মহানুভব জার পিটার ছোটোবেলায় মস্কোর কাছে প্রেওব্রাজেনস্কোয়ে নামে একটা গ্রামে (এখন মাস্কোর একটা এলাকা) বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ -যুদ্ধ খেলতেন । জার হয়ে তিনি প্রেওব্রাজেনস্কি রেজিমেন্ট নামে একটা রেজিমেন্টের গোড়াপ্ত্তন করেন ১৬৮৩ সালে । সবচেয়ে নীলোরক্তের রাজপুরুষরা এতে যোগ দিয়ে মাতৃভুমির (রোদিনা) সেবা করতেন । এতেই নিকোলাসের জায়গা হলো ।
রেজিমেন্টের জীবন যথেষ্ট আরামদায়ক মনে হয়েছিল নিকোলাসের কাছে । এখানে দরবারের অনেক জবরজং ফর্মালিটি এখানে অনুপস্থিত । সমবয়সী লোকজনের সঙ্গও আরেকট কারন হতে পারে । নিকোলাস সবসময়েই অফিসার থাকাকালীন স্মৃতিকে সযত্নে লালন করেছেন । হতে পারে অন্য অফিসারদের মতো দীর্ঘসময়ে ক্যাডেট থাকতে হয়নি বলে তিনি একে অনেক বেশী উপভোগ করেছেন । সন্দেহ নেই ভাবী সম্রাটের উপর খুব একটা খবরদারী ফলায় নি কেউ । সুতরাং ব্যারাকের জীবনটা একটা লম্বা ছুটি হিসাবে ধরা যায় ।
পুরো সময়টা একেবারে বৃথা যায়নি । বাড়িতে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে আজ তাঁদের অফিসাররা চার রকমের পোর্ট ওয়াইন চেখে দেখেছেন তবে টাল হননি । আরো অনেক রকম তামাশা তাঁরা করেছেন । তৃতীয় আলেকজান্ডার নিকোলাসকে 'পোলখভ' (কর্নেল) র্যাংকে উন্নীত করেন বিশ পেরোনোর আগেই । বাবা তাকে কর্নেল করেছেন তাকে সন্মান করতে গিয়ে নিকোলাস সারাজীবন নিজেকে আর পদোন্নতি দেননি!
সেটা খুব আশ্চর্যের হবার মতো বিষয় নয়, তাঁর দূর সম্পর্কীয় মামা, ভিক্টোরিয়ার পুত্র আলফ্রেড চৌত্রিশ বছর বয়সে অ্যাডমিরালের পদ অলংকৃত করেছিলেন । এছাড়াও নিকোলাস ইংল্যান্ডের রয়্যাল স্কটস গ্রে, জার্মানী/অস্ট্রিয়ার বেশ কয়েকটা রেজিমেন্টের অনারারি কর্নেল ছিলেন এমন কী এগুলোর নামও নিকোলাসের নামে ছিল ! (কাইজার নিকোলাউস ফন রুসলান্ড) । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এগুলোর নাম পাল্টে রাশিয়া আক্রমনে পাঠানো হয় ।
তবে তার কিছূ দিন পরে অন্য ঘটনা ঘটল । নিকোলাস, মাতিলদা ক্সেচেসিনস্কায়ার সাথে পরিচিত হলেন । মাতিলদাকে বলা যায় যে কোনো রুশ জারের আদর্শ উপপত্নী, মারিনস্কি ব্যালে স্কুল (কমিউনিস্ট জামানায় কিরভ থিয়েটার) থেকে পাশ করে পেশাদার ব্যালেরিনা ছিলেন এই পোলিশ বংশদ্ভুত নর্তকী । জন্ম তাঁর ১৮৭২ সালে সেইন্ট পিটার্সবুর্গের কাছে, লিগিভোতে । নিকোলাসের দুই জ্ঞাতি ভাই গ্র্যান্ড ডিউক সের্গেই মিখাইলোভিচ আর গ্র্যান্ড ডিউক আন্দ্রেই ভ্লাদিমিরোভিচের সাথেও মাতিলদার লটর পটর ছিল ।
১৮৯৩ সালে 'সিন্ডারেলা' অপেরাতে একবারে একপায়ের উপর বত্রিশবার চক্কর মেরে (ব্যালের ভাষায় যাকে বলে 'ফুয়েতে') রেকর্ড সৃষ্টি করেন মাতিলদা । ১৮৯৮ সালে 'ফারাও কন্যা' অপেরায় আরেকবার ঝড় তোলেন তিনি । রোমানভ পরিবারের অনেকের সাথে লটর পটর করে বিস্তর টাকাকড়ি কামিয়েছেন এই নৃত্যশিল্পী । যার মধ্যে একটা ছিল মস্কোর আলিশান একটা বাড়ি, যে বাড়ির ব্যালকনি থেকে জনতার উদ্দেশ্যে লেনিন হাত নেড়েছিলেন ফিনল্যান্ড থেকে ফিরে ।
তো মারিনস্কির গ্র্যাজুয়েশন ক্লাসে পুরো রাজ পরিবার আমন্ত্রিত ছিল । নাচ দেখে নিকির নেক নজর পড়ল মাতিলদার উপর ।
নিকোলাস মজে গেলেন ব্যালেরিনার উপর । সেসময় যথেষ্ট কেলেংকারি হয়েছিল মাতিলদা ও তার রাজকীয় প্রেমিকদের নিয়ে । সম্পর্কটা খুব গভীরে গড়িয়েছিল বলেই অনেকের ধারনা । নিকোলাস ও মাতিলদা ওনেগা হ্রদের ধারে ঘোড়ার গাড়িতে চযে বেড়াতে যেতেন বলে অনেক লোকে দেখেছে । আজব কান্ড হলো তৃতীয় আলেকজান্ডার এতে প্রথমে রাগ করেছেন বলে কেউ শোনেনি! 'পুরুষ মানুষ তো অল্পবয়সে এরকম একটু আধটু করতেই পারে!' ছিল তাঁর প্রাথমিক বক্তব্য । কিন্তু নিকির মোহ ক্রমে আচ্ছন্নতার দিকে যাচ্ছে দেখে তাকে ফেরানোর অন্য ধান্দা করা হলো ।
স্থির হলো নিকিকে বিশ্বভ্রমনে পাঠিয়ে দিলে নাচনেওয়ালীর উপর থেকে মন তো উঠবেই আর দুনিয়াটা দেখা (মানে দুনিয়ার সব হোমরা-চোমরা, রাজা-রাজড়া আর কী) স্বচক্ষে দেখলে বোকা-সোকা নিকিও তার হ্যাংলামি কাটিয়ে আরেকটু চালাক-চতুর, চৌকস হয়ে উঠবে । কিন্তু একটা বড় অঘটন ঘটে গেল জাপানে গিয়ে ।
জাপান তখন আগের মধ্যযুগীয় সামন্ত রাষ্ট্র নেই, যাতে ১৮৫৩ সালে মার্কিন নৌ সেনাপতি, কমোডর পেরি গায়ের জোরে নেমে পড়েছিলেন বিদেশী জাহাজ ভেড়ার উপর প্রায় দুইশো বছরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে । চল্লিশ বছরের মধ্যে তারা শোগুন প্রথা, সামুরাই প্রথা (শোগুনরা ছিলেন খুব শক্তিশালী সামন্ত, যাঁরা সম্রাটের ক্ষমতাকে খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না, আর সামুরাইরা ছিল পেশাদার যোদ্ধা, মুলতঃ বিভিন্ন শোগুনদের বাহিনীতে লড়তো) উচ্ছেদ করে এক আধুনিক একীভুত রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে ।
জাপানের প্রতি সমগ্র পাশ্চাত্যের দৃষ্টি নিবদ্ধ, একটি মাত্র এশিয়ান রাষ্ট্র যা শিল্পে ও সামরিক শক্তিতে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হতে পারে । জাপান তার স্থল বাহিনীকে, জার্মান সেনাবাহিনীর ধাঁচে আর নৌবাহিনীকে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির মডেলে গড়ে তুলছে । ইতিমধ্যেও চীনের কাছ থেকে বেশ কিছূ বন্দর ছিনিয়ে জাপান প্রমান করেছে সাম্রাজ্য বিস্তারের হিংস্রতায় তারা কারো থেকে কম যায় না ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



