somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সংস্কার কৃত

১৮ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৩:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(হঠাৎ করেই খবর পেলাম যৌথ বাহিনীর ডান্ডার ঘায়ে শয্যাশায়ী হয়েছেন আমার বাল্য স্মৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে থাকা নিত্য স্যার। ৭১’এ রাজাকারদের হাতে পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা শত্র“ সম্পত্তি হিসেবে দখল করেছিলেন তার ভিটাবাড়ী। সা¤প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাদের একজন নিত্য স্যার। সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে বলে বেড়াচ্ছিলেন যে এবার ভালো একটা কিছু হবে। দূর্নীতিবাজরা সব ধরা পড়ে যাচ্ছে। তার এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত বিশ বছর ধরে তিনি যে চায়ের দোকানটাতে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় পার করেন, চা খান, স্মৃতিচারণ করেন, সেই চায়ের দোকানটা উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি তার অভ্যেসমত একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেন। আইনের রক্ষকরা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না। তারাও তাই করেছেন যা তাদের করা উচিত। নিত্য স্যারকে নিয়ে এ গল্পটা লেখা শুরু হলো। হতে পারে, আমার অনেক গল্পের মতো এ গল্পটাও শেষ পর্যন্ত শেষ হবে না।)

সংস্কার, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক- এ তিন ব্যাপারেই বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’র অসীম উৎসাহ ছিলো। তবে ছিয়াত্তর বছর বয়সে যে সাংস্কৃতিক মানের সংস্কারকর্ম তার উপর প্রযুক্ত হলো তা হজম করার মতো শারিরীক অবস্থা তার ছিলো না।

’বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন যদিও নামের আগে বাবু শব্দের ব্যবহার কোনকালেই তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তার ভাষায় ’এটা নিতান্তই শব্দের অপব্যবহার।’ তার ক্ষেত্রে এটা একেবারেই খাটি কারণ ’বাবুয়ানা’ বলে যে ব্যাপারটা আছে তাতে কখনোই অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। জাতপাত মানা বা মেলামেশার ক্ষেত্রে বাছবিচারের প্রসঙ্গ আসলে তিনি বিরক্তিতে এমনভাবে নাক কুচকে ফেলতেন যেন তাকে ময়লার বাক্সের মধ্যে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবক বয়সে তিনি যথেষ্ট পরিমান গোমাংশ ভক্ষণ করেছেন বলেও জনশ্র“তি আছে। তারপরেও ’বাবু’ যে তাকে ছাড়লো না এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের। থানা সদরের হাইস্কুলের হেড মাস্টার হওয়ার কারণে তার কথার গুরুত্ব যথেষ্ট। তিনি আদিকাল থেকেই গাণিতিক নিয়মে হিন্দুদের বাবু ও মুসলমানদের সাহেব সম্বোধন করতেন। বাংলার শিক্ষক নিত্যরঞ্জন শিউলি এ অমোচনীয় নিয়মের কবলে পড়ে ’ বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ হয়েই থাকলেন।

মেরুদন্ডের যেখানটাতে ’ঘা’ খেয়ে তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন, কাকতালীয়ভাবে বছর পনের আগে আমার মেরুদন্ডের ঠিক ঐ স্থানটিতেই মারাত্মক এক গুতো দিয়েছিলেন। সে হিসেবে তার পরিণতিতে আমার খুশিই হওয়ার কথা। কিন্তু খশি হতে পারলাম না। সে সময়টাতে আমি ছিলাম চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম ক্লাসের ছাত্র, তিনি বাংলা ব্যকরণের শিক্ষক। ক্লাসে তিনি পড়াতেন অনেকটা নাছোড়বান্দার মতো। ঘন্টা পড়ে যেতো, পরের ক্লাসের শিক্ষক এসে দাড়িয়ে আছেন কিন্তু তিনি নঞ তৎপুরুষ বুঝিয়েই যেতেন একের পর এক উপমা টেনে। ভাবখানা এমন, এত সহজ জিনিসটা বুঝবি না কেন? খুব একটা কাজ হতো না। জমা ও খরচ দ্বন্দ সমাস, চার মাথার সমাহার চৌমাথা দ্বিগু সমাস- এছাড়া আর অন্য কোন কিছু মাথায় ঢুকতে চাইতো না। যে কথা বলছিলাম, কনুই দিয়ে আমার মেরুদন্ডে চরম এক গুতো দিয়েছিলেন তিনি। তার যথাযোগ্য কারণও ছিলো। এইটে থাকতেই সিগারেট ধরেছিলাম। স্কুল ছুটির পরে মূল রাস্তা থেকে যে পথটি নারকেলতলা গ্রামের দিকে গেছে সেই পথের কালভার্টটির উপরে বসে আমরা কয়েকজন মনের সুখে কে-টু সিগারেট টানতাম। আমাদের ক্লাসের কয়েকটা মেয়ে ঐ পথে বাড়ী ফেরার পথে এ দৃশ্য দেখে একটা চোখকপালী ভঙ্গি করে হেটে যেতো। ওদের মধ্যে সেলিনা ছিল একটু বোকাসোকা। পরপর কয়েকদিন একই অবস্থায় দেখে সে একদিন আমাদের সামনে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ’তুই সিগারেট খাইস? আমি নিত্য স্যাররে বইলে দেবো।’
’খালের মধ্যি চুবনি খাতি চালি বলিস’ আঙ্গুল দিয়ে খাল দেখিয়ে বলেছিলাম আমি। পরদিন স্কুল ছুটির পর নিত্য স্যার আমাকে ধরলেন। শান্ত ভঙ্গিতে তিনি বলেছিলেন, ’যখন বড় হবি, বুঝতে শিখবি কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তখন সিগারেট কেন যা খুশি তাই খাস। কিন্তু এখন না, এখনো সময় হয়নি। এবারের মত ছেড়ে দিলাম কিন্তু আর যদি এরকম কোন খবর পাই তাহলে ছাড়ব না বাছা! প্রয়োজনে তোর বাপরে খবর দেব।’

মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল আমার। মিনমিনে সেলিনা, তোর এত সাহস! স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার সময় ঐ কালভার্টের কাছেই ওকে ধরে আচ্ছামত এক চড় লাগালাম। তাতেও রাগ যাচ্ছিল না। এই ঘটনা নিয়ে আর কোন কথা চালাচালি হলে তাকে এসিড মারা হবে, এ ভয় দেখালাম। এসিড মারার খবর তখন প্রায়ই শুনতাম। ভীতিকর কোন কিছু বোঝাতে ঐ উপমাটাই আমার মাথায় এসেছিল। ’এবার অন্তত গাধা ছেমড়িটার শিক্ষা হবে’ ভেবেছিলাম আমি। পরদিন ক্লাসে নিত্য স্যারের চেহারা দেখেই বুঝলাম, ঘটনা হীতে বিপরীত! আজ আমার খবর আছে। ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে ক্লাসে ঢুকেই তিনি আমার এক নাম্বার স্যাঙ্গাত দিদারুলকে বেত আনার নির্দেশ দিলেন। দিদারুল সাথে সাথেই বুঝলো ঘটনা কি। আামার দিকে একবার তাকাল তারপর বেত আনতে লাইব্রেরী রুমে গেল। বিরল কোন দৃশ্যের গন্ধ পেল ক্লাসের অন্যরা। নিত্য স্যার এর আগে কখনো কাউকে বেত দিয়ে মারেননি। ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না তিনি। দিদারুল বেত নিয়ে ফিরলে বেতটা ধরেই ক্ষোভের সাথে বলে উঠলেন, হতভাগা, বেছে বেছে পাতলা বেতটাই এনেছিস? চালাকির শাস্তি হিসেবে দিদারুলের পিঠেই সপাসপ বেত পড়তে লাগল। কয়েক বাড়িতেই ভেঙ্গে গেল দূর্বল বেতটা। হাত থেকে বেতটা ফেলে দিয়ে তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,’বিল্লাহ, সামনে আয়। এতক্ষণে আসলেই ভয় পেয়ে গেলাম আমি। কাছে পেয়ে প্রথমে আমার চুল পেছন থেকে মুঠি করে ধরলেন। তারপর গর্জে উঠলেন, শয়তান ছেলে, তুই একটা মেয়ের মুখে এসিড মারবি! এরপর বা’হাত দিয়ে আমার মাথাটা নীচু করে ডান হাতের কনুই দড়াম করে নামিয়ে দিলেন আমার মেরুদন্ড বরাবর। অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, মুহুর্তেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি। আমার বাবা তখন ক্ষমতাসীন দলের থানা কমিটির সভাপতি। এ ঘটনা নিয়ে যথেষ্ট নাকাল হতে হয়েছিল নিত্যরঞ্জন শিউলীকে। এ আর এমন কি? নাকাল তিনি জীবনে বহুবার হয়েছেন।(অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৪:০৩
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×