পরিচয় নটরডেমের ত্রাস টেরেন্স পিনেরু স্যারের সাথে। সারা মাঠে তখন পিনপতন নিঃস্তব্ধতা।
একটু পরেই আবার উঠে এলেন মার্লিন ক্লারা পিনেরু, তাঁর সেই ঢলঢল গলায় বললেন, "যে ছেলেটি নাচলো সে কিছু বলতে চায়!"
কান্না জড়া গলায় থেমে থেমে কথা আসে ছেলেটার, "আ....আমি বলেছিলাম ক্লাসিকাল ড্যান্স দেখাবো... কি....কি...কিন্তু যা দেখিয়াছি তা ছিল অশ্লীল... আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"
ইমতিয়াজ কানে কানে বলল, "উচিৎ শিক্ষা হয়েছে শালার!"

বিস্মিত আমি গুম হয়ে ভাবলাম, এইরে কলেজে উঠেও স্যারদের মার খেতে হবে নাকি! স্টেজে এলেন লিংকন ভাই, উঠেই ধরলেন হ্যাপি আখন্দের "চলনা ঘুরে আসি..." সময়টা মন্দ কাটে না।
সুর্য ডোবার সাথে সাথে অনুষ্ঠান শেষ। দোস্তরা মিলে বাইরে এসে একটা টং দোকানে সিগারেট চাই। সিনিয়র এক ভাই উঠে আসেন। জলদ কন্ঠে বলেন, "ফার্স্ট ইয়ার?"
"জ্বী ভাইয়া!"
"তাহলে মাইকেল মামুর দোকানে যাও। রফিক মামুর দোকান সিনিয়রদের জন্য, ঠিকাছে? আর যেন না দেখি এখানে।"
আমরা মিনমিনে গলায় "জ্বী ভাইয়া" বলে সরে আসি। এতক্ষনে নটরডেমকে কলেজ বলে মনে হয়, পরিচিত আবহাওয়ায় মনটাও ভাল হয়ে আসে। নাহ, যতটা ম্যাড়মেড়ে ভেবেছিলাম কলেজটা, ততটা মনে হয় না!


© অমিত আহমেদ

(চলতে পারে)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০০৭ রাত ১২:৪৯
৩৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×