somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'
মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলবেন। কেউ তাঁর লেখার কথা বলবেন। কেউ বলবেন পেশার কথা। কেউ পারিবারিক, কেউ প্রাতিষ্ঠানিক, কেউ আবার তাঁর নেয়া উদ্যোগগুলোর কথা বলবেন। কেউ তাঁকে স্বর্গ উচ্চতায় উঠিয়ে রাখবেন। কেউ তাঁকে নিয়ে কথা বলার মতো মানুষ বলেই মনে করবেন না। তাঁকে নিয়ে সমালোচনা প্রশংসা সব চলবে। কারণ সমকালীন বাংলাদেশে তিনি সবচেয়ে চেনা মানুষদের একজন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁর নাম জানে। চেহারা চেনে। কোনো মানুষ এত উপরে উঠে গেলে বিতর্ক এড়াতে পারে না; তাঁকে প্রতি পদে মানুষের ভালোবাসা আর সমালোচনা নিয়ে চলতে হয়।

অস্বীকার করার উপায় নেই; মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন। শৈশবে "দিপু নাম্বার টু", "হাত কাটা রবিন", "আমার বন্ধু রাশেদ" পড়ে আপ্লুত হয়েছি। এই বইগুলো আমার ছেলেবেলা রঙিন করেছে। কৈশোরে তাঁর সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলো, বিশেষ করে "কপোট্রনিক সুখ দুঃখ" বই পড়ে বিস্ময়ে বাকহারা হয়েছি। হতাশ হয়েছি তাঁর উপন্যাসগুলোর দুর্বল বুনোনে। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে তাঁর কলাম পড়তে ভালো লাগে; ভালো লাগে কলাম জুড়ে তাঁর মুক্তচিন্তা বিচ্ছুরণ। পাঠকদের প্রতি তাঁর সম্মানবোধ। আবার হতাশ হই যখন দেখি এতো জ্ঞানী একজন মানুষের গবেষণায় যেমন সময় দেবার কথা ছিলো তেমন তিনি দিচ্ছেন না। মাথা ঘামাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে। তাঁর এসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি খুশি কিংবা হতাশ হই, কারণ যেভাবেই হোক তিনি আমাদের কাছের মানুষ হয়ে গেছেন।

একজন মানুষ যখন এভাবে অন্যের জীবনে ঢুকে পড়েন তখন তাঁর মধ্যে যে ক্ষমতাটা জন্মায় সেটা ব্যবহার করে অনেক কিছুই করে ফেলা যায়। একটা ছোট্ট লেখা কথা কিংবা সাক্ষাতকারও আর ছোট থাকেনা। তাই জনপ্রিয় মানুষদের কাছে আমাদের অনেক চাওয়া পাওয়া জমে থাকে। আমাকে যদি এখন জিজ্ঞেস করা হয় আমি বলবো, মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে আমার সেই চাওয়া পূর্ণ হয়েছে!

বইটা আমি পড়েছি। ছোট্ট বই। খুব সহজ ভাষায় লেখা। মোটেই বিস্তারিত নয়। নতুন প্রজন্মের জন্য এমনই দরকার। তথ্য যা আছে তাও মোটামুটি আগে থেকে জানা। বেশি তথ্য দিয়ে বই ভারী করা হয়নি, একদম যা জানা খুব দরকার, তাই। তবুও বইটা পড়তে গিয়ে আমি বারে বারে শিউরে উঠেছি। আমার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে এই বই নতুন প্রজন্মের পড়া উচিত। অবশ্যই পড়া উচিত!

জানলাম এই বইয়ের পেছনের মানুষগুলোর ইচ্ছে বইটা যতো বেশি মানুষের হাতে পারা যায় পৌঁছে দেয়া। মুনাফার আশা কারোরই ছিলো না। বইমেলায় তাই দাম খুব কম রাখা হয়েছিলো। বইমেলার পরেও বইটা উঠিয়ে না রেখে অন্তর্জালে তুলে দেয়া হয়েছে। আমি অনুরোধ করবো বইটা দয়া করে যেখানে যেভাবে পারেন ছড়িয়ে দিন। ফেসবুকে, ব্লগে, আপনার অন্তর্জাল পাতায়, ইমেইলে, প্রিন্ট নিয়ে, যেভাবে সম্ভব হয় সেভাবেই। তাঁর কাজ তিনি করেছেন, এবার বাকিটা আমাদের উপরে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনেক বড় শক্তি।
নতুন প্রজন্মকে সেই শক্তির স্বাদ নিতে দিন!

© অমিত আহমেদ

সরাসরি ডাউনলোড লিংক
বড় আকারে
ছোট আকারে

বই এর ওয়েবসাইট
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28931221 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28931221 2009-03-30 12:32:14
সামরিক বাহিনীর সৈনিকদেরকে অমিত আহমেদের খোলা চিঠি
পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরে গোলাগুলির খবর প্রথম পাই জিটকে এক বন্ধুর কাছ থেকে। তখনি বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ব্লগে ঢুকি; দেখি ব্লগাররা ইতিমধ্যেই লাইভ ব্লগিং শুরু করে দিয়েছেন। এরপরে যোগ দেয় সচলায়তন আর ক্যাডেট কলেজ ব্লগ। আমি তিন ব্লগেই চোখ রেখে ঠায় বসে থাকি। মাঝে মাঝে নানান সংবাদ মাধ্যমের আপডেট; আমাদের আড্ডা সাইটে স্ট্রিমিং বাংলা ভিশন সংবাদ।

নানান গুজব এড়িয়ে পরে যখন নিশ্চিত খবর পাওয়া গেলো ভেতরে কী হচ্ছে তখন; একদম সত্যি কথা বলি; আমার প্রাথমিক চিন্তাটা ছিলো খুবই সরল, "দেখ, এবার মজাটা দেখ!" আমার সহানুভূতি বলেন সমর্থন বলেন আর পক্ষপাত বলেন; সবই ছিলো বিডিআর জওয়ানদের জন্য। ওরা বলেছে ওদের উপর সেনা অফিসারেরা নির্যাতন করে, দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সেটা তারা কাদের সাথে করে না?

ভাই শোনেন,
খুব ছোটবেলায় মেজর আনোয়ারের লেখা "হেল কমান্ডো" পড়ে মাথায় মেজরের একটা কথা ঢুকে গিয়েছিলো, "নারীর প্রেমের চেয়ে আমার কাছে দেশপ্রেম অনেক বড়।" আমার স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে ঢোকার। সময়ের সাথে কী হলো বলেন তো? কী হলো যে আমার সামরিক বাহিনীর নাম নেবার আগে একটা গালি বসাতেই হয়? কী হলো যে খোদ বাংলাদেশের সেনারা আটক আছেন শুনে আমার কোনো উদ্বেগ আসে না?

আমি জানি, আপনারাও জানেন, বেশির ভাগ বাংলাদেশীদের প্রাথমিক অনুভূতি এমনই ছিলো। এই ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মানুষ সামরিক কর্মীদের কোনো সহানুভূতি দেখায়নি। আমার পরিচিত যে ক'জন মানুষ সামরিক বাহিনীতে আছেন তাদের সবার কথাতেই আমি প্রতিশোধ স্পৃহা ছাপিয়ে এই নিয়ে অভিমানটাই বেশি দেখেছি। বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের এতটা অপছন্দ করে এটা ইউনিফর্মের আবরণ ভেদ করে আপনারা হয়তো কখনোই বুঝতে পারেন নি। ফেসবুকে সেনা বন্ধুর স্ট্যাটাসে দেখলাম দেশ জুড়ে অনেক তরুন সৈনিকই রেজিগনেশন লেটার জমা দিচ্ছেন। তাদের অভিমান, "দেশের মানুষ আমাদেরকে চায় না; আমরা কেনো সামরিক বাহিনীতে থাকবো?"

ভাইরে,
কখনো কী ভেবেছেন, কেনো বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের প্রতি বিরূপ?

বাংলাদেশের মানুষ বারে বারে আপনাদের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছে। আমরা একাধিকবার সামরিক শাসন; ব্যর্থ ক্যু দেখেছি। আপনাদের গুলিতে আমাদের বন্ধুকে মরতে দেখেছি। আপনাদের বুটের তলে পাহাড়ি ভাই-বোনের অধিকার লুন্ঠিত হতে দেখছি। আচ্ছা, বাদ দেন না হয়! এগুলো জাতীয় সমস্যা। আমরা বাংলাদেশীরা আমাদের নিজেদের গায়ে আঁচ না লাগলে এত বড় ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। সেই ব্যক্তি পর্যায়েও আমাদের অনেক কিছু দেখা হয়ে যায়। আমার হয়তো সংবাদপত্রে পড়া পাহাড়ি নির্যাতনের কথা মনে থাকবে না। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টে লেন পরিবর্তন করার দোষে বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালাকে আপনাদেরই কারো একজনের লাথি মারার কথা মনে থাকবে। কারণ এগুলো আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে।

আপনারা শপথ নিয়েছেন, "জল, স্থল, অন্তরীক্ষে যেখানে যাইবার আদেশ হইবে সেইখানে যাইতে বাধ্য থাকিব।" শপথ নিয়েছেন, "জীবনের বিনিময়ে হইলেও বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করিব।" তাই যে কোনো সমস্যায় আমাদের আপনাদের কথা মনে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, বিদেশী অতিথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, সাফ গেমসে সোনার দৌড়ে টিকে থাকতে, এমন কী যানযট নিরসনে! এর সব হয়তো আপনার করার কথা ছিলো না। এসব কিছু করার শপথ হয়তো আপনি নেননি। গরীব আমাদের বিন্দু বিন্দু করে উপার্জন করা টাকাগুলোর একটা বড় অংশ চলে যায় প্রতিরক্ষা খাতে। তাই আমরা আপনাদের কাছ থেকে এসব দাবি করি। আমাদের মনে হয় না এগুলো বাড়তি কোনো কাজ। দেশের জন্য এই কাজগুলো করার সামর্থ্য আমাদের সবার নেই। আপনাদের আছে। তাই এই কাজগুলো করে যখন আপনারা যখন আমাদের আঙুল তুলে দেখিয়ে দেন তখন আমাদের ভালো লাগে না। যখন আপনারা আমাদের "ব্লাডি সিভিলিয়ান" বলেন, আমাদের ভালো লাগে না। আমাদের মনে হয় আমাদের খুব প্রিয় কেউ আমাদের গালে চড় বসিয়ে দিলো। বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। আপনাদের মধ্যেও। আমাদের দেশ রক্ষার ভার যাঁদের হাতে, তাদের মাঝে দুর্নীতি আমাদের ভালো লাগে না।

কিন্তু ভাই,
আমাদের এই রাগ, এই ক্ষোভ, এই অভিমান আপনাদের উপর করার হক আমাদের আছে। কারণ আমরা আপনাদের ভালোবাসি। আপনারা আমাদের দেশের মানুষ। আমাদের ভাই। আমরা আপনাদের গালি দেই। কিন্তু ভিনদেশী কেউ দিলে আমাদের মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমরা নিজেরা আপনাদের নির্যাতনের কথা বলি। কিন্তু ভিনদেশী কেউ জিজ্ঞেস করলে মাথা উঁচু করে লাইবেরিয়ার গল্প শুনিয়ে দেই। আমরা আপনাদের অবিশ্বাস করি। কিন্তু ভিনদেশী কাউকে বলতে একবিন্দু দ্বিধা হয় না যে আমাদের সেনা পৃথিবীর সেরা। আমরা আপনাদের খলনায়ক বলি। কিন্তু আমাদের সব চেয়ে জনপ্রিয় কল্পনায়ক "মাসুদ রানা"কে বানাই সেনা সদস্য। আমরা আপনাদের ভরসা করি না। কিন্তু দেশের যে কোনো সংকটে আমাদের আপনাদের কথা মনে পড়ে।

আমরা নিজেদের বাড়িতেই ঝগড়া করি, রাগ করি, চিল্লাই। পড়শীর বাড়িতে না। আমাদের ভালোবাসাকে ভুল বুঝবেন না। অবহেলা করবেন না।

বিডিআর বিদ্রোহের খবরে আমার প্রাথমিক অনুভূতি তো বললাম। পরের কথা বলি। যখন নিশ্চিত হই বিডিআর কার্যালয়ে সেনা খুন হয়েছেন, আমার বুক কেমন চিনচিনিয়ে ওঠে। পরে যেখন শুনি সেই সংখ্যা শতাধিক তখন আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগে না! এক একটা লাশ উদ্ধার হয়। আমি মেহেদী মুছে না যাওয়া নববধূর কান্নার ছবি দেখি। বাবাকে হারিয়ে শিশুর চিৎকার দেখি। সহকর্মী হারিয়ে অন্য সেনাদের গোঙানি দেখি। আমার চোখ জ্বালা করে ওঠে। আমার নিজেকে খুব, খুব ছোট মানুষ হয়! সেনা ভাইদের পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়।

আজ দেখুন, সারা দেশ জুড়ে মানুষ আপনাদের শোকে বিহ্বল হয়ে আছেন। প্রথম ধাক্কার সেই "ঠিকই আছে" মনোভাব আর নেই। আজ আমাদের সবার চোখেই জল। কেনো জানেন? কারণ স্বজনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ-শিশুর বেদনাক্লিষ্ট মুখ আমার মতোই সবার বুকে কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছে। সবাই হঠাৎ করেই বুঝতে পেরেছে একজন সেনা আর কেউ নয়, রক্ত মাংসেরই মানুষ। তাদেরও মা আছে, বাবা আছে। ভাই-বোন-স্ত্রী আছে। তাদেরকেও কেউ "বাবা" বলে ডাকে। তারাও আমাদের মতোই ভাতের সাথে ডাল মাখিয়ে খান। ইলিশের মৌসুমে বাজার থেকে ইলিশ কিনে আনেন। বিকেলে স্ত্রীর সাথে টিভি দেখেন। রাতে সন্তানকে পড়া দেখিয়ে দেন। ছুটির দিনে মা'কে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। এমনটা তো আমরা সব সময় বুঝতে পারি না!

আমরা তিন দিন ধরে শোক পালন করবো। আমার মতো সারা দেশের মানুষই রাতে ঘুমাতে গিয়েও শুধু এপাশ-ওপাশ করবেন। কারণ আমাদের ভাই খুন হয়েছেন; আমাদের ভাইয়ের হাতেই। এ যে কতো বড় কষ্ট, কতো বড় বেদনা; এই কষ্ট আর বেদনা যেনো আর কোনো বাংলাদেশীর কোনো দিনও পেতে না হয়। বিডিআরের প্রতি আপনাদের ক্ষোভ আমরা বুঝি। খুনি বিডিআর জওয়ানদের বিচার হোক; শাস্তি হোক। এটা আমি চাই; সারা দেশের মানুষ চায়। কিন্তু রক্তপাত করে সেই শোধ তুলবেন নারে ভাই। একই কষ্ট আমাদের আরেকবার দেবেন না। বিচার ব্যবস্থায় ভরসা রাখুন।

বিডিআর বিদ্রোহ আসলেই বিদ্রোহ ছিলো কিনা তা নিয়ে এখন আমাদের সন্দেহ দানা বাঁধছে। অনেকেই অনেক রকম কন্সপিরেসি থিয়োরি নিয়ে আসছেন। কিন্তু তাদেরও তো ক্ষোভ ছিলো। অনেক জওয়ানও তো নিহত হয়েছেন। আচ্ছা থাক, এসব নিয়ে আমি কিচ্ছু বলবো না, শুধু বলবো এই যে এই বিভৎস হত্যাকান্ড আপনাদেরকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে, এখান থেকে আর দূরে সরে যাবেন না। আমরা আপনাদের কাঁধে সমবেদনার হাত রাখতে চাই। আমরা আপনাদেরকে "ভাই" বলে ডাকার অধিকার ফেরত চাই। যে ভুলগুলো আগে হয়েছে, করে ফেলেছেন, সেগুলো আর করবেন না। আপনারা "দায়িত্ব" আর "সম্মান"-এর শিক্ষা পেয়েছেন। সেই শিক্ষা বিফলে যেতে দেবেন না। আমি জানি অল্পকিছু অফিসারের জন্য আপনাদের মাথাতে দুর্নীতির বোঝা চলে এসেছে। দায়িত্ব আর সম্মানের কথা চিন্তা করে তাদের একঘর করে ফেলুন। শুধু আপনারা কেনো, বদলাতে হবে আমাদেরকেও। এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমরা সবাই শিক্ষা নেবো। আমরা একাত্তরের চেতনায় নতুন করে দেশ গড়তে শিখবো।

ভাইরে,
আমাদের দেশের মানুষেরা খুব সরল। আমরা মনে রাখি না, ভুলে যাই। পরম শত্রুকেও আমরা ক্ষমা করে দেই। সেই ভালো মানুষীর সুযোগ নিয়ে রাজাকারেরা সংসদে আস্ফালন করতে পারে। কোথাকার কোন শর্মিলা বোস লিখে দিতে পারে একাত্তরে নারী ধর্ষণ হয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত জিয়া ইস্পাহানি শুয়োরের বাচ্চা বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলার সাহস পায়, "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপনের সময় এখন নয়।" আর আপনারা তো আমাদের দেশের সূর্য সন্তান। আমাদের বুকে আপনাদের জন্য যে ভালোবাসা যে গর্ব ছিলো তা তো কখনো মুছে যায় নি! যেমন ছিলো তেমনই আছে। শুধু বারে বারে আমাদের ভালোবাসা ঠেলে দিয়েছেন বলে এতো দূরে সরে গেছে যে হঠাৎ যেনো আমরাও ঠাওর পাই না। আপনারা একধাপ নেমে শুধু একবার আমাদের কাতারে আসুন। এরপরে দেখুন আমরা আপনাদের জন্য কী করি! আমাদের দেশটাতে অনুসরণ করার মতো নায়কের খুব অভাব রে ভাই। একবার আপনাদেরকে নায়ক ভাবার সুযোগ দিন। দেখবেন, বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের জন্য জান লাগিয়ে দেবে।

আমি, একজন বাংলাদেশী হিসেবে, বুকে হাত রেখে আজ আপনাদেরকে এই ওয়াদা করলাম!

© অমিত আহমেদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28918034 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28918034 2009-02-28 15:03:02
বাংলাদেশে কম্পিউটার বিজ্ঞানের কনফারেন্স?
অগ্রিম ধন্যবাদ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28901646 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28901646 2009-01-24 04:14:14
ফাটায়ালাও ঢাকা ওয়ারিয়র্স

দৈনিক প্রথমআলোতে সেদিন শিরোনাম পড়ে আমার তৎক্ষণাৎ যা মনে হলো তা হলো “আরে সাব্বাশ!” সাংবাদিকেরা যে আমার মতো এতো উচ্ছসিত ছিলেন না তা স্পষ্ট বোঝা যায় সেদিন আর পর পর ক’দিনের সংবাদপত্রে, ওয়েবসাইটে। একটু গুতো মারতে গুগলে ক্রিকইনফো আর নানান সংবাদপত্রের লিংক চলে আসে। সেখানেও সেই একই রকম একগুঁয়ে মূলভাব, “বাংলাদেশের বিদ্রোহী ক্রিকেটারেরা টাকার লোভে দেশের সাথে বেঈমানী করেছে!”

সাংবাদিকরা খুব সহজেই এই তেরো ক্রিকেটারদের গায়ে “বিদ্রোহী”, “বিশ্বাসঘাতক”, “অর্থলিপ্সু” তকমা লাগিয়ে দিলেন। কেনো? এই তেরোজনের মধ্যে জাতীয় দলে ছিলেন মোটে ছয়জন (আফতাব, কাপালী, নাফিস, রেজা, ধীমাণ আর মোশাররফ)। তাও জানার উপায় নেই এদের মধ্যে ক’জন নিউজিল্যান্ড সিরিজে সুযোগ পেতেন। রফিক আগেই অবসর নিয়েছেন। হাবিবুলের অবস্থানও তেমন মজবুত ছিলো না। বাকিরা কেউ জাতীয় দলে খেলেনি। কথা ঠিক এদের পেছনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শ্রম দিয়েছে অর্থ ঢেলেছে। কিন্তু তা তো মাগনা নয় খেলার বিনিময়ে।

আজকের বিনোদন-বাজার ও পেশাদারিত্বের যুগে খেলা আর শখ নেই। আয়োজকেরা হয়ে গেছেন ব্যবসায়ী আর খেলোয়াড়েরা চাকুরে। এখানে আবেগ কিংবা ঠুনকো মূল্যবোধের কোনো দাম নেই। আমার আগের লেখাতেও ঠিক এই কথাটিই বলেছিলাম। বলেছিলাম বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব শিখতে হবে। আমাদের “তথাকথিত” বিদ্রোহী তেরো খেলোয়াড় কিন্তু হাতে-কলমে ঠিক তাই দেখিয়ে দিলেন। চলে যাবার কারণ হিসেবে তারা বলেছেন তাদের সাথে করা অনাচার/অবিচার। অর্থ নয়। তবে সেটি এখানে বিবেচ্য নয়। যা বিবেচ্য তা হচ্ছে - নিজেদের পরিস্থিতি বিচারে তারা পেশাদারের মতো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত হয়তো বিসিবিকেও পেশাদারিত্ব শেখাবে। দেখাবে বাঙালি ক্রিকেটারদের যাবার অন্য জায়গাও আছে।

আচ্ছা বাদ দেই না-হয় এসব আলোচনা। বরং আইসিএল কেনো বিদ্রোহী হলো তার কারণ শুনি। তারা তাদের নিজেদের টুর্নামেন্ট চালু করেছে। তো? ক্রিকেটাররা ক্রিকেটই খেলছেন। ভালো কোচ পাচ্ছেন। উন্নত ট্রেনিং সুবিধা পাচ্ছেন। এমনকি নিজের দেশ কিংবা শহরের নাম পিঠে চড়িয়েই খেলতে পারছেন। এ-কি দোষের কিছু? কেনো আইসিএল-এ খেললে সেই খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করা হবে? বিসিসিআই আর আইসিসি কি ক্রিকেট কিনে রেখেছে যে তাদের কথা ছাড়া ক্রিকেট খেলা যাবে না?

দোষ আসলে সেখানে নয়। দোষ হচ্ছে হচ্ছে বিসিসিআই এই খেলা থেকে অর্জিত টাকার কোনো ভাগ পাচ্ছে না। একদম সংক্ষেপে বলি। বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বিসিসিআই। আর এই কারণে কোনো দেশই ওদেরকে ঘাঁটাতে সাহস পায়না। আইসিসি তো অনেক আগে থেকেই বিসিসিআই-এর পকেটে ঢুকে বসে আছে।

এরপরে আছে ভারতের প্রাদেশিক রাজনীতি। শক্তিশালী প্রদেশগুলো সবাই ভারতীয় জাতীয় দলে তাদের এক/দুইজন খেলোয়াড় দেখতে চায়। অনেক ভালো খেলোয়ার এজন্য বাদ পড়ে যায়। ম্যাচ গড়াপেটা আর বাজীর ব্যাপার-স্যাপারও আছে বলে কপিল দেব ও অন্যান্যরা প্রায়ই ইঙ্গিত দেন। সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটারদের একটি বড় অংশ বিসিসিআই এর উপর খাপ্পা।

অন্যদিকে ভারতের এসেল গ্রুপ চাচ্ছিলো ক্রিকেট ব্যবসার কিছু ভাগ পেতে। কিন্তু বিসিসিআই এর হর্তা-কর্তাদের সাথে ব্যক্তিগত ঝামেলা থাকায় একাধিক বার বেশি টাকার প্রস্তাব দিয়েও এসেল গ্রুপ ভারতের (কিংবা অন্য দেশের) ক্রিকেট সম্প্রচার স্বত্ত কব্জা করতে পারেনি। পরে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই বিসিসিআই এর উপরে যারা নাখোশ তাদের সঙ্গে নিয়ে নিজেরাই নিজেদের লীগ খুলেছে। এতে ব্যক্তিগত ভাবে আমি দোষের কিচ্ছু দেখি না।

আইসিএল-এর বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের পেছনেও কিন্তু বানিজ্য আছে। ব্যাপার এরকম যে যতো বেশি দেশ আইসিএল-এ খেলবে ততো বেশি দর্শক। ততো বেশি বিজ্ঞাপন। আপনি মানুন আর না মানুন। সমর্থন করুন আর না করুন। ক্রিকেট ফ্যান হলে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে ঢাকা ওয়রিয়র্স খেলতে শুরু করার পর থেকে আপনি এই টুর্নামেন্টের খবর রাখবেন। আর তা জানে বলেই দেশের সংবাদপত্রগুলোও সিরিজের আপডেট দেবে। এভাবে বাংলাদেশের মিডিয়া আর দর্শকের একাংশ কিন্তু ওদের হাতে চলে গেলো। পাকিস্তানের লাহোর বাদশাহস-এর আদলে বাংলাদেশ নিয়ে একটি দল করার ইচ্ছে তাদের গতবছরও ছিলো। সে সময় তারা আশরাফুলকে অফার দিয়েছিলো। শুনি সে নাকি নিমরাজীও ছিলো। পরে সেই পরিকল্পনা আর ব্যাটে-বলে হয়নি।

আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে আইসিএল ২০-২০ ইন্ডিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ঢাকা ওয়রিয়র্সের যাত্রা। প্রথম খেলা চেন্নাই সুপারস্টারসদের সাথে। আমি মনে প্রানেই ওদের সমর্থন দেবো। আমাদের মাটির ছেলে। বাংলাদেশের ছেলে। ওদের নামের সাথে জড়িয়ে থাকবে আমার এই হতভাগ্য দেশটিরও নাম। তাই আগামীকাল টিভিস্ক্রিন কিংবা ইন্টারনেট ব্রাউজারের সামনে আমাকে হাত মুঠো করে বসতেই হবে।

ঢাকা ওয়রিয়র্স… ফাটায়ালাও!

© অমিত আহমেদ

ছবি কৃতজ্ঞতা: Indian Cricket League]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28853042 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28853042 2008-10-10 15:15:37
বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা কালেভদ্রে ইন্টারনেটে ক্রিকেট ফোরামগুলোতে ঢুঁ মেরে দেখি। এম্নিতেই। কে কি বললো, নতুন কি ঘটলো, কে সেঞ্চুরি মারলো - এসব মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে। এসব ফোরামে অনেকটা মজা করেই অনেকে “বাংলাদেশ” প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। সেগুলো পড়তে গিয়ে আমার সবসময়ই কান লাল হয়ে যায়। বাংলাদেশ নিয়ে দুই ধরণের মন্তব্য হয়। খুব অপমানজনক, কিংবা বড়ভাই সুলভ। দু’টোই অসহ্য। যারা অপমান করতে চান তাদের খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। বাংলাদেশের শোচনীয় হারের অভাব নেই। সেগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নোংরা ভাবে বলা হয়। বলা হয় “বাংলাদেশকে টেস্ট-স্ট্যাটাস দেয়া উচিত হয়নি। এক্ষুণি সেটা কেড়ে নেয়া হোক।” বড়ভাইয়েরা আবার একটা “আরে, হবে হবে” ধরণের ভাব নেন। শ্রীলংকার উত্থানের উদাহরণ দিয়ে বলেন “গরীব দেশ, নতুন দল, একটু সময় লাগবে।”

এই যে কদ্দিন আগে আমাদের কিছু খেলোয়াড় আইসিএল-এ চলে গেলো এই নিয়ে সব ক্রিকেট ফোরামেই বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। তাদের সবার প্রায় একই রকম কথা “গেছে ভালো হয়েছে। এমনিতেই বা কি হাতি ঘোড়া মারছিলো?” অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে এসে বলে “বাংলাদেশের মতো জঘন্য দলের টেস্ট-স্ট্যাটাস কেড়ে নেবার এই মোক্ষম সুযোগ!” আমি দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে যাই।

ওরা যে জিনিসটি মাথায় রাখেন না সেটি হলো “আমাদের সুযোগের অভাব।” বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগটা পাচ্ছে কই? আইসিসি নির্ধারিত বাৎসরিক বাধ্যতামূলক খেলাগুলো বাদে ভালো দলের সাথে বাংলাদেশের খেলার সুযোগই হয় না। কেউ খেলতে চায় না। তাদের কথা বাংলাদেশের সাথে খেললে স্পনসর পাওয়া যায় না। টিকেট বিক্রি হয় না। টিভিতে কমার্শিয়াল আসে না। খেলাতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না।

তা এসব তো কোনো নতুন কথা নয়। একটি নতুন দল আসলে অভিজ্ঞতার অভাবে এমন হবেই। সময়ের সাথে সাথে দল ঋদ্ধ হবে। ফ্যান বাড়বে। আর সেই সাথে সাথে বাড়বে ব্যবসায়িক আগ্রহ। সেই সুযোগই তো আমরা পাচ্ছি না।

হ্যাঁ, সুযোগ দিতে পারতো ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলংকা। কিন্তু সেই সুযোগ এই নবাবের বাচ্চারা আমাদের দেবে না। এক পাকিস্তান বাধ্য হয়েই ("নিরাপত্তা সন্তোষজনক নয়" অভিযোগে অন্য দেশ প্রায়শই সিরিজ বয়কট করে) আমাদের সাথে আইসিসি তালিকা বহির্ভূত খেলা বেশি খেলেছে। শ্রীলংকা তাও আইসিসির তালিকা ধরে খেলাগুলো শেষ করে, ভারত তাও করে না। ভারতের কাছ থেকে অনেকদিন থেকেই আমাদের আমন্ত্রণ পাওনা হয়ে আছে, তা তারা নানান অজুহাতে কেবলই এড়িয়ে যাচ্ছে।

এসব কারণে এমনও হয়েছে যে এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই! এই সমস্যা সহজে মিটবে না। কারণ বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশ নিয়ে সবার উন্নাসিকতা প্রকাশ পেয়ে গেছে। আমাদের খেলার টিভিস্বত্ত কিনেছিলো ভারতীয় সংস্থা নিম্বাস । ওরা বলে দিয়েছে লাভ হয়না বলে বাংলাদেশের খেলা ওরা সম্প্রচার করবে না। করতে বাধ্য নয়। আইসিসির টিভি ক্যামেরা নিয়ে কিছু নিয়ম ঠিক করে দেয়া আছে। সেই মেনে ওরা টিভি ক্যামেরা অবশ্য দিচ্ছে, মোট বারোটি। যেখানে একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ছাব্বিশ কিংবা তার বেশি টিভি ক্যামেরা দেয়া হয়।

ক'দিন আগে শুনলাম চ্যানেল আই নাকি নিম্বাসের কাছ থেকে মাত্র পনেরো হাজার ডলারে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের সম্প্রচার-স্বত্ত কিনে নিয়েছে। কাল শুনি সে পরিকল্পনায় নাকি বাগড়া দিয়েছে বিটিভি। তারা বলে বিটিভি ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো চ্যানেল খেলা সম্প্রচার করতে পারবে না! এসব ঝামেলায় সমস্যা হয়েছে আমাদের, প্রবাসীদের। আন্তর্জাতিক কোনো টিভি চ্যানেলে খেলা সম্প্রচার হয়নি বলে আমরা খেলা দেখতে পারিনি। সারাক্ষণ ক্রিকইনফোর পাতা খুলে বসে থাকতে হয়েছে।

সব হিসেব করে যা বুঝলাম এই সিরিজ আয়োজন করতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিশাল পরিমান টাকা জলে চলে যাবে। শুধু খেলার টিকেট বেচে লগ্নি করা টাকা উঠে আসবে না। এভাবে লস দিয়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষমতা বিসিবি-র নেই বলেই মনে হয়।

আমাদের দেশে ক্রিকেট প্রতিভার অভাব আছে তা আমি বিশ্বাস করি না। নতুন যারা আসে, বয়স যতই কম হোক, তাদের সবার হাতে অসংখ্য শট। দুর্দান্ত বোলিং অ্যাকশন। আমি সবসময়ই মুগ্ধ হই। তবে সমস্যা হলো তারা সময় মতো পারফর্ম করতে পারে না। করলে যে ম্যাচ জেতা কোনো ব্যাপারই না তার প্রমান গতকালের ম্যাচ । অনেকে বলে আমাদের খেলোয়াড়দের দেশপ্রেম নেই। একদম রদ্দি কথা! সমস্যা দেশপ্রেমের নয়। প্রতিভারও নয়। সমস্যা হলো পেশাদারিত্বের। আর এই পেশাদারিত্ব নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেললে কখনোই আসবে না।

সেটি যখন সম্ভব হচ্ছে না তখন আমরা কয়েকটি বিকল্প দেখতে পারি -
১) কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে ও আয়ারল্যান্ডের সাথে নিয়মিত হোম-অ্যাওয়ে সিরিজ চালু করা। এই তিন দেশের এতে আপত্তি হবে বলে আমার মনে হয় না।
২) ঘরোয়া লীগকে শক্তিশালী করতে হবে। কেনিয়া আর আয়ারল্যান্ডের একটি-দুটি করে দল আমাদের ঘরোয়া লীগে খেললে দুর্দান্ত একটি জিনিস হবে।
৩) বয়সভিত্তিক লীগ জোরদার করা। এতে ছোট বয়স থেকেই পেশাদারিত্বের তালিম হবে।

এসব করেও হয়তো আইভিলীগের স্বাদ অনাস্বাদিতই থেকে যাবে। তবু ওদের শ্রদ্ধা আদায় করে না নেয়া পর্যন্ত এছাড়া তো আর কোনো উপায়ও দেখি না।

© অমিত আহমেদ

ছবি কৃতজ্ঞতা: Cricinfo.com ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28852924 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28852924 2008-10-10 04:54:05
মুহম্মদ জুবায়ের ভাইয়ের জানাজা ও দাফন

ডালাস সময় Central (UTC-5)

জানাজা

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮
বাদজুম্মা, বিকেল ৩:১০
IANT , Richardson Mosque
840 Abrams Road
Richardson, TX 75081
972-231-5698

দাফন

একই দিন, জানাজার পরপরই
Restland Memorial Park (Islamic Garden)
Restland Funeral Home and Cemetery
13005 Greenville Ave
Dallas, TX 75243
Phone: 972-238-7111 or 800-749-7379]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28848053 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28848053 2008-09-26 09:14:03
কিভাবে প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে হয় একটু জানাবেন জুবায়ের ভাই? মুহম্মদ জুবায়ের ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় এই "বাঁধ ভাঙার আওয়াজ" ব্লগেই। তখন ব্লগে নতুন নতুন এসেছি। কাউকে চিনি না। "মুহম্মদ জুবায়ের" নামটির সাথে অন্তর্জালিক কিংবা কাগজ মাধ্যমে পূর্বপরিচয়ও ছিলো না। আমার জানা ছিলো না "মুহম্মদ জুবায়ের" নামক ব্যক্তিটি একজন পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ লেখক।

উনি তখন ধারাবাহিক ভাবে উপন্যাস "পৌরুষ" পোস্ট করছিলেন। "পৌরুষ" এর শুরু ভালো লাগলেও মাঝের কাহিনী বিন্যাস আর সমাপ্তি মন ভরাতে পারেনি বলে বেশ প্রগল্ভ নিয়েই অভিযোগ, সমালোচনা করেছিলাম। আক্রমনের প্রেক্ষিতে জুবায়ের ভাই আমাকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেননি তিনি আমার চেয়ে বয়স, প্রজ্ঞায় কতো বড়। বরং মন দিয়ে শুনে গেছেন আমার অভিযোগ, পরামর্শ। পরে জেনে মন খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিলো জুবায়ের ভাই বুঝি ভেবে বসলেন আমি বড়দের শ্রদ্ধা করি না। ঠিক করেছিলাম কোনো একদিন সামনা সামনি দেখায় জুবায়ের ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো।

সচলায়তনে যখন শুনলাম জুবায়ের ভাই ফুসফুসজনিত জটিলতায় অসুস্থ হয়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্রনির্ভর হয়ে আছেন - তখন থেকেই মনে কেমন কু ডাক দিচ্ছিলো। খবর জানতে ফোন দিয়েছিলাম জালাল ভাইকে। তিনি "এখন অনেক সুস্থ আছে" জানালেও আমার মনে কু ডাক বন্ধ হয়নি।

আমি তানভীর ভাইয়ের কাছ থেকে হাসপাতালের ঠিকানা নেই। জুবায়ের ভাইকে ফুল পাঠাবো। সেই ফুল পেয়ে হয়তো তিনি খুশি হবেন। এর পরে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয় সময় তো আছে, কাল পাঠাবো। এই করে করে দিন চলে যায়। আমার আর ফুল পাঠানো হয় না।

বাসায় এসে খবর পেয়েই আমার কেমন হাঁসফাঁস লাগে। আমি মাথায়-মুখে পানি দিয়ে আসি। আমার মনে হয়, কি যেনো বলা হলো না, কি যেন করা হলো না। তার আগেই চলে গেলেন আমাদের সবার শ্রদ্ধার, ভালোবাসার প্রিয় জুবায়ের ভাই!

আজ আর লিখতে পারছি না। আজ আর সম্ভব নয়।

শুধু বলি, বেঁচে থাকুন শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জুবায়ের (২২ মে ১৯৫৪ - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮)
... আপনার রচনায়, আমাদের ভালোবাসায়!


মুহম্মদ জুবায়ের এর লেখার লিংক
- বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ব্লগ
- সচলায়তন ব্লগ
- ব্লগস্পট
- এনওয়াইবাংলা কলাম
- পিডিএফ-এ উপন্যাস "পৌরুষ"


এনওয়াইবাংলা থেকে মুহম্মদ জুবায়ের এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
জন্ম ২২ মে ১৯৫৪। বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরে। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে। সত্তর দশকের প্রথমার্ধে লেখালেখি শুরু হলেও ১৯৮৪-৮৫ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত দীর্ঘ স্বেচ্ছা-অবসর বা শীতঘুমে মগ্ন। গল্প-উপন্যাস এবং সংবাদপত্রের কলাম ও ব্যক্তিগত রচনাসহ বিবিধ গদ্যের রচয়িতা, কিছু অনুবাদকর্মও আছে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’ট – উপন্যাস “অসম্পূর্ণ” (১৯৮৬) ও কিশোর উপন্যাস “আমাদের অমল” (২০০৩)। পরবাসজীবন ১৯৮৬-র মাঝামাঝি থেকে। বসবাস করেছেন আমেরিকার টেক্সাস রাজ্যের ডালাস শহরে। মুহম্মদ জুবায়ের এক কন্যা (বয়স ২০) এবং এক পুত্র (বয়স ১০) সন্তানের জনক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28847739 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28847739 2008-09-25 12:18:46
অলিম্পিক রম্য: অ্যাথলেট রোমেল
'সাব্বির। আহ! সাব্বির। ইয়ার মেরা। এসেছিস দোস্ত? বস একটু, আমি চেঞ্জ হয়ে আসি।'

বলেই অন্দর রুমে ছুট লাগালো রোমেল। আমি বিস্ময় নিয়ে বসে থাকলাম। ব্যাপারটা কি? হারামজাদা আমাকে দেখে এমন ভাব করলো যেন হাতে আকাশে চাঁন্দা পেয়ে গেছে। কেস তো খুব একটা সুবিধার লাগছে না। টাকা ধার চাইবে নাকি?

'চল দোস্ত।'

আমি রোমেলের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। গায়ে হাতা কাটা গেঞ্জি, পায়ে রানিং শু আর কোমড়ে বাঁধা ছোট্ট একটা প্যান্ট। ব্যাটা এতো ছোট হাফপ্যান্ট কোথা থেকে সংগ্রহ করলো খোদাই জানেন। লেডিস প্যান্ট নাকি? প্যান্টে যে রকম ময়ূরপঙ্খি রঙের সমাহার লেডিস বলেই তো মনে হচ্ছে! তবে এই মাইক্রোস্কোপিক হাফপ্যান্টটা পরার কি দরকার ছিলো বুঝতে পারছি না। এর চেয়ে কিছু না পরাটাই তো মনে হয় শোভন ছিলো।

'এসব কি রোমেল?'

'জগিং! জগিং হবে ইয়ার মেরা। তুই হবি আমার কোচ। টাইম দেখবি, রেকর্ড রাখবি, উৎসাহ দিবি। এই আরকি।' সবগুলো দাঁত বের করে বললো রোমেল।

'তোরও অলিম্পিকের হাওয়া লাগলো নাকি রে?' অবাক হলাম আমি। রোমেলের মতো অলস ছেলেও কি-না অলিম্পিক ফিভারে আক্রান্ত! বিস্ময় ভাঙলো শীঘ্রই। ঘটনা প্যাঁচ খেয়েছে সেই আদি ও চিরন্তন কারণে। নারী!

রুমা আমাদের কলেজেই পড়ে। ফটকা টাইপ মেয়ে হলেও চেহারা খাপখোলা। এ মেয়ে কাউকেই খুব একটা পাত্তা দেয় না একমাত্র আসমতকে ছাড়া। আসমত আমাদের কলেজের সেরা অ্যাথলেট। হান্ড্রেড মিটার দৌড়ে ঢাকা ইন্টার কলেজ রানার্স আপ। সোজা কথায় আমাদের কলেজের অন্য অনেক ইভেন্টের সাথেই হান্ড্রেড মিটার দৌড়ের চ্যাম্পিয়নের পদকটা মোটামুটি আসমতের জন্য পূর্ণনির্ধারিত। আমার গর্দভ বেস্ট ফ্রেন্ড রোমেল সিদ্ধান্ত নিয়েছে রুমাকে ইমপ্রেস করতে সে এবার কলেজ স্পোর্টসের দৌড়ে অংশ নেবে এবং আসমতকে হারিয়ে রুমার মন জয় করে নেবে।

শুনে রাগে গা-টা জ্বালা করে উঠলো আমার, 'আসমতকে? আসমতকে হারাবি তুই? মুখের কথা না? শালার মাইক্রোস্কোপিক হাফপ্যান্ট পরলেই দৌড়বিদ হওয়া যায় না বুঝলি?'

আমার কথা কানেই নিলো না রোমেল। নির্লিপ্ত মুখে হাতে একটা ফ্লাস্ক ধরিয়ে দিলো।

'এটা কি?' মেজাজ গরম করে বললাম আমি।

'ফ্লাস্ক দোস্ত। থার্মোফ্লাস্ক।'

'কি নিয়েছিস ফ্লাস্কে? চা নাকি?'

রহস্যময় হাসি হাসে রোমেল। বলে, 'চা না দোস্ত। এটা হলো গিয়ে যাকে বলে জিংসেং টি।'

'তুই কি ৮০ বছরের বৃদ্ধা নাকি ব্যাটা? ফেল ওইটা ফেল। ওই সব ফেংমেং বাদ দিয়ে কোকাকোলা নেই।' বলে ফ্লাস্কটা খোলার চেষ্টা করলাম আমি। ঝট করে ফ্লাস্কটা কেড়ে নিলো রোমেল। ভাব-ভঙ্গি মরিয়া। ভাংবো তবু ফ্লাস্ক দেবো না। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

পার্কে ঢুকতেই বোঝা গেল কতো বড় ভুল করে ফেলেছি। ঢুকতে না ঢুকতেই আমাদের চারপাশে প্রায় মেলা জমে গেলো। পানিওয়ালা, পানওয়ালা, বিড়িওয়ালা, বাদামওয়ালা, শসাওয়ালা সবাই সবগুলো দাঁত বের করে রেখেছে। ওদের আনন্দ-উৎসাহের মূল উৎস রোমেলের হাফপ্যান্ট। আগে বুঝিনি, পার্কে খেয়াল করলাম শালার প্যান্টটা চকচকে কি কাপড় দিয়ে যেন তৈরি। আলো রিফ্লেক্ট করছে। অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ালো যখন পিচ্চি বাদামওয়ালা তার ঝাঁকার গোপন জায়গা থেকে একটা ছবি বের করে প্রমান করে দিলো 'আমার কইলজা' ছায়াছবিতে চাকভুম নৃত্যরত বিখ্যাত চিত্রনায়িকা মিস কপির পরিধান করা হাফপ্যান্ট আর রোমেলের হাফপ্যান্ট হুবহু এক!

সবার হাস্যরসের কেন্দ্রবিন্দু হয়েও দেখলাম রোমেলের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আমার হাতে স্টপওয়াচ ধরিয়ে দিয়ে পার্ক রাউন্ড দেয়া শুরু করলো। উপস্থিত জনতা রোমেলের দৌড়ও ভীষণ ভাবে গ্রহণ করলেন। নিতম্ব দুলিয়ে রোমেলের দৌড়ানোর স্টাইলটা অনেকটা পাকি ইঞ্জামামের মতো।

দৌড় শেষে পার্কের বেঞ্চে বসা হলো। রোমেল দেখি দু'টো কাপে জিংসেং ঢালছে।

'দু'টো কাপে ঢালছিস কেনো?'

'তুইও একটু খা না দোস্ত!' অনুরোধের সুরে মরিয়া হয়ে বলে রোমেল। বুঝতে পারি জিনিসটা একা খেতে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না ব্যাটা।

চা মুখে দিতেই মুখ কুঁচকে গেল আমার, 'ওই! কি দিলি এটা?' ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম আমি। কোনো জবাব দিলো না রোমেল। লাল চোখে আমার দিকে তাকালো শুধু একবার।

এভাবে প্রায় এক মাস অনুশীলন চললো আমাদের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটলো দু'টো। এক, নিয়মিত জিংসেং টি খাবার ফলে রোমেলের পেট নেমে গেল। এবং দুই, একদিন পার্কে, প্রকাশ্য দিবালোকে, জগিংরত অবস্থায় রোমেলের হাফপ্যান্ট ফেটে গেল!

চলে এলো আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া দিবস। খুব ঘটা করে নতুন ট্র্যাকস্যুট পরে মাঠে নামলো রোমেল। সাথে কোচ হিসেবে আমি। আমাদের ধারণা ছিলো অন্তত্য আমাদের বন্ধুরা আমাদের ঘিরে থাকবে। উৎসাহ দেবে। কিন্তু যা বুঝলাম আমাদের চেয়ে ওদের আসমতের দিকেই আগ্রহটা বেশি। আসমতকে ঘিরে থাকা ভিড়ের মধ্যে থেকে রুমাকেও দেখা গেল আমাদের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসতে। যদিও রোমেলের ধারণা সেটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি ছিলো। শেষ-মেষ আমাদের দলে জুটে গেল বখা জগলু। ব্যাটা মনে হয় সস্তা বিড়ি ফুঁকে এসেছে। কাছে আসতেই ধক করে গন্ধ নাকে আসলো।

'কি-রে জগা? বিড়ি ফুকে এলি নাকি?' তরল গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি।

কথাটা বোধহয় লাগলো জগলুর। মুখ কালো করে ফেলল। বললো, 'বিড়ি খাই না আমি। এটা গাঁজার গন্ধ। পিওর গ্রীন গ্রাস।'

'গাঁজা ধরেছিস নাকি আজকাল? ঘটনা কি?'

'ঘটনা কিছুই না। গাঁজা খাইলে শরীরে আলাদা বল আসে। মনটা ফুরফুরা হয়। এইজন্য ম্যারাডোনাও খেলার আগে গাঁজা টানতো।'

কথাটা খট করে মাথায় বাঁধলো যেন রোমেলের, 'সত্যি? সত্যি ম্যারাডোনা খেলার আগে গাঁজা টানতো?'

'ইয়ে... মানে... ঠিক গাঁজা হয়তো না... একই জিনিস... মানে...' আমতা আমতা করে বললো জগলু।

'ব্যাস!' ট্রাফিক পুলিশের মতো এক হাত তুলে জগলুকে থামিয়ে দিলো রোমেল, 'পকেটে আছে দু'এক স্টিক?'

'তা আছে!' বিভ্রান্ত স্বরে বললো জগা।

বিভ্রান্ত হয়েছি আমিও। রোমেল ব্যাটার ঘটনা কি।

'সাব্বির ইয়ার মেরা। আড়ালে আয়...' ডাকলো রোমেল।

আমরা একটু সাইডে সরে এলাম। শুরু করলো রোমেল, 'তুই তো জানিস অলিম্পিকে খেলোয়াড়দের ডোপ টেস্ট করা হয়। কেননা ডোপ নিলে শক্তি-স্ট্যামিনা বেড়ে যায় হঠাৎ করে। ফলে জেতাটা হয়ে যায় সহজ। কিন্তু এখানে তো ডোপ টেস্টের বালাই নেই। তাহলে ডোপ নিতে বাধা কোথায়?'

'ডোপ নিবি! পাবি কোথায়?' বিভ্রান্ত আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'আছে দোস্ত, এখানেই আছে...' চোখ মটকে বললো রোমেল, 'জগলুর পকেটে।'

'কি!' আকাশ থেকে পড়লাম আমি, 'এক্ষুনি খেলা শুরু হবে আর তুই গাঁজা টানবি?'

জবাব দিলো না রোমেল। ফুরফুরা গলায় জগাকে বললো, 'চলরে দোস্ত চিপায় চল। ডোপ নিয়ে আসি।'


উপসংহার

ওই দিনের রেসে রোমেলের পারফরম্যান্সটা মনে রাখার মতো ছিলো। আজ পর্যন্ত মনে হয় কোনো দৌড়বিদ এভাবে দু'কদম এগুনোর পর সংজ্ঞা হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় নি।

তবে রোমেলের প্রচেষ্টা যে পুরোটা বিফলে গেল তা বলা যাবে না। কেননা এ ঘটনার পর রোমেল কলেজে, যাকে বলে, সেলিব্রিটি হয়ে গেল। সবার মুখে মুখে (বিশেষ করে মেয়ে মহলে) রোমেলকে নিয়ে ছড়া-কবিতা-গান। সেসব সাহিত্যকর্মের দু'একটা এখানে তুলে দেবার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু বিভাগীয় সম্পাদক পড়ে এক কথায় বললেন, 'অশ্রাব্য!'

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক ভোরের কাগজ, অক্টোবর ২০০০। তৎকালীন অলিম্পিকের ডামাডোলে গল্পটি লিখেছিলাম।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28831480 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28831480 2008-08-16 13:11:46
অণুগল্প: আহারে! মানুষ আর শুয়োরের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? আমরা শুয়োর খাই, মানুষ খাই না। আর কিছু? হিমেলের ইচ্ছে করে ক্যাফের সবগুলো ছাত্রছাত্রীকে শুয়োরের শিরদাঁড়ার মতো চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে। ওই যে সামনে খিলখিল করে হাসছে কিছু এশিয়ান ছেলেমেয়ে। কোন দেশী? কোরিয়ান সম্ভবত। এত হাসি কিসের শুয়োরের বাচ্চাগুলোর? ইচ্ছে করে প্রত্যেকের মাথা ধড় থেকে ছিড়ে নেই। চুলের মুঠি ধরে একটা হ্যাঁচকা টান। গলা ছিঁড়ে যাবে। ফোয়ারার মতো রক্ত ছিটাবে সারা ক্যাফে জুড়ে। আর ওই দিকে ওই কালোগুলো? প্রকান্ড দেহ জুড়ে বসে গর্দভগুলো। হাতির মতো নিনাদ করছে, আর চেয়ার ধাপাচ্ছে। ক্যানো শুনি? চেয়ারগুলো কি তোর বাপের? প্রতিটি জিনিস স্কুলের পাওয়া ট্যুইশন থেকে কেনা। প্রতিটি চেয়ারে হিমেলেরও সমান ভাগ। ওই হারামজাদারা এভাবে ধাপাচ্ছে কেনো ওর চেয়ারগুলো? প্রত্যেকটার মাথা মেঝেতে ফেলে মাড়িয়ে পিষে দেয়া যায় না? টুকরো টুকরো করে দেয়া যায় না খুলি? সেই খুলির সাদা সাদা টুকরোর সাথে মিশে যাবে শুয়োরগুলোর হলুদ ঘিলু। লেপ্টে দেবে মেঝের সাথে। আর সাদা ছেলেমেয়েগুলো সাদা স্রাবের মতো বসে আছে। আরে মাতারীর বাচ্চারা, তোদেরকেও ছাড়বো না। তোদের পাট ছিবড়ে পাট-পাট করবো। ভেজা গামছা যেভাবে ঝাড়ে, ঠিক সেভাবে তোদের মোচড়াবো। পটপট শব্দে হাড় ভাঙবে। ভাঙা হাড় বেরিয়ে আসবে এখানে সেখানে চামড়া ভেদ করে। গামলা গামলা রক্ত পড়বে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। আরব, ল্যাটিন আমেরিকান হারামীগুলোকে বানাবো কাবাব। কুত্তাগুলোকে কুচিকুচি কাটবো করাত দিয়ে। শুরু করবো পা দিয়ে। অল্প অল্প করে মাথার দিকে যাবো। দেখ শালারা ব্যাথা কাকে বলে! আর ওইদিকে ওই শালারা কী বাংলাদেশী নাকি? নাকি ইন্ডিয়ান? পাকি? তোদেরও রেহাই নাইরে। যেই দাঁত বের করে হাসছিস সেই দাঁতগুলো একটা একটা করে তুলে নেবো প্লায়ার্স দিয়ে। এরপর প্রতিটি নোখ, চোখ, কান। এরপর আঙ্গুল, এরপর হাত, এরপর...

নাকি আগুন ধরিয়ে দেবো এই ক্যাফেতে? এই স্কুলে? এই শহরে? এই দেশে? সারা পৃথিবীতে? তোদের আনন্দের শেষ আমি দেখবো। কুত্তার বাচ্চারা। শুয়োরের বাচ্চারা। হারামজাদার দল। জ্যান্ত পোড়াবো তোদেরকে। চামড়া খসে পড়বে। চর্বি গলে গলে পড়বে। পটপট করে পপকর্নের মতো ফাটবে তোদের সুখী মাংস। এক লাথিতে ভেঙে ফেলবো পুরো দালান। সব দালান। মুচড়ে ফেলবো সব গাড়ি। সব স্থাপত্য।

নাহ! তোরা সবাই ভালো রে। খারাপ এই আমি। আমিই খাবাপ। আর নষ্ট। আমি নিজেকেই ধ্বংস করবো। নিজেকেই জ্বালাবো। নিজেকেই কুচিকুচি করবো কেটে। এরপর...

‘জনাব তাহলে এইখানে? লাইব্রেরিতে দেখা করার কথা ছিলো না?’

মরার মতো গ্যাবির দিকে তাকায় হিমেল। সোনালী চুল, আর সবুজ চোখ। তাই না? এই সব চুরমার হবে। আমিই সব চুরমার করবো। তোর চুল ছিঁড়ে নেবো। চোখ উপড়ে ফেলবো। তোর...

হিমেলকে দেখে কেমন ভয় পেয়ে যায় গ্যাবি। ওর গা ঘেঁষে বসে কেমন আকুলকা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে হিমেল?’

হিমেল হয়তো এই মমতার অপেক্ষাতেই ছিলো। কিংবা এই মমতাই ওর অপেক্ষায় ছিলো। পাজল বোর্ডের বিচ্ছিন্ন টুকরোর মতো হিমেলের চারপাশে খসে পড়তে থাকে ওর এতক্ষণের পৃথিবী। সব হিংসা বদলে কেমন ঝাপসা হয়ে যায়। হিমেল ফুঁপিয়ে উঠে বলে, ‘আমার মা মারা গেছে।’ গ্যাবি সঙ্গে সঙ্গে হিমেলকে জড়িয়ে ধরে।

***

ক্যাফেতে ওইদিন মোট সাতাশজন ছাত্রছাত্রী ছিলো। সেদিনের পর থেকে ওদের প্রত্যেকের মনে শ্যামলা একটি ছেলের চিৎকার করে কান্নার ছবি সারা জীবনের জন্য বাঁধা পড়ে যায়!

© অমিত আহমেদ
ব্যবহৃত ছবি © "The Edge of Sorrow" by Tony Hamilton.]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28827962 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28827962 2008-08-06 12:36:38
ভালোবাসা, যারা এবারের এসএসসি-তে উত্তীর্ণ হতে পারেনি...
ক্লাস থ্রি থেকে টেন - এই দীর্ঘ সময়টি আমি ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুল-এ কাটিয়েছি। (ব্যাচ ১৯৯৭। কেউ আছেন নাকি ব্যাচমেট?)

ক্লাস থ্রি-তে যখন ভর্তি পরিক্ষা দেই তখন মনে আছে "ঢাকার সেরা দু'টো স্কুল" বলতেই সবাই বুঝতেন "গভঃ ল্যাব" আর "ধানমন্ডি বয়েজ"। আস্তে আস্তে সময় পাল্টাতে লাগলো। আমি টেনে উঠতে উঠতে ধানমন্ডি বয়েজের আর সেই আগের জৌলুস রইলো না। কেনো তা নিয়ে বিবিধ মতবাদ আছে। তবে বেশির ভাগই প্রাক্তন প্রধানশিক্ষিকা এবং তার চাটুকার ক'জন শিক্ষককে এর জন্য দায়ী করে থাকেন।

এসএসসি-র ফলাফল দিলেই আমি সংবাদপত্রে সেই সংক্রান্ত লেখাগুলো খুব মন দিয়ে পড়ি। আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় কি সব দিন কাটিয়ে এসেছি - সেই স্কুল! কত ঘটনা, কত গল্প, কত বন্ধু। ছাত্র-ছাত্রিদের হাসিমুখ দেখতে ভাল্লাগে। আর যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি তাদের জন্য খুব কষ্ট হয়। আমাদের দেশে এমন একটা ধারণা দেয়া হয় যে এসএসসি ফেল মানেই "লাইফ শেষ"। পাড়া-মহল্লায় সবাই আলাদা চোখে দেখে। বড়রা বাজে কথা শোনান। এই কষ্টের মধ্যে দিয়ে বাচ্চা ছেলে-মেয়ে গুলোকে যেতে হবে ভাবলেই মনটা কেমন ভারী হয়ে যায়।

সংবাদপত্রের খবরে আরেকটি জিনিস খেয়াল করি। সেটি হলো আমার স্কুলটি কেমন করলো। বেশ কয়েক বছর থেকেই খেয়াল করছি আমার স্কুল যেনো পুরানো জৌলুস আবার ফিরে পাচ্ছে। গত ৪/৫ বছর ধরেই ঢাকা বোর্ডের সেরা স্কুল তালিকায় ধানমন্ডি বয়েজের নাম দেখছি। এ বছরের ফলাফলের কথা আর কি বলবো! ২৮৯ জনের মধ্যে ২৮৯ জনই উত্তীর্ণ, এরমধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২১৩ জন। আমার তরফ থেকে আমার প্রাক্তন স্কুলটির প্রতিটি কর্মচারি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র ও অবিভাবককে শুভেচ্ছা। আমার স্কুল আবারও আমাকে গর্বিত করেছে!

সব শেষে ভালোবাসা সারা দেশে যারা উত্তীর্ণ পারেনি কিংবা খুব খারাপ করেছে, তাদেরকে। তোমরা তোমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করেছো। তোমাদেরকে হয়তো এমন বলা হয়েছে, এমন শেখানো হয়েছে - এই পরীক্ষাটি খারাপ মানেই জীবন শেষ। কথাটি ঠিক নয়। এই পরীক্ষার পরেও জীবনে আরও অ-নে-ক পরীক্ষা আসবে। সেসব পরীক্ষায় হয়তো তুমিই সবাইকে টপকে যাবে। মানুষ যত যাই বলুক, নিজের উপর বিশ্বাস হারাবে না।

সবাইকে ধন্যবাদ!

ব্যবহৃত ছবি: ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলের প্রবেশদ্বার
ছবি কৃতজ্ঞতা: DGBHS Alumni Association (DExSA)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28814164 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28814164 2008-06-27 07:04:18
ওয়ামির জন্য থিকথিকে ঘৃনা
বাবা দাদার সাথে একমত হননি। নিজের বিবেচনায় দেখেছেন লেখাপড়ার দরকার আছে। দাদার নীতিগত সমর্থন না থাকা তিনি সত্ত্বেও উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে গেছেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের একজন সম্ভ্রান্ত শিল্পপতি হিসেবে। আমার প্রয়াত দাদা যদ্দিন বেঁচে ছিলেন গর্বিত ছিলেন নিজের ভুল স্বীকার করে। আমি সেটা দেখেছি নিজের চোখেই।

নিজের মানসিক দৃঢ়তা থাকলে গুরুজনের নীতি কিংবা বিবেচনার বাইরে যাওয়া যায়। গিয়ে দেখানো যায় আমিই ঠিক অবস্থানে ভুল ছিল তোমাদেরই। এটা সম্ভব। খুব কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।

গুরুজনকে শেখানোর এই সুযোগটা যারা হারায়, যাদেই সেই মানসিক দৃঢ়তাই নেই, তাদেরকে আমি বেছে নেয়া পথের জন্য তাদের গুরুজনের দোষ দেব না। বরং সব দায়ভার তুলে দেব সেই কুপমুন্ডুকের ঘাড়েই।

রাজাকার কামারুজ্জামান।
যার নাম লিখতে গিয়েই আমার মুখে থুতু জমছে, তাকে এই না হয় পোস্ট থেকে সরিয়েই রাখলাম।

ওয়ামি আমি সরাসরি তোমাকেই বলছি।

আমাদের দেশের মানুষেরা এখনো দেশকে ভালোবাসে।
স্বীকার করে মুক্তিযোদ্ধারা এই সোনার দেশের স্বর্ণসন্তান, শ্রেষ্ঠ সন্তান।
তাঁদেরকে অসম্মান করে যে কথা তুমি বলেছ, বলার সাহস করেছ, সে কথার জবার এ দেশের মানুষ এখনো দিতে জানে।

আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি তোমার ধৃষ্টতা দেখে মাথায় আগুন ধরে গেছে সবার। ঠিক যেমন এখন আমার মাথা দপ দপ করেছে। মুঠো হয়ে আসছে হাত। ইচ্ছে করছে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলি তোমার কুষ্ঠমানসিকতার ধারক দেহটিকে।

যদি কখনো দেখা হয়।
যদি ভাগ্যবিধাতা সে সুযোগ করে দেয়।
তবে আমি, কিংবা অন্য আমার হয়ে অন্য কেউ, এক দলা থিকথিকে ঘৃনা ছিটিয়ে দেবে তোমার মুখে।
দেবেই!

বিশ্বাস হয় না তো?
হবেই!


(এইসব নিও রাজাকারের ব্যাপারে সামহোয়্যার ইন-এর ঠান্ডা নীতি দেখে আসছি অনেকদিন থেকেই। একদিন দু’দিন করে ব্লগে সময় তো কম গেল না। ব্যাপারটা রহস্যজনক, এবং একই সাথে হতাশাজনক। তাই সেই সামহোয়্যারের কাছে ওয়ামির ব্যান চেয়ে খামাখা নিজেকে ছোট করার মানে হয় না।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28779394 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28779394 2008-03-15 17:55:32
(একেবারে ফিরে আসার আগে) পৌনঃপুনিক বিদায়বেলা আমার উড়ান ছাড়বে ভোর সাড়ে পাঁচটায়।
তিনটের সময় বাসা থেকে রেরুবো।

আমার বাবা-মা কেউ আজ সারা রাত ঘুমোবেন না। বাবা সারাটাক্ষণ টিভির সামনে বসে থাকবেন, ভাব করবেন যেন কিচ্ছু হয়নি। মা শুকনো মুখে আমার আশে পাশে ঘুরবেন, আমাদের একটু ঘুমিয়ে নেবার উপদেশ অগ্রাহ্য করেই।

আমি চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ, অনেকদিন ওঁরা রাতে চমকে চমকে উঠবেন। দুপুরের রান্না করার সময় মা'র মনে পড়বে আমি নেই। কাজ থেকে ফিরে এসে আমার রুমে নক করতে গিয়ে বাবার মনে পড়বে নক করার আর প্রয়োজন নেই।

বিকেলে বন্ধুদের সাথে সময় কাটাই। একসাথে আন্ডারগ্রাউন্ড রক কনসার্টে যাই। বিদায় বেলা ওদের চোখ চিকচিক করে ওঠে। বুকে টেনে নিয়ে বলে, "পৌঁছে ইমেইল করিস।" আমি হাসি।

বাসায় এসে দেখি অনেকেই এসেছে। খালারা বেদনার্ত চোখে দেখে আমাকে দেখে, "কানাডাতে একেবারে থেকে যাবি না তো?" আমি হাসি।
চাচা মাথায় হাত রাখেন, "দেখি, তোকে একটু আদর করে দেই।" আমি হাসি।

খালু সেই কখন এসে চেয়ারে ঠায় বসে আছেন। আমার সাথে এয়ারপোর্টে যাবেন। আমার সাথে কোনো হয়রানি যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে। নানু চলে এসেছেন সেই গতকাল। বৃদ্ধা মানুষ। তাঁরও ঘুম হয়না। আগোছালো পায়ে ঘুরে বেড়ান এই ঘর সেই ঘর।

সারাদিন ফোনে কেটেছে অনেক সময়। মামী, ফুপু আর বন্ধুরা যারা আসতে পারেনি। সবার সাথেই গতবাঁধা আলাপ, আর আমার হাসি।

হাসি মুখেই স্যুটকেস সাজাই।

জানি অন্য সব বারের মতো সাবলিল ভাবেই বাড়ি ছাড়বো। এয়ারপোর্টে যখন মা আর চোখের পানি সামলাতে পারবেন না তখনো আমার মুখ থাকবে হাসি হাসি। বাবা যখন ধরা গলায় বলবেন, "টেক কেয়ার!" তখনো।

কিন্তু উড়ানে নিজের সিটে বসার পর, এসব কিছু আমাকে তিলে তিলে মারবে। আমার মুখের আর হাসির ছিটেফোঁটাও থাকবে না। বারে বারে তেষ্টা পারে। আমি জানালা দিয়ে যেন আর কোনোদিন দেখতে পাব না এই ভাবে বাংলাদেশ দেখবো। আমার চোখ জ্বালা করবে। কাঁদতে পারি না বলে নিজের উপর নিজেরই রাগ উঠবে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিজেই বোঝাবো, "সাত বছর যখন পেরেছি... আর তো মোটে কয়টা দিন... অল্প কয়টা দিন!"

© অমিত আহমেদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28775575 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28775575 2008-03-02 01:45:44
জ্বী, আপনারাই দেখিয়ে দিলেন! (অমিত আহমেদ'স ‘গন্দম’ ফ্যাক্টর) গন্দম ’ খুব ভালো যাচ্ছে। এমনকি আমি যেমন আশা করেছিলাম তার চেয়েও ভালো! এ আনন্দটা ভাগাভাগি করে নেবার জন্যই এই পোস্ট। কারণ আমার প্রথম উপন্যাস এর সাফল্যের সমান ভাগীদার আপনারা সবাই, আমার সহব্লগার বন্ধুরা।

‘গন্দম’ উপন্যাসের প্রারম্ভিক এই আমি এ কথা স্বীকার করে নিয়েছি। লিখেছিঃ

‘সামহোয়্যার ইন’ এবং ‘সচলায়তন’ ব্লগে গুটি গুটি পায়ে যে গল্পের সূচনা হয়েছিলো, এ বই প্রকাশের সাথে সে গল্পটি একটি পূর্নাঙ্গ পরিনতি পেলো। ব্লগে ‘গন্দম’ লেখা শুরু করেছিলাম, খুব হালকা চালে। ইচ্ছে ছিলো এটি হবে একটি বড় গল্প, কয়েক পর্বেই সমাপ্য। কিন্তু কয়েকটি পর্ব প্রকাশের পর পরই ব্লগাড়ুদের অনুরোধ ও হুমকির (!) মুখে পড়ে সে পরিকল্পনা বদলাতে হলো, ঠিক হলো বড় গল্প নয়, ‘গন্দম’ হবে একটি পূর্নাঙ্গ উপন্যাস। সে সিদ্ধান্ত নেবার পর ‘গন্দম’ প্রকাশ সাময়িক ভাবে বন্ধ করে, নতুন করে গল্পের ছক কেটে শুরু হয় রাত দিন অন্তর্জালে গবেষণা। ‘গন্দম’ উপন্যাসটিতে আমি দিন তারিখ উল্লেখ করে গল্প বলেছি। কারণ আমি চেয়েছি আমাদের সময়ের তারুন্যের গল্প বলতে। চেষ্টা করেছি নতুন প্রজন্মের চোখে আমাদের সময়ের ঘটনা, চলতি গুজব, কিংবা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গল্পের সাথে সাথেই তুলে আনতে। সে জন্যই আলাদা ভাবে দিন আর তারিখের উল্লেখ, আর রাত দিন অন্তর্জালে গবেষণা। ছোটবেলায় একটা বদ অভ্যেস আমার ছিলো। বইয়ে পড়া যে কোনো তথ্য আমি চোখ বুঁজে বিশ্বাস করে ফেলতাম। পরে সে বিশ্বাস ভেঙে যাবার পর আমি ঠিক করি আমার কোনো লেখায় আমি ভুল তথ্য দেবো না। তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে আমার বাড়াবাড়ি একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। উপন্যাসের একটা জায়গায় আমি উল্লেখ করেছি কোলকাতায় খুব হাওয়া দিচ্ছে, বৃষ্টি হতে পারে। এমন একটি দিন খুঁজে বের করতে আমাকে পুরো একটা দিন ভারতের আবহাওয়ার রেকর্ড ঘাঁটতে হয়েছে। উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ঢাকা ও কোলকাতার পটভূমিকায়। দুই প্রাচীন শহরের এক দঙ্গল ছেলে মেয়ে এ উপন্যাসের পাত্র পাত্রী। তারুন্যের গল্প বলতে গিয়ে আমি গতানুগতিক ভাবে কেবল মধ্যবিত্তকে অবলম্বন করিনি। বরং চেষ্টা ছিলো সব শ্রেনীকে, তা সে একটু করে হলেও ফোকাস করা। ঢাকার অংশ আর কোলকাতার অংশ লেখা হয়েছে ভিন্ন ভঙ্গীতে। বিশেষ করে কোলকাতার ঘটনা পড়তে গিয়ে পাঠক ভারতীয় বাংলার একটা গন্ধ পেতে পারেন - এ বিষয়টি ইচ্ছাকৃত। আরেকটি বিষয় জানিয়ে দেয়া দরকার মনে করছি। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন ‘গন্দম’ সত্যি ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা কি না? আমার জবাব ‘না’। উপন্যাসের তথ্য নির্ভুল থাকলেও চরিত্র গুলো সবই আমার কল্পনাপ্রসূত। জীবিত কিংবা মৃত কারো সাথে কোনো চরিত্রের মিল পাওয়া গেলে তা হলে তা হবে নেহায়তই কাকতালীয় ঘটনা। এ মুহুর্তে খুব বেশি করে মনে পড়ছে ‘সচলায়তন’ ও ‘সামহোয়্যার ইন’ এর সহব্লগারদের। এত অসংখ্য ব্লগারদের উৎসাহ না পেলে ‘গন্দম’ থেমে যেতো সেই কবেই! কৃতজ্ঞতা প্রিয় আরিফ জেবতিক ভাইকে, লেখালেখির স্বেচ্ছা অবসর থেকে যিনি আমাকে টেনে হিঁচড়ে বের করেছেন। ধন্যবাদ সুহৃদ আনোয়ার সাদাত শিমুল, শিবলী সাদিক শোয়েব ও শ্রদ্ধেয় নজমুল আলবাব ভাইকে, যাঁদের সাহায্য না পেলে এই ‘গন্দম’কে আর দুই মলাটে আটকানো যেতো না। সব শেষে ধন্যবাদ দেবো জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার শামসুল আরেফিন দীপন ভাইকে। আমার প্রথম উপন্যাসের প্রকাশনার কাজটি যিনি পরম মমতার সাথে করেছেন। আপনাদের ‘গন্দম’ পাঠ শুভ হোক!

প্রারম্ভিকে যাঁদের নাম আলাদা করে উল্লেখ করতে পারিনি, তাঁদের এখানে কৃতুজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি।
নাম গুলো ক্রমানুসারে সাজানো নেইঃ

আরিফ জেবতিক, নজমুল আলবাব, মাহবুব সুমন, হোসেইন, অমিত, সুমন চৌধুরী, সাদিক মোহাম্মদ আলম, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বাকী বিল্লাহ, জ্বিনের বাদশা, কেমিকেল আলী, অলৌকিক হাসান, হাসান মোরশেদ, অচেনা বাঙালী, স্বরহীন, সন্ধ্যাবাতি, এই আমি মীরা, বিষাক্ত মানুষ, এস এম মাহবুব মুর্শেদ, আনোয়ার সাদাত শিমুল, থার্ডআই, চোর, ফাহা, দ্রোহী, রবিনহুড, নাতাশা হুসাইন, আলভী, শাওন, রেজওয়ান, রাগ ইমন, ফারহান দাউদ, মদনবাবু, পুতুল, রাশেদ, ৈকলাশ, না বলা কথা, উন্মনা রহমান, মুকুল, মিরাজ, আবদুর রাজ্জাক শিপন, রাহাত আহমেদ, তারার হাসি, হাসিব, চিটি, সুলতানা শিরীন সাজি, ধ্রূপদী, নরাধম, ফেলুদা, `হাসান, সমালোচনাকারী, সু-শান্ত, এস্কিমো, লোকালটক, পুতুল, মনের কথা, বকলম, েজবীন, মনিটর, নাস্তিকের ধর্মকথা, বিহংগ, হাসান মাসুদ, জল রঙ, তীরন্দাজ, পালর্ামেন্ট, শফিউল আলম ইমন, আকাশচুির, নির্বাসিত, মৈথুনানন্দ, রাশেদ , ইরতেজা, শয়তান, তুষার ০০৭, সামী মিয়াদাদ, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সুলতানা শিরীন সাজি, সারওয়ারচৌধুরী, কালপুরুষ, ছায়ার আলো, মিছা কথা, বড় হুজুর

কারো নাম যদি ভুলক্রমে বাদ পড়ে যায় তবে তার জন্য আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি! অনেকেই আমার সাথে ইমেইলে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের নাম এখানে প্রকাশ করাটা শোভন মনে হলো না।

আশা রাখি আপনাদের ভালোবাসা, শুভেচ্ছা আমার সাথে থাকবে সবসময়।

ধন্যবাদান্তে,

অমিত আহমেদ

১) অনলাইনে গন্দম কিনতে
২) গন্দম এর ফেসবুক গ্রুপ
৩) গন্দম এর অর্কুট গ্রুপ
৪) অমিত আহমেদ এর ওয়েবসাইট
৫) কবি শেখ জলিল এর রিভিউ
৬) আনোয়ার সাদাত শিমুলের রিভিউ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28772112 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28772112 2008-02-19 22:45:49
মোড়ক উন্মোচনের ছবি উন্মোচিত (অমিত আহমেদ'স ‘গন্দম’ ফ্যাক্টর)
এটুকু জানিয়ে রাখতে পারি আজ মোড়ক উন্মোচননের অনুষ্ঠান, ও অনুষ্ঠান পরবর্তি সময়টুকু যতটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে ভালো হয়েছে।

এখন শুধু ছবি দিচ্ছি।
আগামীকাল না হয় পুরো লেখা দেবো।

উপন্যাস: গন্দম
জাগৃতি প্রকাশনী]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28769140 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28769140 2008-02-11 03:32:21
‘গন্দম’ এর মোড়ক উন্মোচনে সবাইকে আমন্ত্রণ
এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আমার প্রথম উপন্যাস ‘গন্দম’ প্রকাশিত হচ্ছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। ‘গন্দম’ এর মোড়ক উন্মোচনে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

তারিখ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
সময়: বিকেল ৫:০০ টা
স্থান: নজরুল মঞ্চ, অমর একুশে গ্রন্থমেলা

মোড়ক উন্মোচন করবেন বুয়েট এর ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন প্রধান, ও কলামিস্ট ড. আলী আসগর

আপনাদের সদয় উপস্থিতি আমাকে উৎসাহ দেবে অবশ্যই!

ধন্যবাদান্তে,
অমিত আহমেদ

বি:দ্র: জাগৃতি প্রকাশনীর স্টলে (কিংবা কাছাকাছি) আমাকে পাওয়া যাবে প্রতিদিন বিকেল পাঁটটা থেকে রাত ন'টা পর্যন্ত।

- গন্দমের ফেসবুক গ্রুপ
- মোড়ক উন্মোচনের ফেসবুক ইভেন্ট ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28768194 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28768194 2008-02-08 07:08:17
নটরডেমিয়ান ৪: ক্রাইম ক্লাবের জন্ম
আমার দু'পাশের দু'জনের কথা তো বলেইছি, চৌধুরী আর ইজু। জানা গেল ইজু মনিপুরে পড়েছে, মিরপুরের ছেলে। ও একদিনেই আমার বাম হাত মত হয়ে গেল। দশাশই লম্বা, ছ'ফুট তো হবেই - একটা বডিগার্ড বডিগার্ড ভাব। সামনে বনি, পাশা আর তুহিন। বনি আর তুহিনও মিরপুরের ছেলে, তবে মিরপুরের গৌরব তাদের রক্তে নেই। দু'জনেই সাধাসিধা ভাল ছেলে টাইপ। বনির যে কিনা পরে আমার জিগরী দোস্ত হয়ে ওঠে, ওর সাথে আমার প্রথম কথা হলো এরকম,
বনি: "ফোনকার্ড আছে?" (যাদের মনে নেই তাদের বলি, ওই সময়টা এখানে সেখানে টিঅ্যান্ডটির ফোনবুথ গজিয়ে উঠেছিল। ওখানে কার্ড দিয়ে ফোন করা যেত)
আমি: "কেন?"
বনি: "কার্ডে টাকা না থাকলে আমাকে দিবি।"
আমি:"কেন?"
বনি: "কার্ড কেটে গিটারের পিক বানাবো।"
আমি মনে মনে বললাম, জর্জ হ্যারিসনের ছানা এসেছেন, গিটারের পিক বানাবেন। আবাল কোথাকার।

পাশা ছেলেটা কারো সাথেই তেমন কথা বলে না। সারাক্ষণ নোট নেয়া আর অবসরে সেই নোট পড়াই তার কাজ।
পেছনে ছিল সবুজ, তানভীর আর অনি। সবুজও কাকতালীয় ভাবে মিরপুরেই থাকে। সে আবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের একনিষ্ঠ সমর্থক। ঢাকা আর মিরপুর স্টেডিয়ামের বেশ কিছু গেটম্যানের সাথে তার চরম বোঝাপোড়া, সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে সময়টাতে বিনা টিকেটে আমরা দু'জন অনেক ফুটবল ম্যাচ দেখেছি। তানভীর ছেলেটা সহজ সরল, অন্যদের অনুকরন করতে করতেই তার সময় যায়। আমি হয়তো স্যার চলে যাবার পর ক্লাসের মাইক্রোফনটা নিয়ে কেরামতি করছি, পরের ক্লাস শেষে দেখা যাবে সেও তাই করার চেষ্টা করছে।
অনি ইংরেজীতে যাকে বলে "মামা'স বয়"। তুমি তুমি করে কথা বলবে, সব কিছুতেই মাকে টেনে আনবে। একটা উদাহরণ দেই।
আমি: "অনি, চল আজকে টিফিনে প্যাটিস মারি।"
অনি: "আম্মা বলছে ওই প্যাটিস গুলা ভালো না। আমাকে আম্মা রুটি-ডিম দিছে টিফিনবক্সে ভরে।"
অবিসশ্বাস্য ভাবেই ওর মুখটা আবার অসম্ভব খারাপ। সম্ভবত সে কথাটা বলেছিল এভাবে,
"আম্মা বলছে ওই প্যাটিস ভালো না। খানকীর পোলারা কি না কি সব দিয়া বানায়। চুতমারানী তুমি ওইটাই খাইবা না? হাউয়ার নাতি, বাসা থেইকা টিফিন আনতে পারো না? আম্মা আমাকে রুটি-ডিম দিছে টিফিনবক্সে ভরে।"

আরও এখানে সেখানে পরিচয় হয়ে গেল পরাগ, হাসান, আরেফিন, মিশু, জয়ন্ত সহ আরও অনেকের সাথেই। পরে হয়তো আসবে ওদের কথা।

আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন এসি দাস স্যার। কেমিস্ট্রির শিক্ষক। উনাকে নিয়ে দু'টো কথা প্রচলিত ছিল, একটা হলো তিনি ক্লাসে ঢোকার আগে নাকি দু'পেগ মেরে ঢোকেন। কথাটা অবিশ্বাস করার কারন আমরা দেখিনি, কারন উনার চালচলন, কথা বলার ধরন সবই মাতালসদৃশ। আরেকটা হলো, উনার নাকি আমাদের বয়সী রূপবতী এক কন্যা আছে। এ কথাটিও সত্য, চাক্ষুস করেছিলাম পরে।

তিনি একদিন ক্লাসে ঢুকে বললেন, "আজ ক্লাস ক্যাপ্টেন ঠিক করা হবে। তিন জন দরকার, কে কে হতে চাও হাত তোল।"
আমি মনে মনে হাসলাম, সেধে কে ক্যাপ্টেন হতে চায়। স্কুলে সারাটা জীবন ক্যাপ্টেন ছিলাম (বাধ্য হয়ে, নিয়ম ছিল রোল নাম্বার অনুযায়ী ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হবে), ন্যাড়া বেল তলায় বার বার যায় না।
দেখা গেল কেবল একজন ছেলে হাত তুলেছে। আমি ভালমত দেখে রাখলাম ছেলেটাকে। এসি দাস স্যার সময় নষ্ট করলেন না, বললেন, "তুমি ফার্ট ক্যাপ্টেন। আরো দু'জন লাগবে।"
সেই দুজন আর পাওয়া যায় না। স্যার ক্যাপ্টেনের সম্মান নিয়ে অনেক লেকচার দিয়েও যখন কাউকে পেলেন না তখন লটারী করে দু'জনকে দ্বিতীয় আর তৃতীয় ক্যাপ্টেন বানিয়ে ফেললেন।

ক্যাপ্টেনের কাজ জানা গেল প্রতিদিন প্রতি পিরিয়ডে উপস্থিতি নেয়া আর নানান খবর টিকটিকির মত স্যারের কাছে পাচার করা। ক্যাপ্টেনের কোন কেরামতি ধরা পড়লে নাকি সরাসরি টিসি দেয়া হবে।

ক্লাস শেষে আমি ইজুকে পাঠাই ক্যাপ্টেনকে তলব করতে। ক্যাপ্টেন ভীত মুখে কাছে আসে। আমি বলি,
"শুন, বেশী ক্যাপ্টেনগিরী যেন না ফলানো হয় ঠিকাছে? এখনই ঠিক কর ফেল তুই আমাদের দলে নাকি স্যারের দলে।"
ক্যাপ্টেন বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলে, "একটা কথা কইলি! অবশ্যই তোর লগে আছি! তোরা যা কইবি, তাই করুম।"
"অন্য ক্যাপ্টেন সমস্যা দিবো নাতো?"
"ওদের আমি সিস্টেম দিমুনে, কুনো সমস্যা নাই!"
ছেলেটাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল। এর পর থেকে আমার সব কাজের প্রধান সহকারী হয়ে ওঠে তানজিন - গ্রুপ থ্রীর ফার্স্ট ক্যাপ্টেন।

কটা দিন পরে আমাদের ৫/৭ জনের একটা গ্রুপ হয়ে গেল। আমরা ঠিক করে দেই গ্রুপে কখন কি হবে, কে কার প্রাকটিকাল পার্টনার হবে আর কে কবে আমাদের গল্পের বই সাপ্লাই দেবে। তানজিন থাকায় আমাদের দলের শক্তি সীমাহীণ। আমি-ইজু তো আছিই, তার সাথে ক্যাপ্টেনের জোরে তানজিন সুন্দর একে তাকে ঝাড়ি দিয়ে দিতে পারে।

এর ফাঁকে ক্লাস পালানোর একটা সিস্টেম আমি আবিষ্কার করে ফেললাম। প্রথমে ক্লাসে ঢুকেই এসি দাস স্যার নিজে উপস্থিতি নিয়ে নেন। সেটা করতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট লেগে যায়। এর মাঝে প্রতিদিনই আরও
ছয় থেকে দশ জন ছাত্র চলে আসে। স্যার ক্লাসে ঢোকার এক সেকেন্ড পরে ঢুকলেও সেটা লেট অ্যাটেনডেন্স। তাই ওদেরকে স্যারের উপস্থিতি টোকা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এরপর ওরা সবাই একযোগে স্যারের টেবিলের সামনে গিয়ে জড়ো হয়। এ সময়টা ওদের জন্য স্যার ক্লাসে কি হচ্ছে দেখতে পারেন না। সে সময়ে এক ছুটে বেরিয়ে গেলেই কেল্লা ফতে।
তবে হিসাব রাখতে হয় যেন বেশী ছেলে বের হয়ে না যায়। আমাদের দলটা ছাড়া কারও এমনটা করার সাহস নেই, আর আমরা সবাই এক সারীতে বসি। তাই একসাথে ৩ জনের বেশী বেরুনো যায় না। কে কবে বেরুবে সেটা আমি আর তানজিন ঠিক করে দেই।
পরের ক্লাস গুলোতে পালানো আরও সোজা কারন সেগুলোতে তানজিন উপস্থিতি চেক করে। তাই ক্লাসে না আসলেই হয়, আমাদের দলের কাউকেই ও অনুপস্থিত ধরে না। তবে এখানেও কে কোন ক্লাস পালাবে সেটা আমি আর তানজিন মিলে ঠিক করি। একসাথে ৩/৪ জনের বেশী কখনই কাউকে পালাতে দেয়া হয় না। আর আমাদের দলের বাইরে কেউ পালাতে চাইলে আমাদের কাছ থেকে আগে অনুমতি নিতে হয়। আমরা রাজী হলে তবেই এ সুবিধা পাওয়া যায়।
পালিয়ে যে আমরা যে খুব হাতি-ঘোড়া মারতাম তা নয়। ক্লাসের সময়টা কাটতো রফিক মামুর দোকানে আড্ডা মেরে। রফিক মামুর দোকান দ্বিতীয় বর্ষ ছাত্রদের আড্ডাখানা হলেও ক্লাসের সময় কেউ থাকতোনা ওখানে। আমরাই বেশ বড় বড় ভাব করে চা-সিগারেটের চালাতাম।

মাস ঘুরতে এভাবেই আমরা গ্রুপ থ্রীর হর্তাকর্তা হয়ে বসি। যতই দিন যায় আমাদের নাম ফাটতে থাকে। শোনা যায় আমাদের মত অন্য কিছু গ্রুপেও নাকি একই কাঠামোতে দল গড়া হয়েছে। সে মূহুর্তে আমাদের মনে হয় দলটার পরিকাঠামো দেয়া দরকার। আমি আর তানজিন মিলে আমাদের গোপন গ্রুপটির নীতিমালা নির্ধারণ করি। ক্লাবের মুলনীতি ঠিক করা হয়, "অপরাধ ধরা পরার আগে অপরাধ নয়। অন্যের ক্ষতি সাধন না করে, নটরডেমের কটু নিয়ম গুলো বরবাদ করাই আমাদের সাধ্য" আর স্লোগান ঠিক হয় ইংরাজীতে, "মেক নয়েজ!" আরও কিছু নীতিমালা ভরসা করে, গোপনীয়তার শপথ নিয়ে ৫ জন সদস্য (ইজু, সবুজ, বনি, অনি, চৌধুরী) আর আমাকে-তানজিনকে ডিরেক্টর করে জন্ম নেয় "দ্য ক্রাইম ক্লাব!"

***

ক্রাইম ক্লাবের কথা গোপন রাখার পরও কিভাবে যেন কানে কানে ঠিকই ছড়িয়ে পড়লো। আমাদের ঠাঁটবাট ছিল। সবার ল্যামিনেটেড আইডি কার্ড, নামের জায়গায় কোডনেম। সে এক এলাহী করবার। আইডি কার্ড বালানোর আগে আমাদের কোডনেম নিয়ে পুরো একটা দিন কেটে গেল। নাম ঠিক হলো নিন্মরূপ:

১) আমি (ডিরেক্টর) । কোডনেম: মফিজ (কারন সবার ধারনা মফিজ পাগলার সাথে আমার চরিত্রে বিশেষ মিল)
২) তানজিন (ডিরেক্টর) । কোডনেম: চুদ্দুস (কারন চো* ছাড়া তার মাথায় অন্য চিন্তা কমই আসে)
৩) সবুজ । কোডনেম: জগলু (কারন ওকে দেখলেই মনে হয় ওর জন্মই হয়েছে এই নামের জন্য)
৪)বনি । কোডনেম: কোন কোড নেম নাই (কোন কারনও নাই)
৫) ইজু । কোডনেম: হারকিউলিস (ওর দশাশই দেহ ও আসুরিক শক্তির জন্য)
৬) অনি । কোডনেম: ঝইন্টা (লুৎফর রহমান রিটনের একটা টিভি সিরিজ দেখতাম ছোট বেলায়, "ঝন্টু-পন্টু", সে থেকে নামটা এসেছে)
৭) চৌধুরী । কোডনেম: চৌধুরীর পো! (কারন সহজেই অনুমেয়)

ক্রাইম ক্লাব এত জনপ্রিয় হয়ে গেল যে আমাদের দু'জনের কাছে প্রতিদিনই দুই তিন জন ছেলে এসে চাপা গলায় জিজ্ঞাস করতো,
"এই শুন, ক্রাইম ক্লাবের মেম্বার হতে কি করতে হবে!"
অধিকাংশ সময়ই আমাদের জবাব থাকতো,
"ক্রাইম ক্লাব কি?"
এতে লাভের লাভ যা হলো সবার আমাদের ক্লাব নিয়ে আগ্রহ চরমে উঠলো। সবাই সদস্য হতে চায়। টাকা দিয়ে হলেও!

আমরা তাই আস্তে আস্তে সদস্য বাড়াতে লাগলাম। নিয়ম ছিল প্রথমে আবেদনকরীর সাক্ষাতকার নেয়া হবে। তাতে সফল হলে পরে তাকে কোন একটা অপরাধ করতে হবে। সেটা হতে পারে ক্লাস পালানো, কিংবা কুইজে এক জনের পরীক্ষা আরেকজন দেয়া। এতে সফল হলে তবেই পূর্ণ সদস্য পদ আর আইডি কার্ড।

আমরা ক্রাইম ক্লাবে কিছু মার্কা মারা ভালো ছাত্রকে নিঃশর্ত সদস্য পদ দিয়ে দিলাম, তাদের কাজ ছিল আমাদের প্র্যাকলিকালে সাহায্য করা আর ক্লাস নোট সাপ্লাই দেয়া। ওদের কোন আপত্তি ছিল না। ক্রাইম ক্লাবের ল্যামিনেটেড আইডি কার্ড গর্ব ভরে অন্যদেরকে দেখানোতেই ওদের সর্বসুখ নিহীত ছিল।

আমাদের ক্লাবের আরও কথা বলবো পরে। বিশেষ করে কিভাবে ক্লাবটার কথা টিচার্স রুমে ছড়িয়ে পড়লো আর কিভাবে স্যার-ম্যাডামও ক্লাবের ফ্যান হয়ে গেলেন সেটা একটা বলার মতই ঘটনা।

© অমিত আহমেদ

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28765965 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28765965 2008-02-01 02:02:21
গল্প: না বলা কথা
বড় করে দরজার পাশে বাসার নাম্বার লেখা ৯৬। এটাই তো? আলগোছে কোটের পকেট থেকে একটা কালো নোটবুক বের করে ও, একটা পাতা উলটে মিলিয়ে নেয় নাম্বারটা, এর পর কড়া নাড়ে। কড়া নাড়ার প্রায় সাথে সাথেই মতিকে চমকে দিয়ে দরজাটা খুলে যায়। বেনী করা আঠারো-উনিশের একটা মেয়ে। বড় বড় চশমা পড়া, মায়াকাড়া চেহারা। মতিকে দেখেই সে ঝলমলিয়ে উঠে বলে, “খান সাহেব?”

দরজা খুলেই এমন সম্বোধনে একটু ঘাবড়েই যায় রানা, আমতা আমতা করে বলে, “জ্বী!”

হড়হড় করে বলে “আপনি এসেছেন, আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না! আসুন আসুন... ভেতরে আসুন, দাদাজান অপেক্ষা করছেন তো আপনার জন্য!” দরজার কপাট পুরোটাই খুলে দেয় মেয়েটা।

একটু দ্বিধা নিয়েই ঢুকে পড়ে মতি! বাসার ভেতরটাও বাইরের মতই জীর্ণ, দারিদ্রের ছাপটা ভালমতই চোখে পড়ে।

“আমি ভাবতেই পারিনি আপনি আসবেন! ফোনে আপনার কথা শুনে একটুও মনে হয়নি কিন্তু!”

“ফোনে?”

“জ্বী! আপনি যেভাবে ‘দেখি!’ বলে ফোনটা রেখে দিলেন! আমি মাকেও বলেছি, দাদাজানকেও বলেছি যে আপনি আসবেন না। দাদাজান মোটেও বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেন, ‘নাহ, খান আমার কথা ফেলবে না!’”
খিলখিল করে হাসে কিশোরী, বলে, “এটা অবিশ্যি দাদাজান তাঁর সব ছাত্রকে নিয়েই বলেন।”

মেয়েটা হঠাৎই যেন খেয়াল করে তারা এখনো করিডোরেই দাঁড়িয়ে আছে। খপ করে মতির হাতটা ধরে ফেলে সে, টান দিয়ে বলে, “আরে, এখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন যে! আসেন, ভেতরে আসেন!”

যে কামরায় ঢোকা হলো সেটা অনেকটা স্টাডির মত। চারিদিকে ছড়ানো হাজারো বই। তার ফাঁকে একটা ইজিচেয়ারে চোখ বুঁজে শুয়ে আছেন সাদা দাঁড়িগোঁফের জঙ্গলে ঢাকা একজন অতিশয় বৃদ্ধ। দেখেই বোঝা যায়, ভদ্রলোকের শরীরটা ভাল নেই। তাঁর চেয়ারের পাশে একটা টেবিলে দুটো কাপ রাখা। আর তার পাশে একটা ছোট্ট কাঠের টুল।

কিশোরী সটান হেঁটে যায় বৃদ্ধের দিকে, তাঁর একটা হাত তুলে নিয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে একটু চেঁচিয়েই বলে, “দাদাজান! দাদাজান! তোমার ছাত্র এসেছে তো! দাদাজান, দেখো দেখো!”

বৃদ্ধের শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে, তবে দাঁড়িগোঁফের ফাকেও তাঁর হাসি আর উত্তেজনাটা টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “খান? খান এসেছে? আমি বলেছিলাম না তোকে? খান এমন নয়? কই? কোথায়?”

“এই যে, আসছে!” মতির দিকে সরে এসে ফিসফিসিয়ে বলে নাতনি, “দাদাজান চোখে একদমই দেখেন না! কানেও কম শোনেন! একটু জোরে কথা বলতে হবে! আয়-হায়! আপনি বসবেন কোথায়! আমি চেয়ার আনছি দাঁড়ান!”

বিব্রত হয়ে যায় মতি, বাঁধা দিয়ে বলে, “না না! লাগবে না! আমি টুলেই বসছি!” ওর যে টুলে বসতে সমস্যা নেই সেটা প্রমান করতেই সে তড়িঘড়ি করে হেঁটে গিয়ে টুলের উপর বসে পড়ে।

“আচ্ছা আপনি বসুন তাহলে! আমি আসছি!”

মতি বসতেই ওর দিকে ঝুঁকে আসেন বৃদ্ধ, ভরাট গলায় বলেন, “খান! তুমি এসেছো আমি খুব খুশি হয়েছি!”

বিনয়ে মাথা নিচু করে মতি, “স্যার, এটা তো আমার কর্তব্য ছিল!”

মাথা সটান উঁচু করে গর্বের হাসি হাসেন বৃদ্ধ, “সবাই আর এমন ভাবে না খান! তখন নিজের মনেই সন্দেহ জাগে, আসলেই কি সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছি আমার স্কুলের ছাত্রদেরকে? আবার ভাবি শিক্ষা হয়তো ঠিকই ছিল, কিন্তু পৃথিবী তো বদলে গেছে! এ পৃথিবীতে তুমি সৎ পথে, গৌরবের পথে কিভাবে হাঁটবে বলো? আইন বল, ক্ষ্যাতি বল, সম্পদ বল, ক্ষমতা বল, সবই তো জোরের করায়ত্ব! ঠিক বলিনি?”

“জ্বী স্যার!”

“পৌলমীর বাবার কথাই ধর! আমার মতই স্কুলে পড়াতো। একদিন বাস থেকে নেমেছে, নেমে হেঁটে বাসায় আসছে, মোড়ের গলিতে কিছু গুন্ডা মানিব্যাগটার জন্য ছুরি মেরে দিল! কে এমনটা হবে ভেবেছিল বলো? আর সেই গুন্ডাদের কি হলো?” হাত উঠিয়ে বুড়ো আঙ্গুল নাচান তিনি, “কচু-ঘন্টা! কিচ্ছু না! কেউ ধরা পড়েনি!”

কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে মতি।

“আমার পেনশনের ক’টা মাত্র টাকা পাই! সে টাকায় সংসার চলে বলো? বৌমাকে চাকরীতে ঢুকতে হলো। বাচ্চা মেয়েটা একা একা এই বুড়োর সাথে সময় কাটায়!”

হাত বাড়িয়ে মতির হাত খোঁজে অন্ধপ্রায় বৃদ্ধ শিক্ষক, উনার হাতটা ধরে ফেলে মতি।

“ছেলেটা মারা যাবার পরে ভাবলাম, আমার কি একটা ছেলে? হাজার হাজার ছাত্র পড়িয়েছি! ওরা কি কেউ না? ওদের খুঁজে বের করতে লাগলাম। তখনো চোখে ভালই দেখি। ঠিকানা খুঁজে এর বাসায়, ওর অফিসে গিয়েছি! গিয়ে বুঝেছি কোমল মনের ছেলেগুলোকে কিভাবে বদলে দিয়েছে এই সমাজ! কেউ বাসায় ঢুকতে দেয়নি, সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে চলে এসেছি। কেউ বলেছে স্যার মিটিংয়ে আছেন, দেখা হবে না। ওরা ভেবেছে আমি সাহায্য চাইতে গেছি! বল খান, আমি এতদিন পড়িয়েছি তোমাদেকে, এই মোবারক চৌধুরী কি সাহায্য চাইবার লোক?”

“জ্বী না স্যার!”

“যাদের সাথে দেখা হয়েছে তারাও যেন পালাতে পারলে বাঁচে! অথচ রাস্তায় অনেক ছাত্রের সাথে দেখা হয়ে যেত। ভাল ছাত্র ছিল না। আমার তাদের নামও মনে নেই। জীবনেও সাফল্য পায়নি, ওরা কিন্তু ঠিকই এসে সালাম করেছে! দু’একটা ভাল মন্দ কথা জিজ্ঞেস করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এটা কি আমার অনেক বড় চাওয়া, বল খান?”

এক হাতে ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে পৌলমী, একটা বইয়ের স্তুপের উপর ট্রেটা রেখে বলে, “দাদাজান, উনাকে একটু ছাড়! উনার জন্য নাশতা এনেছি!”

“হ্যাঁ হ্যাঁ! অবশ্যই, অবশ্যই!” বিড়বিড় করতে করতে হাত ছেড়ে দিলেন বৃদ্ধ।

“এসবের কি দরকার ছিল?” কাঁচুমাঁচু মুখে বলে মতি।

“দরকার ছিল না মানে! দাদা আস্ত রাখবেন আমাদেরকে না খাইয়ে যেতে দিলে!” চোখ মটকে বলে পৌলমী, “আপনি তো বিকালের ফ্লাইটেই চলে যাবেন। তা নাহলে দাদা আপনাকে রাতে না খাইয়ে যেতে দিত না!”

ট্রে থেকে একটা বাটিতে রাখা পায়েস তুলে নেয় মতি। পায়েস ছাড়াও পিঠা, বড়া, চপ আরো হাবিজাবিতে ট্রেটা ভরা। বোঝাই যাচ্ছে পৌলমীর মা স্বসুরের অতিথির আতিথ্যের জন্য আয়োজনটা করে তবেই কাজে গিয়েছেন।

“তুমি কোন ক্লাসে পড় পৌলমী?” কথা চালাবার চেষ্টা করে মতি!

প্রশ্নটা শুনেই গম্ভির হয়ে যায় পৌলমী, “স্কুলে না! কলেজে উঠেছি!”

মনে মনে হাসলো মতি, “আচ্ছা! কোন বিভাগে?”

“সায়েন্স!”

“ওরে বাবা, এতো সেরকম কঠিন বিষয়! আমার একদমই মাথায় ঢোকে না সায়েন্স!”

খিলখিল করে হেসে ওঠে পৌলমী, “আমি জানিনা ভেবেছেন বুঝি? দাদার চোখ খারাপ হবার পর থেকে আমিই উনাকে সংবাদপত্র পড়ে শোনাই। গত পরশু আপনাকে নিয়ে পত্রিকায় একটা লেখা এসেছে না? আপনি সবচেয়ে কম বয়সে ট্যুরিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন! আর আপনি বলছেন আপনার মাথায় সায়েন্স ঢোকে না!”

“তুমি তাহলে পড়েছো সে লেখা?”

“হুমম! ওখানে আপনার স্কুলের কথা লেখা আছে, আপনার পুরো নাম যে ‘রুবেল মোহাম্মদ আনোয়ার আমিরুল খান’ সে কথাও লেখা আছে। আপনার সে এক মাইল নাম শুনেই তো দাদা আপনাকে চিনে ফেললেন! আপনি এখানে একটা কনফারেন্সে আসছেন শুনে দাদা জোর করে আমাকে দিয়ে সেদিন ডিরেক্টরি খুঁজে ফোনটা করালেন। দাদাজানের বয়স হয়েছে তো...” গলাটা করুন শোনায় পৌলমীর “...তাই আপনাকে ডেকেছেন, তা নাহলে নিজেই যেতেন!”

“আরে না! স্যারকে আছেন জানলে আমি নিজেই তো আসতাম! খুব ভাল করেছো আমাকে ফোন করে। এদিকে আসলে আমি প্রতিবারই দেখা করে যাব উনার সাথে!”

মুখটা ঝলমল করে ওঠে পৌলমীর, “আপনি বসেন, আমি চা নিয়ে আসছি! আমার চা খুব ভাল হয়, মা বলেন!”

চা শেষে পুরোনো শিক্ষকের সাথে আরো আধা ঘন্টা কাটায় মতি। বয়স হলে কি হবে, উনার তেজ যায়নি। ভদ্রলোকের লেখাপড়ার ভাল অভ্যেস ছিল তাও বইয়ের সংগ্রহ দেখলে বোঝা যায়। সে সংগ্রহের একটা অংশ নাকি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন পৌলমীর কলেজের পাঠ্য কিনতে। সেটা শুনে মতি খুব ইচ্ছে হলো বলতে, “বইগুলো আমিই কিনে নিচ্ছি, কত লাগবে বলুন!” কিন্তু এই বৃদ্ধকে সে যতটুকু চিনেছে, জানে একথা শুনলে তিনি প্রচন্ড অপমানিত হবেন।

ওঠার সময় সে হঠাৎই ঝুঁকে পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে ফেলে মতি, বলে, “দোয়া করবেন স্যার!” বৃদ্ধ চোখের পানি মুছে হাত রাখেন মতির মাথায়।

প্রচন্ড আপনজনের মত বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে আসে পৌলমী, ধরা গলায় বলে, “আবার আসবেন!”

***

পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলে পকেট থেকে ওর কালো নোটবুকটা বের করে মতি। পাতা উল্টিয়ে একটা খবরের কাগজের কাটিং তুলে নেয়। সেখানে ছোট্ট করে এ বাসার ঠিকানা লেখা। আর লেখা “দর্শনের পুরানো বই বিক্রি হবে”। কাটিংটা ফেলতে গিয়েও আবার নোটবুকের মাঝেই পুরে রাখে মতি।

যে নোটবুকে বেশ বড় করেই তার নাম লেখা... “খান মোঃ মোতাহীর!”

© অমিত আহমেদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28765277 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28765277 2008-01-29 15:15:38
পদপিষ্ট মানবতা ও আমার বোন রাহেলা
• ২২ আগস্ট ২০০৪ » উনিশ বছরের তরুনী পোষাক কর্মী রাহেলা আক্তার লিমা মিনি চিড়িয়াখানা দেখে ফেরার পথে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশাররফ হোসেন হলের পেছনের জঙ্গলে আকাশ, কবির, লিটন, দেলোয়ার ও আরো কয়েকজনের হাতে লুন্ঠিত [গহনা ও বেতনের ২৮০০ টাকে] ও ধর্ষিত হন [১, ২, ৩]। ধর্ষনের পরে পান্ডষেরা ছুরি দিয়ে রাহেলার গলা কেটে দেয়, এবং তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে একজন তার চুলের মুঠি চেপে ঘাড় ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করে [২], ও রাহেলাকে জঙ্গলে রেখে পালিয়ে যায়।

• ২২-২৪ আগস্ট ২০০৪ » এ কদিনেও রাহেলা মারা যায় না। বরং দূর্বল, শক্তিহীণ রাহেলা গলার ক্ষতস্থানে রাজ্যের পোকার মহোৎসব সয়ে সাহায্যের জন্য ক্রমাগত বলতে থাকেন "আমি মরি নাই, আমাকে বাঁচান!" [২]।

• ২৪ আগস্ট ২০০৪ » ধর্ষক ও সহযোগীরা রাহেলা মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে গিয়ে দেখে সে তখনো বেঁচে। তৃষ্ণার্ত রাহেলা এ সময় তাদের কাছে পানি চেয়ে আকুতি জানান। পাণ্ডষেরা পানির পরিবর্তে তরল এসিড রাহেলার গলায় ঢেলে দেয় [১]।
একই দিনে মালী রাহেলাকে মৃত প্রায় অবস্থায় জঙ্গলে আবিষ্কার করেন ও সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে জানান, রাহেলাকে চিকিৎসার জন্য DMCH তে পাঠানো হয় [১]।

• ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ » ৩৩ দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে এইদিন রাহেলা মারা যান।

এর পরের ঘটনা ঠিক যেমন আমাদের দেশে ঘটে থাকে। চারজনকে আসামী করে মামলা হয় [মামলা নাম্বার ১৩/২০০৫], গ্রেফতার হয় তিন জন [আকাশ, কবির, দেলোয়ার], প্রধান আসামী [লিটন] থাকে পলাতক, সেই তিনজনও ক'দিন পর জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে [২]।

মামলাটি এখনো নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ট্রাইবুনাল-১ এ বিচারাধীন আছে। মামলাটিতে আইনি সহায়তা দিচ্ছে আইন শালিশ কেন্দ্র। আগামী ২৯শে অক্টোবর, ২০০৭ কেসটি কোর্টে উঠবে সাক্ষ্য গ্রহনের জন্য।

তার আগে আমরা ব্লগাররা চেষ্টা করছি জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে যেন আমার বোন রাহেলা সুবিচার পায়। আরো তথ্যের জন্য পড়ুন জ্বিনের বাদশার এ পোস্টটি [জাস্টিস মাস্ট প্রিভেইল]

[১] ডেইলিস্টারের রিপোর্ট
[২] সাংবাদিক ফয়সল নোইয়ের ব্লগ
[৩] মানবীর ব্লগ

[উৎসর্গঃ মানবী, জ্বিনের বাদশা, ফয়সল নোই ও বিপ্লব রহমান।

রাহেলাকে নিয়ে চ্যানেল আইতে টিভি রিপোর্টটি



আপডেটঃ
• ২৫ অক্টোবর ২০০৭-বর্তমান » বিভিন্ন সংবাদপত্রে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য ব্লগাররা ইমেইল পাঠাচ্ছেন [তথ্যসূত্রঃ সচলায়তন ব্লগ, সামহোইয়্যার ইন ব্লগ]
• ২৯ অক্টোবর ২০০৭ » bdnews24.com এ রাহেলাকে নিয়ে রিপোর্ট আসবে [তথ্যসূত্রঃ সাংবাদিক বিপ্লব রহমান]
• ২৯ অক্টোবর ২০০৭ » নতুন করে নতুন পিটিশনে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু হবে [তথ্যসূত্রঃ ব্লগার মানবী]

আমার প্রস্তাবঃ
[১] সামহোয়্যারের পক্ষ থেকে ক্ষ্যাতিমান কলামিস্টদেরকে একটা ইমেইল কি করা যায় এ বিষয়ে লেখার অনুরোধ জানিয়ে?
[২] কেউ কি ফেসবুকে একটা group, কিংবা cause বানাবেন এ নিয়ে?

[একযোগে সচলায়তন ও সামহোয়্যার ইন ব্লগে প্রকাশিত]

© অমিত আহমেদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28739973 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28739973 2007-10-26 13:44:13
সাবিনা ইয়াসমিনের জন্য ভালবাসা ও শুভকামনা
সম্মেলন শেষেই ইলিয়াস কাঞ্চন তুমুল বেগে স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। ক'জন অতিউৎসাহী ছুটে গেল অটোগ্রাফের জন্য, সবাইকেই বিফল হতে হলো। তিনি খুব ভদ্র ভাবেই বললেন তাঁর হাতে একদমই সময় নেই। কিন্তু আমাদের সেটা পছন্দ হলো না। উনি স্কুলের সামনে পার্ক করা তাঁর গাড়িতে পৌঁছুতে পৌঁছুতেই বিচ্ছুর দল গাড়ির চাকা পাংচার করে দিল। জরুরী কাজ ফেলে ভদ্রলোককে আমাদের স্কুলে আটকা থাকতে হলো আধা ঘন্টা।

অন্য অতিথী যাঁরা ছিলেন তাঁদেরকে আপ্যায়নের জন্য আমাদের প্রধান শিক্ষিকার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা অনেকেই সাবিনা ইয়াসমিনের অটোগ্রাফ সংগ্রহের জন্য রুমের সামনে ভিড় করলাম। আমাদের শিক্ষিকার সহকারী আমাদের খুব ঝাড়িবাজী করলো। ঠিক সে মুহূর্তে রুমের দরজা খুলে গেল, আমরা শুনলাম শ্রদ্ধেয় সাবিনা ইয়াসমিন বলছেন একজন দুজন করে ছাত্রদেরকে পাঠিয়ে দিতে। অন্য অতিথিরাও এটা করতে পারতেন, কিন্তু কেউ করেননি। বরং এমন একটা ভাব করেছেন যে আমরা সবাই তুচ্ছাতিতুচ্ছ। সাবিনা ইয়াসমিন যে সবাইকে অটোগ্রাফ দিলেন তাই না, সবার সাথে টুকটাক কথাও বললেন। আমি কোন ক্লাসে পড়ি, রোল নাম্বার কতো, এইসব বাক্যালাপ আর বুক পকেটে অটোগ্রাফ সম্বল করে আমি আমার বন্ধুদের মাঝে হিরো হয়ে উঠলাম।

এরপর কেটে গেছে অনেকদিন, আমি কলেজে উঠেছি। অটোগ্রাফ সংগ্রহের আগ্রহটা তখনও টিকে আছে। একদিন নিউমার্কেটে দেখা হয়ে গেল ওপার বাংলার গায়ক সুমনের সাথে। উনি ততদিনে কবির সুমন, সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গী, তিনিও সুমনের সাথেই ছিলেন। দুই তারকাকে পেয়ে ভিড় জমে গেছে। সবাই দূরত্ব বজায় রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওঁদের দিকে।

আমি কবির সুমনের সাথে সৌজন্যমূলক কথা বলে বুক পকেট থেকে একটা খাতা বের করে দিয়েছি অটোগ্রাফের জন্য, কলম দিতে গিয়ে দেখি কলম নেই! সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট সোনালী কলম বের করে দিলেন। উনি সেলিব্রটি মানুষ, স্বাভাবিক ভাবেই ভেবেছিলেন সুমনের অটোগ্রাফ নিয়ে আমি তাঁরও অটোগ্রাফ চাইবো। সেটা না করে আমি চট করে খাতাটা পকেটে চালান করলাম দেখে একটু বিস্মিতই হলেন। আমি কলম ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম, "আপনি অনেক আগে একবার ধানমন্ডি বয়েজে গিয়েছিলেন, একটা অনুষ্ঠানে। তখন আপনার অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম। সেটা এখনও সযত্নে সংগ্রাহীত আছে।"
উনি স্টার, এমন কথা, তোষামোদ-চাটুকারীতা অনেক সহ্য করতে হয়। কিন্তু আমার কথায় উনি লজ্জ্বা পেয়ে গেলেন। মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে কিছু বললেন, ঠিক ধরতে পারলাম না।

গত রাত্তিরে মা ফোন করেছে। সাবিনা ইয়াসমিনের জন্য মন খারাপ। খুব খুশি যে সরকার চিকিৎসার যাবতিয় খরচ বহন করবেন। মার কথা শুনে আমার ঘটনা দু'টো মনে পড়ে গেল। পাষাণ আমি এর আগে পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটায় নির্লিপ্ত ছিলাম, মার সাথে কথা বলে আমারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। পোড়ার দেশটাতে গুনী মানুষের খুব অভাব। অল্প যে কজন আছে তাঁদেরকে এভাবে হারাতে চাইনা। সাবিনা ইয়াসমিন সবার শিল্পী। শুনেছি এয়ারপোর্টে নাকি অগুনতি মানুষ এসেছিলেন তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে। এমন নির্লোভ ভালবাসা কজন পায় এক জীবনে!

প্রিয় এ শিল্পীর জন্য আমার ভালোবাসা! সুস্থ হয়ে উঠুন, ফিরে আসুন আমাদের মাঝে... রজনীগন্ধা ফুলের মত গন্ধ বিলিয়ে যান দেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে, আরও অনেক-অনেক দিন!


(বি.দ্র. অটোগ্রাফ সংগ্রহের নেশাটা আর নেই, তাই খাতাটা রয়ে গেছে দেশে। সাথে থাকলে অটোগ্রাফটা স্ক্যান করে তুলে দিতে পারতাম)


© অমিত আহমেদ

আমি রজনীগন্ধা

(একযোগে সচলায়তন, সামহোয়্যার ইন ও আমার ব্লগস্পটে প্রকাশিত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28720668 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28720668 2007-07-12 18:10:21
হৃদয়ে বাংলাদেশ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28715000 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28715000 2007-06-07 15:09:26
ব্লগ ছাড়া/না ছাড়া বিষয়ক ব্যক্তিগত প্যাঁচাল... বিরক্ত হতে চাইলে পড়ুন
আমার এই স্বপ্নটা খুব গোপন কিছু নয়। আমার পরিবার, আত্মীয়, ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধবেরা সবাই কম-বেশি জানেন। আমি দেশ ছাড়ার পর যে প্রশ্নটা আমি অবধারিত ভাবেই নিয়মিত ইমেইল, ফোন আর এসএমএস-এ শুনেছি সেটা হলো, "লেখালেখিটা কি একদমই ছেড়ে দিলি?" এমনকি আমার মা, যিনি একদমই সহ্য করতে পারতেন না আমার পড়া বাদ দিয়ে কলম ঘষা, তিনি পর্যন্ত বলেন, "মাঝে মাঝে একটু লিখিস, পত্রিকায় না দিতে চাইলে দিস না, কিন্তু ডায়রি লেখার মত করে হলেও কিছু লিখিস।" সে সময়টা আমার ছিল না। এতটাই ব্যস্ত ছিলাম লেখাপড়ায়, অন্য কিছু আর ছিল না মাথায়।

কিন্তু কী হয়েছে বলি, গত গ্রীষ্মে দেশে গিয়েছি ঘুরতে, এক মেয়ের সাথে হঠাৎই রাস্তায় দেখা। আমি চিনতে পারিনি প্রথমে, ওই এসে পরিচয় দেয়। বলে, "আপনি x x আরিফ, তাই তো?" আমার পুরো নাম ধরে কেউ ডাকলেই আমি বুঝে যাই তিনি আমার লেখা পড়েছেন কোথাও না কোথাও। আমার মনে পড়ে "ভোরের কাগজে" দেখেছি মেয়েটাকে কোনদিন। কথা এগিয়ে যায়। প্রশ্ন আসে কোথায় লিখি এখন। আমি বিস্ময় এবং একটা চাপা গর্ব নিয়ে দেখি কোথাও লিখি না শুনে মেয়েটা অবুঝের মত অভিযোগ করে। সেদিন আমার সারাটা বিকেল কাটে সেই মোহে। মনে হয় এই শহরে একজন হলেও আমার পাঠক আছে, যে জানে আমার কোন লেখাটা কোথায় কোনদিন ছাপা হয়েছিল। আমি ঠিক করে ফেলি লিখবো। এই ব্যস্ততার ফাঁকেই লিখবো। ২০০৮ না হোক ২০০৯ এ একটা বই আমি বইমেলায় বের করার চেষ্টা করবোই। করবোই!

প্রবাসে ফিরে এসেই লেখা শুরু করলাম। কাগজের বান্ডিল ভরতে থাগলো গল্পে। লেখা শুরু করতেই পুরানো স্মৃতি সব ভিড় করতে থাগলো মনে। মনে পড়লো আরিফ ভাই, বিপুল ভাই, রেজা ভাই, মাসুদ ভাই, ভোলানাথ পোদ্দারদা, আহসান কবির ভাই, আহসান হাবিব ভাই, আর সবার কথা। ইমেইল করলাম যাদের ইমেইল ছিল তাঁদের কাছে। দেখা গেলো কারো ইমেইল অ্যাড্রেসই আর আগেরটা নেই, সব ইমেইলই বাউন্স ব্যাক করেছে, কেবল আরিফ ভাইরেরটা ছাড়া। তিনি ইমেইল করলেন, বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ব্লগের ঠিকানা দিলেন।

আমি রেজিস্ট্রেশন করে ক'দিন অপেক্ষা করে দেখলাম, কী ধরনের লেখা আসে ব্লগে। আমার ভাগ্য ভালো না খারাপ বলবো জানি না। সেই ক'দিন ব্লগে রাজাকারদের তান্ডব ছিলো না। গোলাম আজম, নিজামীদের ছবি আমার দেখতে হয়নি। গালি সহ কমেন্ট বা পোস্টও চোখে পড়েনি। আমি লেখা পোস্ট করা শুরু করলাম।

কিছুদিন থেকে বাবা ফোনে জিজ্ঞেস করছেন অন্তর্জালে কোথায় লিখি। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। স্কুলে স্কাউটিং করে একটা জাতীয় পদক পেয়েছিলাম, প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর করা সার্টিফিকেট। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস। বাবা কেবল জানিয়েছেন এই লোকের ভুমিকা কী ছিলো একাত্তরে। সেই সার্টিফিকেট আমি আগুনে পুড়িয়েছি। সেই বাবাকে কোন মুখে আমি ব্লগের ঠিকানা দেই? কলকাতার এক মেয়ে আমার খুব বন্ধু। কলকাতার পটভুমিকায় গল্প লিখছি শুনে সেও কতোবার ঠিকানা চেয়েছে ব্লগের। কোন বিবেচনায় ওকে ঠিকানা দেই, যেখানে আকাশে-বাতাসে ভাসে গালি?

আমি ব্যক্তিস্বাধীনতায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্লেষণ থাকতেই পারে। তাই বলে কি আমার বাক স্বাধীনতা গুঁড়িয়ে চুরমার করা হবে? আমি বিশ্বাস করি লেখার জবাব হবে লেখাতেই। যুক্তির খন্ডন হবে যুক্তিতেই। গালিতে নয়, পোস্ট মুছে নয়। রাজাকারদের আমি ঘৃণা করি। মনে-প্রানেই ঘৃণা করি। কিন্তু সেই ঘৃণার প্রকাশ কেনো হবে গালিতে? আমার পরিবার আমাকে এ শিক্ষা তো দেয়নি। আমি জেনেছি, জ্ঞানের অভাবে সাহসের অভাবে যুক্তির অভাবে গালি আসে। "রাজাকার" এর চেয়ে বড় গালি আর কী হতে পারে? এর পরেও কেনো মুখ খারাপ করে নিজেদেরকে নিজে নিচে টেনে নামানো?

আজ ব্লগ ছাড়ার আমার যে সাময়িক সিদ্ধান্ত সেটা আমার প্রিয় মানুষদেরকে ব্লগের ঠিকানা দিতে না পারার লজ্জায়। আমাকে কথা বলতে না দেয়ার ক্ষোভে। আমার মুল্যবোধকে পিষে ফেলার প্রতিবাদে। লেখা আমার থামবে না। ব্লগে হোক আর চিরায়ত কাগজেই হোক লেখা চলবেই। কিন্তু সেই লেখা হয়তো এখানে আর আসবে না। ভালো থাকবেন সবাই। যোগাযোগ থাকবে।

ধন্যবাদ!

© অমিত আহমেদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714532 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714532 2007-06-04 14:08:39
কিংকর্তব্যবিমুড়তায় বিড়ম্বিত... বিতাড়িত?
অন্যদের মত "আর ব্লগে আসবো না", "আর পোস্ট করবো না" এমন শিশুতোষ ঘোষণা আমি দিচ্ছি না... কারন শত হলেও মানুষের মন, আর ব্লগের অনেককের সাথেই এমন পরিচয় হয়ে গেছে যে বারে বারে আসতে মন চায়। তাই আমি অপেক্ষা করে দেখবো ক'দিন, কি হয়। তবে সত্যি কথা বলতে কি, সামহোয়্যারের কোন বিকল্প পেলে এই নির্লজ্জ সাইটটাতে আর আসতে হতো না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714192 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714192 2007-06-03 16:47:54
নটরডেমিয়ান ৩: গ্রুপ সেভেন, এইট ঘুরে অবশেষে থ্রীতে থিতু
গ্রুপ সেভেনের ক্লাস তখন ছিল পুরানো বিল্ডিংয়ের দুই তলায়, করিডোরের বাম পাশে ঠিক শেষ মাথায়। বড় ক্লাস রুমটা চার কলামে টানা বেঞ্চ দিয়ে সাজানো। এক বেঞ্চে তিনজনের বসার ব্যবস্থা। অন্য পাশে সারা দেয়াল জুড়ে ব্ল্যাকবোর্ড। আমি বেশ মুগ্ধ হলাম ক্লাস দেখে। আমাদের স্কুলে আবার কোন বেঞ্চই অক্ষত ছিল না! ক্রিকেট খেলার প্রয়োজন পড়লেই আমরা একটা বেঞ্চ ভেঙে সুন্দর ব্যাট আর উইকেট বানিয়ে ফেলতাম। সে তুলনায় নটরডেমের বেঞ্চ গুলো বেশ নতুনের মত চকচক করছে। তার উপর ক্লাসে আবার স্পিকারের ব্যবস্থা। শিক্ষক প্রথমে ঢুকেই ছোট্ট মাইক্রোফোনটা জামায় আটকে নেন, তারপর লেকচার দেন। বিশাল ভাব!

আমার সিট পড়েছে শেষ সারির মাঝামাঝি, বেঞ্চের মধ্যিখানে। বাম পাশে জোব্বা পরা দাড়িওয়ালা এক টিংটিংয়ে হুজুর আর ডান পাশে চশমা পড়া পাঠ্যপুস্তক খেকো পড়ুয়া (আফসোস তাদের কারো নামই এখন আর মনে নেই)।
হুজুরকে যাই জিজ্ঞাস করিনা কেন সে উত্তর দেয়, আলহামদুলিল্লাহ!
"কি? কেমন লাগে নটরডেম?"
"আলহামদুলিল্লাহ!"
"সিট পছন্দ হইছে?"
"আলহামদুলিল্লাহ!"
"বেশী কড়াকড়ি লাগেনা?"
"আলহামদুলিল্লাহ!"
আমি বাধ্য হয়ে অন্য ছেলের দিকে তাকাই।
"কি মিয়া, গ্রুপ সেভেন কেমন লাগে?"
সে ফিস ফিস করে বলে, "আমরা যে কি ভাগ্যবান... ওই যে ছেলেটা..." আঙ্গুল তুলে সে সামনে বসা একটা শুকনা মত ছেলেকে দেখায়, "ও বোর্ডে ফাস্ট স্ট্যান্ড!"
আমি বিমর্ষ হয়ে ব্যাগ থেকে "মাসুদ রানা" বের করে পড়তে থাকি। ওদের চেয়ে রানার সঙ্গ নিঃসন্দেহে অনেক ভালো।

ক্লাস শুরু হলো জহরলাল স্যারকে দিয়ে, গনিতের ডাঁকাবুকো প্রফেসর, শুকনো মাঝারি লম্বার বয়স্ক মানুষ, মুখে ছাঁটা গোঁফের আবেশ, সারাক্ষনই পান চাবান। উনাকে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট ছাড়া অন্য কোন জামায় দেখিনি কখনও। রসায়নের এ.সি.দাস স্যারের সাথে আবার তাঁর খুব খাতির, দু'জনকে এক সিগারেট ভাগাভাগি করে খেতে দেখেছি। যাই হোক, প্রথম ক্লাস বলে কথা, আমি মনোযোগ দিয়েই নোট করতে থাকি। জহরলাল স্যার ক্লাসে একটা গোপন কথা ফাঁস করে দিলেন। ইন্টারভিউ থেকে নাকি স্যার-ম্যাডামরা প্রতিটা ছেলেকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ফেলেন। অনেকটা সাইকোলজী অ্যানালাইসিসের মত, পরে সেই তালিকা ধরে সবাইকে সমানুপাতে প্রতিটা গ্রুপে ভাগ করে দেয়া হয়। কথাটার সত্যতা পরে টের পেয়েছি, এমনকি প্রতিটা সেকশনে ধার্মিক, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, উপজাতি আর মফস্সলের ছাত্রদের সংখ্যাটাও ছিল একদম হিসাব মত ভাগ করা!

গ্রুপ সেভেন ছিল স্ট্যাটিসটিকস স্টুডেন্টদের গ্রুপ, আমি সহ আমাদের আরও কয়েকজন ঠিক করে ফেললাম বায়োলজী নেব। অন্যদের কি কারন ছিল জানি না, আমার কারন ছিল গ্রুপ পছন্দ না হওয়া। গ্রুপ সেভেন ভর্তি কেবল সেইন্ট জোসেফ আর সেইন্ট গ্রেগরীর ছাত্র। গ্রেগরীয়ানরা ঠিক আছে, কিন্তু জোসেফাইটদের আমার একদম সহ্য হতো না।
প্রথমে ঠিক হলো আমাদের ক'জনের ছোট্ট গ্রুপটকে বায়োলজী ক্লাস করতে হবে গ্রুপ এইটের সাথে। গ্রুপ এইট ইংলিশ মিডিয়াম বলে আমরা এমনিতেই ওদেরকে পাত্তা দিতাম না, তার উপর প্রতিদিন ক্লাস পরিবর্তন, মনটাই খারাপ হয়ে গেল। সেই মন খারাপ থাকলোনা ওখানে কিংবদন্তী আজমল স্যারের দেখা পেয়ে। তিনি ইংলিশ মিডিয়ামে দিব্যি বাংলায় লেকচার দিয়ে দিতেন। এই হয়তো দু'একটা লাইন ইংরাজীতে, এরপর আবার "জয় বাংলা"! জটিল লোক... শিক্ষকদেরকে নিয়ে আমার এই সিরিজে পরে একটা পোস্ট আসবে, তাঁর কথা বিস্তারিত বলবো সেখানে।

যাইহোক, কিছুদিন পরেই ঘরছাড়া আমাদেরকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেয়া হলো। আমার আশা ছিল গ্রুপ ওয়ানে সব দোস্তদের সাথে পড়বো, সেই আশায় গুড়েবালি, আমি পড়লাম গ্রুপ থ্রীতে। গ্রুপ থ্রী দেখতে বাইরে থেকে গ্রুপ সেভেনের মতই, তবুও প্রথম দেখাতেই আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল। একটা কারন হলো, সব গ্রুপে ক্লাস ক্যাপ্টেন সিলেক্ট করা হয়ে গেছে, কেবল গ্রুপ থ্রী তে হয়নি (জ্বী, এই শিশুতোষ জিনিসটা আছে নটরডেমে)। আরেকটা কারন হলো, ক্লাস হয় নতুন বিল্ডিংয়ে লাইব্রেরীর ঠিক পাশের রুমে, তার মানে সেখান থেকে গল্পেই বই নিয়ে ক্লাসে পাঠ্যপুস্তকের ফাঁকে পড়ার সমুহ সুযোগ।

আমার আসন পড়লো এবার প্রথম সারীতে শেষের দিকে, এবারও মাঝে। এক পাশে মারফতী চুলের এক ছেলে, অন্য পাশে দানব-সদৃশ একজন। পরিচয় পর্ব শেষ হলো, মারফতি চুলের ছেলেটার নাম চৌধুরী, ওকে জিজ্ঞাস করলাম,
"কি মিয়া, কেমন লাগতাছে নটরডেম?"
ও বলল, "বালের নটরডেম! কি করতে যে মায়ে ঢুকাইলো এইখানে। বাল! বালরে! বালটা আমার!"
দানবাকৃতির ছেলেটার নাম ইজু, ওকে জিজ্ঞাস করলাম,
"ক্লাসে কি পড়াইছে? নোট-টোট নিছো কিছু?"
সে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জলদ কন্ঠে বলে,
"কি কও এইসব? নোট নেওনের টাইম আছে?"
মনটা আমার প্রশান্তিতে ভরে যায়, গ্রুপটাকে ভালবেসে ফেলি... এই না হলে গ্রুপমেট!



© অমিত আহমেদ

(চলতে পারে)


নটরডেম নিয়ে অন্য ব্লগারদের কিছু পোস্ট খুজে পেলাম:
১) হেমায়েতপুরীর "স্মৃতিকাতরতা: নটরডেম পর্ব"
২) হযবরল এর "নটরডেমিয়ানস: ডাক দিয়েছে ফাদার পিশোতো"]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714002 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28714002 2007-06-02 17:48:28
নটরডেমিয়ান ২: অ্যাডমিশন টেস্টের করুন কাব্য
এরই মাঝে খবর পেলাম বেয়াড়া নটরডেম কলেজ নাকি ঠিক করেছে তারা তবু অ্যাডমিশন টেস্ট নেবে। আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পেলাম, সেই টেস্ট কেবল লোক দেখানো, আসল নিয়োগ টেবুলেশন শীট দেখেই করা হবে। আর ঢাকা কলেজে তো নিশ্চিত, যেমন বলেছি, সেখানটাতেই আমার পড়ার ইচ্ছা। বাবা মা কিছুদিন কোচিং সেন্টারে ঢোকার জন্য চাপাচাপি করে অবশেষে ক্ষ্যামা দিলেন।

নটরডেম, ঢাকা কলেজ আর রাইফেলসের অ্যাডমিশন ফর্ম কিনে জমা দিলাম। রাইফেলসের ফর্ম কেনার নেপথ্যে আরেক কাহিনী, পরে বলবো কোন দিন। সে যাই হোক, নটরডেমে টেস্টের দিন গেছি কোন প্রিপারেশন ছাড়া। কারন, চান্স না পেলে ঢাকা কলেজ ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। পরীক্ষায় দেখলাম গার্ড বলে কিছু নেই, স্যার ম্যাডাম চা-বিস্কুট খাচ্ছেন। সে সুযোগে অনেকেই দেখাদেখি করে চমৎকার পরীক্ষা দিয়ে দিল। আমি পাত্তাও দিলাম না। খাতা জমা দেয়ার পরে আমাকে অবাক করে দিয়ে স্যার বললেন (কে গার্ডে ছিলেন মনে নেই, সম্ভবত বকুল স্যার), "আমরা আসলে দেখেছি কে কতটা সৎ, যারা দেখাদেখি করেছে তাদের আমরা কিছু না বললেও নাম লিখে নিয়েছি, ওরা আগেই বাদ পড়ে যাবে।" আমি মনে মনে বললাম, "খাইছে‌ আমারে!"

ইন্টারভিউ এর ডাক চলে এল, আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন সম্ভবত ডি.কে.রায় স্যার আর প্রমীলা ভট্টাচার্যী ম্যাডাম।
প্রথম প্রশ্ন প্রমীলা ম্যাডামের, "থাকো মিরপুরে, এত দূরে সময় মত আসতে পারবে?"
আমি বললাম, "চেষ্টা করবো ম্যাডাম!"
ডি.কে.রায় স্যার সময়ানুনর্তিতা নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ ভাষন দিয়ে দিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটাও করলেন তিনিই,
"ধানমন্ডি বয়েজের ছেলেরা তো সব বেয়াড়া ধরনের, 'সিম্পল রেস্টুরেন্টে' বসে আড্ডা দেয়। নটরডেমের নিয়মের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে?"
আমরা যে রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিতাম তার নাম "সিম্পল রেস্টুরেন্ট" বটে! রাগ ছাপিয়ে বিস্ময়টাই গলায় ফুটে ওঠে। আমি বলি, "চেষ্টা করবো স্যার!"
তৃতীয় প্রশ্নটাও তাঁর, "এত কলেজ থাকতে নটরডেম কেন?"
আমি বললাম, "কারন, আমার বাবা মনে করেন নটরডেমের মত নিয়মে চলা প্রতিটা ছাত্রের জন্য আবশ্যক।"
ব্যাস, ইন্টারভিউ শেষ।

ফলাফল চলে এলে জানলাম আমার অ্যাডমিশন হয়েছে, ক্লাস করতে হবে গ্রুপ সেভেনে।


© অমিত আহমেদ

(চলতে পারে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28713673 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28713673 2007-05-31 13:54:38
নটরডেমিয়ান ১: নবীনবরনের ব্যবচ্ছেদ (ব্যাচ '৯৯)
কলেজটা লাল-নীল কাগজে বেশ ভালই সাজিয়েছে। ভেতরে কয়েকজন দোস্ত থাকার কথা। ঢোকার পথেই বিপত্তি। দু'জন শিশুসুলভ সিনিয়র ভাই গলায় ঢালাও মমতা নিয়ে বললেন, "ভাইয়া, নতুন ব্যাচ?"
আমি "জ্বী" বলেছি কি বলিনি তারা একটা "স্বাগতম হে নবীন" লেখা কাগজের টুকরো পিন দিয়ে আমার শার্টে আটকাতে গিয়ে পিন আমূল আমার বুকে ঢুকিয়ে দিল। সে এক রক্তারক্তি কান্ড। আমি এতটাই বিহবল যে টু শব্দটাও গলা দিয়ে বেরুলো না, দেখলাম এক ফোঁটা রক্ত শার্টে মিশে গেল। গর্দভ বড় ভাই দু'টো চরম বিব্রত হয়ে "স্যরি ভাইয়া, স্যরি ভাইয়া" করতে লাগলেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই হচ্ছে কলেজের ছাত্রদের অবস্থা! এই কলেজেই পড়তে হবে দু'দুটো বছর!

কলেজের মাঠে প্যান্ডেলের মত সাজানো হয়েছে। ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলে পড়েছি, ঢাকা কলেজের নবীন বরনে কনসার্ট দেখতে (পড়ুন মারামারি করতে) কম যাওয়া হয়নি। এখানে সিন দেখি পুরা উল্টা। সবাই বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে সপরিবারে উপস্থিত। আমি শামিয়ানায় ঢুকে দোস্তদের খোঁজ করি। ইমতিয়াজ, ফয়সাল, রনি, নিয়াজ, বনি আরও অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যায়।
রনি কানে কানে বলে, "দোস্ত, এখনও সময় আছে, ঢাকা কলেজে যাই গা চল।"
আমি গা লাগাই না।
নিয়াজ গোমড়া মুখে বলে, "বাবা-মা আসতে চাচ্ছিলেন, আমি দিয়েছি ঝাড়ি, বলেছি নবীন বরনে গার্জিয়েনরা যায় নাকি! এখানে অবস্থা দেখেছিস, স্টুডেন্টদের চেয়ে গার্জিয়েন বেশী!"
ওকে আর কি বলবো, আমারও বাসায় একই কাহিনী হয়েছে।
ইমতিয়াজ বলে, "দোস্ত অনেকে বোন নিয়ে এসেছে। ঐ কর্ণারে সবুজ জামা পড়া মেয়েটাকে দেখ... চরম না?"

এরই মাঝে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। নটরডেম যে কেবল ভাল ছাত্র বানায় না, শুদ্ধ মানুষও বানায় সেটাই ইনিয়ে বিনিয়ে সবাই বললেন। স্টেজে লম্বা সাদামাটা ফাদার পিশাতো উঠে চমৎকার বাংলায় নিজের বক্তব্য রাখলেন। এরপর শুরু হয়ে গেল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ-গান-আবৃত্তি উপভোগ করছি, এমন সময় স্টেজে আসলেন নাদুস নুদুস মায়া মায়া মার্লিন ক্লারা পিনেরু। টইটম্বুর গলায় বললেন, "এবার একটা অবাক কান্ড হয়েছে! প্রতিবার আমাদের পুরানো ছাত্ররা পারফর্ম করে। এবার তোমাদেরই একজন আমাকে একটু আগে বলেছে সেও কিছু করতে চায়। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই স্টেজে উঠছে, ওকে অনেক, অনেক হাততালি।"
স্টেজে উঠে এলো হাড়গিলে এক ছেলে, টাইট জিন্স আর লাল রঙের শার্ট পড়া। মাথায় আবার ফুটকি মারা লাল ব্যান্ডানা।
ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি পারফর্ম করবে?"
ছেলেটি মেয়েলি গলায় বলল, "ক্লাসিকাল ড্যান্স!"
আমি মনে মনে বললাম, হে ধরণী, দ্বিধা হও!
ছেলেটি মনে হয় পকেটে সব সময় ক্যাসেট নিয়ে ঘুরে, সেটা বের করে ম্যাডামকে দিয়ে বলে, "এটাতে মিউজিক আছে আপা!"
গান শুরু হতেই আমার পিলে চমকে উঠলো, চটুল হিন্দি গান, "গোরে গোরে মুখরেপে কালে কালে চশমা..."
আর সেই সাথে খ্যামটা নাচ। দর্শকরা দু'ভাগে ভাগ হয়ে শামিয়ানার নিচে বসে ছিল। বাম দিকে নতুন ছাত্ররা, ডান দিকে গার্জিয়েনরা। আমি দেখলাম খ্যামটা নাচের সাথে সাথে ডান দিকের সবার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। ছেলেটির কেরামতি আছে বলতে হবে, দেহের প্রতিটা অঙ্গ গরলের মত ওঠানামা করছে। দেখা গেল ছেলের আগ্রহটা আসলে গার্জিয়েন সাইডের বড় আপাদের দিকে। সোজা ঐ দিকে তাকিয়ে তার কোমড় সঞ্চালনের বিশেষ পারদশিতা পুরোদমেই প্রকাশ্যমান। নাচের ফাঁকে কাবিল ছেলে আবার মাথার ব্যান্ডানাটা খুলে নিখুঁত নিশানায় সবুজা জামা পড়া আপুর দিকে ছুঁড়ে দিল। আমি মুগ্ধ চোখে ছেলেটার হাতের টিপ দেখছি, ইমতিয়াজ কানে কানে বলল, "কান্ডটা দেখলি? হারামজাদার পুঁইতা ফালামু আজ।"
হঠাৎই গান বন্ধ হয়ে যায়। আমরা দেখি মিশকালো ঠোটের শ্যামলা রাগী চেহারার একজন মানুষ স্টেজে উঠে আসেন। কান ধরে ছেলেটিকে স্টেজের পাশে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান যেখানে সাবাই তাদেরকে দেখতে পাবে ঠিকই কিন্তু মনে হবে তিনি কাজটা আড়াল করার চেষ্টা করছেন। কিছু বোঝার আগেই ছেলেটার গালে গুনে গুনে পাঁচটা বিরাষি শিক্কার চড় পড়ে। আমাদের সেই প্রথম পরিচয় নটরডেমের ত্রাস টেরেন্স পিনেরু স্যারের সাথে। সারা মাঠে তখন পিনপতন নিঃস্তব্ধতা।
একটু পরেই আবার উঠে এলেন মার্লিন ক্লারা পিনেরু, তাঁর সেই ঢলঢল গলায় বললেন, "যে ছেলেটি নাচলো সে কিছু বলতে চায়!"
কান্না জড়া গলায় থেমে থেমে কথা আসে ছেলেটার, "আ....আমি বলেছিলাম ক্লাসিকাল ড্যান্স দেখাবো... কি....কি...কিন্তু যা দেখিয়াছি তা ছিল অশ্লীল... আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"
ইমতিয়াজ কানে কানে বলল, "উচিৎ শিক্ষা হয়েছে শালার!"

বিস্মিত আমি গুম হয়ে ভাবলাম, এইরে কলেজে উঠেও স্যারদের মার খেতে হবে নাকি! স্টেজে এলেন লিংকন ভাই, উঠেই ধরলেন হ্যাপি আখন্দের "চলনা ঘুরে আসি..." সময়টা মন্দ কাটে না।
সুর্য ডোবার সাথে সাথে অনুষ্ঠান শেষ। দোস্তরা মিলে বাইরে এসে একটা টং দোকানে সিগারেট চাই। সিনিয়র এক ভাই উঠে আসেন। জলদ কন্ঠে বলেন, "ফার্স্ট ইয়ার?"
"জ্বী ভাইয়া!"
"তাহলে মাইকেল মামুর দোকানে যাও। রফিক মামুর দোকান সিনিয়রদের জন্য, ঠিকাছে? আর যেন না দেখি এখানে।"
আমরা মিনমিনে গলায় "জ্বী ভাইয়া" বলে সরে আসি। এতক্ষনে নটরডেমকে কলেজ বলে মনে হয়, পরিচিত আবহাওয়ায় মনটাও ভাল হয়ে আসে। নাহ, যতটা ম্যাড়মেড়ে ভেবেছিলাম কলেজটা, ততটা মনে হয় না!


© অমিত আহমেদ

(চলতে পারে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28713624 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28713624 2007-05-31 06:27:17
গল্প: গন্দম (পর্ব ৮.২) সময়: বিকাল ৫:৩০-৬:৪৫
হাসানের টং দোকান, বনানী

টয়োটা আর.এ.ভি.টা হাসানের দোকানের ঠিক পাশে পার্ক করলো নিপুন। গাড়িটা ওর মার জন্য কেনা হলেও মা ব্যবহার করেন কেবল বাজার করার আর খালা-মামাদের বাসায় যাবার সময়। বাকিটা সময় নিপুনই নিজেই নিজের মনে করে চালায়। গাড়ি থেকে বের হয়ে হাসানের ছোট্ট টং দোকানটায় বসল নিপুন। বেঞ্চে একজন রিক্সাওয়ালা বসে চা খাচ্ছিলেন। নিপুন বসতেই বেচারা সংকোচে দূরে সিঁটিয়ে বসলেন, নিপুনের গায়ে যেন তাঁর নোংরা স্পর্ষ না লাগে। মনটা খারাপ হয়ে গেল নিপুনের, হায়রে আমার দেশটা, এত ভেদাভেদ মানুষে?
"ঠিক মত বসেন চাচা, এত দূরে বসেছেন, পড়ে যাবেন তো বেঞ্চ থেকে।"
লাল দাঁত বের করে হাসে কেবল চাচা, কাছে আসার কোন লক্ষণ দেখায় না।
"হাসান, বাকিরা আসে নাই?"
"তমাল ভাই আইছিল। কেউ নাই দেইখা গেছে গা। কইছে আবার আইব পরে। আপনারে চা দিমু?"
"দে!"
"সিগারেট?"
"দে!"
সিগারেট ধরিয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতেই ফয়সাল চলে আসে। রিক্সা থেকে নেমে বলে,
"দোস, ভাংতি আছে? পাঁচটা টাকা দে তো।"
ফয়সাল একটা এন.জি.ও তে কাজ করে এবং কোন বিচিত্র কারনে কোনকালেই ওর কাছে ভাংতি থাকে না।
"নাই। মানিব্যাগ নিয়া বাইর হই নাই আজকে।"
"মানিব্যাগ ছাড়া আবালের মত বাইর হইছস ক্যান? বাসায় থাকলেই পারতি।"
"মানিব্যাগ আনি নাই, কারন মানিব্যাগে পয়সা নাই। তোমাগো মত চাকরি করি নাকি আমি? বেকার!"
কথা না বাড়িয়ে হাসানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে দেয় ফয়সাল। নিপুনের বাবার এত টাকা আছে যে দশটা নিপুন কাজ না করলেও তাঁদের কিছু যাবে আসবে না। সে সুযোগে বাবা-মার একমাত্র ছেলে ইচ্ছা করেই কোন কাজ করে না, ওর সারা দিনের কাজ হলো গিটার বাজানো, গান শোনা আর ডি.ভি.ডি.তে সিনেমা দেখা।

আরেকটা রিক্সায় রানা আর তমালও চলে আসে।
"রানা তমালকে পাইলি কই?" জিজ্ঞাস করে নিপুন।
"কাহিনী রে ব্যাটা, বিশাল কাহিনী। দেখি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক গরম ললনার সাথে আলাপ করছে। কসম দোস, আমাকে দেইখা তমাল না চেনার ভান করে!"
বিরক্তি নিয়ে তাকালো তমাল। সবার মধ্যে ওই সবচেয়ে সিরিয়াস। তাই প্রকৃতির নিয়ম মেনে ঠাট্টা-মস্করাও ওর সাথে একটু বেশিই হয়,
"মেয়ে আমাদের কাস্টোমার কেয়ারে কাজ করে। কলিগ টাইপ আরকি। রাস্তায় দেখা হইছে কথা বলব না?"
"তুই কাজ করিস মার্কেটিং সেকশনে। কাস্টোমার কেয়ারের মেয়ে তোর কলিগ হয় কেমনে শুনি?" জিজ্ঞাস করে ফয়সাল।
তমাল বাংলালিংকে জয়েন করেছে গত ছ'মাস হলো। সেটা জাহির করতে সে ইদানিং সারাক্ষণ বাংলালিংকের একটা টিশার্ট পরে থাকে, সেটা নিয়েও বন্ধু মহলে ভালোই হাসি-ঠাট্টা হয়। তমাল জবাব দেয়ার আগেই কথা কেড়ে নিল রানা,
"সেইটা বড় কথা না। শালা মাইয়া আছে দেখে আমাকে রিক্সায় দেখেও না চেনার ভান করছে, এটার বিচার কর!"
"তোরে আমি দেখি নাই। তুই আইছস পেছন থেকে, আমি আগে কেমনে দেখুম শুনি?"
"হ ভাই, রিক্সা চড়ি তো, আমাদের বন্ধু বলতে লজ্জা লাগে না? সেইটা কও?"
তমাল কোন উত্তর দেয় না। আজ সবাই একসাথে ওকে বাগে পেয়েছে, কিছু না বলাটাই এখন শ্রেয়।

এই নিয়ে খানিকক্ষণ রগড় চলার পর সবাই সিরিয়াস হয়ে যায়। একটু পরেই রাজীবের সাথে দেখা করার কথা, তার আগে ওদের এই গোপন বৈঠক। আলোচনার বিষয়বস্তু তৃণা। রাজীবের স্বভাবটা ওদের চেয়ে বেশি কেউ জানে না। সেই স্কুল-কলেজ থেকে বন্ধু ওরা। সবাই জানে রাজীব জাত প্লেয়ার। ওর কতজন বান্ধবী এসেছে আর গেছে তার হিসাব ওরাও ভালো মত জানে না। কিন্তু তৃণার ব্যাপারটা আলাদা। এত সিরিয়াস ওরা রাজীবকে আর কখনও দেখেনি।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে ফয়সাল,
"আমার এই মিটিংটা মোটেই ভালো লাগছে না। রাজু আমাদের দোস্ত, কিছু বলতে হলে ওকেই সরাসরি বলব। পেছনে আলাপ করবো কেন?"
"পেছনে আলাপ কই দেখলি?" বিরক্ত নিয়ে বলে রানা, "যা আলাপ হবে তা তো একটু পরে রাজীবকে জানাবোই? আর ও এখন পুরা অন্ধ, ওকে কিছু বলার আগে আমাদের সবাইকে একমত হয়ে একসাথে বলতে হবে। এছাড়া ওকে মানানো যাবে না।"
"ঠিক!" সায় জানালো নিপুন, "এই তৃণা মেয়েটার ব্যাপারে একটা ডিসিশন আজই নিতে হবে।"
"সমস্যা কি?" বলল তমাল, "রাজীবের লাইফ, রাজীব ডিসাইড করবে, আমি বলার কে? আমি এই আলাপে নাই।"
"দোস্ত, আমাদের কোন বন্ধু একটা নষ্ট মেয়ের সাথে জড়িয়ে পড়বে, আমাদের সেখানে কিছু বলার নাই? কেন, রাজু দোস্ত না আমাদের?" এত আবেগ নিয়ে কথাটা বলল রানা যে জবাব খুঁজে পেল না তমাল। ফয়সাল বলল,
"মেয়েটা হয়তো নষ্ট ছিল, সেটা আমাদের রাজুও ছিল। কিন্তু এখনও যে আছে তার কি প্রমান। হ্য়তো রাজীবের সাথে থাকার পর বদলে গেছে।"
"আমি একটা কথা বলতে চাই..." হাত তুলল নিপুন, "গত সপ্তাহে তৃণাকে দেখেছি আমি, ক্যাফে ম্যাংগোতে। একটা ছেলের সাথে।"
"তো?" প্রশ্ল করলো তমাল, "ছেলে বন্ধুর সাথে দেখা করতে মানা?"
"যা করতে দেখেছি তা বন্ধুদের সাথে কোন মেয়ে করে না দোস্ত।"
কথাটা শুনে আর কিছু বলার থাকলো না কারোরই। কাপের পর কাপ চা আর সিগারেটের পর সিগারেট পুড়িয়ে একটা সিদ্ধান্তে চলে আসলো সবাই।


***

১৩ জুলাই, ২০০৬
সময়: সন্ধ্যা ৭:০০-রাত ১১:০০
এন.এস.ইউ. ক্যাম্পাস, বনানী এবং
বসুন্ধরা হাউজিং, বারিধারা

ঘামে ভিজে বেসমেন্ট থেকে উঠে আসলো রাজীব। অনেক দিন খেলা হয়নি বলে শরীরে জড়তা এসে গেছে। একটু খেললেই হাঁফ ধরে যায় এখন। তিনটে সেট খেলেই এই অবস্থা।

বেরুতেই নিপুনের গাড়ি দেখলো রাজীব। বাব্বা আজ দেখি টাইমে চলে আসা হয়েছে। গাড়ি থেকে নামলো না নিপুন, গলা বের করে বলল,
"রাজু, ওঠ ওঠ তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠ।"
দৌড়ে গাড়িতে উঠে ওবাক হয়ে গেল ও,
"তোরা সবাই একসাথে? কাহিনী কি?"
"কাহিনী বলা হবে বসুন্ধরায় যাবার পর।" হাত বাড়িয়ে সিডি প্লেয়ারটা চালু করে দেয় নিপুন।
বারিধারায় বসুন্ধরার প্লট বরাদ্দ যতই দেয়া হোক, এখনও জায়গাটা প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। এদিকে দক্ষিণের লেকটারও কিছু অংশ ভরাট করা হয়েছে। বড় বড় ঘাশ আর কাশবনে ঘেরা লেকটা রাজীবদের খুবই প্রিয়। জায়গাটা সুন্দর তো বটেই, তার চেয়ে বড় হলো খুবই নির্জন। মাঝে মাঝে বসুন্ধরার নিজস্ব সিকিউরিটি এসে কি হচ্ছে দেখে যায় এছাড়া আর কোন উৎপাত নেই। তাই প্রায়ই নিপুনের গাড়ি নিয়ে সবাই সুর্য ডোবার ঠিক আগ মুহুর্তে ওখানে চলে যায়। সাথে থাকে বড় দু'টো কোকের বোতল , চিপস কিংবা নান-কাবাব। খাওয়ার সাথে সুর্য ডোবা, চাঁদ দেখা আর আড্ডা সবই হয়। পঁচা শামুকের শহরে এটা ওদের নিজেদের প্রবাল দ্বীপ।

গাড়ি পার্ক করেই নিপুনের মনে হয় সাথে সিগারেট নেই,
"সিগারেট আছে কারও সাথে?"
"আছে।" ছোট্ট করে জবাব দেয় তমাল।
"সাবাশ।"
গাড়ি থেকে নেমে বনেটের উপর উঠে বসে সবাই।
সারাটা রাস্তা কি হয়েছে তার কিছুই বলা হয়নি রাজীবকে, কিন্তু রাজীব অনুমান করেছে কেন হঠাৎ কোন জানান না দিয়ে ওকে এখানে তুলে আনা হয়েছে। এমনটা হতে পারে সেটা অবচেতন ভাবেই জানত ও, তাই মানসিক প্রস্তুতিটাও হয়তো কোন একভাবে নেয়া ছিল।
কোন তাফালিং না করে আসল কথা চলে গেল রানা,
"তোকে কেন এ জায়গায় এনেছি জানিস?"
"না বললে জানবো কিভাবে?"
"তৃণার সাথে তোর রিলেশনটা কি?"
এই ভয়টাই ছিল রাজীবের,
"জাস্ট ফ্রেন্ডস!" তোতা পাখির মত বলল রাজীব।
"দেখ দোস্ত, জাস্ট ফ্রেন্ডস যে না সেটা একটা বেকুবও বুঝবে। তোকে আগে দেখি নাই আমরা অন্য মেয়েদের সাথে?"
কোন উত্তর দেয় না রাজীব।
ফয়সাল বলে,
"অন্য কোন মেয়ে হলে কিছু বলতাম না তোকে। আমরাও চাই তুই র‌্যানডম টাংকিবাজী ছেড়ে কারও সাথে থিতু হো, কিন্ত হোয়াই তৃণা?"
"কেন তৃণার সাথেই বা সমস্যা কি?" নিজের গলার ঝাঁঝ দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল রাজীব।
"তাহলে তুই স্বীকার করছিস তৃণার সাথে কিছু আছে তোর?" বলল তমাল।
ভুল বুঝে ডিফেন্সে চলে গেল রাজীব,
"তা তো বলিনি! কিন্তু তোদেরই বা মনে হলো কেন ওর সাথে কিছু আছে?"
"শুনবি?" বলল রানা, "আচ্ছা শোন তাহলে। আগে তুই প্রতিটা সময় মেয়েদের পেছনে ছোঁক ছোঁক করতি। কদিন পর পরই নতুন কোন মেয়ের গল্প বলতি আমাদেরকে। তৃণার সাথে পরিচয় হবার পরে কোন কোন মেয়েকে ডেট করেছিস তুই?"
"অনেক, কয়টা শুনতে চাস?"
"জাস্ট তিনটা মেয়ের নাম বল।"
অনেক খুঁজেও একটা নাম মনে করতে পরল না রাজীব।
"আচ্ছা বাদ দে। দিনে কয়বার কথা হয় তৃণার সাথে ফোনে?"
"দুই বার, তিন বার।"
"মিথ্যা কথা বলবি না দোস্ত!" বলল তমাল।
"মিথ্যা কই বললাম?"
"দে, তোর মোবাইলা দে, কল হিস্টরি দেখি?"
মোবাইল বের করার কোন গরজ দেখায় না রাজীব।
"দোস্ত, ইউ হ্যাভ চেঞ্জড, অবকোর্স ইন এ গুড ওয়ে! কিন্তু তৃণা কিন্তু বদলায়নি। ও যেমন ছিল তেমনই আছে।"
"সেটা তুই কিভাবে জানিস?"
"নিপুন, বলতো ওকে কি দেখেছিস।"
শুনে কানটা গরম হয়ে ওঠে ওর। এমনটাই কথা ছিল, কেউ কাউকে কোন কাজে বাঁধা দেবে না। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারনে রাজীবের অন্য কোথাও মন টানেনি। অবচেতন ভাবে ভেবে নিয়েছিল তৃণাও হয়তো... অনেকে অনেক কথা বলেছে ওকে, কিন্তু ও কখনও তৃণাকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি। কোন মুখেই বা জিজ্ঞাস করবে, ওই তো বড় গলায় বলেছিল কেবলই "বন্ধুত্ব" আর কিছু নয়।
"দোস্ত, ছোটবেলা থেকে চিনি আমরা একে অন্যকে। আমাদের কাছে কেন লুকাচ্ছিস? তুই জানিস যে কোন সমস্যায় আমরা আছি তোর সাথে জানিস না?" বলে ফয়সাল।
"জানি!"
"তাহলে?"
"শুনবি তোরা? আচ্ছা শোন তাহলে, তোদেরকে বলিনি লজ্জায়!" ধরা গলায় বলে রাজীব।
"লজ্জা! কিসের লজ্জা?" অবাক হয় রানা।
"এই আমাকে তো তোরা চিনিস না! যদি হাসিস, যদি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করিস!" কিছু বলতে যাচ্ছিল রানা, থামিয়ে দিল রাজীব, "আমি জানিনা দোস্ত ইফ ইটস লাভ ওর নট। কিন্তু আমি মেয়েটার উপর অনেক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি কোন কারনে। মেয়েটা অনেক ছোট খাট জিনিস নিয়ে শাষন করে আমাকে, আমার কবে কোন মিটিং, কবে কোন খাবারটা ভাল লেগেছিল সেটা ভোলে না কখনই। সব মিলিয়ে কেমন জানি একটা ভাল লাগা আছে। এটা প্রেম কি না আমি জানি না।" কথা গুলো অনেক দিন থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, বন্ধুদেরকে বলতে পেরে হালকা লাগলো রাজীবের।
"আচ্ছা, প্রেম কি না বোঝার উপায় আছে..." বলল রানা, "ওকে বিয়ে করবি তুই? ইচ্ছে করে বিয়ে করতে?"
মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল রাজীবের, এভাবে তো কখনও ভাবেনি ও, "জানি না!"
"চিন্তা কর। চিন্ত করে বল।"
"হয়তো করবো, জানি না দোস্ত! বিয়ের কথা কখনও মাথায় আসেনি।"
"শোন রাজু, আমরা কি ঠিক করেছি সেটা শোন।" বলল নিপুন, "আমরা জানি এখন আমরা যদি বলি ওকে ভুলে যা সেটা পারবি না তুই। তাই তৃণার সাথে আলাপ কর। আমরা যা বললাম সেটা ওকে বুঝিয়ে বল। আমাদের মনে হয় কোন কারনে তুই খুব সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস..."
"আমি জানি কেন, ব্যাপারটা কিন্তু পরিস্কার," বলল ফয়সাল, "অন্য মেয়েরা সবাই রাজুর মতই ছিল, কিন্তু তৃণা ওকে আলাদা অ্যাটেনশন দিচ্ছে, কেয়ার নিচ্ছে, তাই..."
"বাদ দেতো ফয়সাল, আগে আমার কথাটা শেষ করতে দে" বলল নিপুন, "তুই তৃণাকে আস্ক আউট কর। ফর্মালি। বল তুই দেখতে চাস এই সম্পর্কের আসলেই কোন শেষ আছে নাকি। ও যদি একই রকম অনুভব করে, যদি রাজী থাকে তাহলে একটু সময় নিয়েই দেখ, আর না থাকলে না হয় আবার বন্ধুত্বে ফিরে যাবি। কিন্তু সেটা যেন কেবল বন্ধুত্বই হয়, এখন যা চলছে তা না।"
কোন জবাব মুখে আসে না রাজীবের।
"এতে আরেকটা জিনিস কি হবে জানিস রাজু?" বলল তমাল, "তুই জানতে পারবি মেয়েটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কতটা পারঙ্গম। সিরিয়াস রিলেশনে ও এখন যা করে বেড়াচ্ছে তা করতে পারবে না, এই জিনিসটা তুই ওকে ক্লিয়ার করে দিস। তাই 'হ্যাঁ' বলার পরেও যদি ও যাচ্ছেতাই করে বেড়ায় তাহলে তুই নিশ্চিত বুঝে যাবি মেয়েটা তোর যোগ্য নয়।"
"হুম!"
"হুম মানে কি? রাজী? আস্ক আউট করবি?" রানা জিজ্ঞেস করলো।
"কবে করতে হবে?"
"কবে মানে? পারলে আজই। নাহ, আজ না। কাল শুক্রবার, তুই না হয় কাল সামনা সামনি দেখা করে জিজ্ঞেস করিস। ঠিক আছে?"
"আচ্ছা।"
এত সহজে রাজীব রাজী হয়ে যাবে সেটা কেউ ভাবেনি বলেই বিস্ময়টা একটু বেশীই বোধ হয় সবার, রানা জিজ্ঞেস করে,
"আচ্ছা মানে? করবি?"
"করবো!"
"গুড!" এছাড়া আর কিছু বলার থাকে না রানার।
বাকি সময়টা বিরাট চাঁদের নিচে (কোন বিচিত্র কারনে জায়গাটা থেকে চাঁদটা একটু বড়ই দেখায়) নিপাট আড্ডাতেই কেটে যায়। ঘরোয়া থেকে কাবাব আনা হয়েছিল, সে কাবাবেরও সদ্যবহার হয়। রাজীবকে জানানো হয় না যে ওরা সবাই নিঃশ্চিত ভাবেই ধরে নিয়েছে যে তৃণা "না" বলবে আর ওর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে রাজীব। কিন্তু পরদিন জুম্মা শেষে সবাই একটা বিস্ময়কর টেক্সট মেসেজ পায় রাজীবের কাছ থেকে।
ছোট্ট মেসেজটায় কেবল একটা কথাই লেখা,
"শী সেইড ইয়েস!"


© অমিত আহমেদ


(চলবে)

গন্দম - পর্ব ১ | গন্দম - পর্ব ২ | গন্দম - পর্ব ৩ | গন্দম - পর্ব ৪ | গন্দম - পর্ব ৫ | গন্দম - পর্ব ৬ | গন্দম - পর্ব ৭.১ | গন্দম - পর্ব ৭.২ | গন্দম - পর্ব ৮.১


বি.দ্র.:
১) "এ গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কারও সাথে কোন সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তা নেহায়তই কাকতালীয় হিসেবে গন্য হবে।"
২) ভালোবাসার পাঠকদেরকে গন্দমের গত পর্বের প্রথম মন্তব্যটি পড়ার অনুরোধ করছি।
৩) আগামী পর্ব একদিন পরে দেয়া হবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712940 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712940 2007-05-27 19:36:18
গল্প: গন্দম (পর্ব ৮.১) সময়: সন্ধ্যা ৬:০০-৬:৩০
এন.এস.ইউ. ক্যাম্পাস, বনানী

"মহসিন, একটা বেনসন দে!" চায়ের কাপ সামলাতে সামলাতে চিৎকার করে রাজীব। নর্থ সাউথ ক্যাম্পাসের সিগারেট ব্যবসার মনোপলি কায়েম করে রেখেছে মহসিন। ভার্সিটির এমন একটা ধুমপায়ী পাওয়া যাবে না যে মহসীনের খদ্দের নয়। সাতাশ/আঠাশ বছরের ছেলেটার অসাধারন স্মৃতিশক্তি। ওর খদ্দেররা নিয়মিত হলেও সিগারেটের দাম পরিশোধে কেউই নিয়মিত নয়, সব জমা হতে থাকে। কোন এক সময় মহসিন এসে আস্তে করে জানায়, "এই কয়দিনে দুইশো চাইর টাকা জমা পড়ছে কিন্তুক। টাকা দেন।" এই টাকার হিসাব পুরোটাই থাকে তার মাথায়, সে হিসাবে কখনও একটাকা গড়মিল হয় না।

রাজীব বসে আছে নর্থ সাউথের সামনে শান বাঁধানো পাটাতনে। মহসিন একটু দূরেই দাঁড়িয়ে এক মেয়েকে সিগারেট বিক্রি করছে, রাজীবের দিকে ফিরে তাকাবারো প্রয়োজনও বোধ করলো না। মেয়েটা মনে হয় নর্থ সাউথে নতুন, আগে কখনও দেখেনি রাজীব। সিগারেটও মনে হয় নতুন ধরেছে, ধোঁয়া মুখের মধ্যে নিয়েই ছেড়ে দিচ্ছে, এক বিন্দুও ভেতরে ঢুকছে না। মহসিন সিগারেট দিয়েও দাঁড়িয়ে আছে... লুইচ্চা একটা,
"ওই মহসিন, কি কানে কথা যায়না না? বিড়ি চাইলাম না?"
মহসিন নিতান্তই অনিচ্ছা নিয়ে কাছে আসে,
"বেনসন না পলমল?"
"ওই ব্যাটা, পলমল খাই আমি? বেনসন দে!"
নতুন ব্র্যান্ড বলে মহসিনের সবাইকে পলমল গছিয়ে দেবার খুব চেষ্টা, লাভটাও মনে হয় পলমলে একটু বেশিই থাকে।
"মহসিন, মেয়েটা কে রে?"
"নতুন আইছে। ক্যান আপনি চিনেন না? ফয়সাল ভাই চিনে তো!"
"নাম কি?"
"ভাবি কই?"
"বেশি সেয়ানা হইছস না? কি জিগাইলাম আর কি উত্তর দিলি?‌ ভাবি কই মানে? কোন ভাবি?"
"তৃণা ভাবি। ওই যে, ওই দিন নিয়া আইলেন না এইহানে?" দাঁত বের করে হাসে মহসিন।
উত্ড়রে খেঁকিয়ে ওঠে রাজীব, "ওই ব্যাটা, তৃণা ভাবী হইলো ক্যামনে শুনি? আমার সাথে মেয়ে দেখস নাই আগে?"
হাসি মোটেই মলিন হয় না মহসিনের, বলে,
"আরে বস্‌ কম দেখছি নাকি? কিন্তুক এইটা কইলাম অন্যরকম, আমি বুইঝা ফালাইছি!"
"অন্যরকম মানে?" সিরিয়াস হয়ে যায় রাজীব। ওর মনে এখন সন্দেহ দানা বাঁধছে, ব্যাপারটা কি এতটাই দৃশ্যমান যে দেখলেই বোঝা যায়! ওর সিরিয়াস গলা শুনে উল্টো বুঝলো মহসিন, ভাবলো রাজীবের বুঝি মেজাজ গরম হয়েছে,
"মস্করা করতাছিলাম বস্‌!" সুড়ুৎ করে কেটে পড়ে ও।

তৃণাকে কখনও নর্থ সাউথে আনতে চায় না রাজীব। অনেক কারন আছে। এক হলো, রাজীবের সাথে কোন মেয়ে দেখলেই এখন মুখে মুখে নানান গল্প ছড়িয়ে যায়। বন্ধুরা এসে উল্টো-পাল্টো মন্তব্য করে। অন্য মেয়ে হলে এগুলো গায়ে লাগে না ওর, কিন্তু তৃণাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে মাথায় রক্ত উঠে যায়। তার উপর তৃণার রেপুটেশনও তেমন কিছু ভাল নয়। ইন্টারনেট কানেশন আছে কিন্তু ওর ছবি গুলো দেখেনি এমন কাউকে মনে হয়না এই ঢাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে। ছবি গুলো রাজীবও দেখেছে। এমন ছবি হয়তো বিদেশে পারিবারিক অ্যালবামেও রাখা যায়, কিন্তু আমাদের দেশের প্রক্ষাপটে খুবই, খুবই দৃষ্টিকটু। এমন ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য রাজীবের তৃণার উপর একটা চাপা রাগ আছে। কিন্তু সে রাগটা সে কখনই প্রকাশ করেনি। কোন একদিন কথায় কথায় ছবিগুলোর প্রসঙ্গ চলে আসায় তৃণা জানাতে চেয়েছিল কেন ওই শোতে ও সবার সামনে ওর লং স্কার্টটা ছিঁড়ে মিনি বানিয়ে ফেলেছিল, রাজীব শুনতে চায়নি।

এতদিন পরেও রাজীব নিশ্চত হতে পারে না তৃণার সাথে ওর সম্পর্কটা আসলে কি রকম। শুরু হয়েছিল একরকম ওর অনিচ্ছাতেই, তৃণার জেদের কাছে হার মেনে। সে সময়টাতে পাগলের মত ওকে ফোন করেছে তৃণা, নাম্বার দেখেই সেই ফোন কেটে দিয়েছে রাজীব। কখনও বিরক্ত হয়ে ধরলেই বাচ্চা মেয়ের মত অভিযোগ করেছে তৃণা, দেখা করতে চেয়েছে। সে সব অভিযোগ-অনুরোধও রাজীব এড়িয়ে গেছে কাজের অজুহাতে। এমন সময় একদিন হঠাৎ তৃণা ওর অফিসে এসে হাজির। নিজের রুমে তৃণাকে দেখে বরফ হয়ে গিয়েছিল ও, অফিসের সবাই দেখলো ভুঁইয়া সাহেবের মেয়ে স্যারের ছোট ছেলের রুমে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ঢুকে পড়েছে। ভাইয়ার হাতে ধরা পড়ে যাবার ভয়েই রাজীব তৃণাকে দেখে এক মূহুর্ত আর সময় নষ্ট করে না, নিজেই ড্রাইভ করে "মুভ অ্যান্ড পিক"এ নিয়ে আসে। আইসক্রিম খেতে খেতে সরাসরি জিজ্ঞাস করে রাজীব,
"কি চাও তুমি আমার কাছে তৃণা?"
মিটিমিটি হাসে মেয়েটা। বলে, "তা তো জানি না! কিন্তু তোমাকে ভাল লাগে আমার।"
"কেন ভাল লাগে?"
"জানি না।"
কোন ঝুঁকি নিতে চায় না রাজীব, বলে,
"তোমাকে আগেই জানিয়ে দেই তৃণা, বন্ধুত্ব ছাড়া আমার কাছে আর কিছু পাবার আশা থাকলে সেটা এখনই বাদ দিয়ে দাও। আমি কোন ঝানেলায় জড়াতে চাই না।"
খিল খিল করে হেসে উঠে তৃণা,
"আমি জানতাম তুমি ঠিক এ কথাটাই বলবে, রাজীব রহমান! তোমার কাছে বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু চাইও না আমি।"

কিন্তু এর পরেও সময়ের সাথে সাথে সব বদলে যেতে থাকে। সম্পর্ক নিয়ে ওর মতবাদটা ছিল পরিপাটি, "বিয়ের আগে যা ইচ্ছা নিজের পছন্দে, আর বিয়ের সময় বিয়ে বাবা-মার পছন্দে"। সে মতবাদ ভেঙে চুরমার করেছে তৃণা। যতই দিল গেছে দু'জনের বদ্ধুত্ব গাড় হয়েছে। তৃণার মেয়েটার সাথে অনেক কিছুতেই অনেক মিল রাজীবের, আবার অনেক কিছুতেই অনেক অমিল। সব মিলিয়ে দু'জন দু'জনের উপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে ওঠে যে ব্যাপারটা দুই পরিবারেও জানাজানি হয়ে যায়। এমন একটা অবস্থা দাঁড়ায় যে দু'জনকেই দু'জনের পরিবারকে নিশ্চিত করতে হয় যে ওদের সম্পর্কটা নিপাট বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।

চিন্তার তাল কেটে যায় জুনিয়র কিছু ছেলের উৎপাতে,
"রাজীব ভাই, চলেন এক দান হয়ে যাক।"
"নাহ্‌ এখন ইচ্ছা করতেছে না।"
"আরে চলেন না। ডাবলস্‌ হবে... চ্যালেঞ্জ করলাম যান।"
চট করে ঘড়ি দেখে নেয় রাজীব, সময় আছে। চায়ের কাপ রেখে টেবিল টেনিস খেলতে বেসমেন্টের দিকে রওনা দেয় ও।


***

১৩ জুলাই, ২০০৬
সময়: বিকাল ৫:০০-৫:৩০
সিমেন্স সেন্টার, গুলশান

"বস্‌, নওরীন কি করেছে শুনেছেন?"
নওরীনের কথা শুনেই রাগে পিত্তি জ্বলে গেল রানার। নওরীনকে একদমই সহ্য হয় না ওর। মোটা সোটা আই.বি.এ. থেকে পাশ করা মেয়েটা কাজ না জানলে কি হবে, গুটি চালতে এক নাম্বার। সব সময় এর কথা ওর কাছে লাগাবে, সিনিয়র ভাইয়াদের কাছে কলিগদের নামে নালিশ জানাবে।

এই গত সপ্তাহেই মেয়েটা রানার রুমে এসে আদিখ্যেতার একশেষ করেছে। রানার কাছে বসে নানান অজুহাতে এখানে ওখানে ছুয়ে দেয়, আবার বলতে বলতে হঠাৎই গলা নামিয়ে চোখ বুঁজে মুখ কাছে নিয়ে আসে। পরে জানা যায় প্রজেক্ট ফাইল করতে নাকি রানার সাহায্য লাগবে। এমন অবস্থায় আগে আর পড়েনি রানা, ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে কাজটা করে দিয়েছে। পরে শুনে সে নাকি সেকশন ম্যানেজার ভাইয়াকে বলেছে রানা ওকে একটুও কোঅপারেট করেনি।
"কি করেছে?"
"গতকাল সুমন ভাইয়াকে বলেছে আমরা নাকি কাজে ফাঁকি দিয়ে সিগারেট খেতে যাই।"
"সিরিয়াস? তাই বলেছে?"
"জ্বী ভাইয়া!"
"সে যে সারাটা সময় ফোনে হা-হা হি-হি করে সেটা কিছু না?"
"বলেন তো দেখি বস্‌, কেমন লাগে? আপনার কাজ না থাকলে চলেন এইটা নিয়ে আলোচনা আছে। বাকি সবাই ওয়েট করছে বাইরে।"
মনে মনে মেয়েটাকে নিজের জানা সবচেয়ে খারাপ গালিটা দিল রানা, মেয়ে না হলে তোরে বাটি চালান দিতাম মাগী। ঘড়ি দেখল রানা, আজ এর চেয়ে জরুরী কাজ আছে,
"আজ না। কাল বসি সবাই নাকি? আজ জরুরী কাজ আছে একটা।"
"ওকে বস্‌! কিন্তু ওকে টাইট দিতে হবে কিন্তু! ছাড়া যাবে না।"
কমপিউটারটা বন্ধ করে রুম থেকে বের হয়ে গেল রানা। সাড়ে পাঁচটায় নিপুন, তমাল আর ফয়সালের সাথে হাসানের দোকানে জরুরী আলাপ আছে।




© অমিত আহমেদ

(চলবে)

গন্দম - পর্ব ১ | গন্দম - পর্ব ২ | গন্দম - পর্ব ৩ | গন্দম - পর্ব ৪ | গন্দম - পর্ব ৫ | গন্দম - পর্ব ৬ | গন্দম - পর্ব ৭.১ | গন্দম - পর্ব ৭.২


বি.দ্র.: "এ গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কারও সাথে কোন সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তা নেহায়তই কাকতালীয় হিসেবে গন্য হবে।"]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712908 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712908 2007-05-27 15:55:36
গল্প: গন্দম (পর্ব ৭.২) সময়: দুপুর ১২:০০-১:০০
অফিস - তিস্তা গ্রুপ, মহাখালী

টি.ভি ছাড়বেনা ছাড়বেনা করতে করতেও ছেড়ে ফেলল রাজীব। কার্টুন নেটওয়ার্কে 'ফ্লিন্টস্টোনস' দেখাচ্ছে। কার্টুনের উপর ওর শিশুকালের দূর্বলতাটা এখনও টিকে আছে। টি.ভি দেখার একটা বড় অংশ ও কার্টুন দেখেই পার করে। অফিসের কাজ বাদ দিয়ে টি.ভি দেখছে সেটা ভাইয়া জানতে পারলে কপালে খারাবি আছে, কিন্তু গতকালের ডিলটা ফাইনাল করে ওর মন আজ পুরা বিন্দাস! দেখলে দেখুক, যা হবার হবে।

কাল রাত ১টার দিকে বাসায় গিয়ে দেখে বাবা-মা-ভাইয়া কেউ ঘুমায়নি। সবাই জেগে অপেক্ষা করছে ওর জন্য। ডিলটা ফাইনাল হয়েছে শুনে বাসায় সেই ১টার সময়ই একটা উৎসব মত হয়ে গেল। তিস্তা আর ভুঁইয়া গ্রুপ দু'জনেই কাজটার ৫০ ভাগ করে পেয়েছে। রেট ঠিক হয়েছে ১৮ পার পিস। সত্যি কথা বলতে কি বাবা-ভাইয়া মনে করেছিলেন ও কাজটা হাতছাড়া করে ফেলবে। তাই উৎসবটা যতটা না ছিল এগ্রিমেন্ট সাইন করার জন্য তার চেয়ে বেশী ওর সাফল্যে। একমাত্র মার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল ওর উপর, উনি সন্তান সাফল্যে উদ্ভাসিত হয়ে বলে চললেন, "আগেই বলেছিলাম না, রাজু ঠিকই পারবে!"

চেয়ারে হেলান দিয়ে টেবিলে পা তুলে দিল ও। গতকাল মিটিংটা একদমই একমাত্রিক ছিল। ভুঁইয়া সাহেব প্রথম থেকেই বলেছেন দুই গ্রুপে ৫০-৫০ করে কাজ ভাগ করে দেয়া হোক। এ প্রস্তাবে প্রতিবাদের কোন কারন দেখেনি রাজীব। পরে আসল তর্কা-তর্কীটা হয়েছে রেট পার পিস নিয়ে। মার্সেলের মত পিচ্ছিল বায়ার আগে দেখেনি রাজীব... এক্ষুনি হয়তো বলল, "আমার লাভ থাকছে ১৫%", একটু পরেই সে কথা বেমালুম অস্বীকার করে যাবে। সে সময় ভুঁইয়া সাহেবের সাথে চমৎকার বোঝাপোড়া হয়েছে। ভদ্রলোক রাজীবের প্রতিটা প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করেছেন, ছোট বলে কোন অবহেলা দেখান নি। লোকটাকে ভাইয়ার কেন পছন্দ তা এখন বুঝতে পারছে রাজীব। এগ্রিমেন্ট সাইন করার পর রাজীবের হাতটা শক্ত করে ধরে ভদ্রলোক বলেছেন, "তুমি আর তোমার ভাই, দু'জনের মধ্যেই একটা জিনিস আছে যেটা যে কোন ব্যবসায়ীর থাকাটা খুব জরুরী, তোমরা দু'জনেই জান কখন চুপ থাকতে হয়। তোমার বাবা অসম্ভব ভাগ্যবান!"

'ফিন্টস্টোনস' শেষে 'দ্য পাওয়ার পাফ্‌ গার্লস' শুরু হলো। কোন এক বিচিত্র কারনে এই শিশুতোষ মেয়েলি কার্টুনটাও ওর বেশ ভালোই লাগে।
এমন সময় মোবাইলটা কর্কষ স্বরে বেজে উঠল রাজীবের, অচেনা নাম্বার।
"হ্যালো!"

"হ্যালো, ক্যান আই টক টু রাজীব প্লীজ?"
"স্পিকিং!"
"রাজীব, হাই! আমি তৃণা।"
"তৃণা?"
"এরই মাঝে ভুলে গেছ? কাল পরিচয় হলো মনে আছে? বিয়ার?" মেয়েটার গলায় স্পষ্ট অভিমান! আশ্চর্য তো! ওর ফোন নাম্বার কোথা থেকে পেল!
"হ্যাঁ মনে আছে। কেমন আছ তৃণা?"
"ভালো। শোন, তোমার কাজ আছে কোন আজ বিকালে?"
সতর্ক হয়ে গেল রাজীব, "কেন বল তো?"
"সেটা তো এখন বলা যাবে না! আগে বল কাজ আছে নাকি?"
তৃণা এমনটাই বলবে সন্দেহ ছিল রাজীবের। এখন যদি বলে কাজ নেই তাহলে হয়ত দেখা করতে চাইবে। রাজীবের নীতি গ্রামের চোরদের মত, নিজের মহল্লায় চুরি করেনা ও। তাও মেয়ের বাবা যেখানে ভুঁইয়া সাহেব,
"আজ বিকালে একটু কাজ আছে অবশ্য। কি ব্যাপার শুনি?"
"কাজটা পরে করা যায় না?"
"নাহ্‌, সমস্যা হয়ে যাবে, খুবই জরুরী কাজ। কি হয়েছে বল না আগে শুনি?"
"তোমার কিচ্ছু শোনার দরকার নেই!" রাগ দেখিয়ে দুম করে ফোন রেখে দিল মেয়েটা।
বোকার মত মোবাইল হাতে বসে থাকল রাজীব! ঘটনা কি ঘটল তা ঠিক হজম করতে পারছে না।

বড় করে শ্বাস নিয়ে মোবাইলের বোতাম টিপে রানার নাম্বারটা বের করলো ও। রানা ওর ছোটবেলার বন্ধু। পরিচয় সেই ক্লাস সিক্স এ, বনানী বিদ্যানিকেতনে। এর পরে শাহীন কলেজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সব একসাথে পেরিয়ে দু'জনের কয়লা বন্ধুত্ব আজ হীরকে পরিণত।

রানাকে বলা যায় মেয়েদের চলমান ডেটাবেস। ঢাকার হেন মেয়ে নেই যার সম্পর্কে রানা জানে না। ছেলে হিসেবে সে রাজীবের সম্পূর্ন উল্টো। কমপিউটার বিজ্ঞান থেকে ভাল রেজাল্ট করে এখন সিমেন্সে মোটা বেতনে কাজ করছে। মেয়েঘেষা স্বভাবের ছিটেফোঁটাও নেই ওর মাঝে। ওর শখ কেবল মেয়েদের নিয়ে ঢাকার বাতাসে ওড়া গুজব গুলো সংগ্রহ করে ওর ঝোলা সমৃদ্ধ করা। রাজীব নিশ্চিত যে তৃণা সম্পর্কে রানার কাছে সলিড খবর পাওয়া যাবে।

"কিরে দোস্ত, লাঞ্চ করবি নাকি একসাথে?" ফোন ধরেই উদ্দাম গলায় সুধালো রানা। উত্তর দেবার ধারে কাছ দিয়েও গেল না রাজীব,
"তুই তৃণাকে চিনিস?"
"কেন দোস্ত? কাহিনী কি?" বাঁধ ভাঙা আনন্দ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো রানা।
"কাহিনী বলতেছি। আগে বল চিনিস নাকি?"
"৫টা তৃণাকে চিনি। কোনটার কথা কস্‌?"
এই না হলে রানা!
"ভুঁইয়া সাহেবের মেয়ে।"
"বলিস কি! ভুঁইয়া গ্রুপের ভুঁইয়া!" রানার গলায় বিস্ময়টা স্পষ্ট।
"না তো কি! কয়টা ভুঁইয়াকে চিনিস তুই?"
"কস্‌ কি দোস্‌! কাহিনী কি বল তো?"
"ধুর ব্যাটা! খামাখা কথা প্যাচাস। কইলাম তো পরে কমু। তুই কি জানিস?"
"মেয়ে তো চরম হট দোস্ত। কোকড়া চুল না?"
"হুম!"
"লম্বা, শ্যামলা? বিপাশা বাসুর মত দেখতে?"
"লম্বা, শ্যামলা ঠিক আছে। বিপাশা বাসুর মত দেখতে নাকি বলতে পারবো না!"
"দোস্তওওওওওও... কি করছ তুমি শুনি?"
"কিচ্ছু না। এত খুশি কেন তুই শুনি?"
"মেয়ে তো চরম প্লেয়ার দোস্ত!"
"প্লেয়ার মানে?"
"প্লেয়ার মানে তোমার নারী ভার্সন! বুঝছো? মেয়ে তো দুই দিন পর পর বয়ফ্রেন্ড বদলায়!"
"তাই?"
"হ ব্যাটা! কেউ মাস খানেকের বেশী টিকে না। বাপে চিন্তায় আছে ওকে নিয়ে। ইংল্যান্ডে ফুপুর কাছে পাঠানোর ধান্দায় আছে। মেয়ে যেতে চায় না।"
"কেন?"
"সেইটা আমি কেমনে জানুম। মনে হয় বয়ফ্রেন্ড গুলো ছাইড়া যাইতে মন চায় না।"
"মেয়ের বয়স কত?"
"সিওর জানি না। তবে আই.ইউ.বি. তে বি.বি.এ. পড়ে। থার্ড ইয়ারে। গর্ধভ টাইপ স্টুডেন্ট... ফেইল আর রিটেকের উপরে আছে।"
"তুই এত জানিস কিভাবে?" অবাক হলো রাজীব।
"আরে আমার খালাত বোনটা আছে না, সীমা, ওর সাথে পড়ে। সীমার বাসায় দেখেছি কয়েক বার। দুইটাই গর্ধভ তো, ভালো মিল। আমার কিঞ্চিত ইচ্ছা আছিল মেয়ের সাথে প্রেম করার। গর্ধভ তো, আসল প্রেম চিনে নাই!"
হেসে ফেলল রাজীব, খুলে বলল কি হয়েছে গত রাত্রে।
তৃণা ফোন করেছিল শুনে লাফিয়ে উঠলো রানা,
"দোস্তওওওওওওও! কাহিনী তো বেশ প্যাচ খাইছে!"
"শোন দোস্ত। এটা ভুঁইয়া সাহেবের মেয়ে। বুঝছিস কি বল্লাম? ওর সাথে আমি কিচ্ছু করবো না।"
"আরে ব্যাটা, মেয়ে তো তোকে বিয়া করতে চাবে না। কইলাম না, মেয়ে প্লেয়ার?"
"ডাসন্ট ম্যাটার দোস্ত। আমার পক্ষে সম্ভব না।"
"বুঝছি! শোন আজ এন.এস.ইউর সামনে আসবি না বিকালে? তখন কথা হবে এটা নিয়ে। ঠিক আছে?"
"আচ্ছা!"
"ভালো কথা, এই মেয়ের কিছু ছবি কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক চালাচালি হইছে!"
"কি!"
"ইয়েস। ইন্টারন্যাশনাল কার শোর কিছু ছবি। মেয়ে সেখানে মডেল ছিল। আমার কোন ইমেইলের এটাচমেন্টে এখনও থাকতে পারে। পাঠাবো তোকে?"
"পাঠা!"
"আচ্ছা, পনের মিনিট পরে মেইল চেক করিস। আমি এখন গেলাম।"

লাইন কাটতেই আবার বেজে উঠল রাজীবের মোবাইল। ওপাশ তৃণা বলল,
"রাগ করে ফোন কেটে দিয়েছিলাম। স্যরিইই... তুমি রাগ করনি তো?"




© অমিত আহমেদ

(চলবে)

গন্দম - পর্ব ১ | গন্দম - পর্ব ২ | গন্দম - পর্ব ৩ | গন্দম - পর্ব ৪ | গন্দম - পর্ব ৫ | গন্দম - পর্ব ৬ | গন্দম - পর্ব ৭.১


বি.দ্র.: "এ গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কারও সাথে কোন সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তা নেহায়তই কাকতালীয় হিসেবে গন্য হবে।"]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712481 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712481 2007-05-25 15:30:21
গল্প: গন্দম (পর্ব ৭.১) সময়: রাত ৮:২০-১২:৫৫
কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব

পার্টি রুমে ঢুকেই রাজীবের মনে হলো একটা ভুল হয়ে গেছে, আসার পথে বাসা থেকে একটা ব্লেজার তুলে নেয়া উচিত ছিল। পার্টিতে সবাই বেশ ফর্মাল - পুরুষরা পুরোদমে স্যুটেড-ব্যুটেড, মহিলারা সবাই পাল্লা দিয়ে জমকালো শাড়ি। একটু কম বয়সী মেয়েরা অবশ্য স্কার্ট-টপ দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে। সে তুলনায় ডকারস্‌ ট্রাউজার আর পোলো সার্টে রাজীবকে বেশ ম্রিয়মানই বলা যায়।

পোষাকের চিন্তা বাদ দিয়ে পার্টিতে ঢুকে গেল ও। যা হবার হয়েছে, এখন সবার আগে ভুঁইয়া সাহেবের সাথে আগে দেখা করে জানান দিতে হবে যে সে পার্টিতে এসেছে। ঢুকতেই সাদা-কালো ঊর্দি পরা বেয়ারা পাশে এসে দাঁড়ালো ওর,
"স্যার, শ্যাম্পেন?"
একটা গ্লাস তুলে নিয়ে চারপাশে তাকালো রাজীব, পানীয়ের ব্যবস্থা থাকবে সেটা নিমন্ত্রণপত্র দেখেই বোঝা গেছে, সঙ্গত কারনেই পার্টিতে অপরিনত কাউকে দেখা যাচ্ছে না... লোকজনও তেমন বেশী নয়, সব মিলিয়ে প্রায় দু'-আড়াইশো। ভুঁইয়া সাহেব সম্ভবত খুব কাছের মানুষ ছাড়া কাউকে নিমন্ত্রণ করেননি।

একটু পরেই ভুল ভাঙলো রাজীবের, কাছের মানুষ নয় তিনি নিমন্ত্রণ করেছেন সব গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেই দুই মন্ত্রী, এক উপমন্ত্রীকে দেখে ফেলল ও। বাকি সবাই স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। রাজীবের প্রায় সবার সাথেই কম বেশী পরিচয় আছে। তাঁরা এখনও রাজীবকে রহমান সাহেবের ছোট ছেলে হিসেবেই দেখেন, তিস্তা গ্রুপের এক্সিকিউটিভ হিসেবে নয়। এরকম পার্টিতে যা হয়, সবাই ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। এমন একটা গ্রুপে ঢুকতেই ভুঁইয়া সাহেবের দেখা পেল ও। রাজীবকে দূর থেকে দেখেই চিনে ফেললেন তিনি, হেসে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন,
"তৃতীয় রহমান, ঠিক তো?"

"জ্বী, স্লামালেকুম" হেসে হাত বাড়ালো রাজীবও, "আমার নাম রাজীব।" বয়স প্রায় সাতান্ন হলে কি হবে ভদ্রলোকের পাঞ্জার জোর আছে। চেহারা দেখে অবশ্য পঞ্চাশের উপরে বলার যো নেই। শ্যাম বর্ণ, টানটান ছয় ফিট লম্বা, টেইলর্ড ছাইবর্ণ স্যুটে চমৎকার মানিয়ে গেছেন।

"চমৎকার, তাও তো কোন এক রহমানের দেখা মিলল আমার পার্টিতে। তা হাজী সাহেব আছেন কেমন?"
ভাইয়া ব্যবসায় বসার পর থেকে অবসরের সুযোগে প্রায় নিয়মিতই হজ্জ্বে যাচ্ছেন বাবা-মা। তাই মজা করে অনেকেই হাজী সাহেব ডাকা শুরু করেছেন বাবাকে।

"জ্বী ভাল। আপনাকে বিবাহবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাবা-মা আর ভাইয়া।"

"আর বিবাহবার্ষিকী! এসব পার্টি আমার কাছে একদমই ছেলেমানুষী লাগে, কেবল তৃণার চাপাচাপিতে পার্টিটা দিতে হলো।"

হাসলো রাজীব। এসব টুকটাক পারিবারিক আলাপে তেমন স্বাচ্ছন্দবোধ করে না ও তাই সরাসরি কাজের কথায় চলে গেল, "আঙ্কেল, মার্সেল কি এসেছে!"

"আসেনি মানে! ডিনার সার্ভ করার আগেই সে অর্ধ-মাতাল হয়ে বসে আছে। তবে জার্মান তো, জাতে মাতাল হলেও ওরা তালে একদম ঠিক। দেখবে মিটিংয়ে একটা আঙ্গুল পর্যন্ত কাঁপবে না।"

"মিটিংটা হবে কখন?"

ওর পিঠে গুরুজনের মত হাত রাখলেন ভুঁইয়া সাহেব, "আরে হবে হবে... এত তাড়াহুড়ার কি আছে! রাত তো সবে সাড়ে আটটা। ডিনার সার্ভ করা হোক, ভীড়টা একটু হালকা হোক, এরপরে। তুমি পার্টি এনজয় করো, মিটিং এর সময় হলে তোমার কাছে ঠিকই খবর চলে যাবে।"

"জ্বী, আঙ্কেল!"

"তোমার জন্য একটু সমস্যাই হয়ে গেছে তাই না? সব বুড়ো ব্যবসায়ীদের ভীড়ে?" হেসে বললেন ভুঁইয়া সাহেব, "কি করবে বল, ব্যবসায় ঢুকে পড়েছ, এখন এগুলো তো সহ্য করতেই হবে!"

"জ্বী, আঙ্কেল!"

"তবে তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। তুমি অন্য রহমানদের চেয়ে একটু আলাদা তাই না?" রাজীবের বাম হাতে ধরা গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন ভুঁইয়া সাহেব। ইঙ্গিতটা বুঝে মুচকি হাসলো রাজীব।
"তোমার আন্টির সাথে পরিচয় হয়েছে?"

"জ্বী না"

"বল কি! যার সাথে আমার হাজতবাসের রজতজয়ন্তী তার সাথেই পরিচয় হয়নি? এ তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ! চল চল আগে পরিচয় পর্বটা সারা যাক।" রাজীবের বাহু ধরে অন্য একটা গ্রুপের দিকে নিয়ে চললেন ভুঁইয়া সাহেব।


***


পার্টি থেকে কোন মতে পালিয়ে প্যাটিওতে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো রাজীব। ভেতরে ওকে নিয়ে "ওমা", "এ তো বাচ্চা" এসব বলে আদিখ্যেতার একশেষ হয়েছে, বিশেষ করে মহিলা মহলে। মাত্র পঁচিশ বছরের একটা ছেলে মিটিং করতে এসেছে এটা নিয়েই সবাই আপ্লুত। এদিকে মিসেস ভুঁইয়ার আফসোস কেন তাঁদের কোন ছেলে নেই। থাকলে এত বড় ব্যাবসা ভুঁইয়া সাহেবকে একা টেনে নিয়ে যেতে হয় না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল ওর। এছাড়া এ ধরনের পার্টি গুলোতে ও ঠিক স্বাচ্ছন্দ বোধ করেনা। বাবা-মার সামনে ছেলে-মেয়ে ড্রিংক করছে এটা ওর পারিবারিক সংস্কারের সাথে ঠিক খাপ খায় না। বাবা-মা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। ভাইয়া নিয়মিত না হলেও চেষ্টা করেন ঠিকই। রহমান পরিবারে মদ-সিগারেটের মত বদঅভ্যাস গুলো ঢুকেছে ওর মাধ্যমেই। ভুঁইয়া সাহেব তখন সে ইঙ্গিতই করছিলেন। বাব-মার বিন্দুমাত্র ধারনা নেই ওর বদ অভ্যাস গুলো নিয়ে, জানলে বাসায় ঠাঁই হবে না ওর।

পার্টি এখন বেশ জমে গেছে। এক দিকে হাউজি খেলা চলছে, অন্য দিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে চলছে জে.এম.বি. আর শায়খ রহমানের গ্রেফতার নিয়ে চরম আড্ডা। জাদুকর জুয়েল আইচ সাহেবও আজকে আমন্ত্রিত, উনি এক পাশে মহিলাদেরকে হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাচ্ছেন। একটু কম বয়সীরা সবাই মাঠে এসে বসেছে, গীটার বাজিয়ে গান হচ্ছে সেখানে।

মার্সেলের সাথে একটু আগেই দেখা হয়েছে ওর। ভুঁইয়া সাহেব ঠিকই বলেছিলেন, ওয়েল ট্যাঙ্কারের মত লোকটা লিকার গিলেই চলেছে। ঘড়ি দেখলো রাজীব, সাড়ে দশটা বেজে গেছে। মিটিংটা হবে কখন কে জানে। একটা সিগারেট ধরাতেই গলা ভেজাবার তাগিদ বোধ হলো রাজীবের... বেরুবার সময় কিছু একটা নিয়ে বেরুনো দরকার ছিল।

প্যাটিও থেকে ছেলেমেয়েদের গিটারের সাথে নাচ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পার্টিটা অন্য কারও হলে রাজীবও ওখানেই থাকত। ওর মেয়েঘেঁষা দূর্নামটা এমনি এমনি ছড়ায়নি। ওর চেষ্টাই থাকে খুঁতহীণ চেহারাটা (মাঝে মাঝে ক্রেডিটকার্ড) ব্যবহার করে মোবাইলে মেয়েদের নাম্বারের সংখ্যা বাড়নো। তবে একটা নীতি ও সব সময় মেনে চলে সেটা হলো কারও সাথে কখন কমিটমেন্ট যাওয়া নয়, কেউ চাইলেও সে আস্তে করে সরে পড়ে।

"বিয়ার?"

হঠাৎ প্রশ্নে চমকে গেল রাজীব। জিনস্‌-টপ পরা হ্যাংলা-পাতলা একটা মেয়ে হাতে দু'টো বিয়ারের ক্যান ধরে আছে। মেয়েটার চেহারাটা খুব পরিচিত মনে হলো ওর কিন্তু কোথায় দেখেছে তা মনে করতে পারলো না ও।

"অবশ্যই!" ক্যানটা নিতে নিতে বলল রাজীব, "সত্যি কথা বলতে কি, এখন একটা বিয়ারের অভাবই অনুভব করছিলাম।"

খিলখিল করে হেসে উঠলো মেয়েটা, "তুমি তো খুব মজার বাংলা বল, 'অনুভব করছিলাম'... হোয়াট ড্যাজ দ্যট ইভেন মিন?"

উত্তর না দিয়ে হাসলো রাজীব।

"শোন, আমার নাম তৃণা। তোমার নাম কি?" প্রশ্নটা আসলো ইংরেজীতে। এই একটা নতুন ফ্যাশন হয়েছে, বাবা-মা ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবেন আর ছেলে-মেয়েরা দিব্যি বাংলা ভুলে ইংরেজীর আরাধণা শুরু করবে। বাবা-মার কাছে অনেক ঋণী রাজীব যে এই গড্ডালিকা স্রোতে তাঁরা গা ভাসাননি। রাজীব নিঃশ্চিত যে বাংলা ভাল না জানলে কি হবে, হিন্দি গানের কথা লাইন ধরে ঠিকই মুখস্ত এই মেয়ের।

"আমার নাম রাজীব। তুমি তো ভুঁইয়া সাহেবের মেয়ে, তাই না?" মেয়েটার চেহারা এত পরিচিত লাগছিল কেন সেটা এখন ধরতে পেরেছে ও। তৃণার চেহারা একদম ওর মা, মিসেস ভুঁইয়ার মত! মিসেস ভুঁইয়াকে কম-বেশী ওর মার মতই লেগেছে রাজীবের, ঘরমুখী। স্বামী-সন্তানের গতিশীলতার সাথে তাল মেলাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে ক্লান্ত।

"ইয়াপ, আমার বাবা। তুমি ব্যস্ত? আমাদের সাথে বসবে ওখানে?" হাত তুলে প্যাটিওর পেছনের দিকটা দেখাল তৃণা। সেখানে আরও দু'টো মেয়ে আর একটা ছেলে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। হাসল রাজীব, ঘটনা এখন পরিষ্কার হলো। তৃণা এখন ওকে ওর বন্ধুদের কাছে নিয়ে যাবে। বন্ধুরা ওকে ওই সব প্রশ্ন জিজ্ঞাস করবে যেগুলো তৃণার জিজ্ঞাস করতে বাধবে। এর পর যা হবার আপনা আপনি হবে, শেষমেষ চিরন্তন ফোন নাম্বার বিনিময়। কিন্তু এখন রাজীবের মোটেই ইচ্ছে নেই ভুঁইয়া সাহেবের মেয়ের সাথে কিছু করার - ঝামেলা হয়ে যাবে। কিভাবে সুন্দর করে "না" বলা যায় ভাবছে রাজীব, সে সময় চিন্তা থেকে মুক্তি দিল উর্দি পরা পরিচিত বেয়ারা, এগিয়ে এসে মুখ কানের কাছে এনে বলল,
"স্যার, ভুঁইয়া সাহেব মিটিংয়ে বসেছেন।"

"আচ্ছা, তুমি একটু আমার ড্রাইভারকে বলো আমার ব্রীফকেসটা নিয়ে আসতে, ঠিক আছে?"
মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে সরে গেল বেয়ারা। তৃণার দিকে ফিরে বলল রাজীব,
"পরিচিত হয়ে খুব ভাল লাগলো তৃণা, বাট নাউ আই রিয়েলি হ্যাভ টু গো!"



© অমিত আহমেদ

(চলবে)

গন্দম - পর্ব ১ | গন্দম - পর্ব ২ | গন্দম - পর্ব ৩ | গন্দম - পর্ব ৪ | গন্দম - পর্ব ৫ | গন্দম - পর্ব ৬


বি.দ্র.
(১) ৭ম পর্ব বেশী বড় হয়ে যাওয়ায় দুই ভাগে ভাগ করা হলো।
(২) যেহেতু এখন গল্প বাংলাদেশের পটভুমিকায় আমার একটা ডিসক্লেইমার দিয়ে দেয়া উচিৎ, "এ গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কারও সাথে কোন সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তা নেহায়তই কাকতালীয় হিসেবে গন্য হবে।"

ধন্যবাদ!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712346 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28712346 2007-05-24 14:18:54
গল্প: গন্দম (পর্ব ৬)

***

২ মার্চ, ২০০৬
সময়: সন্ধ্যা ৭:০০-৭:৪০
অফিস - তিস্তা গ্রুপ, মহাখালী

ভাইয়ার রুমে ঢুকে বসবে নাকি বসবে না সেটা নিয়ে একটা দ্বিধায় পড়ে গেল রাজীব, ভাইয়া ফোনে কথা বলছে। কথা বলতে বলতেই চোখের ইশারায় ওকে বসতে বললেন তিস্তা গ্রুপের এ.এম.ডি. সজীব রহমান। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো ও। এখন বাজে প্রায় সন্ধ্যা সাতটা, সাধারণত সাড়ে ছটার মধ্যেই ও অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, ভাইয়াও এটা জানেন, তাহলে এখন হঠাৎ রুমে জরুরী তলব কেন? আজ দুপুরে মিরপুরের স্যুয়েটার ফ্যাক্টরীতে স্যাম্পল পাঠাতে দেরি হয়ে একটা ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে সমস্যার সমাধানটাতো ও নিজেই করেছে! সেই কাহিনী তুলে এখন আবার বকা দেবার পায়তাড়া চলছে নাকি?

রাজীবের বড় ভাই সজীব ওর চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড়। দু'জনের সম্পর্কটা প্রায় বন্ধুর মত। একটা সময়ে ছিল যখন ওদের বিনোদন মানেই ছিল মারামারি করা। বাবা-মার চিন্তার শেষ ছিল না তখন ওদের নিয়ে। এক্ষুনি হয়তো দু'জনে মারামারি-ফাটাফাটি হয়ে গেল, একটু পরেই আবার দেখা যাবে দু'জনে বসে গভীর মনোযোগে দাবা খেলছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সম্পর্কটা কেবল গাড়ই হয়েছে। এক সাথে আড্ডা, সিনেমা দেখা কিংবা ভিডিও গেম খেলাটা এখনও তুমুন ভাবেই হয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে সবসময় একটা অদৃশ্য টান আর পক্ষপাতিত্ব কাজ করে। ওর যে কোন ঝামেলায় ও নিঃসন্দেহে জানে ভাইয়া পাশে আছে, ভাইয়ার যে কোন সমস্যায় ও।

তবুও এখন খেয়াল করে দেখেছে ভাইয়ার রুমে আসলেই ওর মাথায় নানান দুঃশিন্তা ভর করে। নর্থ সাউথে পড়ার সময় যখন ওর টাকা চাইতে ভাইয়ার কাছে আসা পড়তো তখন মনে বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করতো না। এটা শুরুই হয়েছে বাবার ব্যবসায় বসতে শুরু করার পর থেকে। বাবার রুমে ঢুকতে ওর সব সময়ই ভয় লাগত, সেই ভয়টা আসে বাবার প্রতি সন্তানের আজন্ম শ্রদ্ধা থেকে। ভাইয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্য রকম, এখানে ভয়ের চেয়ে বেশী কাজ করে আশঙ্কা... এই বুঝি ভাইয়া ভেবে বসল ছোট ভাইটা কোন কাজের না! ভাইয়া ওকে নিয়ে কি ভাবল এটা যে কোন কিছুর কাছ থেকে ওর কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ!

নিজেকে নিজে প্রোবোধ দিল রাজীব, আড্ডা মারতে ডেকেছে ভাইয়া। নির্ঘাত ঈশিকা আপুর সাথে ঝগড়া হয়েছে তাই নিয়ে কথা বলবে।

চার মাস হলো নর্থ সাউথ ছেড়েছে ও, কিন্তু নর্থ সাউথের সামনের আড্ডাটা এখনও ছাড়তে পারেনি। সাড়ে সাতটার সময় নিপুন, রানা, তমাল, ফয়সালের সাথে দেখা করার কথা। আড় চোখে একবার ঘড়িটা দেখতে গিয়েই ধরা পড়ে গেল রাজীব। মাউথপিসে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন ভাইয়া,
"কিরে? কাজ আছে তোর? দেরি হয়ে যাচ্ছে?"
মেরুদ্বন্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল ওর, মাথা নেড়ে "না" বলল ও। ভাইয়ার গলা বেশ সিরিয়াস, গপ্‌-সপের মুডে আছে বলে মনে হয় না। আজকের আড্ডাটা গেল।

সময় কাটাতে ফোনে কার সাথে কথা হচ্ছে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলো ও। ভাইয়ার সাথে কাজ করে এই আন্দাজ করার কাজটা বেশ ভালই শিখেছে ও।

ভাইয়া বেশ চোস্ত ইংরেজীতে কথা বলছে। তার মানে বিদেশী কেউ, 'বায়ার' হবার সম্ভাবলা বেশী, কারন বেশ কয়েকবার 'রেট পার পিস' বলতে শুনল রাজীব। উপমহাদেশের কেউ হবার সম্ভাবনা কম, কারন ওদের সাথে কথা বলার সময় সবসময়ই ইংরেজীর সাথে কিছুটা বাংলা-হিন্দী মিশিয়ে দেন ভাইয়া। এশীয়ার অন্য কোন দেশেরও হবার কথা না। কারন চীনা হোক, জাপানী হোক আর কোরীয়ান হোক, এশীয়ান মানেই বিচ্ছিরি ইংরেজী, ওদের সাথে অনেক ধীরে সহজ ইংরেজীতে কথা চালাতে হয়। ব্রিটিশ বা আমেরিকান বলেও মনে হচ্ছে না, কারন ভাইয়াকে মাঝে মাঝেই দু'একটা কথার পূণরাবৃত্তি করতে হচ্ছে। প্রথম ভাষা ইংরেজী এমন কারও কথাগুলো এক বারেই বুঝে নেবার কথা। শেষ সম্ভাবনা থাকে ইউরোপীয়ান, ওদের ইংরেজী ভাল না হলেও কথা বলতে হয় আমেরিকান অথবা ব্রিটিশ টানে।

ফোন রেখে সটান ওর দিকে তাকালেন সজীব, "আজ তোর আড্ডা দিতে যাওয়া হচ্ছে না। তোর দোস্তদের কল করে দে।"

"পরে করলেও হবে" মিনমিনে গলায় বলল রাজীব, "কি হয়েছে ভাইয়া? স্যাম্পলের ঝামেলাটা কিন্তু মিটে গেছে!"

"কোন স্যাম্পল?" অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন সজীব, পরক্ষণেই ধরতে পেরে মাছি তাড়াবার মত ভঙ্গী করলেন তিনি, "আরে ধুর, ওটা আমি আগেই শুনেছি। তোকে ডেকেছি অন্য কারনে। কথা বলছিলাম মার্সেলের সাথে, ওর কথা মনে আছে তোর?"

মুচকি হাসলো রাজীব, মার্সেল জার্মানীর বায়ার। একটা বড় বহজাগতিক পোষাক কোম্পানীর মিডলম্যান হিসেবে কাজ করে। ওর কাজই হলো সস্তায় মাল কিনে ওর কোম্পানীকে সাপ্লাই দেয়া। ও যত সস্তায় মাল কিনবে ততই ওর লাভ, কারন ওর কোম্পানী ওকে একটা নির্দিষ্ট দামই পরিষোধ করবে দিন শেষে। কয়েক দিন আগেই ওদের ফ্যাক্টরীতে এসেছিল, উইন্টার এন্ডিং ধরতে হালকা স্যুয়েটারের অর্ডার দিতে চায়।

"মার্সেল ওদের কাজটা আমাদেরকেই দিতে চাচ্ছে, কিন্তু পিস প্রতি বলছে ১৫, আমি বলেছি ২০ এর কমে সম্ভব না। ফাইনাল কথা বলতে আজ গলফে ডেকেছে।"

অবাক হলো রাজীব, "গলফে না আজ ভুঁইয়া সাহেবের পার্টি?"

হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন সজীব, "আরে এইটাই তো মজা! ভুইয়া সাহেবের সাথে গত বছরের ঝামেলাটার কথা বলেছিলাম না তোকে মনে আছে?"

মাথা নাড়লো রাজীব, ভালমতই মনে আছে ওর, আমেরিকান একটা কোম্পানি ৫০% কাজ ওদের আর ৫০% কাজ ভুইয়াকে দিয়েছিলেন। পরে দু' ফ্যাক্টরীর কাজ মিলিয়ে দেখে কোম্পানী আর পরের ডিলটা ভুইয়াকে দেয়নি। ওদের কোনই দোষই নেই কিন্তু ভুঁইয়া সাহেব সব সময় এর জন্য ওদেরকেই দোষ দিয়ে এসেছেন। সেই থেকে ঝামেলার শুরু।

এই ব্যবসা জিনিসটা খুবই মজার, এইযে এত ঝামেলা দুই গ্রুপে, তবুও যে কোন অনুষ্ঠানে একে অন্যকে নিয়ম বেঁধে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। আজ ভুঁইয়া সাহেবের ২৫তম বিবাহ বার্ষিকির নিমন্ত্রণ কার্ডটা সেই এক হপ্তা আগেই অফিসে জমা পড়েছে। নিয়ম মতে অফিস থেকে দামী একটা গিফট্‌ ওখানে পৌঁছে যাবার কথা।

"ভুঁইয়া সাহেব আজ মার্সেলকেও নিমন্ত্রণ করেছেন। সেখানে তাঁরাও ডিলটা বাগানোর চেষ্টা করবেন। ভুঁইয়া সাহেব নাকি মার্সেলকে বলেছেন আজ ওখানে এক সাথে বসে তিন পার্টি মিলে আলোচলা হোক। ভুঁইয়া সাহেব ভালো মতই জানেন উনার পার্টিতে আমি অথবা বাবা কেউ যাব না। মার্সেলের তো আর সেটা জানা নেই। আর আমিও কিছু বলিনি, এ ধরনের ছেলেমানুষি কোন্দল আমি বাইরে বলা পছন্দ করি না, এতে রেপুটেশন কমে বই বাড়ে না।"

ভাইয়ার দূরাভিসন্ধী বুঝে গেল ও, গলায় ঝাঁঝ এনে বলল, "দেখ ভাইয়া, এটা মোটেই ঠিক না, তোমরা যাবে না ঠিক আছে, আমি কেন যাব!"

"আরে বোকা, যেয়ে দেখই না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন কত কাজ আমাদেরকে ব্যবসার খাতিরে করতে হয়। আর তোকে একটা গোপন কথা বলি, আমার ইচ্ছা ভুঁইয়া সাহেবের সাথে ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলার। আমার ব্যক্তিগত ভাবে উনাকে চমৎকার লাগে। প্রথম যখন বাবার ব্যবসায় ঢুকেছি, একবার ব্যাঙ্কে গিয়ে কি সমস্যা! আমি যে চেক এনেছি সে অ্যাকাউন্টে নেই টাকা! ব্যাঙ্কের ম্যানেজার আবার তখন আমাকে চেনেন না, বলেন, 'আপনার বাবাকে কল দেন... উনার সাথে কথা বলি!' তখন বাবাকে কল দেয়া সম্ভব বল? বাবা একটা কথাই বলবেন, 'এম.বি.এ করে এই শিখেছ!' এদিকে আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার তক্ষুনি। সে সময় ভুঁইয়া সাহেবও ম্যানেজারের রুমে, তিনি কি বুঝলেন কি জানে কোন কথা না বলে একটানে পঞ্চাশ হাজারের একটা চেক লিখে দিলেন। বললেন, 'ম্যানেজার আমার অ্যাকাউন্ট নাম্বার জানেন, কাল টাকা জমা না পড়লে আমি কিন্তু রহমান সাহেবকে কল দেব!"

এ ঘটনা জানা ছিল না রাজীবের।

"শোন, তুই না গেলে ভুঁইয়া সাহেব পুরো ডিলটাই নিয়ে নেবেন, আর তুই গেলে তাঁর চেষ্টা থাকবে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ কাজ হাতিয়ে নেবার। আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। আমরা আমেরিকার কাজ গুলো নিয়ে এমনিতেই ব্যস্ত, মেশিন গুলোও সব রানিং। জার্মানীর কাজটা পেলে সেটা হবে উপড়ি।"

অসোন্তোষ নিয়ে গুম হয়ে বসে থাকলো রাজীব, বোঝাই যাচ্ছে ভাইয়ার ডিসিশন নেয়া হয়ে গেছে, এখন তর্ক করে লাভ নেই। ওর মনে ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে কাজটা ওকে দেয়া হচ্ছে ওকে পরীক্ষা করার জন্য। এমন একটা জায়গায় পাঠানো হচ্ছে যেখানে হারাবার কিছু নেই। ব্যাপারটা অনেকটা এমন - যদি কিছু করতে পার তাহলে বোঝা যাবে তোমাকে দিয়ে 'ডিল ক্লোজ' করা হবে, আর না পারলে তুমি এখনও তৈরী না... আরও কিছু দিন ভাইয়া-বাবার সাথে সাথে খাতা-বই নিয়ে ঘোরাঘুরি কর।

"এখন সোজা তোর রুমে চলে যা। ম্যানেজার চাচাকে কিছু ফাইল তোর টেবিলে দিতে বলেছি, একটু চোখ বুলিয়ে নে। আটটার দিকে রওনা দিয়ে দিস!"

"ওকে!"

"আরেকটা জিনিস, যখন রেট নিয়ে কথা হবে তখন কিন্তু তোকে আর ভুঁইয়া সাহেবকে এক সাথে কাজ করতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখিস। আমরা সতেরোর নিচে পারবো না। আমার মনে হয়না ভুঁইয়া সাহেবও এর নিচে যেতে পারবেন। যদি যান, তাহলে কনগ্রাচুলেট করে চলে আসিস, ওকে?"

"ওকে!"

"আর শায়খ রহমান ধরা পড়েছে জানিস?"

হঠাৎ বিষয়ের পরিবর্তনে কথাটা ঠিক ধরতে পারলো না রাজীব, "হুম্‌?"

"জে.এম.বি.র আমির, শায়খ রহমান... ধরা পড়েছে!"

"ওহ্‌ হ্যাঁ, টি.ভি রিপোর্ট দেখলাম।"

অবাক হলেন সজীব, "টি.ভি রিপোর্ট? তোর রুমে টি.ভি. লাগিয়েছেন নাকি বাবা?"

কান লাল হয়ে রাজীবের, "ইয়ে... না... মানে... কমপিউটারে... টি.ভি. কার্ড..."

ট্রেড মার্কড মাছি তাড়াবার ভঙ্গী করলেন ভাইয়া, "বুঝেছি! যাহ্‌ এখন... আর শোন, যাবার আগে ভুঁইয়া সাহেবের গিফট্‌টা নিয়ে যাস্‌!"

নিজের রুমে ঢুকে নিজেকে নিজের চড় মারতে ইচ্ছে করলো ওর। কি পরিমান গর্ধভ হলে টি.ভি. কার্ডের কথাটা মুখে চলে আসে।
দরজা খুলে একটা ফাইল নিয়ে ঢুকলেন ম্যানেজার চাচা। চিরকুমার মানুষ, পনের বছর হলো ওদের সাথেই আছেন, সজীব-রাজীবকে নিজের ছেলের মতই স্নেহ করেন তিনি, "রাজু, ৩ থেকে ৫ নম্বর পাতা গুলো কিন্তু ভালো মত পড়তে হবে। গিফ্‌ট আর ইনভাইটেশন কার্ড তোমার গাড়িতে রাখা আছে!" বাবার পরে অফিসের একমাত্র তিনিই সজীব-রাজীবকে সাজু আর রাজু বলে ডাকার অধিকার রাখেন।
"আচ্ছা!"
চাচা বেড়িয়ে যেতেই মোবাইল বেজে উঠলো ওর, ফয়সাল নিঃসন্দেহে! কে কল করেছে না দেখেই কল রিসিভ করলো ও, "দোস্ত, আজ আর আইতে পারুম না রে। বিশাল ক্যাচালে পড়ছি!"



© অমিত আহমেদ

(চলবে)

গন্দম - পর্ব ১
গন্দম - পর্ব ২
গন্দম - পর্ব ৩
গন্দম - পর্ব ৪
গন্দম - পর্ব ৫


বি.দ্র. এক প্রজেক্টের কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটা কাজে হাত দিতে হলো। তবে প্রেশারটা অনেক কমেছে। "গন্দম" এখন থেকে আবার নিয়মিত আসবে আশা রাখি। যাঁরা অধমের লেখার জন্য অপেক্ষা করেছেন তাঁদেরকে সহস্র প্রনাম!

ধন্যবাদ!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28711626 http://www.somewhereinblog.net/blog/aumitblog/28711626 2007-05-20 16:56:39