somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে বাঁচাতে তৎপর শেখ হাসিনার উপদেষ্টা, নিগ্রহের শিকার তরুন সাংবাদিক। প্রতিবাদী মানববন্ধন ৯তারিখ বিকেল ৫টায় প্রেসক্লাবে।
প্রচারিত প্রতিবেদন সম্বন্ধে যা জানা যায়, 'উদ্বোধনী দিনে বস্তুনিষ্ঠ এবং সময়োপযোগী রিপোর্ট উপস্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল। প্রথম বুলেটিনে একমাত্র স্পেশাল রিপোর্ট চট্টগ্রামে যুদ্ধাপরাধের সংশ্লিষ্ট অপরাধে বিচারাধীন একজন রাজনীতিবিদের উপর একটি বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট প্রচারিত হয়। রিপোর্টটি আবু সুফিয়ানের নির্দেশনা, পরিকল্পনা তত্বাবধানে করা হয়েছিল। রিপোর্টটিতে ভয়েস দিয়েছিলো ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আসা অন্য এক রিপোর্টার। সেই রিপোর্টার এর পিতা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। রিপোর্টে বলা হয়, আগামী এক মাসের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল এর প্রধান আবদুল হান্নান এর সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। রিপোর্ট প্রচারিত হবার পর সকল শ্রেনীর দর্শক শ্রোতার অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়ায়।'

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অপরাধ বৃত্তান্তের দীর্ঘ এক ফিরিস্তি দিয়েছেন ব্লগার নিঝুম মজুমদার সাকা, একটি পশুর নাম শীর্ষক ধারাবাহিক অনুসন্ধানী ব্লগে।(ই-বুক হিসাবে পাওয়া যাবে এখানে আর তার ব্লগ পড়তে ভিজিট করুন এখানে ।) নিম্নে তার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো। উল্লেখ্য যুদ্ধাপরাধের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাকা এখন বিচারাধীন।

১. এই সেই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী যার সিএসবি নামে টিভি চ্যানেল ছিলো, তিনিও ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা। অভিযোগ আছে সিএসবি এবং দিগন্ত চ্যানেল দুটিই পাকিস্থানী গুপ্তচর আইএসআই এর স্বার্থ দেখার জন্য চালু হয়েছিলো এবং এর লগ্নিকারীদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে হেরোইন পাচার, দাউদ ইব্রাহিমের সাথে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে এবং জামায়াতে ইসলামীর কিছু কেন্দ্রীয় নেতার সম্পৃক্ততা এবং ইসলামী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতার খবরও শোনা যায়। সেই ইসলামী ব্যাংক যার মাধ্যমেই জংগি সংগঠন হুজি-র কাছে বিপুল পরিমানে বিদেশি অর্থ এসেছিল বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়েছিল। ব্যাংকটিকে এর জন্য জরিমানাও গুনতে হয়।

২. যে সাকা ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল চট্টগ্রামের শ্রী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে পাকিস্থানী সৈন্যদের যোগসাজশে এর মালিক নুতন চন্দ্র সিংহ কে হত্যা করেছিলো। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রায় ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন কুণ্ডেশ্বরী ভবনে। এলাকায় জনদরদী হিসাবে প্রচন্ড জনপ্রিয় এই ৭০ বছরের বৃদ্ধের বুকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে সাকা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলো।

৩. ১৩ ই এপ্রিল ওই একই সৈন্য বাহিনী নিয়ে সাকা ও তার দলবল গহিরার আরেক বিশিষ্ট অধিবাসী চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসের বাড়ী গিয়ে তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালায় তার ছেলে দয়াল হরি বিশ্বাস কে বের করে দিতে এবং চালের ড্রামে লুকায়িত হরি বিশ্বাস কে তার বাবার সামনেই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

৪. এর দুদিন পর ১৫ এপ্রিল সাকা আবারও এক প্লাটুন পাক সৈন্য সহযোগে রাউজানে অভিযান চালায় ।

৫. নোয়াপাড়া ইউনিয়নের পথেরহাটের আওয়ামী লীগ কর্মী হানিফের বাড়িতে ঢুকে তাকে হত্যা করে।

৬. জ্বালিয়ে দেয় জহুর আহমেদ চৌধুরীর জামাতা ও নোয়াপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সম্পাদক ইজহারুল চৌধুরীর বসতবাড়ি।

৭. এছাড়াও ওই দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভিপি আবদুর রব এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র ছাত্রলীগ নেতা খালেদকে ধরে এনে সাকার নির্দেশে হত্যা করা হয়।

৮. এরপর সাকার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী ঊনসত্তর পাড়ায় প্রবেশ করে ১৭০ জন নারী-পুরুষকে একটি পুকুর পাড়ে একত্রিত করে হত্যা করে। সাকা সঙ্গী সেনাদের জানিয়েছিলেন, এরা সবাই মালাউন এবং ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগে।
একজন তরুন নির্ভিক সাংবাদিক আবু সুফিয়ান

সাংবাদিক আবু সুফিয়ান ইতিপূর্বে বেসরকারী টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনে থাকাকালীন বহুল আলোচিত আর্থ ফাউন্ডেশন নামক ভুয়া এনজিও’র হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও আত্মসাতের বিষয় ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আলোচিত হয়েছিলেন। কারন তখন আর্থ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খালিদ হোসেন নিজেকে তৎকালীন সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ এবং বর্তমান সরকারের অনেক সহযোগী শিল্পী সাহিত্যিক, সচিব এবং বর্তমানে শাসকদলের অন্তত চারজন ক্ষমতাধর এমপি/মন্ত্রী জড়িত ছিলেন-তাদের সংশ্লিষ্টতার কথাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসের সাথে তুলে ধরেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানে আরো তিনজন রিপোর্টার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরী করেন। সেই রিপোর্টের জন্য তিনি অর্জন করেন আন্তর্জাতিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার। এছাড়াও তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মানিক মিয়া স্মৃতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারও অর্জন করেন।


টিআইবি ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এওয়ার্ড-২০০৭

এই নির্ভিক সাংবাদিক আবু সুফিয়ান যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রচার করায় চাকুরী চ্যুত হলেন। আমরা যেমন একজন যুদ্ধাপরাধীকে মেনে নিতে পারি না, তেমনি মেনে নিতে পারিনা যুদ্ধপরাধীদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা। যে প্রতিবাদী মানসিকতার ফলে আজ যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে - সেই সামাজিক প্রতিরোধ আমাদের বজায় রাখতে হবে।

এজন্য আগামী ৯ই তারিখ বিকেল ৫টায় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদী মানববন্ধন আয়োজন করা হয়েছে। সবাইকে অংশ নেবার আহবান জানাই।

পোস্ট পরিমার্জিত, ৮ই সেপ্টেম্বর, ৮টা ৫০ মি:। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29426714 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29426714 2011-08-06 17:34:52
ভোটের আগে ভাত, আর তারও আগে চাই ছাত্র-হত্যার বিচার
দখল করা সম্পত্তির মায়া দখলদারদের একটু বেশিই থাকে, এবং এসব দখলী সম্পিত্ত ঘিরে নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বেশি হয়। ছোটবেলায় মনে আছে প্রায়ই চিংড়ী ঘেরে মাছ চোর ধরা হত এবং অধিকাংশ সময় তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হত। এইসব চোররা কারা ছিল? যাদের জমিতে ঘের করা হত তারা। খাল সহ শত শত বিঘা জমি দখল করে ঘের করতো প্রভাবশালীরা। ঘের দেয়ার পর ওখানে যাদের জমি পড়ে যেত তাদের কারোরই নিজেদের জমিতে জাল ফেলানোর অধিকার ছিল না। গতকাল ও দেখা যাবে কিছু দখলদার কায়েমী স্বার্থবাদী'র হাতে জঘন্যতম উপায়ে খুন হল কয়েকজন কমবয়সী তরুণ, আর দোষ চাপানো হল পুরো গ্রামবাসীর উপর।

শবে-বরাতের রাতে এই বয়সী পোলাপান দল বেধে ঘুরতে বের হয় এটা সমস্ত বাংলাদেশে খুবই কমন চিত্র, ঐ গ্রামের মানুষ এটুকু বুঝবে না? আমার নিজেরও বাড়ীর বাইরে প্রথম রাত জাগার সুযোগ হয়েছিল শবে-বরাতের রাতে, আজ থেকে ১৭ বছর আগের ঐ রাতে আমি প্রথম সিগারেট খেয়েছিলাম। আর তারুণ্যেরে এই খুব স্বাভাবিক এ্যাডভেঞ্চারের ফলে চলে গেল ছয়টি তরতাজা প্রাণ।

এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব কারা দিয়েছে তার প্রত্যক্ষদর্শী আছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, তার কাছেও যাবতীয় তথ্য আছে। কিন্তু সরকার এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার করবেন বলে কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যথারীতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন যে, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রাষ্ট্র যখন কোন ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে তখন তার খুব পরিস্কার মেসেজ আছে, অর্থাত বিষয়টা নিয়ে সরকার মাথা ঘামাবে না। ঘামানোর কথাও নয়, সরকার এখন মূলত মাথা ঘামাবে সামনের নির্বাচন ও তার ম্যাকানিজম নিয়ে। সেই ম্যাকানিজমে খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভূমি দখলকারী, নদী দখলকারী, বালুমহাল দখলকারী সহ অন্যান্য সকল প্রভাবশালী দখলবিদরা। কারণ এই দখলকারীরা জানে কিভাবে ভোটের বাক্সও দখল করতে হয়। এরা যেদিকে হেলবে ক্ষমতা ও সেদিকেই হেলবে। ছয়জন ছাত্রের জীবন এখানে কিছুই না।

আজকে কিছুই হয়নি কিন্তু মন চায় আগামীকালই একটা প্রতিবাদের ঝড় উঠুক। কোন রাজনৈতিক ছাত্র-সংগঠন এই ছাত্র-হত্যার বিরুদ্ধে এখনো কোন প্রতিবাদ জানায়নি বলে হতাশ হয়েছি কিন্তু আকাঙ্ক্ষা এই যে সে হতাশা আগামীকালই কেটে যাক। প্রতিবাদ হলে এই হত্যার বিচার হতে পারে অন্যথায় একেবারেই নয়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29416216 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29416216 2011-07-20 00:29:44
প্রকাশিত হচ্ছে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিস্পর্ধী গদ্য 'রাশপ্রিন্ট'
রাশপ্রিন্ট প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। শিল্পী অশোক কর্মকারের প্রচ্ছদ আর জাহিদ মুস্তাফা ও আদিব সাইদের এর অলংকরণে লোকালয় প্রকাশনী হতে এটি প্রকাশ করেন শিমুল মোস্তফা। বইটির প্রকাশ সঞ্জীব চৌধুরীকে সেইসব বিরল লেখকদের একজনে পরিণত করে যারা ‘জীবনে একটিমাত্র বহি লিখিয়াছেন’। তারপরে সঞ্জীব চৌধুরী গায়ক-গীতিকার-সুরকার হিসেবে, গানের দল দলছুট নিয়ে খ্যাতিমান হয়েছেন। আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায় যায় দিন-এ দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার সূত্রে গণ-মাধ্যমে তার স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সংগীত তারকা বা মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি, অথবা উম্মাতাল জীবন-যাপনের জন্য ব্যাপক সামাজিক ভ্রুকুটি সঞ্জীব চৌধুরীর যে অবিচ্ছেদ্য স্বত্তাটিকে আড়াল করেছে তা হচ্ছে তার প্রবল রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা। জীবনের শেষ দশকে যারা সঞ্জীবকে জেনেছেন, ভালবেসেছেন, তাদেরও অনেকের কাছে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে মিছিলে মিছিলে মুক্তির গান গাওয়া সঞ্জীব প্রায় অজানা এক মানুষ। বিনোদনসেবী শ্রোতা বা মুনাফা ও ক্ষমতালোভী সম্পাদকদের কখনো জানা হয়নি ক্ষমতার প্রাত্যহিক চাবুক তাকে প্রতিদিন কিভাবে খুন করেছে।

রাশপ্রিন্ট- এ আমরা সেই সঞ্জীবকে খুঁজে পাই। খুঁজে পাই আশি ও নব্বই দশকের ছোট-কাগজগুলোতে ছড়ানো-ছিটানো তার কবিতাগুলোতে। আমরা মনে করেছি রাশপ্রিন্ট সঞ্জীবের খন্ডিত পাবলিক ইমেজকে পূর্ণতা দিতে পারে। আর একারণেই রাশপ্রিন্ট-এর পুনঃপ্রকাশ। এই পুনঃপ্রকাশ অনুমতির জন্য আমরা কৃতজ্ঞ বইটির বর্তমান স্বত্তাধিকারী খন্দকার আলেমা নাছরীনের কাছে। আরো কৃতজ্ঞ শিল্পী আব্দুল হালিম চঞ্চল ও ইরফান বাবুনের কাছে যারা সঞ্জীবের এই প্রতিস্পর্ধী স্বত্তাটিকে ধারণ করে এগিয়ে এসেছেন বইটি প্রকাশের কাজে। কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি যারা সঞ্জীবকে ভালবেসেছেন, তার সমাজ-সংবেদনকে ভালবেসেছেন, তার তারকা-খ্যাতির চেয়েও বেশি।

প্রকাশক

কাঠপেন্সিল, ১৭৯/৩, ফকিরেরপুল, ঢাকা।

মূল্য : ১৫০

পরিবেশক

জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী

ভাষাচিত্র

আদর্শ

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29320463 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29320463 2011-02-04 23:58:31
‘মেহেরজান’ ছবির প্রদর্শনী অব্যাহত থাকুক ও সেইসঙ্গে ‘মেহেরজান’ ছবির পরিচালক রুবাইয়াৎ হোসেনকে কিছু বেদনাবিদ্ধ জিজ্ঞাসা : লেখাটি যৌথভাবে লিখেছেন বাকী বিল্লাহ, পুষ্পিতা আকাশলীনা ও আশফাকুর রহমান

‘মেহেরজান’ ছবিটি নিয়ে ইতোমধ্যে পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। ছবিটি নিয়ে বাতাসে ভাসছে নানা ধরণের কথা-বার্তা। গতকাল সকাল থেকে ফেসবুকে অনেকেই এ ছবি ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে বলে স্ট্যাটাসে জানাতে থাকলে সরকারের সিদ্ধান্তের বিচক্ষণতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। আরো কিছুটা সময় পার হলে জানা যায় যে সম্ভবতঃ নির্মাতারাই বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে প্রেক্ষাগৃহগুলো থেকে ছবিটি কিছুদিনের জন্য তুলে নিচ্ছেন। ফলে ছবিটির প্রিমিয়ার শো-র পর থেকে অনেকের ভেতরেই যেমন ছবিটির বক্তব্যের বিরুদ্ধে জাতীয় ইতিহাসের আবেগগত দৃষ্টিকোণের দিক থেকে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, ছবিটি তুলে নেবার বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আবার এ ছবির নির্মাতাগণ কিছু সহানুভূতিও পাচ্ছেন।

গত ২৬শে জানুয়ারি ‘প্রথম আলো’র উপসম্পাদকীয় পাতায় সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘মেহেজান’ বিষয়ে রোবায়েত ফেরদৌস, মাহমুদুজ্জামান বাবু, কাবেরী গায়েন ও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নিবন্ধে ছবিটির আধেয় ও বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা থাকলেও এটি নিষিদ্ধ করা বা হল থেকে যেন প্রত্যাহার না করা হয়, সে নিয়ে আগেই সতর্কবানী দেওয়া হয়েছিল। ‘মেহেরজান’-এর এই সাময়িক বা আপাতঃ প্রত্যাহৃত অবস্থা সরকারের সিদ্ধান্ত না পরিচালক ও নির্মাতাপক্ষের আত্মরক্ষামূলক অবস্থান তা এখনো পরিষ্কার নয়। ভলতেয়ারের আপ্তবাক্য স্মরণ করাটা এক্ষেত্রে জরুরি মনে করছি: ‘তোমার মতের ব্যপারে আমি একমত নাও হতে পারি। কিন্তু তোমার মতকে রক্ষা করতে আমি প্রয়োজনে জীবন দেব।’ গণতন্ত্রের এর চেয়ে সুন্দর চরিত্র আর কিছুই হতে পারে না। কাজেই ‘মেহেরজান’ ছবির স্বাভাবিক প্রদর্শনী ও প্রচারের পক্ষে আমাদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেই এ ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষন ও সুস্থ বিতর্কে জড়ানোও আমার নাগরিক অধিকার বৈকি।

বস্তুত: গত ২৬শে জানুয়ারি ‘প্রথম আলো’র উপসম্পাদকীয় পাতায় সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘মেহেজান’ বিষয়ে রোবায়েত ফেরদৌস, মাহমুদুজ্জামান বাবু, কাবেরী গায়েন ও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নিবন্ধে ও পাশাপাশি এই চলচ্চিত্রের নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের বক্তব্য (Click This Link)পাঠের প্রেক্ষিতে নির্মাতাকে উদ্দেশ্য করে পাঠক হিসেবে আমাদের ভেতর কিছু বেদনাবিদ্ধ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০১০-এ ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর উইক এণ্ড ম্যাগাজিনে তিন কিস্তিতে প্রকাশিত রুবাইয়াতের নিবন্ধ ‘দ্য স্পিরিচ্যুয়ালিটি অফ সিনেমা’ পাঠক হিসেবে আমাদের আন্তরিক ভাবে মোহিত, মুগ্ধ করেছিল। একজন তরুণ ও নারী নির্মাতা হিসেবে রুবাইয়াতের পঠন-পাঠন, পরিশ্রম করার ক্ষমতা ও সঙ্কল্পকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিবাদন জানিয়ে, খুব নম্রভাবেই এ ছবির পরিচালকের কাছে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো তুলে ধরতে চাইছি:

১. প্রিয় রুবাইয়াৎ, ‘প্রথম আলো’র উপসম্পাদকীয় পাতায় আপনার নিবন্ধের শুরুতেই আপনি বলেছেন ‘মেহেরজান একাত্তরের নারীপ্রধান একটি আখ্যান। এই আখ্যানে রয়েছে সেই নারীদের গল্প, যাঁরা নিজেদের মতো করে যুদ্ধ করেছেন- কখনো হয়তো বন্দুক ছাড়াই; অহিংসার পথে রক্ষা করেছেন আত্মসম্মান।’
রুবাইয়াৎ, অহিংস পথে আত্মসম্মান রক্ষার বিষয়টি আপনি যদি একটু বিশদভাবে বুঝিয়ে দিতেন, তবে বড় উপকৃত হতাম। বীরপ্রতীক তারামন বিবি, খাসিয়া নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি বা বরিশালের নূরজাহান বেগম যিনি চোদ্দ বছর বয়সে রাইফেল চালনা করে, রজ:স্বলা হবার পূর্বেই পাক বাহিনী কর্তৃক ধৃত ও ধর্ষিতা হয়ে যুদ্ধের পর পর পিতার বয়সী একজনকে বিয়ে করতে বাধ্য হন এবং ইতোমধ্যে তাঁর মৃত্যু না হয়ে থাকলে ঢাকার কোন বস্তিতে দাইগিরি করে জীবন চালাচ্ছেন (‘বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ’ কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা নারীদের উপর প্রকাশিত গ্রন্থটি এ প্রসঙ্গে বিশেষ দ্রষ্টব্য), এদের কারোরই আসলে অহিংস পথে আত্মসম্মান রক্ষার কোন উপায় ছিল না। এমনকি সহিংস পথ বা ‘বন্দুক’ ধরেও সবসময় আত্মসম্মান রক্ষা করতে পারেন নি তাঁরা। নারী হিসেবে অহিংস থাকার একটাই অর্থ ছিল একাত্তরে...আর তা’ হলো ধর্ষিতা হওয়া!
২. আপনি আপনার লেখায় আরো উল্লেখ করেছেন যে ‘নীলিমা ইব্রাহিম তাঁর ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’র ভূমিকায় ৩০-৪০ জন মেয়ের উল্লেখ করেছেন, যাঁরা আত্মসমর্পণকারী বা বন্দী পাকিস্থানী সৈন্যের সঙ্গে ভারতে চলে গিয়েছিল (আমি বীরাঙ্গনা বলছি, নীলিমা ইব্রাহিম, জাগৃতি, ১৯৯৮)।’ কিন্তু এতে কি প্রমাণিত হলো রুবাইয়াৎ? আপনার এই লেখার পরপরই ২৬ শে জানুয়ারি ‘প্রথম আলো’ ব্লগে এক পাঠিকা মন্তব্য করেছেন যে নারী হিসেবে আপনি কি বোঝেন না কোন্ বেদনায় তাদের চলে যেতে হয়েছিল? সমাজ তাদের আর গ্রহণ করবে না। কাজেই পাকিস্থানী সৈন্যের ঘরে গিয়ে বধূ, রক্ষিতা বা গৃহ পরিচারিকা...যে স্থানই লাভ হোক...সেই অনিশ্চিত অন্ধকারে তাদের ঝাঁপ দিতে হয়েছে। এ কি কোন প্রেমের যাওয়া? বাংলাদেশে বসবাস ও কর্মরত বিদেশী সমাজসেবী থেরেশ ব্লশের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে কিভাবে যুদ্ধ নয়, স্রেফ দারিদ্র্যের কারণে শয়ে শয়ে বাংলাদেশী নারীকে প্রতিবছর পাচার হতে হচ্ছে ভারত ও পাকিস্থানে। উত্তর ভারতীয় বর্ণ হিন্দু পুরুষ বা পাকিস্থানী ‘শরীফ’মুসলমান পুরুষের বধূ, রক্ষিতা বা গৃহপরিচারিকার জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। তবু, তারা দেশে ফিরতে চাইছেন না। কারণ তারা জানেন যে ফিরলে আরো নিদারুণ প্রতিকুল অবস্থায় তাদের পড়তে হবে।

৩. বড় বেদনার সাথে লক্ষ্য করলাম আপনি আপনার নিবন্ধ ‘মেহেরজান যা বলতে চেয়েছে’-এ আভাসে ইঙ্গিতে বাংলাদেশে দুই লক্ষ নারী আদৌ ধর্ষিতা হয়েছে কিনা তেমন সন্দেহ ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। এই সন্দেহের পক্ষে আপনার প্রদত্ত যুক্তি হলো ১৯৭৭-১৯৮৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দলিলপত্র-এ মোট ২২৭ জনের মধ্যে ২৩ জন নারীর সাক্ষ্য গৃহীত হয়েছে। এদের ভেতর মাত্র ১১ জন যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এতে কি প্রমাণিত হলো? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতায় ‘তিন লক্ষ’কে ভুলে ‘থ্রি মিলিয়নস্’ বা ‘ত্রিশ লক্ষ’ বলা নিয়ে কিছু গুঞ্জন বাতাসে রয়েছে। ধরা যাক ত্রিশ লক্ষ নয়, তিন লক্ষ মানুষই শহীদ হয়েছেন। ২৫ শে মার্চ ১৯৭১-এ এক রাতে পাকবাহিনী দুই থেকে আড়াই লক্ষ মানুষ হত্যা করলে বাকি আট/নয় মাসে আরো পঞ্চাশ হাজার সারা দেশে মরেছে নিশ্চয়। অবশ্য সারা দেশে আজো নিত্য নতুন যত গণকবর আবিস্কৃত হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে যত গণহত্যার বিবরণ রয়েছে, তাতে ‘ত্রিশ লক্ষ’ কোন অসম্ভব অঙ্ক বলে মনে হয় না। কিন্ত আট খণ্ডের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দলিলপত্র-এ যদি গণহত্যার ভিকটিম পরিবারের বেঁচে যাওয়া বা প্রত্যক্ষদর্শীদের ভেতর থেকে পুরুষ সাক্ষীই পাওয়া যায় মাত্র ১৯৪ জন (২৩ জন নারী বাদ দিলে), তাহলে অবাক হবার কি আছে যে অসম্ভব পুরুষতান্ত্রিক সংস্কারের এই দেশে ২৩ জনের বেশি নারী স্বাক্ষী পাওয়া যাবে না, যাদের ভেতর আবার মাত্র ১১ জনই যৌন নিপীড়নের কথা বলবেন? নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’বা আইন ও সালিশ কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত ‘নারীর একাত্তর’ গ্রন্থেই প্রচুর ধর্ষিতা নারীর কেস স্টাডি রয়েছে। আপনার নিজের লেখাতেই আপনি বলছেন যে ‘গর্ভপাতের সংখ্যা ২৩ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং যুদ্ধশিশুর সংখ্যা ৪০০ থেকে ১০ হাজারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে আসতে না পারায় বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়।’ রুবাইয়াৎ, আপনার লেখার এই পংক্তিটি বসনিয়া হার্জেগোভিনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেখানেও ঠিক কি পরিমাণ গর্ভপাত হয়েছে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা অক্ষরে অক্ষরে পাওয়া যায় নি। কিন্তু সার্ব সৈন্যদের ধর্ষণের ফলে সৃষ্ট ভ্রুণ হত্যায় সেখানকার নারীরা ব্যপক হারে গর্ভপাত করিয়েছেন, একথা সত্য। কিন্তু,ধরা যাক, একজন ধর্ষিতা ও ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী নারী গর্ভপাত করিয়ে এ ব্যপারে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না, কথা বলতে চাচ্ছেন না...সেক্ষেত্রে আমরা কি ধরে নেব যে ধর্ষণের অভিযোগটি সার্ব (কিম্বা, পাকিস্থানী সৈন্য) সম্পর্কে ভিত্তিহীন? ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বেশ কিছু যুদ্ধশিশু যারা বাইরের দেশগুলোয় বিদেশী পিতামাতার ঘরে দত্তক সন্তান হিসেবে মানুষ হয়েছেন, বয়:প্রাপ্ত হয়ে তারা এদেশ ঘুরেও গেছেন। তাদের সাক্ষাৎকারও আমরা পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। এর পরও আপনার সন্দেহ? কয়েক বছর আগে ভারতীয় তাত্ত্বিক শর্মিলা বোস এমনি মন্তব্য করেছিলেন যে ১৯৭১-এ বাংলাদেশে পাক বাহিনী কর্তৃক নারী ধর্ষণের বিষয়টি অবাস্তব ও অতিরঞ্জিত। অদ্ভুত ব্যপার হলো, শর্মিলাও মাকির্নী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক। ’৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্থানের পক্ষ নিয়ে এদেশে সপ্তম নৌবহরও পাঠাতে চেয়েছিল, যা নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো দানের দরুণ সম্ভব হয় নি। যুদ্ধের চল্লিশ বছর পরও এই উপমহাদেশের বিদ্যার্থীরা যখন মার্কিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন ক্ষয়-ক্ষতি, হত্যা বা ধর্ষণের পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে, তখন ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’ আক্রান্ত হতে হয় বৈকি! অথচ, ২৬শে মার্চের এক সকালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে পাক বাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছেন অন্তত: পঞ্চাশ থেকে ষাট জন ছাত্রী, হলে থাকা মেয়েদের খোঁজ নিতে আসা সত্তর বছরের নানী-দাদি থেকে সাত বছর বয়সী ছোট বোণেরা পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষিতা বাঙালী নারীর স্তন কেটে ফুটবল খেলা, ধর্ষিতা ও পিপাসার্তা নারী পানি চাইলে তাদের মুখে পাক বাহিনীর প্রস্রাব করার বিবরণ আছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রচিত ‘শেখ মুজিব’ সহ একাধিক বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থে। শাহীন আখতারের ‘তালাশ’ উপন্যাসেও ক্যাম্পে অবরুদ্ধ বাঙালী নারীর স্তন বা বগলে পাক সৈন্যের পুরুষাঙ্গ মর্দন সহ বিকৃত নানা যৌনাচারের প্রসঙ্গ পড়লে শিউরে উঠতে হয়! সেই সব নির্যাতনের উল্লেখের ধার-কাছে না গিয়ে আপনার ছবির ‘নীলা’ বলে যে পাক বাহিনীই তাকে প্রথম ধর্ষণ করেনি। করেছে ‘ছাত্র ইউনিয়নে’র ছেলেরা। হায়, এই সংলাপের মাধ্যমে মতিয়া-মেননের নেতৃত্বের ষাটের দশকের উদ্দীপ্ত ও আদর্শবাদী তারুণ্যের...বাংলাদেশ যে সততা ও ইষ্পাতদৃঢ়, যে ইসক্রা বা আগুনের ফুলকিসম তারুণ্য আর ফিরে পায় নি...সেই তারুণ্যের ইতিহাসের প্রতি আপনার ছবি চেতনে অথবা অবচেতনে, জ্ঞানে অথবা নির্জ্ঞানে প্রকাশ করলো অবজ্ঞা ও অসম্মান!
(আর ধর্ষিতা নারীর ‘যৌনাকাংখা’ থাকতে পারে বলে ইতোমধ্যেই ফেসবুকে কিছু লেখা পড়ছি। শত্রু সৈন্যের ক্যাম্প থেকে সদ্য ফেরা কোন ধর্ষিতা নারীর কতটুকু ‘যৌনাকাংখা’ থাকতে পারে, এ ব্যপারটা কল্পনা করতেও আমাদের মত ‘অ-উত্তরাধুনিক ও নেহায়েৎ সাধারণ তরুণ তরুণীদের যে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে! আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে আমাদের যে পূর্বপুরুষেরা রক্ত দিয়ে আর যে পূর্বনারীরা সম্ভ্রম দিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা তুলনামূলক স্বাধীন ও নিরাপদ দেশ বা রাষ্ট্র উপহার দিয়ে গেছেন, যে দেশে আমরা অন্তত: আর গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকার হই না, সেই স্বাধীন দেশে বসে এখন ত’ কত থিসিস রচনা করা যেতেই পারে, ফেসবুকে কত বিতর্ক তোলা যেতেই পারে যে ‘ধর্ষিতার’ও যৌনাকাংখা থাকে এবং সেই যৌনাকাংখা প্রকাশ করাই তার চরিত্রের বিপ্লবী দিক। নারীর ‘ফ্রিডম অফ সেক্স্যুয়ালিটি’র কথা বলে নিজেদের আমরা কতই না র্যা ডিকাল ভাবছি! হায়, একাত্তরের ধর্ষিতারা যারা মারা গিয়েছেন তারা নিশ্চিত তাদের কবরে শিউরে উঠেছেন এতক্ষণে! এত বড় বিদ্রুপ, এত বড় অবমাননা আমরা তাদের কি করে করছি? তাদেরই হারানো সম্ভ্রম ও আব্রু পায়ে দলে?)
৪. ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘নারীর একাত্তর’-এ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সাক্ষাৎকার আপনি উদ্ধৃত করেছেন। শুধু পাকিস্থানী সৈন্য নয়, বিহারি, আগাখানি, বাঙালি রাজাকার সবাই তাঁর অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়েছে ও পাকিস্থানী মেজর আলতাফ করিম তাঁর জীবন বাঁচান বলেও আপনি উল্লেখ করেছেন।

রুবাইয়াৎ, ব্যক্তিগত ভাবে একজন পাকিস্থানী সৈন্য ভাল আচরণ করতেও পারেন। বাঙালি নারীর অসহায় অবস্থার সুযোগও বাঙালি রাজাকার নিতে পারেন। কিন্তু আপনার ছবির সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক দিক হলো মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্র চিত্রণ। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা এখানে যুদ্ধ না করে নারী সঙ্গে কাতর ও উন্মুখ। অথচ, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে চিরদিনের মত পঙ্গুত্ব বরণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আজো আলাপ করলে জানা যায় কিভাবে দিনের পর দিন গাছের ফল বা ক্ষুধার কৃত্রিম বড়ি খেয়ে তারা দু:সাধ্য সব অপারেশনে নেমেছেন। আজো তারা অশ্রুজলে স্মরণ করেন কবে ও কোথায় তাঁরা পাক বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করেছেন নগ্ন ও ধর্ষিতা বাঙালী মেয়েদের!
৫. বিশিষ্ট নারীবাদী চলচ্চিত্র তাত্তিক লরা মালভি তাঁর ‘ফেমিনিজম ইন সিনেমা’ গ্রন্থে বারবার বিরোধিতা করেছেন ‘মেল গেইজে’র যে গেইজে পুরুষের চোখে নারীর ‘যৌনবস্তু’ আবেদন ফুটিয়ে তোলা হয়। আপনি নারী পরিচালক হয়েও নায়িকা ‘মেহেরজানে’র কস্টিউম ও সাজগোজে সেই ‘মেল গেইজ’-এর কোন পরিবর্তন হয় নি। সত্যি কথা বলতে, এই ছবির প্রিমিয়ার শো-এর আগেই ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় ‘মেহেরজান’-এর একটি দৃশ্যের ছবি দেখে প্রথমে আমরা খুবই অবাক হয়ে গেছিলাম। ঐ যেখানে কাদাজলে বসা ‘মেহেরজানে’র শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে স্লিভলেস ব্লাউজে একটি স্তন অনাবৃত, মুখোমুখি তার বালুচ সৈন্য। দেখুন, সোফিয়া লোরেন ‘টু উইমেন’ ছবিতে ধর্ষিতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর’-এ বেশ কিছু ধর্ষিতা নারীর ছবি আছে যা দেখে শিউরে উঠতে হয়। কিন্তু যুদ্ধ, দাঙ্গা, খরা, বন্যা, জলোচ্ছাস, দূর্ভিক্ষ সহ প্রাকৃতিক বা মানবিক কোন বিপর্যয়ে তরুণী নারীর আলোকচিত্র বা ভিডিও ফুটেজ ব্যবহারের এ্যাঙ্গেল দেখেই বোঝা যায় কোথায় নারীটির প্রকৃত অসহায় অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে আর কোথায় এই মর্মন্তুদ পরিস্থিতিতেও তার শরীরকে ক্যামেরায় ‘মেল গেইজ’ বা পুরুষ চোখের উপাদেয় পণ্য করে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা খুব দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে ‘মেহেরজান’-এর এই দৃশ্যে মনে হয় নি যে নায়িকা কোন বাস্তব সঙ্কটে আছে। ১৯৭১-এর ঐ ভয়াবহ দিনগুলোয় সর্ষে ক্ষেতে নায়ক-নায়িকার হাঁটা, নৌকায় ঘোরা, জলক্রিড়া...সবই ভারি অদ্ভুত! কাদা-জলে নায়িকার পোশাকের এই আপাত: বিস্রস্ত দৃশ্য যেন রঙ্গময় বিধাতা পুরুষ নায়কের কাছে নায়িকার সৌন্দর্য ও যৌনাবেদন পুরোপুরি উন্মোচন ও তাদের প্রণয় ঘনীভূতকরণের জন্যই নির্মিত। আমাদের বড় দূর্ভাগ্য এই যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি নারী হলেও তার মন্ত্রীপরিষদ, সেনাবাহিনী, সংসদ, আদালত, সংবাদমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন ও সুশীল সমাজ যেমন থাকে পুরুষশাসিত, একইভাবে নারী যদি চলচ্চিত্র পরিচালকও হয়, সেই ছবির প্রযোজক, স্ক্রিপ্ট লেখক, ক্যামেরা ক্রু, এডিটিং প্যানেল, ডিস্ট্রিবিউটর্স ও সর্বোপরি ভোক্তা শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সিদ্ধান্ত নির্মাতা অংশত পুরুষ। তাই, লরা মালভি ও তার মাতা মাতামহীরা মিলে হাজারো ‘মেল গেইজ’-এর বিরুদ্ধে লিখেও বিশেষ সুবিধা করতে পারবেন বলে ত’মনে হচ্ছে না। গোটা সিনেমা জুড়েই ‘মেহেরজান’কে আঁটোসাঁটো কামিজ, গলায় ওড়না ঝুলিয়ে চলা-ফেরা করতে দেখা গেছে। যদিও ’৭১ সালেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েই কৈশোরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই শাড়ি পরতেন। কিম্বা, সালোয়ার-কামিজ পরলেও ভয়ানক যুদ্ধের ভেতর অমন গলায় ওড়না দুলিয়ে গ্রামের রাস্তা জুড়ে চলা-ফেরা করা বেশ অকল্পনীয় ব্যপার বলেই মনে হয়। এ ব্যাপারেও আপনার কাছ থেকে সামাণ্য উত্তর যদি আমরা পেতাম!
৬. প্রিয় রুবাইয়াৎ, আপনি আরো লিখেছেন যে ‘শত্রু’“রেখার ওপারে নারী-পুরুষের প্রেম বাংলা ভাষায় ও সারা বিশ্বের কথাসাহিত্য, কবিতা, চলচ্চিত্র বা নাটকের চিরন্তন বিষয়।’হ্যাঁ, অস্বীকার করছি না। দস্তয়েভস্কি সহ অনেক রুশ লেখকই যাঁর ‘ওভারকোট’ থেকে জন্ম নিয়েছেন, সেই নিকোলাই গোগোলের ‘তারাস বুলব্যা’-য় কসাক যোদ্ধা তারাসের ছোট ছেলে আন্দ্রে পোলিশ তরুণীর প্রেমে পড়ে স্বপক্ষ ত্যাগ করলে ক্রুদ্ধ পিতা আপন পুত্রকে সমরাঙ্গনে হত্যা করে। ‘প্রথম আলো’র ব্লগ পড়ে কৌতুক বোধ করেছি যখন অনেকেই আপনার পক্ষে যুক্তি দান করতে গিয়ে মুম্বাই মশালা ছবি ‘বীর-জারা’র প্রসঙ্গ তুলেছেন। শেষমেশ আপনার ছবিকে যারা সমর্থন করছেন, তাদের বীর-জারার মতো উদ্ভট বলিউডি ছবির রেফারেন্স টানতে হচ্ছে...এটাই দুঃখজনক।
শত্রুরেখা’র ওপারে নারী-পুরুষের প্রেম কখনোই দোষনীয় নয়। গোগলের ‘তারাস বুলব্যা’-য় শত্রুপক্ষের পোলিশ তরুণীকে উদ্দেশ্য করে রুশ সেনা আন্দ্রের প্রেমোচ্চারণ আজো বড্ড শ্রুতিমধুর। কিন্তু, তাই বলে গোগল গোটা রুশ বাহিনীর সব সৈন্যকে মন্দ চরিত্রের দেখাতে যান নি। আন্দ্রেরই ভাই অস্তাপ ও পিতা তারাসের প্রবল আত্মোৎসর্গ...দেশমাতৃকার জন্য...সেখানে দেখানো হয়েছে। আপনার চলচ্চিত্রের তিন জন মুক্তিযোদ্ধার অন্তত: একজনের চরিত্রে সে গুনের উপস্থিতি দেখা গেলে জন প্রতিক্রিয়া, বিক্ষোভ ও রোষ এত তীব্র হতো না!
৭. নানাজানের চরিত্রের স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’র নিখিলেশ চরিত্রটির কথা উল্লেখ করেছেন। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের জন্য রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা ও সমালোচনা দুই-ই প্রাপ্য। প্রশংসা একারণে যে বাঙালী বর্ণহিন্দু শ্রেণী নিয়ন্ত্রিত স্বদেশী আন্দোলনের সাথে সমাজের দরিদ্র চাষী ও বিশেষত: মুসলমান কৃষক শ্রেণীর বিচ্ছিন্নতা গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। সমালোচনা এ কারণে প্রাপ্য যে সন্দ্বীপের মতো ভোগী, শঠ ও নিষ্ঠুর চরিত্র দিয়ে সুভাষ চন্দ্র বসু, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশ, প্রীতিলতা বা কল্পনা দত্তদের রক্ত ও আত্মত্যাগকে ঢাকার চেষ্টা করে রবীন্দ্রনাথ অসম্ভব অন্যায়ও করেছেন বৈকি ইতিহাসের সাথে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের জন্যই ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলার দরিদ্র মুসলিম, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য তা’বিশেষ ফলপ্রসূ হয় নি। তাই বলে একাত্তরের রণাঙ্গনে সব মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগকে অস্বীকার করা যায় না। কাজি নজরুল ইসলাম যখন ‘অগ্নিবীনা’লিখে কারারুদ্ধ বা শরৎচন্দ্রের ব্রিটিশ বিরোধী উপন্যাস ‘পথের দাবি’ ঔপনিবেশিক সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে, নিখিলেশের মুখ দিয়ে অহিংসা ও ভাববাদী নানা কথা বলিয়ে রবীন্দ্রনাথ পরোক্ষে ব্রিটিশের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন বৈকি।

৮. আপনার লেখার একদম শেষে এসে আপনি বলছেন যে আপনার এই ছবি ‘বাঙালী মুসলমানের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান।’ এবার সত্যিই অবাক হলাম। এ ছবি তবে কার? নারীর? না, কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠির? আপনার ছবির প্রচারণায় একবার বলা হচ্ছে যে এটা মুক্তিযুদ্ধে নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের ছবি। আবার, ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত আপনার নিবন্ধের শেষে বলা হচ্ছে যে ‘বাঙালী মুসলমানের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান কোন অপরাধ হতে পারে না।’অপরাধ কে বলছে রুবাইয়াৎ? যে কোন জাতি বা এমনকি ধর্মীয় গোষ্ঠিরও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করার ‘অধিকার’ আছে। ইস্রায়েলের ইহুদিরাও সেই যুক্তির আওতায় বলতে পারে যে তাদের ‘ইহুদি’পরিচয় বিষয়ে আত্ম-অনুসন্ধানের অধিকার আছে। বিজেপির ‘গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়’ শ্লোগানও এই ‘অধিকার বোধে’র আওতায় একভাবে বৈধ ত’ বটেই! কিন্তু, পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থের রচয়িতা পুরুষ ও উক্ত ধর্মগ্রন্থগুলোয় শুদ্রের অবস্থানে পতিত নারীর হাল কি এক? ইহুদি পুরুষেরা ঈশ্বরের কাছে সকাল বিকাল ধন্যবাদ জানায় তাদের নারী না বানানোর জন্য। মনুর সংহিতায় নারী নরকের দ্বার। ইসলামেও বেহেশতে পুরুষের অগ্রাধিকার। খ্রিষ্ট ধর্মেও নারীর হীনাবস্থার ব্যত্যয় নাই। পশ্চিমে সাদা, খ্রিষ্টান নারীকে সাদা ও খ্রিষ্টান পুরুষের সাথে বিস্তর লড়াই করে ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার পর্যন্ত আদায় করতে হয়েছে। হিন্দু বা মুসলিম নারীদেরও একই লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে বা হচ্ছে! পুরুষ কি আপনাকে এম্নি এম্নি একফোঁটা কিছু দেবে? নারী যে সব ধর্মগ্রন্থেই চিরশুদ্র, রুবাইয়াৎ! আর ১৯৭১-এর যুদ্ধে শুধু বাঙালী মুসলমান নারী ত’ ধর্ষিত হয় নি! পাক বাহিনীর অনেকেই এদেশে এসেছিল ‘হিন্দু’ বা ‘অর্ধ-হিন্দু বাঙালী মুসলমানে’র সাথে যুদ্ধ করতে। গণহত্যার মতোই গণধর্ষণের শিকারও জনসংখ্যা অনুপাতে সবচেয়ে বেশি হয়েছে হিন্দু নারী। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় একাত্তরের যুদ্ধের সময় এদেশে জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ২০ ভাগের কাছাকাছি হলেও ধর্ষিতা নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল বাঙালী হিন্দু অবিবাহিতা নারী (৪৪% ভাগ)। এরপর পর্যায়ক্রমে এসেছে বাঙালী মুসলিম অবিবাহিতা, বাঙালী হিন্দু বিবাহিতা, বাঙালী মুসলিম বিবাহিতা ও আদিবাসী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সহ অন্যান্য জনগোষ্ঠির নারীরা। সাঁওতাল, রাখাইন, চাকমা...কে ধর্ষিতা হয় নি? ধর্ষণের মুখ্য টার্গেট অবশ্যই হয়েছে বিবাহিতার বদলে অবিবাহিতা তরুণীরাই বেশি। এ-ও পুরুষতন্ত্রের আর এক সংস্কার বৈকি! অনাকর্ষিত মৃত্তিকার মতো অনাকর্ষিত নারী দেহের লোভ! এখন তবে ‘ধর্ষিতা’ হওয়ার যুক্তিতে বাঙালী মুসলমানের পাশাপাশি বাঙালী হিন্দু, সাঁওতাল, রাখাইন, চাকমা...সবাই ‘আত্মপরিচয়ে’র অনুসন্ধান করুক! দুঃখজনক রুবাইয়াৎ! আমরা যারা একাত্তর দেখি নি, তবে একাত্তরের গল্প শুনেছি আমাদের মা বাবাদের কাছ থেকে, আমরা জেনেছি যুদ্ধের ঐ ন’টা মাস এ দেশের সব মানুষ একাত্ম -একপ্রাণ হয়ে লড়াই করেছে। সেদিন দেশের জন্য রক্ত ঢালা পুরুষ বা ধর্ষিতা কুমারীর রক্তে ভেদ করা যায় নি যে কোন্ রক্ত কার? আজ তবে এই ভেদরেখা কেন? ফকির লালন সাঁই কি কম দুঃখে বলেছেন যে পৈতা দিলে যদি ব্রাক্ষণ হয়, তবে তিনি বামনী কি প্রকারে চিনবেন? কিম্বা, সুন্নত দিলে যদি হয় মুসলমান, মুসলমানীর কি হবে? ধর্মগ্রন্থগুলো যে পুরুষের রচনা, এ কথা বহু আগেই সাহস ভরে বলে গেছেন বেগম রোকেয়া! নারীর আত্মপরিচয়ের মীমাংসা ত’ তাই শাস্ত্র-শরিয়তের লক্ষণ রেখা ছাড়িয়েই শুরু হবার কথা।
ব্যক্তিগতভাবে যারা আপনার ছবি বাজেয়াপ্ত করা বা আপনাকে গ্রেপ্তারের কথা বলছে, তাদের দাবির প্রতি কঠোর ভিন্নমত পোষণ করেই আমরা এ লেখাটি শেষ করছি।
পরিশেষে আবারো এক তরুণ, মেধাবী লেখক ও পরিচালক হিসেবে আপনাকে অভিবাদন।

৩০ শে জানুয়ারি ২০১১।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29317249 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29317249 2011-01-30 17:32:08
আসিতেছে... শুদ্ধস্বরের প্রকাশনায় অপর বাস্তব-৫ http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29316546 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29316546 2011-01-29 13:31:54 এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে
কারখানায় আগুন লাগার পর কলাপসিবল গেটগুলি লাগিয়ে দিয়ে সটকে পড়ে মালিকপক্ষ। কেন এ কাজ করা হয় তার পক্ষে জোরালো যুক্তি আছে তাদের। কর্মীদের নেমে যাওয়ার হুড়োহুড়িতে মালিকের মূল্যবান সম্পদের ক্ষতিসাধন যেন না হয়! আর এভাবে জীবন্ত কয়লা হয়ে যায় একজন মা, বাবা, একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। অর্থনীতিতে মা বাবা বলে কিছু নেই, আছে সস্তা শ্রমিক। তারা এতটাই সস্তা যে ইট কাঠ পাথরের দামও তাদের চেয়ে অনেক বেশি। প্রবৃদ্ধির গতি চক্রাকারে বাড়ে, ফুলে ফেপে ওঠে অর্থসম্পদ অথচ শ্রমিকদের বাচিয়ে রাখার মানসিকতাটুকুও তৈরি হয় না। বাজার দরের সাথে সঙ্গতিহীন অন্যায্য যে মজুরিকাঠামো ঘোষিত হয় তা বাস্তবায়নেও মাসের পর মাস টালবাহানা চলতে থাকে। মালিকের হিসাব সোজা। এত লোক আছে এ দেশে যে একপাশ থেকে মারতে শুরু করলেও সবার মরতে অন্তত একশ বছর লেগে যাবে। সম্পদের পাহাড় গড়ে চোখে ঠুসি লাগিয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়া যে জানোয়ার আগুনে জ্বেলে দেয় মনুষ্যত্ব-তাদের হত্যা করতে হবে।

২ মাসের বিরামহীন নির্যাতন-কারাবাসে বিপুল পরিমাণ প্রাণশক্তি ক্ষয় করিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের কন্ঠ মন্টু ঘোষকে। গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের আরেক কন্ঠ মোশরেফা মিশুকে। কোর্ট একটি মামলায় মিশুকে দুইদিনের রিমান্ড দিয়েছে। আগামীকাল আরো হবে। এযাবত কারখানার গেটে তালা কিংবা ব্যবস্থার অভাবে শতশত শ্রমিক নিহত হয়েছে, কোন মালিকের বিচার হয়নি। হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে কোন মালিক শাস্তি পায়নি। যৌন নিপীড়ন, মারপিট, মজুরি না দেয়ার অপরাধেও কোন মালিকের শাস্তির নজির নেই। এগুলোর প্রতিবাদ করলে শাস্তি দিতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আইন আর মাস্তানির অভাব নাই। রাষ্ট্রকে জানোয়ার বললে বা হত্যা করার আহ্বান জানালে নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রদোহিতা হয়, তাই এরকম কিছু বলছি না!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29291086 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29291086 2010-12-16 23:52:28
অন্যমনস্ক শরৎ ও কবিতা সর্ম্পকে এক অনন্য বয়ান
কবিতা মানুষের মত, মাঝে মাঝে তার নিজের একটি রাষ্ট্র, একটি দেশের বাড়ী অথবা একটি ঋতু এমন নানান কিছুর প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন সে হয়ত নিজেকে গণ্য করে কোন বিশেষ গোত্রের একজন সদস্য হিসেবে অথবা কখনো কখনো নিজেই একটি গোত্র তৈরি করতে চায়, গোত্রের দলপতিও হতে চায় মাঝেসাঝে। একটি কবিতা অন্য একটি কবিতার সাথে কথা বলে; প্রতিবেশীর মত দুঃখ সুখ ভাগাভাগি করে নেয়, প্রতিযোগীতা করে, ঈর্ষা করে, ভালোবাসে আবার একাও থাকে। এ সবকিছুর পরও কবিতা আসলে কথা বলতে চায়, অন্য মানুষের সাথে যেমন কবিতার সাথেও। প্রতিটি মানুষ আলাদা, অনন্য তার কবিতাও তেমনি আলাদা, অনন্য। কারো সাথে কারোটা মেলানো যায় না, আবার চাইলে মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে হয়ত একদিন সবাই নিজের অনন্য কবিতাটি লিখবেন, অথবা অন্যকে জানাবেন। কথা বলতে শুরু করবেন।

আমি কথা বলতে শুরু করি উনিশ বছর বয়স থেকে, এর আগেও আমি কবিতা লিখেছিলাম কিন্তু কথা বলতে পেরেছিলাম বলে আত্মবিশ্বাস জাগেনি। ‘নিরক্ষরতার কবিতা’ লিখতে যেয়ে প্রথমবার মনে হয়েছিল আমি হয়ত কথা বলতে শুরু করেছি। কবিতাটি দীর্ঘ, কথা বলার জন্য আমার দীর্ঘ কবিতার দরকার হয়েছিল। তবে সবসময় আমার দীর্ঘ কবিতার প্রয়োজন হয়নি।

কবিতায় কথা বলার বিশেষ একটা ধরন রয়েছে, যেটাকে পুরোপুরি বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে অনুমান করি। কবি, পাঠক, সমালোচক যেটাকে কাব্যময়তা বলেন, পরিশেষে অনুভূতিই যেটার বিচারক। মানুষের ভালোবাসার যেমন বিচার করা সম্ভব হয় না তারপরও আমরা যেমন সেটার বিচার করি। তেমনি কবিতারও বিচার হয়, মানুষের মতই। সময়ের সাথে সাথে আইন আর বিচার পাল্টায় কেউ শাস্তি পান, কেউ সম্মানিত হন। কবিতা উত্তীর্ণ হয়, কবিতা বাতিল হয়ে যায়। কেউ কেউ ভাষাকে, কাব্যময়তাকে, ব্যাকরণকে আমূল পাল্টে দেন আর আমরা নতুন একটি বিশ্বে প্রবেশ করি। নতুন বিশ্বের আনন্দ, উত্তেজনা, ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে মেতে উঠি।

আবার একই ঘরে থাকতে থাকতে আমাদের কান্তি আসে, আমরা পরস্পরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেই। তখন আর আলাপ গল্পগুলো জমে ওঠে না, আমরা অনুসন্ধান বন্ধ করে দেই। পরিশ্রমী শ্রমিকের খুঁজে পাওয়া খনিতেই বারবার যাই, তাকে উপাসনা করি। অনুসন্ধানহীন থাকা মানুষের জন্য একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, যদিও আমাদের অনেকেই এই পরিস্থিতিতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠি।

মানুষ যেহেতু কেবল কবিতা নিয়েই বসবাস করেনা সেহেতু নতুন উপলব্ধি নতুন বিশ্লেষণ কখনো কখনো কবিতার অস্তিত্ব, কবিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে অন্য ধরণের গুরুত্ব বহন করে, কখনো কবিতার রসদ হয়ে ওঠে। আমি কবিতার সদা অস্তিত্বমানতায় বিশ্বাস করি। কবিতার বেঁচে থাকায় বিশ্বাস করি। বিশ্বাস, কল্পনার মত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, দুরূহ স্বপ্নকেও কবিতার অরে বন্দি করে। কবিতার সাথে কবিতার, শিল্পের সাথে শিল্পের, মানুষের সাথে মানুষের, কথা শুরু হয়।

প্রতিটি নতুন কবিতা লিখতে যেয়ে আমার একই সাথে দুটো অনুভূতি হয়। প্রথমটি হল, মনে হয় যেন জীবনে প্রথমবার কবিতা লিখছি, দ্বিতীয়টি হল আর কোনদিনই আমাকে দিয়ে কবিতা লেখা সম্ভব হবে না। এভাবেই আমি লিখি, পরস্পর বিরোধী উপলব্ধি নিয়ে।

পুরো একটা দশকের কবিতাকে মিলিয়ে কবিতার নিজস্ব কোন মাতৃভূমি তৈরি নাও হতে পারে। তবে কবিতার পড়তে পড়তে জমতে থাকা অরসমূহ ভরা জোয়ারেও চর তৈরির ইঙ্গিত দেয়। সেই অর্থে এই বই আমার কবিতা সমূহের সংকলনও বটে। কবিতা সমূহের বিন্যাস ও ধারাবাহিকতায় এই অভিযাত্রার ছাপ থাকবে বলে প্রত্যাশা করি।

পরিশেষে বইয়ের সমস্ত কবিতা কথা বলতে চাওয়ার পুরোনো আকাঙ্খার প্রকাশ। আশা করছি এই অভিযাত্রায় কবিতার মিথষ্ক্রীয়া জমে উঠবে।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29100309 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29100309 2010-02-18 13:31:04
১৪ সেপ্টেম্বর অন্যরকম এক হরতাল, সফল করুন তবে সবার আগে আমিও হরতাল সর্বাত্মকভাবে সফল করার আহবান জানাচ্ছি। এ হরতাল আসলেই অন্যরকম। মডেল পিএসসি ২০০৮ এর আলোকে জনদরদী আওয়ামী লীগ সরকার যেসব শর্তে দুই বহুজাতিক কোম্পানীকে সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানের দ্বায়িত্ব দিয়েছেন তা ভয়াবহের থেকেও ভয়াবহ। ভূমিকা না করে আমি তথ্যগুলি জানাচ্ছি।
১. মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুযায়ী সমুদ্রবক্ষে প্রাপ্ত গ্যাসের ৫৭ শতাংশ গ্যাস কোম্পানীর রিকভারী কস্ট হিসেবে গণ্য হবে।
২.বাকী গ্যাসের শতকরা ৮০ ভাগ মুনাফার অংশ হিসেবে পাবে কোম্পানী, সর্বোচ্চ ২০ ভাগ পাবে বাংলাদেশ। লক্ষ করুন, ২০ ভাগ কিন্ত মোট গ্যাস থেকে নয়। অর্থাত আমরা পাব মোট গ্যাসের মাত্র সাড়ে আট শতাংশ। কোম্পানী চাইলে ৮০ ভাগের পুরোটই রপ্তানী করতে পারবে( ওটা আসলে ৮০ ভাগ নয়, সাড়ে একানব্বই ভাগ)
৩. আমাদের ভাগের সাড়ে আট শতাংশ নিজেদের কাজে লাগানো অর্থাত সমুদ্র থেকে গ্যাস স্থলভাগে পরিবহনের খরচ আমাদেরই বহন করতে হবে। যে খরচ প্রাপ্ত গ্যাসের থেকেও কয়েকগুণ বেশি হওয়ার কথা।
পরিসংখ্যান আর দেয়া দরকার মনে করছি না। এই চুক্তি বাতিলের স্বপক্ষের যুকতই হিসেবে এ কটিই যথেষ্ট বিবেচনা করছি।
সরকার এবং তার কতিপয় মূর্খ মন্ত্রী (যারা এই চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশে ভয় পায়) চেষ্টা করছেন তারা নিজেরা ও কয়েকজন ভাড়াটে বুদ্ধজীবী (যেমন এবিএম মুসা) দিয়ে নানা ধরণের গোজামিল তত্ব দিয়ে নিজেদের জায়েজ করা। কিন্ত এরকম একটি চুক্তি করে তা কি আদৌ সম্ভব। ওই শর্তগুলি কিন্তু আমার বানানো নয়, কাগজে লেখা আছে।
কর্পোরেট হালুয়া-রুটি যে আজকাল বহু মালের কপালে জোটে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। আর একদিন হরতাল না করেই মনে হয় তারা দেশকে উন্নতি দিয়ে ফাটিয়ে ফেলবেন! দুবৃত্ত রাজনীতিবিদ আর শোষক বহুজাতিক এসব গাধা মনের সুখে চরাবেন না তো কি আঙ্গুল চুষবেন? কয়েক বছর আগের কথা আলাদা, কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় কে না জানে যে জাতীয় সম্পদ আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সে সম্পদ বোঝা হয়ে যায়। নাইজেরিয়া তার জলন্ত উদাহরণ। আবার ভেনেজুয়েলা বা বলিভিয়ার উদাহরণও আছে, যারা সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিককে ঝেটিয়ে তাড়িয়েছে। এখন সেসব দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানের আমুল পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক সংগ্রাম-অবরোধ করেই সেটা হয়েছে, পাকা ফল গাছ থেকে টুপ করে পড়ল আর খেলাম; ব্যাপারটা মোটেও এমন হয়।
্কিন্ত আমাদের শিক্ষিত সমাজ জাতির ভাগ্য বদল নয় বরং বহুজাতিকের হালুয়া-রুটির ভাগের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন দেখা যাচ্ছে!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29008729 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/29008729 2009-09-11 21:04:59
পাগল পীরের পাগলামী এমন একটা সময় ছিল যখন আরব দেশের লোকেরা খোরমা খেজুর খাইয়া জীবন ধারণ করিত। এই বঙ্গদেশে তখন গোলা ভরা ধান ও পুকুর ভরা মাছ ছিল বলে জনশ্রুতি রহিয়াছে, বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ব্যাপার। তবে একথা সত্য যে গাছে গাছে ফুল ফুটিত ও বনে বনে পাখিরা ডাকিত। পাখির ডাক- এ এমনই এক জিনিস যে আনন্দ, বেদনা বা ক্ষোভ যাহা ব্যক্ত করিতেই ডাকুক না কেন তাহা সকল সময়েই সুমিষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং বনে বনে পাখি ডাকিত একথা সত্য হইলেও তাহারা কি মোটিভে ডাকাডাকি করিত তাহা পরিস্কার নহে।

এরকমই কোন একটি সময়ের কথা কহিতেছি। মহামতি বুদ্ধের অনুসারী ভিক্ষুগণ তখন সমগ্র ভারতবর্ষে অহিংসাব্রত প্রচার করিতেছিলেন। বঙ্গদেশেও তাহাদের কর্মপরিধি বিস্তৃতছিল। বঙ্গদেশে সদ্ধর্মী ভিক্ষুদের অন্যান্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন লুই'পা। এই ভিক্ষুগণ তাদের নিত্যকার অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ করিতেন যাহা পরবর্তীকালে চর্যাগীতিকা বা চর্যাপদ নামে খ্যাত হয়।

একদিন পাহাড়ী রাস্তায় হাটিতেছিলেন লুই'পা। একটি নির্জন টিলার ওপর উঠিয়া কান্তিবোধ করিলে ক্ষণকালের জন্য বিশ্রাম লইতে থামিলেন তিনি। তৃষ্ণার্ত বোধ করিয়া আশেপাশে চাহিলেন যে কোন ঘরবাটী দৃশ্যগোচর হয় কি না। টিলার একেবারে কোণের দিকে একটি কুড়ে দেখিয়া তৃষ্ণা নিবারণের নিমিত্তে সেইদিকে অগ্রসর হইলেন। তথায় হাজির হইয়া তিনি পানি বলিয়া উঠিলে কুড়ের ভেতর থেকে মধ্যবয়স্ক রোগা এক ব্যক্তি বাহির হইল। ভিক্ষু দেখিয়া সে অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়িল। কিরূপে এই সম্মানীয় অতিথির আপ্যায়ণ করিবে? মাটির সরায় পানি আনিয়া সে অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া কহিল, ভদ্র, আপনাকে আপ্যায়ন করিতে পারি এমন কিছুই আমার ঘরে নাই। লুই'পাও লজ্জিত হইয়া তরিৎ কহিলেন, তৃষ্ণার পানিই যথেষ্ট। অন্য কোন কিছুর আবশ্যক নাই। কথায় কথায় তিনি জানিতে পারিলেন, নি:সন্তান এই দম্পতির অন্য কোন সহায় নেই। কোনমতে এই নির্জণে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করিতেছে। বিদায় বেলায় লই'পা দিধাগ্রস্থ হইলেন ইহা ভাবিয়া যে হতদরিদ্র এই ব্যক্তিকে তিনি কি অহিংসার বাণী শোনাইবেন? অত:পর আরো উঁচু উঁচু পাহাড়ে উঠিলেন এবং বিভিন্ন মানুষের মধ্যে ঘুরিয়া ফিরিয়া লুই'পা দিনের কর্ম সম্পাদন করিলেন। ফিরিবার পথে টিলাবাসী অসহায় ব্যক্তিটির কথাই তিনি পূণ:পূণ: ভাবিতেছিলেন। তাহার মাথায় কয়েকটি লাইন ঘুরিতেছিল। তিনি লিপিবদ্ধ করিলেন। তাহার প্রথম দু'লাইন ছিল এরকম-
'টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী
হাড়িত ভাত নাহি নিতিআ আবাশী'

হেনকালে তিনি পাগল পীরের সম্মুখে পড়িলেন। তিনি পাগল পীরকে দেখিতে পাইলেন না কিন্তু পাগল পীর তাহাকে দেখিতে পাইল। লুই'পাকে দেখিয়াই পাগল পীর তাহার মনের যাবতীয় অবস্থা পড়িয়া লইলেন। বুঝিলেন, সংসারের দুঃখ দারিদ্র্য লইয়া ভিক্ষু বড়ই বিচলিত। সহসা তাহার গৌতমের কথা মনে পড়িল। মনে পড়িল সেও মানুষের দুঃখ, দূর্দশা, জ্বরা-ব্যাধি, হিংসা-ক্রোধ দেখিয়া এরূপ বিচলিত হইতো। হঠাৎ করিয়া পাগল পীরের কি মনে হইল যে তিনি ভাবিলেন, এই ভিক্ষুর ঈমানের পরীক্ষা লইয়া দেখি না কেন?

টিলাবাসী অসহায় দম্পতির দূর্গতির কথা চিন্তা করিতে করিতেই লুই’পা টের পাইলেন, চকিতে তার চক্ষুদ্বয়ে যেন একটি আলোর ঝলক আসিয়া লাগিল। ক্ষণকাল পরেই পরিস্কার হইলো, ইহা সেই শবরী বালিকার গাত্রের রঙ্গীন জামার বর্ণচ্ছটা, যাহাকে অদ্য দ্বিপ্রহরেই আপন পিতামাতার সম্মুখে ধর্মপোদেশ দান করেছেন তিনি। লুই'পা বিচলিত বোধ করিলেন, শবরী বালিকার রঙ্গীন বস্ত্র তাহার চক্ষুতে ভাসিবে কেন? এখানেই যদি শেষ হতো তথাপি লুই'পা রক্ষা পাইতেন, শেষ হইলো না। শবরী বালিকার বর্ণময় বস্ত্রের অন্তরালে সদ্য বিকশিত পুস্পকমঞ্জুরী, যাহা বৃহৎ পর্বতমালার মধ্যেও ক্ষুদ্র টিলার মাধূর্যের মত স্বীয় আলোয় উদ্ভাসিত; তাহা অকস্মাৎ স্মরণে আসিয়া ভিক্ষুকে বিহবল করিয়া তুলিল। ভিক্ষু প্রভু বুদ্ধের নাম স্মরণ করিয়া মস্তিস্ক হইতে বিভ্রম ঘুচানোর চেষ্টা করিলেন, সফল হইলেন না। টলিতে টলিতে আপন আশ্রমে ফিরিয়া আসিয়া লিখিতে বসিলেন। লিপিবদ্ধ হইলো-

উঁচা উঁচা পাবত তাহী বসই শবরী বালি,
মৌরঙ্গী পিচ্ছ পরহিন শবরী গেবত গুঞ্জরীমালী।

এর এভাবেই এতশত বছর পরেও আমাদিগকে শবরী বালিকার সৌন্দর্য হতে বঞ্চিত হতে হইলো না। সবই পাগল পীরের কল্যাণে। জয় পাগল পীর!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28775427 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28775427 2008-03-01 16:45:44
কপি রাইটের সংগ্রামে কপিবরগণ!
উন্নত বিশ্ব জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী সমুহের পেটেন্ট কবজা করিয়া বেশ ছড়ি ঘুরাইতেছে। সুতরাং ব্লগের সম্মানিত কপিবরগণের অধিকার রহিয়াছে আপন আপন কপি ভক্ষণের।

যে বা যাহারা তাদের কপি চুরি করিয়াছে তাহাদের বিচার হউক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28774831 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28774831 2008-02-28 15:18:27
জেবতিক এই উপন্যাস না লিখলেও পারতেন জেবতিক যেমন তার উপন্যাসখানা না লিখলেও পারতেন তেমনি আমিও এই লেখাটি না লিখলেও পারতাম। অনেক দোনমনা করে লিখেই ফেললাম। ন্যাংটো রাজার গায়ে চমৎকার রেশমী পোষাক আবিস্কার করে ও তার সৌকর্যে মুগ্ধ হয়ে যে বা যারা স্তুতি করেন তাদের কোন ক্ষতি না হলেও রাজার ন্যাংটোত্ব কিন্তু ঠিকই প্রলম্বিত হয়। এ কারণে দারুন কিছু লেখার স্রষ্টা জেবতিকের উপন্যাসের ব্যাপারে নিস্পৃহ থাকা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে না।

’ধুলি মাখা চাঁদের’ ডাকে সাড়া দিয়ে অর্থাৎ খরিদ করে এবং পাঠ করতে আরম্ভ করে কোন বাঁধা পেতে হয় না। এক নিঃশ্বাসেই পড়ে ফেলা যায়, কারণ কোন কিছুই ভাবায় না, পোড়ায় না। উপন্যাসটি নায়ক প্রধান। আনিস এবং দীপুকে কেন্দ্র করে এর গল্প আবর্তিত হয়েছে। বদরুল, তওহীদ, মির্জা, জয়ীতা, সেঁজুতি সহ আরো কিছু চরিত্র এসেছে। পেশীশক্তি নির্ভর রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসে আনিস। কিন্তু অন্ধকার জীবনের পুরোনো ঘটনাপ্রবাহের জের তাকে ছাড়ে না। উচ্ছাস নামের একটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী দীপু। সাংস্কৃতিক জগতকে ঘিরেই তার যত স্বপ্ন, প্রেম আছে একটি অনুষঙ্গ হয়ে। উচ্ছাসের বিকশিত রূপ আতঙ্কিত করে তোলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও মৌলবাদীদের। নানা ঘটনার ঘনঘটা পেরিয়ে দীপু জীবন দেয়। পুরোনো অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েও আনিস ব্যর্থ হয় দীপুর জীবন বাঁচাতে।

এরকম ঘটনা নিয়ে আরো কয়েক গন্ডা উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। জেবতিক এটাকে কতখানি শিল্পিত করতে পেরেছেনে, বা জীবনবোধ ও সময়কে তা কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছে সেটাই মূখ্য। এ প্রশ্নের কোন উত্তর নেই এবং জেবতিকের লেখা যারা পছন্দ করেন তাদের জন্য এ উপন্যাসে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন কিছুর সুযোগ নেই। ছাত্র রাজনীতির মত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এ উপন্যাসের অন্যতম অনুঘটক। এ নিয়ে আলাপ পাড়তে গেলে অবশ্যই লেখকের কিছু ইতিহাস বোধের পরিচয় দিতে হয়। আমাদের তরুণরা তো আর এমনি এমনি বিপথগামী হয়নি। তার অনিশ্চয়তা, প্রতিদিনকার অস্থিরতা ও সাংস্কৃতিক দৈন্যতার যে রূপ এখন বাস্তব; সে বাস্তবের পেছনে আর কোন বাস্তব নেই? লেখক চরিত্র গুলোর মুখ নি:সৃত সংলাপ দিয়ে লাইনের পর লাইনের মনোটোনাস ঘটনার বর্ণনা দিয়ে যাবেন কিন্তু সময় ও বাস্তবের কাঁটাছেড়ায় পাঠককে অংশগ্রহণ করাবেন না আদৌ, এরকম উপন্যাস অন্য কেউ লিখতে পারেন কিন্তু জেবতিক কেন?

যদি মেনে নেই, এটি একেবারেই বর্ণনাধর্মী উপন্যাস যেখানে গল্পটাই মুখ্য তাতেও সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। জেবতিকের উপন্যাসের শেষাংশে যখন দীপু মারা গেল, এ জায়গাটির বর্ননায় লেখকের দায়সারা ভাব রীতিমত পীড়া দিয়েছে। ’মেয়েরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল বা কেউ একজন বলল, দীপুকে মেরে ফেলেছে শুয়োরের বাচ্চারা, আনিস টের পেলো তার পায়ের নীচে মাটি সরে যাচ্ছে’ এরকম দু’চার লাইন দিয়ে উপন্যাস শেষ করা হল। শেষ হল ’তাকে ডেকেছিল ধুলিমাখা চাঁদ’ এর ডাক। দূর্মুল্যের বাজারে নগদ আশি টাকা খরচ হয়েছে বলে নয়, ’ধুলিমাখা চাঁদের ডাক শেষ করে চাঁদ খুঁজে না পেয়ে শুধু ধুলি ঝাড়তে হয়েছে বলেও নয়; আমি চিন্তিত একজন সম্ভাবনায়, সৃষ্টিশীল লেখকের গাঁজোয়ারি মানসিকতায়।

এ কারণেই এ লেখার শেষ একটি পূনরোক্তি দিয়ে, ’ আরিফ জেবতিক এই উপন্যাসটি না লিখলেও পারতেন।’


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28774829 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28774829 2008-02-28 15:05:10
গল্পটি টলস্টয় লিখেছিলেন
একেতো গার্মেন্টস মালিক, তার উপর নাম মোয়াজ্জেম তরফদার। আর সে কিনা ভাবছে টলস্টয়ের গল্পের কথা, বিষয়টা একটু খটকার হয়ে গেল না। সে খটকা দূর করতে হলে তরফদারের অতীত জীবনে সুলুক লাগাতে হবে। তবে এখনই আমরা তা করতে যাচ্ছি না। এ মুহুর্তে আমাদের সামনে উপস্থিত মোয়াজ্জেম তরফদার একটি জাজ্বল্যমান বাস্তব সমস্যার মধ্যে নিপতিত। এত বড় সমস্যা পাশ কাঁটিয়ে অন্য আলোচনার সূত্রপাত প্রাসঙ্গিক হয় না।

গত পরশু রাত থেকে ঘটনার শুরু। রুটিনমাফিক সব কাজ সেরে অভ্যেসমত দু’পেগ এ্যাবসলুট ভোদকা পান করে ঘুমোতে গিয়েছিল সে। ঘুমিয়ে এমনই এক স্বপ্ন দেখল যে তার ভাবন চক্রে আচ্ছামত প্যাচ লেগে গেল। বাংলা ভাষায় স্বপ্নের দুরকম মানে হয়। একটি স্বপ্ন হচ্ছে লক্ষ, ভিশন। অন্যটি ঘুমিয়ে দেখার স্বপ্ন, খোয়াব। লক্ষ নিয়ে তরফদারের কোন সমস্যা নেই। মাঝেমধ্যে লক্ষ বদল করে জীবনের এপিঠ-ওপিঠ ঘুরে ফিরে দেখার যে লক্ষ তাতে সে অবিচল আছে। তার সমস্যা খোয়াব নিয়ে। খোয়াবে সে দেখল, সে মোয়াজ্জেম তরফদার নয়, মেশিন অপারেটর মৌসুমি। তরফদারের গার্মেন্টসেই কাজ করে সে। স্বপ্নে সে একটা টাইট জিনস ও শর্টস পরে বসুন্ধরা মার্কেটে সানগ্লাস পরা এক লোকের হাত ধরে হাটছে। সে (মৌসুমি) নিশ্চিত নয় হাত ধরে হাটতে থাকা পাশের লোকটি কে? বড়লোকের মেয়েগুলির মত উচু হিল পরে কোমর দুলিয়ে হাটতে পেরে সে যেমন আনন্দিত তেমনই শংকিত সাথের লোকটিকে লোকটিকে নিয়ে। এই আনন্দময় ঘোরাঘুরির পেছনে সানগ্লাস পরা লোকটির ভূমিকা আছে তা নিশ্চিত হলেও মোয়াজ্জেম তরফদার যে আবার কিনা স্বপ্নের মৌসুমি সে শংকিত এই ভেবে যে, লোকটি তার কাছে কি চায়?এরকম উদ্বট স্বপ্ন মানুষ কখনোই দেখে না তা নয়। মাথা বিক্ষিপ্ত থাকলে বা পেট গরম হলে এরকম স্বপ্ন আকছার দেখে । তবে পরপর দু’রাত একই স্বপ্ন যদি ধারাবহিক নাটকের মত দেখা হয় তাহলে দূঃশ্চিন্তা না করে পারা যায় না।

মৌসুমি নামের একটি চরিত্র আমাদের সামনে হাজির হয়েছে, বেশ শক্তিশালী ভাবেই। সুতরাং তার একটু খোজখবর করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। তরফদার যদিও জানে না, মৌসুমির আসল নাম মৌসুমি নয় রোজিনা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দুইটা নামই দু’জন নায়িকার। নায়িকার নাম হলেও রোজিনা শব্দটি যতটা প্রোলেতারিয়েতিয় মনে হয়, মৌসুমি ততটা নয়। যদিও আমার মনে পড়ে, নায়িকা রোজিনা তার সময়ে যথেষ্ট লাস্যময়ী এবং স্মার্ট ছিলেন। এমনকি বলিউডি নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী বাংলাদেশে ছবি করতে এসে তার ছবির নায়িকা হিসেবে রোজিনাকেই পছন্দ করেছিলেন। এতকিছু স্বত্বেও মানতে বাধ্য, মৌসুমি নাম যে লাস্যময়তা ধারণ করে রোজিনা তা করে না। রোজিনার মৌসুমি রূপান্তর অবান্তর ছিল না মোটেও। এক হাজার টাকার হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও নিজের কর্মদতার জোরে মৌসুমর আয় এখন চার হাজার টাকার উপরে। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য, সাধারণ সাজসজ্জা, মাথার ওপর একস্তুপ রুক্ষ্ম চুল নিয়েও তার সৌন্দর্য এতটাই প্লাবন তুলতে পারে যে আশেপাশের অনেক কিছুকেই খড়কুটোর মত ভাসতে দেখা যায়। অন্যরাতো বটেই মৌসুমি নিজেও তা দেখতে পায়। তার সম্পর্কে আরো অনেক কিছুই বলা যায়। অন্য আর দশটা গার্মেন্টস কর্মীর মত তারও গড়পড়তা একটা করুণ ইতিহাস হয়তো আছে। তের চৌদ্দ বছর বয়স থেকে এই চব্বিশ বছর পর্যন্ত ’আপনা মাঁসে হরিনা বৈরী’ কাল কাঁটাতে তাকে অনেক ঝড়ঝাপটা নিশ্চয়ই পোহাতে হয়েছে। সেসব খোঁজে আমরা যাব না। এই গল্পে এত তথ্যের দরকার পড়বে না।

মোয়াজ্জেম তরফদার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিল এবং ওখানেই গোলমালটা লাগে। এ আর নতুন কি! বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই গোলমালের জায়গা। বেতন-ফি বাড়লে গোলমাল, জরুরী অবস্থা ডাকলে গোলমাল, কলকারখানা বন্ধ হলে এমনকি চালের দাম বাড়লেও গোলমাল। ভরসার কথা, রাস্ট্রপরে সুনিপুণ তত্বাবধানে সে গোলমাল দিন দিন কমে আসছে। তরফদারের বিবর্তনের ইতিহাসে সে ছোয়া পাওয়া যায়। ছাত্রাবস্থায় তরফদার সেসব গোলমালে ভালমতই জড়িয়ে পড়েছিল, অর্থাৎ বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হল। এবং আশৈশব তার যে স্বপ্ন (খোয়াব নয়) বড়লোক হব, তা কয়েক বছরের জন্য বিস্মৃত হল। তাতে ক্ষতি বিশেষ হয় নাই। চৌকষ, ত্যাগী, তরুন বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি খেতাবে যে সে ভূষিত হল তার ক্ষেত্র তো এটাই। ছাত্রত্ব শেষ হলেও রাজনীতির ডামাডোল তাকে ছাড়ল না। ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত হয়ে তার দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতার নানামুখী পরিষ্ফুটন ঘটল। অল্পদিনের মধ্যেই বিকাশমান গার্মেন্টস শ্রমিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে দাড়াল মোয়াজ্জেম হোসেন তরফদার। বিচ্ছিন্ন, বিশৃংখল ও লবিহীন আন্দোলন গুলিকে একসুতোয় গাঁথাকেই সে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিল। বছর তিনেক আগে নূন্যতম তিন হাজার টাকা মজুরীর দাবীতে ব্যাপক সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠল। লাখো শ্রমিক মাঠে নেমে এলেও আন্দোলন ছিল সুশৃংখল। কোন জ্বালাও পোড়াও বা ভাংচুর হল না। ফলে আন্দোলন দমন করাও সহজ হল না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, আন্দোলনের সফলতা সময়ের ব্যাপার। তরফদারের সাথে আলোচনায় বসলেন বিজেএমই নেতারা। মালিকপক্ষ তেমন কোন ভূমিকা ছাড়াই বিশ লাখ টাকার ক্যাশ এবং তিরিশ লাখ টাকা প্রতিশ্র“তির প্যাকেজ অফার করল। যেহেতু সময় ছিল খুবই কম ' কম দামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছি কিনা' এ ছাড়া অন্য কোন কিছু ভাবার অবকাশ পাওয়া গেল না। বাকীটা সময় কৌশলগত শলাপরামর্শ করতেই পার হয়ে গেল। রক্তচক্ষু নিয়ে টলতে টলতে মিটিং থেকে বেরিয়ে এসে মোয়াজ্জেম তরফদার ঘোষণা দিল, কুত্তার বাচ্চা মালিক শ্রেণী তাদের দাবী মানবে না। অতএব সোজা আঙ্গুলে কাজ হবে না, আঙ্গুল বাঁকা করতে হবে। কারখানায় জ্বালাও-পোড়াও এর আহবান জানিয়ে দিল তরফদার। মূহুর্তেই আগুন ছড়িয়ে গেল চারিদিকে। শ্যাওড়াপাড়া, তেজগা, টঙ্গী রণত্রে হয়ে গেল। সাভারে যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরানো হলে মারা গেল বেশ কয়েকজন সাধারণ যাত্রী। যদিও সাভারের গার্মেন্টস শ্রমিকেরা কেউই সনাক্ত করতে পারল না, তাদের মধ্যে কারা এ ঘটনা ঘটাল। আইন শৃংখলা রাকারী বাহিনীসহ রাস্ট্রের সব ধরণের সংস্থাই নৈরাজ্য দমনে সর্বাত্মক ঝাপিয়ে পড়ল। রপ্তানীমুখী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাত রা করতে এবং দেশ ও জাতিকে নৈরাজ্যের হাত থেকে বাঁচাতে পত্রপত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখা হল, বুদ্ধিজীবীরা সেমিনার করলেন এবং সচেতন নাগরিকরা গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে মানববন্ধন করলেন। দুদিনের মধ্যেই আন্দোলন এমনভাবে দমন হল, মৃত সাত গার্মেন্টস শ্রমিকের লাশ নেয়ার জন্য মর্গে আসার মত কেউ থাকল না। এর মধ্যে উচ্ছেদ হতে বাকী থাকা বস্তিগুলি উচ্ছেদ করা হল, কারণ ঐ বস্তিগুলিই উচ্ছৃংখল শ্রমিকদের আস্তানা। মোয়াজ্জেম তরফদার গ্রেপ্তার হল এবং দশদিনের মধ্যেই ছাড়া পেল। 'অতঃপর গার্মেন্টস শ্রমিকেরা ১১৬০ টাকা বেতন পাইয়া ৩৬ টাকা কেজি দরে মোটা চাল কিনিয়া খাইয়া সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল।'

যে রাজনৈতিক দলের সাথে তরফদার যুক্ত ছিল তারা তাকে হটকারী বলে সমালোচনা করলে সেও পার্টিকে আপোষকামী আখ্যা দিয়ে পার্টি ছাড়ল। ব্যর্থ শ্রমিক আন্দোলনের দায়ভার কাঁধে নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিতেও ইস্তফা দিল। বছরখানেকের মধ্যেই গোটা দুই গার্মেন্টস ইন্ডাষ্ট্রি ও একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক হয়ে গেল সে। ষড়যন্ত্র করে তাকে শ্রমিক রাজনীতিতে থাকতে দেয়া হয় নাই, সে বিজ্ঞাপনও যথেষ্ট বাজার পেল। নিজের বিজ্ঞাপনী সংস্থা থাকলে এ আর এমন কঠিন কি?

'ডিক্লাসিফিকেশন অব সেক্সুয়ালিটি' বলে একটি ধারণা তরফদারের বন্ধু মহলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সম্প্রতি। আনিসুল ও জাফর নামে তার দুই বন্ধু এ ধারণার প্রবর্তক। ধারণাটিকে একটি সমস্যা বা লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ঘরের সুন্দরী বউ বা উচ্চমূল্যে কেনা উচ্চ শ্রেণীর নারী (কলগার্ল)- মোটা দাগে নিজেদের শ্রেণীতে যৌনচর্চায় চরম অনীহা এ লণের প্রথম ধাপ। লণের দ্বিতীয় ধাপেও একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন হচ্ছে; অপুষ্টিজনিত রোগাপটকা গার্মেন্টসের মেয়েগুলির প্রতি আগ্রহ। ভাল করে খেতে না পেয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মেয়েটি, যার হাত পা গুলি লম্বা লম্বা কাঠির মত, খালি পায়ে নির্জীব হাটার সময় পেছন থেকে যাকে কোনভাবেই যুবতী নারী হিসেবে সনাক্ত করা যায় না- এরকম একটি মেয়েই হয়ে উটছে যৌন উত্তেজনার আধার। বাংলায় একে কি বলা যায়? শ্রেণীচ্যুত যৌন প্রেষণা? বৃহস্পতিবারের সাপ্তাহিক মুক্ত পানোৎসবে এ প্রসঙ্গ উঠলে তরফদার চোখ বন্ধ করে নিজেকে ঝালাই করে নেয়। নাহ, তার মধ্যে এ লক্ষণ ওঠে না। রোগাপটকা মেয়েগুলির প্রতি তার কোনরকম আকর্ষণই বোধ হয় না। তবে মৌসুমির মুখটি মনে পড়ে। চুড়ো করে বাধা রুক্ষ্ম চুলের নিচে ও লাল টেট্রনের জামার ফাক দিয়ে বেরিয়ে থাকা ঘাড় ও পিঠের খোলা অংশটুকু চোখে ভাসে। স্বপ্নে নয়, বাসতবে কোন একদিন এই দৃশ্যের টুকরোটি তার স্মৃতিতে গাঁথা হয়েছিল। মৌসুমির শরীরটা ঠিক অন্যান্য গার্মেন্টস কর্মীদের মত অপুষ্টি আক্রান্ত নয়। এদিন রাতেই পুরোনো ধারাবহিক স্বপ্নটির আরেক পর্ব দেখতে পায়। মোয়াজ্জেম তরফদার নয়, সে গামর্ন্টেস কর্মী মৌসুমি। বাতরোগী মাকে নিয়ে চরম দূঃশ্চিন্তা করতে করতেই গুলশান এলাকার কোন এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে সে। স্বপ্নের ধরণে তেমন কোন পরিবর্তন না হলেও একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে। তরফদার অর্থাৎ স্বপ্নে মৌসুমি এদিন তার সাথে সানগ্লাস পরা লোকটিকে চিনতে পারে। এ লোকটির নাম মোয়াজ্জেম তরফদার, সে যে গার্মেন্টসে কাজ করে এ লোকটি তার মালিক। এরপরের ঘটনা প্রবাহ তরতর করে এগাতে থাকে। তার বিস্তারিত চিত্রনাট্য মোয়াজ্জেম তরফদারের স্বপ্নেই রচিত হয়েছিল। বসুন্ধরা শপিং মল থেকে গুলশানের রেস্তোরা সবখানেই সে চিত্রনাট্যেও বাস্তব মঞ্চায়ণ ঘটে। এখন আমরা একলাফে চলে যাব কাইমেক্সের দিকে। স্থান- উত্তরা পাঁচ নম্বর সেক্টরে তরফদারের একটি ফ্যাট। সময় বিকেল চারটা। বাইরে লাঞ্চ সেরে এখানেই এসেছে তরফদার ও মৌসুমি। যে পটভুমি রচিত হতে এত ঘটনা ঘটল, সেদিকেই যাচ্ছিল তারা। বলা উচিত, তরফদার যাচ্ছিল ও মৌসুমিকে যেতে হচ্ছিল। যে কোন কাজই নিশ্ছিদ্র ও ঝামেলামুক্ত রাখার পূর্বাপর অভ্যেসমত এবং বাহুলগ্না মৌসুমির ভতিসন্ত্রস্ত্র ভাব কাঁটাতে তরফদার তাকে জানাল, তাদেও আসন্ন মিলনের পর্বটিকে নিরাপদ ও ঝুকিমুক্ত করার যথাযথ প্রস্তুতি আছে, অতএব দূঃশ্চিন্তা না করে সে সহজ হতে পারে। এই অতিরিক্ত দ্বায়িত্বশীল মনোভাব কোন কাজে না এসে বরং হীতে বিপরীত হল। একটা ঘটনা ঘটে যাওয়া এবং বলে কয়ে ঘটানো- এ দুয়ের মধ্যকার মাত্রাগত তারতম্যের ফ্যাক্টরে মৌসুমি তরফদারের শরীর থেকে ছিটকে গিয়ে নিরাপদে অবস্থান নিয়ে দাবী জানাল, এখনই সে এখান থেকে কের হয়ে যেতে চায়। এ দাবী মানা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। এ ফ্যাটে তরফদার ঢুকেছে লুকিয়ে, বেরোতেও হবে রাত ন’টার পরে লুকিয়ে। তার বউ নাহিদার শুভানুধ্যায়ী নেই এরকম জায়গা ঢাকা শহরে বিরল। এত তুচ্ছ ব্যাপারে পারিবারিক শান্তি নষ্ট করতে চায় না সে। আরেকটি কারণ, এক মাসের এই প্রকল্পে এর মধ্যেই তরফদারের ষাট হাজার টাকা খসে গেছে। 'মাথা ঠান্ডা রেখে যথেষ্ট ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে' মনে মনে ভাবল সে। কিন্তু হঠাৎ করে গোয়ার বনে যাওয়া মৌসুমি ধৈর্য্য পরীক্ষর কোন অবকাশই দিল না। ধস্তাধস্তি, আচড়-কামড়, চিৎকার-চেচামেচি করে একটা শোরগোল তুলে দিল। ভীত তরফদার তার মুখ চেপে ধরলে সে লাথি মেরে গোটা দুই পটারি ও আস্ত একটা টেবিল ল্যাম্প গুড়িয়ে দিল। বিকট শব্দে কেঁপে উঠল বাড়িটা। আর কোন উপায় ছিল না, নির্বোধ মেয়েটিকে বিছানার ওপর শুইয়ে ফেলে বালিশ চাপা দেয়া ছাড়া। ঠিক খুণী প্রকৃতির লোক যাকে বলে তরফদার তা নয় কিন্তু মৌসুমি তার হাতে খুন হয়ে গেল।

শুরুতেই তরফদারের ভাবনায় টলস্টয়ের একটি গল্পের প্রসঙ্গ পাড়া হয়েছিল। এখন অন্তত গল্পটি না বললে রাস্তার ঐ ক্যানভাসারের মত কাজ হয় যে বিশেষ এক পাতার নাম শোনাবে বলে লোক জড়ো করে তাবিজ বেঁচে কিন্তু পাতার নাম আর বলে না। যদিও চুড়ান্ত বিচারে গল্প কথক আর ক্যানভাসারের ফারাক খুব কমই আছে। গল্পটি বলছি-

আসিরিয়ার রাজা এসারহাদ্দন পাশের দেশে রাজা লাইলীর রাজ্য অভিযান করে দখল করে নিল। শহর-নগর সব পুড়িয়ে দিলো, অর্ধেক মানুষ মেরে ফেলে বাকী অর্ধেককে দাস হিসেবে তার রাজ্যে নিয়ে এল। সেনাদের কাউকে শুলে চড়াল, কারো বা জ্যান্ত চামড়া ছুলে নিল। স্ত্রী-পূত্র-কন্যাকে হত্যা করে স্বয়ং রাজা লাইলীকে খাচায় পুরে রেখে দিল। রাতে শুয়ে রাজা এসারহাদ্দন ভাবছিল কিভাবে লাইলীকে হত্যা করা হবে তা নিয়ে। এমন সময় বিছানার পাশে খসখস শব্দ শুনে পাশ ফিরে দেখল পাকা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ’কি , নিজের মৃত্যুর পরিকল্পনা করছ?’বৃদ্ধ জানতে চাইল। তা হবে কেন? প্রতিবাদ জানিয়ে বলল এসার হাদ্দন। ’আমি লাইলীকে মারার পরিকল্পনা করছি। ’তুমিইতো লাইলী, বলল বুড়ো। ’পার্থক্য হচ্ছে যে তুমি ভাবছ তুমি লাইলী নও।’ এ বলে বুড়ো তাকে শহরের প্রান্তে এক জলাশয়ের কাছে নিয়ে গেল। বুড়োর কথামত এসারহাদ্দন জামাকাপড় খুলে ঐ জলাশয়ে ডুব দিল। ডুবেই সে ল করল, সে বিছানায় শুয়ে আছে, তার পাশে এক সুন্দরী নারী। নারী তাকে বলল, উঠুন মহামান্য লাইলী। রাজপূত্র এবং সেনাপতি রাজসভায় অপো করছেন। রাজসভায় গিয়ে সংবাদ পেল, প্রবল প্ররাক্রমশালী রাজা এসারহাদ্দন তার দেশের দিকে সৈন্য অভিযান পরিচালনা করেছেন। রাজপূত্ররা ও সেনাপতি রাজ্য রক্ষার অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন। সবাই উদ্বিগ্ন, কিন্তু বিনা বাঁধায় তো রাজ্য ছেড়ে দেয়া চলে না। ভার কাঁটাতে রাজা শিকারে গিয়ে কয়েকটি হরিন শাবক মারলেন। ফিরে এসে তিনে নিজেও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেও লাইলী রাজ্যরক্ষা করতে পারলেন না। তার সামনে তার স্ত্রী-পূত্র-কন্যাদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হল। সাজানো রাজ্য ছারখার করে দিয়ে তাকে একটি খাচায় বন্দী করে রওনা হল এসারহাদ্দনের বাহিনী।রাজা লাইলী , যে কিনা প্রাক্তন রাজা এসারহাদ্দন নিস্ফল ক্রোধে খাচায় বন্দী হয়ে গজরাতে লাগল, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। একদিন তাকে শুলে চড়ানোর প্রস্তুতি নেয়া হল। তিনি চিৎকার করে বলতে চাইলেন, না, আমিই এসারহাদ্দন। কিন্তু তার কথায় কেউ কর্নপাত করল না। হঠাৎ করে তার মনে হল, তিনি একটি ক্ষুদ্র হরিন শাবক যাকে ঘিরে রয়েছে শিকারীরা, সামনে ঘনিয়ে আসছে অনিবার্য মৃত্যু................

মোয়াজ্জেম তরফদার চব্বিশ বছর বয়সী তরুণীর মুতদেহে নিজেকে আবিস্কার করে টের পেলেন, ঘরে অপেক্ষা করছে বাতরোগী মা যার সাথে আর কোনদিনই দেখা হবে না। দেখা হবে না লাজুক চেহারার সুপারভাইজার সেলিমের সাথে যে সাহস করে ভালবাসার কথাটা বলতে পারল না। সানগ্লাস পরা অচেনা এক লোক কার সাথে যেন শলা পরামর্র্শ করছে, লাশটি টুকরো টুকরো করে কয়েক জায়গায় পুতে ফেলতে হবে। চাপাতি হাতে এগিয়ে আসছে কেউ একজন। লোকটিকে চেনা যাচ্ছে তো। এতো তারই বিশ্বস্ত ইদ্রিস আলী। ইদ্রিস তাকে টুকরো করবে? ভয় নয়, আতঙ্ক নয়; বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু মৃত তো আর কাঁদতে পারে না!






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28771447 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28771447 2008-02-17 16:50:05
রূপালী ধ্বংসস্তুপ ও একটি গোলটেবিল বৈঠক
ফেরার পথে কিছুদুর এগিয়ে সামনে একটা জটলা। ছোট একটা পিক আপে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। কার কার্ড আছে কার কার্ড নেই এসব আলোচনা, ’ওমুক পাঁচফির-সাতফির নেছে, মোর একফিরও জোটলে না’ জাতীয় আহাজারি পেরিয়ে একটু সামনে এসে পাওয়া গেল উদাস চেহারার ছোটখাট মধ্যবয়স্ক এক লোক। স্পষ্ট বোঝা গেল, ত্রাণের দড়ি টানাটানিতে যোগ দিতে ইচ্ছুক নন। বেশি ভাব বিনিময়ের দরকার হল না। পিঠে হাত রেখে আস্তে করে বললাম, চলেন, বাজারে গিয়ে চা খাই। তিনি চললেন আমাদের সাথে। হাটতে হাটতে তার কাছে জানতে চাইলাম, পরিবারের সবাই আছেতো ঠিকঠাক? খুব স্পষ্ট এবং স্বাভাবিক গলার উত্তরে জানা গেল, তার ছেলে, ছেলের বউ আর দুই নাতি নেই। আরেকটু এগোতেই অন্য একজন দাড়ালেন সামনে। কিছুণ আগে যুক্ত হওয়া আমাদের নতুন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেন, বক্কার, যাও কোম্মে? জানা গেল, আমাদের সঙ্গীর নাম বক্কার, সম্ভবত আবু বকর। বক্কার কোন উত্তর দিলেন না, শুধু বললেন, আও। আরো একজন যুক্ত হল আমাদের সাথে।

আমাদের ক্যাম্প অর্থাত তাফালবাড়ী স্কুল এন্ড কলেজ ছাড়িয়ে বাজারের মোড়। সেখান থেকে আরো সামনে এগিয়ে ফাকা জায়গায় একটা চায়ের দোকান। এটা হয়ত আজ কালের মধ্যেই চালু হয়েছে। ছোট একটা একচালা, সামনে দুটো বেঞ্চ। আশেপাশের অনেক বড় এলাকার কেন্দ্র তাফালবাড়ী বাজার। এখন ত্রাণের আশায় এই বাজারকে ঘিরে কমপে ৫০ হাজার লোকের আনাগোণা। এর বাইরে আছে ত্রাণ কর্মীরা। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সময়টা খারাপ না। দোকানে আগে থেকেই ছিল যুবক দোকানী কালাম, তার চাচাতো ভাই তাহের ও জুবুথুবু হয়ে বসে থাকা অনেক বয়স্ক একজন। চায়ের অর্ডার হল, আলাপ পরিচয় হল এবং গোলটেবিল বৈঠকও শুরু হল, যদিও গোল বেঞ্চি বৈঠক বলাটাই বেশি সঙ্গত। আমি আর পদ্ম ছাড়া উপস্থিত পাঁচজনের মধ্যে চারজনই দুপুরে আমাদের লঙ্গরখানার খিচুড়ি খেয়েছেন, সবাই খিচুড়ির সাথে ফুলকপি ও আলুর টুকরো পেয়েছেন। যে কারণে লঙ্গরখানা সংশ্লিষ্ট হিসেবে সনাক্ত হওয়ার পরে বেশ একটা সম্মানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলাম এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের সঞ্চালকের দ্বায়িত্ব পেয়ে গেলাম। আলোচনা শুর করল তাহের। কয়েকদিনে সবচেয়ে বেশি শোনা বাক্যটি দিয়েই সে কথা পাড়ল, যারা মরেছে তারাই বেঁচেছে, বেঁচে গিয়ে তার হয়েছে মরণদশা। বুড়ি মা, বিধবা দুই ভাবী আর তার ছেলেমেয়েদের সারাবছর কি খাওয়াবে? ’ তেরান খাইলাম নয় এক মাস, হেইফির?’ সতের সদস্যের পরিবারের সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে তারা তিন ভাই বাড়ীতেই থেকে গিয়েছিল, নৌকা আর জালের মায়া ছাড়তে পারেনি। দু’ভাই মরেছে, তাহের বেঁচে আছে। নৌকা, জাল, ঘরবাড়ি সবই গেছে। সুযোগ নিয়ে আমি মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্খা আর ঘুরে দাড়ানোর অনুপ্রেরণা নিয়ে লম্বা এক দার্শনিক বক্তব্য দিয়ে দিলাম। দেখা দেল দার্শনিকতায় তাদের অনুরাগ কম নয়, তারা মন দিয়ে আমার কথা শুনলো এবং বুঝল। বক্কার লজ্জা ভেঙ্গে স্পষ্ট জানাল, এতকিছুর পরেও যে সে বেঁচে আছে সেই আনন্দ কম না। অন্যরাও মানল কিন্তু তাহের মানল না। সে না-সূচক মাথা নেড়ে গেল।

রাত বাড়ল, দোকান বন্ধ হল, কেরোসিনের গুরুত্ব বিচারে চেরাগ বন্ধ করা হল কিন্তু চাঁদের আলোয় রূপালী ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে আমাদের বৈঠক চলতে লাগল। বুড়ো লোকটি শুধুমাত্র একবারের জন্য হাটুর মধ্যে থেকে মাথা বের করে বলল, মোগো এলেকা অইছে ’মা ফাতেমার ব্যাভার(যৌতুক)। এডু যহন গ্যাছে তহন বোজ, কেয়ামতের আর দেরি নাই।’ বক্কর একথা শুনে ক্ষেপেই গেল,’ভারী আমার ব্যাভার, দ্যাহেন দেহি ব্যাভারের কি ছিরি!’ এরকম অনেক বিষয়েই আমরা একমত হলাম, অনেক বিষয়ে হলাম না। কিন্তু সুন্দরবনের ব্যবহার নিয়ে আমার একটি বক্তব্যে রীতিমত প্রতিরোধের সামনে পড়লাম। যখন বললাম,বনের গাছ কেটে তারা নিজেদের জন্য এতবড় বিপদ ডেকে এনেছে তখন সমস্বরে আপত্তি উঠলো। বুড়ো এবার মাথা বের না করেই গোজগোজ করে জানাল, এ কথার কোন ভিত্তি নেই, জঙ্গল আল্লাহর দান, গাছ কেটে এটা কমানো যায় না। যেখানে আমরা বসে আছি এখান থেকে তিন কিলোমিটার সামনেই বলেশ্বর পাড়ি দিলে গহীন বন। মাছ ধরার পাশাপাশি টুকটাক গাছ চুরি এখানকার লোকের বৈধ পেশা হিসেবেই স্বীকৃত। তাহের স্পষ্ট বলে দিল, বনের গাছে তাদের হক আছে। এটা কাটলে চুরি হয় না। ’ মোরা আর কয়ডা গাছ কাডি? ফরেস্টাররা এলেকা ব্যাড় দিয়া দিয়া কাডে, কাইডা সাফ কইরগা হালায়। মোরা যেডুন কাডি তাতে গোড়া থাহে, আবার গাছ অয়। ওরা সাফ কইরগা হালায়। জঙ্গলের মায়া মোগোচে বেশি কারো নাই।’

রাত হয়ত ভোর হয়ে যেত। কিন্তু ক্যাম্পে ফিরতে হবে, জাহিদ মামুনের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। জাহিদ মামুন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত টিম লিডার। উঠে পড়ি, ক্যাম্পে গিয়ে খিচুড়ি খাই, কম্বল গায়ে শুয়ে পড়ি। একটি নারী কন্ঠ জানালায় খটখটায়। ’ঢাহার ভাইরা, ও ঢাহার ভাইরা, এট্টা কম্বল দেবা নাহি? কেউ একজন উত্তর দেয়, আমরা এখনো কম্বল দিচ্ছি না। এবার সম্মিলিত নারী কন্ঠের খিলখিল হাসি। ’খালি খেচুরি খাইলে অয়, পোলাপান নিয়া শোব না? ঐ হাসি, আকাঙ্খার তাগিদ স্পষ্ট করে দেয়, তারা ঘুরে দাড়াবে। পরদিন বিকেলে রামপাল থানার পশুর নদীর তীরে সন্যাসী গ্রামে গিয়েও দেখি সেই একই মানুষ। আকাঙ্খার তাগিদে উন্মুখ। ত্রাণ নেয়ার সময় মাথা নত করেনি, সোজা হয়ে সামনে দাড়িয়েছে হকদারের মত। বুকের মধ্যে হাহাকার বাজে। এরাতো আমাদেরই মানুষ, শক্ত, শৃঙ্খলহীন। কিন্তু যোগাযোগটা সবসময় হয় না। এমনকি এই যোগাযোগও হল ঘুর্ণিঝড় নামক একটা উপলকে কেন্দ্র করে। বাকী সারাটা বছরই হয়ত এই রূপালী ধ্বংসস্তুপ, উপকুল আর অসাধারণ এইসব সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগের স্মৃতিটুকু নিয়ে চলবে নিজের সাথে নিজের বিপ্লবী রাজনীতি! আমরা আমরা খেলা!


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28748722 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28748722 2007-12-01 11:59:20
আগামীকাল বাগেরহাটের শরনখোলায় একটি লঙ্গরখানা চালু হচ্ছে ০১৭১২৫৩৪৮৫৬]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28746550 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28746550 2007-11-20 15:11:13 সংস্কারকৃত (শেষাংশ)
৭১ সালে থানা শান্তি কমিটির সভাপতি রহমতউল্লাহ সরদার ছিলেন নিত্য বাবুর বাল্যবন্ধু। যখন খবর পাওয়া গেল পাকিস্তান আর্মি থানা সদরে ক্যাম্প করছে তখনো রহমতউল্লাহ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তার ভয়ের কিছু নেই। তখন রীতিমত যুদ্ধ চলছে। রহমতউল্লাহ তার পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম লীগার। লেখাপড়া জানা লোক। তার বাবা এল এম এফ পাস মুকসেদ ডাক্তার ছিলেন মুসলিম লীগের জেলা পর্যায়ের নামকরা নেতা। ৭১ এর ডামাডোলের আগেই তিনি প্রাণত্যাগ করেন। রহমতউল্লাহ বাপের যোগ্য উত্তরসুরি। মুসলমান জ্যাত্যাভিমানের ধারণা তার রক্তেই ছিলো। রহমতউল্লাহ’র সাথে সম্পর্ক রেখে চলতে আত্মপীড়ন অনুভুত হলেও আর্মি ক্যাম্প স্থাপনের খবর পেয়ে পূত্রহীন নিত্য বাবু দু’ কন্যার নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে ফের দেখা করেছিলেন তার সাথে। অধিকাংশ হিন্দু পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেলেও নিত্যরঞ্জনের মনে হত, মারা যাওয়া আর জানের ভয়ে দেশত্যাগ করায় তফাত কি? কিন্তু পরিস্থিতি যা দাড়াল তাতে সেমতে অটল থাকাটা দুস্কর! সে রাতে রহমতউল্লাহর সাথে তার কথোপকথন ছিল গতানুগতিক। তাকে দেখেই যেন রহমতউল্লাহর জোশ বৃদ্ধি পেল।
সে বললো, শালার হিন্দুস্তান! মুসলমানদের হিস্যা মেরেও শালাগো খাই মিটে নাই। এখন পাকিস্তান না ভাঙ্গলে শান্তি হচ্ছে না। পাকিস্তান ভাঙ্গা এত সহজ না। একটা মুসলমানের গায়ে একফোঁটা রক্ত থাকতেও পাকিস্তান ভাঙ্গবে না। একটু থেমে খানিকটা চোখ বাকা করে আবারো বললো, তুমি কি অস্বীকার করতে পার নিত্য, সবই হিন্দুস্তানের কুচক্র?
নিত্যরঞ্জন কোন উত্তর দিলেন না।
তোমার আর কি? পাকিস্তান ভাঙ্গলেই তো তোমার আরাম। হিন্দুরা কি আর মুসলমানের ভাল বুঝবে?
তুমি ভাল করেই জানো যে ব্যাপারটা এত সরল না। এ পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। উত্তর দিতে শুরু করলেন তিনি। এরকমটাই সাধারণত হয়। ভাবেন যে কিছুই বলবেন না কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখ খোলেন। যারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে জানপাত করে দিচ্ছে তাদের মধ্যে কয়জন হিন্দু? মুসলমানইতো বেশি।
মনটা শক্ত কর রহমত, তোমাদের এত সাধের লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আর টেকে না। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন নিত্য রঞ্জন। কিন্তু রহমতের ক্রুদ্ধ পাকানো চোখ দেখে থেমে গেলেন। প্রসঙ্গ বদলিয়ে বললেন, মনুর মেয়েটারে ক্যাম্পে দিয়ে এসেছে তোমার লোকজন, কতবার কোলে নিছি মেয়েটারে, বুকের মধ্যে খুব মোচড়ায়।
মালাউনের বাচ্চা মালাউন, ইয়া নফসী ইয়া নফসী কর! ইয়া নফসী বুঝিস? নিজে বাঁচলে বাপের নাম। গলায় বিষ ঢেলে দিয়ে হিসহিস করে উঠেছিল রহমতউল্লাহ।

সেই রাতে প্রায় সাতশ হিন্দু নারী-পুরুষ-শিশুর একটি বহর বর্ডার পেরোনোর জন্য রওনা হয়েছিল যাদের মধ্যে নিত্যরঞ্জনের শ্যালক, স্ত্রী ও দু মেয়ে ছিল। বাগেরহাটের কুখ্যাত রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে বিষ্ণুখালী নদীর তীরে ডাকরা বাজার নামক একটি জায়গায় রাজাকার বাহিনীর হাতে আটক হয় তারা। রজ্জব আলী বাহিনীর কাছে সে রাতে খরচ করার মত পর্যাপ্ত গুলি ছিল না। যে কারনে রামদা, ছুরি, বল্লম জাতীয় অস্ত্র দিয়ে এতগুলি মানুষকে মারতে প্রায় সারারাত লেগে গিয়েছিল। রে যে ঘোরতর অন্ধকার ছিল, নয়তো দু’একজন প্রত্যদর্শী এমন জুটে যেত যারা রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করতে পারত যে কোন এক গর্ভবতী তরুনীর পেট বরাবর রামদার কোপ বসানোর পরে ঠিক কি দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিল। তবে কয়েক মাইল জুড়ে বিষ্ণুখালী নদীর পানি লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছিল- দিনের আলোতে এ দৃশ্য দেখেছিল হাজার হাজার মানুষ।

খবরটা শুনে ভগবান বলে একটা হাক দিয়ে বসে পড়েছিলেন নিত্যরঞ্জন। কোনকালেই ভগবানে বিশ্বাস না থাকলেও সেই মুহুর্তে তার কেন ভগবানের নাম মনে পড়লো তা একটা গুরুতর প্রশ্ন। বউ আর মেয়েদুটি শেষ মুহুর্তে এমনভাবে তাকে বিদায় দিয়েছিল যেন ফাঁসির আসামীকে বিদায় দিচ্ছে। তিনি নিজেও ভেবেছিলেন, যাক! এদের বাঁচানো গেল। নিজে বেঁচে থাকবেন এমন কোন আশাই করেননি। সে মুহুর্তে বাঁচা বা মরা কোনটা নিয়েই তার কোন ইতর বিশেষ ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে রহমতউল্লাহর সাথে দেখা হলে মন্দ হয় না, দু’একবার ভেবেছেন তিনি। তবে সেটা যে সম্ভব হবে তা আশা করেননি।
কিন্তু ঘটনা ঘটলো কি? বিশ্বাসের গোড়া ধরে এরকম প্রবল নাড়া লাগলে অনেক সময় চরম ধার্মিক লোককেও দেখা যায় আল্লাহ-ভগবানের নাম ধরে শাপ শাপান্ত করছে। এ কারণেই হয়তো অবিশ্বাসী নিত্যরঞ্জন ভগবানের নাম ধরে হেকে উঠলেন। কয়েকদিন অপ্রকৃতস্থের মত ঘোরাঘুরি করলেন তিনি। পাক আর্মির ক্যাম্পের আশেপাশেই বেশি দেখা যেতে লাগলো তাকে। যথারীতি ধরাও পড়লেন। ঘটনাচক্রে রহমতউল্লাহ তখন ক্যাম্পেই ছিল। সে কমান্ডারকে জানালো, লোকটা পাগল, আগে থেকেই পাগল ছিল। হিন্দু হলেও গোমাংশ ভণ করে এবং ঠাকুর দেবতায় এর কোন বিশ্বাস নেই। কমান্ডার এ কথা শুনে মজা পেলেন। হিন্দু কিন্তু দেবতা মানে না এমনকি গোমাংশ খায়- বিষয়টি কৌতুককর মনে হল তার কাছে। তিনি একে ছেড়ে দেয়ার জন্য বললেন। কিন্তু নিত্যরঞ্জন ক্যাম্প ছেড়ে গেলেন না। আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে লাগলেন। দু’দিনের মধ্যেই দেখা গেল ক্যাম্পের সাধারণ জওয়ানরাও চেনে তাকে এবং দেখামাত্রই হাসিমুখে জানতে চায়, পাগল গোমাংশ খাবে কি না? তারপর হো হো করে হেসে ওঠে অনেকগুলি কন্ঠ। আর এভাবেই মরা হয় না নিত্যরঞ্জনের, তিনি বেচেই থাকলেন। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে রহমতউল্লাহর সাথে দেখা হওয়ার শখ পূরণ হল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই রহমতউল্লাহ খতম হয়ে যায়। এত রাজাকার বেচে গেল, কাসেম মাস্টার, সিরাজ চেয়ারম্যান; নিজের হাতেই যারা অগণিত মানুষ মেরেছে। কিন্তু রহমতউল্লাহ বাচলো না, এটা ভেবে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয় তার।

একা মানুষ তায় মাথার ঠিক নেই, এ কারনে প্রায় বছর দুই ছোট বোনের আশ্রয়ে তার শশ্বুর বাড়ীতে কাটিয়ে তিনি আবারো ফিরলেন চুপনগর, সম্পূর্ণ সুস্থ্য অবস্থায়। কিন্তু ভিটে ফেরত পেলেন না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখার দ্বায়িত্ব যাদের ওপর অর্পিত ছিল তারাতো নিরেট নিরামিষভোজী নয়। তাছাড়া প্রায় এতগুলো দিন বাড়ীটা দেখাশুনার গুরুদায়িত্ব যে নিয়েছিল তারতো এমনিতেই একটা স্বত্ত তৈরি হয়। তদুপরি হিন্দুর বাড়ী। ইন্ডিয়া গিয়েছিল যেসব হিন্দু পরিবার, তারা সবাই ভিটে হারাল এমন নয়। তবে তাদের অনেক কায়দা কানুন করতে হয়েছিল। নিত্যরঞ্জন কোন কায়দা করলেন না। এটা তিনি জানতেনও না। স্কুলের চাকরিটা যে ফেরত পেলেন তাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি।

ভুতপূর্ব রহমতউল্লাহ ছিলেন আমার বড় মামা। সে হিসেবে আমি মুসলিম লীগার মুকসেদ ডাক্তারের অর্থাত আমার নানার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমার মাথায় কি যেন গড়বড় হয়ে গেল। হলে আমার সিনিয়র এক বড় ভাইয়ের হাতে মগজ ধোলাই হয়ে আমি একটি ঐতিহ্যবাহী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনে যোগ দিলাম। বিজ্ঞানমনস্কতা, অসা¤প্রদায়িকতার সাথে সাথে রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করার দীক্ষা পেলাম সমানতালে। আমার এই পতনের খবর এবং আচার আচরণ আমার পরিবারের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দারুণ একটা গোলযোগ তৈরি করল। আমাদের বিরাট পরিবারের অধিকাংশ লোকই বিএনপি বা জামাতের রাজনীতির সাথে যুক্ত। আগে পরে যাই হোক না কেন বর্তমানে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে খুব চিন্তিত থাকে। আমি যেই ছাত্র সংগঠনে যোগ দিয়েছি সেটি সম্পর্কে তাদের ধারণা- এরা ভারতের পয়সা খায় আর মুসলমানদের ঈমান-আকিদা নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, এইসব নানান কাহিনী। প্রথমে হুমকি-ধামকি, তারপরে পয়সা বন্ধ করার ভয় দিয়ে তারা আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করল। আমি আমার মতই চলতে থাকলাম, অন্যসবও ঠিকমতই চললো।

২০০১ সালের মতার পট পরিবর্তিত হয়ে বিএনপি-জামাত জোট সরকার মতায় আসার পর সারাদেশ জুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছিলো। আমার নিজের এলাকাও বাদ পড়লো না। ক্যাম্পাসে থেকেই খবর পেলাম, আমার আত্মীয়-পরিজনরাই সামনে থেকে এ অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জানতাম যে তেমন কিছু করার নেই, তারপরেও ক্যাম্পাস থেকে বাড়ী চলে আসলাম। আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই এলাকাছাড়া। তাতে তাদের কোন অসুবিধা নেই কারণ আগের পাঁচ বছরে তারা যা কামিয়ে নিয়েছে, দিব্যি কয়েক বছর হেসেখেলে পার করে দিতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের তো শাখের করাত। হিন্দু হলে তো কথাই নেই। পরিবারের যার কাছেই জানতে চাইলাম সেই বিষয়টা উড়িয়ে দিয়ে বলল, আরে, কোথায় কিসের সংখ্যালঘু নির্যাতন? এ সবই ইন্ডিয়া ও তার দালালদের অপপ্রচারণা। পরিচিতদের মধ্যে শুধু নিত্য স্যারকেই প্রকাশ্যে দেখতে পেলাম। তাকে কেউ কোন ঝামেলা করেনি কারণ তিনি আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না এটা সবাই জানত। আমি বাড়ীতে থাকাকালেই হুড়কা গ্রামে জনৈকা ছবি রানী বিশ্বাস বিএনপি ক্যাডারদের হাতে ন্যাক্কারজনকভাবে লাঞ্ছিত হল। যথারীতি কেউ কোন প্রতিবাদ করলো না এবং বিএনপি- জামাত এ ঘটনাকে মনগড়া বলে উড়িয়ে দিল। একা একা বেশকিছু সময় উদ্ভ্রান্তের মত ঘোরাঘুরি করে একটা মাইক ভাড়া করলাম এবং বাজারের মোড়ে একাই সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাবেশ শুরু করলাম। সামনে কোন লোক জড়ো হলো না তবে বাজারে অবস্থানরত লোকজন কান খাড়া করে শুনছিলো, আমি কি বলি। আমার পরিবারের কয়েকজন ক্রুদ্ধ চেহারায় উত্তেজিতভাবে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি যখন বলছিলাম, ছবি রানীর লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেফতার করতে হবে তখন এ ঘটনায় জড়িতদের কয়েকজন কাছেই ছিল। তারা পুরো ব্যাপারটিকে আমোদের বিষয় হিসেবে নিল। ভাবখানা এমন, তাদের সামনে কোন জোকার হাস্যরস প্রদর্শন করছে। এক পর্যায়ে দেখলাম, ছাতা মাথায় এক বৃদ্ধ মনযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে। তিনি আর কেউ নন, নিত্যরঞ্জন শিউলি। বক্তব্য পর্ব শেষ হলে তিনি হাত ধরে টানতে টানতে আমাকে বাজারের মধ্যে নিয়ে গেলেন, এক হাতে শক্ত করে আমার হাত ধরে অন্য হাতে থাকা ছাতা দিয়ে আমাকে দেখিয়ে চিৎকার করে চারিদিক ঘুরে ঘুরে বলতে লাগলেন, ’মানুষ হয়েছে রে! এই ব্যাটা মানুষ হয়েছে! দ্যাখ সবাই, দিনরাত তো শুধু গরু, ছাগল আর ভেড়া দেখিস, এই দ্যাখ, একটা মানুষ। আমার ছাত্র মানুষ হয়েছে। এমনিতেই আমার কর্মকান্ডকে পাগলামী হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। তার ওপর এরকম আরেকটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। তবে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্য জিনিস। মানুষ কি হয়েছি? যদি নাও হই তবে হতেই হবে। মানুষ হতে হবে।

সংস্কার এবং সংস্কৃতি নিয়ে নিত্য স্যারের উতসাহী হয়ে ওঠার পেছনে ভিন্ন একটি পটভুমি রয়েছে। পূর্বোক্ত ঘটনার নৈরাশ্যজনক অভিজ্ঞতায় আমি বুঝলাম, এলাকায় শক্তিশালী রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে হলে সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। সে অনুযায়ী কিছু কাজ ও শুরু করে দিলাম। বেশ কয়েকজন ছাত্রের সাথে যোগাযোগ হল। ভাবছিলাম একটি রাজনৈতিক প্রশিণের কথা। সে সময় পার্টির কাজে খুলনা এসেছিলেন পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক যতীন সরকার। যতীন সরকার অসাধারণ বক্তা। আমি খুলনায় তার সাথে দেখা করে তাকে একদিন আমার এলাকায় সময় দেয়ার অনুরোধ জানালে তিনি আনন্দের সাথেই রাজী হলেন। ছোট একটা ঘরে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। কিছু ছাত্র ও স্থানীয় স্কুল কলেজের কয়েকজন শিকের পাশাপাশি আলোচনা সভায় হাজির ছিলেন নিত্য স্যার। সবার বোধগম্য করে সংস্কৃতি নিয়ে দারুন একটা আলোচনা করলেন যতীন সরকার। ’ মানুষ হচ্ছে একমাত্র প্রাণী যে নিজের সংস্কার করতে পারে, এ কারণে মানুষ অনন্যসাধারণ। সংস্কার করে ক্রমাগত নিজের উৎকর্ষতা অর্জনের পথে মানুষ যা যা অর্জন করে তার সবই হচ্ছে সংস্কৃতি।’ মোটা দাগে এরকমই ছিল আলোচনা। আলোচনা সভা শেষ হলে নিত্য স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ’তুই আমার ছাত্র ছিলি বলেই আজ এরকম একজন বিদ্বান লোকের সাক্ষাত পেলাম।’

এরপর থেকে নিত্যরঞ্জন সংস্কার ম্যানিয়ায় আক্রান্ত হলেন। সংস্কার, সংস্কৃতি নিয়ে তিনি কিসব কান্ডকারখানা করছেন, ঢাকায় বসেই তার বিস্তারিত খবরাখবর পেতাম। বাজারে হাটতে হাটতে সবজি বিক্রেতা জোবেদ আলীকে হয়তো বলতে শুরু করলেন, ’৪০ বছর ধরে একই কাজ করছিস, এবার একটু ান্ত দে। নিজের কিছু সংস্কার কর। তুই তো মানুষ, গরু-ছাগল না! গরু ছাগলের সংস্কৃতি নেই, ওরা নিজের সংস্কার করতে পারে না। কিন্তু তোতে আর গরু-ছাগলে ফারাকটা কি আছে? ওরা বছরের পর বছর ঘাস খেয়ে যায়, আর তুই সবজি বেঁচে যাস!’ এ কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া জোবেদ আলীর আর কিছু করণীয় ছিল না তা বেশ বোঝা যায়।

একদিন স্থানীয় হরলাল সাংস্কৃতিক একাডেমীতে গিয়েও নাকি খুব হম্বিতম্বি করেছেন। বলেছেন, ’গাড়লের দল! গান বাজনা করেই ভাব খুব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড হচ্ছে। ছ্যা! এর নাম সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড? অত সোজা না রে, অত সোজা না। আগে বোঝ ব্যাটারা ভাল করে, সাংস্কৃতিক কাকে বলে, ইত্যাদি ইত্যাদি। স্থানীয় লোকেরা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। নিত্যরঞ্জন শিউলীর পাগলামীর সাথে তারা আগে থেকেই পরিচিত।

গত বছরের ১১ জানুয়ারি আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, বলা ভাল মতা কেন্দ্রে একটা বড়সড় পরিবর্তন আসলো। কেন এ পরিস্থিতি হল সে প্রোপট সবাই জানেন, খামোখা কথা বাড়ানোর দরকার নেই। এ পরিবর্তনের পর কিছু নতুন ঘটনাপ্রবাহ দৃশ্যমান হল মানুষের সামনে। বড় বড় দূর্নীতবাজ যারা রাজার হালে এতকাল কাটিয়ে দিয়েছে, তারা ধরা পড়ে বিচারের আওতায় আসা শুরু হল। রাজনৈতিক সংস্কারের কথাবার্তা আলোচনা হতে লাগল বেশ জোরেসোরে। এর মধ্যে আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন ধরণের সংস্কার ঘটে গেছে। ছাত্রজীবন শেষ করেছি, সেই সাথে রাজনৈতিক জীবনের ডামাডোলের কালও। যথারীতি রুটি-রুজির ধান্ধায় নানারকম ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। নামকাওয়াস্তে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ আছে কিন্তু তেমন কোন কাজকর্মে অংশ নিই না। প্রতিদিনই ঘুমোনোর আগে একবার ভাবি, নাহ, পার্টির কাজকর্ম জোরদারভাবে শুরু করা দরকার, কিন্তু ঐ পর্যন্তই! এর মধ্যে হঠাৎ একটা ফোন পেলাম। গমগমে গলায় একজন বলল, বিল্লাহ, চিনতে পারছিস, আমি তোর নিত্য স্যার,সংস্কার তো শুরু হয়ে গেছে রে ব্যাটা! এবার তো ঘটনা ঘটে যাবে।’ বলা বাহুল্য, আমি তার মত অত উৎসাহী ছিলাম না, বরং সংস্কারের আড়ালের ঘাপচিকগুলো নিয়েই বেশি ভাবছিলাম। আমার ভাবনা তাকে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। বললাম অনির্বাচিত সরকার বেশিদিন থাকার ঝুকিগুলো কি রকম, বিদেশীরা এ ধরণের সরকার দিয়ে কিভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। এসব কথায় তিনি ততটা পাত্তা দিলেন, উল্টো আমাকে দোষারোপ করলেন এই বলে, ’তোরা বেশি বুজতে গিয়ে কোন কিছুই পরিবর্তন করতে পারিস না।’ আমি মনে মনে কামনা করল]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28740690 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28740690 2007-10-28 15:43:53
আরাম আগে না ব্যারাম আগে? এক.
ডিম আগে না মুরগী আগে জানিনা। গল্প আগে না কবিতা আগে তাও জানিনা। শুধু জানি আমরা একদল একদা আমাদের খুব জ্বর হইছিলো। জ্বরে আমাদের গাঁ খালি পোড়ে আর পোড়ে। সে এক বিরাট সর্বগ্রাসী তাপপ্রবাহরে ভাই। পুড়তে পুড়তে আকাশ আগুন,বাতাস আগুন । পুড়তে পুড়তে জমিন আগুন পাতালও আগুন। মধ্যে মধ্যে জ্বর একটু কমে তখন আরাম লাগে। আবার জ্বর বাড়ে তখন ব্যারাম লাগে।জ্বর আরো বাড়ে তো ব্যারামের চৌহদ্দি ঘর দূয়ার ছাড়িয়ে ,আসমানে উঠে আবার ফিরে এসে ছালার বস্তা দিয়ে আমারে ধরে মুড়িয়ে। ঘাম দিয়া জ্বর একটুখানি ছাড়তে থাকে তো আরাম ও একটু খানি লাগতে থাকে। জ্বর আরো কমে, আরাম আরো লাগে। জ্বর আরো কমে, তখন আবার ব্যারাম লাগে। জ্বর আস্তে আস্তে আসতে থাকে তো আরামও আবার লাগতে থাকে।
(দুই
এতক্ষণ বলেছি ভূয়া কথা, আরাম ব্যারামের ধন্দ রাখিয়া এইবার কব আসল কথা। শুনেন সর্বজন শুনেন মন দিয়া, একখন্ড মেঘ কোথা হতে কোথায় যেন যাচ্ছিল ভাসিয়া ভাসিয়া। গরজণে মেঘ হইল বরষণ,ভিজিল গাঁ, বাধিল জ্বর। অত:পর উৎপাদিত তাপ নিবেদিত হইলো উৎপাদনের চরণে। এই যেমন ছাগল পালন করা অথবা সন্ধ্যাবেলা হাস মুরগী ঘরে তোলা ইত্যাদি বিবিধ। এই সকল কাজ নীচ বিবেচনায় প্রস্থান। সামনে অগ্রসরায়মান অবস্থায় পাওয়া গেল তাপাকাঙ্খী নারীকুল। বুক পকেটে তাপের তখন ভারী ছটফটানি অবস্থা। আমি জানি কেমন সহজেই তাদের গলিয়ে ফেলা যায় সোনার মত, সৃজন করা যায় আশ্চর্য সব কারুকার্য,টেরাকোটা। কিন্তু কেন যেন হৃদয় বীণ বাজেনা তাই সূত্রধর ও তামুক সাজেনা। অথবা চোখে দেখিনা তাই হৃদয় ভরেনা বা হৃদয়ে ধরে (ধারণ) না। কেউ কি আছেন ভাই, আমারে এক টুকরা মোম দ্যান। এই জ্বর তাপ আমি এখন কি করি। আমি মোম গলাই আর দেখি। আবার গলাই আবার দেখি। মোম আর তাপ যুগপৎ নি:শেষ হলেই খেল খতম হবে, পয়সা ও হজম হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28739876 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28739876 2007-10-26 02:17:29
শরতেই জন্মেছিল শরত (খন্ড ত পড়ে না তাই ত)
মানুষ দু’পায়ে হাটে- এ কথা আজ চরম সত্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ চরম সত্য ব্যাপারটি এক সময় অস্তিত্বহীন ছিল। সত্য এরকমই। এক সত্যকে ফালতু বানিয়ে নতুন সত্য প্রতিস্থাপন করার জন্য অপেক্ষা করে ভবিষ্যত। সবকিছুর মধ্যে একমাত্র খাটি সত্য মানুষ ও তার অস্তিত্ব। এবং এ সত্যটাই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্যঞ্জনায় হাজির হয়। কারন সত্যটা সে নিজেই তৈরি করেছে। কোন জিব্রাইলের ডানায় ভর দিয়ে এ সত্য আমদানী হয় নি। করোটির নিচের হলুদ থিকথিকে পদার্থের সুষম ব্যবহারই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অনেকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্যমনস্ক শরত। ঐ হলুদ পদার্থ যেমন তার যথেষ্ট আছে তেমনি সে জানে কিভাবে তার ব্যবহার করতে হয়। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা যারা চিন্তায় পৌঢ়, আমাদের আশা-ভরসার কেন্দ্রে সে। সাহিত্যে বা চিন্তার অন্যান্য জগতে বিদ্যমান চোখ ওঠা রোগের বিপরীতে(ক্যাতরে থিকথিক করে চোখ, কিছুই দেখা যায় না) স্পষ্ট কিছু দেখানোর ক্ষমতা তারই আছে। খুব ভাল লাগত যদি আমি নিজেই শরতের জন্মদিনে একটা গীত রচনা করতে পারতাম। যেহেতু পারিনি তাই অন্যের লেখা একটা গান হাজির করছি শরতের প্রতি। গানটা লিখেছিলেন শহীদুল ইসলাম রিপন।

লিখো দিন লিখো দিন, লিখো রাত লিখো রাত
লিখো সকাল দুপুর সন্ধ্যা
লিখো কাল লিখো কাল, লিখো মহাকাল
যদিও সময়টা বন্ধ্যা।

যদিও তোমার চোখের কোণে
নির্ঘুম রাত্রির ছাপ।
যদিও তোমার কাঁটছে সময়
বিশ্রি নিরুত্তাপ
তবুও লিখো লিখো শ্রাবণ লিখো লিখো
শরত শুভ্র কাশফুল
অন্তর লিখো লিখো বাহির লিখো লিখো
লিখো যত মানবিক ভুল।

লিখো সম্পর্ক, সম্পর্কের ঘুণ
উগরাণো অনিচ্ছুক ভ্র“ণ
লিখো বিরচিত বিষাদের নুন
সন্তাপ লাগা একাকী ফাগুণ
হারিয়ে গেলে বন্ধুর মুখ
লিখো এলিজি
হাঙ্গরমুখো এই সময়ের গল্প
মস্ত কারসাজি
তবুও লিখো লিখো শ্রাবণ লিখো লিখো
শরত শুভ্র কাশফুল
অন্তর লিখো লিখো বাহির লিখো লিখো
লিখো যত মানবিক ভুল।

শুভ জন্মদিন শরত। শুভ জন্মদিন আমাদের ভবিষ্যত।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28730405 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28730405 2007-09-10 13:08:20
উদারীকরণের ফল ভোগ করছে অর্থনীতি
কোনোরকম বাছবিচার ছাড়াই বিদেশি পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে দেশের কৃষি ও শিল্পকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। উৎপাদকের ব্যয় বাড়িয়ে কমানো হয়েছে আমদানিকারদের। ফলে দেশে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশ বিদেশি পণ্যর জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে শুরু করে। একে একে সব রকম পণ্য আমদানিতে নির্ধারিত শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। দেশে বিকাশমান বিভিন্ন খাতকে প্রণোদনা দিতে যে সময় ওইসব পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার কথা সে সময়েই বিদেশি পণ্যর জন্য সব রকম সুবিধা প্রদান করা হয়। কৃষি উৎপাদনের সহায়ক পণ্যের বিপনন ব্যবস্থা ছেড়ে দেয়া হয় ব্যক্তিখাতে। ফলে হু হু করে বাড়তে থাকে এসব পণ্যের দাম এবং উৎপাদন ব্যয়।
আমদানি শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার, ব্যাংক ঋণের সুদ কমানো, ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ নানাভাবে আমদানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর বিপরীতে দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ সংকোচন, কৃষি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাকে কঠিন করে তোলা হচ্ছে। সরকারের একের পর এক পদেেপ দেশের কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমে যাচ্ছে বিদেশি পণ্যের আমদানি ও বিপণন ব্যয়। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় পণ্য। ক্রমশ বিদেশি পণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। আমদানি উদারীকরণের যুক্তি হিসেবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সামনে আনা হলেও এ পর্যন্ত সরকারের কোনও সিদ্ধান্তের ফলাফলই সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। উল্টো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)’র চাপে গত এক দশক ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্য উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা হ্রাসের পদপে অনুসরণ করা হয়েছে। সব রকম পণ্য আমদানির েেত্র তুলে দেওয়া হয়েছে শুল্ক ও অশুল্কজনিত সব রকম বাধা। উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা এবং সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ সত্ত্বেও স্বল্পোন্নত দেশ হয়েও বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ব্যাপক হারে উদারীকরণ করেছে। অথচ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও)’র বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর কোনও পণ্যের শুল্ক হ্রাসের বাধ্যবাধকতা নেই।
২০০৭-২০১০ সাল মেয়াদী আমদানি নীতিতে বিদেশি পণ্য আমদানির সব রকম বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর আগে দেশীয় শিল্প খাত রার জন্য দেশে উৎপাদিত ৫৫ ভোগ্যপণ্য আমদানিরেত ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপিত ছিল। বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে পুঁজির প্রতিযোগিতায় অনেক দেশীয় কোম্পানি টিকতে না পারলেও সীমিত আমদানি নীতির কারণে এই ৫৫টি পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। এসব পণ্যের এলসি মার্জিন তুলে দিয়ে আমদানি অবাধ করায় সংশ্লিষ্ট শিল্পের টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। দেশীয় শিল্প বিকাশের সর্বশেষ অবলম্বনও বন্ধ হয়ে যাবে।
সরকারের আমদানিনির্ভর নীতির সর্বশেষ প্রতিফলন ঘটেছে ব্যাংক ঋণের সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে। মাত্র এক সপ্তার মধ্যে কৃষি ব্যাংকের ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বন্যার আঘাতে বিপর্যস্ত কৃষি খাতের পুনর্বাসনে বিনা সুদে ঋণ বিতরণের প্রয়োজন থাকলেও এক লাফে ঋণের সুদ ৪ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে কৃষি ব্যাংক। অবশ্য বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর বন্যার কারণে বর্ধিত এ সুদ স্থগিত রেখেছে তারা। দু’এক মাসের মধ্যেই এ স্থগিতাবস্থা তুলে নিয়ে নতুন সুদের হার কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে আমদানি ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কৃষি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরেক দফা বাড়বে। ফলে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে আমদানিকারকরা।
রোজার মাসকে সামনে রেখে নিত্য প্রয়োজনীয় ১০টি পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে এলসির ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংক ভেদে এ সুদের হার ছিল ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার বাড়াতে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রোধের যুক্তি দেখানো হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণের সুদ কমানোর কারণে দ্রব্যমূল্য কমবে না। এর আগে মূল্য কমানোর কৌশল হিসেবে বেশ কয়েকটি পণ্যের আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া হলেও বাজারে এর ন্যূনতম প্রভাব পড়েনি। উল্টো প্রতি সপ্তায়ই বাড়ছে সব রকম ভোগ্যপণ্যের দাম। ফলে শুল্ক কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমলেও দেশের মানুষ কোনও উপকার পাচ্ছে না। মাঝখানে সুবিধা ভোগ করছে পণ্য আমদানিকারকরা।
আমদানি পণ্যের ঋণের সুদের হার কমানো হলেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের প্রবাহ হ্রাস করে দিয়েছে বাংলাদেশ। মূলত আইএমএফ’র চাপে গত তিন বছর ধরে এ ধরনের মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে সরকার। সম্প্রতি আইএমএফ অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে আরও বাণিজ্য উদারীকরণের নির্দেশ দেয় এবং দেশীয় পণ্যকে সুরা দিতে ‘সেফগার্ড বডি’ গঠনের বিরোধিতা করে।
শুধু শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রেই নয়Ñ শিল্প ও কৃষি খাত বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমেও দেশীয় খাতকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। গত ৫ বছরে জ্বালানি তেলের দাম ৮ দফা বৃদ্ধির ফলে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। দেশে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এটি একটি বড় কারণ। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি ও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অতীতের প্রভাব বিবেচনা না করেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী দু’এক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। এবার একইসঙ্গে সারের দামও বাড়ানো হবে। ফলে আশংকা করা হচ্ছে, কৃষি ক্ষেত্রে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রতিটি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বাড়বে। ফলে দেশে উৎপাদিত সব পণ্যের দাম বাড়বে।
এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আমদানি শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ কমানো হয়েছে বিদেশি পণ্যের শুল্ক। প্রস্তুতকৃত পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক হার ২৫ শতাংশে বহাল রেখে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর শুল্কহার বাড়িয়ে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অথচ সমজাতীয় বিদেশি পণ্যের আমদানি ব্যয় কমে গেছে। এতে একদিকে দেশের বাজারে স্থানীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে রফতানি সুযোগ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের শিল্প ও কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বিদেশি পণ্য আমদানি সহজ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে দেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি করলে তা অবশ্যই দেশের মানুষকে বেশি দামে কিনতে হবে।
তাদের মতে, আমদানি নির্ভরতা কমাতে না পারলে কোনও পদপেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী হবে না। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার একমাত্র উপায় দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি। এজন্য কৃষকের কাছে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সহজশর্তে কৃষি ঋণ পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে। অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পকে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন পরিষেবায় ভর্তুকি প্রদান, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং কাঁচামাল আমদানির ব্যয় হ্রাস করতে পারলে শিল্প পণ্যের ক্ষেত্রেও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এজন্য আমদানিকারকদের সুবিধা না দিয়ে কৃষক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দিকে তাকানো উচিত। দেশে উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লেও দেশে এর প্রভাব পড়বে না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28728274 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28728274 2007-08-28 17:45:01
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ: কমছে বিদেশী সাহায্য, বাড়ছে নীতি নির্ভরতা ২
উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলোর পরিপ্রেেিত স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সত্যই যদি বিদেশি সাহায্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এতটাই কমে গিয়ে থাকে তাহলে এখন কি এমন ভয় বা আশঙ্কা অর্থ উপদেষ্টা পাচ্ছেন যে তিনি তাদের সবগুলো পরামর্শ যত তিক্তই হোক একের পর এক গ্রহণ করে চলেছেন? তার ওই প্রবন্ধের সিদ্ধান্ত অংশে বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান না হলেও সাহায্যের মধ্যে শর্তহীন ‘অনুদান’ অংশ বৃদ্ধি করে সেদিকে জোর দেয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছিল। এখন মতায় এসে সেই অঙ্গীকারকে ধরে অগ্রসর হলেই তিনি ভালো করতেন এবং সাহস করে প্রতিকুল শর্তযুক্ত বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যানের একটি বাস্তব সুযোগও এবার তার সামনে ছিল এবং আছে।
ওই একই গ্রন্থে আমি নিজেও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল ‘এইড অ্যান্ড পোভার্টি’। সেখানে আমি দেখিয়েছি যে, ১৯৯০ দশকে একদিকে নিট বিদেশি সাহায্য কমলেও অন্যদিকে তাতে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার মোটেও কমেনি বরং বেড়েছে। ১৯৯১ অর্থবছরে আমাদের নিট বিদেশি সাহায্য ছিল ১৪১৫.৪০ মিলিয়ন ডলার বা জিডিপির প্রায় ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। তখন আমাদের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থবছর ২০০০ সালে নিট বিদেশি সাহায্য কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৬৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ জিডিপির মাত্র ৩ দশমিক ২০ শতাংশে। অথচ সেই বছর অর্জিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। পরবর্তীতে একই প্রবণতা আরো সুপ্রকট হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আজো ভয় কিসে?
বিশ্বব্যাংকেরই একটি প্রকাশনায় স¤প্রতি এমন একটি তালিকা মুদ্রিত হয়েছে যা থেকে দিবালোকের মতো বেরিয়ে আসে যে, ‘বিদেশি সাহায্যদাতারা’ মুখে দারিদ্র্য দূরীকরণকে আজ তাদের এক নম্বর ল্য হিসেবে ঘোষণা করলেও তাদের আসল উদ্দেশ্য দারিদ্র্য দূরীকরণ নয়, বরং ধনী দেশগুলোর স্বার্থে অসম বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে আরো অসম করার জন্য দরিদ্র দেশগুলোর উপর তথাকথিত ‘নিও-লিবারেল’ নীতিমালা চাপিয়ে দেয়া। সেই জন্যই আজ যেসব দেশে দারিদ্র্য বেশি তারা কম সাহায্য পেলেও যেসব দেশ নিও-লিবারেল পলিসি অনুসরণে সম্মত হয়েছে তারাও অধিক সাহায্য ভোগ করছে।

বৈদেশিক সাহায্যের প্রকৃত এবং দারিদ্র্য বিমোচনমুখী বরাদ্দ (১৯৯৮)
দেশসমূহ দৈনিক ২ ডলারের নিচে আয়কারী জনসংখ্যা (%) দৈনিক ২ ডলারের নিচে আয়কারী জনসংখ্যা (মিলিয়নে) প্রকৃত সাহায্য, প্রকৃত মোট দেশজ আয় বা জিডিপি (%) দারিদ্র্য বিমোচনমুখী বরাদ্দ প্রকৃত জিডিপির (%)
কম সাহায্যপ্রাপ্ত দেশসমূহের কতিপয় উদাহরণ
বাংলাদেশ ৮৭.৬৩ ১০১.৭২ ১.০২ ৩.৩৮
ইথিওপিয়া
নেপাল ৮৯.০০
৮৬.৭০ ৪৮.৫৩
১৭.৬৪ ২.৯০
১.৭০ ৩.৭৫
২.৭০
অনেক বেশি সাহায্যপ্রাপ্ত দেশসমূহের কতিপয় উদাহরণ
হাইতি
নিকারাগুয়া
মঙ্গোলিয়া ৬৮.২৮
৭৪.৫০
৫৭.২৯ ৪.৬৯
৩.০৭
১.৩৫ ৪.৫১
১০.২১
৪.৩৪ ২.৫২
২.৩১
২.১৩
উৎস : ঈড়ষষরবৎ ধহফ উড়ষষবৎ (১৯৪৪), ঞধনষব ৩, চধমব ৩৫.

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28727195 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28727195 2007-08-22 17:38:38
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ: কমছে বিদেশী সাহায্য, বাড়ছে নীতি নির্ভরতা
সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। বহু আগে থেকেই এ ব্যাপারে বামপন্থী মহল এবং একাডেমিশিয়ানদের প থেকে এসব কথা বলা হচ্ছিল। অবশেষে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও কিছুটা একই সুরে কথা বলা শুরু করেছেন।

নতুন করে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বিরোধিতার পটভূমি
তত্ত্বাবধায়ক সরকার মতায় আসার পর যে বাজেট ঘোষণা করে তাতে দেখা যায় যে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সমর্থিত ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট’ রা করেই অর্থ উপদেষ্টা এগোতে চান। বাজেট ও বাজেট পরবর্তী নীতিমালা পর্যবেণ করলে দেখা যাবে যে, বর্তমান সরকারও তার পূর্বসুরীদের মতো ক) হরে-দরে বিরাষ্ট্রীয়করণের নীতি অব্যাহত রাখতে চাচ্ছে। একই ধারায় বর্তমান পাটকলগুলোর মাথা ব্যথা না সারিয়ে মাথা কেটে ফেলার নীতি অব্যাহত রাখা হয়েছে। খ) বাজেটের আগেই বাজারে সরকারি পণ্যসমূহের যেমন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম নানাভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং বাজেটে কৃষিখাতে ভর্তুকির কথা স্বীকার করা হলেও এসব পণ্যের দাম ‘যুক্তিসঙ্গত’ করার যুক্তি প্রচ্ছন্নভাবে তুলে ধরা হয়। বর্তমান মুহূর্তে দাম ‘রেশানালাইজ’ করার কথা বলে একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ-তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ। সকল মহল থেকে বলা হয়েছে যে, মুদ্রাস্ফীতি যখন গত এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম দুই-অংকের ঘর ছাড়িয়ে যেতে বসেছে, তখন এই প্রস্তাব মেনে নেয়াটা হবে আগুনে ঘি ঢালার শামিল। সুতরাং সকলেই তা ‘আত্মঘাতী’ প্রস্তাব হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও বর্তমান সরকার এই প্রশ্নে এখনো কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। দেখে মনে হয়, সরকার দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে সুযোগের অপোয় আছে।
গ) ‘কাঠামোগত কর্মসূচি’, ‘পিআরএসপি’, ‘পিআরজিএফ’ ইত্যাদি বিভিন্ন গালভরা নীতি ও স্লোগানের আড়ালে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ অনেকদিন ধরেই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশকে ‘পুঁজি বাজার’ ও ‘পণ্যের বাজার’ উন্নত দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু যে কোনো ‘নিওকাসিক্যাল ইকোনোমিক্স’-এর নার্সারি কাসের ছাত্রও বলতে পারবেন যে, চলমান ‘গ্লোবালাইজেশন’ যদি সত্যই সকলের জন্য সমান অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় তাহলে বর্তমান গ্লোবালাইজেশন প্রক্রিয়ায় সর্ব প্রথম ‘শ্রম বাজার’-কে তৃতীয় বিশ্বের উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের বাঘা বাঘা নিওকাসিক্যাল তাত্ত্বিকরা তত্ত্বগত বিতর্কে এ কথা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেও পরে উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সর্বদাই বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন। কারণ এই দুটি সংস্থার গঠন ও গঠনতন্ত্রই এদের উপর সংখ্যালঘিষ্ঠ ধনী দেশগুলোর কর্তৃত্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব অনিবার্য করে তুলেছে। যেহেতু সংস্থা দুটি ধনী দেশগুলোর স্বার্থে গ্লোবালাইজেশন নীতি একতরফা ভাবে আমাদের মতো দেশগুলোতে চাপিয়ে দিচ্ছে সেহেতু দ্রুত আমাদের দেশের পণ্য ও পুঁজি বাজারে বিদেশিদের আধিপত্য বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ায় বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ধীরে ধীরে বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে কৌশলে সে দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বড় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন টেলিযোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বিমান, বন্দরÑএসব প্রতিষ্ঠানকেও ‘দতা’ বৃদ্ধির নামে বিদেশিদের কাছে ধাপে ধাপে হস্তান্তরিত করার নীতি এখনো অনুসৃত হচ্ছে। এমনকি বহুল প্রচারিত ও প্রশংসিত দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এখন পর্যন্ত এসব খাতের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ১২টি ব্যবসায়ী সংগঠন এই প্রসঙ্গে তাদের একটি বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘ব্যবসায়ী স¤প্রদায়-এর আগে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে ‘সেফগার্ড মেজার্স’ সহ রাজস্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ সহায়তা দেওয়ার যে সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছিল সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে অনেক দেশ রপ্তানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন, শিল্পায়নের ভিত্তি মজবুতের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুফল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। আমরা সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এ ধরনের অন্যান্য সংস্থার ব্যবস্থাপত্রের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশি এশিয়ার দেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’
উল্লিখিত বিবৃতি থেকে মনে হচ্ছে যে, ‘আইএমএফের’ এবং সমধর্মী সংগঠনগুলোর সব নীতি না হলেও অন্তত ‘অবাধ আমদানি’ নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নিজের শিল্প এবং ব্যবসা রার স্বার্থেই আজ রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্য পাশাপাশি তারা একান্তভাবে তাদের নিজস্ব স্বার্থে রাজস্ব সুযোগ-সুবিধার দাবিও তুলেছেন।
ঘ) স¤প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘সংকোচনমূলক’ এবং ‘সতর্ক’ মুদ্রানীতি অনুসরণ করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের চাপে কৃষি ব্যাংক ও রাকাব প্রদত্ত কৃষি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি করার পদপে গৃহীত হয়। এছাড়া ব্যক্তি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নানাভাবে ঋণ প্রদানকে সংকুচিত করা শুরু করে। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রদত্ত অন্যান্য ঋণের সুদের হারও না কমিয়ে বরং আরো বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব ব্যাপারেও সকল মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়। এ কথা সহজেই অনুমেয় যে সরকারের সামনে বর্তমানে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বল্গাহীন মুদ্রাস্ফীতি। এতকাল আইএমএফ ও তাদের সহযোগীদের সকল পরামর্শ অনুগত ভৃত্যের মতো আমরা মেনে চলেও যখন মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলাম তখন আবার সেই পুরনো দাওয়াই প্রয়োগের কোনো সুযোগ বর্তমানে নেই। এই পুরনো দাওয়াই বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে এবং ‘কস্ট পুশ ইনফ্যাশান’ তৈরি করবে। বাজারে বিনিয়োগ চাহিদা নানা কারণে ইতোমধ্যেই নিুাভিমুখী। এসব পদেেপর ফলে তা আরো কমে যেতে পারে। পুরো অর্থনীতিতে তখন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান আরো হ্রাস পাবে। সরকার তখন সমূহ বিপদের মধ্যে পতিত হবে। মন্দা ঠেকাবো না স্ফীতি ঠেকাবোÑএই শাঁখের করাতে নিজেকে সরকার স্বেচ্ছায় বলী দেয় কিনা, সেটাই এখন নিকট ভবিষ্যতে দেখার বিষয়।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের ঘর না সামলিয়ে নিজের ঘর সামলাক
আমাদের দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন তার প্রথম ফিন্যান্স মিনিস্টার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিচালক জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম থেকেই বিশ্বব্যাংক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্যের ব্যাপারে সতর্ক মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। তখন থেকেই নীতিগত প্রশ্নে তথাকথিত বৈদেশিক সাহায্য প্রদানকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছিল।
তদানীন্তন পরিকল্পনামন্ত্রী অধ্যাপক নূরুল ইসলাম তার স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন, কীভাবে বিশ্বব্যাংক তখন ‘দ্বিপাকি দর কষাকষির’ বদলে বহুপাকি কনসোর্টিয়াম গঠন করে দর কষাকষি চালাতো। এর ফলে দাতাগোষ্ঠীর সম্মিলিত ‘বার্গেইনিং পাওয়ার’ অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেই যুদ্ধে তখন আমরা হেরে গিয়েছিলাম। শুধু যুদ্ধে হেরে যাওয়াই নয়, আমাদেরকে ‘এইড নেগোসিয়েশন’ চালানোর জন্য ঢাকাকে বাদ দিয়ে প্যারিসকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমাদের শুনতে হয়েছিল ‘বটমলেস বাস্কেট’-এর অপবাদ। যদিও তখনকার বিচারে কেনিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া দুর্নীতির ইনডেক্সে আমাদের চেয়ে বেশি বৈ কম ছিল না। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নীতি প্রণেতারা অপোকৃত অনুগত থাকায় তাদের এই দুর্নাম তখন সইতে হয়নি এবং তথাকথিত বিদেশি ‘সাহায্য’ প্রবাহও সে সব দেশে উদারভাবেই চলেছিল।
পরবর্তীতে প্রথমে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে মন্ত্রিসভা থেকে বিতাড়িত হতে হয়। বঙ্গবন্ধুও সপরিবারে নিহত হন এবং সামরিক ছত্রছায়ায় দাতাগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে দণিপন্থী পথে যাত্রা শুরু হয়। ল্যণীয় যে পৃথিবীর যে সব দেশে সামরিক সরকারগুলো মতায় এসেছে সেসব দেশে বিশ্বব্যাংক ও সমধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ সাহায্য প্রবাহ তুলনামূলক ভাবে বেশি হয়েছে। পাকিস্তান, চিলি, মেক্সিকো, বলিভিয়া, ব্রাজিল এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের এরশাদ আমলটি এ ব্যাপারে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিরাজমান। এমনকি জিয়া সরকারকে দিয়েও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্পগুলোর বিরাষ্ট্রীয়করণ করাতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং জেনারেল জিয়ার তখন যুক্তি ছিল, ‘লাভজনক কারখানা কেন বিরাষ্ট্রীয়করণ করবো?’ কিন্তু পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদই প্রথম সামরিক আইনের ছত্রছায়ায় এ ধরনের ‘প্রাগমেটিজম’ থেকেও আরো দেিণ সরে গিয়ে হরে-দরে বিরাষ্ট্রীয়করণের সাধারণ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সেই নীতিগুলো গণতান্ত্রিক আমলেও আর প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। দিনে দিনে আমাদের সমগ্র নীতি দর্শন দাতাগোষ্ঠীর পকেটে চলে যায়। এমনকি আমাদের গণতান্ত্রিক প্রধান দুইটি দলও একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাতাগোষ্ঠীর প্রতি তাদের আনুগত্য প্রদর্শনে কম-বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠেন। যদিও কখনো কখনো সাইফুর রহমান সাহেব ও তোফায়েল আহমেদ সাহেব নিরুপায় ব্যক্তির মতো মৃদু স্বরে দাতাদের নির্দেশের বিরুদ্ধে কিছু কিছু কথা বলেছেন। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাহেবের সেই বহুল প্রচারিত উক্তিটি আমার মনে পড়ছে, ‘আমরা ড্রাইভিং সিটে থাকলেও স্টিয়ারিংটা রয়েছে দাতাগোষ্ঠীর হাতে।’
তবে বর্তমান মুহূর্তে দাতাগোষ্ঠীর খবরদারির মাত্রা অনেক বেশি। একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়েও তাদের খবরদারি প্রসারিত হয়েছে। এখন তারা গ্যাসের দাম, তেলের দাম, বিদ্যুতের দাম, সুদের হার, শুল্কের হার, ভর্তুকির মাত্রা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানার ধরন, কারখানা বন্ধ করা না করা, সবই নির্ধারণ করে দিতে চাইছেন। এমন কি ‘বিদেশি সাহায্যের’ প্রকৃতিও এখন পরিবর্তিত করে একে ‘অ্যা প্যাকেজ অব থ্রেট অ্যান্ড অফার’-এ পরিণত করা হয়েছে। বার্কলির অধ্যাপক প্রণব বর্ধন এই ধরনের সাহায্যকে তাই নতুন নামকরণ করে ‘থ্রোফার’ (ঞযৎড়ভভবৎ) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ঠাট্টা করে এক অর্থনীতিবিদ সেদিন এক সেমিনারে বলছিলেন যে, বিদেশি সাহায্য বর্তমানে অনেকটা ছাগলের বিষ্ঠা ত্যাগের মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রথমে একটু আসে, তারপরে ‘সংস্কার’ কর্মসূচি কার্যকরী হলে আবার একটু আসে। এইভাবে পর্যায়ক্রমে ক্যারট এবং স্টিকের খেলা চলতে থাকে।

বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা কি অপরিহার্য?
দণিপন্থী দলগুলো ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এতকাল নিরূপায় দর্শকের মতো দাতাগোষ্ঠীর চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে আসলেও অতি স¤প্রতি আঘাত যখন তাদের ঘাড়েই এসে সরাসরি পড়েছে তখন তারাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আমরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক মনে করি। আমাদের দেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সুশাসনের সংকট রয়েছে এ কথা আমরা মানি। কিন্তু এই অজুহাতে সংস্কারের নামে বিদেশি দাতাগোষ্ঠী আমাদের অর্থনৈতিক দর্শন শুধু নয়, খুঁটিনাটি সকল অর্থনৈতিক পদপে নির্ধারণ করে দিবেন, সেটা আমরা মোটেও মানবো না।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ আজ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাংলাদেশের কৃষককে এ জন্য সত্যিই আমাদের ধন্যবাদ দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা আজ বিদেশি সাহায্য যা আসে তার দ্বিগুণ ডলার আমাদেরকে পাঠাচ্ছেন। তাদেরকে আজ শিতি করে উচ্চ উপার্জনশীল শ্রমে রূপান্তরের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। তাদের নিরাপদ ভ্রমণের সুযোগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক ুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নিয়োজিত ল ল শ্রমজীবী মানুষ এবং পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরা যে অমানুষিক খাটুনি খেটে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিকে ৫ থেকে ৬ শতাংশের কাছে নিয়ে এসেছেন, তাদেরকে আরো উৎসাহ উদ্দীপনা যোগাতে হবে এবং নির্মম শ্রমশোষণ কমিয়ে তাদেরকে তাদের যোগ্যতা ও কাজের যথার্থ স্বীকৃতিও দিতে হবে। তাহলে এই প্রবৃদ্ধির হার ৮ থেকে ৯ শতাংশে পৌঁছে দেয়া মোটেও কঠিন হবে না। বিদেশি সাহায্যভিত্তিক এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই পথে আমাদের বিকশিত হতে না দেয় তাহলে ওই সামান্য বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে জাতিকে আজ আত্মমর্যাদার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে হবে ‘লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে)।
আসলে আমরা আজ বিদেশিদের কাছ থেকে কতটুকু সাহায্য পাচ্ছি তার একটি সম্যক ধারণা জাতির সামনে তুলে ধরা কর্তব্য মনে করছি।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘থিংক-ট্যাংক’ হিসেবে পরিচিত সিপিডি কর্তৃক ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ওই গ্রন্থের শিরোনাম ছিল ‘রিভিজিটিং ফরেন এইড’। ওই গ্রন্থে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মীর্জা আজিজুল ইসলাম সাহেবের একটি লেখার শিরোনাম হচ্ছে, ‘দি ম্যাক্রো ইকোনোমিক ডাইমেনসানস অব এইড ডিপেন্ডেনস।’ আমি তার ওই প্রবন্ধের শেষ অধ্যায় ‘কি ফান্ডিংস’ (পৃষ্ঠা নং ১৮৩) থেকেই উদ্ধৃতি তুলে ধরছি,
‘‘১৯৯০-এর দশক থেকে বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ বর্তমান মূল্য ও প্রকৃত অর্থে উভয় দিক থেকেই স্বপ্লোন্নত দেশগুলোতে কমতে থাকে। বাংলাদেশের েেত্রও এটা ঘটেছে।
* তবে বহুমুখী বৈদেশিক সাহায্য সবসমসয় রাজনৈতিক চলকগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কহীন ছিল না এবং তা সচরাচর নানা রকম শর্তাবলীর সঙ্গে যুক্ত ছিল যা নীতিমালাগত স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।...
* বৈশ্বিক বৈদেশিক সাহায্যের েেত্র আরো গুরুত্বপূর্ণ বৈপরিত্য হলো বাংলাদেশে বৈদেশিক সাহায্যের খুব সামান্য অংশ হচ্ছে অনুদান এবং তা ক্রমশ কমতির দিকে।...
* বৈদেশিক সাহায্যের একটি ধরন হিসেবে খাদ্য সাহায্য বলতে গেলে বিলুপ্ত হয়েছে। পণ্য সাহায্য বা কমোডিটি এইড উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু প্রকল্প সাহায্যের (প্রজেক্ট এইড) পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।...
* কতগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক মাপকাঠির নিরিখে বিশেষ করে জিডিপি, বিনিয়োগ ও আমদানির দিক থেকে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা স্পষ্টত দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আমদানিতে অর্থায়নের েেত্র বৈদেশিক সাহায্যের গুরুত্ব কমে যাওয়া এবং আমদানি শুল্কের হ্রাসÑ রাজস্ব খাতে কোনো অবদান না রাখায় বৈদেশিক সাহায্য তাৎপর্যহীন ও গৌণ হয়ে পড়ছে।’’
উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলোর পরিপ্রেেিত স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সত্যই যদি বিদেশি সাহায্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এতটাই কমে গিয়ে থাকে তাহলে এখন কি এমন ভয় বা আশঙ্কা অর্থ উপদেষ্টা পাচ্ছেন যে তিনি তাদের সবগুলো পরামর্শ যত তিক্তই হোক একের পর এক গ্রহণ করে চলেছেন? তার ওই প্রবন্ধের সিদ্ধান্ত অংশে বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান না হলেও সাহায্যের মধ্যে শর্তহীন ‘অনুদান’ অংশ বৃদ্ধি করে সেদিকে জোর দেয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছিল। এখন মতায় এসে সেই অঙ্গীকারকে ধরে অগ্রসর হলেই তিনি ভালো করতেন এবং সাহস করে প্রতিকুল শর্তযুক্ত বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যানের একটি বাস্তব সুযোগও এবার তার সামনে ছিল এবং আছে।
ওই একই গ্রন্থে আমি নিজেও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল ‘এইড অ্যান]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28727187 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28727187 2007-08-22 17:27:52
সংস্কার কৃত
সংস্কার, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক- এ তিন ব্যাপারেই বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’র অসীম উৎসাহ ছিলো। তবে ছিয়াত্তর বছর বয়সে যে সাংস্কৃতিক মানের সংস্কারকর্ম তার উপর প্রযুক্ত হলো তা হজম করার মতো শারিরীক অবস্থা তার ছিলো না।

’বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন যদিও নামের আগে বাবু শব্দের ব্যবহার কোনকালেই তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তার ভাষায় ’এটা নিতান্তই শব্দের অপব্যবহার।’ তার ক্ষেত্রে এটা একেবারেই খাটি কারণ ’বাবুয়ানা’ বলে যে ব্যাপারটা আছে তাতে কখনোই অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। জাতপাত মানা বা মেলামেশার ক্ষেত্রে বাছবিচারের প্রসঙ্গ আসলে তিনি বিরক্তিতে এমনভাবে নাক কুচকে ফেলতেন যেন তাকে ময়লার বাক্সের মধ্যে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবক বয়সে তিনি যথেষ্ট পরিমান গোমাংশ ভক্ষণ করেছেন বলেও জনশ্র“তি আছে। তারপরেও ’বাবু’ যে তাকে ছাড়লো না এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের। থানা সদরের হাইস্কুলের হেড মাস্টার হওয়ার কারণে তার কথার গুরুত্ব যথেষ্ট। তিনি আদিকাল থেকেই গাণিতিক নিয়মে হিন্দুদের বাবু ও মুসলমানদের সাহেব সম্বোধন করতেন। বাংলার শিক্ষক নিত্যরঞ্জন শিউলি এ অমোচনীয় নিয়মের কবলে পড়ে ’ বাবু নিত্যরঞ্জন শিউলি’ হয়েই থাকলেন।

মেরুদন্ডের যেখানটাতে ’ঘা’ খেয়ে তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন, কাকতালীয়ভাবে বছর পনের আগে আমার মেরুদন্ডের ঠিক ঐ স্থানটিতেই মারাত্মক এক গুতো দিয়েছিলেন। সে হিসেবে তার পরিণতিতে আমার খুশিই হওয়ার কথা। কিন্তু খশি হতে পারলাম না। সে সময়টাতে আমি ছিলাম চুপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম ক্লাসের ছাত্র, তিনি বাংলা ব্যকরণের শিক্ষক। ক্লাসে তিনি পড়াতেন অনেকটা নাছোড়বান্দার মতো। ঘন্টা পড়ে যেতো, পরের ক্লাসের শিক্ষক এসে দাড়িয়ে আছেন কিন্তু তিনি নঞ তৎপুরুষ বুঝিয়েই যেতেন একের পর এক উপমা টেনে। ভাবখানা এমন, এত সহজ জিনিসটা বুঝবি না কেন? খুব একটা কাজ হতো না। জমা ও খরচ দ্বন্দ সমাস, চার মাথার সমাহার চৌমাথা দ্বিগু সমাস- এছাড়া আর অন্য কোন কিছু মাথায় ঢুকতে চাইতো না। যে কথা বলছিলাম, কনুই দিয়ে আমার মেরুদন্ডে চরম এক গুতো দিয়েছিলেন তিনি। তার যথাযোগ্য কারণও ছিলো। এইটে থাকতেই সিগারেট ধরেছিলাম। স্কুল ছুটির পরে মূল রাস্তা থেকে যে পথটি নারকেলতলা গ্রামের দিকে গেছে সেই পথের কালভার্টটির উপরে বসে আমরা কয়েকজন মনের সুখে কে-টু সিগারেট টানতাম। আমাদের ক্লাসের কয়েকটা মেয়ে ঐ পথে বাড়ী ফেরার পথে এ দৃশ্য দেখে একটা চোখকপালী ভঙ্গি করে হেটে যেতো। ওদের মধ্যে সেলিনা ছিল একটু বোকাসোকা। পরপর কয়েকদিন একই অবস্থায় দেখে সে একদিন আমাদের সামনে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ’তুই সিগারেট খাইস? আমি নিত্য স্যাররে বইলে দেবো।’
’খালের মধ্যি চুবনি খাতি চালি বলিস’ আঙ্গুল দিয়ে খাল দেখিয়ে বলেছিলাম আমি। পরদিন স্কুল ছুটির পর নিত্য স্যার আমাকে ধরলেন। শান্ত ভঙ্গিতে তিনি বলেছিলেন, ’যখন বড় হবি, বুঝতে শিখবি কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তখন সিগারেট কেন যা খুশি তাই খাস। কিন্তু এখন না, এখনো সময় হয়নি। এবারের মত ছেড়ে দিলাম কিন্তু আর যদি এরকম কোন খবর পাই তাহলে ছাড়ব না বাছা! প্রয়োজনে তোর বাপরে খবর দেব।’

মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল আমার। মিনমিনে সেলিনা, তোর এত সাহস! স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার সময় ঐ কালভার্টের কাছেই ওকে ধরে আচ্ছামত এক চড় লাগালাম। তাতেও রাগ যাচ্ছিল না। এই ঘটনা নিয়ে আর কোন কথা চালাচালি হলে তাকে এসিড মারা হবে, এ ভয় দেখালাম। এসিড মারার খবর তখন প্রায়ই শুনতাম। ভীতিকর কোন কিছু বোঝাতে ঐ উপমাটাই আমার মাথায় এসেছিল। ’এবার অন্তত গাধা ছেমড়িটার শিক্ষা হবে’ ভেবেছিলাম আমি। পরদিন ক্লাসে নিত্য স্যারের চেহারা দেখেই বুঝলাম, ঘটনা হীতে বিপরীত! আজ আমার খবর আছে। ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে ক্লাসে ঢুকেই তিনি আমার এক নাম্বার স্যাঙ্গাত দিদারুলকে বেত আনার নির্দেশ দিলেন। দিদারুল সাথে সাথেই বুঝলো ঘটনা কি। আামার দিকে একবার তাকাল তারপর বেত আনতে লাইব্রেরী রুমে গেল। বিরল কোন দৃশ্যের গন্ধ পেল ক্লাসের অন্যরা। নিত্য স্যার এর আগে কখনো কাউকে বেত দিয়ে মারেননি। ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না তিনি। দিদারুল বেত নিয়ে ফিরলে বেতটা ধরেই ক্ষোভের সাথে বলে উঠলেন, হতভাগা, বেছে বেছে পাতলা বেতটাই এনেছিস? চালাকির শাস্তি হিসেবে দিদারুলের পিঠেই সপাসপ বেত পড়তে লাগল। কয়েক বাড়িতেই ভেঙ্গে গেল দূর্বল বেতটা। হাত থেকে বেতটা ফেলে দিয়ে তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,’বিল্লাহ, সামনে আয়। এতক্ষণে আসলেই ভয় পেয়ে গেলাম আমি। কাছে পেয়ে প্রথমে আমার চুল পেছন থেকে মুঠি করে ধরলেন। তারপর গর্জে উঠলেন, শয়তান ছেলে, তুই একটা মেয়ের মুখে এসিড মারবি! এরপর বা’হাত দিয়ে আমার মাথাটা নীচু করে ডান হাতের কনুই দড়াম করে নামিয়ে দিলেন আমার মেরুদন্ড বরাবর। অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, মুহুর্তেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি। আমার বাবা তখন ক্ষমতাসীন দলের থানা কমিটির সভাপতি। এ ঘটনা নিয়ে যথেষ্ট নাকাল হতে হয়েছিল নিত্যরঞ্জন শিউলীকে। এ আর এমন কি? নাকাল তিনি জীবনে বহুবার হয়েছেন।(অসমাপ্ত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28726470 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28726470 2007-08-18 15:55:04
চিত্তচাঞ্চল্য
আমি জীবনেও কোনদিন আওয়ামী লিগ নই বরং আওয়ামী খুত ধরে ও শ্রেণী সীমাবদ্ধতা আলোচনা করেই জীবনের বড় একটা সময় পার করেছি। ছাত্রলীগের মারও খাইছি একাধিকবার। এমনকি আমি বঙ্গবন্ধুর (তিনি আমার নেতা না হতে পারেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু নি:সন্দেহে) মৃত্যুও মেনে নিতাম যদি না সেটি পাকিস্তানপন্থীদের হাতে না হয়ে সেটি ঠিকই কোন গণবিপ্লব হতো। ব্লগে এসে ৭৪ এর দূভিক্ষ নিয়ে চলছে চলবের পোস্ট দেখে যথেষ্ট চিত্তচাঞ্চল্য হলো। পাকিস্তানের মরুব্বী আমেরিকার ভুমিকার কথা মনে পড়লো। যুক্তরাস্ট্রের নোংরা রাজনীতির কোন সীমা এমনিতেই হয় না, কিন্তু এই নোংরামীর কোন তুলনা হয় না। ভাবতে ভাবতে চাঞ্চল্য আরো বাড়লো। যুক্তরাস্ট্র শেষ পযৃন্ত সফল হয়েছিলা। বঙ্গবন্ধুকে বাচানো যায় নি। পাকিস্তান চোদা জাউরার পয়দারা এরপর অনেকবছর দেশটারে বলাতকার করেছে। ফাকে ফাকে টিকে থাকার স্বার্থে আমরিকার হোগা চাটতে ভুল করে নাই। সেই পাকিচোদা পয়দার একটারে একটু আগে ব্লগে পোস্ট মারতে দেখলাম। চলছে পাকিস্তান, চলবে পাকিস্তান। কিছুটা চিত্তচাঞ্চল্য তো হওয়ারই কথা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28725955 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28725955 2007-08-15 15:24:34
যারা বন্যার্তদের সাহায্য করতে চান তাদের জন্য
শ্রম, দক্ষতা, নগদ অর্থ যেভাবেই পারুন না কেন সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের ত্রাণ কাজে এগিয়ে আসতে পারেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28724864 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28724864 2007-08-09 14:36:34
জানোয়ার পর্যায় থেকে মানুষ হয়ে ওঠা পুরুষের জন্য কতটুকু সম্ভব?
যা হোক, ভাষা বিষয়ক তুলনামূলক আলোচনা এ লেখাটির উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য শিরোনামের প্রশ্নটি যুৎসুইভাবে হাজির করা। গতকালই ব্লগে সন্ধ্যাবাতির একটি পোস্ট পড়া ও সেখানে কমেন্ট করার সূত্র ধরেই এ প্রশ্নের আনাগোনা। সন্ধ্যবাতির পোস্ট.. যেখানে অন্যান্য বিভিন্ন আলোচনার এক পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সময় সুযোগে পুরুষের চরিত্রের জানোয়ার স্বত্তা স্বরূপে প্রকাশিত হয়। পোস্টটি পড়ে তাৎণিকভাবে আমি যে কমেন্টটি করেছিলাম সেটি তুলে দিচ্ছি..

পুরুষ যে জানোয়ার এটা জানার জন্য জ্ঞানী হতে হয় না, যে কোন পুরুষ ভালো করে নিজের ভেতর দেখলেই স্পষ্ট হতে পারবে, স্বীকার করবে কি না তা আলাদা কথা। আস্তিক, নাস্তিক, ধর্মান্ধ, সাধু, বাউল সব পুরুষই জানোয়ার।
আমি জীবনের দীর্ঘ একটা সময় বিশ্বাস করেছি যে, সৃষ্টি হিসেবে নারী পুরুষের চেয়ে উন্নততর। কিন্তু এখন সে বিশ্বাস নেই। তাই যদি হবে, যুগের যুগ পুরুষ নামক জানোয়ার(যেভাবেই হোক না কেন) নারীর ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-ভক্তি-আনুগত্য আদায় করতে পারতো না।
উপসংহার: নারী-পুরুষ উভয়েই জানোয়ার। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে জানোয়ারীত্ব প্রদর্শনের লড়াইয়ে পুরুষ এগিয়ে আছে..
এই যা।

মানব স¤প্রদায় ক্রমাগত নিজের সংস্কার করতে করতে আজকের এ পর্যায়ে পৌছেছে। সংস্কৃতি শব্দটিও এসেছে সংস্কার থেকেই। অর্থাৎ সংস্কৃতি হচ্ছে তাই যা পরিবর্তনের উপায়। মানুষ নিরন্তর নিজেকে পরিবর্তিত করছে কিন্তু ছাগল বছরের পর বছর ধরে একই রকম অস্তিত্ব পার করে যাচ্ছে। এ কারণে ধরে নেয়া হচ্ছে মানুষের সংস্কৃতি আছে, ছাগলের নেই। এবং এ বৈশিষ্টটি জানোয়ার পর্যায় (প্রবৃত্তি) থেকে মানুষ (সংস্কৃতিবান) হয়ে ওঠার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু যতোই সংস্কৃতিবান হোক না কেন মানুষ প্রবৃত্তির কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হচ্ছে ুধা ও যৌনতা। ুধা বিষয়টি অনেক সরল। যে কোন শ্রেণী বা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ুধা একই রকম আবেদন নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু যৌনতার বিষয়টি ভিন্ন। নারী ও পুরুষের েেত্র যৌনতার বিষয়বস্তু, আবেদন, ভাবার্থ ইত্যাদির মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান রচিত হয়েছে। একজন উর্ধতন অন্যজন অধস্তন। একজন ধর্ষণ করে আরেকজন ধর্ষিত হয়। যৌনতা হচ্ছে এমন একটি ব্যাপার যাতে করে প্রবৃত্তির কাছেই ফিরতে হয়। সংস্কৃতিবান মানুষ তার সংস্কৃতি নামক খোলসটি ঝেড়ে ফেলে তার আদি অস্তিত্বে প্রত্যাবর্তন করে। বিষয়টি ভাব অর্থে যেমন বস্তুগত অর্থেও তেমনই। জামাকাপড় পরতে শেখাটা মানুষের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। কিন্তু যৌনকর্মে অংশগ্রহণ করার সময় এই সংস্কৃতিকে তার ছাড়তে হয়। না ছেড়ে উপায়ও থাকেনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে যৌনতার কি ধারণাগত কোন পরিবর্তন ঘটেনি। প্রবৃত্তির এই আদিম রূপে প্রত্যাবর্তনের সময় সে কি জানোয়ার রূপে না গিয়ে মানুষ রূপে যেতে পারার যোগ্যতা অর্জন করেনি? কিছুটা তো হওয়ারই কথা। নারী-পুরুষ যৌনতায় একে অপরের পরিপুরক হয়ে উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে গোলমাল লাগিয়ে দিলো ঐ উর্ধতন এবং অধস্তনতা। আমি পরিবারের মালিক, আমি সম্পত্তির মালিক, আমি সন্তানের মালিক, সব কিছু আমারই ভোগ দখলের নিমিত্তে; এক পরিবার প্রথা উদ্ভুত হওয়ার পর থেকে পুরুষ যখন মালিক বনে গেল তখন থেকে যৌনতার ভেতরেও মালিক এবং অধস্তন- এ দু ধারার সূচনা ঘটলো। ফলে, আদিতে যেটা ছিলো তুলনামূলক সুস্থ সেই যৌনতার ধারণায় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটলো উল্টো পথে। যতো দিন গেল ততোই পুরুষের সহযোগী ভূমিকার চেয়ে আধিপত্যমূলক অবস্থান তীব্র হলো। বোঝাপড়ার মাধ্যমে আনন্দলাভ নয় বরং দন্ডমূন্ডের কর্তা হয়ে ভোগ- এ ধারণার প্রসার পুরুষের জানোয়ার সত্ত্বাটাকেই মানুষ সত্ত্বার উর্ধে স্থাপন করলো, বলা ভালো যে প্রতিস্থাপন করলো।

এই আমার প্রশ্ন। এখন উত্তর খোজা হোক, জানোয়ার পর্যায় থেকে মানুষ হয়ে ওঠা পুরুষের পে কতোখানি সম্ভব?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28724143 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28724143 2007-08-04 13:23:17
নির্বোধ মুসলমানেরা বন্ধুও চিনে না!
অন্যসব বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পিয়াল ভাইকে যারা ভালোমত চেনে তা সে হোক শত্রু বা মিত্র, তাদের বোঝা উচিত পিয়াল ভাই মুসলমানিত্বের শত্রু নয় (অপর বাস্তব দ্রষ্টব্য)। এমনকি তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছে এদেশের ৯৯ ভাগ মুসলমান। স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি স্বীকার করেছেন, তার চেতনার সিংহভাগ জুড়ে অবস্থান করে আছেন শেষ নবী হযরত মুঃ সাঃ।

পিয়াল ভাইকে আনব্যান করা হোক এ দাবী করিছ না কারণ যার কাছে দাবী করবো তাকে বোধসম্পন্ন হওয়া দরকার, নির্বোধের কাছে দাবী করাকরি নির্বোধদেরই সাজে।

কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে নির্বোধ মুসলমানরা শত্রু-মিত্র চিনতে শিখছে না এটা ভেবে মনটা খারাপ হচ্ছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28723274 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28723274 2007-07-29 18:15:47
গোমুখাসনে বোতলবন্দী জীন ৪
ঢাকাই ছবির কয়েকটা প্রযোজনা সংস্থার ছাপাছাপির কাজ আমি করতাম। এ সূত্রে এফডিসিতে আমার টুকটাক যাতায়ত ছিলো। পুরোনো কিছু বকেয়া টাকার সন্ধানে আবারো নিয়মিত এ ঘরানার লোকজনের পিছনে পিছনে ঘুরতে ঘুরতেই আচমকা মাথায় এক আইডিয়া চলে আসলো। সে অনুযায়ী কাজও শুরু করে দিলাম। কেউই টের পেলো না ফাকতালে আমি কি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মাসখানেক পরে চালু একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ’ অশ্লীল ছবির নেপথ্য রহস্য যেখানে’ শিরোনমে হাসান রাশীদের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হলো। প্রতিবেদনে এমন কিছু তথ্য ছিলো যা এর আগে কখনো কোন বিনোদন সাংবাদিক উপস্থাপন করতে পারেনি। এ নিয়ে বিরাট হৈচৈ পড়ে গেল। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে আমার প্রতিবেদনের উল্লেখ করে সম্পাদকীয় লেখা হলো। এ লাইনের লোকজন রাতারাতি আমার নাম জেনে গেল। যে সাপ্তাহিক পত্রিকায় এটা ছাপা হয়েছিলো তারা তো পারলে আমাকে মাথায় করে নাচে। প্রতিবেদনের ফলোআপ করার জন্য আমাকে অনুরোধ করলো। এ কাজে আবারো এফডিসি যেতে হলো আমাকে। আমাকে এফডিসিতে দেখেই তেড়ে এলো বেশ কয়েকজন নির্মাতা। এর মধ্যে অশ্লীল সিনেমার নির্মাতা হিসেবে রীতিমত বিখ্যাত আবু শরাফত টিপু গালি দিয়ে বলতে লাগলো, শুয়োরের বাচ্চারে ধর, আইজ ওর একদিন কি আমার একদিন। ভালো মানুষের ভেক ধইরা কি সর্বনাশটাই করলো রে.. ওর রেহাই নাই।’ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জানের ভয়ে দৌড় লাগালাম আমি। তারা ধাওয়া করলো আমাকে। দেখা গেল বিভিন্ন দিক থেকে দৌড়ে আসছে ফটো সাংবাদিকরা। ধাওয়ার এক পর্যায়ে যখন আমি ধরা পড়ে গেলাম তখন পুলিশও চলে এসেছে। দু একটা কিল ঘুষি পড়তে না পড়তেই পুলিশ আমাকে উদ্ধার করলো। এর আগে লোকজন আমার নাম জেনেছিলো, এবার আমি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। পরেরদিন প্রায় সবগুলি পত্রিকার প্রথম পাতাতেই আমার ছবি আসলো। সাংবাদিক নির্যাতন বলে কথা! সুস্থ্য ছবির নির্মাতা, নাগরিক সমাজ, এনজিও ওয়ালা ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন এ ঘটনার প্রতিবাদে পত্রিকায় বিবৃতি দিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকের বিনোদন পাতার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি নিলাম আমি।

হঠাৎ করে তৈরি হওয়া জীবনের এই নতুন অধ্যয়ে ভালোমতই অভ্যস্ত হলাম; হাই প্রোফাইল বিনোদন সাংবাদিক। শোবিজ জগতের সব স্টারদের নিয়েই কাজ কারবার। টিভি স্টার ও মডেলদের সাথে একটু দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করে ব্যক্তিত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট হলাম। আমি তো আর যেনতেন সাংবাদিক না যে অন্যান্যদের মতো স্টারদের পেছনে ছোকছোক করবো। এ কৌশল কাজ দিলো। ব্যাক্তিত্ব সচেতন ভাবগম্ভীর হিসেবে আমার একটা অবস্থান তৈরি হয়ে গেলো। মাঝে মাঝে চিন্তা করি আর মনে মনে হাসি। কিন্তু ঢাকাই ছবির পরিচালক এম আই বাবলুর সাথে আমার দোস্তি দারুন জমে গেলো। বাবলু ভাইয়ের টাইপটাই এরকম যে কোন ভাবগাম্ভীর্য কাজে আসে না। গভীর রাত পর্যন্ত তার ডেরায় বসে বাংলা মদ খাওয়ার নেশায় পড়ে গেলাম, উপরি হিসেবে মাঝেমধ্যেই পাওয়া যেতো নাজমা ও সুমাইয়াকে। এরা দুজনেই বাবলু ভাইয়ের খোদ লোক। এক্সট্রার রোল করে। পেটে বাংলা মদ ও মোটাসোটা গোলগাল দুই মেয়ের রংঢং; বাবলু ভাইয়ের চরম ভক্ত বনে গেলাম। চিকনা চাকনা যে মডেলগুলির দিকে ব্যাক্তিত্ব বাঁচিয়ে আড়ে আড়ে তাকাতাম তাদের প্রতি বাস্তবিকই উন্নাসিকতা পেয়ে বসলো। দেখলেই মনে হতো, এগুলি হাভাতে না কি? সন্ধ্যা হলেই আমার মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতা গোপন থাকলো না। জেসিকা টের পেতে শুরু করলো। তবে ওর প্রতি আমার টান কিন্তু একবিন্দুও কমেনি। সতিসত্যিই আমি তাকে ভালোবাসি। সুতরাং যা কিছু করতাম সবই খুব খেয়াল করে। কোনদিন যদি দেখতাম কোনভাবেই সন্দেহ যাচ্ছে না তার, না বুঝতে পারার তাড়নায় আক্রান্ত হচ্ছে তাহলে সেদিনের জন্য মৌজমাস্তি বাদ দিয়ে তাকেই সময় দিতাম এবং যেকোন ভাবেই হোক না কেন তার সংশয় দুর করতাম।

এ সময়কালেই আমার সাথে খাতিরের সুযোগ নিয়ে এম আই বাবলু চরম অশ্লীল এক ছবি বানালেন। ছবিটার কাটপিস ফুটেজগুলি আগেই দেখেছিলাম। অনায়াসে এক্স রেটেড দিয়ে চালানো যাবে। বাবলু ভাইকে বারবার বললাম, ’ভাই এ জিনিস তো সেন্সরে আটকে দেবে।’ কিন্তু কিভাবে কিভাবে তিনি ঠিকই ছবিটা সেন্সর থেকে বের করে নিয়ে আসলেন। ছবিটা যেদিন মুক্তি পেলো সেদিনই বাসায় এসে একটি দামী রেফ্রিজারেটর ও ফ্ল্যাট স্ক্রীন টিভি দেখতে পেয়ে বুঝলাম, বাবলু ভাই আমার কাছে কি চান। একজন লোক এত আশা করে আমার মুখ চেয়ে আছে আর আমি তার প্রত্যাশা পুরণ করবোনা তাতো হয় না। ঐ দিন সন্ধ্যায় আমি সবগুলি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার বিনোদন সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করে তাদের এক জায়গায় করলাম। আগ বাড়িয়ে তাদের বললাম যে আজই মুক্তি পাওয়া ’সুদে আসলে উসুল’ ছবিতে অশ্লীল দৃশ্য সংযোজন করা হচ্ছে যা নিউজ করা উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পরিচালক এম আই বাবলু আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমার, এটাও বিবেচনা করা দরকার। করণীয় নির্ধারণে সকলের পরামর্শ চাইলাম। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বাবলু ভাইয়ের বাসায় এ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। কোন আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই বাবলু ভাইয়ের উপহার পৌছে গেলো হাতে হাতে। এদিন রাতে সুমাইয়া ও নাজমার সাথে যুক্ত হলো আরো দু’জন, শাহানা ও নাসরিন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক পর্যায়ে হাজির হলেন চিত্রনায়িকা রঞ্জনা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশী মদতো ছিলই। শেষ রাতে ঘোর জড়ানো কন্ঠে উপস্থিত সাংবাদিকরা আমাকে অনুরোধ করলো, যেহেতু বাবলু ভাই আমাদের ইনফরমার এবং বিশিষ্ট সজ্জন সেহেতু ’সুদে আসলে উসুল’ ছবিটার খবর আমরা যেন চেপে যাই। আমি বুঝলাম, কেল্লা ফতে!

সকলের নাকের ডগা দিয়ে ’সুদে আসলে উসুল’ দিব্যি চলতে লাগলো এবং বিরাট ব্যবসাসফল হলো। বাবলু ভাইয়ের সাথে আমার আন্তরিক বন্ধন আরো নিবিড় হলো। হঠাৎ একদিন আমার লায়েক ভাইয়ের কথা মনে হলো। যতদুর জানি, তার পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। তাকে খুজে বের করে বাবলু ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলাম। এবার অন্তত বেচারা ভালোমতো বাঁচতে পারবে। একবছরের মধ্যেই ’পুলিশ কনস্টেবল’ ’নায়কের গোবেচারা ভাই’ ইত্যাদি বেশকিছু চরিত্রে অভিনয় করে লায়েক ভাই তার চেহারা রীতিমত পরিচিত করে ফেললেন। এতোখানি তিনি পারবেন ভাবাই যায়নি। এমনকি বাবলু ভাইও তার প্রশংসা করতে লাগলেন। তবে আমি বা বাবলু ভাই কেউই তখনো জানতাম না কতোবড়ো বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারেন লায়েক ভাই। ’ বেদের মেয়ে জোসনা’ খ্যাত পরিচালক মোজাম্মেল হোসেন বকুলের নতুন ফোক ছবি, ’বংশী বাজায় কে’ তে নায়ক হিসেবে কাস্ট হলেন লায়েক ভাই। নাম নিলেন ফোরকান শাহ। ছবির মহরতে পরচুলা পরা ঝকঝকে মেকআপে লায়েক ভাই ওরফে ফোরকান শাহকে দেখে মনেই হলো না, এই লোককে কখনো চিনতাম আমি। বেদের মেয়ে জোসনা’র চেয়ে বেশি আলোড়ন তুললো ’বংশী বাজায় কে’। বহুবছর পর ঝাকে ঝাকে বাঙালী সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ’বংশী বাজায় কে’ দেখার জন্য। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, ’বংশী বাজায় কে’ না দেখানোর জের হিসেবে স্বামীর ঘর ছেড়েছে যুবতী বধু। ময়মনসিংহে এক সিনেমা হলে ছবি দেখতে এসে হলের মধ্যেই পূত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে আরেক গৃহবধু। এরকম কোন না কোন খবর পত্রিকার পাতায় লেগেই ছিলো। দেশের হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ের অন্ত:পুরে জায়গা করে নিলেন ফোরকান শাহ। এমনকি আমি নিজেই ভূলতে বসলাম, এই লোকের নাম একসময় লায়েক ছিলো। মজার ব্যাপার এই যে, তিনি তখনই লায়েক হলেন যখন তিনি লায়েক নামটিকে পরিত্যাগ করলেন।

কলকাতায় অর্থাৎ টালিউডে ’বংশী বাজায় কে’ ছবির রিমেক হলো। তাতেও অভিনয় করলেন ফোরকান শাহ। ওখানেও ছবিটি হিট হওয়ায় দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তিনি। এমনকি পরিচালক আবু জাহিদের ভিন্ন ধারার ছবি ’বারবনিতা’ তে অভিনয় করেও সুনাম অর্জন করলেন ফোরকান শাহ। যতদিন যাচ্ছিলো আমি শুধু অবাকই হচ্ছিলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722434 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722434 2007-07-24 17:48:14
গোমুখাসনে বোতলবন্দী জীন ৩ শেষ পর্যন্ত কাজটা ঠিকঠাক মত প্রেসে উঠলো কিন্তু দূঃশ্চিন্তার অনেক কিছু তখনো বাকী। ব্যাংকের প থেকে বেশ কিছু বিষয়ে মান নিয়ন্ত্রনের জন্য বলা হয়েছিল যেগুলি ঠিকঠাক না হলে যে কোন সময় কাজ বাতিল করে দিতে পারে তারা। বিশেষ করে তারা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছিল তাদের লোগোর রংয়ের উপর। এ বিষয়ক পূর্বাপর কিছু ঘটনা আমাকে জানিয়েও দেয়া হয়েছে। প্রথম দিন পুরো সময়টাই প্রেসে থাকলাম আমি। সবকিছু সঠিক ভাবেই এগোলো। তবে একদিন ঠিক চললেই তো হয়ে গেলো না। ৪ পাতার ক্যালেন্ডারই হচ্ছে ১ লাখ। ৪ রংয়ের ছাপা। অর্থাৎ মোট ১৬ লাখ ইমপ্রেশন। তার মানে দাড়ায়, শুধু ক্যালেন্ডারই ছাপা হবে ১০/১২ দিন ধরে। সময়ও একটা ব্যাপার। ঠিক সময়ে মাল ডেলিভারী দিতে হবে। খুব খেয়াল করে, খুব খেয়াল করে.. জেসিকাকে ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলতে পেরেছি যে কারনে একটা বিপত্তি থেকে অন্তত রা পাওয়া গেছে। ঝামেলাটা হয়েছে ওর এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বিয়ে পড়ে গেছে এর মধ্যেই। এ নিয়ে তেমন কোন চাপ ও আমাকে দেয় নি। শুধু একদিন আমি ওর সাথে থেকে বিয়ের দিনে ও কোন পোশাকটা পরবে তা পছন্দ করে দিয়েছি। পোশাকটা দারুন! অনেকটা আকাশীর মতো রং, আবার ঠিক আকাশীও নয়।

আসল বিপত্তি হলো অন্যখানে। অনেক চেষ্টা করেও জেসিকার পোশাকের রংয়ের শেডের লিপস্টিক খুজে পেলো না। এ নিয়ে ওর খুব মন খারাপ হলো। এতটা দূঃখ করে আমাকে কথাটা বললো সে যে আমার মনে হলো, যদি এই রংয়ের লিপস্টিক খুজে বের করতে না পারি তাহলে আমার জীবনটাই বৃথা। প্রথমে শুনে নিলাম, খোজা হয়েছে কোথায় কোথায়? যেসব শপিং সেন্টার এখনো খুজতে বাকী সেগুলো টার্গেট করে খুজতে থাকলে পাওয়া যেতেও পারে, ভাবলাম আমি। প্রেসে ঐ গুরুত্বপূর্ণ ছাপাটা চলতে না থাকলে এটা কোন ব্যাপারই ছিলো না, আকাশী রংয়ের লিপস্টিক প্রয়োজনে পয়দা করতাম। একটু দরিদ্র বন্ধুবান্ধব যারা ছিলো, ফোন করে প্রায় তাদের সবাইকেই কাজে লাগিয়ে দিলাম, লোভ দিলাম কাজ হাসিল হলে বিরাট পার্টি হবে। কাপড়ের স্যাম্পল ছিলো আমার কাছে। কাপড়টা স্ক্যান করে ইনজেক্ট পেপারে প্রিন্ট নিয়ে ধরিয়ে দিলাম সবাইকে, এই রংটারই শেড মিলাতে হবে। জেসিকার বান্ধবীর বিয়ের ঠিক আগের দিন দুপুর পর্যন্ত লিপস্টিকের কোন হিল্লে হলো না। এ সময়টাতে আমি প্রেসে ছিলাম। ক্যালেন্ডারের দুই রং ছাপা ইতিমধ্যে ঠিকঠাক মতো হয়ে গেছে। এখন হলুদ ছাপা হবে। লোগোর রং মেলাতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরমধ্যে জেসিকার ফোন এলো, জানতে চাইলো আমি কোন খোজ পেয়েছি কিনা। তখন পর্যন্ত আমার কাছে কোন খবর এসে পৌছায় নাই, ’তুমি অন্য একটা ড্রেস পরো বরং’ বললাম আমি। টের পেলাম ওপাশ থেকে গলাটা কেমন ধরে এসেছে তার। বুকটা ভারী হয়ে গেল আমার, কোথা থেকে উড়ে এসে এক অযাচিত মর্দামী ভর করলো । বললাম, কোন চিন্তা না করে তুমি তোমার প্রস্তুতি নাও, কাল বেলা ১২ টার মধ্যে পৌছে যাবে তোমার কাঙ্খিত বস্তু’। বললাম তো বটে, কিন্তু কিভাবে এটাকে কার্যকর করা যাবে তা ভেবে বিরাট টেনশনে পড়ে গেলাম। কোয়ালিটি প্রিন্টার্সের ম্যানেজার সুজনের কথাতেও মনযোগ দিতে পারলাম ঠিকমতো। বিকেলে টঙ্গী থেকে ফোন করলো আমার পুরোনো বন্ধু স্টক লটের ব্যবসায়ী আযম। সে আছে চেরাগ আলী আলাউদ্দিন সুপার মার্কেটে। সে খবর দিলো, আমার চাহিদা অনুযায়ী রংয়ের লিপস্টিকের একটা লিংক পাওয়া গেছে। তবে ব্যাপারটা অতো সহজ না, তার ভাষায় চরম জটিল। আমাকেই যেতে হবে যদি কাজ হাসিল করতে চাই। দুপুরের পর থেকে ইলেকট্রিসিটি না থাকায় হলুদ রংয়ের ছাপাটা এখনো উঠানো যায় নাই, এটা নিয়েও আরেক টেনশন। ইলেকট্রিসিটির এ অবস্থা থাকলে সময়মত মাল ডেলিভারী যে কিভাবে হবে? হয়ে যাবে, কাজ আটকাবে না, নিজেকে ভরসা দিলাম আমি। টঙ্গীর পথে রওনা দিতে গেলে সুজন আতকে উঠলো, বললো, করেন কি? ছাপাটা তো শুরু হোক, তারপর যান।’ আল্লাহর নাম নিয়ে ছাপা শুরু করে দ্যান, উপরে আল্লাহ, নিচে আপনি, বলতে বলতেই রওনা হলাম আমি। বিকেল ৫ টার দিকে চেরাগ আলী আলাউদ্দিন সুপার মার্কেটে পৌছালাম। আযম আগে থেকেই ওখানে ছিলো। মার্কেটের ৩ তলায় বিউটি কর্নারের সত্বাধিকারী আলী বাহাদুরই হচ্ছেন সেই লোক যাকে কেন্দ্র করে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো দেখা যাচ্ছে অর্থাৎ আকাশী রংয়ের লিপস্টিক প্রাপ্তির েেত্র এ মুহুর্তের খোদ লোক যাকে বলে। কিন্তু আলী বাহাদুর সাহেবের সাথে কথা বলে আমার প্রত্যাশার বেলুনটা চুপসে যেতে ধরলো। ঘটনা হচ্ছে, চীন থেকে কিছু কসমেটিক আইটেম আমদানী করছে আলী বাহাদুর। ধারণা করা হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশার বস্তু এই লটে থাকবে। কিন্তু লট এসে পৌছবেই আজ রাতে। বিভিন্ন লোকের অর্ডারের মাল, কোনটা কোথায় কিভাবে আছে তা ভালোভাবে সনাক্ত করাই অন্তত দুদিনের কাজ। অথচ এরই মধ্যে রয়েছে আমার কাঙ্খিত বস্তু। আলী বাহাদুরের মতে, এটি অবশ্যই পাওয়া যাবে কিন্তু তার জন্য আমার সময় নিতে মাত্র তিনদিন। মনে মনে গালি পাড়লাম, আরে ব্যাটা তিনদিনই যদি সময় থাকতো তাইলে তোর ধামা ধরে বসে থাকা কেন? সমাধানের অন্য আরেকটি রাস্তা বাৎলে দিলেন আলী বাহাদুর। মধ্য রাতে মাল এসে পৌছনোর পর গোডাউনে ঢুকবেন আমাকে নিয়ে। যদি খুজে পাওয়া যায়। সময় আছে আগামীকাল বেলা ১২টা পর্যন্ত।

সকাল ৭টার দিকে বহু সাধনার ধন যখন হাতে পাওয়া গেল, আনন্দে এত জোরে চেচিয়ে উঠলাম যে ঢুলুঢুলু চোখে ঝিমাতে থাকা আলী বাহাদুরের ঝিম পুরোপুরি ছুটে গেল। বললো, করেন কি মিয়া? ভয় পেয়ে গেছি না! দু চোখ ঘুমে ভেঙ্গে আসলো আমার। রাতে সুজন ফোন দিয়ে কি একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে ব্যাটারী ডাউন হয়ে মোবাইল বন্ধ হয়ে গেলো। যে জাজ্বল্যমান সমস্যা তখনো আমার সামনে উপস্থিত ছিলো তাতে অন্য কোন সমস্যা নিয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থাও ছিলো না। ওদিকে কি অবস্থা কে জানে? ভাগ্য আমার সহায় হবে, যেমন হয়ে এসেছে আগে পরে, এ ভেবে আবারো নিজেকে প্রবোধ দিলাম। মনে চাইলো এখনি জেসুকে ফোন করে খবরটা দেই, কিন্তু মোবাইলে কোন চার্জ নেই তাছাড়া এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গে না ওর। কি দরকার, একবারে পৌছে ওকে বিস্মিত করে দেবো। কান্তিতে পারলে গোডাউনেই ঘুমিয়ে পড়তাম, কিন্তু আলী বাহাদুর প্রায় ঘাড়ে করে নিয়ে তার বাসায় শুইয়ে দিলো। সাড়ে ১১টার আযম এসে ঘুম ভাঙ্গালো। কপাল ভালো, তার মাথায় ছিলো, নচেৎ তীরে এসে তরী ডুবতো। দেখার মতো উস্কোখুস্কো চেহারা নিয়ে একটানে পৌছে গেলাম আদাবর। আযমের ফোন থেকে জেসিকাকে বাইরে আসতে বললাম, মনে আমার দিগ¦ীজয়ের আনন্দ। ছোট্ট প্যাকেটটা হাতে পেয়ে ও বুঝতে পারলো এতে কি আছে, কিন্তু চোখেমুখে অবিশ্বাস। খুলে যখন নিশ্চিত হলো যে সব ঠিকই আছে, কেঁদে ফেললো সে। আমি ভাব ধরলাম যে এ আর এমন কি, এ নিয়ে এত উচ্ছাসের কি আছে।

বাসায় ফিরে চোখেমুখে পানি দিয়ে কড়া এক কাপ চায়ে দু চুমুক দিয়েই যেন ২৪ ঘন্টার ঘোর কাটিয়ে ফিরে এলাম বাস্তবে। নিজের প্রতি যারপরনাই বিরক্ত হলাম, অবাক হলাম এইভেবে যে এতখানি বাড়াবাড়ি করার মত একটা স্বত্তা আছে আমার তাতো জানতামই না। তবে সবচেয়ে বেশি হলাম দূঃশ্চিন্তাগ্রস্থ। দ্রুত ফোনটা সচল করে সুজনকে কল দিলাম। সুজনের গলার স্বর শুনে বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। ’ফোনে কথা বইলা লাভ নাই, তাড়াতাড়ি প্রেসে আসেন’ ঠান্ডা গলায় বললো সে। মনের মধ্যে কু ডাক ডাকতে লাগলো বিষমভাবে। আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম, আল্লাহ এবার আমাকে রা করো, নিজের কাজেতো বটেই নামায রোযার েেত্রও আর কোন গাফিলতি করবো না। সবকিছু সহিসালামতে হয়ে গেলে বাবা খানজাহানের দরগায় একটা ছাগল দেবো বলে মানত করলাম। কিন্তু ছাপার যে পরিনতি হয়েছে তাতে কোন মানত কাজে আসবে বলে মনে হলো না। লোগোর রং দেখে আমি স্বামীহারা বিধবার মত বিলাপ করে উঠলাম। মাথাটা ঘুরতে লাগলো, মনে হলো পড়ে যাবো। সুজন এস আমাকে ধরলো।

’ কোন উপায় ছিলো না, যে পার্সেন্টেজ এ প্লেট বানানো হইছে তাতে ছাপার রং এরকমই হয়,বলা শুরু করলো সুজন, ’ ডিজাইন, আউটপুট, প্লেট সবকিছু নতুন করে করা লাগতো, কিন্তু আপনের ডেলিভারীর ডেটে তাইলে কুলাতো না। এদিকে আপনের মোবাইলে পাইলাম না, দূঃখিত কয়। শেষে কি করা, ভাবলাম পার্টিপুর্টির সাথে ভালোইতো খাইখাতির আপনের, এইটুক উনিশ-বিশ মানায় নিতে পারবেন না। দিলাম ছাপা রানিংয়ে তুলে, তেমন অসুবিধা হয় নাই, কি বলেন? এর চেয়ে কতো বড়ো বড়ো ঝামেলাওয়ালা কাজও চলে যায়, এতো মামুলি ব্যাপার।’

’সময় লাগলে সময় দুইদিন বাড়ায় নিতাম, লোগোর রং ঠিক হয় নাই, এ দিয়ে এখন কি হবে’ হাহাকার করে উঠলাম আমি।’ তুই হারামী আমার এ কি সর্বনাশ করলি’ রাগের চোটে নিজের মাথার চুল টানতে থাকলাম গায়ের জোরে। ’ভালো করতে গিয়া মন্দ হইলাম, এ কারণেই তো বললাম, থাকেন। আপনে থাকেন নাই, ফোন বন্ধ করে রাখছেন, আমার কি করা’ যান্ত্রিক গলায় বলে দ্বাািয়ত্ব শেষ করলো সুজন।

পরের দু দিন উন্মাদের মত মতিঝিলে ঐ ব্যাংকের হেড অফিসে দৌড়াদৌড়ি করলাম। ফায়দা হলো না। ছাপাটা বাতিল হলেও অফিস থেকে আমাকে বলা হলো, কাজটি আমার প্রতিষ্ঠানই করবে, এমনকি এক সপ্তাহ সময়ও বাড়িয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু তারা তো জানেনা বা জানলেও বুঝে উঠতে পারছে না যে ১২ লাখ টাকার কাগজের ছাপা বাতিল হয়ে গেলে আমার পে এ কাজটি আবারো করা সম্ভব না। বারবার এ ছাপাটি চালানোর অনুরোধ জানিয়ে আমি অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিরক্ত করতে সমর্থ হলাম কিন্তু কাজ আদায় করতে পারলাম না।

দ্রুত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলো আমাকে। অফিসের বাড়ীওয়ালা কে জানিয়ে দিলাম, সামনের মাস থেকে অফিস ছেড়ে দিচ্ছি। অগ্রীম জামানতের টাকা ফেরৎ নিয়ে ডিজাইনার, একাউন্ট্যান্ট ও পিয়ন এই তিন কর্মচারীর বকেয়া বেতন শোধ দিয়ে জানিয়ে দিলাম, তাদের চাকরি শেষ। ফার্নিচার ও কম্পিউটার গুলি বিক্রির টাকা এবং হাতে থাকা নগদ ক্যাশ যা ছিলো তা দিয়ে বাকী বকেয়া পরিশোধ করলাম যতদুর সম্ভব। তারপরেও মার্কেটে প্রায় চার লাখ টাকা দেনা থাকলো। উপায়ন্তর না পেয়ে ভুতের গলির বাসা ছেড়ে দিয়ে ফেরারী হয়ে গেলাম। তবে এরপরেও আমি আবার ঘুরে দাড়ানোর সাহস পেলাম জেসিকার কারণে। চরম এই বিপদে সে বিরাট শক্তি হয়ে আমার পাশে দাড়ালো। অনেক দূঃখ যন্ত্রনার মধ্যেও সে আমাকে নিরাশ হতে দিলো না। এমনকি ফ্যাশনে-শপিংয়ে অনেক কাটছাট করে আমার রুটি-রুজির ব্যবস্থাও করলো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722024 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722024 2007-07-22 19:43:38
গোমুখাসনে বোতলবন্দী জীন ২ তার বলার ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল যে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি কোন উত্তর দিলাম না। অনেক ছোট বেলায় পড়া একটা গল্পের কথা মনে পড়লো। কার লেখা ঠিক মনে নেই, সৈয়দ মুজতবা আলীর হতে পারে। ট্রেনের বগিতে ফার্ষ্ট কাসে উঠে পড়েছে টোকাই ধরণের একটি ছেলে। উঠেই বিভিন্ন উদ্ভট প্রশ্ন করে বিরক্ত করে ফেলেছে সবাইকে। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে সে লেখকের কাছে জানতে চাইলো,স্যার আপনি কখনো সন্দেশ খাইছেন? লেখক প্রথমে প্রশ্নের ভঙ্গি এবং ধরণ শুনে মজা পেলেন। তারপর এই প্রশ্ন এবং সেই ছেলেটা লেখকের মনে যে অনুভুতি তৈরি করলো তাই হয়ে গেল গল্পটির আসল উপাদান। যতদুর মনে পড়ে গল্পের শেষটা ছিল মন খারাপ হওয়ার মত। এইসব গল্পটল্প যদিও চুড়ান্ত বিচারে কোন ব্যাপার না কিন্তু বাস্তবের ছোটখাট গল্পগুলি প্রত্যেকটাই এক একটা ব্যাপার হয়ে যায়। জগতটাও এমন আজিব, সবসময় কিছু না কিছু কাহিনী ঘটেই চলে। আমার অতি সাধারণ বিচার বুদ্ধি দিয়েও যা বুঝি তাতেই আমি অবাক হই আর অবাক হই। মানুষ ভাত খায়, আবার মানুষই দর্শন চর্চা করে। মানুষ আগে কি অবস্থায় ছিল আর এখন কি অবস্থায় আছে? কতো বড় বড় বিষয় নিয়ে সে এখন ভাবে অথচ কুকুর-বিড়ালের মত গাল দিয়ে খেয়ে পশ্চাৎ দিয়ে বের করার বাস্তবতাকেই সে পরিবর্তন করতে পারে নাই। আর মেয়ে মানুষ দেখলে তো কথাই নাই! জামকাপড় খুলে আদিম যুগে ফেরত যাওয়ার জন্যে মাথা খারাপ হয়ে যায়। কোন এক কবি নদীর এপার ওপার নিয়ে কোন একটা কথা বলেছিলেন। এইটাও মানুষের জীবনের একটা বিরাট মনস্তত্ব। এই যে আমি, ভালো খাওয়া দেখলে আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, সুন্দরী মেয়ে দেখলে জিহবা দিয়ে রীতিমত লোল পড়ে, এই আমারই মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম না হয়ে অন্যরকম হলে কতই না ভালো হতো। সব চিন্তা বাদ দিয়া সাগরের পাড়ে দাড়িয়ে মাথায় হাত রেখে শুধু চিন্তা করতাম, কেন? কেন এইসব? মানুষ কেন আসলো? তার গন্তব্যই বা কোথায়? কিন্তু তা কি সম্ভব? পরের বেলাই আমাকে ভাত খেতে হবে। নাহলে এসিডিটির ব্যাথা শুরু হয়ে যাবে। খেতেই যখন হবে তো খারাপ খাব কেন? ভালোটাই খাব। আর ভালো খাওয়া তো এমনি এমনি জুটবে না। নিজের মাথায় জোরসে একটা চাটি মেরে এইসব লঘু চিন্তার খপ্পর থেকে ফেরৎ আসলাম। আমি ভাবতেছি এরকম বড় বড় কথা! এতদিনে ’ আদার ব্যাপারী ও জাহাজের খবর’ নিয়ে চালু থাকা বাগধারার একটা সঠিক প্রয়োগ ঘটলো বলে মনে হচ্ছে।

সেইদিনের পর ফাকে ফাকেই লায়েক ভাইয়ের খোঁজ রাখতাম। তিন মাসের মধ্যেই চমকওয়ালা আরেকটি বিপরীতধর্মী বাস্তবতা উপহার দিলেন। সেটি ছিল আরো বেদনাদায়ক। কিছুদিন আগে তার বাসায় গিয়ে কিছুটা কৌতুহলভরে, কিছুটা মজা করে জানতে চাইলাম, মধু টধু খাচ্ছেন তো রেগুলার? সালশার বোতল খালি হয়ে গেছে নাকি এখনো আছে? থাকলে দ্যান, আমিও একটু খাই। প্রসঙ্গত বলা দরকার, তিনি এখনো সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে প্রজেক্টের কাজই করে যাচ্ছেন। পারমানেন্ট কিছু হয় নাই। লায়েক ভাই আমার কথাকে খুব সিরিয়াসলি নিলেন। বললেন, সালশা খাব কেন? আমিতো এখন নিয়মিত গোমুখাসন করতেছি। গোমুখাসন কি এবং কেন? জানতে চাইলাম আমি। লায়েক ভাই করিৎকর্মা লোক, দেরী না করে তিনি নামাযের ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে পড়লেন। তারপর ডান পাটা বাম পায়ের উপর তুলে দিয়ে চেপে ধরে পেছন দিকে নিলেন যতদুর সম্ভব। দু পায়ের হাটু যেখানে এক হয়েছে সেখানে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললেন, দ্যাখো, এই জায়গাটা অনেকটা গরুর মুখের মত দেখতে হয়েছে না? এটাই গোমুখাসন। আমি বিস্মিত হলাম কিন্তু তখনো জানতাম না যে আমার বিস্ময়ের অনেক কিছুই এখনো বাকী রয়েছে। লায়েক ভাই বললেন, এটা হচ্ছে যোগ ব্যায়ামের একটি আসন। ধরো, যৌন কামনায় তোমার শরীর উত্তেজিত হয়ে গেল, কিন্তু তা উপশমের কোন রাস্তা তোমার জানা নেই তখন এই আসন ম্যাজিকের মত কাজ দেবে। সেবার নিয়মিত মধু, সালশা খেয়ে আমিতো বিপদেই পড়ে গেলাম। প্রত্যেক রাতেই শরীর গরম হয়ে ওঠে। এটা শরীরের জন্য খুব খারাপ। যে দাওয়খানা থেকে সালশা নিয়েছিলাম তাদের কাছে গেলে তারা এই পরামর্শ দিল। ভালো কাজ পেয়েছি।’

এই কথার পরে কোনরকম বক্তব্য বা অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ আমার ছিল না।

তিন.

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে একটি কর্পোরেট ব্যাংকের বার্ষিক ক্যালেন্ডার ও এনুয়াল রিপোর্টের কাজ পেয়ে গেলাম আমি। আমার প্রতিষ্ঠানের যে কলেবর তাতে এত বড় কাজ না পাওয়ারই কথা। কিন্তু আমার দেয়া ডিজাইন পছন্দ হওয়ার কারনে কাজটি তারা আমাকেই দিয়ে দিল। বিগ ডিল, ইটস আ ভেরি বিগ ডিল! উত্তেজনায় আমার মাথা দপদপ করতে লাগলো। এতো টাকা ইনভেস্ট করা একটু কঠিন কিন্তু কাজটা ঠিকঠাক মত করতে পারলে আগামী বছর কিছু না করেও দিব্যি হেসেখেলে কাঁটিয়ে দেয়া যাবে। আমি ভাবতে বসলাম, কিভাবে কোথা থেকে এত টাকার যোগাড় করা সম্ভব। কাগজের দামের একাংশ ও ছাপার টাকা বাকী রাখলে নগদ কত টাকা দরকার হবে? এইসব বিবিধ বিষয় দিনরাত আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো। এ সংক্রান্ত তদবির ও প্রস্তুতিতে আমার যাবতীয় সময় পার হতে লাগলো। প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে জেসিকার সাথে আমার দেখা হয় নাই, এমনকি সে ফোন করলেও ভালো করে কথা বলতে পারি নাই। কাজের প্রস্তুতি মোটামুটি গুছিয়ে উঠলে এ বিষয়টির ভয়াবহতা চিন্তা করে আমি আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। জেসিকা আমাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে! মনে মনে নানারকম কায়দা কৌশল করতে লাগলাম। শাহবাগের আজিজ মার্কেটে এই মার্কেটের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আতলামি মার্কা কিছু কাপড়ের দোকান হয়েছে। ইদানিং আতলামীর উপকরণে জেসিকার একটা ঝোক ল করা যাচ্ছে। এ লাইনেই এ যাত্রা সামলাতে হবে। আমাকে চমকে দেবার জন্যই সে এটা শুরু করেছিল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি, সে ইন্টারমিডিয়েটও উৎরাতে পারে নাই এ নিয়ে তার কিছু হিনমন্যতাও ছিল। এ কারনে, সুরুচির পরিচয় দিতে সে বিভিন্নরকম প্রচেষ্টা নিত। আমি মনে মনে বলতাম, দরকার নাই জান আমার, সুরুচির কোন দরকার নাই। তোমার ধারালো ফিগার আর আমার শ্বসুরের ধনসম্পত্তি যে পরিমাণ আছে তার চেয়ে বেশি সুরুচির আমার দরকার নাই; মুখে যদিও কিছুই বলতাম না, বরং তার এই চেষ্টা আমাকে আনন্দ দিত। একবার সে গামছার কাপড় দিয়ে বানানো একটা ফতুয়া পরে আসলো, আমার জন্যেও আনলো একটা। তার ঘি, মাখন খাওয়া চেহারার সাথে সেটা এতই বেমানান লাগছিলো, কি আর বলবো। কে তাকে এই বুদ্ধি দিছে আল্লাহ মালুম! আর আমি নিজে পরবো গামছার ফতুয়া? কভি নেহী। আমার দাদা ছিল খেজুর গাছ কাটা গাছি, বাবা অল্প জমিওয়ালা কৃষক। গামছার ব্যবহার তারা জীবনে যথেষ্ট করেছেন, আমার আর গামছা দরকার নাই। যা হোক, আমি আজিজ মার্কেটে গিয়ে তার জন্য দুইটা ফতুয়া কিনলাম। একটা আলখাল্লা পরা রবীন্দ্রনাথের ছবিওয়ালা আরেকটাতে বাঁশি বাজাচ্ছেন চিত্রশিল্পী সুলতান। রবীন্দ্রনাথ আলখাল্লা পরে থাকুন বা সুলতান যত পারেন মনের সুখে বাঁশি বাজান তাতে আমার কি? এরকম একটা বিপদের মুহুর্তে তারা যে আমার কাজে লাগতে পারেন এটা ভেবেই তাদেরকে আমার বড়ো মাপের একটা কিছু মনে হলো। তবে আমার কোন কায়দা কৌশলই ঠিক ভাবে কাজে আসলো না। জেসিকা, আমার পরানের জেসু আমার সাথে দেখাই করতে চাচ্ছিল না। ফোনে বললো, আমার সাথে তোমার দেখা করার কি দরকার? এমনিতে তো আমাকে তোমার কোন দরকার নেই, দুই সপ্তাহ বিরতির কারনে যদি গা ঘসাঘসি করার খায়েশ জাগে তাহলে একটা কলগার্ল ভাড়া কর, পয়সা লাগলে আমি দিবানি। দিবানি শব্দটার ব্যবহারে আমি ঘোরতর আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এমনিতে তার কথাবার্তার ঠাটবাট খারাপ না, কিন্তু চরম েেপ গেলে এটা অুন্ন থাকে না, আঞ্চলিক শব্দ বেরিয়ে আসে। লণ বেশি ভাল না। আমি গলা মিহি করলাম, হাল্কা ধমক দিলাম, নানারকম অনুনয় বিনয় করলাম কিন্তু কোন কিছুতেই সে আর গলে না। তো পাথর টলানোর আর বুদ্ধি কি? আমি মোটর সাইকেল নিয়ে একেবারে ওদের আদাবরের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। গেটের বাইরে দাড়িয়ে মোবাইলে কল দিয়ে বললাম, তুমি যদি এখনি না আস তাহলে সোজা বাসায় ঢুকে তোমার বাবা মাকে বলবো, আপনাদের মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। একটু পরেই বেরিয়ে আসতে দেখলাম তাকে। চেহারায় রীতিমত আতঙ্ক। আমি তো জানি, বাপ মাকে কি পরিমাণ ডরায় সে। কৌশল হিসেবে এটা একটু চরমই হয়ে গেল। কি করা, আর তো কোন উপায় ছিল না। চুপিচুপি এসে বাইকের পেছনে বসলো সে। আমি সোজা একটানে মিরপুর ১০ নাম্বার দিয়ে ঘুরে বিজয় সরনী দিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে উঠলাম। উত্তরা গিয়ে ধরলাম আশুলিয়ার রাস্তা। পুরো সময়েই আমার শরীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলো জেসিকা। অন্যান্য সময় বাইকে উঠলেই পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরতো সে। কি যে ভালো লাগতো, বাইক চালানোর মজাটাই মাঠে মারা গেল আজ। মাগরিবের আযান পড়লে ফাকা একটা জায়গায় বাইকটা থামালাম। তার মুখটা এখনো গম্ভীর, থমথমে। আমি হাত ধরে মা চাইলাম, ওর জন্যে আনা উপহার দিলাম। সে খুলে ওগুলি দেখল, চেহারার কোন পরিবর্তন হলো না। এরপর বিস্মিত হয়ে দেখলাম, আলখাল্লা পরা বাউল রবীন্দ্রনাথ আর বংশীবাদক সুলতানকে গিট দিয়ে বাঁধছে সে। কি যে আছে মাথায় কে জানে? অনেকটা আচমকাই সে ঐ কাপড়দ্বয়ের ব্যবহার করে আমার গলা পেচিয়ে ধরলো, বেশ জোরেই। নিঃশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছিল, ব্যাপার না, মারা না গেলেই হলো। আমি চুপচাপই থাকলাম। হাত দিয়ে ধরা কাপড় শক্ত করে আমার গলায় চেপে বসাতে গিয়ে ধীরে ধীরে সে চলে আসছিলো আমার বুকের কাছে। গলায় একটা শক্ত টান পড়াতে আমি ঝুকে প্রায় ওর গায়ের উপরেই পড়লাম। ওর নিঃশ্বাসের গতি তখন স্বাভাবিক ছিল। সেটা যতো বাড়লো, আমার গলার ফাস ততোই আলগা হলো। একসময় তা আর থাকলো না কারন ওর হাত দুটো তখন দুপাশে ঝুলছে। ঝুলন্ত হাত দুটো একটু পরেই আমার গলায় উঠে কোমল পরশ বোলাতে লাগলো, যেখানে একটু আগেই চেপে বসেছিল শক্ত ফাস। ফেরার পথে আমার বাইকটা উড়ছিল, জেসিকার উড়তে থাকা ওড়নাটাকে মনে হচ্ছিল এই বাহনের ডানা। এরপর ডানা দুটিকে গুটিয়ে শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল সে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722021 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722021 2007-07-22 19:40:34
গোমুখাসনে বোতলবন্দী জীন ১ এক.

কোন বাবা মা যখন তার সন্তানের নাম লায়েক রাখেন তখন তাদের সুপ্ত বাসনার রূপটি অস্পষ্ট থাকে না। তাদের প্রত্যাশা থাকে যে এই ছেলে একদিন সত্যিসত্যিই লায়েক হয়ে উঠবে। বলা বাহুল্য, এই লায়েক শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক নয়। আমাদের লায়েক ভাই সে প্রত্যাশা পুরণের আশপাশ দিয়েও যেতে পারেন নি। তেত্রিশ বছরের জীবনে যে শব্দটি তিনি সবচেয়ে বেশিবার শুনেছেন তা হচ্ছে, ’নালায়েক’। যতবারই শুনেছেন ততবারই অবাক হয়ে ভাব ধরতেন, কি আশ্চর্য! তার নামের আগে একটা না লাগানোর দরকার টা কি? দরকার যে কেন পড়ে তা তিনি ভালোই বুঝতেন কিন্তু ভান করতেন যে বোঝেন না। তাছাড়া তার উপায়ও তেমন কিছু ছিলো না। সর্বোপরি তিনি একজন রসিক লোকও বটে।

২০০৩ সালে তার সাথে আমার প্রথম আলাপ-পরিচয় হয়েছিলো। তখন ডিগ্রী পাশ করে তিনি কেবল ঢাকায় এসেছেন, এবং বিস্ময়কর ভাবে থাকা খাওয়ার খরচ উঠে দু চার টাকা হাত খরচ করা যায় এরকম একটি কাজও জুটিয়ে ফেলেছেন। কোন একটা এনজিওর প্রজেক্টে ডাটা কালেকশান এর কাজ। একই এলাকার লোক হওয়ার সুবাদে এবং ডাইলখোর হিসেবে তার সমধিক পরিচিতি থাকার কারনে তাকে আগেই চিনতাম। তবে আলাপ পরিচয় ছিলো না। ঢাকা শহরেই এ পর্বের সূচনা ঘটে। ২০০২ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্দোলন কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় হল ভ্যাকেন্ট হয়ে গেলে লায়েক ভাই তার শ্যাওড়াপাড়ার বাসায় অন্তর্বতীকালীন আশ্রয় প্রদান করেন। আলাপ-পরিচয় দ্রুত ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। তার কাছ থেকে শোনা তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আমাকে যুগপৎ মুগ্ধ এবং আন্দোলিত করে ফেলে। বিশেষ করে ’সাতদিন টাতদিন না চলবে’ শিরোনামের গল্পটি আমার মুখ থেকেই ছড়িয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। গল্পটি এরকম,

দুইবার ডিগ্রী পরীায় ফেল করে লায়েক ভাই তখন ডাইল-গাঞ্জাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ডাইল-গাঞ্জা তো আর চিরকাল তাতেই থাকে না, আরো আগে বাড়ে। সেই সূত্র অনুযায়ী তিনি হিরোইনও ধরেছেন। প্রথমে বাবার পকেট আর মায়ের তহবিলেই হানা দিয়ে খরচ কুলোলেও পরে তাতে চলে না। এরপর দাদা বাড়ির নারকেল-সুপারী এমনকি ধান চালও বিক্রি চলতে লাগলো। লায়েক ভাইয়ের বাপ হালিম পাটোয়ারীর সহ্যের বাঁধ ভাঙ্গলো। তিনি পূত্রকে তালাবন্দী করে ফেললেন। লায়েক ভাই প্রথমে তর্জন-গর্জন, তারপরে অনুনয় বিনয় শেষে পুরোদস্তুর কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। তাতেও কাজ না হলে কোরআন ছুয়ে শপথ করলেন, জীবনে আর নেশা করবো না। তাকে ছেড়ে দেয়া হলো, কিন্তু হালিম পাটোয়ারী সতর্ক হয়ে গেলেন। লায়েকের হাতে যেন কোন ভাবেই নেশা করার মত পর্যাপ্ত টাকা পয়সা না আসতে পারে সে ব্যাপারে সব ধরণের ব্যবস্থা নিলেন। প্রাক্তন নেশা সহযোগীরা কিছুদিন তাকে সাপোর্ট দেয়ার পরে যখন নিশ্চিত হলো, এ সাপোর্টের কোন রিটার্ন নেই তখন লায়েক ভাইয়ের এ উৎসও বন্ধ হয়ে গেল। এতো আর ঢাকা শহর নয় যে চাইলেই ছিনতাইয়ের অপার ত্রে বিস্তৃত আছে। লায়েক ভাইয়ের মধ্যে পাগলামীর লন দেখা দিল। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হলেন। বিভিন্ন ধরণের টোটকা চিকিৎসার পরে কোন কাজ না হলে হালিম পাটোয়ারী নিরুপায় হয়ে তাকে খুলনা শহরে এক পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন।

ডাক্তার লায়েক ভাইকে যথারীতি বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করলে লায়েক ভাই একেবারে সুস্থ্য লোকের মতো বললেন, ডাক্তার সাহেব,আমি অসুস্থ্য এটা আমি জানি এবং এও জানি যে আমি কিসে ভালো হবো। লেখেন আমার কথা মতো একটা প্রেসক্রিপশন লেখেন। ডাক্তার এ কথা শুনে উৎসাহিত হলেন এবং মজাও পেলেন। যেহেতু এ ধরণের রোগীকে গুরুত্ব দিতে হয়, তিনি বললেন, খুব ভালো। বলেন, আপনার কথা মতোই আমি প্রেসক্রিপশন লিখবো। তিনি প্রেসক্রিপশন লেখার প্যাড কাছে টেনে নিলেন। লায়েক ভাই বললেন, লেখেন, একদম উপরে লেখেন, হালিম পাটোয়ারী একটা পাকা বদমায়েশ! সে কাড়ি কাড়ি টাকা জমায় কিন্তু একমাত্র সন্তান লায়েকরে কোন টাকা দেয় না। ওষুধ হিসেবে লেখেন, সকালে ১০০ টাকা, বিকেলে ১০০ টাকা, রাত ৯ টায় ৮০ টাকা। আর কোন সাতদিন টাতদিন লেইখেন না। লেখেন, চলবে। সাতদিন টাতদিন না চলবে।

ডাক্তার কি লিখেছিলেন সেটা লায়েক ভাইকে জিজ্ঞেস করে কোন উত্তর পাই নি তবে তিনি তার নেশাগ্রস্থতা কাটিয়ে উঠেছেন তা পরিস্কার। হালিম পাটোয়ারীর সাথে তার তেমন কোন যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় না।

দুই.

পিতৃপ্রদত্ত আব্দুর রশিদ নামটা নিয়ে কখনোই সন্তুষ্ট ছিলাম না আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অপার স্বাধীনতা পাওয়া গেল। এ স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ নিলাম নামটাকে বদলে। আব্দুর টাকে ফেলে দিয়ে একটা হাসান যুক্ত করে নামটা দাড়ালো হাসান রশিদ। এটা অল্প কিছুদিন চলার পরে মনে হলো আরেকটু কি হলে যেন ভালো হয়। রশিদকে বদলে করলাম রাশীদ। এখন পুরোটা হলো হাসান রাশীদ। তবে নাম পরিবর্তনের তেমন কোন গুণগত ফলাফল পাওয়া যায়নি। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই আমার একবারে ম্যাড়মেড়ে কেটেছে। চেহারায় কোন চটক নেই, অন্য কোন বিশেষ গুণ নেই, ছাত্র হিসেবে টেনেটুনে সেকেন্ড কাস এরকম সাদামাটাদের কপালে যা থাকে আর কি। আমার কাজ ছিলো উজ্জ্বল মেধাবী সংস্কৃতিবান সহপাঠী যারা সুন্দরী বান্ধবী নিয়ে ক্যাম্পাস আলো করে ঘুরে বেড়াত তাদের দেখে ইর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরা , হলের টিভি রুম কে কেন্দ্র করেই সন্ধ্যা রাত কাটিয়ে দেয়া এবং একদিন আমার জীবনে সিনেমার মতো কিছু একটা ঘটবে, বাড়ী-গাড়িওয়ালা বাপের একমাত্র মেয়ে আমার প্রতি ভালোবাসায় পাগল হয়ে ছুটে আসবে এবং আমার হাত ধরে বলবে, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না; মাসের পর মাস এরকম অলীক স্বপ্নের প্রহর গুনে সময় কাটিয়ে দেয়া। তাতে অন্য কোন কাজ না হলেও সময়টা পার করা গেছে এবং বড়লোকের জীনস পরা স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী একটি মেয়ে আমাকে পেতেই হবে এ জেদটা একেবারে ভেতরে গেঁথে গেছে। দিন সবসময় সমান যায় না, এ প্রবাদ বাক্য আমার জীবনেও ফলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর কিছুদিনের মধ্যেই আমার শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হয়েছে। এক বছরের মধ্যে আমি মোটামুটি চালু একটি ব্যবসা, কিছু টাকা পয়সা এবং তার চেয়ে বড় কথা, আমার প্রত্যাশা মাফিক একজন গার্লফ্রেন্ডের অধিকারী হয়েছি। যদিও মেয়েটা বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করেও এইচ এস সির গন্ডী পেরোতে পারে নি, মফস্বল থেকে ঢাকায় আসার বয়স বেশিদিন না হওয়ায় কথাবার্তা, বিশেষ করে ইংরেজি যেটুকু বলে তার প্রায় পুরোটাই ভুল কিন্তু এগুলান কোন ব্যাপার না। সে জীনস পরে ম্মার্টলি হাটাচলা করে,তার বাপের বাড়িই আছে দুইটা, গাড়িতো কোন ব্যাপার না। আমাকে খুব পছন্দ করে, আমার কার্যকলাপ-ভাবভঙ্গিতে মুগ্ধ থাকে এবং আমার টাকা পয়সা, সামর্থ্য যা আছে তাতেই সে সন্তুষ্ট। মনের সুখে প্রায়ই আমি গুনগুন করে গান জুড়ে দিই, আমার আনন্দের আর সীমানা নাই রে..। এমনকি জেসিকার সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পরে বন্ধুমহলে আমার ভাবসাব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রিন্টিং এর কিছু কাজের আশায় কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম একটা মোবাইল কোম্পানীতে চাকরিরত আমার এক বন্ধুর কাছে। ক্যাম্পাস জীবনে, এই দুবছর আগেও আমরা খুব ঘনিষ্ট ছিলাম। শালার পুত এমন ভাব ধরলো যে আমারে চিনেই না। গত সপ্তাহে সেই পাবলিক নিজে থেকেই আমারে ফোন দিয়ে বলে, কিরে দোস্ত, একবার আসলি আর কোন খোজ নাই, আমি তো কিছু কাজকাম দিতে পারি নাকি? আয় একদিন একসাথে লাঞ্চ করি। পরশু গেলাম তার অফিসে। সমাদরের কোন অভাব নাই। বেশ চেষ্টাও করলো যেন ওদের কোম্পানীর ব্র“শিয়ারের কাজটা আমি পাই। পেয়ে যেতে পারি মনে হচ্ছে। এই সমাদরের কারণ স্পষ্ট। ফেরার সময় ফিসফিস করে জানতে চাইলো, হেভী জোটাইছস নাকি একটা? নিয়ে আয় একদিন। আলাপ সালাপ করি। আমি এমন ভাব করলাম যে তাতো বটেই। কিন্তু মনে মনে সাবধান হয়ে গেলাম। এইসব মাল থেকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। এদের নজর শুধ বন্ধুবান্ধবের সুন্দরী গার্লফ্রেন্ডের উপর। জেসিকা, ওরে আমার জেসুরে.. তোমারে আমি যরে ধনের মতো আগলিয়ে রাখবো। তুমি আমার সাত রাজার ধন।

মাথাটা আমার পুরো গেছে। এগুলো ভাল লণ না। সব সময় একই চিন্তা করলে ব্যবসা বানিজ্য সবই ডুববে। গত পনের দিন ধরে ভাবছি লায়েক ভাইকে দেখতে যাবো কিন্তু হয়ে উঠছে না। খবর পেয়েছি বেচারা একমাস টাইফয়েডে ভুগেছে। কি করে টিকে আছে কে জানে? পুরো এক বছরের মধ্যে তার সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারি নাই। কাজটা কোনমতেই ভালো হয় নি।

লায়েক ভাইকে দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। একজন হাসিখুশি লোক টাইফয়েডের কষনে এরকম জরাজীর্ণ রূপ নেবে, ভাবাই যায় না। শ্যাওড়াপাড়া একেতো নিচু এলাকা, তার দেড়রুমের বাসাটা আবার নীচতলায়। সপ্তাহ দুই আগের প্রবল বর্ষায় তার বাসাতে পানি ঢুকে গিয়েছিল। শরীর দূর্বল থাকার কারণে পানি নামার পর বাসা পরিস্কারও করতে পারেন নি। ড্যাম পড়া বোটকা গন্ধে টিকে থাকাই দায়। একজন অসুস্থ্য মানুষ বাস করছে ততোধিক অসুস্থ্য একটি পরিবেশে। আমাকে দেখে লায়েক ভাই খুশি হলেন। হাতের বড়ো প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি? ফল ফ্রুট আনছো নাকি? দাও, প্যাকেটটা দাও,ফলফ্রুট খাওয়ার দরকার আছে। মনটা কয়দিন যাবত শুধু ভিটামিন ভিটামিন করে। তখনো লায়েক ভাইয়ের আগ্রহের আসল পয়েন্টটি আমি ধরতে পারি নাই। যখন সেটি বুঝলাম, না হেসে পারলাম না। আসলেই সে একজন খাটি রসিক। আমি একজন লোক ঠিক করলাম, বড় এক শিশি স্যাভলন কিনলাম। প্রায় ঘন্টাখানিক ধরে ঘর সাফসুতরো করা হল। মোটামুটি বাসযোগ্য হয়েছে। পরদিন শুক্রবার থাকায় সিদ্ধান্ত নিলাম, রাতটা লায়েক ভাইয়ের বাসাতেই থাকবো। রান্নাঘরে খোজ নিয়ে দেখা গেল কিছুই নাই। শ্যাওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড বাজার থেকে একটি ইলিশ মাছ, কিছু সবজি এবং বেশ কয়েক দিনের চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন কিনে ফিরলাম আমি। ইলিশ মাছ দেখে লায়েক ভাইয়ের চোখ ঝকমক করে উঠলো। বললেন, দ্যাখো অবস্থা! এই ভরা বর্ষাকালে ইলিশ মাছের সিজনেও এখনো ইলিশ খাওয়া হয় নাই। ইলিশ খাইছি ছোট বেলায়। ১০ টাকা, ১৫ টাকা কেজি। আর এখন? নাহ, খামাখাই বাইচা থাকা। এই জীবনের কোন দাম নাই।’ বলে তিনি একটা ম্যাচের কাঠি নিয়ে এমন ভঙ্গিতে কান চুলকাতে লাগলেন যেন কান চুলকানোর মধ্যেই জগত জীবনের সকল স্বার্থকতা নিহিত। রে যে ইলিশ মাছটা কেটে এনেছিলাম, না হলে রান্নার পাশাপাশি কাটার কাজটা আমাকে নিজের হাতেই করেতে হতো। ইলিশ ভাজার সুবাস ছড়িয়ে পড়লো চারিদিক। লায়েক ভাই লম্বা নাক টেনে ইলিশ ভাজার সুবাস নিলেন কয়েকবার। তারপর গম্ভীর হয়ে গেলেন একেবারে। ভেবেছিলাম বোটকা গন্ধের বিছানা বালিশে ঘুমই হবে না, কিন্তু ঘুম ভালোই হলো। সকালে আমি জাগার আগেই লায়েক ভাই উঠে গেলেন। তখনই আমার কাছে ভিটামিন, ফলফ্রুটের রহস্য পরিস্কার হলো। আমি জেগেই দেখলাম তিনি তার যৎসামান্য চুলওয়ালা মাথায় খুব যতœ নিয়ে কি যেন মাখাচ্ছেন। আমি ঘুমজড়ানো চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই তিনি বললেন, চুলগুলোকে বাঁচানোই যাচ্ছে না। এমনিই পড়ে যাচ্ছিল তার উপর টাইফয়েডের ধকল, মাথা ফাকা হতে আর বেশি দেরি নাই। আজ হোক কাল হোক বিয়েশাদী তো করতে হবে নাকি? এখানেই শেষ নয়, মাথা ধুয়ে তিনি একটা মাদুর পেতে বসলেন এক শিশি সালশা ও ছোট একটা বোতলে রাখা মধু নিয়ে। একটা ন্যাকড়া থেকে বের করলেন কিসব পাতাপুতা। আমি বিস্ময় নিয়ে দেখেই যাচ্ছিলাম। এবারেও আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না। তিনি ব্যাখ্যা দেয়ার ভঙ্গিতে গলাটা অনেক নিচু করে বললেন, যৌনশক্তি এক জিনিস শরীরে কিছু টেরই পাই না। এত বয়স হলো অথচ দ্যাখো আমার কপাল! এই জিনিসের স্বাদ কি রকম তা জানতেই পারলাম না। প্রজেক্টের চাকরিটা পারমানেন্ট হবে হবে করে হচ্ছে না। পারমানেন্ট হলেই একটা বিয়ে করে ফেলবো আশা আছে।’ এ পর্যন্ত বলে একটু থামলেন, এরপর গলার স্বর আরো নিচু করে ফিসফিস করে বললেন, কিছু মনে নিয়ো না, তোমারে একটা প্রশ্ন করি; তোমার কখনো কারো সাথে কিছু হইছে?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722020 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28722020 2007-07-22 19:37:47
মাহেন্দ্রক্ষণ ও তার সন্তানাদি ৪
এরপরেও প্রায় বারো বছর ছোট বাশতলা গ্রামের এই বাড়ীতেই সংসার ছিলো সালমার। এই ঘরে-দ্বোরে, উঠোনেই কাঁটিয়েছে সে বারো বছরের পুরোটা সময়। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও তাদের আর পরস্পরের সাথে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। প্রথম বছরে তারা ুব্ধ ছিলো পরস্পরের প্রতি। দ্বিতীয় বছরে তাদের মনে হলো, এই ােভ নিজ স্বার্থের প্রতি পপাতমূলক অবস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। তৃতীয় বছরে গিয়ে তারা দুজনেই ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাক্রমের জন্য নিজেকেই পুরোপুরি দায়ী করলো, অনুশোচনায় দগ্ধ হলো এবং এতটাই আত্মগ্লানি অনুভব করলো যে লজ্জা এড়াতে কেউ কারো সামনেই পড়তে চাইতো না। এবং এর পরপরই প্রায় সমসাময়িক সময়ে তারা ধরতে পেরেছিলো, একজন অন্যজনের প্রতি কি অযুত নিযুত পরিমাণ ভালোবাসা জমা হয়েছে। এই ভালোবাসা অনেকটা প্রাপ্তবয়স্ক, কম বয়সের অস্থিরতা, ছটফটানি মুক্ত এক নিখাদ স্বর্ণখন্ড যেনবা! কিন্তু ততোদিনে নিয়তি আবারো নতুন চেহারায় গেড়ে বসেছে কয়েক বছরের ফাক গলে। তাদের দুজনেরই ছোয়া লেগে থাকা বিভিন্ন স্মারক স্পর্শ করে স্মৃতিচারণ করা ছাড়া পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের আর একটিই মাধ্যম ছিলো তাদের; ভাষাহীনতা।

এই লম্বা সময়ে একটি দিনই ছিলো ব্যতিক্রম যেদিন সালমার ছেলে রিফাতের জন্ম হয়েছিলো। খুব সকালে ব্যাথা উঠেছিলো সালমার, রিফাত হয়েছিলো মধ্যরাতে। ঐ একটা দিনই তাদের সুযোগ হয়েছিলো নিবিড়ভাবে পাশে থাকার। প্রসবের ব্যাথাটা কিরকম জানতো না শাহিদা, জানা হয়নি এই জনমে। নারীত্বের এই কথিত সুখের ব্যাথা পাওয়া হয়নি বলে কোন হা হুতাশও নেই তার। কিন্তু সেদিন ব্যাথাটা পেতে চেয়েছিলো সে, সালমার অসম্ভব সেই যন্ত্রনা ভাগ করে নেয়ার জন্য। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, আর এ কারণেই বোধ হয় শক্ত মুঠির মধ্যে সালমার হাতটি চেপে ধরা অবস্থায় কল্পলোকে অস্তিত্বশীল ব্যাথাটা আরো কয়েক গুন বেড়ে গিয়ে আঘাত হেনেছিলো শাহিদার হৃদপিন্ডে। বিকেলের দিকে সালমা তার সাথে কথাও বলেছিলো। ঘর্মাক্ত, যন্ত্রনাকাতর মুখটিকে যতোদুর সম্ভব স্বাভাবিক করে স্পষ্ট স্বরে বললো, যদি মইরে যাই.. বাক্যটি শেষ হলো না, সালমা চুপ হয়ে গেলো। কি যেন একটা বুঝে এ বক্তব্য থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলো।

অনেকবার ভেবেছে শাহিদা, জানতে চাইবে, ’যদি মইরে যাতি তো কি?’ কিন্তু সময় ঠিকই গড়ালো, নিয়তি বদলালো না। একটি অর্ধসমাপ্ত বাক্য তাদের রহস্যঘেরা জীবনে নতুন কিছু দূর্বোধ্যতা তৈরি করে ঝুলতে থাকলো, অর্ধসমাপ্ত জীবনেরই আরেকটা প্রতিরূপ হিসেবে। ঠিক কিভাবে রিফাত তার কাছে এসে পড়লো, তার ন্যাওটা হয়ে পড়লো এবং মুখে বোল ফোটার সাথে সাথেই তাকে সই বলে ডাকা শুরু করলো তা আর ঠিকমতো মনে পড়ে না আজকের শাহিদা বেগমের। সালমা তাকে কোন এক কালে সই বলে ডাকতো যা ঐ বাচ্চা ছেলেটির কখনোই শোনার কথা নয়। হতে পারে সালমাই কোন এক মুহুর্তে শিখিয়েছিলো সই ডাকতে এবং ঐ একবারই যথেষ্ট হয়েছিলো। কি ভেবেছিলো সালমা তা না জানলেও এতো সত্যি, তাদের দুজনের অস্তিত্বের মাঝখানে গড়ে উঠলো এমন এক সেতু যা অতিক্রম করা যায় না ঠিকই কিন্তু যাকে ছুয়ে এপার ওপার একই সাথে পেতে পারে যৌথ মাটির সুবাস। দিন যতো গেলো রিফাত এমনভাবে তার ব্যক্তিগত অধিকারে চলে আসলো, শাহিদার মনে হলো, øেহের খেলা খেলতে খেলতে একাকিত্ব ঘোচানোর যে প্রক্রিয়ায় সে রত তা হয়তো সালমাকেই ঠেলে দিচ্ছে একাকিত্বের অতলে। সালমার স্বামী আহাম্মদ আলী এর মধ্যে আইন পাশ করে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে জেলা শহরে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত। তার ইচ্ছা সালমা ও রিফাত তার সঙ্গেই থাকুক। কারণ পসার জমে ওঠার সাথে সাথে তার পে কঠিন হয়ে পড়ছে সপ্তাহান্তে আসা যাওয়া করা। কিন্তু সালমার আপত্তির কারণে তা আটকে ছিলো। এ সময়কালে শয্যাশায়ী মেজবিবির পরলোকগমন সালমার আপত্তির ভিতটিকে অনেকখানি দূর্বল করে দিলো। রিফাতের উপর একক অধিকার প্রসূত অপরাধবোধে ভুগে শাহিদাও চাইলো, তারা চলে যাক। তাছাড়া বহুকাল ধরে শাহিদার সাথে বসবাস করা আদি নিয়তিবাদী নির্দেশক মহাশয়ও হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে পড়লো। একটি বাচ্চা ছেলেকে অবলম্বন করে স্বাচ্ছ্যন্দে পার করতে থাকা এই জীবন শাহিদার প্রাপ্য কিনা সে প্রশ্ন ঘোরতরভাবে উত্থাপন করে লাগাতার খোচাখুচি চলতেই লাগলো। সেবার আহাম্মদ আলীর উপস্থিতিতে শাহিদাকে তার সাথে বিভিন্ন শলা পরামর্শ করতে দেখা গেলো, বিষয়টি সালমার চোখ এড়ালো না। একদিন সবার সামনেই শাহিদা এ প্রসঙ্গ পাড়লো, অনেকটা সিদ্ধান্তের মতো করেই বললো, রিফাতের লেখাপড়া ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে তাদের সপরিবারে জেলা সদরে থাকা উচিত বলে সে মনে করে। সালমা কোন আপত্তি করলো না বরং অতিরিক্ত উদ্যোগী ভুমিকা নেয়াতেই দেখা গেলো, এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা এ বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তারা যেদিন এ বাড়ি ছেড়ে গেলো, আশ্চর্যজনকভাবে ল করা গেলো শাহিদা, রিফাত বা সালমা কেউই একফোটা চোখের জলও ফেললো না। অনেকটা দূর্ঘটনাচক্রে একেবারে শেষদিকে সালমার চোখে চোখ পড়ে গেলো শাহিদার। সালমার শান্ত মুখটা থেকে কি পরিমাণ ক্রোধের আগুন নিঃসৃত হচ্ছিলো তা পড়বার মতা একমাত্র শাহিদারই ছিলো, সে কারণে মুহুর্তেই চোখ নামিয়ে ফেলতে হয়েছিলো তাকে। বিস্ময়করভাবে রিফাতের অভিব্যক্তিও ছিলো মায়ের কার্বন কপি। শেষ পর্যন্ত ক্রুদ্ধ চোখে সে তাকিয়েই ছিলো শাহিদার দিকে, যেভাবে এজলাসে দাড়িয়ে মিথ্যা মামলার আসামী তাকায় ষড়যন্ত্রকারীর দিকে। ইতিমধ্যে সে বেশ বড়ো হয়ে গেছে, কান্নার চেয়ে ক্রোধই তাকে ভালো মানালো। আর কোনদিন এ বাড়িতে পা ফেলেনি তারা। আহাম্মদ আলী প্রায়ই এসেছে। সহায় সম্পত্তির দেখভাল বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে শাহিদার সাথে। কিন্তু সালমা বা রিফাত আসেনি। দু’বছর পরে এ খবর কানে এসেছে শাহিদার, রিফাতকে ক্যাডেটে পাঠানো হয়েছে। ছেলেটাকে আর একবারের জন্যও দেখতে পাওয়া গেলো না।

দীর্ঘকাল পরে আজ রাতে তিনি একটি পুরোনো ট্রাঙ্ক খুজে বের করলেন। ধুলো পড়ে, পোকায় কেটে প্রায় গত হয়ে পড়া শরৎচন্দ্র স্পর্শ করতেই হাঁচি পেয়ে গেলো তার। শরিফকে ডেকে ট্রাঙ্কটি বুঝিয়ে দিয়ে বইগুলি বাধাতে দিতে বললেন। রাতের খাওয়ার পর শরিফের মা ও তার স্বামী মোহব্বত আলীর সাথে পরামর্শ করতে বসলেন, ইলেকট্রিসিটি ও গ্রামের অন্যান্য সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ বিষয়ে। অনেক দিন পরে বড়ো এক গ্লাস দুধ খেলেন এবং বিছানায় যাওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়লেন।

সাধারণত টেম্পো বা কোন ধরণের যান্ত্রিক যান এ গ্রাম পর্যন্ত আসে না, পাশের গ্রামেই থেমে যায়। কিন্তু এই হেমন্তে খোলস বদলানো সূর্যের চনমনে ছন্দমাখা একটি দিনে ছোট বাশতলা গ্রামের এবড়ো থেবড়ো মাটির রাস্তা দিয়ে ধুকতে ধুকতে একটি টেম্পো এসে দাড়ালো হাজী বাড়ির সামনে। বড়ো একটি ব্যাগ নিয়ে টেম্পো থেকে নেমে দাড়ালো আঠারো/ উনিশ বছরের দীর্ঘদেহী এক তরুণ। কোমরের একেবারে নীচে নামিয়ে পরা অসংখ্য পকেটওয়ালা একটি প্যান্ট ও কালোর উপর উৎকট রং চংয়ে একটি টি-শার্ট তার পরনে। শরিফ গরুগুলিকে গোসল করাতে নিয়ে যাচ্ছিলো। টেম্পো থেকে নেমে পড়া ছেলেটিকে দেখেই সে গরু রেখে পড়িমড়ি করে ছুট লাগিয়ে বাড়ীর ভেতরে চলে গেলো, হাপাতে হাপাতে বললো, ম্যালা বড়ো হইয়ে গেইছে, তাও আমি চিনতি পারিছি! রিফাত ভাই আইছে, রিফাত ভাই।

খবরটি অনেক বড়ো এবং বড়ো ধরণের প্রতিক্রিয়াই হলো শাহিদা বেগমের ভেতরে। তাকে বেশি করে ভাবালো দূঃশিন্তা মেশানো একটি কৌতুহল। শেষ যেদিন রিফাত এ বাড়ি ছেড়ে গেলো, শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তাকে দেখতে থাকা সেই ক্রুদ্ধ দৃষ্টি কি আবারো একইরকম ভাবে আক্রমন হানবে? এ আশঙ্কা সত্যি হলো না। মূর্তিমান রিফাত, পুরোদস্তুর একজন যুবক, দাড়িয়ে আছে একদম তার নাক বরাবর কৌতুহলী ভঙ্গিতে, মুখে বিস্ময় ও হাসি ফুটিয়ে। রিফাতের দিকে ভালো করে তাকিয়ে শাহিদা বেগমেরও হাসি পেয়ে গেলো। লম্বা চুলগুলি এমনভাবে কাটা যেন খুব পরিকল্পিত ভাবে মাথার উপর এলোমেলো হয়ে থাকে। পরিস্কার কামানো মুখে শুধু থুতনির নীচে একগোছা দাড়ি। রিফাতের হাসিমাখা মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো, সই! মাইগড! তোমাকে তো এ্যাঞ্জেলিনা জোলির মতো লাগছে। কথাটির অর্থ কি তা দূর্বোধ্য হলেও শাহিদা বেগমের মনে হলো, ঐ বাক্যের মধ্যে দিয়েও সালমাই ফুটে বেরোলো। একহারা পুরুষালী একটি শরীরের ঘাড়ে সালমার মুখটাই যেন বসানো হয়েছে। সেই গায়ের সোনা রং, সেই নাকমুখ! সালমার থুতনির নীচে দাড়ি- এরকম একটি বিচিত্র চিন্তা হঠাৎ করে মাথায় আসাতে তিনি শব্দ করে হেসে ফেললেন। সঙ্গত কারণে রিফাত ধরে নিলো যে তার বেশভুষাই এ হাসির কারণ। কিছুটা কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে সে বলে উঠলো, ’ এরকম ফ্যাশন আমার যে খুব ভালো লাগে তা না। মুক্তির আরাম নিচ্ছি। ক্যাডেট কলেজের নিয়ম কানুনে জানটা একেবারে ঝালাপালা হয়ে গ্যাছে।’

স্বাভাবিক ছিলো না এরকম একটি দীর্ঘ বিরতির পর দুজন মানুষের সাাৎ পর্বটি হালকা চালের বাক্যালাপের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি ভারী হয়ে উঠলো না, যে আশঙ্কা দুজনরেই ছিলো। এবং অনেকটা ইচ্ছার জোরেই যেন তারা ছুড়ে ফেলে দিলো কয়েকটি বছরের ফাক ও অন্যান্য ’আসলেও আসতে পারে’ এ জাতীয় প্রশ্নের ঝাপি। কোন আড়ম্বর ছাড়াই আজ একটি উদ্দাম প্রাণ নেচে বেড়াতে লাগলো কোন এক দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা মল পরা বালিকার ছদ্মবেশ নিয়ে। এক রোমাঞ্চকর জলতরঙ্গের বাজনা বেজেই গেলো আজ সারা দুপুর, সারা বিকেল, সারা সন্ধ্যা।

অনেক কালের অব্যবহৃত দণি দিকের ঘরটি চমৎকারভাবে ঝেড়েপুছে রিফাতের জন্য বিছানা করা হলো। নতুন কাঁথা বালিশ ও জানালার পর্দা থেকে হালকা ন্যাপথলিনের সুবাস ভেসে আসা পরিবেশটিও রিফাতকে সন্তুষ্ট করতে পারলো না, অন্তত এ ঘরে ঢোকার পর থেকে তার চেহারা দেখে তাই মনে হলো। আঙ্গুল দিয়ে শাহিদার এখনকার শোবার ঘরটিকে ইঙ্গিত করে জানালো ঐ ঘরটাতে শোবে সে। এই সিদ্ধান্তের মর্ম ঠিকভাবে না বুঝলেও শাহিদা বেগম কথা না বাড়িয়ে তার নিজের ঘরটিকে পূনর্বিন্যাস করে নিজের ব্যবহার করা বালিশ কাঁথা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন রিফাত প্রায় মারমুখী ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। অল্প কয়েকটি কথায় রিফাত তাকে মনে করিয়ে দিলো, তাকে আলাদা রাখার অপচেষ্টা সে অতীতেও বহুবার করেছে কিন্তু কোনবারই সফল হয়নি। এমনকি ঘুমিয়ে পড়ার পরেও রিফাতকে কোলে নিয়ে শুইয়ে দেয়া হতো সালমার ঘরে কিন্তু সে ঠিকই বস্তায় ভরে দূর গাঁয়ে ফেলে দেয়া বেড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে ফিরে আসতো চেনা অঙ্গনে অর্থাৎ সইয়ের বিছানায়। এককালের নাছোড়বান্দা পুচকে ছেলেটি গায়ে গতরেই শুধু বড়ো হয়নি, গোয়ার্তুমিতেও পরিপক্ক হয়েছে এটা বুঝতে দেরী হলো না। রিফাতকে ওর মায়ের কাছে ঘুমোতে পাঠাবার ষড়যন্ত্রের শাস্তি হিসেবে যেসব আচড়-কামড়গুলি উপরি পাওনা হতো সেসব স্মারকগুলি হয়তো এখনো বিরল নয় তার শরীরে। শাহিদার ঘরেই মশারি খাটিয়ে ঘুমোতে গেল তারা দুজন; শৈশব স্মৃতির জরাক্রান্ত তরুন ও বয়স্ক এক আত্মবিশ্বাসী নারী।

কোনরকম ভনিতা ছাড়াই রিফাত পূর্বাপর অভ্যস্ততার ধারাবাহিকতায় শাহিদা বেগমের বুকের মধ্যে মুখ গুজে দু’হাত দিয়ে শক্ত করে পিঠ জড়িয়ে ধরলো। সম্প্রতি শাহিদা বেগমের ঘুম ভালো হচ্ছিলো। শোয়া মাত্রই গভীর ঘুমের অতলে চলে গেলেন তিনি। স্মৃতি হাতড়ানো ধারণাটিকে আরিক বাস্তবে পরিণত করে একজোড়া চওড়া অথচ কোমল হাত তার কাঁধ হয়ে কোমর পর্যন্ত ঘুরতে ফিরতে লাগলেও তাতে এতটুকু চিড় ধরলো না ঘুমে বরং গভীরতর হলো। কিন্তু বুকের মধ্যে গুজে থাকা মুখটি অবস্থান পরিবর্তন করে পেটের মুক্তভূমিতে নেমে এসে হঠাৎ পানি থেকে ডাঙ্গায় উঠে পড়া কাকড়া ছানার মতো ইতস্তত এপাশ ওপাশ করতে লাগলে অনেকটা সুড়সুড়ি লাগার মতো অনুভুতি নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার। চকিতেই বুদ্ধিমতী শাহিদা বেগম ধরে ফেললেন যে শৈশব স্মৃতির সুতোর গুটির জড়ানো প্যাচানো জটিল অংশের সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে আকস্মিকভাবে উৎকন্ঠার কাটাগুল্মে ঝাপ দিয়েছে সদ্য বয়:প্রাপ্ত এক পুরুষ। এই ধরে ফেলাটা পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে নয়, খানিকটা সন্দেহের মতোই। কিন্তু সাফাত কৌতুহলী শিশুর মতো আধো আধো জড়তাগ্রস্থ পায়ে পুরো আঙ্গিনা জুড়ে পরিভ্রমন শুরু করলে সন্দেহের মধ্যে ঘাপটি মারা অন্যসব সন্দেহ দুর হলো অর্থাৎ যা তিনি ধরে নিয়েছিলেন তাই ঠিক। বন্ধ চোখ না খুলেই তিনি এ মুহুর্তের করণীয় নিয়ে ভাবলেন। যে কোন রকম সিদ্ধান্ত নিতে তার মধ্যে বৈরাগ্যভাব উপস্থিত হলো, করণীয় নিয়ে ভাবনাটিই অপ্রয়োজনীয় মনে হলো। মৃত নদীর আর নদী ভাঙ্গনের ভয় কি? এছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ছিলো, øেহময় সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়ানো এই ছেলেটি হয়তো অল্প কয়েকটি দিন থাকবে এ বাড়ীতে; সে সময়টুকু তার আনন্দ নিয়েই যেন সে থাকতে পারে। নতুন কোন অস্বাভাবিকতা, অস্থিরতার আমদানী আর না ঘটুক। পরিবর্তিত সময় এই নিস্পৃহতার সুযোগটুকু তাকে করে দিয়েছে। কিছুদিন আগে হলেও অন্য সবকিছু ভুলে তাকে অবশ্যই নেমে পড়তে হতো হৃদয়ঘাতী এক প্রতিরোধে।

বোকার স্বর্গে বাস করা ধারণাগুচ্ছ সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমানিত হলো একটি বিস্ময়কর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহনের মধ্য দিয়ে যা শাহিদা বেগমের শরীরের প্রতিটি প্রত্যঙ্গতো বটেই এমনকি সমস্ত রোমকুপ ও মগজের কোষকে পর্যন্ত বিবশ করে দিলো। একসময়কার সশস্ত্র যে আর্তনাদগুলিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিলো তারা একটি অনুপম সুরের মূর্ছনায় রুমঝুম করে জেগে উঠলো নুপুর পরা নর্তকী রূপে। একটি বড়ো ঢেউ হঠাৎ করে আছড়ে পড়ে ভেঙ্গে দিলো এতোকাল ধরে গড়ে ওঠা মজবুত বাধটিকে। নৃত্যের তালে তালে বেরিয়ে এলো নর্তকীরা, ডানা গজিয়ে পরী হয়ে উড়ে চলে গেলো এ বাড়ির টিনের চালকে ঝমঝম শব্দে কাপিয়ে আর বৃরাজিতে শো শো শব্দ তুলে। অন্যদিকে ছোট ছোট মৃদু কোমল ঢেউ আছড়ে পড়তেই লাগলো একের পর এক যতণ পর্যন্ত না ভেঙ্গে যাওয়া বাধের শেষ মাটিটুকুও পানিতে মিশে গেলো। বন্ধ চোখেও জলের প্লাবন নামলো। অনির্বচনীয় শিহরণে তিরতির করে কাঁপতে থাকা শাহিদা বেগম ভাবলেন, নিজেকে ভুল প্রমাণ করে গুড়িয়ে দেয়ার অনন্যসাধারণ এই মুহুর্তটুকুর জন্য একটি জনম শুধু নয়, অন্তত তিনটি জনমের বঞ্চনাকে উৎসর্গ করা যায়।

আজ রাতে সমস্ত বাংলাদেশ রাস্ট্রের যাবতীয় জোনাকী পোকা জড়ো হতে শুরু করলো এ বাড়িটিকে ঘিরে। আসুক জোনাকী পোকারা, গুবরে পোকারাও আসুক। চলে আসুক রাজ্যের বনবিড়াল, শেয়াল, বাঘডাসা আর নিশাচর বাদুড়েরাও। জামরুল গাছটি অন্তত এ রাতটার জন্য হলেও ফিরে পাক ভেঙ্গে যাওয়া ডালটি।

কিছুটা উৎসব আজ রাতে তো হতেই পারে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28721833 http://www.somewhereinblog.net/blog/bakibillahblog/28721833 2007-07-21 14:46:04