
দারিদ্র্য আর স্বপ্ন—এই ছিল পরিবারটির সম্বল। ছাত্রলীগের কারণে তাদের স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেছে। স্বপ্ন-হন্তারকেরা দেখ, আবু বকরের মাকে দেখ। তাঁর ভাঙা ঘর দেখ। ভাইবোনদের গায়ে লেপটে থাকা কষ্ট দেখ। দেখ আবু বকরের বাবাকে। তোমাদের কুৎসিত চেহারা দেখতে চান না এই বৃদ্ধ বাবা
সরকার-সমর্থক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের পরিণতিতে এবার প্রাণ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক। দিনমজুর বাবার এই সন্তানকে ঘিরে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী গ্রামের দরিদ্র পরিবারটি স্বপ্ন দেখেছিল সোনালি এক ভবিষ্যতের। আবু বকর নিজেও দিনমজুরের কাজ করেছেন—নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে, পরিবারকে সাহায্য করতে। এভাবে তিনি স্কুল ও কলেজ-জীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতেও বাড়ি গিয়ে দিনমজুরের কাজ করতেন।
গত ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আবু বকর ছোট ভাই ওমর ফারুককে বলেছিলেন, ‘আর একটি বছর তোমরা কষ্ট করো। এরপর আমি পাস করে বের হব। ভালো চাকরি হবে। তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।’ কিন্তু পরিবারটির সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আবু বকরের পরিবারকে কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই। আবু বকর ছাত্ররাজনীতি করতেন না। কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির করুণ শিকারে পরিণত হলেন।
অপেক্ষায় আছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবু বকরের মা-বাবাকে কী বলবেন?
আমরা গত বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথম আলোয় লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলান।’ ২৯ ডিসেম্বর (২০০৮) নির্বাচনের পরের দিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তখন ওই লেখায় আমরা বলেছিলাম, শেখ হাসিনার শাসনামলের শুরুতেই যদি ছাত্রলীগ এভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাতে থাকে, তাহলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত শান্তিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আমাদের স্বপ্ন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীরা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন বলে আমরা শুনেছিলাম; কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
গত বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আবার ছাত্রলীগের একাধিক পক্ষ বেপরোয়া সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত এবং শিক্ষকদের বাসভবনে ভাঙচুর হয়েছিল। এমন আরও ঘটনা ঘটেছিল। আমরা তখন এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের হুঁশিয়ারিমূলক ‘নির্দেশ’ শুনেছি বারবার।
গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী ঘটনাবলির পটভূমিতে আবার আমরা লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলাতে পারছেন না?’ বলেছিলাম, ‘শেখ হাসিনা ছাত্রলীগকে সামলাতে পারলেন না বা পারছেন না—এ কথা আমরা এত তাড়াতাড়ি বলতে চাই না। আমরা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে চাই; দেখতে চাই, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে কীভাবে সামলান, কতটুকু সামলান।’
আমাদের মনে আছে, সেদিন (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের ৬১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভা ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধান অতিথি। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ছাত্র হোক আর যে-ই হোক; আইন অমান্য ও চাঁদাবাজি করলে গ্রেপ্তার করা হবে, শাস্তি দেওয়া হবে, সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই হুঁশিয়ারি কোনো কাজে আসেনি। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর কথাও শোনেনি ছাত্রলীগ। বরং ফেব্রুয়ারির পর মার্চ আর এপ্রিলে ছাত্রলীগ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সশস্ত্র সংঘাতের ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ১৩ মার্চ (২০০৯) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস ঘটনার পর শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়েছিল ঢাকা ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ। তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছিল ছাত্রলীগ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অস্ত্র নিয়ে নেমে পড়ছিল বারবার। সে সময়ে খুলনা, সিলেট ও পটুয়াখালীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ঘটে সহিংস ঘটনা।
ওই সব সন্ত্রাসী ঘটনার পর শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ ছেড়ে দেন। ৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভা শেষে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যমকে। একই সঙ্গে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু এর পরও বন্ধ হয়নি ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদা আর টেন্ডারবাজি; বরং সারা দেশে এসব আরও ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে।
আমরা হিসাব করে দেখেছি, গত এক বছরে শুধু প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছে দেশব্যাপী ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীদের ১২১টি ছোট-বড় সন্ত্রাসী ঘটনার খবর। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরের মৃত্যুসহ মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সংঘর্ষের ফলে।
মনে পড়ে, তখন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব হুঁশিয়ারি ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এবারের সহিংসতার পর যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ছাত্রলীগের এ এফ রহমান হল শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুককে দল থেকে বহিষ্কার এবং এই কমিটি বিলুপ্ত করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা কোনো ব্যাপার না। এমন ঘটতে পারে। তবে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি সেটাই বড় বিষয়।’
মনে পড়ে, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পল্টনে ছাত্রলীগের সেই পুনর্মিলনী সভায় বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী পরোক্ষভাবে প্রথম আলোর লেখালেখির কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের এক মাস সময়ও দিতে চায় না। এখনই লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার গঠন করেছি মাত্র ৩৫-৩৬ দিন হলো। এর মধ্যে সব ঠিক করে ফেলতে হবে! আলাদিনের চেরাগ নিয়ে তো ক্ষমতায় আসি নাই!’
আমরা কখনো বলিনি, কোনো সরকারের হাতে আলাদিনের চেরাগ আছে, ক্ষমতায় এসেই তারা এক মাসের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। আমরা নতুন সরকারের শুরুতেই ১৯ জানুয়ারি (প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলান) ও ১৭ ফেব্রুয়ারি (প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলাতে পারছেন না?) দুটি মন্তব্যমূলক লেখা প্রকাশ করে সরকারকে বিনীতভাবে সজাগ করতে চেয়েছিলাম। কারণ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে ছাত্রলীগসহ সরকারি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো যে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, তা তখন বিভিন্ন আলামত থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অতীতেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬—২০০১) এসবের পরিণতি ভালো হয়নি, আমরা এমনটা দেখেছি।
আমাদের মনে আছে, একইভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আসার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল ছাত্রদল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের ৩৫ দিন পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম আলোয় মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রদলকে সামলান!’ ওই লেখার দুই বছর পর ২০০৩ সালের ৮ আগস্ট আমরা আবার লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রদলকে সামলাতে পারেননি।’ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পাঁচ বছর ধরেই ছাত্রদলের অব্যাহত ছাত্র-সন্ত্রাস, বন্দুকযুদ্ধ, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, জবরদখল চলে। এ সবকিছুর পরিণতি আমরা জানি।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট মাত্র ৩১টি আসন পেয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। তার পরও থেমে নেই ছাত্রদল। এই সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের দুই পক্ষে সংঘর্ষ ও বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ আড়াই বছর আগে শেষ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কমিটিকেই নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। সাধারণভাবে শোনা যায়, কেন্দ্রীয়সহ দেশের বেশির ভাগ কমিটিতেই অছাত্ররা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আছেন। তাঁদের ‘প্রধান পেশা’ চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি।
এসব বিবেচনায় আমরা শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে বিভিন্নভাবে সাবধান করেছি। কিন্তু এসবে কোনো কাজ হয়নি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সমাবেশে আমাদের এসব লেখালেখির ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমালোচনা করেছিলেন, তা আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এরপর সরকারের এক বছর পার হয়েছে। আশা করেছিলাম, এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে উদ্যোগী হবে, ছাত্রলীগকে সামলাবে। কিন্তু তিনি পারলেন না। এ কথা বলতে গিয়ে আমরা কষ্ট পাচ্ছি। কারণ, স্বাধীনতার পর প্রায় চার দশক জুড়ে ছাত্ররাজনীতির নামে বাংলাদেশকে এক সন্ত্রাসকবলিত বিপন্ন দেশে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ ছোট-বড় বহু শিক্ষাঙ্গনে খুনোখুনি, গোলাগুলি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর হল দখলের ঘটনা ঘটেছে; ঘটছে সব সরকারের আমলেই। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্ররাজনীতির দোহাই দিয়ে এসব আর মেনে নেওয়া যায় না। এখন সময় হয়েছে প্রশ্ন তোলার যে, ছাত্রসংগঠন ও ছাত্ররাজনীতির নামে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমরা আর কত দিন মেনে নেব?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এখন আপনি কী বলবেন? আপনি আবু বকরের দিনমজুর বাবাকে, তাঁর অসহায় মাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবেন?
মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



