(হঠাৎ করেই খবর পেলাম যৌথ বাহিনীর ডান্ডার ঘায়ে শয্যাশায়ী হয়েছেন আমার বাল্য স্মৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে থাকা নিত্য স্যার। ৭১’এ রাজাকারদের হাতে পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা শত্র“ সম্পত্তি হিসেবে দখল করেছিলেন তার ভিটাবাড়ী। সা¤প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাদের একজন নিত্য স্যার। সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে বলে বেড়াচ্ছিলেন যে এবার ভালো একটা কিছু হবে। দূর্নীতিবাজরা সব ধরা পড়ে যাচ্ছে। তার এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত বিশ বছর ধরে তিনি যে চায়ের দোকানটাতে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় পার করেন, চা খান, স্মৃতিচারণ করেন, সেই চায়ের দোকানটা উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি তার অভ্যেসমত একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেন। আইনের রক্ষকরা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না। তারাও তাই করেছেন যা তাদের করা উচিত। নিত্য স্যারকে নিয়ে এ গল্পটা লেখা শুরু হলো। হতে পারে, আমার অনেক গল্পের মতো এ গল্পটাও শেষ পর্যন্ত শেষ হবে না।)
সংস্কার, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক- এ তিন ব্যাপারেই বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’র অসীম উৎসাহ ছিলো। তবে ছিয়াত্তর বছর বয়সে যে সাংস্কৃতিক মানের সংস্কারকর্ম তার উপর প্রযুক্ত হলো তা হজম করার মতো শারিরীক অবস্থা তার ছিলো না।
’বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন যদিও নামের আগে বাবু শব্দের ব্যবহার কোনকালেই তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তার ভাষায় ’এটা নিতান্তই শব্দের অপব্যবহার।’ তার ক্ষেত্রে এটা একেবারেই খাটি কারণ ’বাবুয়ানা’ বলে যে ব্যাপারটা আছে তাতে কখনোই অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। জাতপাত মানা বা মেলামেশার ক্ষেত্রে বাছবিচারের প্রসঙ্গ আসলে তিনি বিরক্তিতে এমনভাবে নাক কুচকে ফেলতেন যেন তাকে ময়লার বাক্সের মধ্যে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবক বয়সে তিনি যথেষ্ট পরিমান গোমাংশ ভক্ষণ করেছেন বলেও জনশ্র“তি আছে। তারপরেও ’বাবু’ যে তাকে ছাড়লো না এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের। থানা সদরের হাইস্কুলের হেড মাস্টার হওয়ার কারণে তার কথার গুরুত্ব যথেষ্ট। তিনি আদিকাল থেকেই গাণিতিক নিয়মে হিন্দুদের বাবু ও মুসলমানদের সাহেব সম্বোধন করতেন। বাংলার শিক্ষক নিত্যরঞ্জন শিউলি এ অমোচনীয় নিয়মের কবলে পড়ে ’ বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ হয়েই থাকলেন।
মেরুদন্ডের যেখানটাতে ’ঘা’ খেয়ে তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন, কাকতালীয়ভাবে বছর পনের আগে আমার মেরুদন্ডের ঠিক ঐ স্থানটিতেই মারাত্মক এক গুতো দিয়েছিলেন। সে হিসেবে তার পরিণতিতে আমার খুশিই হওয়ার কথা। কিন্তু খশি হতে পারলাম না। সে সময়টাতে আমি ছিলাম চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম ক্লাসের ছাত্র, তিনি বাংলা ব্যকরণের শিক্ষক। ক্লাসে তিনি পড়াতেন অনেকটা নাছোড়বান্দার মতো। ঘন্টা পড়ে যেতো, পরের ক্লাসের শিক্ষক এসে দাড়িয়ে আছেন কিন্তু তিনি নঞ তৎপুরুষ বুঝিয়েই যেতেন একের পর এক উপমা টেনে। ভাবখানা এমন, এত সহজ জিনিসটা বুঝবি না কেন? খুব একটা কাজ হতো না। জমা ও খরচ দ্বন্দ সমাস, চার মাথার সমাহার চৌমাথা দ্বিগু সমাস- এছাড়া আর অন্য কোন কিছু মাথায় ঢুকতে চাইতো না। যে কথা বলছিলাম, কনুই দিয়ে আমার মেরুদন্ডে চরম এক গুতো দিয়েছিলেন তিনি। তার যথাযোগ্য কারণও ছিলো। এইটে থাকতেই সিগারেট ধরেছিলাম। স্কুল ছুটির পরে মূল রাস্তা থেকে যে পথটি নারকেলতলা গ্রামের দিকে গেছে সেই পথের কালভার্টটির উপরে বসে আমরা কয়েকজন মনের সুখে কে-টু সিগারেট টানতাম। আমাদের ক্লাসের কয়েকটা মেয়ে ঐ পথে বাড়ী ফেরার পথে এ দৃশ্য দেখে একটা চোখকপালী ভঙ্গি করে হেটে যেতো। ওদের মধ্যে সেলিনা ছিল একটু বোকাসোকা। পরপর কয়েকদিন একই অবস্থায় দেখে সে একদিন আমাদের সামনে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ’তুই সিগারেট খাইস? আমি নিত্য স্যাররে বইলে দেবো।’
’খালের মধ্যি চুবনি খাতি চালি বলিস’ আঙ্গুল দিয়ে খাল দেখিয়ে বলেছিলাম আমি। পরদিন স্কুল ছুটির পর নিত্য স্যার আমাকে ধরলেন। শান্ত ভঙ্গিতে তিনি বলেছিলেন, ’যখন বড় হবি, বুঝতে শিখবি কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তখন সিগারেট কেন যা খুশি তাই খাস। কিন্তু এখন না, এখনো সময় হয়নি। এবারের মত ছেড়ে দিলাম কিন্তু আর যদি এরকম কোন খবর পাই তাহলে ছাড়ব না বাছা! প্রয়োজনে তোর বাপরে খবর দেব।’
মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল আমার। মিনমিনে সেলিনা, তোর এত সাহস! স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার সময় ঐ কালভার্টের কাছেই ওকে ধরে আচ্ছামত এক চড় লাগালাম। তাতেও রাগ যাচ্ছিল না। এই ঘটনা নিয়ে আর কোন কথা চালাচালি হলে তাকে এসিড মারা হবে, এ ভয় দেখালাম। এসিড মারার খবর তখন প্রায়ই শুনতাম। ভীতিকর কোন কিছু বোঝাতে ঐ উপমাটাই আমার মাথায় এসেছিল। ’এবার অন্তত গাধা ছেমড়িটার শিক্ষা হবে’ ভেবেছিলাম আমি। পরদিন ক্লাসে নিত্য স্যারের চেহারা দেখেই বুঝলাম, ঘটনা হীতে বিপরীত! আজ আমার খবর আছে। ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে ক্লাসে ঢুকেই তিনি আমার এক নাম্বার স্যাঙ্গাত দিদারুলকে বেত আনার নির্দেশ দিলেন। দিদারুল সাথে সাথেই বুঝলো ঘটনা কি। আামার দিকে একবার তাকাল তারপর বেত আনতে লাইব্রেরী রুমে গেল। বিরল কোন দৃশ্যের গন্ধ পেল ক্লাসের অন্যরা। নিত্য স্যার এর আগে কখনো কাউকে বেত দিয়ে মারেননি। ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না তিনি। দিদারুল বেত নিয়ে ফিরলে বেতটা ধরেই ক্ষোভের সাথে বলে উঠলেন, হতভাগা, বেছে বেছে পাতলা বেতটাই এনেছিস? চালাকির শাস্তি হিসেবে দিদারুলের পিঠেই সপাসপ বেত পড়তে লাগল। কয়েক বাড়িতেই ভেঙ্গে গেল দূর্বল বেতটা। হাত থেকে বেতটা ফেলে দিয়ে তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,’বিল্লাহ, সামনে আয়। এতক্ষণে আসলেই ভয় পেয়ে গেলাম আমি। কাছে পেয়ে প্রথমে আমার চুল পেছন থেকে মুঠি করে ধরলেন। তারপর গর্জে উঠলেন, শয়তান ছেলে, তুই একটা মেয়ের মুখে এসিড মারবি! এরপর বা’হাত দিয়ে আমার মাথাটা নীচু করে ডান হাতের কনুই দড়াম করে নামিয়ে দিলেন আমার মেরুদন্ড বরাবর। অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, মুহুর্তেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি। আমার বাবা তখন ক্ষমতাসীন দলের থানা কমিটির সভাপতি। এ ঘটনা নিয়ে যথেষ্ট নাকাল হতে হয়েছিল নিত্যরঞ্জন শিউলীকে। এ আর এমন কি? নাকাল তিনি জীবনে বহুবার হয়েছেন।(অসমাপ্ত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

