somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... রুশদেশের সত্যিকথা ২০
অতএব রাশিয়ার হাতে দুটো রাস্তা খোলা ছিল, দক্ষিন আমেরিকার কেপ হর্ন অথবা দক্ষিন আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (আক্ষরিক অর্থেই দুনিয়া ঘুরে যাওয়া!) । রুশ অ্যাডমিরালরা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাবার পরিকল্পনা করলেন । রাশিয়া তখনো জাপানের নৌ শক্তি খাটো করে দেখছে! তাদের চোখে জাপানীরা ছিল এশীয় পশ্চাদপদ একটা দেশ । তাদের ঠাট্টা করে বলা হতো হলুদ বাঁদর! হলুদ বাঁদরেরা যে কতখানি এগিয়ে গেছে সেটা রুশরা ধারনাই করতে পারে নি । তৎকালীন রুশ নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন খোদ সম্রাটের চাচা গ্র্যান্ড ডিউক আলেক্সিস ।

ওদিকে পোর্ট আর্থারের অবস্থা ক্রমেই লেজে গোবরে হয়ে যাচ্ছিলো রুশদের জন্য । অ্যাডমিরাল তোগোর কমান্ডে ছিল হাতসুকে, শিকিশিমা, আসাহি, ফুজি আর ইয়াশিমা আর ফ্ল্যাগশিপ মিকাসা এই কটা ব্যাটলশিপ বা প্রথম ডিভিশান । সাথে আরো ছিল ইওয়াতে, আজুমা, ইজুও, ইয়াকুমো আর তোকিওয়া ক্রুইজারগুলো যেগুলো ছিল সেকেন্ড ডিভিশানের অন্তর্ভুক্ত ।

বিপরীত দিকে পোর্ট আর্থারের সুরক্ষিত পোতাশ্রয়ে ছিল পেত্রোপাভলস্ক, পোবেদা, সেভাস্তোপোল, পোল্তাভা, জারেভিচ আর রেতজিভান এই কটা ব্যাটলশিপ । এদের সাথে ছিল পাল্তাদা, দিয়ানা, নোভিক, আস্কোল্দ আর বয়ারিন এই কটা ক্রুইজার ।

আট তারিখ রাতের হামলায় জাপানী ট্রপেডো পালাদা আর রেতজিভানকে আঘাত হানবে । ব্যাটলশিপ রেতজিভান ছিল রুশদের সবচেয়ে শক্তিশালী জাহাজ এটাকে ঘায়েল করে জাপানীরা রুশদের শক্তি বলা যায় এক ধাক্কায় বেশ কমিয়ে দিয়েছিল ।

তবে রাত দুটোর দিকে রুশরা পুরো জেগে পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করেছিল । আজব ব্যাপার হচ্ছে সে দিন বন্দরের আশপাশে কোন টহল রাখা হয় নি । এতো গুলি জাহাজ নিয়ে তোগো এতো কাছে চলে এলেন কারও তেমন চোখে পড়ল না !

পরসিন সকাল আটটার সময়ে অ্যাডমিরাল তোগো তাঁর সহকারী ভাইস অ্যাডমিরাল শিগেতো দেওয়াকে চারটে ডেস্ট্রয়ার সহ পাঠালেন পোর্ট আর্থারের ক্ষয় ক্ষতি নিজের চোখে দেখে আসার জন্য ।

দেওয়া, সকাল ন'টার দিকে বন্দরের কাছাকাছি এসে সকালের কুয়াশা ভেদ করে যাখলেন তাতে তাঁর মনে হলো যে বন্দরে প্রায় বারোটার মত বড় যুদ্ধজাহাজ আছে যার তিন চারটে খারাপ ভাবে উল্টে আছে আর বন্দরের বাইরে যেসব ছোট জাহাজগুলো আছে সেগুলোর খুবই বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে ।

দেখে দেওয়ার মনে হলো (স্বভাবসুলভ ভাবেই দেওয়ার চারটি জাহাজ রুশদের চোখে পড়েনি বা তারা বা তাদের চোখে পড়লেও তারা কোনো ব্যাবস্থা নেয় নি ) রুশ নৌবহর খুবই আঘাত পেয়েছে গত রাতের হামলায় এবং তিনি খুব দ্রুত জাপানী নৌবহরের দিকে ফিরে তোগোর কাছে রিপোর্ট করে বললেন এখনই আবার হামলা চালালে রুশ নৌবহরকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যাবে । দেওবা যেটা জানতেন না যে রুশ নৌ বহর নিজেদের গুছিয়ে এনে পাল্টা আক্রমণের জন্য তৈরী হচ্ছে ।

দশটার দিকে আবারও পোর্ট আর্থারের দিকে এগিয়ে এল জাপানী নৌ বহরের প্রথম ডিভিশন । সাত হাজার গজ দূর থেকে রুশ জাহাজ বয়ারিন তোগোর জাহাজ মিকাসার দিকে গোলা বর্ষন করতেই তোগো বুঝলেন কিছু একটা গোলমাল হয়েছে । বারো ইঞ্চি কামান গুলো সব মাটিতে বসানো কামানের ব্যাটারিগুলোর দিকে তাক করে বাকি ছয় আর আট ইঞ্চি কামানগুলো রুশ জাহাজের দিকে ফেরানোর হুকুম দিলেন তোগো ।

কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ বাদেই আরেকটা শেল এসে মিকাসার চিফ এঞ্জিনিয়ার সহ পাঁচজন ক্রুর মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়ালো । বারোটা বিশের দিকে তোগো জাপানী নৌবহরকে ফিরে চলার হুকুম দিলেন । আঠারো ঘণ্টার লড়াইতে দেড়শো জন রুশ আর একশো বত্রিশ জন জাপানী নিহত হয়েছিল ।

মার্চের আট তারিখে রুশ অ্যাডমিরাল স্তেপান মাকারভ এসে আগের অ্যাডমিরাল স্তার্কের কাছ থেকে কমান্ডের ভার নিলেন । রুশরা যথেষ্ট উজ্জীবিত হয়েছিল নতুন রুশ নৌ সেনাপতিকে দেখে, মার্চের দশ তারিখে তিনি পাল্টা রুশ আক্রমনের নেতৃত্ব দিলেও ফলাফল সেই শুন্যই রয়ে গেল ।

কিন্তু বিধি বাম, পরের মাসেই মাকারভ তাঁর জাহাজ পেত্রোপাভলস্ক একটা মাইনের আঘাত পেলে সলিল সমাধি লাভ করলেন । রুশ পূর্বাঞ্চলীয় নৌ বহরে আবার হতাশা নেমে এল । অ্যাডমিরাল ভিলহেল্ম ভিটগেফ্ট ( রুশ সশস্ত্র বাহিনীর একটা উল্ল্যেখযোগ্য অংশ ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভুত রুশ) কমান্ডের দায়িত্ব নিলেন ।

অ্যাডমিরাল ভিটগেফ্ট এরও বরাত খারাপ, কারন এর পরের মাসেই জাহাজের ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে একটা জাপানী শেল এসে পড়ায় তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায় । আবারো কান্ডারী বিহীণ হয়ে পড়ে রুশ প্রাচ্য অঞ্চলের নৌ বহর । তবে তোগো খুব একটা শান্তিতে ছিলেন না, তাঁর বহরের দুটো ব্যাটলশিপ ( যেগুলো সবচেয়ে ভারী ও শক্তিশালী জাহাজ, যেগুলোকে "ক্যাপিটাল শিপও বলা হতো) হারিয়েছেন ।

পোর্ট আর্থারে ঘাঁটি গেঁড়ে বসা রুশ নৌবহরকে বের করে এনে খোলা সাগরে লড়াই করে তাদের ঘায়েল করার পরিকল্পনা বাদ গেছে । এবং অবশ্য্গি তিনি জানতে পারছেন আরেকটা রুশ নৌবহর যত দেরীতেই হোক প্রশান্ত মহাসাগরে চেহারা দেখাবে এবং তাদের সাথেও লড়তে হবে তোগোর জাপানী নৌ বহরকে ।

ওদিকে, মাটিতে রুশ সেনা বাহিনীর ভাগ্য একই রকম নেতিবাচক ছিল । মে মাসেই জাপানী সেকেন্ড আর্মির জেনারেল ইয়াসুকাতা ওকু লিয়াওদং উপদ্বীপে সৈন্য অবতরণ করালেন ও নানশানে যুদ্ধে কিনচৌ দখল করে নিলেন । জেনারেল মারেসুকে নোগির থার্ড আর্মি কোরিয়াতে নামল আর জেনারেল মিচিতসুতা নোদজু, মাঞ্চুরিয়ান উপদ্বীপে সৈন্য চালনা করলেন । মে এর এক তারিখেই স্থল বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তামেমোতো কুরোকি, ইয়ালু নদীর ওপাশে উইজি শহরের রুশদের প্রধান ঘাঁটির দখল নিলেন ।


ছবি ১: যুদ্ধের প্রথম দিকে

ছবি ২: জেনারেল কুরোকি দূরবীন দিয়ে ইয়ালুর নদীর অপরপার পর্যবেক্ষণ করছেন

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28741049 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28741049 2007-10-29 21:00:06
রুশদেশের সত্যিকথা ১৯
কিন্তু রাশিয়ানরা গবেটের মতো এর কোনো উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করে নি । পরের বছর ফেব্রুয়ারী মাসেও রুশ পররাষ্ট্র দফতরের কাছ থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে রাশিয়া ত্যাগ করার নির্দেশ পান । ফেব্রুয়ারীর ছয় তারিখে জাপান, রাশিয়ার সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ।

ফ্রেব্রুয়ারীর আট তারিখে জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলো । আসলে যুদ্ধ ঘোষনার আগেই জাপানের নৌ ও স্থল বাহিনী আক্রমণের জন্য শক্ত অবস্থান নিয়ে ফেলেছিল । জার নিকোলাসের জন্য এটা ছিল বড় রকমের একটা ধাক্কা, ক্ষুদে জাপান যে বিশাল রাশিয়ার বিরুদ্ধে যু্দ্ধ ঘোষনা করবে এটা তিনি ভাবতেও পারেন নি এবং তাঁর সামরিক উপদেষ্টারাও সেরকম কোনো আভাস দেয় নি । আট দিন পরে রাশিয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে জাপানের বিরুদ্ধে যু্দ্ধ ঘোষনা করে ।

ফেব্রুয়ারীর আট তারিখ রাতে, অ্যাডমিরাল হেইহাচিরো তোগো পোর্ট আর্থারের উপর নৌ আকস্মিকভাবে আক্রমণ শুরু করেন, রাত গড়িয়ে যখন সকাল হচ্ছে তখনও জাপানের আক্রমণ অব্যাহত ছিল । কিন্তু তোগো খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছিলেন না, তিনি ভেবেছিলেন রাশিয়ানরা পাল্টা আক্রমণ চালাবে । কিন্তু রুশ নৌবহর, পাল্ট আক্রমনে যেতে কোনো আগ্রহ দেখালো না, আর বন্দরটা মাটিতে স্থাপিত কামানের ব্যাটারি দিয়ে চমৎকার ভাবে সুরক্ষিত ছিল ।

অ্যাডমিরাল তোগো ভুল তথ্য পেয়েছিলেন স্থানীয় গুপ্তচরদের কাছ থেকে । টিকটিকিরা জানিয়েছিল যে পোর্ট আর্থার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় কঠিন প্রতিরক্ষা আছে । আসলে রুশরা তাদের তহবিলের একটা বড় অংশ খরচ করেছিল কাছের দালনি নামে একটা জায়গার পিছনে এবং আক্রমণে রাতে রুশ অফিসারদের একটা বড় অংশ দালনিতে পার্টিতে ব্যাস্ত ছিল । গুপ্তচরদের কথায় প্রভাবিত হয়ে তোগো তাঁর সবচেয়ে মুল্যবান জাহাজগুলোকে তীরের খুব কাছে আনেন নি । নাইলে সে রাতেই হয় তো পোর্ট আর্থারের পতন ঘটতো ।

তবে এই নৌ আক্রমণ, কোরিয়াতে জাপানের স্থল আক্রমণের জন্য চমৎকার কাভার সৃষ্টি করল । জাপানী বাহিনী, কোরিয়ার ইনচেওনে সৈন্য নেমে পড়ল ও সিওল সহজেই তাদের কব্জায় চলে এল । জেনারেল কুরোকি ইতেই এপ্রিলের শেষের দিকে পুরো কোরিয়ান উপদ্বীপের দখল নিয়ে ইয়ালু নদী পার হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । ইয়ালুর ওপারেই রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকা ।

এই পর্যন্ত বলা যায় সবকিছুই জাপানের নিয়ন্ত্রণে ছিল । রুশরা সাইবেরিয়ার হাজার হাজার মাইল, বিশাল প্রান্তর পেরিয়ে সৈন্য পাঠাতে গিয়ে যথেষ্ট বিপাকে পড়ছিল অপর দিকে গোটা এলাকাটা ছিল একেবারে বাড়ির পিছনের উঠানের মতো । রাশিয়ার অন্য দুটো নৌ বহর ছিল কৃষ্ণ সাগর আর বাল্টিক সাগরে । রাশিয়া বাল্টিক সাগর থেকে তাদের সবচেয়ে বড় নৌ
বহরের উল্লেখযোগ্য জাহাজগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠাতে মনস্থ করল ।

ছবি: পোর্ট আর্থারের তেলের ডিপোতে অগ্নিকান্ড]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28740777 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28740777 2007-10-28 21:00:46
রুশদেশের সত্যিকথা ১৮
১৯০৩ সালের দিকে রুশ-জাপান বিরোধ দানা বেঁধে উঠল আবার । জাপান সবে চীনে আরেকটা বড় রকমের যুদ্ধ শেষ করে এনেছে । কোরিয়ান উপদ্বীপ বা মাঞ্চুরিয়ান উপদ্বীপ কোনোখানেই জাপান আর দশ বছর আগের মতো কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিল না ।

অবশ্য জাপানের পিছনে ব্রিটেনের পরোক্ষ মদদ ছিল । রুশ সম্রাট ভিক্টোরিয়ার নাত-জামাই হলে কী হবে সাম্রাজ্যের স্বার্থ তো তা বলে ছাড় দেয়া যায় না! জাপান বলতে গেলে তখন ব্রিটেনের হয়ে একটা প্রক্সি যুদ্ধের সুচনা করল । ব্রিটিশের হাতে তখন ছিল চীনের হংকং সহ অনেক বানিজ্যিক সুবিধা বা কনসেশান, ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফ্রিকার অনেকটা জায়গা ।

দক্ষিন আফ্রিকা যা আদতে ডাচদের রাজ্য ছিল, ব্রিটেন যথেষ্ট ছলে বলে কৌশলে ঊনিশশতকের মাঝামাঝি সময়ে বাগাতে পেরেছিল । সোনা ও হীরের দেশের আগের ঔপনেবেশিক ওলন্দাজরা ( যারা নিজেদের আফ্রিকানার বা বোয়ার বলতো) ইংরেজের উপর বিশেষ প্রীত ছিল না । তাই তারা ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা আঁটতে থাকে ।

এবং দক্ষিন আফ্রিকার বোয়াররা প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় বিদ্রোহ ঘোষনা করে বসে বিংশ শতাব্দী শুরু হবার সাথে সাথে--যুদ্ধটা ইতিহাসে বোয়ার যুদ্ধ বলেই পরিচিত । দক্ষিন আফ্রিকা ছিল সুয়েজের মতোই ভারতবর্ষে যাবার একটা খুব গুরুত্বপুর্ণ সমুদ্র পথ । ব্রিটিশ সিংহ বিস্তর কাঠ খড় পুড়িয়ে এ বিদ্রোহ দমন করতে পেরেছিল ১৯০২ সালের দিকে ।


এর মধ্যে ভিক্টোরিয়ার আরেক নাতি দ্বিতীয় ভিলহেল্ম বোয়ার পক্ষে বেশ কিছু বিবৃতি দিয়ে বসেন যা নানীর দেশের লোকদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা বেশ কমিয়ে দেয় (নামিবিয়া, তাঞ্জানিয়া আর উগান্ডা তখন জার্মান উপনিবেশ ছিল. অর্থাৎ দক্ষিন আফ্রিকার ব্রিটিশ প্রভাবমুক্ত হলে সেখানে জার্মান প্রভাব স্বয়ংক্রিয় ভাবেই বেড়ে যেত) । মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তখন দক্ষিন আফ্রিকায় ছিলেন, তাঁর আত্বজীবনীতে এসবের কাননিক বিবরণ আছে ।

ব্রিটিশের আরেকটা দুঃস্বপ্ন ছিল রুশ সাম্রাজ্য হিন্দুকুশ প্রবতমালা পার হয়ে হয় ভারতবর্ষে হাত বাড়াবে অথবা সাইবেরিয়ার ওদিকটা থেকে চীনে প্রভাব বলয় বিস্তার করবে । পুর্ব ইউরোপে স্লাভ জাতি অধ্যুষিত এলাকায় রুশ প্রভাব বিস্তারও ব্রিটিশের রাতের ঘুম নষ্ট করার আরেকটা কারন ।

যে জন্য উদীয়মান জাপানের সাথে সে সময়ে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখেছিল ব্রিটিশ । যদিও জাপান যে কত অল্প সমবের মধ্যে কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠবে তা ব্রিটেন আগে জানলে বোধহয় আরেকটু ক, সাহায্য করতো ! ১৯০২ সালে জাপান আর ব্রিটেন একটা মৈত্রীচুক্তি করে যার একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে রুশ প্রভাব খর্ব করা ।

ব্রিটেনের রাজকীয় নৌবাহিনীর সাথে জাপানের সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট অমায়িক । বিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটেনে তৈরী হচ্ছিল জাপানের অনেক গুলো যুদ্ধজাহাজ । যার মধ্যে একটা ছিল "মিকাসা" সে যুগের তুলনায় ছিল যুগান্তকারী ভাবে আধুনিক।

মিকাসা বানানো হয়েছিল রয়্যাল নেভির ম্যাজেস্টিক ক্লাস যুদ্ধজাহাজকে মডেল করে । ওজন ছিল ১৫ ১৪০ টন ও ১৮ নট গতিতে চলতে পারতো । চারটা বারো ইঞ্চি কামান, চোদ্দটা ছয় ইঞ্চি কামান ও বিশটা তিন ইঞ্চি কামান ছিল জাহাজটাতে । আর বর্ম হিসেবে জাহাজটা মোড়ানো হয়েছিল জার্মানীর ক্রুপ কোম্পানির ইস্পাতের পাত দিয়ে । জাহাজটা ছিল জাপানী নৌ প্রধান, অ্যাডমিরাল হেইহাচিরো তোগোর নিজ্স্ব জাহাজ--বা ফ্ল্যাগ শিপ । সে যুগের সেরা যুদ্ধ জাহাজ ।

এখন যা চীনের লিওয়াদং উপদ্বীপ তখন তাই মাঞ্চুরিয়ার উপদ্বীপ বলে পরিচিত ছিল । এবং এখনকার দালিয়ান বন্দরটির কাছেই পোর্ট আর্থার বন্দরটি অবস্থিত । ১৮৫৯ সালের দিকে আফিমের যুদ্ধের সময়ে একটা আঘাত প্রাপ্ত ব্রিটিশ রণতরী এখানে একটি মাছধরা গ্রামে এসে ভেড়ে । জাহাজের কমান্ডারের নাম আর্থার হওয়াতে এটি পোর্ট আর্থার হিসেবে রাতারাতি পোর্ট আর্থার হিসেবে মানচিত্রে নাম করে ফেলে । রুশরাও সেই নামটাই ব্যাবহার করতো ।

আগেই বলেছি ১৮৯৫ সালের দিকে জোর খাটিয়ে রাশিয়া এ বন্দরটি কব্জা করে । তার পর থেকেই তারা একে শক্তিশালী করার চেষ্টায় ব্যাস্ত ছিল । কোরিয়া ছিল নাম কা ওয়াস্তে স্বাধীন ও রুশ-চীন ও জাপান এই ত্রিশক্তির বলয়ের অধীন । শুরুতে জাপানের কৌশল ছিল মাঞ্চুরিয়ার উপর জাপান দাবী ছেড়ে দেবে যদি রাশিয়া কোরিয়ার উপর দাবী ছেড়ে দেয় ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28740356 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28740356 2007-10-27 21:57:42
রুশদেশের সত্যিকথা ১৭
এশিয়ান মুল ভুখন্ডে উত্তর-পূবের তটরেখা যদি আমরা ভালো করে খেয়াল করি তাহলে দেখবো কয়েকটি উপদ্বীপ প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে বিস্তৃত। সবচেয়ে উত্তরের উপদ্বীপটি অবশ্যই রুশ সাইবেরিয়ার আগ্নেয়গিরি সমৃদ্ধ কামচাৎকা উপদ্বীপ । তারপরের সবচেয়ে বড় উপদ্বীপটি হচ্ছে কোরিয়ান উপদ্বীপ । প্রায় বাহাত্তর হাজার বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত কোরিয়ান উপদ্বীপ, ঊঈনিশ শতকের শেষ ভাগে আনাম, তিব্বতের মতই চীনের একটা করদ রাজ্য ছিল । চীনে তখন রাজত্ব করতেন মাঞ্চু বংশদ্ভুত চিং রাজবংশ ।

কোরিয়ান উপদ্বীপে এটাই জাপানের প্রথম আক্রমণ নয় । ষোড়শ শতকের শেষ দিকে জাপান বেশ কয়েকবার কব্জা করার চেষ্টা করেছে কোরিয়াকে । একবার তো এক জাপানী সেনাপতি হাজার হাজার কোরিয়ান বন্দীর নাক-কান কেটে কেটে এনে জাপানী কিয়োতো শহরের কাছে একটা ঢিবি বানিয়েছিলেন (!) । যে ঢিবির নাম 'মিমিজুকা' । তবে ১৫৯৮ সালের মধ্যেই জাপানের আক্রমণের গতি শ্লথ হয়ে একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায় । তার কারন কিছুটা কোরিয়ানদের অভিনব রণকৌশল আর চীনের মিং সম্রাটদের সরাসরি হস্তক্ষেপ । মিং রা বুজকতে পেরেছিলেন জাপানকে এশিয়াতে পা রাখতে দিলে চীনের প্রান্তিক রাজ্যগুলোর অবস্থা টলে উঠবে । তিনশো বছর পরে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ।

কিন্তু এবার কোরিয়ার আর জাপানের শিল্প-প্রযুক্তিতে আকাশ-পাতাল প্রভেদ । জাপান, প্রাশিয়ান বাহিনি কর্তৃক প্রশিক্ষিত হয়ে আধুনিক যুদ্ধ কৌশল সম্বন্ধে সম্পুর্ণ ওয়াকিফহাল আর কোরিয়া তখনো প্রায় মধ্যযুগে পড়ে আছে । ১৮৭৬ সালে জাপানীরা কোরিবার উপরে বৈষম্য মুলক গাংহোয়া চুক্তি চাপিয়ে দেয় । ১৮৮৪ সালে তারা চীনপন্থী কোরিয়ান সরকারকে উৎখাত করে গায়ের জোরে । ১৮৯২ সালে কোরিয়ার চাষীরা বিদ্রোহ করে অত্যাচারী জমিদার আর শাসকদের বিরুদ্ধে , বিদ্রোহীরা নিজেরদের বাহিনীকে বলতো 'তোংশাক বাহিনী'।


চীন আর জাপান (কোরিয়া তখন দুই শক্তির মধ্যে বলা যায় যৌথ ভাবে শাসিত হচ্ছিল ) এদের দমন করতে বাহিনী পাঠনোর উদ্যোগ নেয়ার আগেই তোংশাকদের বিদ্রোহ স্তমিত হবে আসে । ১৮৯৪ সালের ৮ ই জুন জাপানী নৌ-সেনারা প্রথম কোরিয়ান উপদ্বীপে সরাসরি অভিযান চালায় । প্রথম দফায় হাজার পাঁচেক সৈন্য নেমেছিল । বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে কোরিয়াতে সৈন্য পাঠানো উদ্দেশ্য আসলে ছিল চীনের কর্তৃত্ব যেটুকু আছে সেটাকেও খর্ব করে ফেলা ।

জুলাই মাসে আরো শেন্য এবং বলা যায় তৎকালীন জাপানী নৌবাহিনীর প্রায় সমস্ত যুদ্ধজাহাজ এসে ঘাঁটি গাড়ে কোরিয়াতে । সেপ্টেম্বরের পনেরো তারিখে জাপানী বাহিনী (এখন উত্তর কোরিয়ার রাজধানী) পিয়ং ইয়ং এর গ্যারিসন থেকে চীনা বাহিনীকে পরাস্ত করে অবশিষ্ট বাহিনীকে বের করে দেয় । পিয়ং ইয়ং এর পরাজয়ের খবর শুনে চীনারা কোরিয়া থেকে তাদের অবশিষ্ট সৈন্য প্রত্যাহার করে ইয়ালু নদীর তীরে তাদের প্রতিরক্ষা মুলক ব্যাব্স্থা গড়ে তুলতে থাকে ।

ডিসেম্বরের দিকে জাপানী সৈন্যরা কোরিয়ান উপদ্বীপ পার হয়ে মাঞ্চুরিয়ার ভিতরে লুশুংকাউ (পোর্ট আর্থার) দখল করে ফেলে । এবং শোনা যায় কয়েক হাজার বেসামরিক লোককে ১৮৯৪ সালের শেষ দিকে এই পোর্ট আর্থারে জাপানী সৈন্যরা হত্যা করে । এই শহরটির বর্তমান নাম হচ্ছে দালিয়ান । আর উপদ্বীপটির বর্তমান নাম লিয়াওদং উপদ্বীপ ।

পুরো লড়াইটাই সবগুলো ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল । রুশদের স্বার্থটা অবশ্য এর মধ্যে সবচেয়ে তীব্র । রাশিয়ানরা সবসময়েই প্রশান্ত মহাসাগরে একটা বরফ মুক্ত এলাকায় কিছু বন্দর দখলের পাঁয়তারায় ছিল ।কোরিয়াতো বটেই জাপান যুদ্ধজয়ের ফসল হিসেবে পুর্ব মাঞ্চুরিয়া উপদ্বীপটিও হাতিয়ে নেবার পাঁয়তারা কষছিলো (শিমোনোসেকির চুক্তি নামে চীনের সাথে একটা একতরফা চুক্তিও হয়ে গেছিল কাগজে-কলমে)এমন সময় ফ্রান্স-রাশিয়া আর জার্মানী এ ত্রি-শক্তি বাগড়া দিলো । উপদ্বীপ স্হ পোর্ট আরথার বন্দরটা ছেড়ে দিতে হলো রাশিয়ার কাছে ।

জাপানীরা কোরিয়ান উপদ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বসায় তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটেছিল । রুশরা সময় নষ্ট না করে পুর্ব মাঞ্চুরিয়ার পোর্ট আর্থার (লু শুং কাউ) একটা নৌ ঘাঁটি বসানোর কাজে লেগে পড়ল । এবং সে জন্য হার্বিন থেকে মুকদেন পর্যন্ত একটা রেললাইন বসানোর তোড়জোড়ও শুরু হয়ে গেল জোর কদমে । বছর দুই বাদে মানে ১৮৯৬ সালে রাশিয়া, চীনের উপর চাপ প্রয়োগ করে একটা ইজারার চুক্তিও করে ফেলল ।

উদীয়মান সুর্যের দেশের উদীয়মান নেতারা বিশেষ করে সমর নায়কেরা ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দেখেন নি । স্বার্থে আঘাত লেগেছে এরকম কটুভাব ছাড়াও নেপোয়ে দই মেরে দেয়াতে জাপানীরা ভীষন অপমানিত বোধ করছিল (হাজার হোক চীনকে লড়াইতে হারিয়ে ও জায়গার দখল নিয়েছিল ওরা!) । এতে প্রমানিত হলো এখনো জাপানের উপর খবরদারী করার ক্ষমতা আছে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর । এরকম অবস্থা চিরকাল থাকবে না এই প্রতিজ্ঞা নিবে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধজাহাজ বানাতে লেগে গেল জাপানীরা । নৌ-শক্তির উপরে কোনো শক্তি নেই তার প্রমান সব জায়গাতে পাওয়া যাচ্ছে । যেহেতু তখনও ভারী যুদ্ধজাহাজ বানানোর কৌশল জাপানের আয়ত্ব হয় নি সুতরাং ইউরোপে ফরমাশ দিয়ে বানানো হলো জাহাজগুলো । সবচেয়ে বেশী অর্ডার পেল বিলাতের ভিকার্স কোম্পানি ।

তখন ১৮৯৪-১৮৯৫ সালে যাই মনে হোক, আসলে আখেরে সাংঘাতিক মুল্য দিতে রাশিয়াকে এর জন্য !]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28739026 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28739026 2007-10-22 15:30:15
রুশ দেশের সত্যিকথা ১৬
চীনে তখন মাঞ্চু সম্রাটরা রাজত্ব করছেন । তাঁদের মধ্যযুগীয়, ঐতিহ্যবাহী শাসন-ব্যাবস্থা সাম্বরাজ্য লোলুপ, প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ইউরোপিয়ানদের থাবাতে ক্রমেই ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিল । ফরাসী ওলন্দাজ-পর্তুগিজ-রুশ এদের সাথে এই সাম্রাজ্য বিস্তারের মৃগয়াতে ইদানীং যোগ দিয়েছিল আমেরিকা আর জাপান । বিশেষ করে উদীয়মান সুর্যের দেশের সাথে রুশ সাম্রাজ্যের বিরোধ বাধাটা ছিল একেবারে অবধারিত ।

অণ্যান্য ঔপনোবেশিক শক্তি মুলতঃ বন্দর দখল করেই সন্তুষ্ট ছিল । কারন পশ্চিম-ইউরোপীয় সাম্রাজ্য প্রায় সর্বদাই বানিজ্য নির্ভর । 'সুবাসিত বন্দর' হং কং সেই ১৮৪২ সালেই ব্রিটিশ তার যুদ্ধ-জাহাজের কামানের মুখে চুক্তি করে নিজেদের বলে লিখিয়ে নিয়েছে । ম্যাকাউ অবশ্য আনেক কাল হয় পর্তুগিজদের হাতে । আনাম (ভিয়েতনাম) কব্জা করেছে ফরাসীরা । শাংহাই, নানকিং, আময় সবখানেই বহিরাগত শক্তি নিজেদের 'প্রভাবিত অঞ্চল' গঠন করে ছেড়েছে । তবে একেবারে গোড়া থেকেই জাপানীদের আগ্রাসনটা একটু অন্যরকম ছিল । এবং তাতে রুশদের টক্কর লাগাটা যাকে বলে খুব স্বাভাবিক পরিনতি ।

১৮৬৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে পনেরো বছর বয়স্ক প্রিন্স মুৎসোহিতো তাঁর বাবা সম্রাট কোমেইর স্থলে সিংআসনে বসে নতুন 'মেইজি' বা আলোকিত নতুন যুগের কথা ঘোষনা করলেন । এই 'মেইজি ডিক্লারেশানের' উপর আধুনিক জাপানের ভিত দাঁড়িয়ে আছে বললে খুব একটা ভুল হবে না । আর এই মেইজি ঘোষনার সাথে সাথেই দুইশো পয়ঁষট্টি বছর ধরে কায়েম তোকুগাওয়া শোগুন তন্ত্রের বিলোপ ঘটলো ও সম্রাট আবার তাঁর হারানো কর্তৃত্ব ফিরে পেলেন । তাই একে 'মেইজি রেস্টোরেশন' ও বলা হয় ।

শোগুনরা ছিলেন সেনাপতি ও শক্তিশালী সামন্ত শাসক । শোগুনতন্ত্রকের ইংরেজিতে বলা হতো 'শোগুনেট' আর জাপানীতে 'বাকুফু' । বাকুফু কথাটার অর্থ দাঁড়ায় 'তাঁবুর মধ্যে দফতর' । তাঁবু স্বাভাবিক ভাবেই মহড়ায় থাকা সেনাপতির দফতর । আর তাঁবু দিয়ে এরকম একটা রুপকও বলা যেতে পারে চালু ছিল যে শোগুনদের শাসন আসলে অস্থায়ী ।

প্রাচীনকালে, বলা যেতে পারে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই সম্রাটরা তাঁদের বিশ্স্ত অনুসারীদের এই সন্মানসুক উপাধী দিয়ে এসেছেন । কিন্তু ষোলোশো সালের দিকে তোকুগাওয়া লেয়াসু নিজেই ক্ষমতা দখল করে শোগুন উপাধী নিয়ে দেশের কার্যকর ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেন । তাঁর ঘাঁটি ছিল 'এদো' (আজকের টোকিও), ক্ষমতাহীণ সম্রাটরা থাকতেন প্রাচীন ও পবিত্র নগরী কিয়োতোতে । ১৬০০-১৮৬৮ এই সময়টাকে তাই 'এদো পিরিয়ড' ও বলা হয়ে থাকে ।

মুৎসোহিতো এই নতুন যুগের স্বর্নালী আবির্ভাবকে স্মরণীয় করে রাখতে নিজেই সম্রাট 'মেইজি' নাম নিয়ে নিলেন । সম্রাট মেইজি, কিয়োতো থেকে টোকিওতে রাজধানী সরিয়ে আনলেন । ঊনিশশো বারো সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ পয়ঁতাল্লিশ বছর রাজত্ব করবেন মেইজি । এবং এ সময়ের মধ্যেই একটি পশ্চাদপদ মধ্যযুগীয় রাষ্ট্র থেকে আধুনিক বিশ্ব-শক্তিতে পরিনত হবে মেইজি-শাসিত জাপান ।



সে যাই হোক ১৮৭০ এর দশকে জাপান দ্রুত শিল্পায়ন ও আধনিকায়নের দিকে অগ্রসর হলো । ঐতিহ্যবাহী সামুরাই প্রথা (অনেকটা ভারতীয় ক্ষত্রিয়ের মতো) বিলোপ করে জাপান আধুনিক ও শক্তিশালী নৌ ও সেনা বাহিনী গঠনের দিকে নজর দিল । সে যুগের সেরা নৌ বাহিনী ছিল ব্রিটিশদের রয়্যাল নেভি আর শৃঙ্খলা ও কারিগরি দিক থেকে শ্রেষ্ঠ স্থল বাহিনী হিসেবে ধরা হতো প্রাশিয়ান তথা জার্মান সেনাবাহিনীকে । উদীয়মান জাপানী নৌ ও সেনা ক্যাডেটদের অনেককেই এই দুই দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হলো ।

প্রচুর বিদেশী সামরিক প্রশিক্ষককেও মোটা টাকা দিয়ে আনা হলো জাপানীদের রণকৌশল আর ফৌজি কেতা কায়দা শেখানোর জন্য । আঠারোশো একাত্তর সালে ব্রিটেনে যেসব নৌ ক্যাডেটদের পাঠানো হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হেইহাচিরো তোগো (নামটা অনেক সময়ে 'তোগো হেইহাচিরো' এভাবেও লেখা হয় । 'তোগো' পারিবারিক পদবী), পরবর্তীকালে তিনি জাপানী নৌবাহিনীর প্রধানে পদ অলংকৃত করবেন । ১৮৭১ সাল থেকে সাতাত্তর সাল পর্যন্ত বিলাতে ছিলেন তোগো ।


*ছবি-সম্রাট মেইজি

গ্রুপছবি, ১৮৬৯ সালে যুদ্ধ-জাহাজ কাসুগাতে হেইহাচিরো তোগো (পিছনে, শাদা কিমোনো পরিহিত)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28736754 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28736754 2007-10-10 22:02:06
রুশদেশের সত্যিকথা ১৫
এই দুই সম্রাট আবার সম্পর্কে জ্ঞাতি ভাই ছিলেন । আলিক্সের মতো ভিলহেল্ম ভিক্টোরিয়ার আপন মেয়ের ঘরের নাতি । রাণী ভিক্টোরিয়া তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকে প্রাশিয়ার যুবরাজ ওতৃতীয় ফ্রিডরিখের (ইংরেজিতে ফ্রেডারিক) কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন । এতে অবশ্য রাজকীয় প্রটোকল খুব ক্ষুন্ন হয় নি ।

জন্মগতভাবে জ্যেষ্ঠতা সবসময় মেয়েদের সিংহাসনের দাবীদার করতো না (সপ্তম এডওয়ার্ড আসলে ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় পুত্র) । ভিক্টোরিয়ার কন্যা (তাঁর নামও আবার ভিক্টোরিয়া!) কন্যা যখন জার্মানীতে শ্বশুর বাড়িতে আসেন তখন তাঁর শ্বশ্বুর সম্রাট প্রথম ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ প্রাশিয়ার সম্রাট ।

শ্বশুর সাহেব অষ্টাদশ শতকে জন্মেছিলেন । এবং মার্শাল ব্ল্যুখারের বাহিনীর হয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন অল্পবয়সে । ১৮৩০ আর ১৮৪৭ এর বিপ্লব তাঁর জীবদ্দশাতেই হয়েছে । সে সময় জার্মানী বলে কোনো দেশ অবশ্য ছিল না । প্রাশিয়ার রাজারাই জার্মান রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী । প্রধানমন্ত্রী বিসমার্কের কুটনীতি ও নানাবিধ ধড়িবাজির ফলে তাঁরা প্রায় সমস্ত জার্মানভাষী অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব আরোপ করেন (অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ার সাম্রাজ্য আর সুইজারল্যান্ড বাদে) ।

১৮৭০ সালে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সকে হারানো প্রাশিয়ার জন্য সোনায় সোহাগা হয়েছে বলা যায় । ১৮৭১ সালে বিসমার্কের পরামর্শে প্রাশিয়ার প্রথম ভিলহেল্‌ম নিজেকে প্রাশিয়ার রাজা ও জার্মানীর সম্রাট ঘোষনা করেন ।

ভিলহেল্ম পুত্র ও ভিক্টোরিয়া জামাতা ফ্রিডরিখ বা তৃতীয় ফ্রিডরিখ অতীব সজ্জন ব্যাক্তি বলে ইউরোপময় সুবিদিত ছিলেন । তবে তাঁকে সিংহাসনে বসার জন্য সাতান্ন বছর বসে থাকতে হয়েছিল । নব্বই বছর বয়সে তাঁর বাবা পরলোক গমন করেন ১৮৮৮ সালের ৯ ই মার্চ । বিধিবাম, মসনদে মাত্র নিরানব্বই কর্মদিবস তিনি আসীন ছিলেন । এবং এর মধ্যে প্রত্যেকটি দিনই প্রাণঘাতী ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে কেটেছে । কিন্তু তার আগের বছর নভেম্বর মাসেই ফ্রিডরিখের ল্যারিংক্সের ক্যান্সার ধরা পড়ে

ডাক পড়ল সে যুগের সেরা নাক-কান ও গলা বিশেষজ্ঞ, ব্রিটিশ ডাক্তার স্যার মোরেল ম্যাকেঞ্জির পরীক্ষায় । ম্যাকেঞ্জি, ফ্রিডরিখের গলা থেকে খানিকটা টিস্যু তুলে পরীক্ষা করে বললেন 'এ খুব সম্ভবত ক্যান্সার নয়,' এবং অপারেশান করে ল্যারিংক্স কেটে ফেলে দেবার বিরোধিতা করলেন তিনি । এই নিয়ে ফ্রিডরিখের জার্মান চিকিৎসক, বের্গমান আর ফিরখোভের খানিকটা মতবিরোধ দেখা দিলো স্যার ম্যাকেঞ্জির ।

ব্যাপারটা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ডাক্তারদের (এবং পারিষদদের মধ্যে) খানিকটা হাউকাউ লেগে গেল । জার্মান-ব্রিটিশের প্রতিদ্বন্দীতা (যদিও ফ্রিডরিখ ব্রিটিশ মহারাণীর জামাতা) আছেই, তার সাথে আরো যোগ হয়েছিল ক্যান্সারের মতো নিরাময় অযোগ্য কোনো রোগ নিয়ে কেউ নতুন বর্ধিত জার্মান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসতে পারবে কি না ।

ফ্রিডরিখ যদি সিংহাসনে বসতে না পারেন বা উত্তরাধিকার ত্যাগে বাধ্য হন তাহলে নিঃসন্দেহে তাঁর পুত্র ভিলহেল্‌ম বসবেন মসনদে । এটা পরবর্তীকালে খুব পরিস্কার হয়ে উঠেছিল যে চিকিৎসক দের একটা বড় অংশ রাজনৈতিক ঘোঁট পাকানোর শরিক ছিলেন ।

ব্যাপারটা পরিস্কার হলো যখন ফ্রিডরিখের মৃত্যুর পরে জার্মান চিকিৎসকরা একটা 'প্রাক্তন সম্রাটের অসুস্থতা' বলে একটা শ্বেতপত্র ধাঁচের রিপোর্ট প্রকাশ করে ফেললেন । স্যার ম্যাকেঞ্জি বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? তিনিও একটা পাল্টা বই ছেপে ফেললেন, এবং সেজন্য রোগীর গোপন ও ব্যাক্তিগত তথ্য প্রকাশের জন্য রয়্যাল কলেজ অভ সার্জন কর্তৃক ধাতানি খেলেন ।

মোদ্দা কথা হলো এই যে তৃতীয় ফ্রিডরিখে দুঃখজনক মৃত্যুর পরে তাঁর জেদী ও উচ্চভিলাষী পুত্র ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম দ্বিতীয় ভিলহেল্ম নাম নিয়ে ১৫ ই জুন ১৮৮৮ সালে গদিতে বসলেন । ঘটনাটা পৃথবীর ইতিহাসে সাংঘাতিক প্রভাব ফেলবে সোয়া শতাব্দী পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুচনায় । ঐতিহাসিকদের অনেকেরই ধারনা তৃতীয় ফ্রিডরিখ বেঁচে থাকলে তিনি জার্মানীকে উচ্চভিলাষী, সাম্রাজ্যবাদী সামরিকীকরণের পথে হাঁটতেন না । অন্তত তাঁর কর্মকান্ড চিঠিপত্র থেকে তাঁকে শান্ত মেজাজের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শাসক বলেই মনে হয় ।

আর এই দ্বিতীয় ভিলহেল্মই হচ্ছেন নিকির কাজিন "ভিলি" !

আঠারোশো উনষাট সালে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার এই প্রথম নাতিটির জন্ম । জন্মটি ছিল জটিল এক সিজারিয়ান বার্থ, কর্তব্য ডাক্তারের ফর্সেপের টানে ভিলহেল্মের বাঁ হাতটা প্রায় অচল হয়ে যায় । অচল ও কুঁকড়ে যাওয়া হাতটি ভিলহেল্ম বিশেষ ভাবে বানানো একটা পকেটে লুকিয়ে রাখতেন । নাকে রনীচের পেল্লাই গোঁফটাও হতে পারে নষ্ট হাতটা থেকে নজর ফেরানোর কৌশল । দ্বিতীয় ভিলহেল্মের যতগুলি অফিশিয়াল ছবি আছে তার কোনোটাতেই হয় বামহাতটা ভাল করে দেখা যায় না, অথবা বাঁ হাতটা কায়দা করে কোনো ছড়ি তরবারীর বাঁটে রাখা ।

অবশ্য ডানহাতে প্রচন্ড শক্তি রাখতেন জার্মান সম্রাট । যে সব অধীনস্থদের সম্রাটের সাথে করমর্দন করার দুর্ভাগ্য হয়েছে তাঁরাই বলেছেন আক্ষরিক অর্থেই বজ্রমুষ্ঠি ছিল সম্রাটের । হাতের আংটিগুলো আবার উল্টো করে মানে পাথরগুলো নীচের দিকে দিয়ে পরতেন সম্রাট যাতে হাড়ে হাড়ে হাতের চাপ টের পাওয়া যায় !

ভিলহেল্ম তাঁর কাজিনের সাথে ইংরেজিতেই লেখতে । চিঠির নীচে সই থাকতো "Your Dear Cousin Willy" . নিকিও একই ভাবে চিঠিতে স্বাক্ষর করতেন । দুনিয়াদারী সম্বন্ধে খানিকটা অজ্ঞ জ্ঞাতি ভাইটিকে নানান বিপদজনক পরামর্শ দিয়েছিলেন ভিলহেল্ম । বয়সে প্রায় নয় বছর বড় হওয়াতে মুরুব্বিয়ানা ফলাতে বেশ সুবিধা ছিল ভিলির । এগুলোর মধ্যে ছিল 'পীত বিপদ' বা ইয়েলো পেরিল সম্বন্ধে রাশিয়াকে 'সতর্ক' করা ।

'পীত' হচ্ছে এশিয়ানরা, বিশেষ করে চীন ও জাপানীদের উদ্দেশ্য করে বলা । হুঁশিয়ার না হলে এশিয়ানরা পুরো দুনিয়াটা গিলে ফেলবে । এবং এ ব্যাপারে অর্থাৎ পীত বিপদের হাত সভ্য ইউরোপকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে রাশিয়ার একটী পবিত্র কর্তব্য আছে । আশা করা যায় কাজিন নিকি এ ব্যাপারে অবগত আছেন । একবার ভিলহেল্ম, নিকিকে একটা তৈলচিত্র পাঠালেন যাতে নিকি আর ভিলির ছবি আঁকা ছিল ।

ভিলহেল্ম লোহার বর্ম পরে দাঁড়িয়ে আছেন, নীচে বাইজান্টাইন আলখেল্লা পরা উবু হয়ে বসে থাকা নিকি প্রশংসা ও সমভ্রমের সাথে তাকিয়ে আছেন ভিলির দিকে, তাঁদের পিছনে সমুদ্রের দৃশ্য; সেখানে অনেকগুলো যুদ্ধজাহাজ ভেসে যাচ্ছে । ছবির সাথে একটা চিঠিও দিয়েছিলেন তাতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল । নিকিকে তিনি 'প্রশান্ত মহাসাগরের অ্যাডমিরাল' মনে করেন আর নিজেকে আটলান্টিকের নৌ সেনাপতি, ছবিটা তারই প্রতিকৃতি । জাপানের দিকে নজর রাখতে হবে, আবার মনে করিয়ে দিলেন ভিলহেল্ম ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28734847 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28734847 2007-10-01 15:58:03
রুশদেশের সত্যিকথা ১৪
অনেক ব্যাপারেই তাঁরা বহুমত পোষন করতেন, তবে তার মধ্যে প্রধান ছিল মার্ক্সিয় তত্বকে কীভাবে বাস্তবের সাথে মেলাবেন । যেহেতু মার্ক্স মুলতঃ শিল্পপ্রধান পশ্চিম ইউরোপ বা আমেরিকাকেই সমাজতন্ত্র বিকাশের মডেল হিসেবে ধরেছিলেন, এবং মার্ক্সীয় দর্শনের একটা বড় উপজীব্য বিষয় হচ্ছে সমাজের দীর্ঘানূক্রমিক বিবর্তন । শিকারজীবিরা পশুচারী হয়েছে, তা থেকে তারা কৃষিজীবিতার পর্যায় অতিক্রম বানিজ্যিক যুগ পার হয়ে শিল্পায়নের দিকে এগিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি । এইখানে অনগ্রসর, পশ্চাদপদ রুশ সমাজের অবস্থানটা ঠিক কোথায়?

তাঁরা কী রাশিয়াকে শিল্পোন্নত হয়ে ওঠার সুযোগ দেবেন? নাকি এখনই কৃষককে সমাজের ভিত্তি ধরে এগিয়ে যাবেন? মার্ক্সীয় তাত্বিকদের একাংশ শহুরে শ্রমিককেই 'প্রোলেতারিয়েতের অগ্রপথিক' হিসেবে ধরেছেন । তাঁরা কী সমস্ত জনগনকে তাঁদের কাছে টানবেন? নাকি পার্টি হবে পেশাদার হার্ডকোর বিপ্লবীদের নিয়ে ? আরো একটা কথা ক্ষমতা দখলের কৌশলই বা তাঁরা কী ভাবে নির্ধারন করবেন?

উনিশশো সালেই জার্মানীর লাইপসিগ থেকে 'ইস্ক্রা' নামের বিখ্যাত পত্রিকাটি বের হতে শুরু করে । তবে এটাও আরো অনেক বিপ্লবী লিটল ম্যাগাজিনের একটা । মিউনিখ, লন্ডন আর জেনিভা থেকেও সেটার অনেক সংস্করণ ছাপা হবে । প্রথম দিকে এটার দায়িত্বে ছিলেন লেনিন আর ইলিয়া মার্তভ ।

কিন্তু মাঝখানে সম্পাদনা পরিষদের সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে লেনিন ইস্ক্রা থেকে চলে যান ১৯০৩ সালে । এ সময়েই পরবাসী রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ভাঙ্গনটা প্রথম প্রকট ভাবে দেখা গেল । যার রেশ একশো বছর পরেও ঐতিহাসিকভাবে অনুভুত হচ্ছে ।

১৯০৩ সালের অগাস্ট মাসে ব্রাসেলস আর লন্ডনে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেস বসল । এখানেই লেনিন , পার্টির সদস্যপদ কেবল পেশাদার কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত রাকার প্রস্তাব দিলেন । লেনিনের খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ইলিয়া মার্তভ এ ব্যাপারে একমত হলেন যে পার্টির একেবারে ভিত্তিভুমি পেশাদার বিপ্লবীদের দিয়েই গঠিত হতে হবে কিন্তু তিনি এটাও জোর দিলেন পার্টির সদস্য পদ সকলের জন্যই উন্মুক্ত থাকা প্রয়োজন, এমন কী সমমনা দলগুলোর সাথেও সাযুজ্য থাকা প্রয়োজন ।

প্রথমে তাদের এই বিরোধটা একেবারেই সাধারন বলে মনে হয়ে ছিল । কিন্তু ফাটলটা ক্রমেই বেড়ে গেল । গেওর্গি প্লেখানভ শুরুতে লেনিনের সাথেই ছিলেন, কিন্তু তিনিও আবার পক্ষত্যাগ করলেন । দু' দলের নাম হলো বলশেভিক (সংখ্যাগুরু) বা কট্টরপন্থী আর মেনশেভিক (সংখ্যালঘু) বা উদারপন্থী ।

আরো কিছু কারন অবশ্যই ছিল যার মধ্যে একটা ছিল ইস্ক্রার পরিচালনা পরিষদে কে থাকবে সেই বিতর্ক । ওই সময়েই লেনিন তার "কী করতে হবে ?" (চতো দেলাত?) নামের রচনাটা লেখেন । ওই নামে নিকোলাই চের্নিশেফস্কির একটা উপন্যাস আছে অবশ্য এবং উপন্যাসটি রুশ বিপ্লবীদের অনেককই বিপ্লবে ‌উদ্বুদ্ধ করেছে বলা যায় ।

লেনিন যেটা বলে চেয়েছিলেন যে যথেষ্ট কট্টরপন্থী একটা পার্টি না থাকলে শ্রমিক শ্রেণি ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে । সুতরাং কেবল একটা প্রকৃত বিপ্লবী দলই পারে ' বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' আমদানী করতে ।

১৯০৩ সালের কংগ্রেসটা ব্রাসেলসে শুরু হলেও বেলজিয়ান পুলিশ ডেলিগেটদের একটা বড় অংশকে বেলজিয়াম থেকে বহিস্কার করলে তাঁরা সব লন্ডনে জড় হন । এই সময়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের একটা বড় বা উল্লেখ্যযোগ্য অংশ ছিল ইহুদী ট্রেড ইউনিয়ন বা 'বুন্ডিস্ট' রা ।

একটা কথা অবশ্য মনে রাখতেই হবে এইসব জার বিরোধী বা পুঁজিবাদ বিরোধিতায় ইহুদীদের ভুমিকাটা ছিল উল্লেখযোগ্য । নিপীড়িত সংখ্যালঘু হিসেবে যে কোনো বিপ্লবী কর্মকান্ডে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহন বা ভুমিকা থাকবে এটা খুব অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয় ।

কংগ্রেসের ভোটাভুটিতে লেনিনের হার্ডলাইনার দের পক্ষেই বুন্ডিস্ট দের একটা বড় অংশের ভোট পড়ে । তবে সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এটাকে বিচার করলে ভুল হবে । কারন লেনিনের প্রতিপক্ষদের ইলিয়া মার্তভ (আসল নাম ইউলি ওসিপোভিচ সেদেরবাউম) ও লিওন ত্রতস্কি (লিওন দাভিদোভিচ ব্রনস্তাইন) ও ও অন্তত জন্মসুত্রে ইহুদী ছিলেন ! বুন্ডিস্টদের ভোটেই 'বলশেভিক' বা সংখ্যাগুরু নাম নেয় হার্ডলাইনাররা । বাস্তবে তাদের সংখ্যাটা অত বেশি ছিল না ।

সে যুগের ইংরেজি প্রকাশনায় বলশেভিকদের 'ম্যাক্সিমালিস্ট' আর মেনশেভিকদের 'মিনিমালিস্ট' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে বেশ কিছু জায়গায় । আসলে দুটো নামই খানিকটা বিভ্রান্তিকর ও ভুল । বলশেভিকরা শুরুতে সংখ্যায় কম ছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত তাদের সংখ্যাটা বলা যায় স্থিতিশীল ছিল । তারপরে বেড়ে যায় । সত্যি বলতে কী সতেরো সালের বিপ্লবের পরে এসব শব্দের অর্থই পুরো পাল্টে গেছে বলা চলে ।

এ সব অবশ্য সমস্ত প্রবাসী আন্দলনের অবশ্যাম্ভাবী ফল । বিদেশের মাটিতে, তাও এতো গুলো ভিন্ন দেশে বসে পার্টি চালাতে গেলে আরো ভাঙন মনে হয় প্রাপ্য ছিল । আদর্শিক শুচিবায়ুতার কথা না হয় নাই বললাম ।

কিন্তু এসব ভাঙনের চেয়ে তাঁরা যে ব্যাপারটা আরো বেশি ভয় করতেন সেটা হচ্ছে পার্টির ভিতরে জারের গুপ্ত পুলিশ বা 'ওখ্রানা' র অনুপ্রবেশ । ডানপন্থী-বামপন্থী, উগ্রপন্থী-নরমপন্থী সবার উপরেউই কড়া নজরদারীর ব্যাবস্থা রেখেছিল রুশ সরকার । বেশ কিছু টাকা খাওয়া এজেন্ট এগুলোর মধ্যে যাকে বলে সেঁধিয়ে গিয়েছিল অত্যন্ত সফলভাবে । জারের বেশ কিছু পেটোয়া সংস্থাও ছিল যারা বিপ্লবের নাম ভাঁড়িয়ে বিভেদ আর কেলেংকারী ঘটাতো ।

এসব কিছুর প্রধান ছিলেন কর্নেল সের্গেই জুবাতভ (১৮৬৪-১৯১৭) । জুবাতভ অল্প বয়সে আবার বিপ্লবী ছিলেন , পরে কোর্তা বদল করেন । জুবাতভের একটা গুন ছিল যে মাঝে মাঝে তিনি ইন্টারোগেশনের সময়ে বিপ্লবীদের ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করাতে রাজী করাতে পারতেন ।

এবং তিনি সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে শুধু নিপীড়নে মানুষের বিপ্লব দমন করা যাবে না । সরকারপন্থী কিছু ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে তারা অনেকটা ক্ষোভ প্রশমন করতে পারবে । বিপ্লবী মহলে জুবাতভের ইউনিয়নগুলোর নাম হয় 'পুলিশ ইউনিয়ন' ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28726166 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28726166 2007-08-16 16:17:48
রুশদেশের সত্যিকথা ১৩
কখন বলেছেন? ১৮৭০ এর দশকে যখন কোনো মার্ক্সিস্ট রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা একেবারেই একাডেমিক বা বিপ্লবী স্বপ্ন । এই ভবিষ্যতবাণী বলা যায় খানিকটা ফলে গিয়েছিল, কিন্তু প্রস্তাবের দ্বিতীয় অংশ বাড়াবাড়ি রকমের ইউটোপিয়ান । এখনো, এই একুশ শতকে এসেও আমরা 'রাষ্ট্রযন্ত্র' বা 'রাষ্ট্র কাঠামো দুটিকেই বহাল তবিয়তে থাকতে দেখি ।

তবু সেইন্ট পিটার্সবুর্গে প্রবল নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে কতিপয় বুদ্ধিজীবি, (সংখ্যায় তাঁরা পনেরোর বেশী হবেন না। 'শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির জন্য কমিটি,' (মোটামুটি ওইরকমই হবে এর অনুবাদ) নামে এক জনহৈতিষী সংস্থার পত্তন করেন ১৮৮৩ সালে । বিপ্লবী মার্ক্সবাদকে এঁরা আদর্শ হিসেবে গ্রহন করেন । এদের মধ্যে থাকবেন পাভেল আক্সেলরোদ, গেওর্গি প্লেখানভ আর একজন বিশেষ নাম করবার মতো মহিলা ভেরা সাসুলিচ । বলা যায় এই কমিটিই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা পরবর্তী কালের কমিউনিস্ট পার্টির শিকড় বিশেষ ।

১৮৮০ এর দশকে তাঁরা কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ গুপ্ত পুলিশ (ওখ্রানকা, জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের আমলে এই বাহিনীটি বিশেষ স্ফীত হয়েছিল ) তাড়া খেয়ে প্রায় সকলেই দেশান্তরী বা আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বাধ্য হন । এঁদের সকলেই যে প্রাথমিক উৎসাহ ধরে রাখতে পারবেন তা নয় । অনেকে শোনা যায় টিকটিকি হিসেবে কমরেডদের সাথে বেঈমানী করেছেন, এবং ব্যাক্তিত্বের সংঘাত যেটা যে কোনো প্তিষ্ঠানের জন্যই অবশ্যাম্ভাবী তা তাঁদের পিছু ছাড়েনি । কোন্দল ও তৎসৃষ্ট দল-উপদল সৃষ্টি এঁদের হাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে ।

১৮৯৭ তে বেলারুসের প্রাদেশিক রাজধানী মিন্সকে তাঁরা জমায়েত হয়ে (অবশ্যই গোপনে!) রুশ রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিত্তি আনুষ্ঠানিক ভাবে পত্তন করেন । মার্ক্স আর এঙ্গেলসের কথাই তাঁরা মুল মন্ত্র ভেবে এগিয়ে যাবেন স্থির করেন । যদিও মার্ক্সবাদে রাশিয়ার মতো এরকম কৃষিভিত্তিক দেশে বিপ্লবের রাস্তা খুব ভাল করে বাতলানো হয় নি । তাতে তাঁরা চিন্তিত হলেন না । রোমানভ বংশ আর অভিজাততন্ত্র এই দুই জগদ্দল পাথর ওল্টাতে হবে । কোনো রকম 'গ্র্যাজুয়ালিজম' বা অন্তবর্তীকালীণ পন্থার মধ্যে দিয়ে তাঁরা যাবেন না, তবে বাকুনিনপন্থী (নিহিলিস্ট/সোশ্যাল রেভোল্যুশনারি) দের মতো বোম মেরে কাজ হাসিলের রাস্তায়ও তাঁরা হাঁটবেন না ।

এ রকম চিন্তাভাবনা করার আসলে বেশি না হোক কিছু বাস্তব ভিত্তি অবশ্যই ছিল । ১৮৯০ এর দশকে, সত্যি বলতে কী ১৮৮০ এর দশকেই রাশিয়া শিল্পায়নের দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছে । আর কিছু না হোক এর বিশাল জনসংখ্যা, খনিজ-কৃষিজ-বনজ সম্পদের কারনেই রাশিয়াতে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠে ছিল ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পপতি মহল । আর বেহিসেবী ভুস্বামীদের অনেকে দেরীতে হলেও শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন । যদিও এর গতি ছীল খুবই ধীর তবু একটা শহুরে খেটে খাওয়া শ্রেণীর জন্ম নিচ্ছিল । তাদের ভিখারী সুলভ মাইনে আর জঘন্য কাজের পরিবেশের জন্য এই শ্রমিক শ্রেণী উগ্রপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের অত্যন্ত উর্বর ভুমি বলে পরিগনিত হবে ।

শিল্প স্থাপন প্রক্রিয়া কেন্দ্রীভুত ছিল সেইন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে মস্কো , মস্কো থেকে ওদেসা এই রেখায় । তাতে খুব একটা অসুবিধা ছিল না । দেশের মাথারা ওইসব জায়গাতেই থাকতেন, আর মধ্যবিত্তের বিকাশও ঘটছিল ও সমস্ত শহরে । উদীয়মান মধ্যবিত্ত আর বর্ধনশীল শ্রমিকশ্রেণী, এ দুই শক্তিতে একজোয়ালে বাঁধতে পারলেই বিপ্লবের লাঙ্গল, একনায়কতন্ত্রের অহল্যাভুমি চিরে ভবিষ্যতের বীজবপনের কাজটা শুরু হবে । কিন্তু শুরুটা করবে কে?

সন্দেহ নেই এই বিপ্লবীরা শুরুতে (এবং শেষেও!) খুব কেতাবী ও তাত্বিক ভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন । যদি তাঁদের সংস্থাগুলো এরকম গোপনে কাজ করতে বাধ্য না হতো, যদি তাঁরা মানুষের সাথে মিশে ভোটের জন্য দাঁড়াবার অভিজ্ঞতা পেতেন তাহলে হয়তো তাঁদের অনেক 'বৈজ্ঞানিক' গোঁয়ারতুমি এমনিতেই চলে যেত । বাস্তব, যে কোনো 'দ্বন্দমুলক বস্তুবাদের' চেয়ে বাস্তববাদী শিক্ষক । কিন্তু সে সুযোগ তাঁরা পান নি । আর বৈপ্লবিক কর্মাকান্ডের বিবর্তনের জন্য কয়েক দশকের মতো সময় কতোটা পর্যাপ্ত সেটাও অবশ্য ভেবে দেখা দরকার ।

তবে তার আগে আরেকটু পিছনে ফিরে যাওয়া যাক । ১৮৮৭ সালের মে মাসে বড় ভাই আলেক্সান্দার উলিয়ানভের গ্রেফতার ও ফাঁসির পরে ছোটভাই (জন্ম ১৮৭০) ভ্লাদিমির না কি বলেছিলেন যে 'আমরা ও পথে যাবো না' (অন্তত পরবর্তীকালের জীবনীগুলোতে তাই লেখা আছে) । উলিয়ানভ পরিবার তখন কাজান থেকে চল্লিশ কিলোমিটারের মত দূরে কোকুশকিনোতে থাকতেন । তার কিছুকাল পরে তিনি কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য বহিষ্কৃত হন ।

তবে তিনি তাঁর লেখাপড়া ব্যাক্তিগতভাবে চালিয়ে যেতে থাকেন । যার মধ্যে ডাস কাপিটাল বইটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল । ১৮৯১ সালে তিনি সেইন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত ছাত্র হিসেবে যোগ দেন ও বছর দুয়েকের মধ্যে আইন পাশ করেন ।

এরপরে সামারা আর সেইন্ট পিটার্সবুর্গে ওকালতি করেছেন তিনি । ১৮৯৫ সালের ৭ ই ডিসেম্বর কর্তৃপ্ক্ষ আবারো 'রাজনৈতিক প্রচারণার' দায়ে সাইবেরিয়ার শুশেনস্কোয়ে গ্রামে তাঁকে চালান করে দেয় (কমিউনিস্ট জমানায়্এই গ্রামের নাম রাখা হয়েছিল 'লেনিনস্কোয়ে') । সেইখানে তখন গেওর্গি প্লেখানভও নির্বাসন কাটাচ্ছিলেন । লেনিন অনেক সময় কাটিয়েছেন এঁর সাথে পরে আবার বিচ্ছেদ হবে সে অন্য গল্প । ১৮৯৮ সালে রাজনৈতিক কর্মী নাদেজদা ক্রুপস্কায়াকে বিয়ে করেন । ১৯০০ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাসন দন্ড শেষ হলে তিনি বিদেশ যাবার দরখাস্ত করলেন কর্তৃপক্ষের কাছে ।

সাইবেরিয়াতে থাকার সময়েই সেখানকার লেনা নদীর প্রেমে পড়েন তিনি । এবং সে যুগের আরো অনেক বিপ্লবীর ছদ্মনাম নেন 'লেনিন' (লেনা থেকে) ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28722821 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28722821 2007-07-26 19:54:31
রুশদেশের সত্যিকথা ১২
তাঁরা বুঝেছিলেন জনগনকে ন্যুনতম অধিকার না দিলে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই ফুঁসে উঠবে এবং তা রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিশেষভাবে আহত করবে । একধরনের সীমিত গণতন্ত্রের চর্চা তাঁরা নিরবিচ্ছিন্নভাবেই চালিয়ে যান । এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই জার্মান স্যোশাল ডেমোক্র্যাটদের উত্থান ।

১৮৬৩ সালে ফার্ডিনান্ড লাসালের জার্মান শ্রমিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তার হাত ধরেই জার্মান স্যোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্ম হয় আরো বারো বছর পরে । এটিই জার্মানীর সবচেয়ে পুরনো দল এবং বর্তমানে ক্ষমতায় আছে । তখন জার্মানী ছিল অনেক গুলো জার্মান অভিজাত শাসিত রাজ্যের সমষ্টি, সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাশিয়া ।

প্রাশিয়ার রাজাই ছিলেন আবার জার্মানীর সম্রাট । অভিজাততন্ত্র পুরোদমে চলছে, কিন্তু ওদিকে নির্বাচনও হচ্ছে, সম্রাটের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী ছিলেন বিশ্বস্ত চ্যান্সেলর ওটো ফন বিসমার্ক । তবে বিসমার্ক এতোটাই সম্রাটভক্ত ছিলেন যে তাঁর হাতে সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে জার্মান সম্রাট প্রথম ফ্রেডেরিক নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন ।

একটা জিনিস মনে রাখা দরকার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা মার্ক্স থেকে ওভাবে প্রভাবিত হননি । মার্ক্স ছিলেন তাঁদের প্রায় সমসাময়িক ব্যাক্তিত্ব । মার্ক্স তাই শুরুর দিকের জার্মান সমাজতন্ত্রীরা এতটা পাত্তা দিতেন না । যদিও জীবদ্দশাতেই মার্ক্সের প্রভাব পড়বে সমস্ত সমাজতন্ত্রী চিন্তা ভাবনায় । কিন্তু এই প্রবাসী বা নির্বাসিত বুদ্ধিজীবিটির প্রভাব শুরুতে এত ব্যাপক ছিল না ।

তাঁরা বরং (মার্ক্স নিজেও অনেকটা যা ছিলেন) নিজেদের "হেগেলিয়ান আদর্শবাদী" ভাবতে ভালবাসতেন । হেগেলের প্রভাবটা (১৮৩০-১৮৪০) তাঁরা পুরো পেয়েছিলেন । ১৮৪৮ এর ক্ষণস্থায়ী বিপ্লবের পুরো স্মৃতি তাঁদের অনেকের মনে আছে । ১৮৭১ সালে প্যারিস কমিউনের ধারনায় উজ্জীবিত করেছে তাঁদের ।

কিন্তু এদের সাথে (পরবর্তীকালের) মার্কসবাদীদের ও তৎকালীণ নৈরাজ্যবাদীদের পার্থক্যটা শুরু থেকেই ধরা গেছিল । তাঁরা আসলে সমাজকল্যান-সম্পদের বন্টন এবং ক্ষমতা প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহনে অণেক বেশী আগ্রহী ছিলেন । যেখানে নৈরাজ্যবাদীরা সব ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে এবং মার্ক্সিস্টরা শ্রেণী সংগ্রামের চেতনা জাগিয়ে দলভিত্তিক বিপ্লবের পরিকল্পনায় মশগুল হবেন । ওদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রাট রা ভাবতেন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের একটা ভাগ যখন পাওয়া গেছে বা যাচ্ছে (ব্রিটেন আর জার্মানীতে) তখন নিজেদের অবস্থান সংহত করে সামনে এগোনো যাক ।

১৮১২ সালটা রুশ পঞ্জিকায় বিশেষভাবে গুরুত্বপুর্ন, কারন এবছরই নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমন করেন ও নিজের কফিনের সবচেয়ে বড় পেরেকটা নিজের হাতে ঠুকে দেন । সে যাই হোক, নেপোলিয়ন যখন মস্কো দখল করেছিলেন তখণ রুশরা মস্কো নিজেরাই জ্বালিয়ে দিয়েছিল । যেহেতু বেশিরভাগই বাড়িই তখন কাঠের ছিল, আগুন হু হু করে পুরো শহরটাকে গ্রাস করে ফেলেছিল । যে সময়ে ইভান ইয়াকভলেভ নামে একজন ধনী জোতদার নেপোলিয়নের সাথে দেখা করতে এলেন ।

নেপোলিয়ন বললেন তিনি ইভানকে মস্কো ত্যাগ করার অনুমতি দেবেন তবে ভাসিলিকে একটা কাজ করতে হবে । সেইন্ট পিটার্সবুর্গে জার প্রথম আলেক্সান্দারের কাছে নেপোলিয়নের নিজের হাতের লেখা চিঠি পৌঁছে দিতে হবে । ইভান রাজি হলেন, না হয়ে অবশ্য কোনো উপায়ও ছিল না । ইভানের 'পরিবার' বলতে ছিল তাঁর অল্প বয়সী জার্মান রক্ষিতা ভিলহেলমিনা লুইজা হাগ ও অবৈধ শিশু পুত্র আলেক্সান্দার । ভিলহেলমিনা তার ছেলের পদবী রেখেছিলেন 'হের্তসেন' বা 'হার্তসেন'--মানে 'হৃদয় সম্পর্কিত' (Herz--হৃৎপিন্ড, হৃদয় থেকে--Herzen) । পুত্রটি অর্থাৎআলেক্সান্দার হার‌্ৎসেন, রুশ চিন্তাজগতে আলোকপ্রাপ্তি ঘটাতে বিশেষ অবদান রাখবেন ।

১৮৩৪ সালে হার‌্ৎসেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে প্যারডি গান গাইবার দায়ে বহিস্কৃত ও নির্বাসিত হন । উত্র পুর্ব রাশিয়ার গন্ডগ্রাম ভিয়াৎকাতে হার্তসেন আটক ছিলেন, যতদিন না ১৮৩৮ এ জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দার (তখন যুবরাজ) শহর পরিদর্শনে আসেন । কিছুটা উদারমনা আলেক্সান্দার, তাকে মুক্তি দিয়ে ভ্লাদিমির শহরে পাঠান অফিশিয়াল গেজেটের সম্পাদনার কাজে নিয়োগ দেন । তারপরে ১৮৪০ এর দিকে মস্কোতে আবার ফিরে আসেন হার্তসেন।

বেশ কিছুকাল সরকারী চাকুরি করার চেষ্টা করে দেখেন হার্তসেন । কিন্তু ৪৬ সালে বাবা অনেক সম্পত্তি রেখে মারা গেলে চাকুরি ছেড়ে দেন । যখন তখণ বিদঘুটে সব প্রেমে পড়ে যাওয়ার অভ্যাস ছিল এই উদারমনা বুদ্ধিজীবির । এইসব কারনে তিনি ১৮৪৭ এর গোড়ার দিকে রাশিয়া ছাড়েন । আরো কোনো দিন নিজের দেশে ফিরবেন না তিনি । বড় মাহেন্দ্রক্ষনে রাশিয়া ছেড়েছিলেন তিনি, কারন তার পরের বছরই ইউরোপ জুড়ে বিপ্লবের দাবানল জ্বলে উঠবে । আগুনঝরা ১৮৪৭ ।

সিসিলি থেকে বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠে ফ্রান্স, বিভক্ত জার্মানী থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে এমন কী ব্রাজিলে পর্যন্ত তার ঝাপটা লাগবে এই সাতচল্লিশের ইনকিলাব । তবে অপরিকল্পিত এই তান্ডব নিভে যাবে নেতৃত্বের অভাব ও শাসককুলে সুসংবদ্ধ দলন-পীড়ন নীতির সামনে । তবু এটা হবে তৎকালীন প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজীবির মোড় ঘোরার সময়--টার্নিং পয়েন্ট । সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম, লিবারেলিজম, পশ্চিমের সব 'ইজম' এরই বিশেষ বাড় বেড়েছিল এই বছরে ।

প্যারিসে লুই ফিলিপের সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু হতে ইতালি থেকে ফ্রান্সে চলে আসেন হার্তসেন । কিন্তু রাজা ফিলিপকে তাড়াতে পারলেও বিপ্লবী শক্তি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অভাবে । এই ব্যার্থতা দেখে দ্রুত সুইজারল্যান্ডে আস্তানা গাড়েন হার্তসেন, এই বিপ্লব গভীরভাবে দাগ কেটে গেছে তাঁর মনে, কিন্তু এর ব্যার্থতা তাঁকে চিন্তার জগতে সংযম এনে দিয়েছিল । ১৮৫৪ সালে একবার জেনিভা ছেড়ে লন্ডনে আসবেন তিনি, তারপরে আবারো জেনিভা ফেরত যাবেন ৬৪ তে । প্যারিসে যক্ষায় ভুগে ১৮৭০ এ মৃত্যু ।

আলেক্সান্দার হার্তসেন ১৮৪২ সালে প্রথম লেখালেখি শুরু করেন 'ইসকান্দার' ছদ্মনামে । এর পরে অনেক প্রবন্ধ, বই লেখেন হার্তসেন । প্রবাস থেকে রুশভাষায় অনেক গুলো পত্রিকা সম্পাদনা করেন যেগুলো নিজের দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল । এর মধ্যে জনপ্রিয় ছিল 'কোলোকোল' (ঘন্টা), পোলিয়ার্নিয়া জভিয়েজদা (মেরু নক্ষত্র) বিশেষ উল্লেখজনক । শোনা যায় জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নিজেই পড়তেন এ নিষিদ্ধ পত্রিকা দুটো ।

মিখাইল বাকুনিনের জন্ম ১৮১৪ সালে রাশিয়ার এক অভিজাত ঘরে । কিন্তু নীল রক্তের অধিকারী হলেও তিনি সারা জীবন অভিজাততন্ত্রের গনেশ ওল্টানোর কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন । ১৮৩০ এর দশকে তিনি রুশ সেনাবাহিনীর একজন জুনিয়র অফিসার ছিলেন, ১৮৩৫ এ কিন্তু প্রতিবাদ স্বরুপ নিজের কমিশন বিসর্জন দেন ।

সে সময় দার্শনিক আলেক্সান্দার হার্তসেনের (আরেকজন রুশ নক্ষত্র) সাথে দেখা হয় বাকুনিনের । হারৎসেন বলা যায় বাকুনিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন । যদিও প্রথম জন ছিলেন উদারনীতির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা আর বাকুনিন কালক্রমে নৈরাজ্যবাদের প্রথম প্রাণ পুরুষ হয়ে ওঠেন । জর্জ সঁ, কার্ল মার্ক্স, পিয়ের জোসেফ প্রদো , এসব গুণী ব্যাক্তিত সান্নিধ্যও বাকুনিন পরে পাবেন ।

১৮৪৪ এ বাকুনিনকে ফিরে আসার হুকুম দেন স্বয়ং জার । কিন্তু ফরমান অমান্য করায় তাঁর অভিজাত বংশ থেকে নাম কাটা যায় । সাতচল্লিশের বিপ্লবের সময় তিনি মনের আনন্দে বিপ্লবে যোগ দিয়েছেন । ১৮৫০ এ পোলিশদের সাহায্য করতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি ও রাশিয়াতে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয় ।

প্রথমে সেইন্ট পিটার্সবু্র্গের পিটার আর পলের দুর্গে আটক ছিলেন তারপর সেখান থেকে সাইবেরিয়াতে চালান দেয়া হয় তাঁকে । সেখানে তাঁর জ্ঞাতি ভাই নিকোলাই মুরাভিওভ গভর্নর ছিলেন । নির্বাসনে থাকলেও বেশ আরামেই কাটান তিনি সাইবেরিয়ার রাজধানী ইরকুৎস্কে ।

মুরাভিওভ বেশ উদারমনা ছিলেন এবং তিনি নির্বাসিত এসব বিপ্লবী ও বুদ্ধিজীবিদের সংস্পর্শে থাকতে পছন্দ করতেন । কিন্তু বেশ কিছুদিন পরে মুরাভিওভকে পদচ্যুত করা হয়, কারন তিনি নাকি সাইবেরিয়াকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে রুপান্তরিত করার পরিকল্পনা আঁটছিলেন । কিন্তু পালিয়ে জাপান চলে যেতে সক্ষম হন তিনি এবং সেখান থেকে আমেরিকা হয় আবারো পশ্চিম ইউরোপ । লন্ডনে গিয়ে হার্তসেনের সাথে দেখা করেন বাকুনিন ।

১৮৮৪ এর দিকে কতিপয় রুশ বুদ্ধিজীবি এক হয় 'জনগনের মুক্তি' নামে একটা প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন । এবং খুব শিগগীরই তিনি আবার 'বিপ্লবী' কর্মকান্ডে' নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন । পরাধীন পোল্যান্ড রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে দেখে তিনি বিপ্লবী, অভিজাত-বিরোধী, প্রাক্তন অভিজাত রুশ দ্রুত সেখানে চলে গেলেন পোলদের সাহায্য করতে । (এইসব কারনে হার্তসেন ও বাকুনিন দুজনেই রাশিয়ার জাতীয়তাবাদীদের কাছে খুব অপ্রিয় হয়েছিলেন ।

কিন্তু বিদ্রোহটা বেলুনের মত চুপসে গেলে বাকুনিন সুইডেনে চলে গেলেন । তখনই তাঁর মাথা একটা গোপন সন্ত্রাসবাদী দল সৃষ্টি করার পরিকল্পনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে । সুইডেন, জার্মানী, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড এবং অবশ্যই রুশ ও পোলিশ সদস্যদের সমম্বয়ে গড়ে ওঠে এই দলটা । 'সমস্ত কর্তৃত্ব যা স্বাধীনতাকে খর্ব ও সংকুচিত করে তাকে অস্বীকার ও ধ্বংস করাই আমাদের ব্রত,' শপথবাক্য ও মিশন স্টেটমেন্টে এই কথাগুলো লেখা ছিল ।

তারপরেও বাকুনিনকে নিরংকুশ যুদ্ধংদেহী সন্ত্রাসবাদী বলা যায় না । কারন এমিল লাকোলা'র ডাকে সাড়া দিয়ে জেনিভাতে শান্তি সন্মেলনে সংগঠক হিসেবে তিনি বেশ গুরত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখেন । সেখানে গারিবাল্দির সাথে দেখা হয় । ৭০ এ ফ্রাংকো-প্রাশিয়ান যুদ্ধে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাকুনিনের সহানুভুতি ছিল প্যারিস কমিউনের প্রতি । ৭২ সালের দ্য হেগ সন্মেলনে কার্ল মার্ক্সের সাথে মিখাইল বাকুনিনও ছিলেন । একদিকে সন্ত্রাসবাদ আরেকদিকে সমাজতন্ত্র ঝান্ডা ওড়ান বাকুনিন । তবে ঢালাও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল না সেটা প্রমান হয় সের্গেই নেচায়েভের সাথে বিরোধে । নেচায়েভ যেকোনো রকম রক্তারক্তি ঘটানোর পক্ষপাতী ছিলেন ।

কিন্তু কিছুকাল পরে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের সাথেও বিরোধ বাধলো । শুধু রাষ্ট্র নয় পার্টি ডিক্টেটরশিপের ঘোর বিরোধিতা করেন এই নৈরাজ্যবাদী । ফলে ৭২ সালে মার্ক্সিস্ট ধারার প্যানেল (বা ইন্টারন্যাশনাল) থেকে বহিস্কৃত হন বাকুনিন । বাকুনিন সকল কর্তৃত্বের বিলোপ এমন কী রাষ্ট্রের ধ্বংস সমস্ত 'প্রকৃত' বিপ্লবীর লক্ষ্য বলে দাবী করেন ।

বাকুনিন আর হার্তসেন, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবি ও নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবী এ দুটি নক্ষত্র অনেকদিন রাশিয়াতে বিপ্লবী শক্তিকে পথ দেখাবে । এক হিসাবে বলতে গেলে তাঁরা একই বৃক্ষের ফল ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28721490 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28721490 2007-07-18 21:56:11
রুশদেশের সত্যিকথা ১১
এই অভ্যার্থনা স্মৃতি নিকোলাসের মনে ছিল এবং তা এক সময়ে ফ্রান্সের কাজে আসবে । এমন কী একবছরের ওলগাকে দেখেলেও মানুষ 'Vive la Bebe!' (বাচ্চা জিন্দাবাদ!) বলে চেঁচামেচি করত । নিকোলাস প্যারিসে তৃতীয় আলেকজান্ডার সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন । তারপরে ট্রেনে করে জার্মানির মধ্যে দিয়ে রাশিয়া ফিরলেন ।

দেশে ফিরে যে কাজটা তিনি জীবনে সবচেয়ে ভয় পেতেন সেটায় জড়িয়ে পড়লেন মানে শাসন কাজ এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা শুরু করলেন । প্রথমে তিনি মারিয়ার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতেন কিন্তু তারপরে নিজেকেই পুরো কাজের ভার নিতে হলো । এবং সে ব্যাপারে সমস্ত কাজ আবার নিজ দায়িত্বে করার পক্ষপাতী ছিলেন নিকোলাস ।

নিকোলাসের উপর কর্তৃত্ব খাটাতেন তাঁর দুই চাচা, আলেক্সিস আর ভ্লাদিমির । আলেক্সিস ছিলেন রুশ নৌবাহিনী গ্র্যান্ড অ্যাডমিরাল ও দ্বিতীয়জন একজন সিনিয়র গ্র্যান্ড ডিউক । অন্যসব লোকের উপস্থিতিতে তাঁরা সম্রাটকে মান্য করতেন । কিন্তু যেই নিকোলাসের স্টাডির দরজার বন্ধ হয়ে যেত অমনি ঠাস করে ডেস্কের উপরে বিকট চাপড় মেরে লেকচার শুরু করে দিতেন আলেক্সিস । এ দু'জনের সাথে একা থাকতে খুবই অস্বস্তি বোধ করতেন নিকোলাস ।

শুধু সাম্রাজ্য চালানোই নয়, নিকি আবার পদাধিকার বলে তাঁর বিশাল পরিবারের কর্তাও ছিলেন । ১৯১৪ সালের হিসাব যদি ঠিক হয় তবে তখনকার মুল্যমানে নিকোলাসের ব্যাক্তিগত সম্পদের পরিমান ছিল পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার বা তার কম বেশী কিছু, এর মধ্যে ছিল আবাদী জমি, ফলের বাগান, খনি, শিল্পের শেয়ার । আরো ছিল আশি মিলিয়ন ডলার মু্ল্যমানের মুল্যবান পাথর যা রোমানভরা তাদের তিনশৌ বছরের শাসনে জমিয়েছিল । ১৮৯৫ সালেই নিকোলাসের রোজগার বছরের প্রায় বারো মিলিয়ন ডলার । কিন্তু রাবণের বংশকে প্রতিপালন করার পরে দেখা যেত বছর শেষে সম্রাটের হাত খালি ।

সাতটা প্রাসাদ ও পনেরো হাজার চাকরবাকর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ । সম্রাটের নিজস্ব ট্রেন , ইয়াট, তিনটে থিয়েটার, অ্যাকাডেমি অভ আর্টস ও ব্যালে । প্রত্যেক গ্র্যান্ড ডিউক এক লাখ ডলারের পরিমান ভাতা পেতেন, সমস্ত গ্র্যান্ড ডাচেস বিয়ের সময় পাঁচ লাখ ডলার । এছাড়াও হাসপাতাল, অনাথ-আশ্রম আর ইস্কুলে যেত টাকা । (কেন এই তহবিল সরকারের অন্য কোনো দফতর দেখত না এক রহস্যের ব্যাপার) ।

এবারে একটু অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক । কেবল রাজ পরিবারের রকম-সকম নিয়ে থাকলে তো আর রুশ দেশের সব হাল-হকিকত জানা যাবে না ।

১৮৮৭ সালে জার আলেকজান্ডারকে মারতে গিয়ে 'নারোদনায়া ভলিয়া' এমনই পাল্টা মার খায় যে পুরো সংগঠনের অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে । কয়েকশো সক্রিয় সমর্থক আর আর হাজার দুয়েক কর্মীর একটা বড় অংশ আটক হয় । যারা এই চিরুনি তল্লাশীর বাইরে থাকতে পেরেছিল তাদের আর সাংগঠনিক কাজ কর্ম চালিয়ে যাবার অভিরুচি বেশিদিন থাকেনি । তাঁরা সব নিজের গোছাতে থাকেন নয় তো নতুন একটা দল গঠনের পরিকল্পনা করতে থাকেন । নতুন দলের নাম হয় সোশ্যা রেভোল্যুশনারি পার্টি বা 'এসআর' (তাদেরকে আক্ষরিক অর্থেই 'এসার' বা 'নারোদনিকি' বলা হতো) । আগের মার-মার-কাট-কাট নীতি খানিকটা পরিবর্তন হয় ।

আসলে তখন রাশিয়াতে কোনো রাজনৈতিক দলই বৈধ ছিল না । নির্বাচন ছিল না (একবারে স্থানীয় পর্যায় 'জেমস্তভো' নির্বাচন হতো), ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না, প্রেসের স্বাধীনতা ছিল না । মানে ঊনিশ শতকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে (মুলতঃ পশ্চিম ইউরোপে) যেসব স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তার ছিঁটেফোটা রাশিয়াতে এসে পড়েছিল । সব দলই যদি আন্ডারগ্রাউন্ড হয় তাহলে সন্ত্রাসবাদ চর্চা করতে দোষ কী? পরিস্থিতি আরো বেশী খারাপ হতে তাঁরা অনেকেই দেশান্তরী হয়ে পড়েন ।

এসআর বা নারোদনিকদের গোড়া আসলে ১৮৬১ সালে । যখণ জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার সার্ফদের মুক্ত করার প্রয়াস চালান । নারোদনিকদের মুল ধারাটা ছিল পপুলিস্ট ধাঁচের, জারের সংস্কারে তারা খুশি হতে পারেনি । তাদের ধারনা ছিল খুব কম স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তাদের এবং এতে ধনী কৃষক বা 'কুলাক'দের প্রাধান্য গেছে বেড়ে । তাই প্রান্তিক চাষীদের মুক্ত করার জন্য আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে । এরকম আন্দোলন নেতৃত্ব অবশ্যই দেবে শহুরে বুদ্ধিজীবিরা!

আরো একটি আন্দোলন ছিল এদের বিপক্ষে, সেটা ছিল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের । সেটাও অবশ্য জার্মান মডেলে ছিল । বিসমার্ক, জার্মান সাম্রাজ্যেকে একীভুত করার পরে সংসদীয় গনতন্ত্রের যে সীমিত চর্চা করেন তা থেকেই জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের আত্ব-প্রকাশ । নিখিল-ইউরোপীয় বামেরা জার্মানদের সঙ্গত কারনেই গুরু মানতেন ।

কার্ল মার্ক্স ১৮৬৭ সালে ডাস কাপিটাল প্রকাশ করেন । আজব ব্যাপার হচ্ছে রাশিয়ার মতো একটা ভয়ানক সেন্সরশিপআক্রান্ত দেশে সেটা অনুবাদ হয় ১৮৭২ এর দিকেই! (বইটা অর্থনীতির পাঠ্যবই হিসেবে দেখানো হয়েছিল!) । আর সেন্সর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা স্কুরাতভের উক্তি 'খুব কম লোকই এটা পড়বে এবং আরো কম লোকে এটা বুঝবে (!?!)' এমন দুরূহ বিষয়ে, এমন কঠিন ভাষায় লেখা জাম্বো সাইজের কেতাব!

ভুল । তিন হাজার কপি এক বছরের মধ্যে বিক্রি হয়ে প্রমান করল এ বই পড়ার লোক আছে । ১৮৮০ সালের দিকে রাশিয়াতে সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়্যে বেশি সংখ্যক মানুষ 'পুঁজি' বইটা পড়ে ফেলেছে । একথা জানা দরকার যে প্রথম টিকা সমৃদ্ধ ইংরেজি সংস্করণ বেরিয়েছে ১৮৮৭ সালে, মার্ক্সের মৃত্যুর চার বছর পরে !

১৮৮৪ সালে কতিপয় বুদ্ধিজীবি 'জনগনের মুক্তি' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের চেষ্টা চালাতেই গ্রেফতা হয়ে যান । এই দলে ছিলেন গেওর্গি প্লেখানভ, পাভেল আক্সেলরোদ প্রমুখ জনহৈতিষী ব্যাক্তিবর্গ ছিলেন এতে । নিন্দুকেরা বলে সংখ্যাঅয় না কি তিন হালিও হবে না এই সংস্থার প্রাথমিক সদস্যদের সংখ্যা । তবে এদের মধ্যে থেকেই রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের জন্ম হবে । পরবর্তীকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল । 'নারোদনিকি' দের সবচেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, এদের আদর্শিক ভিত্তিতে মার্ক্সবাদ ক্রমেই বেশি বেশি করে স্থান পাবে ।

রাশিয়া সেসময়ের মান বিচারেও সাংঘাতিক রকমের জাতিগত বিদ্বেষপুর্ণ একটা দেশ । জাতিগত 'বিশুদ্ধতা' রক্ষার চেষ্টা তখন থেকই শুরু যেটা বিশ শতকের ফ্যাসিবাদকে উস্কে দেবে ।

মধ্য এশিয়া ও ককেশাসের বাসিন্দারা দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক, ইহুদিরা বেশিরভাগ অচ্ছ্যুত ও সংরক্ষিত অঞ্চলে আবদ্ধ । ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া এসব পুরোটাই রাশিয়ার অঙ্গীভুত, পোল্যান্ডে খানিকটাও ঢুকে গেছে রুশ দেশে । এবং এদের সবাই অন্তত ভাষাগতভাবে রুশ বানানোর চেষ্টা চলছে ঊনিশ শতকের গোড়া থেকেই ।

রুশ সাহিত্যের দুই প্রধান দিকপাল, দস্তয়েভস্কি আর তুর্গেনেভ গত হয়েছেন ১৮৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে । আন্তন চেখভ তাঁর স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন । মামিন সিবিরিয়াক ও অন্যান্য উদীয়মান গল্পকার পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালাচ্ছেন । তলস্তয় ব্যাস্ত আধ্যাত্বিকতা নিয়ে । তবে ককেশাস থেকে একজন তরুন লেখকের নাম ইদানীং খুব শোনা যাচ্ছে । তার নাম আলেক্সান্দার পেশকভ, কিন্তু মাক্সিম গোর্কি ছদ্মনামেই তিনি লিখে থাকেন বেশিরভাগ সময়ে । এই প্রথম সমাজের নীচের তলার মানুষের ছবি কোনো রুশ লেখক অসংকোচে আঁকছেন বাস্তবের ক্যান্ভাসে । মানুষের সম্ভাব্যতা বা 'লিচনোস্ত' তাঁর লেখার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকছে ।





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28718344 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28718344 2007-06-28 22:23:15
রুশদেশের সত্যিকথা ১০
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একসপ্তাহ পরে নিকোলাস আর আলেকজান্ড্রার বিয়ে হলো, দিনটা নিকোলাসের মায়ের জন্মদিন ছিল তাই প্রটোকল অনুযায়ী শোকপ্রকাশ খানিকটা শিথিল করা গিয়েছিল । পরিবারের মহিলারা আলিক্সকে সাজালেন পুরনো ধাঁচের একটা রুপার ব্রোকেডের পোশাকে । তারপরে সম্রাজ্ঞী মারিয়া আলিক্সের মাথায় পরালেন কনের মুকুট । সেখান থেকে তাঁরা হেঁটে গেলেন শীত প্রাসাদে, সেখানে অশ্বারোহী হুসার সৈনিকের উর্দি পরে নিকোলাস অপেক্ষা করেছিলেন । জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে বিয়ে করলেন তাঁরা, কোনো অভার্থ্যনা বা পানভোজনের বন্দোবস্ত ছিল না, হানিমুনেরও কোনো কথা ওঠেনি । তাঁরা সোজা মারিয়ার আনিচকভ প্রাসাদে ফিরে এলেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ।

অনেক কিছুই গোলমাল হয়েছিল তাঁদের জীবনে । কিন্তু বিয়েটা না, সেটা ছিল একেবারে আদর্শ ভিক্টোরিয়ান পরিণয়, টিকে ছিল তাঁদের জীবনের একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত ।

প্রথম শীতটা তাঁরা আনিচকভ প্রাসাদে কাটিয়েছিলেন । পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর নিকোলাস, সেখানের একটা ছোট বৈঠকখানা থেকে সাম্রাজ্যের সমস্ত কাগজপত্র দেখতেন, পাশের শোবার ঘরে নতুন সম্রাজ্ঞী আলিক্স রুশভাষা মকশো করতেন । খাওয়ার টেবিলে সম্রাট-মাতা মারিয়া অত্যন্ত উদার হাতে নিকোলাসকে পরামর্শ দিতেন । ব্যাপারটা যে আলিক্সের পছন্দ হচ্ছে না সেটা তিনি আমলেই আনতেন না ।

শোক পর্ব শেষ হতেই মারিয়া আবার তাঁর উৎসবের হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছিলেন । রুশ দরবারের রেওয়াজ অনুযায়ী সম্রাট-মাতা, সম্রাট-পত্নীর থেকে বেশী মর্যাদা পাবেন । দেখা যেত মহামুল্যবান হীরে-জহরতে শোভিত হয়ে সম্রাজ্ঞী মারিয়া ছেলে নিকোলাসের হাত ধরে চলেছেন । আর পিছনে কোনো গ্র্যান্ড ডিউকের হাত ধরে গোমড়া মুখে আলেকজান্ড্রা । বউ-শ্বাশুড়ির বিবাদ শিগগীরই তুঙ্গে উঠল ।

মারিয়া বুঝেই উঠতে পারতেন না কেন আলিক্স শ্বাশুড়ির ভুমিকায় অসন্তুষ্ট হচ্ছে । হীরে-জহরতের ব্যাবহার নিয়ে ঝগড়াটা লাগল এর পরে । কিছু কিছু মহামুল্যবান রত্ন পাথর ছিল রোমানভ পরিবারে যেগুলো কেবল জারিৎসারাই ব্যাবহার করতেন বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে । কিন্তু সেরকম একটা উপলক্ষ্যে সেগুলো চাইতেই মারিয়া জানালেন সেগুলো তিনি দেবেন না । চটে গিয়ে আলিক্স জানালেন সেগুলোর দরকার নেই তাঁর । একটা কেলেংকারি ঘটার আগেই অবশ্য মারিয়া সেসব অলংকারের উপর দাবী ছাড়লেন ।

তবে মারিয়া কোপেনহেগেনে বাপের বাড়িতে যেতে গৃহবিবাদ কিছুটা কমে এল । এবং জানা গেল আলিক্স অন্তস্বত্বা । সুতরাং সেইন্ট পিটার্সবুর্গ ছেড়ে পনেরো মাইল দূরে জারস্কোয়ে সেলোতে নিকোলাস আর আলেকজান্ড্রা তাঁদের নতুন বাড়ি (বা প্রাসাদ) সাজাতে লাগলেন । শুনে মারিয়া বিরাট এক চিঠি লিখলেন । মনে হলো সব মনোমালিন্য মিটমাট হয়ে গেছে ।

তাঁরা আশা করেছিলেন অন্তত প্রথম সন্তানটি ছেলে-জারেভিচ হবে । কিন্তু অত্যন্ত একটা প্রসবের পরে জন্ম নিল প্রথমা কন্যা ওলগা নিকোলায়েভনা । সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবলেন না তাঁরা এখনো অনেক সময়ে আছে ছেলে জন্ম দেবার !

অবশেষে আনুষ্ঠানিক শোক পালনের একবছর পুরো হলো । আনুষ্ঠানিকভাবে নিকোলাসের অভিষেকের সময় হয়ে এলো । এরকম একটা ব্যাপার কোনো অবস্থাতেই পশ্চিমা ভাবধারার সেইন্ট পিটার্সবু্র্গে অনুষ্ঠিত হতে পারে না । মস্কোই হচ্ছে অভিষেকের জায়গা । তবে নিয়ম হচ্ছে অভিষেকের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত নতুন সম্রাট মস্কোতে পা রাখতে পারবেন না । নিকোলাস আর আলেকজান্ড্রা তাই শহরের সীমানার ঠিক বাইরে একটা আশ্রমে জায়গা নিলেন সেখানে তাঁরা প্রার্থনা আর উপবাসে সময় কাটাচ্ছিলেন ।

অভিষেকের দিন পুরো চার মাইল পথ দুই সারিতে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে ছিল জনতার ভীড় ঠেকাতে । । সোনালী শিরস্ত্রাণ পরা ইম্পেরিয়াল গার্ডরা ছিল সবার সামনে তারপরে ছিল কসাকরা, তাদের পিছনে একটা শাদা ঘোড়ায় চড়ে নিকোলাস মস্কোতে প্রবেশ করলেন । পিছনে একটা খোলা কোচগাড়িতে করে এলেন সম্রাট মাতা মারিয়া তারপরে আলিক্স, তারপরে গ্র্যান্ড ডিউকের দল, তারপরে অন্যান্য অভিজাতের দল, তারপরে দরবারের কর্মচারীরা । তারপরে এল সম্রাটের নিজস্ব অর্কেস্ট্রা, এবং আরো সৈন্য সামন্ত । একটা বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিকির পুরনো প্রেমিকা মাতিলদা ক্সেচেসিনস্কায়া, পুরো শোভাযাত্রাটাই দেখছিলেন ।

পরদিন খুব ভোরে উঠলেন তাঁরা । আলিক্সের চুল যখন একজন হেয়ারড্রেসার বাঁধছে তখন পাশে একটা টুলে বসে নিকি, আলিক্সের কর্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন । বেশ কয়েকবার মুকুট পরানোর মহড়া নেয়া হলো । এবং তা করতে গিয়ে আলেক্জান্ড্রার মাথা জখম হলো খানিকটা । কারন মুকুটটার নীচে একটা হীরে চিরুনী মতো জিনিস ছিল চুলে আটকানোর জন্য । সেটা সোজা মাথার চামড়া ভেদ করে সেঁধিয়ে গিয়েছিল ।

অভিষেক হলো মস্কোর উস্পেনস্কি ক্যাথিড্রালে । কয়েক হাজার মোমবাতির আলো পড়ে স্বর্ণখচিত বেদী ঝলসাচ্ছিল । সমস্ত হোমড়া-চোমড়ারা বসে ছিলেন গির্জা আলো করে । অভিষেক চলল পুরো পাঁচ ঘণ্টা ধরে এবং একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল । গির্জার মাঝের পথ ধরে যখণ নিকোলাস হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর কাঁধ থেকে অর্ডার অভ সেইন্ট অ্যান্ড্রু এর স্মারক চেইনটা ছিল তা খুলে মাটিতে পড়ে গেল । খুব কাছের লোকেরাই সেটা খেয়াল করেছিল এবং তাদেরকে শপথ করিয়ে নেয়া হলো যে এব্যাপারে তাঁরা কখনো মুখ খুলবেন না । এরপরে নয় পাউন্ড ওজনের জারের মুকুট পরিয়ে দেয়া হলো নিকোলাসের মাথায় ।

বাইজান্টাইন দু'মাথা ঈগল খচিত আলখেল্লা গায় দিয়ে অভিষিক্ত সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী গির্জা ত্যাগ করলেন । সার বাঁধা কামান থেকে তোপধ্বনি করা হলো, মস্কোর সব গির্জার ঘন্টা বাজতে লাগল, ক্রেমলিনের ঘণ্টা অবশ্য সব ঘণ্টার আওয়াজকে ছাপিয়ে গেল । সে রাতে সাত হাজার লোককে ক্রেমলিনে নেশভোজে আপ্যায়িত করা হয়েছিল । সেখানে জাঁকালো পোশাক আশাক পরা লোকজনের ভীড়ে খুব সাধারন চাষীর পোশাক পরা কিছু লোকও ছিল । তারা সব ইভান সুসানিন নামে এক ভৃত্যের বংশধর । তিনশো বছর আগে সুসানিন আক্রমণকারী পোলিশ সৈন্যদের অত্যাচারেরমুখেও বলে দেয়নি প্রথম রোমানভ জার মিখাইল কোথায় লুকিয়ে আছেন । এরপর থেকে সমস্ত অভিষেকেই সুসানিনের বংশধরদের ডাক পড়ে ভোজে ।

সে দিন বিকেল থেকেই মস্কো ক্রেমলিনের হলঘরে অতিথিদের এক এক করে স্বাগত জানাচ্ছিলেন নিকোলাস আর আলেকজান্ড্রা । নয় পাউন্ড মুকুটের ভারে (প্রায় চার কেজির উপরে) নিকোলাস মাথা ব্যাথা হচ্ছিলো সাংঘাতিক কিন্তু ট্র্যাডিশন তো অভিষেকের দিন ভাঙ্গা যায় না ! অভিজাত অভ্যাগতরা রাতের নাচের আসর পর্যন্ত ছিলেন, তাঁরা জাঁকজমক তো কিন্তু সে রাতে রাজ পরিবারের মণি-মানিক্যএর বহর দেখে তাঁদেরও চোখ ট্যাঁরা হয়ে গিয়েছিল । নিকোলাসের বোন জেনিয়া আর আলেকজান্ড্রার বোন এলিজাবেথ (এলা নামেই বেশী পরিচিত) তো আগাগোড়াই মহামুল্য পান্নায় ঢাকা ছিলেন, নিকোলাস একটা ব্রোঞ্জের কলার পরেছিলেন তাতে ঝাঁকে ঝাঁকে হীরে বসানো ছিল ।

বড় দুর্ঘটনাটা ঘটল পরের দিন ।

পরদিন মস্কোর সাধারন লোকদের গণহারে আপ্যায়িত করার কথা ছিল । এসব কাজের জন্য শহরের খোদিনকা মাঠটাকেই (খোদিনস্কোয়ে পোলে) ব্যাবহার করা হতো । পরবর্তীকালে এখান থেকে রাশিয়ার প্রথম এরোপ্লেন উড়বে ও এয়ারপোর্ট তৈরী হবে । মাঠটা আবার সে সময়ে সৈন্যদের মহড়ার জন্যও ব্যাবহার করা হতো, সেজন্য আড়াআড়িভাবে মাঠটা জুড়ে কাটা হয়েছিল অনেকগুলো ট্রেঞ্চ । সেগুলোর উপরে কাঠের পাটাতন ফেলে সমান করে শামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছিল । কয়েকশো বা হাজার ব্যারেল বিয়ার আনা হয়েছিল আপ্যায়নের অংশ হিসেবে । । বলা হয়েছিল সম্রাটের প্রতীক ছাপ মারা এনামেলের মগও নাকি সেই কাঙ্গালী ভোজে বিনামুল্যে বিলি করা হবে !

এবং ধারনা করা যায় যখন সেসব স্যুভেনির মগভর্তি ঘোড়ার গাড়িগুলোর সব একেক করে মাঠের আরেক প্রান্তে জড় এসে পৌঁছাচ্ছিল তখন সেই ভোরবেলাতেই প্রায় পাঁচলাখের মতো মানুষ সেখানে বিনা-পয়সার গণভোজে এসে অপেক্ষা করছিল (কেউ কেউ তখনই মাতাল!) ।

অশুভ গুজবটা ছড়িয়ে পড়ল মাঠময়, কেবল যারা সবার আগে থাকবে তারাই নাকি মাগনা বিয়ারে গলা ভেজাতে পারবে!

ব্যাস পড়ি কী মরি বলে দৌড়াতে শুরু করল হাজার হাজার মানুষ, কিছু লোক অবশ্য না বুঝেই দৌড়েছিল । জাঁদরেল কসাক রক্ষীরা পর্যন্ত কিছু করতে পারল না এই উন্মত্ত জনতার স্রোতের সামনে । মড় মড় করে ভেঙ্গে পড়তে লাগল ট্রেঞ্চের উপরে পাতা পাটতনগুলো, যারা পরিখায় পড়ল, তাদের উপর আবার হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল তাদের পিছনে থাকা মানুষগুলো । আর মহিলা আর অল্পবয়সীরা পিষ্ট হতে থাকল সব জায়গাতে । যখন হুল্লোড় থামল দেখা গেল খোদিনকা মাঠ যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গেছে । ছ'সাতশো মানুষ মরে পড়ে আছে ট্রেঞ্চগুলো জুড়ে, কয়েক হাজার আহত । সেদিন দুপুরে মস্কোর সবকটা হাসপাতাল আর মর্গ ভরে উঠল হতাহতের মিছিলে ।

নিকোলাস যখন শুনলেন কী হয়েছে তখন মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিলেন 'এর চেয়ে তো আমার সম্রাট না হওয়াই ভাল ছিল!' এবং তাঁকে যখন জানানো হলো আজরাতে ফরাসী রাষ্ট্রদুত আরেকটি নৈশভোজ ও নাচের আসরের আয়োজন করেছেন, তখণ তিনি বললেন তিনি আজ কোনো মঠে গিয়ে সারাদিন প্রায়শ্চিত্তের জন্য উপবাস আর প্রার্থনা করবেন । কিন্তু নিকোলাসের মুরুব্বীরা বোঝালেন এতে একটা 'নিছক দুর্ঘটনাকে' বেশী গুরুত্ব দেয়া হবে । আর ফ্রান্স, রাশিয়ার খুবই গুরুত্বপুর্ণ মিত্র, তাকে কী এরকম কারনে 'চটানো' ঠিক হবে?

নিকোলাস নাচের আসরে গেলেন, এবং শাসনকালের প্রথম বড় ভুলটা করলেন । 'রোম যখন পুড়ছিল তখন নিরো তখন বেহালা বাজাচ্ছিলেন (বাঁশি নয়!) ।' ঐতিহাসিকরা বলেন প্রবাদটা নাকি সত্যই নয়, বদমাশ নিরো নাকি তখন রোমের অনেক দূরে ছিলেন । কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে মানুষ কী মনে করে তাই । মস্কোর হাসপাতালে যখন হাজার হাজার লোক কাতরাচ্ছে তখন তাঁরা নৈশভোজ ও বল নাচে যোগ দিয়েছেন কথাটা পরদিন সকালেই ছড়িয়ে পড়ল । আলেকজান্ড্রা কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিলেন এবং অনুষ্ঠান একেবারেই জমেনি ।

অনেক রুশই ভাবল এরকম একটা দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হলো বলে নিকোলাসের শাসন আমলটা খুব ভাল যাবে না, লক্ষণ সব অশুভ! আর আরো একটা জিনিস জানা গেল যে তরুন জার এবং তাঁর বিয়ে করে আনা 'জার্মান মেয়েমানুষ' টা খুবই হৃদয়হীণ ও অবিবেচক । এমন বিপর্যয়ের পরেও তারা পান-ভোজন-নাচে ব্যাস্ত থাকে!

শুধু গণতন্ত্রে নয় স্বৈরতন্ত্রেও মানুষের কী ভাবে সেটা কিন্তু খুব গুরত্বপুর্ন!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28717493 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28717493 2007-06-24 18:45:06
রুশদেশের সত্যিকথা ৯
কাজিন আলেক্সান্দার ('সান্দ্রো') এসে দেখলেন নিকি, বাবার ঘরের পাশের করিডরে অত্যন্ত বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন । 'সান্দ্রো' বললেন নিকোলাস । 'আমার, আলিক্সের, মা'র গোটা রাশিয়ার কী হবে? আমি কখনো সম্রাট হতে চাইনি । আমি দেশ চালানোর কিছুই জানি না ।'

লিভাদিয়াতে শেষ সন্মান জানানোর জন্য যখন নৌবাহিনীর কামান গুলো তোপধ্বনি করছিল আর লিভাদিয়া প্রাসাদের জানালাগুলো সব কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল শোক প্রকাশের জন্য তখনই প্রাসাদের উপাসানলয়ে, নিকোলাই আলেক্সান্দরোভিচ রোমানভ, জার দ্বিতীয় নিকোলাস হিসেবে শপথ নিলেন ।

তারপরেই একই জায়গায় প্রিন্সেস আলিক্স, তাঁর জন্মগত লুথারান বিশ্বাস করে অর্থোডক্স ধর্ম গ্রহন করলেন আনুষ্ঠানিকভাবে । ধর্মান্তরণের সাথে সাথেই তাঁর নাম পাল্টে তিনি নাম রাখলেন, 'আলেক্সান্দ্রা ফিউদরভনা' । আমরা এরপর থেকে আলিক্সকে জারিৎসা আলেক্সান্দ্রা/ আলেকজান্ড্রা নামেই উল্লেখ করব ।

তার কয়েকদিনের মধ্যেই সমস্ত পরিবার তৃতীয় আলেকজান্ডারের কফিন বহন করে, ট্রেনে করে সেইন্ট পিটার্সবুর্গের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন ।

১৭০৩ সালে জার পিটার রাজধানী সেইন্ট পিটার্সবুর্গে (রুশে-"সাংক্ত পেতের্সবুর্গ") সরিয়ে নেয়ার আগে রাশিয়ার আদি রাজধানী ছিল মস্কোতেই । পিটার ভেবেছিলেন, শুধু ভেবেছিলেন কেন বলেও ছিলেন প্রকাশ্যভাবে, মস্কোর মত একটা পশ্চাদপদ, প্রাচীন শহরে রাজধানী থাকলে রাশিয়াতে পাশ্চাত্য ভাবধারা প্রবেশ করতে পারবে না সহজে ।

তারপরেও মস্কো ছিল তখন দ্বিতীয় রাজধানী, এবং বেশ কিছু দপ্তর তখনও মস্কোতে রাখা ছিল । আর জারেরা তখনও মস্কোর নদীর তীরে ক্রেমলিন চৌহদ্দির মধ্যে তাঁদের অনেকগুলো প্রাসাদ রেখে দিয়েছিলেন । বিয়ে, অভিষেক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মত গুরুত্বপুর্ন সব ব্যাপারে তাঁরা প্রায়ই মস্কোতে আসতেন । এ ছাড়াও বছরে বেশ কয়েকমাস এসে তাঁরা মস্কোতে কাটিয়ে যেতেন যেন পুরনো রাজধানীর সাথে তাঁদের যোগসুত্র ছিন্ন না হয় ।

'ক্রেমলিন' বলতে অবশ্য আমাদের মনে মস্কো ক্রেমলিনের কথাই ভেসে ওঠে । আসলে প্রত্যেক বড় শহরেই তখন একটা করে 'ক্রেমলিন' ছিল । ক্রেমলিন মানে আসলে দুর্গ-প্রাচীর ঘেরা একটা জায়গা, ইংরেজিতে যাকে বলে 'সিটাডেল' । তবে সমস্ত ক্রেমলিনের মধ্যে মস্কো ক্রেমলিন ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত ও বড় ।

কেননা এটা ছিল সম্রাটদের থাকার জায়গা ও সাম্রাজ্যের প্রাণ কেন্দ্র । একাদশ শতাব্দীতে প্রিন্স ইভান দোলগোরুকি (যদিও কথাটা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি নয় প্রিন্স দোলগোরুকিকে অনেক সময় মস্কোর প্রতিষ্ঠাতাও বলা হয় ) এটার গোড়া পত্তন করেন বলা চলে । তখন ওক-গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল প্রাচীরটা ।

১৩৩০ এর দিকে যখন কিয়েভ থেকে মস্কোতে রাজধানী সরে আসে তখন বাইরের প্রাচীর পাকা করা হয়, ভিতরে ছিল, কয়েকটা গির্জা, প্রাসাদ, ব্যারাক, আস্তাবল এমনকী একটা মঠ পর্যন্ত । ১৪৪০ এর দিকে ইতালি থেকে কারিগর যেমন পিয়েত্রো আন্তোনিও সোলারি আর মার্কো রুফোকে আনিয়ে জার তৃতীয় ইভান প্রথম বড়সড় একটা প্রাসাদ বানান ।

শোনা যায় বিদেশীদের হাতে দালান কোঠা বানানো হলেও জাররা তাদের 'বিধর্মী ক্যাথোলিক' বলে খুব ঘৃণা করতেন । স্থপতিরা তাঁদের সাথে হাত মেলালে, পাশে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে, তোয়ালে দিয়ে তারপরে বলে দিতেন কীভাবে কী সব দালানকোঠা বানাতে হবে না হবে!

সপ্তদশ শতকের আগে রাশিয়াতে যাঁরা এতোকাল শাসন করে এসেছেন তাঁরা সকলেই 'রুরিকিড' বংশের রাজপুরুষ । তাঁরা মনে করতেন তাঁদের পুর্বপুরুষ হচ্ছেন ভাইকিং রুরিক, যিনি খুব সম্ভবত স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে ৮৫০ এর দশকের কোনো এক সময় এসেছিলেন তাঁর ভাইকিং সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ।

উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া লুট করা, কিন্তু রাজত্ব গেড়ে বসেন তিনি । রুরিকের সাথের ভাইকিংরা ধীরে ধীরে স্থানীয় স্লাভদের সাথে মিশে জন্ম দিল নতুন জাতি 'রুস' এর । 'রুস' বলতে অবশ্য পুরো দেশটাকেও বোঝাতো । অনেক ঐতিহাসিক আবার এসব মানতে রাজী নন । রুরিক-ফুরিক সব মাতাল ও মূর্খ ভাইকিংদের গাল গপ্প!

সে যাইহোক, রুরিকিডরা প্রায় সাতশো বছর রাজত্ব করেছে । এই বংশের সবচেয় উল্লেখযোগ্যদের একজন ছিলেন জার চতুর্থ ইভান বা 'ইভান গ্রোজনি' বা ইভান দ্যা টেরিবল/ 'ভয়ংকর ইভান' (যদিও 'ইভান গ্রোজনি' র আসল তর্জমা 'ইভান দ্যা গ্রেট' ই হবে) ।

এরকম ভয়ংকর রক্তপিপাসু, নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং খামখেয়ালী শাসক পৃথিবীতে খুব বেশি আসেন নি । তারপরেও অনেক রুশের কাছে ইভান গ্রোজনি জাতীয় বীর । জার পিটার নাহয় দেশকে আধুনিক করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ভয়ংকর ইভান না থাকলে দেশটাকে এতো বড় চেহারা দিতো কে!?!

কিন্তু ১৫৮৪ সালে ইভানের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র প্রথম ফিওদর বেশীদিন চালাতে পারেন নি । ১৫৯৮ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে রাশিয়াতে রুরিক রাজবংশের শেষ বাতিটি নিভে যায় । এবং কয়েক বছর ফিওদরের ভগ্নীপতি বোরিস গোদুনভ দেশ চালান এবং তাঁর মৃত্যুর পরেই রাশিয়াতে গৃহযু্দ্ধ বেধে যায় । ১৬০৫-১৬১৩ এই সময়টাকে রুশরা বলে 'দুর্যোগের সময়' (টাইম অভ ট্রাবল--'স্মুতনোয়ে ভ্রেমিয়া') । তারপরে সমস্ত অভিজাতরা মিখাইল রোমানভকে হাতে পায়ে ধরে সিংহাসনে বসান ১৬১৩ সালে । এরপরে যাঁরা ছিলেন (আমাদের নিকি তক) পর্যন্ত সকলেই রোমানভ জার ।

আবার ১৮৯৪ সালে ফেরা যাক । তৃতীয় আলেকজান্ডারের কফিন নিয়ে ট্রেন এসে মস্কোতে থামল । লাশ রাখা হয়েছিল ক্রেমলিনে, সেখানে শহরের সবগুলো গির্জাতে প্রার্থনা চলল । তারপরে সেইন্ট পিটার্সবুর্গ । খোলা গাড়িতে করে কফিনটা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, পিছনে পরিবারের সবাই ।

সবার পিছনে আলিক্স/আলেকজান্ড্রা । কারন তখনো নিকির সাথে বিয়ে হয় নি তাঁর । আলেকজান্ড্রাকে দেখে প্রৌঢ়া মহিলারা সব বুকে ক্রুশ আঁকল । হবু শ্বশুরের কফিনের পিছন পিছন মেয়েটা রাজধানীতে এসেছে । এ মেয়ে যে অপয়া তাতে কারো কোনো সন্দেহ আছে !?!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28717060 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28717060 2007-06-22 20:07:32
রুশদেশের সত্যিকথা ৮
বলা হয় ভিক্টোরিয়া নিজেও ছোটবেলায় ইংরেজি ভাল করে বুঝতেন না, আর কথা বললে জার্মান অ্যাক্সেন্ট চলে আসত । অবশ্য ততদিনে তাঁর পরিবার ইংল্যান্ডে প্রায় সোয়াশো বছর ধরে আছে । ভিক্টোরিয়া তাঁর মামা, বেলজিয়ামের লিওপোল্ডের পরামর্শে, অতীব ক্ষুদ্র জার্মান রাজ্য সাক্সে কোবুর্গ উন্ড গোটা রাজ্যের ডিউক আলবার্টকে বিয়ে করেন ১৮৩৯ সালে । প্রিন্স আলবার্ট, প্রিন্স অ্যালবার্ট কোট নামের পোশাকটির জন্য পরিচিত । লোকে আরো বলে প্রকৃতিবিদ্যা ও বৈজ্ঞানিক গবেষনায়ও নাকি তাঁর অনেক উৎসাহ ছিল ।

বাইশ বছরের দাম্পত্য জীবনে নয়টি পুত্রকন্যার জন্ম দেন ভিক্টোরিয়া আর আলবার্ট । এর মধ্যে ছয়টী কন্যা । তার মধ্যে পাঁচটিকে আবার বিভিন্ন জার্মান রাজবংশে বিয়ে দেন ভিক্টোরিয়া । সুতরাং বলা হতো ব্রিটিশ সিংহাসনে রাণী যেমন আধা-জার্মান, জার্মান কুলীন বংশগুলোতে আবার ইংরেজ রাজকুমারীদের আধিপত্য । জার্মানীর সাথে যে ব্রিটেনের এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লাগবে সেটা ঊনিশ শতকে আঁচ করা যায় নি বললেই চলে । জার্মানদের সাথে আবার আত্বীয়তা ছিল ডেনিশ, সুইডিশ ও অধুনা প্রতিষ্ঠিত গ্রীসের শাসক পরিবারের ।

কিন্তু ১৮৬০ এর দশকে জার্মানি এক হতে শুরু করল । মুলতঃ প্রাশিয়ার আধিপত্য এখানে ছিল প্রধান । প্রাশিয়া মানে বার্লিনের ক্ষমতা বাড়া মানে অস্ট্রো-হাঙ্গারিয়ান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব হওয়া, যদিও দু্টিই জার্মান ভাষী । তারপরেও একীভুত জার্মান সাম্রাজ্য ভয় করার কিছু ছিল না ইংল্যান্ডের । বিলাতের সাম্রাজ্য দুনিয়াজোড়া, এবং এর মুল ভিত্তি নৌশক্তি । জার্মানরা বড় জোর মহাদেশীয় ইউরোপে প্রাধান্য করতে পারবে । আবার অন্য দিকে রুশরা যেহেতু অনেককাল ধরেই কনে বাছাই করছে জার্মান অভিজাত বংশগুলোতে । রুশ-জার্মান-ইংরেজ মৈত্রীর কথাও আস্তে আস্তে শোনা যেতে লাগল ।

এত কিছু বলে ফেললাম তার কারন হচ্ছে নিকির বিয়েতে এ সব উঠে এল খুব প্রাসঙ্গিক বিষয়ে । নিকির জন্য যদি আর কোনো কনে পাওয়া নাই যায়, বা সে যদি আলিক্সকেই বিয়ে করবে স্থির করে থাকে তো বেশ! জার্মান গ্র্যান্ড ডিউকের কন্যা ও ভিক্টোরিয়ার নাতনি, প্রয়োজনীয় নী। রক্ত আছে তার শিরায় । তার একটি বোনেরও আবার এদিকে বিয়ে হয়েছে, একেবারে ফেলনা নয় সম্পর্কটা । ভেবেচিন্তে নিমরাজী হলেন জার ও জারিৎসা ।

ভিক্টোরিয়া আলিক্স হেলেনা লুইজ বিয়াট্রিস, রাণী ভিক্টোরিয়ার তৃতীয় কন্যা অ্যালিস আর হেস-ডার্মস্টাটের গ্র্যান্ড ডিউক চতুর্থ লুইয়ের দ্বিতীয় মেয়ে, জন্ম ১৮৭২ সালে । ছোট বেলার একটা বড় অংশ কেটেছে ইংল্যান্ডে যখন আলিক্সের ডাক নাম ছিল 'সানি' বা 'অ্যালিকি' । কিন্তু ছয় বছর বয়সে ডিপথেরিয়ার মহামারীতে আলিক্স তার ছোট্ট চার বছরের বোন মে আর মা অ্যালিসকে হারায় । এবং এই দুই শোকের ধাক্কা আলিক্স অনেক দিন বয়ে নিয়ে বেরিয়েছে । ১৮৮০ দশকে তাকে ইংল্যান্ডে নানীর দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় । ভিক্টোরিয়া তাঁর এই নাতনিটি নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন ।

জার তৃতীয় আলেকজান্ডার কেন মত পাল্টালেন? প্রথম ও প্রধান কারন হচ্ছে কিডনির অসুখটা বেড়ে যাওয়াতে জারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল । তিনি ভেবেছিলেন তাঁর আরো বেশ কিছূকাল আয়ু আছে, এবং সেই জন্য সিংহাসনে বসার জন্য নিকিকে তৈরি করতে তিনি দেরী করছিলেন । কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপান ও অন্যান্য কারনে তাঁর স্বাস্থ্য এত খারাপ হতে লাগল যে নিকির বিয়ের জন্য তিনি চাপ দিতে থাকলেন, যাকে খুশি নিকি বিয়ে করুক!

১৮৯৪ সালে আলিক্সের ভাই এরনেস্টের বিয়েতে নিকোলাস রাশিয়ার পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন । পাত্রী এরনেস্টের মামাতো বোন, ভিক্টোরিয়া পুত্র, প্রিন্স আলফ্রেডের কন্যা ভিক্টোরিয়া মেলিটা । বিয়েটা খুব বেশিদিন টিকবে না । সে যাহোক এই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে নিকোলাস প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন আলিক্সকে । এবং পর দিন আলিক্স তাতে সন্মতি জানালেন । ডায়েরিতে নিকোলাস লিখলেন, 'আমার কাঁধের উপর থেকে একটা পাহাড় নেমে গেছে ।'

জার আর জারিৎসা খুশি হয়ে টেলিগ্রাম করলেন । জারিৎসা, আলিক্সকে একটা পান্না বসানো ব্রেসলেট উপহার দিলেন রোমানভ পরিবারের ভাবী পুত্রবধু হিসেবে । দশদিন নিকোলাস ছিলেন আলিক্সদের বাড়িতে ।

জুনমাসে আলিক্স আর নিকোলাস, রাণী ভিক্টোরিয়ার সাথে দেখা করার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমালেন । সেখানে ওয়ালটন অন টেমস জায়গায় আলিক্সের বোনের একটা কটেজ ছিল । সেখানে নিকোলাস আর আলিক্স বেশ কয়দিন নিরিবিলিতে কাটান । বহুবছর পরেও ওয়ালটনের নাম শুনলে আলিক্সের চোখে পানি আসত ।

ওয়ালটন থেকে তাঁরা 'নানী' মানে উইন্ডসর দুর্গ-প্রাসাদে ভিক্টোরিয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন । রুশ রাজবংশের উপর ভিক্টোরিয়া খুব সন্তুষ্ট না হলেও এই হবু নাত-জামাইটিকে তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল । এখানেই নিকি এনগেজমেন্টের উপহারগুলো দেন । গোলাপী মুক্তা বসানো আংটি, গোলাপী মুক্তার নেকলেস । মুক্তা বসানো একটা চেন তার চারদিকে অনেকগুলো মহামুল্যবান রত্নে পেন্ডেন্ট ।

এবারে আসল কথাটা পাড়তে হয় । নিকোলাস, মাতিলদার সমস্ত কথা খুলে বললেন আলিক্সকে । কিম্তু না প্রথম প্রেমের পুর্বারেগে মশগুল আলিক্স, 'ক্ষমা স্বর্গীয়' নীতিতে সব মাপ করে দিলেন । 'আমাদের যখন অল্প বয়স (নিজের বয়স কিন্তু তখন মাত্র বাইশ!) তখন এসব ভুলত্রুটি আমরা করতেই পারি, এসব ঈশ্বর ক্ষমা করবেন, যদি আমরা অনুতপ্ত হই' অত্যন্ত মহানুভবতার সাথে নিকিকে চিঠি লিখে জানালেন আলিক্স । ছয় সপ্তাহ ইংল্যান্ডে কাটিয়ে দেশে ফিরলেন নিকি ।

বাড়ি ফিরে নিকি দেখলেন বাবার শরীর এর মধ্যে আরো খারাপ হয়েছে । ডাক্তারদের পরামর্শে তিনি সেইন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে সুদুর দক্ষিনে, কৃষ্ণ সাগর তীরের ইয়ালতাতে লিভাদিয়া প্রাসাদের অবস্থান করছিলেন । কিডনির বৈকল্য তাঁকে গ্রাস করেছিল ভীষণভাবে । এই প্রাসাদের স্তালিন, রুজভেল্ট আর চার্চিল 'ইয়ালতা সন্মেলন' করবেন ১৯৪৫ সালে । তখন এটা জারদের অনেকগুলো প্রাসাদের একটা ছিল ।

নিকোলাস, আলিক্সকে টেলিগ্রাম করলেন চলে আসার জন্য । ট্রেনে চড়ে জার্মানি থেকে ইউক্রেনে চলে এলেন আলিক্স হবু শ্বশুরকে দেখার জন্য । তারপরে অনেকটা পথ ছাদখোলা ঘোড়ার গাড়িতে । পথে অনেকবার থামতে হলো, স্থানীয় লোকেরা রুটি আর লবন নিয়ে আসছিল (ঐতিহ্য বাহী রুশ অভ্যর্থনা) । সমস্ত অসুস্থতা স্বত্বেও জার তৃতীয় আলেকজান্ডার বিছানা ছেড়ে উঠে ইউনিফর্ম পরলেন । তারপরে নিকোলাস আর আলিক্স এই রোগ জীর্ণ, মৃত্যুপথযাত্রী দৈত্যাকার সম্রাটের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিলেন ।

ডাক্তাররা সব তৃতীয় আলেকজান্ডারের বিছানা থেকে জারিৎসার কাছে রিপোর্ট করতেন । পাশের ঘরে বসে থাকা চুপচাপ নিকির সাথে কথা বলার খুব একটা দরকার তাঁরা মনে করতেন না । এবং আলিক্স তো একেবারেই বহিরাগত বাইরের কেউ একজন । নিকোলাস আর আলিক্সের দাম্পত্য জীবনটা খুব মসৃনভাবে শুরু হয়নি ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716946 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716946 2007-06-21 22:04:45
রুশ দেশের সত্যিকথা ৭
তবে শুধু নিকোলাসের জন্যই যে তাঁদের চিন্তা ছিল তা নয় । নিজেদের পারিবারিক ভবিষ্যতও তাঁরা ভাবছিলেন । রাজাদের বিয়ে মানে সিংহাসনের ভবিষ্যত দাবীদারের পথ নিষ্পন্ন করা । তাঁরা জনগনের মালিক হতে পারেন কিন্তু কিছু কিছু কাজ করতে তাঁদের নিজের বলতে খুব কমই স্বাধীনতা ছিল ।

আসলে নিকোলাসের বাবাও ভাবেন নি যে তিনি সম্রাট হবেন । সেই জন্য দ্বিতীয় আলেকজান্ডার, তৃতীয় আলেকজান্ডারের শিক্ষা দীক্ষার জন্য তেমন একটা গা করেন নি । তাঁকে স্রেফ একজন গ্র্যান্ড ডিউক পর্যায় কাজ করার মত শিক্ষা দেয়া হয়েছিল । আর নিকোলাসের বড় ভাই খুব ছোটবেলায় মারা না গেলে নিকোলাসও সিংহাসনের দাবিদার হতে পারতেন না । এই সব সে যুগে ছিল খুব প্রচলিত একটা ব্যাপার ।

মানুষের আয়ু ছিল কম, রাজা-রাজড়ারাও অল্পবয়সে দুম করে দুনিয়ার পাট চুকিয়ে চলে যেতেন ডিপথেরিয়া-কলেরা-টাইফয়ডের মতো অসুখে । তাই বর্তমান তৃতীয় বিশ্বের লোকদের মত বিয়ে ও (পুত্র) সন্তান পাগল ছিলেন তাঁরা । সন্তান থাকা মানে সিংহাসন ও নানান সম্পত্তি ও খেতাবের উপর দাবিদাওয়া পোক্ত হওয়া ।

মাতিলদাকে যে বিয়ে করা যাবে না সেটা শুরুতেই নিকি বুঝেছিল । অভিজাত পরিবারের, নিদের পক্ষঢ ডিউকের কন্যা সম্রাটের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী । কনের পরিবারের সাথে আবার রাশিয়ার পুর্ব শত্রুতা থাকলে চলবে না । কনেকে অর্থোডক্স ধর্মে দীক্ষান্তর নিতে হবে, এবং এই বিয়েতে যেন রাশিয়া যৌতুক হিসেবে কিছু 'কৌশলগত মিত্র' পায় শ্বশুরবাড়ির দেশে । সেক্ষেত্রে পছন্দ করার স্বাধীনতা কমে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই ।

নিকোলাসের যখন ষোলোবছর বয়স, তখন কাজিন সের্গেইএর বিয়েতে যোগ দিতে গিয়ে বারো বছরের একটি সোনালীচুলো কিশোরীর সাথে দেখা হয় তার । জানা যায় যে সে হচ্ছে সের্গেইএর কনে জার্মানীর হেস-ডার্মস্টাটের গ্র্যান্ড ডিউকের কন্যা প্রিন্সেস এলার বোন, প্রিন্সেস আলিক্স, বা অ্যালিকি । ভিক্টোরিয়ার মেয়ে প্রিন্সেস বিয়াট্রিস, আলিক্সের মা । আলিক্সকে মহামুল্য একটা ব্রুচ উপহার দিয়েছিল কিশোর নিকোলাস । আলিক্স সেটা হাতে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার নিকোলাসের হাতে গুঁজে দেয় । দেখে ভারী রাগ হয়েছিল নিকি, মেয়েকে পটানো তো সহজ নয় !

সে যাইহোক , আজব দেশের অ্যালিসের (আলিক্স, অ্যালিসের জার্মান উচ্চারণ) মতোই মেয়েটা নিকির মাথার মধ্যে রয়ে গেল । মাঝে মাঝেই বাপ মাকে সে জ্বালাতো 'বিয়ে করলে আলিক্সকেই করব!' বলে । শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন তৃতীয় আলেকজান্ডার আর মারিয়া ফিওদরভনা । আলিক্সকে তাঁরা দেখেছেন এবং পুত্রবধু হিসেবে মোটেই পছন্দ করেননি । ভিক্টোরিয়ার নাতনি হতে পারে সে, কিন্তু সে একেবারে মফস্বলের রাজকুমারী (হেস-ডার্মস্টাট, জার্মানির সবচেয়ে ক্ষুদে করদ রাজ্যগুলোর একটা ছিল), আর না সেটাও না । মেয়েটা উমম..কী বলে...মাথা..ঠিক তাও নয় মানে একটু হিস্টিরিয়ার ছোঁয়া আছে ।

আলিক্সের চলন-বলনও ঠিক সুবিধার নয় । খুব বেশী ইন্ট্রোভার্ট, ভয়াবহ ফরাসী উচ্চারন (সে সময়ে রুশদেশের ও ইউরোপের অনেক দেশেরই রইস আদমীরা ফরাসীতে বাতচিত করতেন), পোশাক-আশাকের উপর খুব ভাল ধারনা নেই (কোনো প্রিন্সেস, ফ্যাশন দুরস্ত হবেন না সেটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ) । নিন্দুকেরা বলে থাকে আলিক্স নাকি খুব অহংকারীও! লাজুক লোককে সবাই ভুল বোঝে, বিশেষ করে যখন তার উপর অনেক সামাজিক দায়িত্ব থাকে ।

তৃতীয় আলেকজান্ডার, ছেলের জন্য ফ্রান্সের সিংহাসন চ্যুত রাজার কন্যা ইলেনকে বাছাই করেছিলেন । কিন্তু ফরাসী প্রিন্সেস ধর্মান্তরে ক্যাথোলিক বিশ্বাস ত্যাগ করতে না চাওয়াতে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেল । এর পরে । এরপরে প্রাশিয়ার প্রিন্সেস মার্গারেট, (ভিক্টোরিয়ার আরো একটি নাতনি) সাথে সম্বন্ধ এল, নিকোলাস জানালো এ বিয়ে করার চেয়ে সন্ন্যাসী হওয়াটা তার জন্য অনেক বেশী পছন্দের । সুতরাং আবারো আলিক্স ।

অষ্টাদশ শতকের আগে প্রায় সমস্ত রুশ জার তাঁদের নিজেদের দেশের অভিজাত সম্প্রদায় (বয়ার) থেকে কনে বেছেছেন । বিদেশী 'ধর্মচ্যুত' দের মধ্যে নিজেদের সম্বনধ খোঁজেননি । পিটারই প্রথম নিজের ছেলের জন্য জার্মানির ব্রুন্সভিক-ভোলফেনবুটেল বংশের প্রিন্সেস শার্লটকে পছন্দ করেন । তারপর কালে কালে অনেক জার্মান রাজকুমারী এসেছেন রোমানভ রাজবংশের পুত্রবধু হিসেবে । দু'জন অবশ্যই নিজেরাই সম্রাজ্ঞী বনে গেছেন ।

তখন জার্মানী শতধা বিভক্ত ছিল ছোট-বড় নানান রাজ্যে । প্রাশিয়া (প্রয়সেন) অবশ্য একটা উল্লেখ করা মত রাষ্ট্র ছিল তবে তখনো তা রাশিয়ার প্রতি হুমকি হয়ে ওঠেনি । ফরাসীরা রুশদের খুব একটা পাত্তা দিত না আর ফরাসী বিপ্লবের পর তাদের নিজেদের গদিই এমন টলমলে হয়ে যায় যে ফরাসী বংশে বিয়ে করে খুব একটা ফায়দা ছিল না ।

আর জার্মানদের সাথে দুনিয়ার রাজা-রাজড়ার আত্বীয়তা ছিল । ১৭১২ সালে ইংল্যান্ডের রানী অ্যান, নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তাঁর এক দূর সম্পর্কের আত্বীয় জার্মানির হ্যানোভারের ডিউক, জর্জ (গিওর্গ) কে এনে সিংহাসনে বসায় । ফলে লতাপাতায় অনেক ক্ষুদে জার্মান রাজকুমার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে থাকেন ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716674 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716674 2007-06-19 22:36:42
রুশদেশের সত্যিকথা ৬
'নারোদনায়া ভলিয়া' কথাটার তর্জমা হতে পারে 'জনগনের ইচ্ছা বা মুক্তি' । আসলে জনগনের সাথে এর তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না । খুব বেশি হলে হাজার দুয়েক সমর্থক এবং কয়েকশো সংগঠক ছিল এতে । বস্তুত এটি ছিল কতিপয় সমাজবিচ্ছিন্ন, ছাত্র ও (অতি) বুদ্ধিজীবির সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সংস্থা । ডারউইন-মিলস-মার্ক্সের সব কেতাব পড়ে, অনেক ভেবে, মাথা চুলকে তাঁরা এই 'বৈজ্ঞানিক' (?) সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সমাজ-দেশ-রাষ্ট্র যাই বলি না কেন জিনিসগুলো কতিপয় কতিপয় লোকের খেলার পুতুল ও লুন্ঠনের ক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে ।

সমাজকে পাল্টাতে হলে তাই প্রথমে সমাজের মাথাগুলোকে খতম করে দিতে হবে । আজকের দিনে হয়তো এদেকে বলা যেতো সেক্যুলার মৌলবাদী । জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে মেরে (১৮৮১) এই দেশপ্রেমিকরা খুব ফুর্তিতে ছিলেন । পালের গোদাটা গেছে! বাকিগুলোও যাবে!

তবে একটা বড় ভুল হয়েছিল তাঁদের । সম্রাটদের মধ্যে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার মন্দের ভাল ছিলেন । তিনি সত্যিই যথেষ্ট লেখাপড়া জানা উদারপন্থী ও সংস্কারকামী ছিলেন (কতটুকু সফল হয়েছিলেন বা হতে পারতেন তা তর্কের বিষয়ে ) । তাঁর পুত্রটি তাঁর থেকে বহুগুনে প্রতিক্রিয়াশীল (এবং মাথামোটা) ছিলেন এবং তিনি বাবার সমস্ত উদারপন্থী সংস্কার একের পর এক উল্টে দিতে থাকেন । 'জনগনের ইচ্ছার' ইজারাদাররা জার তৃতী আলেকজান্ডারকেও বোম মেরে বৈতরণী পার করে দেবার পাঁয়তারা আঁটলো । কিন্তু সম্রাট তাঁর বাবার চেয়ে অনেক সেয়ানা ছিলেন ।

পরিকল্পনা আঁটা হলো সেইন্টপিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আসবেন সম্রাট । ভারী ভারী কিছু বইয়ের ভিতর কাগজ ছিঁড়ে সেখানে বোমা নিয়ে ঢুকবে তারা (অনেকটা টিনটিনের ক্যাপ্টেন হ্যাডক যেভাবে চাঁদে হুইস্কি নিয়ে গেছিলেন সে ভাবে!) । কিন্তু টিকটিকি ছিল দলের ভিতর । গুপ্তপুলিশ তখন খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছিল রাশিয়াতে । ১৮৮৭ সালের ১ লা মার্চ প্রায় দশ বারোজন কে আটক করা হলো । দেশদ্রোহের কেস, দ্রুত বিচার এবং ফাঁসির রায় । পাখোমি আন্দ্রেউশকিন, ভাসিলি ওসিপানভ, ভাসিলি গেনেরালভ, পিওতর শেভিরেভের সাথে আলেক্সান্দার উলিয়ানভ নামে সেইন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন একুশ বছর বয়সী ছাত্রের ফাঁসি কার্যক করা হলো মে'র ৮ তারিখে, শ্লিসেলবুর্গ দুর্গে ।

শেষ নামটি খুব গুরুত্বপুর্ণ, আলেক্সান্দার, জার আলেক্সান্দারকে মারতে এসে ফাঁসিতে ঝুলেছে ছাত্র আলেক্সান্দার (সম্রাটকে আমরা 'আলেকজান্ডার' বলছি ইংরেজ রীতিতে) । তার বাড়ি সিমবির্স্ক শহরে । সেখানে তার একটা ভাই ছিল, নাম ভ্লাদিমির, ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ । বয়সকালে সে সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত হবে । সেখানে লেনা নামে একটা নদীর প্রেমে পড়বে সে এবং ছদ্মনাম নেবে 'লেনিন' । সে ব্যাপারে আমরা পরে জানতে পারব ।

ভ্লাদিমির এবং আলেক্সান্দারের বাবা ছিলেন সেযুগের খুবই সফল ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ইলিয়া নিকোলায়ভিচ উলিয়ানভ । জীবনের শেষ বারো বছর সিমবির্স্ক জেলার স্কুল পরিদর্শক ছিলেন তিনি । ১৮৩১ সালে জন্ম, ১৮৫৪ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন বিজ্ঞানে ।

আবহাওয়া বিজ্ঞানের উপর তাঁর দুটো বই আছে । প্রাথমিক শিক্ষার উপর তিনি অনেক গবেষনা করেছেন । খুব সামান্য অবস্থাতে জীবন শুরু করলেও মৃত্যুর সময়ে (১৮৮৬, ছেলের ফাঁসি দেখতে হয়নি একবছরের জন্য) তিনি শহরের গন্য-মান্য-প্রতিষ্ঠিতদের একজন ছিলেন । আলেক্সান্দার ব্লাংক নামে নামে এক ডাক্তারের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন সেটাও প্রতিষ্ঠার একটা কারন ।

সিমবির্স্ক শহরটা আরো এক কারনে গুরুত্বপু্র্ণ । ফিওদর কেরেনস্কি নামে সেখানে আরেক স্কুল শিক্ষক থাকতেন, যাঁরও আলেক্সান্দার নামে একটি পুত্র ছিল--আলেক্সান্দার কেরেনস্কি । রাশিয়ার ইতিহাসে তিনিও নাম লেখাবেন ভ্লাদিমিরের উলিয়ানভের পাশাপাশি । তবে সে মুলতঃ ব্যার্থতার ইতিহাস ।

সে যাই হোক নিকোলাস যখন জাপান সফর থেকে ভ্লাদিভস্তকে এলেন তখন ভ্লাদিভস্তক ছিল (এবং এখনো) দূরপ্রাচ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে গুরত্বপুর্ণ বন্দর । পূবে যেভাবে রাশিয়া ভুখন্ড দখল করে চলেছিল (মুলতঃ চীনের) তাতে আশা (?) করা গিয়েছিল যে সারা বছর বরফমুক্ত কয়েকটা বন্দর তারা কব্জা করতে পারবে । অন্তত কোরিয়ান উপদ্বীপটা যে তারা কব্জা করতে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না রুশদের মনে ।

সবচেয়ে উদার পন্থী রুশরাও এই সাম্রাজ্য বিস্তারে তেমন খারাপ কিছু দেখতে পেতেন না । রাশিয়া 'সভ্যতার' বিস্তার ঘটাচ্ছে এশিয়াতে । এতে কার কী বলার আছে? আর ইংরেজ, ফরাসী, পর্তুগীজ, ওলন্দাজরা যেভাবে ভাগ বাঁটোয়ারা করছিল দুনিয়াটাকে সেখানে রুশ উচ্চাভিলাষ খুব একটা বিসদৃশ ঠেকবে না ঊনিশ শতকের পর্যবেক্ষকের কাছে । বীরভোগ্যা বসুন্ধরা!

চীন ছিল পশ্চাদপদ মাঞ্চু সম্রাটদের লুন্ঠনভুমি । মাঞ্চুরা নিজেরাও খাস চীনা (হান চীনা) ছিলেন না, তারা ছিলেন মাঞ্চুরিয়া থেকে আগত মোঙ্গল, সতেরোশো শতকে মিং রাজবংশকে হটিয়ে সিংহাসন দখল করেন । তাঁরা সাধারন লোকদের সেটা মনে করিয়ে দেবার জন্য নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে চুল বেণী করার নির্দেশ দেন! এমন দেশে মানুষ শাসককে ভাল বাসবে কেন?

তবে ভারতের মতো বিদেশীরা একেবারে সার্বভৌম ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করেনি, দেশে নামকা ওয়াস্তে সম্রাট ছিলেন । আর ছিলেন প্রায় স্বাধীন ও সর্বদা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত সামন্ত বর্গ । দেশের বেশ একটা বড় সংখ্যক লোক আফিমে বুঁদ হয়ে থাকত ।

ওদিকে ইংরেজরা ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল হংকংএ । শাংহাইতে সমস্ত বিদেশী শক্তিরই (গ্রেট পাওয়ার্স!) ঘাঁটি ছিল রুশ-ফরাসী-আমেরিকান-ইংরেজ এবং হালে জাপানী । সেখানে শহরের একটা বড় এলাকা (কনসেশন জোন) পুরো বিদেশীদের ছিল এবং সেখানে সন্ধ্যার পরে কোনো চীনা দেখা গেলে (ভৃত্য-পতিতা বা ইত্যকার 'প্রয়োজনীয় জনতা' বাদে) সটান তাকে ফাটকে পাঠিয়ে দেবার সুবন্দোবস্ত ছিল । (আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এই মহান কর্মে বিশেষত ভারতীয় শিখ-ভোজপুরি সিপাইরা নিয়োজিত ছিল) ।

চীনা মালি চর্চিত পার্কগুলোর ফটকে লেখা ছিল সেই বিখ্যাত সুমধুর বাণী "অনলি ডগস অ্যান্ড চাইনিজ আর ফরবিডেন (কেবল কুকুর আর চীনাদের প্রবেশ নিষেধ) ।" সাইনবোর্ডের বাণীটি আফ্রিকাতেও রফতানী হবে ।

১৮৯১ সালে, সাত সাগর তেরো নদীর পারে লন্ডন মহানগরীতে একজন অল্পবয়্সী ছাত্র ডাক্তার স্বপ্ন দেখছেন দেশে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে গনতন্ত্র আনবেন, বিদেশীদের উৎপাত বন্ধ করবেন । তরুনটির নাম ডক্টর সান ইয়াৎ সেন । তবে তাঁকে আরো একুশ বছর অপেক্ষা করতে হবে । বিদেশীরা যাবে আরো চল্লিশ বছর পর ।

সে যাই হোক আমরা তো রাশিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম, চীন নিয়ে নয় । তবে রুশ ভানতে কেন এই চীনের গীত? এসব কিছুই সে যুগের বাস্তবতা । রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তারেই তার শাসকদের ধ্বংস, কথাটা অদ্ভুত মনে হলেও কথাটা অনেকাংশে সত্য । নিউটনের তৃতীয় সুত্র ।

পশ্চিমে যেহেতু সাম্রাজ্য কঠিন বা প্রায় অসম্ভব তাই পুবে তাকাও । আর পুবের সম্প্রসারণ করতে হলে চাই উন্নত যোগাযোগ ব্যাবস্থা । নদী পথে সম্ভব নয় । সাগরে যেতে হলে গোটা দুনিয়া ঘুরে যেতে হবে । তাহলে রেল লাইন পাতা হয় । নিকোলাস যখন ভ্লাদিভস্তকে এসে পৌঁছেছেন তখন ট্র্যান্স সাইবেরিয়ান রেল লাইনের একটা গুরুত্বপুর্ন উদ্বোধন অনুষ্ঠান হচ্ছিল সেখানে ।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716454 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716454 2007-06-18 15:07:35
রুশদেশের সত্যিকথা ৫
ভারতে তাজমহল, স্বর্ণ মন্দির দর্শন সেরে ৩১ এ জানুয়ারি ১৮৯১ সালে সিংহল থেকে সিংগাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । শ্যামের (এখন থাইল্যান্ড) রাজা পঞ্চম রামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকার সেরে জাভা দ্বীপ দর্শন সেরে ১৩ই মার্চ চীনের নানকিং বন্দরে পা রাখেন তিনি । সেখানে অনেক কিছু দেখে শুনে ১৫ ই এপ্রিলে জাপানে কাগোশিমা বন্দরে ছ'টা জাহাজ সহ উদীয়মান সুর্যের দেশ, জাপানী সাম্রাজ্যে পা রাখেন জারেভিচ নিকোলাস ।

সেটা ছিল জাপানে প্রথম কোনো রাজকীয় সফর । যেহেতু জাপান ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করছে আর রাশিয়াও এ অঞ্চলে ক্রমে তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, আমেরিকাও প্রশান্ত মহাসাগরের এদিকটায় তার লোলুপ দৃষ্টি বিস্তৃত করছে; সুতরাং বলাই বাহুল্য রুশ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত উত্তরাধিকারীর এই সফরের দিকে নজর ছিল সবার ।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু শান্তির সময়ে সকল রাজাই অপরাপর রাজন্য বর্গকে অত্যন্ত সাদরে গ্রহন করার পক্ষপাতী । কোবে আর কিওটোতে নিকোলাসকে বিপুলভাবে সংবর্ধিত ও ভোজসভায় আপ্যায়িত হলেন । কিওটোতে জাপানী প্রিন্স আরিসুগাওয়া তাকাহিতো প্রতিনিধি দল সহ সাক্ষাত করে ভবিষ্যতে রুশ-জাপান সম্পর্কে যতদূর উন্নত করার উপর 'গুরুত্বারোপ' করলেন ।

তবে সফরটা স্রেফ পানভোজন-সিরিয়াস বৈঠকের ছিল না । নিকোলাস প্রায় ত্রিশ-চল্লিশটা বুদ্ধমুর্তি সহ নানান কিউরিও সংগ্রহ করেছিলেন, পরে সেগুলো বিভিন্ন রুশ যাদুঘরে দান করা হয়েছিল । কোথায় যেন শুনেছিলেন নাগাসাকিতে চমৎকার উল্কি শিল্পী আছে । জাপান সফরের স্মৃতি শরীরে ধারন করতে বাহুতে উল্কি আঁকার সিদ্ধান্ত নিলেন নিকোলাস । তলব শুনে শহরের দুই সেরা উল্কি শিল্পী এলো জারেভিচের শরীর অলংকৃত করতে ।

এখানেই ১১ই মে ১৮৯১ সালে ওৎসু অঞ্চলে মন্দির পরিদর্শন করতে গিয়ে অঘটনটা ঘটল সেদিন । আমরা আসলে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সেইদিন (অ)ঘটন পুর্ণ দিনে । শিগা জেলার ওৎসুতে বিওয়া হ্রদ দেখে ফেরার সময় ৎসুদা সানজো নামে একজন দেহরক্ষী নিকোলাসকে লক্ষ্য করে তরবারী চালায় (অনেকটা রাজীব গান্ধীকে মারার জন্য শ্রীলংকান নৌ সেনার স্টাইলে! তবে আঘাত করার জন্য রাইফেলের বাঁটের চেয়ে খোলা তরবারি অনেক বেশি ভয়ংকর অস্ত্র সন্দেহ নেই!) । মন্দিরের ভিতর জর্জ আর নিকোলাস জুতা পরে ঢুকেছিলেন সেটাও একটা কারন হতে পারে ।

দ্বিতীয়বার আঘাত করার আগেই নিকোলাসের সঙ্গী প্রিন্স জর্জ তার ছড়ি উঁচিয়ে সেটা ঠেকিয়ে দেন । এরপরে সানজো পালাতে চেষ্টা করতেই নিকোলাসের সাথী দুই রিকশাওয়ালা (হ্যাঁ! রিকশা ব্যাপারটা তখন জাপানীদের এক চেটিয়া ছিল!!) দৌড়ে গিয়ে কনস্টেবল সানজোকে মাটিতে পেড়ে ফেলে । নিকোলাসের কপালে প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা একটা ক্ষত সৃষ্টি হওয়া ছাড়া তেমন কোনো ক্ষতি হয় নি ।

ঝড়ের বেগে নিকোলাসকে কিওটোতে ফিরিয়ে নেয়া হলো । প্রিন্স কিতাশিরাকাওয়া ইউশিহিসা নিকোলাসকে বিশ্রাম নেবার অণুরোধ করে টোকিওতে খবর পাঠালেন । এরকম একটা ঘটনা সেযুগে যুদ্ধ ঘোষনা করার অজুহাত হিসেবে যথেষ্ট ছিল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এমন একটা কারনেই ঘটেছিল, যদিও সেখানে সত্যিকার অর্থেই অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী নিহত হয়েছিলেন ) এবং রুশদের মোকাবিলা করার মতো জাপানী সামরিক বাহিনী তখনো ততটা শক্তিশালী হয় নি ।

তাই প্রধানমন্ত্রী মাৎসুকাতা মাসাওশি, সম্রাট মেইজি (এই মেইজিই ১৮৬৮ সালে শোগুন তন্ত্র লোপ করে সম্রাটের এক্চ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করেন, এবং সে ঘটনাকে 'মেইজি রেস্টোরেশন' বলে অভিহিত করার হয়) পরামর্শ দিলেন যত শিগগীর সম্ভব জারেভিচ নিকোলাসের সাথে দেখা করে সমবেদনা প্রকাশ করতে । সম্রাট বিকেল বেলায় টোকিওর শিমবাশি স্টেশনে ট্রে উঠে সারারাত জার্নি করে পরদিন সকালে প্রাচীন রাজধানী কিওটোতে পৌঁছালেন ।

পরদিন, নিকোলাস বললেন যে কোবে বন্দরে অবস্থিত রুশ নৌবহরে তিনি ফিরতে চান । সম্রাট মেইজি, প্রিন্স তারুহিতো আর প্রিন্স আরিসুগাওয়াকে পাঠালেন নিকোলাসের সাথে । এমন কী দু'দিন বাদে নিজেই রুশ জাহাজে ব্যাক্তিগত ভিজিটে এলেন । অনেক সিনিয়র জাপানী কর্তাব্যাক্তি মানা করেছিলেন এরকম একটা কাজ করতে, তাঁদের আশংকা ছিল সম্রাটকে অপহরণ করা হতে পারে ।

সম্রাট ব্যাক্তিগতভাবে বললেন জাপান তার একজন অত্যন্ত সন্মানিত অতিথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যার্থ হয়েছে, ব্যাস বন্যার পানির মতো সহানুভুতি জানিয়ে টেলিগ্রাম আসতে লাগল । জারেভিচ নিকোলাস আশু সুস্থতা কামনা করে প্রায় দশ হাজার এসেছিল জাপানের নানান জায়গা থেকে । জাপানের ইয়ামাগাতা প্রিফেকচারের একটা শহরতো 'ৎসুদা' আর 'সানজো' এ দুটো কলংকজনক নাম রাখা নিষিদ্ধ করে ফেলল!

প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়নি এ অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ৎসাইগো সুগামিচি আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওকি শুজো ইস্তফা দিলেন (যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এখানে কী করার ছিল তা পরিষ্কার নয়!) । মানে জাপানী প্রশাসন তাঁদের দুঃখপ্রকাশের আন্তরিকতায় কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকুক সেটা চাননি ।

জাপানী সরকার, আদালতকে চাপ দিল ফৌজদারীবিধির ১১৬ ধারায় (যাতে জাপানের সম্রাট, রাজপরিবারের ক্ষতিসাধন বা ক্ষতিসাধনের চেষ্টাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার রাখা হয়েছে) । কিন্তু প্রধান বিচারপতি কোজিমা ইকেন দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন ১১৬ ধারা এখানে প্রয়োগযোগ্য নয় এবং আপিলের পর ৎসুদো সানজোকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করলেন । ভবিষ্যতে এই রায়টাকেই জাপানের বিচারবিভাগকে প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত করার ব্যাপারে প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে ।

রুশ কর্তৃপক্ষ, জাপানী কর্তৃপক্ষের সমস্ত কর্মকান্ডের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করলেন । কিন্তু নিকোলাস সুস্থ হয়ে উঠলেও ডানদিকে ভ্রুর উপর মস্ত কাটা দাগ নিয়ে ফিরলেন । জাপান সম্বন্ধে বলা যায় তখনই তাঁর মনোভাব খানিকটা বিষিয়ে গিয়েছিল । যার ফল রুশ-জাপান যু্দ্ধ হিসেবে আরো একযুগের ও বেশী পরে ফলবে ।

ইতিহাস বড় রহস্যজনক গতিতে চলে! রুশ সাম্রাজ্যের পতনের বীজ শেষ বিচারে জাপানের এক কোনো মাথা নষ্ট পুলিশ কন্সটেবলের তরবারীর এক কোপে রোপিত হয়েছিল বলা চলে !! এই কোপটা না পড়লে হতে পারে রাশিয়ার ইতিহাস (এবং পৃথিবীরও!) অন্য দিকে ঘুরে যেত ।

বিশ শতকে আমরা রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বন্যা দেখতে পাই তা আসলে ঊনিশ শতকের ধারাবাহিকতারই ফসল । এমন রাজপুরুষ, রাজনৈতিক কমই আছেন যাঁর উপর হামলা হয় নি । কারন ঊনিশ শতকেই শাসকরা বেশি বেশিকরে তাঁদের সুরক্ষিত প্রাসাদ আর দুর্গ থেকে বাইরে আসতে থাকেন ।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের চেয়ে বিপ্লবী-নৈরাজ্যবাদী বা স্রেফ মাথানষ্ট লোকদের প্রাণনাশের চেষ্টা অনেক বেশি হুমকির কারন হয়ে দাঁড়াল । আগ্নেয়াস্ত্রের আকার ছোট হয়ে আসা আর বিস্ফোরক প্রযুক্তির ব্যাবহার এর মুল কারন । আর ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই রাজ-রাজড়াদের প্রতি মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা কমতে শুরু করেছে ।

নিকোলাসের পিতামহ দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের বোমায় নিহত হবার কথা তো আগেই বলেছি । আমেরিকার দুই প্রেসিডেন্ট লিংকন আর গারফিল্ড আততায়ীর বুলেটে প্রাণ হারান । মহারানী ভিক্টোরিয়া, ভিক্টোরিয়ার পাঁচ ছেলেমেয়ে, সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন (এবং অসংখ্য হোমড়া-চোমড়ার) উপর আততায়ীরা অনেকবার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়েছে ।

সে যাইহোক দুই সাহসী রিকশাওয়ালা মুকাইহাতা জিজাবুরো আর কিতাগাইচি ইচিতারোকে যুদ্ধজাহাজে ডেকে বিস্তর আপ্যায়ণ করে সোনার মেডেল দিয়ে পুরষ্কৃত করলেন নিকোলাস । জাহাজ থেকে নামার সময়ে তাদের দুজনের প্রত্যেককে আড়াই হাজার ইয়েনের একটা থলে ধরিয়ে দিয়ে বললেন তারা যতদিন বাঁচবে প্রত্যেক বছর তাদেরকে প্রত্যেককে এক হাজার ইয়েন করে পেনশন দেয়া হবে । দুঃখের বিষয়, জাপানের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবার পর সম্রাট তাঁর ওয়াদাটা আর পরে রাখতে পারেননি !

বাহুতে উল্কি আর কপালে তরবারির কাটা দাগ, জাপানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে শরীরে নিয়ে জারেভিচ নিকোলাই আলেক্সান্দ্রোভিচ সাইবেরিয়ার প্রধান সমুদ্র বন্দর ভ্লাদিভস্তকে পা রাখলেন ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716133 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28716133 2007-06-16 11:28:33
রুশদেশের সত্যিকথা ৪
মহানুভব জার পিটার ছোটোবেলায় মস্কোর কাছে প্রেওব্রাজেনস্কোয়ে নামে একটা গ্রামে (এখন মাস্কোর একটা এলাকা) বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ -যুদ্ধ খেলতেন । জার হয়ে তিনি প্রেওব্রাজেনস্কি রেজিমেন্ট নামে একটা রেজিমেন্টের গোড়াপ্ত্তন করেন ১৬৮৩ সালে । সবচেয়ে নীলোরক্তের রাজপুরুষরা এতে যোগ দিয়ে মাতৃভুমির (রোদিনা) সেবা করতেন । এতেই নিকোলাসের জায়গা হলো ।

রেজিমেন্টের জীবন যথেষ্ট আরামদায়ক মনে হয়েছিল নিকোলাসের কাছে । এখানে দরবারের অনেক জবরজং ফর্মালিটি এখানে অনুপস্থিত । সমবয়সী লোকজনের সঙ্গও আরেকট কারন হতে পারে । নিকোলাস সবসময়েই অফিসার থাকাকালীন স্মৃতিকে সযত্নে লালন করেছেন । হতে পারে অন্য অফিসারদের মতো দীর্ঘসময়ে ক্যাডেট থাকতে হয়নি বলে তিনি একে অনেক বেশী উপভোগ করেছেন । সন্দেহ নেই ভাবী সম্রাটের উপর খুব একটা খবরদারী ফলায় নি কেউ । সুতরাং ব্যারাকের জীবনটা একটা লম্বা ছুটি হিসাবে ধরা যায় ।

পুরো সময়টা একেবারে বৃথা যায়নি । বাড়িতে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে আজ তাঁদের অফিসাররা চার রকমের পোর্ট ওয়াইন চেখে দেখেছেন তবে টাল হননি । আরো অনেক রকম তামাশা তাঁরা করেছেন । তৃতীয় আলেকজান্ডার নিকোলাসকে 'পোলখভ' (কর্নেল) র‌্যাংকে উন্নীত করেন বিশ পেরোনোর আগেই । বাবা তাকে কর্নেল করেছেন তাকে সন্মান করতে গিয়ে নিকোলাস সারাজীবন নিজেকে আর পদোন্নতি দেননি!

সেটা খুব আশ্চর্যের হবার মতো বিষয় নয়, তাঁর দূর সম্পর্কীয় মামা, ভিক্টোরিয়ার পুত্র আলফ্রেড চৌত্রিশ বছর বয়সে অ্যাডমিরালের পদ অলংকৃত করেছিলেন । এছাড়াও নিকোলাস ইংল্যান্ডের রয়্যাল স্কটস গ্রে, জার্মানী/অস্ট্রিয়ার বেশ কয়েকটা রেজিমেন্টের অনারারি কর্নেল ছিলেন এমন কী এগুলোর নামও নিকোলাসের নামে ছিল ! (কাইজার নিকোলাউস ফন রুসলান্ড) । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এগুলোর নাম পাল্টে রাশিয়া আক্রমনে পাঠানো হয় ।

তবে তার কিছূ দিন পরে অন্য ঘটনা ঘটল । নিকোলাস, মাতিলদা ক্সেচেসিনস্কায়ার সাথে পরিচিত হলেন । মাতিলদাকে বলা যায় যে কোনো রুশ জারের আদর্শ উপপত্নী, মারিনস্কি ব্যালে স্কুল (কমিউনিস্ট জামানায় কিরভ থিয়েটার) থেকে পাশ করে পেশাদার ব্যালেরিনা ছিলেন এই পোলিশ বংশদ্ভুত নর্তকী । জন্ম তাঁর ১৮৭২ সালে সেইন্ট পিটার্সবুর্গের কাছে, লিগিভোতে । নিকোলাসের দুই জ্ঞাতি ভাই গ্র্যান্ড ডিউক সের্গেই মিখাইলোভিচ আর গ্র্যান্ড ডিউক আন্দ্রেই ভ্লাদিমিরোভিচের সাথেও মাতিলদার লটর পটর ছিল ।

১৮৯৩ সালে 'সিন্ডারেলা' অপেরাতে একবারে একপায়ের উপর বত্রিশবার চক্কর মেরে (ব্যালের ভাষায় যাকে বলে 'ফুয়েতে') রেকর্ড সৃষ্টি করেন মাতিলদা । ১৮৯৮ সালে 'ফারাও কন্যা' অপেরায় আরেকবার ঝড় তোলেন তিনি । রোমানভ পরিবারের অনেকের সাথে লটর পটর করে বিস্তর টাকাকড়ি কামিয়েছেন এই নৃত্যশিল্পী । যার মধ্যে একটা ছিল মস্কোর আলিশান একটা বাড়ি, যে বাড়ির ব্যালকনি থেকে জনতার উদ্দেশ্যে লেনিন হাত নেড়েছিলেন ফিনল্যান্ড থেকে ফিরে ।

তো মারিনস্কির গ্র্যাজুয়েশন ক্লাসে পুরো রাজ পরিবার আমন্ত্রিত ছিল । নাচ দেখে নিকির নেক নজর পড়ল মাতিলদার উপর ।

নিকোলাস মজে গেলেন ব্যালেরিনার উপর । সেসময় যথেষ্ট কেলেংকারি হয়েছিল মাতিলদা ও তার রাজকীয় প্রেমিকদের নিয়ে । সম্পর্কটা খুব গভীরে গড়িয়েছিল বলেই অনেকের ধারনা । নিকোলাস ও মাতিলদা ওনেগা হ্রদের ধারে ঘোড়ার গাড়িতে চযে বেড়াতে যেতেন বলে অনেক লোকে দেখেছে । আজব কান্ড হলো তৃতীয় আলেকজান্ডার এতে প্রথমে রাগ করেছেন বলে কেউ শোনেনি! 'পুরুষ মানুষ তো অল্পবয়সে এরকম একটু আধটু করতেই পারে!' ছিল তাঁর প্রাথমিক বক্তব্য । কিন্তু নিকির মোহ ক্রমে আচ্ছন্নতার দিকে যাচ্ছে দেখে তাকে ফেরানোর অন্য ধান্দা করা হলো ।

স্থির হলো নিকিকে বিশ্বভ্রমনে পাঠিয়ে দিলে নাচনেওয়ালীর উপর থেকে মন তো উঠবেই আর দুনিয়াটা দেখা (মানে দুনিয়ার সব হোমরা-চোমরা, রাজা-রাজড়া আর কী) স্বচক্ষে দেখলে বোকা-সোকা নিকিও তার হ্যাংলামি কাটিয়ে আরেকটু চালাক-চতুর, চৌকস হয়ে উঠবে । কিন্তু একটা বড় অঘটন ঘটে গেল জাপানে গিয়ে ।

জাপান তখন আগের মধ্যযুগীয় সামন্ত রাষ্ট্র নেই, যাতে ১৮৫৩ সালে মার্কিন নৌ সেনাপতি, কমোডর পেরি গায়ের জোরে নেমে পড়েছিলেন বিদেশী জাহাজ ভেড়ার উপর প্রায় দুইশো বছরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে । চল্লিশ বছরের মধ্যে তারা শোগুন প্রথা, সামুরাই প্রথা (শোগুনরা ছিলেন খুব শক্তিশালী সামন্ত, যাঁরা সম্রাটের ক্ষমতাকে খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না, আর সামুরাইরা ছিল পেশাদার যোদ্ধা, মুলতঃ বিভিন্ন শোগুনদের বাহিনীতে লড়তো) উচ্ছেদ করে এক আধুনিক একীভুত রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে ।

জাপানের প্রতি সমগ্র পাশ্চাত্যের দৃষ্টি নিবদ্ধ, একটি মাত্র এশিয়ান রাষ্ট্র যা শিল্পে ও সামরিক শক্তিতে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হতে পারে । জাপান তার স্থল বাহিনীকে, জার্মান সেনাবাহিনীর ধাঁচে আর নৌবাহিনীকে ব্রিটিশ র‌য়্যাল নেভির মডেলে গড়ে তুলছে । ইতিমধ্যেও চীনের কাছ থেকে বেশ কিছূ বন্দর ছিনিয়ে জাপান প্রমান করেছে সাম্রাজ্য বিস্তারের হিংস্রতায় তারা কারো থেকে কম যায় না । ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715978 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715978 2007-06-14 19:31:21
রুশদেশের সত্যিকথা ৩
তবে তার আগে নিকোলাসের ব্যাপারে ফিরে আসা যাক ।

গাচিনা প্রাসাদে থাকার ব্যাবস্থা ছিল সম্রাটের ছেলেমেয়েদের । সেখানে অসম্ভব বিলাস ব্যাসনে সাথে বেশ কিছু বিদঘুটে নিয়মকানুনও ছিল । যেমন যত শীতই পড়ুক ঠান্ডা পানিতে গোসল সারতে হবে! (রুশ শীতেও!), ঘুমাতে হবে ক্যাম্প খাটে, এসবে তাদের 'নৈতিক মেরুদন্ড' শক্ত হবে । বাসায় প্রাইভেট টিউটররা পড়াত ইতিহাস, ভুগোল, জার্মান, ইংরেজি, রুশ, কলাবিদ্যা, আর দরবারে সমস্ত আদবকায়দা ।

তবে ছেলেমেয়েরা সবসময় খুব সভ্য ভব্য ছিল তা বলা চলে না । অনেক বিদেশী রাষ্ট্রদূত এসে দেখেছেন সম্রাটের পুত্রকন্যারা টেবিলে চারপাশে রুটির গোলা পাকিয়ে এক জন আরেকজনকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ে মারছে (!), তবে তৃতীয় আলেকজান্ডার সময় সময় খুব কড়া হাতে শাসন করতেন । তাই বাচ্চা আর বাচ্চাদের মা অনেক সময়ই জারের সামনে অনেক কথা চেপে যেতেন ।

দশবছর বয়সে নিকোলাসের ভাগ্যে জুটল টিউটর দানিলভ, তিনি আবার র‌্যাংকে জেনারেল অফিসার ছিলেন, তখন রিটায়ার্ড । রাশিয়ার অনেক ক্যাডেট কলেজ দাবড়ে এসে শেষকালে সম্রাটের পুত্রকে মানুষ করার মহান দায়িত্ব চেপেছিল তাঁর কাঁধে । অনেক চমৎকার এবং অনেক উদ্ভট চিন্তাভাবনা তিনি তাঁর অল্পবয়সী ছাত্রটির মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন । যার ফলে (পরোক্ষভাবে বলতে গেলে) বলা যায় জান-মান আর সিংহাসন তিনটিই মহান নিকি হারিয়েছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর পরে । তবে যে অন্য গল্প ।

প্রথমেই দানিলভ নিকিকে বুঝিয়ে দিলেন যে এই যে ঝকমকে পোশাক পড়া কেতা দুরস্ত সব রাজপুরুষদের দেখা যাচ্ছে এরা প্রকৃত রাশিয়ান নয় (কথা অতীব সত্য), যে সমস্ত (মুলতঃ) বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেরা কিছুদিন পরপর হোমড়া-চোমড়াদের বোম মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে তারা তো কখনোই রুশভুমির (রোদিনা) প্রকৃত সন্তান নয় ।

আদি অকৃত্তিম, খাঁটি ও ভেজালবিহীণ রুশরা হচ্ছে গরীব-মুর্খ ও ধার্মিক, লাঙ্গল ঠেলা চাষীরা যাদেরকে নিকির পিতামহ দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তাঁর অশেষ দয়াতে ভুমিদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন । এরাই হচ্ছে রুশভুমির সংখ্যা গরিষ্ঠ ও দেশের মেরুদন্ড বিশেষ । এরা সকলেই সবিশেষ সম্রাট-ভক্ত, জারকে তারা 'বাতুশকা জার' বা 'পিতা জার' বলে সম্বোধন করে থাকে ।

এই সুখপ্রদ ও মুলতঃ ভুল ধারনাটি আজীবন লালন করেছেন নিকোলাস, গরিব চাষীরা তাঁকে ভালবাসে! গরিব চাষীরা তাঁকে বাপ মানে!

কথাটা অতিরঞ্জিত হলেও নেহাত ফেলনা নয় । জমিদারের গোমস্তাকে যতই গালাগাল দিক না কেন কৃষকরা জারকে তারা সত্যি ভক্তি-শ্রদ্ধা করত । সবচেয়ে গরিবের কুটিরেও, ঘরের মধ্যে যীশু, মা মেরীর পাশেই পিতৃপ্রতিম 'বাতুশকা' জারের ছবি শোভা পেত । তাদের ধারনা ছিল জারে কাছে কোনো মতে একবার যেতে পারলে তাদের সমস্ত সমস্যার আশু সমাধান ঘটবে ।

জার যা বলেন তা তাঁর দুষ্ট কর্মচারীরা ঠিকমত পালন করে না । আর জারও এমন স্বর্গের মতো উচ্চতায় অবস্থান করেন যে পনেরো কোটি প্রজার দেখভাল করা তাঁর পক্ষে সবসময়ে সম্ভব হয় না । জার সকল অন্যায় আর ভুলের উর্ধ্বে ।

নিকোলাসের আরেক সমস্যা ছিল তার বাবা । সব ছেলে না হোক অনেক ছেলেই তাদের বাবাকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে ও বাবার মতো হওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু বাবা, সম্রাট তৃতীয় আলেকজান্ডারের মত এরকম হিমালয়সম শক্তি ব্যাক্তিত্ব আর বাজখাঁই মেজাজের অধিকারী হলে বেচারা পুত্রধনের দূর থেকে সন্মান জানানো ছাড়া কোনো গতি থাকে না ।

আর মানুষের স্বভাবেরও রকমফের আছে, নিকোলাস রোমানভের মতো কোনো অন্তর্মুখী, লাজুক ও স্বভাবতঃ বিনয়ী মানুষের পক্ষে জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের মতো চরম এক্সট্রোভার্টের অনুকরণ অসম্ভব ব্যাপার । কিন্তু সেই অসম্ভব কে সম্ভব করার চেষ্টা তিনি করে গেছেন সারা জীবন ।

দানিলভ আরো বোঝান একনায়ক হওয়াটা জারের জন্য একেবারে ঐশী কর্তব্য । যে সম্রাট একনায়ক নন তিনি একটি পবিত্র কর্তব্যকে লঙ্ঘণ করছেন । সম্রাটের আরো কিছু কর্তব্য আছে, একটা হচ্ছে যাই ঘটুক না কেন সর্বদা নির্বিকার থাকা ও নিজের ভাবনা চিন্তা কাউকে বুঝতে না দেয়া । অন্যটি হচ্ছে সবাইকে অবিশ্বাস করা, কারন প্রত্যেকেই চাইবে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে । অবশ্যই যাকে অবিশ্বাস করা হচ্ছে তার প্রতিও নির্বিকার থাকতে হবে!

খুব খারাপ পরামর্শ নয় এগুলো । এরকম নিরংকুশ অভিজাততন্ত্রের পুরোধাকে এরকম মানসিকতা বেশ কাজে দেবে সময় সময় । কিন্তু নিকোলাস বোধহয় কথাগুলো পুরোটাই মানে বঁড়শি, ফাতনাম, সুতো সহ টোপ গিলে ফেলেছিলেন । পরিনামে বদহজম ।

তবে সম্রাট পত্নীর জন্য সময়টা১৮৭০-১৮৮০) ভারী আনন্দে কেটেছে । তিনি নাচতে ভারী পছন্দ করতেন এবং শীত গ্রীষ্ম সর্বদা নাচের আসর বসত । পোলিশ নাচ, জিপসি নাচ, ফরাসী নাচ, ভিয়েনিজ ওয়ালৎস, কোন নাচই বাদ যেতো না । শীতে দেখা যেতো আলেক্সান্দার বা শীত প্রাসাদের বিশাল জানালার বাইরে ঝুর ঝুর করে তুষার পড়ছে, কিন্তু সারারাত নাচ চলছে ।

এরকম পার্টি সম্বন্ধে ডেনমার্কের বাপের বাড়িতে চিঠি লিখতে গিয়ে সম্রাজ্ঞী মারিয়া নিজেই লেখেন, 'নাচতে গিয়ে এক মহিলার পেটিকোট খুলে মাটিতে পড়ে গেল, কিন্তু নাচ থামল না । শেষ পর্যন্ত একজন অভ্যাগত একটা থামের ধারে সেটাকে আড়াল করে রাখলেন, তবু নাচ চলতেই থাকল । ভীড়ের মধ্যে ঠিক বোঝা গেল না ঠিক কার এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে ।' জারিৎসা মারিয়া ছিলেন এইসব পার্টির মধ্য মনি ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715813 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715813 2007-06-13 14:38:28
রুশদেশের সত্যিকথা ২
বিয়ের পরে প্রিন্সেস ডাগমার, মারিয়া ফিওদরভনা নাম নিয়ে লুথারান থেকে অর্থোডক্স ধর্মে দীক্ষান্তর করেন (রাজাদের আবার ধর্ম কী!) । নবম ক্রিশ্চিয়ানকে বলা হতো 'ইউরোপের শ্বশুর' । কারন তিনি তাঁর ছয়টি পুত্র কন্যাকেই বৈবাহিক সুত্রে ইউরোপের ছয়দেশের রাজ পরিবারে প্রতিষ্ঠিত করেন । মারিয়া (ডাগমার) এর বড় বোন আলেকজান্ড্রা, রাণী ভিক্টোরিয়ার পুত্রবধু-সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী ।

পশ্চিম ইউরোপের সব রাজা রাজড়াই পরষ্পরের আত্বীয় ছিলেন । বলা হতো 'রাজাদের কোনো দেশ নেই, আবাস আছে, আত্বীয়তা নেই মিত্রতা আছে" । অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবুর্গদের সাথে জার্মান হোহেনৎসোলার্নদের, ড্যানিশ ওল্ডেনবুর্গদের সাথে রাশিয়ান রোমানভদের আত্বীয়তায় তাই আশ্চর্য হবার কিছু নেই ।

কে ক্যাথোলিক, কে প্রটেস্টান্ট, কে অর্থোডক্স এসব নিয়ে মাথা ঘামাতো না কেউ, তবে কথা ছিল যে যেই দেশে যাবে, জামাতা বা পুত্রবধু হয়ে তাকে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমত গ্রহন করতে হবে । তাঁরা ভাবতেন এতে তাঁদের প্রভাবের বলয় বাড়বে এবং যুদ্ধের হুমকি কমানো যাবে প্রথমটি আংশিক সত্য হলেও দ্বিতীয় আশাটি বিশেষ পুরণ হয় নি ।

আসলে ক্ষমতা, রাজ্য বিস্তারের লোভ বা তাগিদ ও অন্যান্য ব্যাপার আত্বীয়তা বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অনেক বড় ছিল । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান সিংহাসনে ছিলেন কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেলম, আর ইংল্যান্ডের সিংহাসনে রাজা ষষ্ঠ জর্জ, দুজনেই রানী ভিক্টোরিয়ার আপন নাতি! এদের দুজনের কাজিন আবার রাশিয়ার নিকোলাস । লোকে বলত যুদ্ধটা আসলে কাজিনদের লড়াই এবং কথা আসলে খুব মিথ্যে নয় ।

সে যাই হোক, ডাগমার বা মারিয়া ফিওদরভনা, ছয়টি পুত্র-কন্যার (এর মধ্যে চারটি পুত্র!) সম্রাট-পত্নীর দায়িত্ব পালন করেন । এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম পুত্রটির নাম রাখা হয়েছিল নিকোলাস (নিকোলাই), জন্ম ১৮৬৮ সালের ৬ ই মে তে । পুত্রটি অল্পবয়সে খুব বেশী সংবেদনশীল ছিল বলেই নিকট জনেরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন । বিশেষ করে একদিন তাকে বদমেজাজী, বলশালী ও বিশাল ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন বাবার চেয়ার নিতে হবে, এ চিন্তা অল্পবয়সে তাকে যথেষ্ট পীড়িত করেছে ।

বোমায় আহত পিতামহ, দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে যখন প্রাসাদে নিয়ে আসা হয় তখন তেরো বছরের বালক ও ভবিষ্যতের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে মৃত্যুপথযাত্রী পিতামহের পালংকের পায়ের কাছে বিস্ফোরিত ও আতংকিত চোখে এই মৃত্যুদৃশ্য দেখতে হয়েছিল । হতে পারে এই ঘটনা গভীর নেতিবাচক রেখাপাত করেছে নিকোলাসের মনে, অন্তত কতিপয় মনোরোগ বিশারদ সে রকমই মনে করেন ।

অবশেষে বড় হলে উঠল নিকোলাস । কিন্তু কোনো রকম জাগতিক দায়িত্ব নেবার মানসিকতা তার মধ্যে বিশেষ দেখা গেল না । অবশ্য সেরকম কোনো দায়িত্ব তাকে দেয়াও হয় নি । তার মানে এই নয় যে নিকোলাস ছিল কোনো (ডাকনাম 'নিকি' নামেই পরিচিতজনের কাছে বেশি পরিচিত) উশৃঙ্খল, বখে যাওয়া, দুর্বিনীত রাজকুমার । যেই তার কাছে এসেছে সেই নিকির বিনয়ে ও সারল্যে খানিকটা মুগ্ধ হয়েছে ।

দেখতে-শুনতে বাপের মত শালপ্রাংশু দেহী নন, মাত্র পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি । চেহারায় ভারিক্কি ভাব আনার জন্যে ঘন চাপদাড়ি রাখতে শুরু করেন বয়স কালে, ফলে তাঁর চেহারাটা দাঁড়ায় খানিকটা 'কাজিন জর্জ' (ইংল্যান্ডের পঞ্চম জর্জ) এর মতন । চমৎকার বন্দুকের গুলি ছুঁড়তে এবং তাস খেলতে পারতেন, এবং ফরাসী ও জার্মানে ব্যাপক বুৎপত্তি ছিল, রাজকুমারদের যেসব বিষয়ে জানা দরকার সবই তিনি জানতেন । নিকি যে বুদ্ধিমান তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না কারো । শুধু, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যটির পুরুষ উত্তরাধিকারীকে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে অল্পবয়স থেকে তেমন সচেতন করে তোলা হয় নি এই যা ।

তো জার তৃতীয় আলেকজান্দারের শারীরিক গঠন ও ছিল এরকম জঙ্গি মেজাজের সাথে পুরো মানানসই । বন্ধু-বান্ধবদের মনোরঞ্জনের জন্যে হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে রুপার কয়েন বাঁকিয়ে ফেলাটা ছিল তৃতীয় আলেকজান্ডারের বিশেষ হবি ।

একবার বলকানে কোনো বিশেষ উত্তেজনার সময়ে অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রদূত আভাস দেন যে তাঁর দেশ দুয়েক ডিভিশন সৈন্য মোবিলাইজ করতে পারে । জার তৃতীয় আলেকজান্ডার, একটা রুপার কাঁটাচামচ তুলে, বাঁকিয়ে সুতায় গিঁট দেয়ার মতো গিঁট দিয়ে চামচটা অস্ট্রিয় কুটনীতিকের প্লেটের উপর ফেললেন । 'আমি আপনাদের দু'তিন ডিভিশন সৈন্যকে এরকম প্যাঁচে ফেলে দেবো !' বলে চলে যান তিনি ।

আরেকবার পুরো পরিবার সহ ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি । ট্রেনের ছাদ দুমড়ে কামরার ভিতরে এসে পড়ে । আলেকজান্ডার একাই হারকিউলিসের মত শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে ছাদটকে ঠেলে উপরে নিয়ে যান যাতে পরিবারের বাকিরা নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে । এমন লোক যে ভাল একনায়ক হতে পারবে তাতে আর সন্দেহ কী?


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715686 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715686 2007-06-12 10:34:51
রুশ দেশের সত্যিকথা ১
জ্বিনের বাদশার উস্কানিতে শুরু করলাম । কতদূর টেনে নিতে পারবো জানি না । তবে আপনারা সাথে থাকলে কিছু দূর তো যাবে অবশ্যই)

ফিনল্যান্ড উপসাগরের পশ্চিম-দিগন্তে অস্তগামী সুর্য পুরো ডুবে যাওবার আগেই রুশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে পূব অংশে বেরিং সাগরে পূব দিগন্তে সু্র্য উঁকি দেয় । মাত্র তিনটে দেশ সম্বন্ধে এ কথা বলা যায়, রাশিয়া, ক্যানাডা আর মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্র । (ফরাসী, ইংরেজ, পর্তুগিজ আর ডাচ সাম্রাজ্য সম্বন্ধেও এ কথা খাটত বটে তবে তা সাগরপারের নানান বিচ্ছিন্ন ভুখন্ডের সমষ্টি, একীভুত কোনো দৈত্যাকার মহাদেশীয় রাষ্ট্র নয় ) । এবং তুরষ্ক বাদে রাশিয়া পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেটা ইউরোপ আর এশিয়া এ দুই মহাদেশে পড়েছে ।

তবে রুশ শাসকরা সবসময়ে নিজেদের ইউরোপিয়ান ভাবতে ও পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন । যদিও সেটা সমস্ত ইওরোপিয়ানদের পছন্দ ছিল না, এবং গোঁড়া রুশ অর্থোডক্সরাও মস্কোকে 'দ্বিতীয় বাইজান্টিয়াম' বা 'তৃতীয় জেরুসালেম' বলে ভাবতে পছন্দ করত । তাদের ধারনা ছিল 'প্রকৃত' খ্রীষ্ট ধর্মের তারাই একমাত্র ও সর্বপ্রথম হকদার । পশ্চিমের খ্রীষ্ট-ধর্ম কলুষিত ও ভ্রষ্ট । প্রথমে রোমের পদস্থলন ঘটেছে তারপরে লুথার সেটাকে বিভ্রান্তির নতুন গহ্বরে নিয়ে ফেলেছেন ।


সে যাই হোক, মহামতি সম্রাট পিটার (বা পিওতর, বুঝবার ও উচ্চারনের সুবিধার জন্য ইংরেজি বানান রীতি অণুসরণ করা হয়েছে যথা সম্ভব) প্রায় গায়ের জোরে রাজধানী সেইন্ট পিটার্সবু্র্গে স্থানান্তরের পরে যতদূর সম্ভব পাশ্চাত্যকরণের চেষ্টা করেছেন । ফিনল্যান্ড উপসাগরের তীরের বন্দর-নগর-রাজধানীটি বলা যায় দুই প্রজন্মের ক্রীতদাস শ্রমে তৈরী । সাগরের ধারের কাদাভরা জলাভুমি গাছের সোজা সোজা গুঁড়ি বুনিয়াদ শক্ত করে মস্ত মস্ত আলিশান সব দালানের ভিত করে তোলা হয়েছে । পিটার ও পলের দূর্গ, শীত প্রাসাদ, গাচিনা প্রাসাদ, আর্মিটেজ, অ্যাডমিরাল্টি ভবন সবই অষ্টাদশ আর ঊনিশ শতকের কীর্তি ।

সেইন্ট পিটার্সবু্র্গকে বলা হতো উত্তরের ভেনিস । অসংখ্য খাল আড়াআড়িভাবে ছেদ করেছে শহরটাকে । সত্যি বলতে কী সেইন্ট পিটার্সবুর্গ অনেকগুলো দ্বীপকে সেতু দিয়ে জোড়া দিয়ে তৈরী । ঊনিশ শতকে অধিকাংশ পর্যটকই মন্তব্য করেছে এ শহরে এলে কেমন যেন ইটালি ইটালি আভাস পাওয়া যায়! অবশ্য তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই কারন ইতালিয়ান কারিগররাই গড়েছে এখানকার বেশিরভাগ দালান কোঠা ।

এই শহরে জড় হয়েছিল রাশিয়ার সবচেয়ে জ্ঞানী-গুণী, প্রতিভাবান আর অপব্যায়ী লোকেরা । তাদের নজর ছিল বার্লিন-প্যারিস কিংবা লন্ডনের বা আরো পশ্চিমের ওয়াশিংটনের দিকে । নিজের দেশের মানুষকে অভিজাত আর বুদ্ধিজীবি উভয় শ্রেণীই করুণা আর অবজ্ঞার চোখে দেখতেন । ধনী লোকেরা ফরাসী রিভিয়েরা বা ইটালির উত্তরে ছুটি কাটাতে যেতেন । আমোদ-ফুর্তি আর জুয়া খেলার জন্য রুশ অভিজাত নন্দনরা বিখ্যাত । বলা যায় মন্টে-কার্লোর জুয়ার দালানগুলোর পত্তন হয়ে রুশ অভিজাতদের পকেট থেকে খসে পড়ে রুবলের তোড়া থেকে ।

কিন্তু ঠিক কোন উৎস থেকে এই বিলাস ব্যাসনের টাকা আসতো? বিশাল বিশাল সব খাস তালুক ছড়ানো ছিল পুরো রাশিয়া জুড়ে । উদয়াস্ত পরিশ্রম করত সেখানকার লাঙ্গল ঠেলা চাষী । চাষি না বলে তাদের জমিদারের ঘানিতে জুড়ে দেয়া বলদ বলল অনেক ঠিক হবে কারন ১৮৬২ সালে আগ পর্যন্ত চাষীদের একটা বড় অংশ ছিল "সার্ফ"--ভুমিদাস (সার্ফ শব্দটা ল্যাটিন servus থেকে এসেছে মানে সার্ভ বা সেবা করে) । এস্টেটের অংশ ধরা হতো তাদের, পিতার মৃত্যুতে পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকারী হতো এদের ।

যেন এরা মানুষ নয়, গরু-ছাগল বা ভেড়া । ঠিক অস্থাবর সম্পত্তির মতোই কেনা বেচা হতো সার্ফরা । একটা ভাল ঘোড়ার জন্য কোনো অশ্ববিলাসী ভুস্বামী পঞ্চাশ বা একশো জন ভুমিদাসের মালিকানা হস্তান্তর করেছেন এমন ঘটনা খুব বিরল নয় । ইভান তুর্গেনেভ (বিখ্যাত আলোকপ্রাপ্ত জমিদার নন্দন) বলেছেন একবার বাগানের একটা গোলাপ ছিঁড়ে ফেলায় তুর্গেনেভের মা, বাড়ির সব সার্ফকে (সংখ্যায় ত্রিশ চল্লিশজন হবে ) চাবুক পেটা করেছিলেন, এই রকম কিছু ঘটনাই নাকি তুর্গেনেভকে রুশ সামন্ত জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল । তলস্তয়দেরও সার্ফ ছিল মেলা--মহান লেভ (তলস্তয়) যৌবনে অন্তত একজন ভুমিদাস রমনীকে পোয়াতি করেছিলেন বলে সুষ্পষ্ট আলামত আছে ।

কিছূ কিছু দূরাচার আছে তা এতোই, অমোচনীয় ভাবেই কেলেংকারীজনক যে সবচেয়ে অত্যাচারী শাসকও নিজের স্বার্থেই সে সব মোচন করার উদ্যোগ নেন । আমাদের দেশে যেমন শ্বেতাঙ্গ নীলচাষীদের উৎপাতে খোদ ইংরেজ সরকার বাহাদুরই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন, স্পষ্ট বুঝেছিলেন এদেরকে শক্তহাতে না ধরলে বিশাল প্রজাবিদ্রোহের ঘটনা ঘটবে । তো সেরকমই রাশিয়াতেও মধ্য সার্ফ তন্ত্রের যে অবসান ঘটানো দরকার তা মধ্য ঊনিশ শতকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ।

তবে ১৮৬২ সালে বিড়ালে গলায় ঘণ্টা বাঁধার কৃতিত্ব জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের । অবশ্য ক্রিমিয়ার যুদ্ধে বেধড়ক মার খেয়েছিল রাশিয়া সেটাও একটা কারন । 'মুক্তিদাতা জার' নামটি তাই দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের নামের আগে লেখা হয় । সার্ফ তন্ত্র ইউরোপের প্রায় সব জায়গাতেই ছিল কিন্তু ঊনিশ শতকে ছিল খুব অল্প কিছু জায়গায় । ব্যাপারটা অনেক অভিজাত রুশের কাছেও ছিল সন্মানের প্রশ্ন

আরো অনেক কিছু করেছিলেন এই সম্রাট । সেন্সরশিপ শিথিল করা, স্থানীয় পর্যায় নির্বাচন আরো অনেক কিছু । তা এসব করেও সব মহলে মন পাননি তিনি । ভুমি সংস্কারের পুরো সুফল জোটেনি বেশীরভাগ চাষীর কপালে । তাদের সন্তানরা শহরে গিয়ে নৈরাজ্য আর সন্ত্রাসবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে থাকল । (আর আরো অনেক কিছুর মতো নিহিলিজম ও পশ্চিম থেকে আমদানী করেছীল রুশরা) । শেষ মেষ ১৮৮১ সালে জারের গাড়ি বহরে বোমা মেরে গুরুতর জখম করে দিল কতিপয় নিহিলিস্ট । বোমার আঘাতে আলেকজান্ডারের পেটের নীচের অংশ ছিন্ন ভিন্ন অংশ হয়ে গিয়েছিল । গাড়ি প্রাসাদে ফেরার কিছু পরেই মারা যান তিনি ।

গদিতে বসলেন জার তৃতীয় আলেকজান্দার । বাবার উদারনীতির ফল তিনি নিজের চোখে দেখেছেন । 'মুক্তিদাতা জারের' ভাগ্যে জুটেছে আততায়ীর বোমা । এই বাঞ্চোত দেশবাসীকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না ! সব শালাকে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেয়া হবে । উপরে ঈশ্বর আর নীচে তাঁর প্রতিনিধি জার । একনায়ক তো অনেকই ছিল, কিন্তু নিজেকে অফিশিয়ালি "আফতোক্রাত" (অটোক্র্যাট) ঘোষনা দিয়েছে কয়জন ?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715623 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28715623 2007-06-11 22:40:23
শুভংকর পক্ষীগণ তাহা লয়ে করে হুড়াহুড়ি

এক পক্ষীকে ধরি রাজা করিলেন তর্জন
পক্ষী কহিল "রাজন! শুনো মোর নিবেদন

তিল তিল করে মোরা করেছি ভক্ষণ
কহো দেখি মহারাজ, পক্ষী কতজন?'
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28713307 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28713307 2007-05-29 18:28:09
কিরলিয়ান ফটোগ্রাফি
সে যাই হোক কিরলিয়ান ফটোগ্রাফি আসলেই একটা দারুন অভিনব ফটোগ্রাফিক পদ্ধতি ।

হাই ভোল্টেজ আবেশে বস্তুর চারপাশে কী ধরনের জ্যোতির্ময় বলয় দেখা যায় সেটা সোভিয়েত অ্যামেচার উদ্ভাবক সেমিওন কিরলিয়ান ১৯৩৯ সালে প্রথম ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন ।

কিরলিয়ানের মতে এটা হচ্ছে জীবের 'লাইফ ফোর্স' বা জৈব শক্তির প্রকাশ আর বিশুদ্ধ পদার্থবিদরা অবশ্য বলেন এটা স্রেফ বস্তুর মধ্যে ইলেক্ট্রিক ইনডাক্শনের প্রভাব !!

এটা
কী ভাবে নেবেন আপনি সেটা সম্পুর্নই আপনার ব্যাপার!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711886 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711886 2007-05-21 18:29:45
মে ফ্লাওয়ার
সেই বিষাদের ছায়া ঢেকে থাকায় শোরগোল করে আমার আর কোনোদিন জন্মদিন পালন করা হয়ে উঠল না ।

না আজ আমার জন্মদিন নয়, তবে দিনটা কাছিয়ে আসছে । জন্মদিন আর নববর্ষ এ দুটো দিন অবিমিশ্র সুখের দিন নয় । মনে করিয়ে দেয় এ দুই দিবস যে আরো একটি বছর চলে গেল আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ।

সত্যি বলতে কী আমি শীতঋতুর জমানো ভক্ত । ল্যাংড়া আম খাওয়ার আনন্দও আমাকে মগজ-গ্রীষ্মের উষ্ণ দাবদাহের দালালী করাতে পারবে না । তার সাথে কাঁঠাল পাকানো গুমোট । ওয়াহ্ !

তবু মে মাসটা এলে আমি চাঙ্গা হয়ে উঠি । আমি বেশ কিছূ মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটেছে আমার এই মাসে । আর মে মাস আসলেই মনে পড়ে মে ফ্লাওয়ারের কথা ।

না, এপ্রিল ফুল নয়, মে'র ফুল আসলেই ফুল এবং ভীষনভাবে ইউনিক । একটা ফুট খানেক লম্বা ডাঁটার মাথায় বছরের একটাই ফুল ফোটে, এবং শুধু মে মাস জুড়েই থাকে ফুলটা । বড় সড় একটা ঝাড়নের মত, মস্ত লালচে গোলাপী ফুলটা । প্রতি বছর একটা করে কন্দ বা বাল্ব বাড়ে । একটা করে অতিরিক্ত ডাঁটা বাড়ে, একটা করে অতিরিক্ত ফুল ।

মে মাস গেলেই শুকিয়ে মরে যেতো ফুলটা । ওয়ানটাইম প্রস্ফুটন পার অ্যানাম ।

নিজের হাতে বাবা লাগিয়েছিলেন গাছটা । প্রতিবছর একটা করে অতিরিক্ত ফুল ফুটতো আর আমি ভাবতাম একটা স্পেশাল জন্মদিনের উপহার মিলল বোধহয়! দুঃখ করে একবার বলেছিলেন "বুদ্ধি করে তোর জন্মের সময় যদি লাগাতাম গাছটা! তাহলে তোর যত বয়স বাড়তো ততগুলো ফুল ফুটতো ঝোপটাতে!"

বাবার মৃত্যুর পরে ভাবতাম ঝোপটা একটা স্মারক হয়ে থাকল ।

বাগান সহ সেই বাড়ি ছেড়ে কংক্রিটের খাঁচায় এসেছি কবে । থানকুনি থেকে মর্নিং গ্লোরি, কাঠগোলাপ আর কোনের দেয়াল ঘেঁষে সেই মে ফ্লাওয়ারের ঝাড় এখন কেবলই স্মৃতি ।

তবু মে মাস এসেছে । আমার স্মৃতির বাগানে তো সবসময়েই মে ফ্লাওয়ার ফোটে ।

(কারো কাছে মে ফ্লাওয়ার ফুলটা থাকলে লিখতে পারেন, )
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711512 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711512 2007-05-19 22:44:30
রিকশার বিকল্প কী হতে পারে?
আসলে আমরা যদি একটা অল্পখরচে, দুষনমুক্ত ও মোটামুটি দ্রুত গতি সম্পন্ন এমন বাহন খুঁজতে চাই তাহলে দেখব আমাদের অপশন ছোট হয়ে আসছে ।

এরকম একটা বাহন আছে অবশ্য, স্পোর্টস বাইক । কিন্তু সেটায় মহিলা বা বাচ্চারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না । বাজারের থলে নিয়ে বাড়ি ফেরাও ঝক্কি হতে পারে । আর দুধে-ভাতে থেকে যারা মেদ ভুঁড়ির মাত্রা বাড়িয়েছেন ননীর শরীরে তাঁদেরও খুব একটা পোষাবে না ।

(যদিও শেষ মানদন্ডটা বাদ দিতে পারি । যেমন হরতালের দিনে আমরা অনেক সময়ে মেলাদূর হাঁটি )

এখানে এখন বিকল্প হতে পারে টুইক (বা টোয়াইক যাই হোক না কেন) বা হাইটেক ট্রাই সাইকেল । একটা অ্যালুমিনিয়াম-ফাইবারগ্লাস-অ্যারোডিনামিক বডি, অনেকগুলো গিয়ার সহ পেডাল প্রপালশন সাথে রিচার্জেবল ব্যাটারি চালিত ইলেক্ট্রিক মোটর একটা সাশ্রয়ী নগর পরিবেশ বান্ধব বাহন হতে পারে ।

এখন আপনি বলবেন টুইকের যা দাম সেটা দিয়েতো গাড়ি কেনা যায় । কিন্তু আমি বলব সেটা সুইজারল্যান্ডে তৈরি বলে । বাংলাদেশে তৈরী হলে আরেকটু কম ফিটিং থাকলে জিনিসটা নিশ্চয়ই আরো কম দামে বিকোতো ।

আপনারা কী বলেন?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711055 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28711055 2007-05-17 15:44:20
"তিনি প্রত্যহ বাড়ি ফিরিয়া ছাদে উঠিয়া উহাদের তাড়াইয়া দিতেন "
রামপুরাভিশনের একজন ক্যামেরাম্যান একটা 'এজমালি ছাদওয়ালা' বাড়িতে থাকতেন । মানে বাড়িটার ছাদে ইচ্ছা করলে পাশের বাড়ির লোকেরাও উঠতে পারত । তো, ওই পাবলিক ছাদে উঠে জনা কয়েক পাড়ার চ্যাংড়া পোলাপান রোজ বিকেলে নেশা করতো ।

বেচারা ক্যামেরাম্যান কাজ সেরে এসেই প্রথমেই ওদের চলে যেতে বলতেন । নেশাটা যদি যথেষ্ট সময় হয়ে থাকে চ্যাংড়ারা তেমন উচ্চবাচ্চ্য না করে চলে যেত ।

কিন্তু বিধিবাম, একদিন ওদের মৌতাতটা ঠিক যথেষ্ট হয়নি বা মাঝখানে কেটে গিয়েছিল । নেশারুদের মৌজে বাগড়া দিলে তারা কেমন কান্ড করতে পারে তা আশা করি অনেকের জানা আছে । অল্প দুয়েককথা পরেই তারা বেরসিক ক্যামেরাম্যানকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ছাদ থেকে ! বেচারার ভবলীলা তখনই সাঙ্গ হয়ে যায় ।

না, খবরটা মনে পড়ার কারন অন্য । সেটা হচ্ছে ইত্তেফাকের ভাষা--"তিনি প্রত্যহ বাড়ি ফিরিয়া ছাদে উঠিয়া উহাদের তাড়াইয়া দিতেন (!?!)"

বেচারা । আমরা যতই খারাপ থাকি না কেন সারাদিনের কাজ শেষের পরে এমন একটা "প্রাত্যহিক কর্তব্য" (?) আমাদের কয়জনকে করতে হয় ?

মন খারাপ থাকলে (যেমন এখন আছে), আমি সেই দুর্ভাগা চিত্রগ্রাহকের কথা স্মরণ করি ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710517 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710517 2007-05-14 11:47:28
তারিখ ও পেজ নাম্বার দিয়ে ব্লগ আর্কাইভ সার্চ চাই!
এখন যদি ৩৭৬৩ তম ফ্রন্ট পেজ চলতে থাকে তাহলে আমি ২৫০০ তম পেজ কী ভাবে দেখব?

বা কী ভাবে ২০০৬ সালের ১৯ শে ডিসেম্বরের পোস্টগুলো পড়বো?

এই সুবিধা না থাকলে ব্লগের পুরনো লেখাগুলো পড়তে সোহেইল জাফর ভাইয়ের উয়ারি-বটেশ্বরে খোঁড়াখুঁড়ি করার মতো মেহনত করতে হবে নয়তো আশার আলোর মতো কোনো ক্রলার প্রোগ্রাম বানিয়ে ছেড়ে দিতে হবে !!

যেহেতু আমরা অধিকাংশ এতো জিনিয়াস বা ডেটা মাইনিং এ এতো এক্সপার্ট নই, এবং ব্লগ নিয়ে এতো খাটতে পারবো না সুতরা হে কর্তৃপক্ষ আপনাদের দরজার সামনে আবারো পিটিশান...কখন নেবেন ডিসিশান ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710409 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710409 2007-05-13 18:44:22
গুহা মানবের হায়ারোগ্লিফিক্স ২ (সকালের গান)
বেরিয়ে আসি গুহার চাতালে,

পুবের দিগন্তে তখন সারসের

গোলাপী কুসুমের মত সুর্য পিছলে উঠছে ।

রক্তাভ মেঘের দিকে তাকিয়ে ভাবি

এই সকালে তো আমাদের একজন নেই ।

কালও সে ছিল, আজ কেবল রেখে গেছে

স্মৃতি আর কালচে রক্তের দাগ ।

শ্বাপদ এসেছিল আমাদের ডেরায় কাল রাতে,

আমাদের নিক্ষিপ্ত অক্ষম মুষল, অঙ্গার, মশাল আর

অভিশাপ উপেক্ষা করে নিয়ে গেছে

আমাদের সাথীকে ।

হতে পারে, খুব সম্ভব একদিন আমিও যাবো

সময়ের আগেই, জরা আর ক্ষয়ের

ফাঁদে বাঁধা পড়ার আগেই,

প্রকান্ড দাঁতালো মার্জারের নির্দয় কামড়ে ।

রেখে যাবো কিছু স্মৃতি আর

আশ্রয়ের প্রবেশপথে এইরকম

লালাভ কালচে দাগ

****

তবুও আমার কেন যেন মনে হয়

নিয়তি, সুর্যের কক্ষপথের অবধারিত নয়!

হতে পারে দিনের ছায়ার মত, ভেসের যাওয়া

মেঘের মত নিয়তি গতিপথ বদলায় ।

হতে পারে, আমাদের বাহুর পেশল কাঠিন্য

আর পাথরের কুঠারের আঘাতকে

(শ্বাপদ তো কোন ছার)

এমন কী ভবিতব্যও ভয় পায়!! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710152 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28710152 2007-05-11 18:40:18
টনি, টা টা? http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709996 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709996 2007-05-10 17:56:54 শ্বাপদ রাত্রিতে (কু-বিতা) আমার চির চেনা সুর্য, আহত সরিসৃপের মত

পশ্চিম আকাশের চাল বেয়ে পিছলে নামে

বেলা শেষের সরোবরে, আর

আমি গুহার চাতালে বসে কাঠ-কয়লার

জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড ছাড়িয়ে

দেখি, আঁধারের চাদরের

হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসা,

দেখি পুবের দিগন্তে

গোলথালা চাঁদের কৌণিক উত্থান ।

রুপালী বন্যায় ধুয়ে যাওয়া ঝলসানো

প্রান্তরে চোখ যায় আমার,

আর আমার চোখ আটকে যায়,

আগুনের আলোর

বলয়ের ঠিক বাইরে

গুঁড়ি মেরে অপেক্ষমান

শ্বাপদের নিঃস্পন্দ

স্ফটিক চোখে ।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709691 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709691 2007-05-08 21:58:57
ওয়ালডেন
প্র্যাক্টিক্যাল ফিলোসফার থোরোকে কী আবারো পরিচয় করিয়ে দেবার প্রয়োজন আছে? এই স্বশিক্ষিত স্কুল শিক্ষক দুটো খুব প্রয়োজনীয় কনসেপ্ট শিখিয়ে গেছেন পৃথিবীর মানুষকে । এক অত্যাচারী প্রভুকে অহিংস উপায়ে পরাস্ত করা যেতে পারে । দুই, মানুষ খুব অল্প উপকরণ নিয়ে দুনিয়াতে বাঁচতে পারে।

বাস্তবে দুজন মানুষ নন-ভায়োলেন্সের (সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স) ধারনাকে কাজে চেষ্টা করে পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দিয়েছেন । একজনের নাম গান্ধী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বড় পুরোধা, আর আরেকজন মার্টিন লুথার কিং, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের প্রধান নায়ক । এ দুজন খোলাখুলিই স্বীকার করেছেন তাঁদের দর্শনে থোরোর 'থরো' প্রভাবের কথা । (দু'জনেরই ভাগ্যে অবশ্য জুটেছে ঘাতকের বুলেট, তবু তাঁদের অহিংস লিগ্যাসি আজো অন্ত্ত নামে বেঁচে আছে)

সেই যাই হোক ওয়ালডেনের নির্জন কুটিরে বসেই থোরো তাঁর ভাবনাগুলোকে সুসংবদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছিলেন । ওয়ালডেনের কুলে নিজের হাতে বানানো কুটিরে দু'বছর কাটিয়ে এসে চিন্তাগুলো কাগজে গুছিয়ে লিখতে থাকেন ।

"When I wrote the following pages, or rather the bulk of them, I lived alone, in the woods, a mile from any neighbor, in a house which I had built myself, on the shore of Walden Pond, in Concord, Massachusetts, and earned my living by the labor of my hands only. I lived there two years and two months. At present I am a sojourner in civilized life again."
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709193 http://www.somewhereinblog.net/blog/babelblog/28709193 2007-05-05 07:31:15