আমার প্রিয় পোস্ট

গাহি সাম্যের গান

মৌলবাদীদের বিজ্ঞানপ্রীতি এবং বিজ্ঞানবিদ্বেষ প্রসংগে (১)

২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:১৪

শেয়ার করুন:                   Facebook

অন্ধবিশ্বাসীদেরও একধরনের যুক্তি থাকে। থাকে বৃত্তাবদ্ধ যুক্তি, কানাগলিতে ঘুরপাক খাবার যুক্তি - যা থাকেনা তা হলো যুক্তির শৃংখলা, বাছবিচার। নিজ নিজ বিশ্বাসের সমর্থনে তাদের যুক্তিপ্রয়োগের চেষ্টা হয়ে উঠে হাস্যকর, আচরন হয়ে উঠে জান্তব। এর একটা ভাল উদাহরন হলো ধর্মীয় মৌলবাদীদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা-সিদ্ধান্তগুলোকে নির্ভুল প্রমাণ করবার প্রানান্তিক চেস্টা এবং এই উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা এবং একই সাথে অবজ্ঞা করা। এদের স্বভাব হলো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত-অনুসিদ্ধান্তগুলোর সাথে এদের মতের সামান্য মিল খুঁজে পেলে আনুগত্য প্রকাশ আর না মিললে অবজ্ঞা; এই দুই চরম প্রান্তিক আচরনের মাঝখানের বিশাল ফাঁকা জায়গাটা ভরাট হতে পারে মৌনতা নয়তো গোয়ার্তুমি দিয়ে।

ধর্মগ্রন্থগুলো যে স্থানে-কালে রচিত হয়েছে সে স্থান-কালের জ্ঞানচর্চার মানের ওপরেই নির্ভর করছে ওগুলোতে কি কি বিষয়ে কতটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা। স্থান-কাল পাল্টে যাওয়ায় বিভিন্ন ব্যাখ্যা সন্নিবেশিত হয়েছে - এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। ধর্মগ্রন্থের নৈতিক আবেদনকে মুল বলে যারা মানতে পারছে তাদের এ নিয়ে ক্ষোভ বা অস্বস্তি নেই। সমস্যা হয় মৌলবাদীদের, যারা ধর্মগ্রন্থের প্রতিটি ব্যাখ্যা সিদ্ধান্তকে আক্ষরিক অর্থে সত্য, বিজ্ঞান সম্মত বলে মনে করতে এবং করাতে চায়।

সপক্ষ সমর্থনের এই উন্মাদনা থেকে সূচিত হয় নানান অপকৌশল কুপ্রবৃত্তির। খুব সাধারন একটা প্রবৃত্তি হলো কোন বিজ্ঞানী কিংবা কোন বিখ্যাত ব্যক্তিত্তকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা। যেমন উনি এটা বলেছেন, তিনি ওটা বিশ্বাস করতেন ইত্যাদি। বাস্তবতা এই যে গোটা বিশ্বেই শিক্ষিত এবং মেধাসম্পন্ন জনগোষ্টীর একটি বড় অংশ নানান অপবিজ্ঞানে ও অলৌকিকত্তে বিশ্বাসী। সুদুর অতীত থেকে সম্প্রতিকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে উদাহরনের কোন ঘাটতি থাকেনি। যেমন জোহান কেপলার জ্যোতিষশাস্ত্র বিশ্বাস করতেন, নিউটন ক্ষারধাতুকে সোনায় রূপান্তর করার চেস্টা চালিয়েছিলেন,লগারিদমের আবিস্কর্তা জন নেপিয়ার ঐশী গ্রন্থের ব্যাখ্যায় সীমাহীন অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন, ইউরেনাসের আবিস্কর্তা উইলিয়াম হার্সেল মনে করতেন সুর্যের অভ্যন্তরভাগ শীতল ও অন্ধকারময়। বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে ফ্রান্ক জে টিপলার পর্যন্ত এরকম অসংখ্য বিজ্ঞানীর নাম করা যাবে যারা ব্যক্তিগত জীবনে ইশ্বরবাদ, অধ্যাত্মবাদ ও অলৌকিকতায় আস্থাশীল ছিলেন।

এভাবে সব রেকর্ড ঘাটলে কিছু বিজ্ঞানী বা বিদ্বানের অযৌক্তিক, অলৌকিক এবং বিজ্ঞানবিরুদ্ধ বিষয়াদি নিয়ে অস্পস্ট অবস্থান লক্ষ করা যাবে। এই ব্যাপারগুলোকেই কাজে লাগায় মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে বিভিন্ন রকমের অপবিজ্ঞানের ধ্বজাধারী ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। মৌলবাদীরা- ধর্মব্যবসায়ীরাও তাদের নিজ নিজ মতাদর্শগুলোকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ করতে এগুলোর সাহায্য নেয়। এর সাথে যুক্ত হয় প্রকৃত তথ্য-তত্ত্বের বিকৃতি । এটা হতে পারে দুদিক থেকেই - বিজ্ঞানীর মুল কথার বিকৃত উপস্থাপনা করে অথবা কথিত ঐশীবাণীর অর্থ পাল্টে দিয়ে। ধর্মগ্রন্থ এবং বিজ্ঞান দু'বিষয়েই সাধারন মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে যে কোন পক্ষের বক্তব্যকে বিকৃত করে বা অসমভাবে জুড়ে দিয়ে উদ্দেশ্যসাধন একটি কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম কথা হলো কিছু বিজ্ঞানী বা মহামনীষির ব্যক্তিগত বিশ্বাস কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের আওতায় পড়ে না। পরীক্ষিত সত্যকেই বিজ্ঞান মর্যাদা দেয়। বিজ্ঞানের জগতে ব্যক্তিবিশ্বাসের কানাকড়ি মুল্য নেই যতক্ষন না তা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষনের ধাপ পেরিয়ে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের মর্যাদা পায়। জে বি হ্যালডেন টেলিপ্যাথিতে বিশ্বাস করতেন এতে টেলিপ্যাথির সত্যতা প্রমাণিত হয় না, এতে বড়জোর প্রমাণিত হয় "হ্যালডেন নামের এক ব্যক্তি টেলিপ্যাথিতে বিশ্বাস করতেন"।

দ্বিতীয়তঃ, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব মহামনিষীরা বিজ্ঞানকে স্রেফ পেশা হিসাবে গ্রহন করেছেন। এঁরা জীবনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক দৃস্টিভঙ্গি গ্রহন করেন না। অর্থাৎ বিজ্ঞান এদের কাছে আলুপটলের ব্যবসা বা জমির দালালির মতো নিতান্তই একটি পেশা। এঁরা একই সাথে পেশায় বিজ্ঞানী এবং মানসিকতায় বিজ্ঞান- বিরোধী। এরকম স্ববিরোধিতার কারণ হতে পারে তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পরিবেশ।

তৃতীয়তঃ, চরম সত্য বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব বিজ্ঞান বলে না; আজ যা তত্ত্ব, আগামীকাল পরীক্ষা পর্যবেক্ষন অনুসন্ধানের মাধ্যমে তা ভুল প্রমাণিত হতে পারে। বিজ্ঞানের প্রতি মেকী আনুগত্য দেখানো মৌলবাদী গোষ্ঠি যারা বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের তত্ত্ব বা বিজ্ঞানীর উক্তিকে সপক্ষে ব্যবহার করছে তারা বুঝতে পারছে না যে তারা একই সাথে ধর্মগ্রন্থগুলোর মর্ম-অর্থের কিরকম বিবর্তন ঘটাচ্ছে। আজ এই ভন্ডরা কসমোলজি থেকে শুরু করে ইনফরমেশন থিওরী, কোয়ান্টামতত্ত্ব সবকিছুরই ইঙ্গিত বেদে, বাইবেলে বা কোরানে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আরো কয়েক'শ বৎসর পরে হয়তো অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বই পাল্টে যাবে, তখন কি এইসব মৌলবাদী, ভূয়া বিজ্ঞানপ্রেমী মতলববাজ তাত্ত্বিকেরা নিজ নিজ ধর্মগ্রস্থগুলোর উক্তির নবতর অর্থ-বাখ্যা খুঁজে পাবে নাকি দোষ চাপাবে ভাষাতাত্ত্বিকদের ঘাড়ে?


চলবে...


সহায়ক লিংক:
১. IIDB Philosophical Forum
২. PCA Forum

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): বিজ্ঞানযুক্তিবাদ ;

 

  • ১৬ টি মন্তব্য
  • ২১৬ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১৪ জনের ভাল লেগেছে, ২ জনের ভাল লাগেনি
১. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫৬
comment by: রিয়াজ শাহেদ বলেছেন: শেষ কথাগুলোই আসল কথা।
২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১৬

লেখক বলেছেন: আশা করি পরবর্তী পর্ব্ব পড়বেন।

২. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫৮
comment by: হুমায়রা ফেরেদৌস তানিয়া বলেছেন: waiting to hear more from you. good observation and very informative.
২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১৪

লেখক বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ।

৩. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১৪
comment by: মানুষের পৃথিবী বলেছেন: কেবলমাত্র নিরেট পরীক্ষিত সত্যই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। হাজার বছর আগের অন্ধ ধর্মগুলোকে জিইয়ে রেখেছে যে সমস্ত মোল্লা, প্রচারকগণ তাদের বিপরীতে কিছু শানিত, বিজ্ঞানদীপ্ত মানুষই সমাজকে যুগে যুগে আলো দেখিয়েছে।

আপনার লেখাটি দেশের ধর্মান্ধ মানুষের নিরন্ধ্র অন্ধকার মনে কিছু আলোর রেখা টানুক এই প্রত্যাশায় রইলাম।
২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১৭

লেখক বলেছেন: আপনার বিশ্বাস এবং চিন্তাকে স্যালুট।

৪. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:২৪
comment by: স্বাধীনতা তুমি বলেছেন:
মানুষ কিভাবে ধর্মকে দেখলো বা বিচার করলো সেটা দিয়ে তো আপনার কিছু যায় অসে না। আপনি কিভাবে ধর্মকে দেখছেন সেই বিচারটা মানুষের সামনে উপস্থাপনটা করুন না? মানুষও দেখুক আপনার বিচারটা কি এবং ধর্ম সম্পর্কে আপনার কি ভাবনা বা বিচার? অন্যের চোখের দেখা ধর্মকে দেখে কেন ধর্মের সমালোচনা করেন এটাই বুঝিনা। আপনি কি মূর্খ যে আপনি নিজে ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে পারেন না? তায় অন্যের চোখে দেখা ধর্মকে নিয়ে সমালোচনায় মেতে উঠেন? আমার কথা হলো ধর্মকে নিয়ে সত্যিই যদি সমালোচনা করতে চান তাহলে ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা করে এসে তারপরে এর সমালোচনা করুন। তখনই কেবল বুঝতে পারবেন ধর্মের মধ্যে কোন বিষয় দূর্বল আছে, না ধর্ম নিয়ে যারা অযৌক্তিক আলোচনা করছে তাদের মধ্যে দূর্বলতা আছে।
২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৩৫

লেখক বলেছেন: মানুষ কিভাবে ধর্মকে দেখলো বা বিচার করলো সেটা দিয়ে অনেক কিছু যায় আসে বলে আমি মনে করি। আমি কিভাবে ধর্মকে দেখি সেটা এই লেখার বিবেচ্য বিষয় নয়। ঠিক আছে?

৫. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৪৩
comment by: প্রতারিত পুরুষ বলেছেন: রিয়াজ শাহেদ বলেছেন: শেষ কথাগুলোই আসল কথা।
২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ২:২৫

লেখক বলেছেন: হ।

৬. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৪৯
comment by: স্বাধীনতা তুমি বলেছেন:
লেখক বলেছেন: আমি কিভাবে ধর্মকে দেখি সেটা এই লেখার বিবেচ্য বিষয় নয়। ঠিক আছে?


এটা কি আপনার মূর্খের মত উত্তর হলো না? আপনিই বলছেন মানুষ ধর্মকে নিয়ে বিভিন্ন ভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। মানুষ যদি ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তাহলে আপনি সঠিক ব্যাখ্যাটা তুলে ধরুন। ধর্ম যদি বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে ধর্মের প্রকৃত প্রেজেন্টেশনটা কি সেটাকে তুলে ধরেণ। তবেই মানুষ আপনাকে জ্ঞানী বলবে। আপনাকে শ্রদ্ধা করবে। আপনাকে সঠিক ধার্মিক বলবে।

দেখুন, আপনি মানুষকে দুধের গুনাগুন সম্পর্কে বিশ্লেষন করে বুঝাতে চাচ্ছেন তাহলে আপনি ল্যাব্রটারীতে ঘোল নিয়ে নারাচারা করে দুধের বর্ণনা দেবার চেষ্টা করছেন কেন?

২০ শে জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১:২৩

লেখক বলেছেন: আয়োডিনযুক্ত লবন রেগুলার গ্রহনের পরামর্শ দেয়া হৈল।

৭. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৩:৩০
comment by: দ্বিতীয়নাম বলেছেন: স্বাতু কথা বাদ দেন, হে একটা ধর্ম প্রতিবন্ধী। এই ধরনের ব্লগ দেখলেই হামলে পড়ে আর ব্লগারগো মুর্খ আর ফালতু লাদি ছড়ায়।
২০ শে জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৭

লেখক বলেছেন: ধর্ম প্রতিবন্ধী .... আখ্যাটা জটিল হৈসে :)

৮. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ৯:৪৬
comment by: বিগব্যাং বলেছেন: ভালো পোষ্ট...
৯. ২০ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১১:৩৬
comment by: ফারুক আহসান বলেছেন: কোথায় হাল্কা মেজাজের হল । এ ত দেখি চমৎকার পোস্ট ।

 



 


আছি কুনোরকম...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ১২৪৭৩