ভারতে তাজমহল, স্বর্ণ মন্দির দর্শন সেরে ৩১ এ জানুয়ারি ১৮৯১ সালে সিংহল থেকে সিংগাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । শ্যামের (এখন থাইল্যান্ড) রাজা পঞ্চম রামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকার সেরে জাভা দ্বীপ দর্শন সেরে ১৩ই মার্চ চীনের নানকিং বন্দরে পা রাখেন তিনি । সেখানে অনেক কিছু দেখে শুনে ১৫ ই এপ্রিলে জাপানে কাগোশিমা বন্দরে ছ'টা জাহাজ সহ উদীয়মান সুর্যের দেশ, জাপানী সাম্রাজ্যে পা রাখেন জারেভিচ নিকোলাস ।
সেটা ছিল জাপানে প্রথম কোনো রাজকীয় সফর । যেহেতু জাপান ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করছে আর রাশিয়াও এ অঞ্চলে ক্রমে তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, আমেরিকাও প্রশান্ত মহাসাগরের এদিকটায় তার লোলুপ দৃষ্টি বিস্তৃত করছে; সুতরাং বলাই বাহুল্য রুশ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত উত্তরাধিকারীর এই সফরের দিকে নজর ছিল সবার ।
রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু শান্তির সময়ে সকল রাজাই অপরাপর রাজন্য বর্গকে অত্যন্ত সাদরে গ্রহন করার পক্ষপাতী । কোবে আর কিওটোতে নিকোলাসকে বিপুলভাবে সংবর্ধিত ও ভোজসভায় আপ্যায়িত হলেন । কিওটোতে জাপানী প্রিন্স আরিসুগাওয়া তাকাহিতো প্রতিনিধি দল সহ সাক্ষাত করে ভবিষ্যতে রুশ-জাপান সম্পর্কে যতদূর উন্নত করার উপর 'গুরুত্বারোপ' করলেন ।
তবে সফরটা স্রেফ পানভোজন-সিরিয়াস বৈঠকের ছিল না । নিকোলাস প্রায় ত্রিশ-চল্লিশটা বুদ্ধমুর্তি সহ নানান কিউরিও সংগ্রহ করেছিলেন, পরে সেগুলো বিভিন্ন রুশ যাদুঘরে দান করা হয়েছিল । কোথায় যেন শুনেছিলেন নাগাসাকিতে চমৎকার উল্কি শিল্পী আছে । জাপান সফরের স্মৃতি শরীরে ধারন করতে বাহুতে উল্কি আঁকার সিদ্ধান্ত নিলেন নিকোলাস । তলব শুনে শহরের দুই সেরা উল্কি শিল্পী এলো জারেভিচের শরীর অলংকৃত করতে ।
এখানেই ১১ই মে ১৮৯১ সালে ওৎসু অঞ্চলে মন্দির পরিদর্শন করতে গিয়ে অঘটনটা ঘটল সেদিন । আমরা আসলে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সেইদিন (অ)ঘটন পুর্ণ দিনে । শিগা জেলার ওৎসুতে বিওয়া হ্রদ দেখে ফেরার সময় ৎসুদা সানজো নামে একজন দেহরক্ষী নিকোলাসকে লক্ষ্য করে তরবারী চালায় (অনেকটা রাজীব গান্ধীকে মারার জন্য শ্রীলংকান নৌ সেনার স্টাইলে! তবে আঘাত করার জন্য রাইফেলের বাঁটের চেয়ে খোলা তরবারি অনেক বেশি ভয়ংকর অস্ত্র সন্দেহ নেই!) । মন্দিরের ভিতর জর্জ আর নিকোলাস জুতা পরে ঢুকেছিলেন সেটাও একটা কারন হতে পারে ।
দ্বিতীয়বার আঘাত করার আগেই নিকোলাসের সঙ্গী প্রিন্স জর্জ তার ছড়ি উঁচিয়ে সেটা ঠেকিয়ে দেন । এরপরে সানজো পালাতে চেষ্টা করতেই নিকোলাসের সাথী দুই রিকশাওয়ালা (হ্যাঁ! রিকশা ব্যাপারটা তখন জাপানীদের এক চেটিয়া ছিল!!) দৌড়ে গিয়ে কনস্টেবল সানজোকে মাটিতে পেড়ে ফেলে । নিকোলাসের কপালে প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা একটা ক্ষত সৃষ্টি হওয়া ছাড়া তেমন কোনো ক্ষতি হয় নি ।
ঝড়ের বেগে নিকোলাসকে কিওটোতে ফিরিয়ে নেয়া হলো । প্রিন্স কিতাশিরাকাওয়া ইউশিহিসা নিকোলাসকে বিশ্রাম নেবার অণুরোধ করে টোকিওতে খবর পাঠালেন । এরকম একটা ঘটনা সেযুগে যুদ্ধ ঘোষনা করার অজুহাত হিসেবে যথেষ্ট ছিল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এমন একটা কারনেই ঘটেছিল, যদিও সেখানে সত্যিকার অর্থেই অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী নিহত হয়েছিলেন ) এবং রুশদের মোকাবিলা করার মতো জাপানী সামরিক বাহিনী তখনো ততটা শক্তিশালী হয় নি ।
তাই প্রধানমন্ত্রী মাৎসুকাতা মাসাওশি, সম্রাট মেইজি (এই মেইজিই ১৮৬৮ সালে শোগুন তন্ত্র লোপ করে সম্রাটের এক্চ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করেন, এবং সে ঘটনাকে 'মেইজি রেস্টোরেশন' বলে অভিহিত করার হয়) পরামর্শ দিলেন যত শিগগীর সম্ভব জারেভিচ নিকোলাসের সাথে দেখা করে সমবেদনা প্রকাশ করতে । সম্রাট বিকেল বেলায় টোকিওর শিমবাশি স্টেশনে ট্রে উঠে সারারাত জার্নি করে পরদিন সকালে প্রাচীন রাজধানী কিওটোতে পৌঁছালেন ।
পরদিন, নিকোলাস বললেন যে কোবে বন্দরে অবস্থিত রুশ নৌবহরে তিনি ফিরতে চান । সম্রাট মেইজি, প্রিন্স তারুহিতো আর প্রিন্স আরিসুগাওয়াকে পাঠালেন নিকোলাসের সাথে । এমন কী দু'দিন বাদে নিজেই রুশ জাহাজে ব্যাক্তিগত ভিজিটে এলেন । অনেক সিনিয়র জাপানী কর্তাব্যাক্তি মানা করেছিলেন এরকম একটা কাজ করতে, তাঁদের আশংকা ছিল সম্রাটকে অপহরণ করা হতে পারে ।
সম্রাট ব্যাক্তিগতভাবে বললেন জাপান তার একজন অত্যন্ত সন্মানিত অতিথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যার্থ হয়েছে, ব্যাস বন্যার পানির মতো সহানুভুতি জানিয়ে টেলিগ্রাম আসতে লাগল । জারেভিচ নিকোলাস আশু সুস্থতা কামনা করে প্রায় দশ হাজার এসেছিল জাপানের নানান জায়গা থেকে । জাপানের ইয়ামাগাতা প্রিফেকচারের একটা শহরতো 'ৎসুদা' আর 'সানজো' এ দুটো কলংকজনক নাম রাখা নিষিদ্ধ করে ফেলল!
প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়নি এ অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ৎসাইগো সুগামিচি আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওকি শুজো ইস্তফা দিলেন (যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এখানে কী করার ছিল তা পরিষ্কার নয়!) । মানে জাপানী প্রশাসন তাঁদের দুঃখপ্রকাশের আন্তরিকতায় কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকুক সেটা চাননি ।
জাপানী সরকার, আদালতকে চাপ দিল ফৌজদারীবিধির ১১৬ ধারায় (যাতে জাপানের সম্রাট, রাজপরিবারের ক্ষতিসাধন বা ক্ষতিসাধনের চেষ্টাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার রাখা হয়েছে) । কিন্তু প্রধান বিচারপতি কোজিমা ইকেন দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন ১১৬ ধারা এখানে প্রয়োগযোগ্য নয় এবং আপিলের পর ৎসুদো সানজোকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করলেন । ভবিষ্যতে এই রায়টাকেই জাপানের বিচারবিভাগকে প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত করার ব্যাপারে প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে ।
রুশ কর্তৃপক্ষ, জাপানী কর্তৃপক্ষের সমস্ত কর্মকান্ডের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করলেন । কিন্তু নিকোলাস সুস্থ হয়ে উঠলেও ডানদিকে ভ্রুর উপর মস্ত কাটা দাগ নিয়ে ফিরলেন । জাপান সম্বন্ধে বলা যায় তখনই তাঁর মনোভাব খানিকটা বিষিয়ে গিয়েছিল । যার ফল রুশ-জাপান যু্দ্ধ হিসেবে আরো একযুগের ও বেশী পরে ফলবে ।
ইতিহাস বড় রহস্যজনক গতিতে চলে! রুশ সাম্রাজ্যের পতনের বীজ শেষ বিচারে জাপানের এক কোনো মাথা নষ্ট পুলিশ কন্সটেবলের তরবারীর এক কোপে রোপিত হয়েছিল বলা চলে !! এই কোপটা না পড়লে হতে পারে রাশিয়ার ইতিহাস (এবং পৃথিবীরও!) অন্য দিকে ঘুরে যেত ।
বিশ শতকে আমরা রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বন্যা দেখতে পাই তা আসলে ঊনিশ শতকের ধারাবাহিকতারই ফসল । এমন রাজপুরুষ, রাজনৈতিক কমই আছেন যাঁর উপর হামলা হয় নি । কারন ঊনিশ শতকেই শাসকরা বেশি বেশিকরে তাঁদের সুরক্ষিত প্রাসাদ আর দুর্গ থেকে বাইরে আসতে থাকেন ।
প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের চেয়ে বিপ্লবী-নৈরাজ্যবাদী বা স্রেফ মাথানষ্ট লোকদের প্রাণনাশের চেষ্টা অনেক বেশি হুমকির কারন হয়ে দাঁড়াল । আগ্নেয়াস্ত্রের আকার ছোট হয়ে আসা আর বিস্ফোরক প্রযুক্তির ব্যাবহার এর মুল কারন । আর ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই রাজ-রাজড়াদের প্রতি মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা কমতে শুরু করেছে ।
নিকোলাসের পিতামহ দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের বোমায় নিহত হবার কথা তো আগেই বলেছি । আমেরিকার দুই প্রেসিডেন্ট লিংকন আর গারফিল্ড আততায়ীর বুলেটে প্রাণ হারান । মহারানী ভিক্টোরিয়া, ভিক্টোরিয়ার পাঁচ ছেলেমেয়ে, সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন (এবং অসংখ্য হোমড়া-চোমড়ার) উপর আততায়ীরা অনেকবার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়েছে ।
সে যাইহোক দুই সাহসী রিকশাওয়ালা মুকাইহাতা জিজাবুরো আর কিতাগাইচি ইচিতারোকে যুদ্ধজাহাজে ডেকে বিস্তর আপ্যায়ণ করে সোনার মেডেল দিয়ে পুরষ্কৃত করলেন নিকোলাস । জাহাজ থেকে নামার সময়ে তাদের দুজনের প্রত্যেককে আড়াই হাজার ইয়েনের একটা থলে ধরিয়ে দিয়ে বললেন তারা যতদিন বাঁচবে প্রত্যেক বছর তাদেরকে প্রত্যেককে এক হাজার ইয়েন করে পেনশন দেয়া হবে । দুঃখের বিষয়, জাপানের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবার পর সম্রাট তাঁর ওয়াদাটা আর পরে রাখতে পারেননি !
বাহুতে উল্কি আর কপালে তরবারির কাটা দাগ, জাপানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে শরীরে নিয়ে জারেভিচ নিকোলাই আলেক্সান্দ্রোভিচ সাইবেরিয়ার প্রধান সমুদ্র বন্দর ভ্লাদিভস্তকে পা রাখলেন ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০০৭ দুপুর ২:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



