somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুশদেশের সত্যিকথা ১৭

২২ শে অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অ্যাডমিরাল তোগো বিখ্যাত হতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম শতকের চারটি বছর কেটে যাবে । তার আগে রুশ -জাপান যুদ্ধের গোড়ায় অর্থাৎ ১৮৯৪ সালের দিকে ফিরে যাওয়া যাক । তবে সেই যুদ্ধটা ছিল একান্ত ভাবেই স্থল-যুদ্ধ, যুদ্ধটা আসলে হয়েছিল চীন আর জাপানের মধ্যে ।

এশিয়ান মুল ভুখন্ডে উত্তর-পূবের তটরেখা যদি আমরা ভালো করে খেয়াল করি তাহলে দেখবো কয়েকটি উপদ্বীপ প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে বিস্তৃত। সবচেয়ে উত্তরের উপদ্বীপটি অবশ্যই রুশ সাইবেরিয়ার আগ্নেয়গিরি সমৃদ্ধ কামচাৎকা উপদ্বীপ । তারপরের সবচেয়ে বড় উপদ্বীপটি হচ্ছে কোরিয়ান উপদ্বীপ । প্রায় বাহাত্তর হাজার বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত কোরিয়ান উপদ্বীপ, ঊঈনিশ শতকের শেষ ভাগে আনাম, তিব্বতের মতই চীনের একটা করদ রাজ্য ছিল । চীনে তখন রাজত্ব করতেন মাঞ্চু বংশদ্ভুত চিং রাজবংশ ।

কোরিয়ান উপদ্বীপে এটাই জাপানের প্রথম আক্রমণ নয় । ষোড়শ শতকের শেষ দিকে জাপান বেশ কয়েকবার কব্জা করার চেষ্টা করেছে কোরিয়াকে । একবার তো এক জাপানী সেনাপতি হাজার হাজার কোরিয়ান বন্দীর নাক-কান কেটে কেটে এনে জাপানী কিয়োতো শহরের কাছে একটা ঢিবি বানিয়েছিলেন (!) । যে ঢিবির নাম 'মিমিজুকা' । তবে ১৫৯৮ সালের মধ্যেই জাপানের আক্রমণের গতি শ্লথ হয়ে একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায় । তার কারন কিছুটা কোরিয়ানদের অভিনব রণকৌশল আর চীনের মিং সম্রাটদের সরাসরি হস্তক্ষেপ । মিং রা বুজকতে পেরেছিলেন জাপানকে এশিয়াতে পা রাখতে দিলে চীনের প্রান্তিক রাজ্যগুলোর অবস্থা টলে উঠবে । তিনশো বছর পরে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ।

কিন্তু এবার কোরিয়ার আর জাপানের শিল্প-প্রযুক্তিতে আকাশ-পাতাল প্রভেদ । জাপান, প্রাশিয়ান বাহিনি কর্তৃক প্রশিক্ষিত হয়ে আধুনিক যুদ্ধ কৌশল সম্বন্ধে সম্পুর্ণ ওয়াকিফহাল আর কোরিয়া তখনো প্রায় মধ্যযুগে পড়ে আছে । ১৮৭৬ সালে জাপানীরা কোরিবার উপরে বৈষম্য মুলক গাংহোয়া চুক্তি চাপিয়ে দেয় । ১৮৮৪ সালে তারা চীনপন্থী কোরিয়ান সরকারকে উৎখাত করে গায়ের জোরে । ১৮৯২ সালে কোরিয়ার চাষীরা বিদ্রোহ করে অত্যাচারী জমিদার আর শাসকদের বিরুদ্ধে , বিদ্রোহীরা নিজেরদের বাহিনীকে বলতো 'তোংশাক বাহিনী'।


চীন আর জাপান (কোরিয়া তখন দুই শক্তির মধ্যে বলা যায় যৌথ ভাবে শাসিত হচ্ছিল ) এদের দমন করতে বাহিনী পাঠনোর উদ্যোগ নেয়ার আগেই তোংশাকদের বিদ্রোহ স্তমিত হবে আসে । ১৮৯৪ সালের ৮ ই জুন জাপানী নৌ-সেনারা প্রথম কোরিয়ান উপদ্বীপে সরাসরি অভিযান চালায় । প্রথম দফায় হাজার পাঁচেক সৈন্য নেমেছিল । বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে কোরিয়াতে সৈন্য পাঠানো উদ্দেশ্য আসলে ছিল চীনের কর্তৃত্ব যেটুকু আছে সেটাকেও খর্ব করে ফেলা ।

জুলাই মাসে আরো শেন্য এবং বলা যায় তৎকালীন জাপানী নৌবাহিনীর প্রায় সমস্ত যুদ্ধজাহাজ এসে ঘাঁটি গাড়ে কোরিয়াতে । সেপ্টেম্বরের পনেরো তারিখে জাপানী বাহিনী (এখন উত্তর কোরিয়ার রাজধানী) পিয়ং ইয়ং এর গ্যারিসন থেকে চীনা বাহিনীকে পরাস্ত করে অবশিষ্ট বাহিনীকে বের করে দেয় । পিয়ং ইয়ং এর পরাজয়ের খবর শুনে চীনারা কোরিয়া থেকে তাদের অবশিষ্ট সৈন্য প্রত্যাহার করে ইয়ালু নদীর তীরে তাদের প্রতিরক্ষা মুলক ব্যাব্স্থা গড়ে তুলতে থাকে ।

ডিসেম্বরের দিকে জাপানী সৈন্যরা কোরিয়ান উপদ্বীপ পার হয়ে মাঞ্চুরিয়ার ভিতরে লুশুংকাউ (পোর্ট আর্থার) দখল করে ফেলে । এবং শোনা যায় কয়েক হাজার বেসামরিক লোককে ১৮৯৪ সালের শেষ দিকে এই পোর্ট আর্থারে জাপানী সৈন্যরা হত্যা করে । এই শহরটির বর্তমান নাম হচ্ছে দালিয়ান । আর উপদ্বীপটির বর্তমান নাম লিয়াওদং উপদ্বীপ ।

পুরো লড়াইটাই সবগুলো ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল । রুশদের স্বার্থটা অবশ্য এর মধ্যে সবচেয়ে তীব্র । রাশিয়ানরা সবসময়েই প্রশান্ত মহাসাগরে একটা বরফ মুক্ত এলাকায় কিছু বন্দর দখলের পাঁয়তারায় ছিল ।কোরিয়াতো বটেই জাপান যুদ্ধজয়ের ফসল হিসেবে পুর্ব মাঞ্চুরিয়া উপদ্বীপটিও হাতিয়ে নেবার পাঁয়তারা কষছিলো (শিমোনোসেকির চুক্তি নামে চীনের সাথে একটা একতরফা চুক্তিও হয়ে গেছিল কাগজে-কলমে)এমন সময় ফ্রান্স-রাশিয়া আর জার্মানী এ ত্রি-শক্তি বাগড়া দিলো । উপদ্বীপ স্হ পোর্ট আরথার বন্দরটা ছেড়ে দিতে হলো রাশিয়ার কাছে ।

জাপানীরা কোরিয়ান উপদ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বসায় তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটেছিল । রুশরা সময় নষ্ট না করে পুর্ব মাঞ্চুরিয়ার পোর্ট আর্থার (লু শুং কাউ) একটা নৌ ঘাঁটি বসানোর কাজে লেগে পড়ল । এবং সে জন্য হার্বিন থেকে মুকদেন পর্যন্ত একটা রেললাইন বসানোর তোড়জোড়ও শুরু হয়ে গেল জোর কদমে । বছর দুই বাদে মানে ১৮৯৬ সালে রাশিয়া, চীনের উপর চাপ প্রয়োগ করে একটা ইজারার চুক্তিও করে ফেলল ।

উদীয়মান সুর্যের দেশের উদীয়মান নেতারা বিশেষ করে সমর নায়কেরা ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দেখেন নি । স্বার্থে আঘাত লেগেছে এরকম কটুভাব ছাড়াও নেপোয়ে দই মেরে দেয়াতে জাপানীরা ভীষন অপমানিত বোধ করছিল (হাজার হোক চীনকে লড়াইতে হারিয়ে ও জায়গার দখল নিয়েছিল ওরা!) । এতে প্রমানিত হলো এখনো জাপানের উপর খবরদারী করার ক্ষমতা আছে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর । এরকম অবস্থা চিরকাল থাকবে না এই প্রতিজ্ঞা নিবে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধজাহাজ বানাতে লেগে গেল জাপানীরা । নৌ-শক্তির উপরে কোনো শক্তি নেই তার প্রমান সব জায়গাতে পাওয়া যাচ্ছে । যেহেতু তখনও ভারী যুদ্ধজাহাজ বানানোর কৌশল জাপানের আয়ত্ব হয় নি সুতরাং ইউরোপে ফরমাশ দিয়ে বানানো হলো জাহাজগুলো । সবচেয়ে বেশী অর্ডার পেল বিলাতের ভিকার্স কোম্পানি ।

তখন ১৮৯৪-১৮৯৫ সালে যাই মনে হোক, আসলে আখেরে সাংঘাতিক মুল্য দিতে রাশিয়াকে এর জন্য !
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ৮:৫৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অধিকার ক্ষত কবিতা খুঁজে নেবে মহিমা (অনুকাব্য)

লিখেছেন নাঈম জাহাঙ্গীর নয়ন, ২৫ শে জুন, ২০১৭ রাত ১:৩৩

অধিকার



মিষ্টি কথার ভাষণ চাই না---
চাই, সাধারণ মানুষের অধিকার;
খাদ্য শিক্ষা চিকিৎসা বাসস্থান
আইনের সু-শাসন, প্রতিটা নাগরিক
যে অধিকারের দাবীদার।।

কোনো প্রয়োজন দেখিনা ওয়াদা
প্রাপ্ত দায়িত্বই পালন কর তোমার;
প্রাণে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাদাখ ভ্রমনঃ(বিশেষ পর্ব) – সবাই যা জানতে চায় (খরচাপাতি এবং ......)

লিখেছেন রুবাইয়াত শোভন, ২৫ শে জুন, ২০১৭ দুপুর ১২:৫২

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ২৫ শে জুন, ২০১৭ বিকাল ৪:৩৬

দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ঈদ আল ফিতর। মন গেয়ে ওঠে আপন মনেই -

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাকাত থেকে বিলিওনিয়ার হওয়ার বিবিধ উপায়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৫ শে জুন, ২০১৭ বিকাল ৫:৫৩



বাংলাদেশে কমপক্ষে ১০ লাখ কোটীপতি আছে, যারা বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, সোনালী, অগ্রনী, রূপালী, এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি; অনেকে সেই টাকা ফেরত দেয়ার জন্য এখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইদ মোবারক ইদ

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ২৫ শে জুন, ২০১৭ রাত ৯:৪০



কাছে কিংবা দূরে
যে যেখানে থাকো;
মহান আল্লাহকে
প্রাণ খোলে ডাকো।

সফলতা, সমৃদ্ধি .
ধরা দিক সবার করে;
যুলুম অত্যাচার
বন্ধ হোক ধরণীর পরে।
পবিত্র ইদের রাতে
এই হোক সবার কামনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×