somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের ?আওয়ামীকরণ? দ্রুত এগিয়ে চলেছে

২৪ শে মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের ?আওয়ামীকরণ? দ্রুত এগিয়ে চলেছে
সিরাজুর রহমান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনসাধারণকে যথোপযোগী সেবাদান ও তাদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তার সরকার সমস্যায় পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান ১২ মার্চ সচিবদের কাছে চিঠিতে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি উদ্বেগ জানিয়েছেন যে, মন্ত্রী দফতরগুলো প্রয়োজনীয় দ্রুততার সাথে তাদের কর্তব্য পালন করছে না। প্রধানমন্ত্রী লক্ষ করেছেন, বিভিন্ন মন্ত্রী দফতর সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং সমস্যা সমাধান করতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করছে।’
মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান তার চিঠিতে সচিবদের শাসিয়েছেনঃ ‘বিলম্বগুলো কি ইচ্ছাকৃত, না অনভিজ্ঞতার কারণে ঘটছে, সেটা আপনাদের ভেবে দেখতে হবে।’

মন্ত্রী দফতরগুলো এবং মন্ত্রীরা যে জনসাধারণকে সেবাদান এবং সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যথোপযুক্ত দ্রুততার সাথে কাজ করছেন না সেটা এবং তার কারণগুলোও জনসাধারণের কাছে খুবই স্পষ্ট। তারা জানে, যেকোনো মন্ত্রী দফতরের প্রধান ব্যক্তি স্বয়ং মন্ত্রী। সব সিদ্ধান্তের উৎস তিনিই, তার জের ধরেই সচিব ও পরবর্তী পর্যায়গুলোর তৎপরতা শুরু হয়।

হাবভাবে স্পষ্ট, বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা ধরে নিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর মনোতুষ্টি, মিডিয়ায় নিজের চেহারা দেখানো আর কণ্ঠস্বর শোনানোই নিজেদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। কথায় কথায় ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’ বলতে বলতে প্রায়ই তাদের মুখের থুথু শুকিয়ে যায়। কারণে-অকারণে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে তারা বিদেশী কূটনীতিক, অভ্যাগত, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এবং এফবিআই’র সার্জেন্ট, সাব-ইন্সপেক্টরদের দর্শন করেন। তারপর তারা অনিবার্যভাবেই অপ্রয়োজনীয় সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সম্পূর্ণ অবাস্তব, অপ্রয়োজনীয় এবং প্রায়ই পরস্পরবিরোধী বিরাট বিরাট বিবৃতি দেন।

এ ব্যাপারে মন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রণী হচ্ছেন লে. কর্নেল (অবঃ) ফারুক খান। তার একটা ভ্রান্ত ধারণা, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেই মানুষ তার কথা বিশ্বাস করবে। শুনেছি, ফারুক খান বাণিজ্যমন্ত্রী। বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটে বাণিজ্য সব দেশেরই একটা বড় মাথাব্যথা এখন। ডাকসাঁইটে বাণিজ্যমন্ত্রীরাও বাণিজ্য বৃদ্ধির চেষ্টায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। ফারুক খান বাণিজ্যের ব্যাপারে কিছু করতে পারছেন কি না সন্দেহ। মনে হচ্ছে, বিডিআরে প্রায় ৭০ জন উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তার নৃশংস হত্যার তদন্তে যাতে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে না পারে, প্রকৃত অপরাধীরা ধরা না পড়ে; সে চেষ্টাতেই তিনি দিবারাত্রি অতিবাহিত করছেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি সেনাকর্মকর্তাদের প্রথম কিস্তি হত্যার পর খুনি বলে অভিযুক্ত ১৪ ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে তার সাথে দেখা করেছিলেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী খুনিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজম বধ্যভূমি বিডিআর সদর দফতরে যান। দ্বিতীয় কিস্তি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় তার পর। রাতের অন্ধকারে সাহারা খাতুন আবারো বধ্যভূমিতে গিয়েছিলেন এবং তার সেখানে অবস্থানের সময় তৃতীয় দফা হত্যাকাণ্ড চলে বলে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে সেনা কর্তৃপক্ষ বারবার বিদ্রোহ দমনের সরকারি অনুমতি চেয়ে হতাশ হয়েছে।

তদন্ত বিপথগামী করার চেষ্টা
সরকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নেতৃত্বে যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল, সেটা সেনাবাহিনীর মনঃপূত হয়নি। তাই সরকার তড়িঘড়ি সাবেক আমলা আনিসুজ্জামান খানের নেতৃত্বে নতুন একটা তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্পষ্টতই সেনা কর্তৃপক্ষ এতেও খুশি হয়নি, কেননা তারাও পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সব সৎ ও সাধু ব্যক্তি আশা করেন, তদন্তগুলো সত্বর সমাধা হবে এবং প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।

এ দিকে কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান প্রতিদিনই গলা ফাটাচ্ছেন। চিৎকার করে একেক দিন একেক দল বা গোষ্ঠীকে অপরাধী বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। শুনেছি, বিভিন্ন তদন্তের মধ্যে সংযোগ রক্ষা তার একমাত্র দায়িত্ব। কার্যক্ষেত্রে তিনি একজন ক্ষ্যাপা বিচারকের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। তদন্ত শেষ হওয়ার এবং ফলাফল প্রকাশের আগেই তিনি রায় দিয়ে দিচ্ছেন? একেক দিন একেক রকম।
প্রধানমন্ত্রী নিজে যদি না বোঝেন তাহলেও তার কোনো না কোনো উপদেষ্টা নিশ্চয়ই তাকে বলেছেন, এতে তদন্তকে প্রভাবিত করা এবং প্রকৃত সত্য উদ্?ঘাটনের অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে বিপথগামী করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের আইনে এটা কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা যখন ফারুক খানকে সংযত করার চেষ্টা করছেন না, তখন জনসাধারণের মনে এ ধারণা সৃষ্টি হতে বাধ্য যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রকৃত সত্য উদ্?ঘাটন এবং সেনাকর্মকর্তাদের নৃশংস হত্যার প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করতে চান না।

এই একটিমাত্র দৃষ্টান্ত থেকেই বোঝা যাবে, বিভাগীয় দায়িত্ব পালনের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর আরোপিত রাজনৈতিক কর্তব্য পালন, প্রধানমন্ত্রীর মনোরঞ্জন এবং জনসংযোগেই মন্ত্রীদের সময় বেশি অতিবাহিত হচ্ছে। সচিবরা অভিজ্ঞ ও সুদক্ষ, সর্বোপরি নিরপেক্ষ হলে তারা মন্ত্রীদের অদক্ষতা ও অবহেলা বহুলাংশে পূরণ করতে পারতেন। কিন্তু হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সে আদর্শ পরিস্থিতি অসম্ভব করে রেখেছে।
সচিবদের কাছে ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লার চিঠির মাত্র কয়েক দিন আগেই শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি সরকার প্রশাসন দলীয়করণ করতে গিয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল যে, তার পক্ষে সরকার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রশাসন এখনো পুরোপুরি ‘আওয়ামীকৃত’ হয়নি।

চারদলীয় জোট এবং বিএনপি’র কপাল ভালো, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের এই নিষ্ত্র্নিয়তা কিংবা অলসতা কিংবা ব্যর্থতার জন্যও প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর দোষ চাপাননি। কোনো কোনো পত্রিকায় সম্প্রতি পড়ছিলাম? সচিবালয়ে গুঞ্জন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে পরিকল্পনা ও নির্দেশের তুবড়ি ফুটছে খইয়ের মতো; এর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে মন্ত্রী ও আমলারা হিমশিম খাচ্ছেন।
অসাংবিধানিকও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অজস্র দফায় শত শত জ্যেষ্ঠ আমলাকে বারবার বদলি করা হয়েছে, প্রায় প্রতি সপ্তাহে তাদের নিয়ে ঘুঁটি চালাচালি করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই আমলাকে এক মাসের মধ্যে দু-তিনবার বদলি করা হয়েছে। বহু শীর্ষ আমলাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসর দেয়া (ছাঁটাই করা) হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারও মাত্র সে দিন ৫৬ জন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে কলমের এক আঁচড়ে জমিতে বীজ ছড়ানোর মতো ছিঁটিয়ে দিয়েছে। জানুয়ারি মাসে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় ডজনে ডজনে, কুড়িতে কুড়িতে বিসিএস আমলার বদলি, ছাঁটাই ইত্যাদির খবর ছাপা হচ্ছে। প্রতি বছর স্বাভাবিক পদ্ধতিতেও যথাসময়ে অবসর নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক আমলা। চারদলীয় সরকারের আমলে কিছু দলীয়করণ যদি হয়েও থাকে, তাহলে এখন আর প্রশাসনের ওপর তার লক্ষণীয় প্রভাব অবশিষ্ট থাকার কথা নয়।

শিক্ষানবিস ডিক্টেটর
অথচ সুশাসনের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে একটি দক্ষ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র। আমলারা সবাই হাসিনা দলের প্রতি অনুগত নয় বলে প্রশাসন চালাতে তার অসুবিধা হচ্ছে। এ কথা বলে শেখ হাসিনা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন যে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি তার কাম্য নয়। তিনি কি জানেন না, একজন ডিক্টেটরই এমন মনোভাব পোষণ করেন?
কম শিক্ষিত, কম বুদ্ধিমান মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি প্রায়ই দুর্বল হয়ে থাকে। কিন্তু পত্রিকা পাঠকদের অনেকেরই মনে থাকার কথা, ১৯৯৬-২০০১ সালের মধ্যে প্রশাসন দলীয়করণের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টার সমালোচনা করে বিভিন্ন পত্রিকায় বেশ কয়েকজন নিরপেক্ষ লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে অনেক প্রবন্ধ আমি নিজেও লিখেছি। সে সময় বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের অনুরোধে সরকার প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলি করেছে। পত্রিকার পৃষ্ঠায় প্রায়ই ছাপা হয়েছে, সেসব স্থানীয় নেতার অনুমতি ছাড়া পুলিশ মামলার এজাহার নিতেও অস্বীকার করত। নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য বিএনপি সরকারের এত দিনের লাশ কবর থেকে টেনে তুলে শেখ হাসিনা সুবুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছেন না। দেশে এমন বহু বিজ্ঞ লোক আছেন যারা হাসিনাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন? চালুনি সুঁচকে বলে তোর লেজে ফুটো।
গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিত্যনতুন আমলা আমদানি করা হলে তারা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা পাবেন কী করে? কাজকর্ম দূরের কথা, নিজের চেয়ারে বসতে অভ্যস্ত হতেও তো সময়ের প্রয়োজন। বিএনপি’র গায়ের গন্ধ থাকতে পারে সন্দেহে বহু দক্ষ ও অভিজ্ঞ আমলাকে বিদায় করে দেয়া হচ্ছে। শুনেছি, বিএনপি আমলে অবসরপ্রাপ্ত শতাধিক আমলাকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যদিও দেশের ও বিশ্বের পরিস্থিতি তারপর অনেক পরিবর্তিত হয়েছে এবং এদের দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাসের সম্ভাবনা ধর্তব্যে আনা হচ্ছে না।

শিক্ষাপদ্ধতির দলীয়করণ
এবারে ক্ষমতা লাভের মুহূর্ত থেকে শেখ হাসিনা শুধু প্রশাসন নয়; রাষ্ট্রের সব যন্ত্র, সব অঙ্গ আওয়ামীকরণের জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্রের কথা আগেই বলা হয়েছে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার মুহূর্ত থেকে শিক্ষাব্যবস্থার আওয়ামীকরণের প্রক্রিয়াও পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। এতে জনমনে এ ধারণাই তৈরি হচ্ছে যে, হাসিনা ছাত্রলীগকে প্রকাশ্যে দিচ্ছেন এক নির্দেশ এবং আড়ালে ভিন্ন নির্দেশ। তারা আন্দোলন করছে, শিক্ষাঙ্গন অচল করে দিচ্ছে, তারপর সরকার তাদের দাবি অনুযায়ী নির্দেশ দিচ্ছে, ব্যবস্থা নিচ্ছে।

সবগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ থেকে ভাইস চ্যান্সেলার ও অধ্যক্ষরা বিতাড়িত হয়েছেন, তাদের স্থলে নিয়োজিত হয়েছেন অনুগত আওয়ামী লীগপন্থীরা। যেসব অধ্যাপক ছাত্রলীগের নির্দেশে পরিচালিত হতে রাজি নন, তারা মানে মানে সরে পড়ছেন। ছাত্রাবাসগুলোতে ছাত্রলীগ একরকম প্রকাশ্য যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। তারা একে একে ছাত্রাবাস দখল করছে। কেউ বাধা দিলে তাকে মারধর, এমনকি হত্যাও করা হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হলো ছাত্রশিবির নেতা, কিন্তু গ্রেফতার করা হলো ৫০ জন শিবির সদস্যকে। এখন থেকে যারা ছাত্রলীগের সদস্য হবে না, তারা ছাত্রাবাসে স্থান বা উচ্চশিক্ষা পাবে না। হিটলারের জার্মানিতে ঠিক এই রীতি চালু হয়েছিল? নাৎসিবাদ ছাড়া আর কিছু শিক্ষা দেয়া হবে না, অন্য কোনো মতামত সহ্য করা হবে না।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, প্রতিরক্ষাও রেহাই পাচ্ছে না এই আওয়ামীকরণের অভিযান থেকে। ২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনার জের ধরে ঐতিহ্যবাহী বিডিআর’র নাম পাল্টে দেয়া হচ্ছে। অথচ ব্রিটিশ-মার্কিন সেনাবাহিনীতে শত শত বছরের পুরনো রেজিমেন্টগুলোর নাম ও ঐতিহ্য সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বিডিআর’র আর কী কী পরিবর্তন হয় তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। অপর দিকে ভারতীয় মিডিয়া প্রায়ই নতুন নতুন জল্পনার ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাদের কারো কারো বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত সরকার নাকি বিডিআরকে ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারার ঠিকা বিএসএফকে দেয়ার প্রস্তাব করেছে।

আবার রক্ষীবাহিনী?
একটা ছোট খবর, আপনাদের চোখে পড়েছে কি না জানি না। বিডিআর’র নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল হোসেন একটা ইলেকট্রনিক পত্রিকাকে বলেছেন, বিডিআর’র ৫৫ হাজার সদস্যের সবাইকে ছাঁটাই করা হবে, না কাউকে কাউকে রাখা হবে; সে ব্যাপারে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
পঁচাত্তরে জাতির পিতা এবং গদিনসীন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো। খুন করল সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার। ১৯৮১ সালে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা। কিন্তু পঁচাত্তরে কিংবা একাশিতে গোটা সেনাবাহিনী ভেঙে দেয়ার উদ্ভট কথা ওঠেনি, যেমন উঠছে এখন বিডিআর’র বেলায়। বিডিআর’র পরিবর্তে সরকার কি আবারো রক্ষীবাহিনী গঠনের কথা ভাবছে?

বাংলাদেশের নিজেরই অর্থনৈতিক সঙ্কট। ফখরুদ্দীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সে সঙ্কটকে তীব্রতর করে দিয়ে গেছেন। বেকারের হার এখন ২০ শতাংশেরও বেশি। তার ওপর যুক্ত হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা ফিরে আসছেন হাজারে হাজারে, শিগগিরই ফিরবেন লাখে লাখে। তার ওপর বিডিআর’র ৫৫ হাজার সদস্যকে বেকার এবং ৫৫ হাজার পরিবারকে বিপন্ন করার পরিণতি কি সরকার ভেবে দেখেছে?

পিলখানার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনী ৬৪ জন উচ্চপদস্থ অফিসার হারিয়েছে। তদুপরি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় একজন জেনারেল এবং একজন লে. কর্নেল শোচনীয় মৃত্যুবরণ করেছেন। এমতাবস্থায় সাধারণ বুদ্ধি অনুসারে অদক্ষ, কাঁচা অফিসারদের ডবল-ট্রিপল প্রমোশন না দিয়ে উচিত ছিল, কিছু সিনিয়র অফিসারের অবসর গ্রহণ পিছিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার করেছে উল্টোটা। সময় হওয়ার আগেই একজন লে. জেনারেল এবং একজন মেজর জেনারেলকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছে। বিএনপি আমলে অবসর নেয়া শতাধিক আমলাকে কাজে ফিরিয়ে আনার সাথেও এ ব্যাপারটার তফাত লক্ষযোগ্য। সেনাবাহিনীতেও কি আওয়ামীকরণের কোনো পরিকল্পনায় হাত দেয়া হয়েছে?
বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, উপরোল্লিখিত ব্যাপারগুলো দেশে স্থায়ীভাবে একটা একদলীয় সরকার কায়েম করার আলামত। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যোসেফ স্ট্যালিনও একদলীয় ডিক্টেটরি সরকার চালু করেছিলেন। কিন্তু তাতে নিজেদের ও দেশের অকল্যাণই হয়েছিল শুধু।

কূটনৈতিক প্রতিহিংসা
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার নীতি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটা দৃষ্টান্ত বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। মুজিব ভাইকে আমি বিশ্ব মিডিয়ার সাথে পরিচিত করে দিয়েছিলাম ১৯৬৯ সালে লন্ডনে কতগুলো সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। মুক্তিযুদ্ধে আমারও কিছু ভূমিকা ছিল। একাত্তরে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অনুরোধে বিশ্ব মিডিয়ায় আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। বস্তুত আমার অনুরোধে এবং আমার উপরিউক্ত দায়িত্ব নেয়ার শর্তেই বিচারপতি চৌধুরী বিলেতে আমাদের আন্দোলনে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন। বিবিসি’র মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক খবর প্রচার করে দেশবাসীর মনোবল অক্ষুণ্ন রাখতে সাহায্য করেছিলাম। এপার-ওপারের খবরাখবর বেতারের মাধ্যমে বিনিময় করে পাকিস্তানের বন্দিশিবিরে আটক কয়েক লাখ বাংলাদেশীর এবং দেশে তাদের আত্মীয়স্বজনের উদ্বেগ প্রশমনে সাহায্য করেছি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পাওয়ার পর বিলেতে তার প্রথম সফরে বুশ হাউজে একটা চা চক্র দিয়ে শেখ হাসিনাকে বিবিসি’র সম্পাদক, সাংবাদিক ও পরিচালকবৃন্দের সাথে আমি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন এক সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছিলেন, তিনি রাজনীতি ঘৃণা করেন, শুধু পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। রেকর্ডিং থামিয়ে দিয়ে এ বক্তব্যের সম্ভাব্য অপপ্রভাবের কথা স্টুডিওতেই শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে বলি। পরবর্তীকালেও অবশ্যই তার কিছু ভুলভ্রান্তি সংশোধনের চেষ্টা করেছিলাম বলে তিনি আমার ওপর ক্রুদ্ধ।
একাত্তরের বিজয় দিবসে লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসে (তখন অস্থায়ী) পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য বিবিসি থেকে আমাকে টেলিফোন করে আমন্ত্রণ করা হয়। তারপর থেকে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য প্রতি বছর ২৬ মার্চ হাইকমিশন একটা সংবর্ধনার আয়োজন করে আসছে। আমার সৌভাগ্য, এ যাবৎ প্রতি বছরই আমার স্ত্রী সোফিয়া রহমান (যুক্তরাজ্যের আন্দোলনে তারও বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল) এবং আমি এ সংবর্ধনায় আমন্ত্রিত হয়েছি। ব্যতিক্রম হয়েছে এবারই। আমার স্ত্রী কিংবা আমাকে ২০০৯ সালের স্বাধীনতা দিবসের সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ করা হয়নি। শেখ হাসিনা ও তার সরকার হাজার হাজার মাইল দূরেও প্রতিশোধ নিয়েছেন বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে।
লেখকঃ প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(লন্ডন, ২১.০৩.০৯) [email protected] (সুত্র,নয়া দিগন্ত,২৪/০৩/২০০৯)
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×