বিয়ের পরে প্রিন্সেস ডাগমার, মারিয়া ফিওদরভনা নাম নিয়ে লুথারান থেকে অর্থোডক্স ধর্মে দীক্ষান্তর করেন (রাজাদের আবার ধর্ম কী!) । নবম ক্রিশ্চিয়ানকে বলা হতো 'ইউরোপের শ্বশুর' । কারন তিনি তাঁর ছয়টি পুত্র কন্যাকেই বৈবাহিক সুত্রে ইউরোপের ছয়দেশের রাজ পরিবারে প্রতিষ্ঠিত করেন । মারিয়া (ডাগমার) এর বড় বোন আলেকজান্ড্রা, রাণী ভিক্টোরিয়ার পুত্রবধু-সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী ।
পশ্চিম ইউরোপের সব রাজা রাজড়াই পরষ্পরের আত্বীয় ছিলেন । বলা হতো 'রাজাদের কোনো দেশ নেই, আবাস আছে, আত্বীয়তা নেই মিত্রতা আছে" । অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবুর্গদের সাথে জার্মান হোহেনৎসোলার্নদের, ড্যানিশ ওল্ডেনবুর্গদের সাথে রাশিয়ান রোমানভদের আত্বীয়তায় তাই আশ্চর্য হবার কিছু নেই ।
কে ক্যাথোলিক, কে প্রটেস্টান্ট, কে অর্থোডক্স এসব নিয়ে মাথা ঘামাতো না কেউ, তবে কথা ছিল যে যেই দেশে যাবে, জামাতা বা পুত্রবধু হয়ে তাকে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমত গ্রহন করতে হবে । তাঁরা ভাবতেন এতে তাঁদের প্রভাবের বলয় বাড়বে এবং যুদ্ধের হুমকি কমানো যাবে প্রথমটি আংশিক সত্য হলেও দ্বিতীয় আশাটি বিশেষ পুরণ হয় নি ।
আসলে ক্ষমতা, রাজ্য বিস্তারের লোভ বা তাগিদ ও অন্যান্য ব্যাপার আত্বীয়তা বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অনেক বড় ছিল । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান সিংহাসনে ছিলেন কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেলম, আর ইংল্যান্ডের সিংহাসনে রাজা ষষ্ঠ জর্জ, দুজনেই রানী ভিক্টোরিয়ার আপন নাতি! এদের দুজনের কাজিন আবার রাশিয়ার নিকোলাস । লোকে বলত যুদ্ধটা আসলে কাজিনদের লড়াই এবং কথা আসলে খুব মিথ্যে নয় ।
সে যাই হোক, ডাগমার বা মারিয়া ফিওদরভনা, ছয়টি পুত্র-কন্যার (এর মধ্যে চারটি পুত্র!) সম্রাট-পত্নীর দায়িত্ব পালন করেন । এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম পুত্রটির নাম রাখা হয়েছিল নিকোলাস (নিকোলাই), জন্ম ১৮৬৮ সালের ৬ ই মে তে । পুত্রটি অল্পবয়সে খুব বেশী সংবেদনশীল ছিল বলেই নিকট জনেরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন । বিশেষ করে একদিন তাকে বদমেজাজী, বলশালী ও বিশাল ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন বাবার চেয়ার নিতে হবে, এ চিন্তা অল্পবয়সে তাকে যথেষ্ট পীড়িত করেছে ।
বোমায় আহত পিতামহ, দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে যখন প্রাসাদে নিয়ে আসা হয় তখন তেরো বছরের বালক ও ভবিষ্যতের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে মৃত্যুপথযাত্রী পিতামহের পালংকের পায়ের কাছে বিস্ফোরিত ও আতংকিত চোখে এই মৃত্যুদৃশ্য দেখতে হয়েছিল । হতে পারে এই ঘটনা গভীর নেতিবাচক রেখাপাত করেছে নিকোলাসের মনে, অন্তত কতিপয় মনোরোগ বিশারদ সে রকমই মনে করেন ।
অবশেষে বড় হলে উঠল নিকোলাস । কিন্তু কোনো রকম জাগতিক দায়িত্ব নেবার মানসিকতা তার মধ্যে বিশেষ দেখা গেল না । অবশ্য সেরকম কোনো দায়িত্ব তাকে দেয়াও হয় নি । তার মানে এই নয় যে নিকোলাস ছিল কোনো (ডাকনাম 'নিকি' নামেই পরিচিতজনের কাছে বেশি পরিচিত) উশৃঙ্খল, বখে যাওয়া, দুর্বিনীত রাজকুমার । যেই তার কাছে এসেছে সেই নিকির বিনয়ে ও সারল্যে খানিকটা মুগ্ধ হয়েছে ।
দেখতে-শুনতে বাপের মত শালপ্রাংশু দেহী নন, মাত্র পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি । চেহারায় ভারিক্কি ভাব আনার জন্যে ঘন চাপদাড়ি রাখতে শুরু করেন বয়স কালে, ফলে তাঁর চেহারাটা দাঁড়ায় খানিকটা 'কাজিন জর্জ' (ইংল্যান্ডের পঞ্চম জর্জ) এর মতন । চমৎকার বন্দুকের গুলি ছুঁড়তে এবং তাস খেলতে পারতেন, এবং ফরাসী ও জার্মানে ব্যাপক বুৎপত্তি ছিল, রাজকুমারদের যেসব বিষয়ে জানা দরকার সবই তিনি জানতেন । নিকি যে বুদ্ধিমান তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না কারো । শুধু, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যটির পুরুষ উত্তরাধিকারীকে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে অল্পবয়স থেকে তেমন সচেতন করে তোলা হয় নি এই যা ।
তো জার তৃতীয় আলেকজান্দারের শারীরিক গঠন ও ছিল এরকম জঙ্গি মেজাজের সাথে পুরো মানানসই । বন্ধু-বান্ধবদের মনোরঞ্জনের জন্যে হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে রুপার কয়েন বাঁকিয়ে ফেলাটা ছিল তৃতীয় আলেকজান্ডারের বিশেষ হবি ।
একবার বলকানে কোনো বিশেষ উত্তেজনার সময়ে অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রদূত আভাস দেন যে তাঁর দেশ দুয়েক ডিভিশন সৈন্য মোবিলাইজ করতে পারে । জার তৃতীয় আলেকজান্ডার, একটা রুপার কাঁটাচামচ তুলে, বাঁকিয়ে সুতায় গিঁট দেয়ার মতো গিঁট দিয়ে চামচটা অস্ট্রিয় কুটনীতিকের প্লেটের উপর ফেললেন । 'আমি আপনাদের দু'তিন ডিভিশন সৈন্যকে এরকম প্যাঁচে ফেলে দেবো !' বলে চলে যান তিনি ।
আরেকবার পুরো পরিবার সহ ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি । ট্রেনের ছাদ দুমড়ে কামরার ভিতরে এসে পড়ে । আলেকজান্ডার একাই হারকিউলিসের মত শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে ছাদটকে ঠেলে উপরে নিয়ে যান যাতে পরিবারের বাকিরা নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে । এমন লোক যে ভাল একনায়ক হতে পারবে তাতে আর সন্দেহ কী?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



