
‘ফতুয়া’ শব্দটি ডিকশনারিতে নেই। এটি লোকমুখে প্রচলিত বাঙালির বিশেষ পোশাকের নাম। ফতুয়ার কথা বলতেই যে কারো চোখে রবীন্দ্রনাথের নাটক-গল্পের চরিত্রগুলো ভেসে ওঠে। এখনো রবীন্দ্রনাথের নাটকে আদি সময়ের সেই গোল গলা, সামনে দুটি পকেট আর লম্বাটে ফতুয়া দেখা যায়। সেই সময় একটু বয়স্করা ঘরে আরাম পেতে ফতুয়া পরতেন। সাদা ফিনফিনে কাপড়ের সেই ফতুয়া ২০০০ সালে এসে একেবারে লেটেস্ট ফ্যাশন হয়ে গেল। সবাই শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবির কমন লুকটাকে একটু পরিবর্তন করতেই রীতিমতো ফতুয়ার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শার্টের বিকল্প কিংবা ক্যাজুয়ালি ফতুয়া একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ফেললো। ২০০০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ফতুয়া সরগরম করে রেখেছিল ফ্যাশন বাজার।
২০০০-এর শুরু থেকে প্রত্যেক ডিজাইনার ও বুটিক হাউস ফতুয়ার সেই আদি রূপে নানাভাবে শোভাবর্ধন করেছে। ফতুয়ার অলঙ্করণ ও নকশায় এসেছে নানা বৈচিত্র্য। দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। লোকাল মার্কেটে তুমুল চাহিদার কারণে গ্লোবাল মার্কেটেও ছড়িয়ে পড়ে ফতুয়া। এখন প্রবাসী বাঙালিদের মাঝেও তুমুল জনপ্রিয় পোশাক ফতুয়া। জিন্স প্যান্ট কিংবা যে কোনো ট্রাউজারের সঙ্গে চটজলদি পরতে পারার জন্যই ফতুয়ার এতো চাহিদা বেড়েছিল। ইউরোপের সবচেয়ে বড় দোকান জা’রার শো-রুমেও এখন ফতুয়া চলছে। চীন ও ভারতেও ফতুয়ার অবাধ মার্কেট। ফ্যাশন ডিজাইনাররা জানিয়েছেন, ভারতীয় উপ-মহাদেশে ফতুয়ার উৎপত্তি হলেও বাংলাদেশেই ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো বুটিক হাউস থেকে শুরু করে সর্বত্র ফতুয়ার ভরপুর কালেকশন দেখা যাচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের বাহারি ডিজাইনের ফতুয়ায় সয়লাব বুটিক হাউসগুলো। কিন্তু এবার ফতুয়ার বিক্রিতে ভাটা পড়েছে।
কে-ক্রাফটের শো-রুমগুলোতে গতবারের তুলনায় এবার ফতুয়ার বিক্রি কম। কে-ক্রাফটের একজন কর্মী জানান, দুটো পাঞ্জাবির সঙ্গে কেউ কেউ একটা ফতুয়া কিনছেন। আবার যারা শর্ট পাঞ্জাবি পছন্দ করছে না তারাই ফতুয়া কিনছেন।
কে-ক্রাফটের ঈদ কালেকশনে এবার জয়সিল্ক, এন্ডি কটন, এন্ডি সিল্ক ও ডবি কটনের ফতুয়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। অবশ্য অধিকাংশ বুটিক হাউসেও এ ফেব্রিকের ফতুয়াই বেশি। পাশাপাশি অনুন’স সুতি ও টুয়েল কটন, দেশাল কুমিল্লার খাদি আর নরসিংদীর তাঁত, রঙ ডুপিয়ান সিল্ক ও মসলিন এবং সাদা-কালো সুতি ও ক্রেফটের ফতুয়া করেছে ঈদে।
ডিজাইনে শার্ট কাটিং, পাঞ্জাবি কাটিং, গোল গলা, ভ্যান কলার, হাফ নেক বেশি চলছে। কে-ক্রাফটের ফতুয়ায় উজ্জ্বল কালারের সঙ্গে হ্যান্ড ও মেশিন এমব্রয়ডারি, কারচুপি, রঙিন সুতো, স্টোন ও চুমকির কাজে দারুণ সমন্বয় দেখা যায়। এসব ফতুয়ার দাম ৪২৫ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে জয় সিল্ক ও এন্ডি কটনের ফতুয়ার দাম বেশি।
অনুন’সের ঈদের ফতুয়ার কালেকশন বেশি। এবার চাহিদা কম থাকায় নিরাশ নন বিক্রয় কর্মীরা। তারা জানান, ঈদে বিক্রি না হলেও তেমন কিছু হবে না। কারণ ফতুয়া সারাবছরই বিক্রি হয়। তারা আরো জানান, এখন চাহিদা কম থাকলেও ঈদের আগে হঠাৎ ফতুয়ার টান পড়তে পারে। এ জন্যই কালেকশন রাখতে হচ্ছে। অনুন’সে হাফ নেকের ডিমান্ড বরাবরই একটু বেশি। এছাড়া তরুণ-তরুণীদের কাছে হাফ স্লিভ, ফুল স্লিভ দুই ধরনের ফতুয়াই পছন্দ। অনুন’সের ফতুয়ার দাম ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দেশালে ফতুয়ায় স্ক্রিন প্রিন্ট ও দেশি ডিজাইনের ব্যবহার বেশি। এছাড়া তাদের ফতুয়ায় নানা স্লোগান স্থান পেয়েছে।
রঙের ফতুয়ায় নানা উজ্জ্বল রঙের ছড়াছড়ি ক্রেতাদের বেশি আকৃষ্ট করে। রঙের মসলিন ফতুয়ার দাম বেশি। কাজের মধ্যে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক, এমব্রয়ডারি, কারচুপি, চুমকি, হাতের কাজ, পুঁতি ও কাটবেইজ কাজ বেশি। রঙের বিক্রয় কর্মীরা জানান, এবার মেয়েদের কুর্তি, ছেলেদের কুর্তা ও শর্ট পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি থাকায় ফতুয়ার বিক্রি কমেছে। রঙের ফতুয়ার দাম ৩৫০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা।
সাদা-কালোর সুতি ও ক্রেফটের ফতুয়ার চাহিদা একটু বেশি। অনেকে শুধু এ দুটি রঙের জন্য সাদা-কালোর পোশাক পছন্দ করেন। সাদা-কালোর ফতুয়ায় হাতের কাজ, এপলিক ও এমব্রয়ডারি প্রাধান্য পেয়েছে। দাম ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

