তবে তার আগে নিকোলাসের ব্যাপারে ফিরে আসা যাক ।
গাচিনা প্রাসাদে থাকার ব্যাবস্থা ছিল সম্রাটের ছেলেমেয়েদের । সেখানে অসম্ভব বিলাস ব্যাসনে সাথে বেশ কিছু বিদঘুটে নিয়মকানুনও ছিল । যেমন যত শীতই পড়ুক ঠান্ডা পানিতে গোসল সারতে হবে! (রুশ শীতেও!), ঘুমাতে হবে ক্যাম্প খাটে, এসবে তাদের 'নৈতিক মেরুদন্ড' শক্ত হবে । বাসায় প্রাইভেট টিউটররা পড়াত ইতিহাস, ভুগোল, জার্মান, ইংরেজি, রুশ, কলাবিদ্যা, আর দরবারে সমস্ত আদবকায়দা ।
তবে ছেলেমেয়েরা সবসময় খুব সভ্য ভব্য ছিল তা বলা চলে না । অনেক বিদেশী রাষ্ট্রদূত এসে দেখেছেন সম্রাটের পুত্রকন্যারা টেবিলে চারপাশে রুটির গোলা পাকিয়ে এক জন আরেকজনকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ে মারছে (!), তবে তৃতীয় আলেকজান্ডার সময় সময় খুব কড়া হাতে শাসন করতেন । তাই বাচ্চা আর বাচ্চাদের মা অনেক সময়ই জারের সামনে অনেক কথা চেপে যেতেন ।
দশবছর বয়সে নিকোলাসের ভাগ্যে জুটল টিউটর দানিলভ, তিনি আবার র্যাংকে জেনারেল অফিসার ছিলেন, তখন রিটায়ার্ড । রাশিয়ার অনেক ক্যাডেট কলেজ দাবড়ে এসে শেষকালে সম্রাটের পুত্রকে মানুষ করার মহান দায়িত্ব চেপেছিল তাঁর কাঁধে । অনেক চমৎকার এবং অনেক উদ্ভট চিন্তাভাবনা তিনি তাঁর অল্পবয়সী ছাত্রটির মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন । যার ফলে (পরোক্ষভাবে বলতে গেলে) বলা যায় জান-মান আর সিংহাসন তিনটিই মহান নিকি হারিয়েছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর পরে । তবে যে অন্য গল্প ।
প্রথমেই দানিলভ নিকিকে বুঝিয়ে দিলেন যে এই যে ঝকমকে পোশাক পড়া কেতা দুরস্ত সব রাজপুরুষদের দেখা যাচ্ছে এরা প্রকৃত রাশিয়ান নয় (কথা অতীব সত্য), যে সমস্ত (মুলতঃ) বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেরা কিছুদিন পরপর হোমড়া-চোমড়াদের বোম মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে তারা তো কখনোই রুশভুমির (রোদিনা) প্রকৃত সন্তান নয় ।
আদি অকৃত্তিম, খাঁটি ও ভেজালবিহীণ রুশরা হচ্ছে গরীব-মুর্খ ও ধার্মিক, লাঙ্গল ঠেলা চাষীরা যাদেরকে নিকির পিতামহ দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তাঁর অশেষ দয়াতে ভুমিদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন । এরাই হচ্ছে রুশভুমির সংখ্যা গরিষ্ঠ ও দেশের মেরুদন্ড বিশেষ । এরা সকলেই সবিশেষ সম্রাট-ভক্ত, জারকে তারা 'বাতুশকা জার' বা 'পিতা জার' বলে সম্বোধন করে থাকে ।
এই সুখপ্রদ ও মুলতঃ ভুল ধারনাটি আজীবন লালন করেছেন নিকোলাস, গরিব চাষীরা তাঁকে ভালবাসে! গরিব চাষীরা তাঁকে বাপ মানে!
কথাটা অতিরঞ্জিত হলেও নেহাত ফেলনা নয় । জমিদারের গোমস্তাকে যতই গালাগাল দিক না কেন কৃষকরা জারকে তারা সত্যি ভক্তি-শ্রদ্ধা করত । সবচেয়ে গরিবের কুটিরেও, ঘরের মধ্যে যীশু, মা মেরীর পাশেই পিতৃপ্রতিম 'বাতুশকা' জারের ছবি শোভা পেত । তাদের ধারনা ছিল জারে কাছে কোনো মতে একবার যেতে পারলে তাদের সমস্ত সমস্যার আশু সমাধান ঘটবে ।
জার যা বলেন তা তাঁর দুষ্ট কর্মচারীরা ঠিকমত পালন করে না । আর জারও এমন স্বর্গের মতো উচ্চতায় অবস্থান করেন যে পনেরো কোটি প্রজার দেখভাল করা তাঁর পক্ষে সবসময়ে সম্ভব হয় না । জার সকল অন্যায় আর ভুলের উর্ধ্বে ।
নিকোলাসের আরেক সমস্যা ছিল তার বাবা । সব ছেলে না হোক অনেক ছেলেই তাদের বাবাকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে ও বাবার মতো হওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু বাবা, সম্রাট তৃতীয় আলেকজান্ডারের মত এরকম হিমালয়সম শক্তি ব্যাক্তিত্ব আর বাজখাঁই মেজাজের অধিকারী হলে বেচারা পুত্রধনের দূর থেকে সন্মান জানানো ছাড়া কোনো গতি থাকে না ।
আর মানুষের স্বভাবেরও রকমফের আছে, নিকোলাস রোমানভের মতো কোনো অন্তর্মুখী, লাজুক ও স্বভাবতঃ বিনয়ী মানুষের পক্ষে জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের মতো চরম এক্সট্রোভার্টের অনুকরণ অসম্ভব ব্যাপার । কিন্তু সেই অসম্ভব কে সম্ভব করার চেষ্টা তিনি করে গেছেন সারা জীবন ।
দানিলভ আরো বোঝান একনায়ক হওয়াটা জারের জন্য একেবারে ঐশী কর্তব্য । যে সম্রাট একনায়ক নন তিনি একটি পবিত্র কর্তব্যকে লঙ্ঘণ করছেন । সম্রাটের আরো কিছু কর্তব্য আছে, একটা হচ্ছে যাই ঘটুক না কেন সর্বদা নির্বিকার থাকা ও নিজের ভাবনা চিন্তা কাউকে বুঝতে না দেয়া । অন্যটি হচ্ছে সবাইকে অবিশ্বাস করা, কারন প্রত্যেকেই চাইবে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে । অবশ্যই যাকে অবিশ্বাস করা হচ্ছে তার প্রতিও নির্বিকার থাকতে হবে!
খুব খারাপ পরামর্শ নয় এগুলো । এরকম নিরংকুশ অভিজাততন্ত্রের পুরোধাকে এরকম মানসিকতা বেশ কাজে দেবে সময় সময় । কিন্তু নিকোলাস বোধহয় কথাগুলো পুরোটাই মানে বঁড়শি, ফাতনাম, সুতো সহ টোপ গিলে ফেলেছিলেন । পরিনামে বদহজম ।
তবে সম্রাট পত্নীর জন্য সময়টা১৮৭০-১৮৮০) ভারী আনন্দে কেটেছে । তিনি নাচতে ভারী পছন্দ করতেন এবং শীত গ্রীষ্ম সর্বদা নাচের আসর বসত । পোলিশ নাচ, জিপসি নাচ, ফরাসী নাচ, ভিয়েনিজ ওয়ালৎস, কোন নাচই বাদ যেতো না । শীতে দেখা যেতো আলেক্সান্দার বা শীত প্রাসাদের বিশাল জানালার বাইরে ঝুর ঝুর করে তুষার পড়ছে, কিন্তু সারারাত নাচ চলছে ।
এরকম পার্টি সম্বন্ধে ডেনমার্কের বাপের বাড়িতে চিঠি লিখতে গিয়ে সম্রাজ্ঞী মারিয়া নিজেই লেখেন, 'নাচতে গিয়ে এক মহিলার পেটিকোট খুলে মাটিতে পড়ে গেল, কিন্তু নাচ থামল না । শেষ পর্যন্ত একজন অভ্যাগত একটা থামের ধারে সেটাকে আড়াল করে রাখলেন, তবু নাচ চলতেই থাকল । ভীড়ের মধ্যে ঠিক বোঝা গেল না ঠিক কার এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে ।' জারিৎসা মারিয়া ছিলেন এইসব পার্টির মধ্য মনি ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



