আমি যখন পণ্ডিতমশাই…(১) (২)
আমার টিউশনি জীবনের শুরুর দিকে একটা ক্লাস সিক্সের ছেলেকে গুলশান-২ এ গিয়ে পড়াতাম। সেইরকম অভিজাত এক পরিবার! দারোয়ান, কেয়ারটেকার সহ আরো কয়েকজনের কাছে জবাবদিহিতা এবং কয়েক জায়গায় সাক্ষরদান ছাড়াও গার্জিয়ান ফোনে কনফার্ম করার পরেই কেবলমাত্র বাসায় প্রবেশের অনুমতি মিলতো। যাই হোক, সবই সয়ে নিয়েছিলাম কারণ মাস শেষের প্রাপ্তিটা বেশ খুশি করার মতোই ছিলো। আর তাছাড়া আমার টিউশনির বাজারটাতেও তখন বেশ মন্দা যাচ্ছিল। তো, টিউশনির শুরুতে বলা হয়েছিলো যে, সপ্তাহে চারদিন(সাধারণত তিনদিনের বেশি পড়ানো হয় না। কিন্তু ঐ যে বললাম, বাজারে মন্দা চলছিলো।) সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত পড়াতে হবে। কিন্তু সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ভাবেই হোক, টিউশনির প্রথমদিন থেকেই আমার মহাব্যস্ত স্টুডেন্টের শিডিউল পাওয়াটা ‘লাম্বার ওয়ান ছাখিব কান’ এর শিডিউল পাওয়ার চেয়েও কঠিন কাজ হয়ে দেখা দিলো।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বুয়েটের সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ওই দুইদিন নিয়মিতই যেতাম। আর বাকি দুইদিন ল্যাব, কুইজ ইত্যাদি বিবেচনায় শিফট হত। তো, শুক্রবারদিন আমার স্টুডেন্টের রুটিন ছিলো এরকম-ভোরে উঠে শারীরিক শিক্ষকের কাছে ব্যায়াম, তারপর নাস্তা; নাস্তার পর হুজুরের কাছে কোরআন-শিক্ষা, এরপর আমার কাছে অংক করা; তারপর আমার মতোই আরেকজন পার্টটাইম পণ্ডিতমশায়ের(ইনি ঢাকা ভার্সিটির ছিলেন) কাছে অন্যান্য বিষয়গুলো পড়া। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে যেতো। তারপর বিকেল তিনটায় আবার স্পেশাল(!) কোচিং। সন্ধার পরে আবার বসতে হতো সারাদিনে নানান টিচারের কাছ থেকে প্রাপ্ত হোমওয়ার্কের সদগতি সাধনে!
ইংলিশ ভার্সন স্কুলের ছাত্র হলেও মূলতঃ ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিলো। এর আগের বছরও ক্যান্ডিডেট ছিলো, কিন্তু চান্স পায় নি(মানে ক্লাস সিক্সে এটা ওর দ্বিতীয় বছর)। তাই এবার ভীষষণ সিরিয়াস! একদিন বিকেলবেলা আমাকে হটাৎ ফোন করে বললো, “ভাইয়া, আজ পড়বো না। আজ আমার আমার বার্থডে।” আমি বললাম, “বেশ।” মনে মনে ভাবলাম, জন্মদিন ব্যাপারটা কেন বছরে একবার আসে? কেন প্রতি মাসে একবার করে আসে না? পরদিন ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এটা ছিলো ওর ১৪তম জন্মবার্ষিকী। মানে ১৪ পেরিয়ে ১৫ তে পদার্পণ।(মনে রাখবেন ও কিন্তু তখনো ক্লাস সিক্সে পড়ে! মনে আছে আমার ১৪তম জন্মবার্ষিকীর কয়েকদিন পরেই দশমশ্রেণীর ১ম সাময়িক পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আর এস,এস,সি তে ইংরেজী ২য়পত্র পরীক্ষার দিন পদার্পন করেছিলাম ১৬ বৎসরে।)
যাই হোক, এতোগুলো টিচারের এতরকম চাপে পড়ে ওর অসহায় অবস্থা দেখে আমার বেশ মায়াই লাগতো। তাই আমি আর ওর সেই চাপকে না বাড়িয়ে, যথাসম্ভব ইজি-ওয়ে তে হ্যান্ডেল করতে চেষ্টা করতাম। আর এটা নিয়ে আমাকে ওর মায়ের কাছ থেকে নানান অভিযোগও শুনতে হতো। আমি নাকি ওকে ভালো করে চাপ দিচ্ছি না, বেশি করে হোমওয়ার্ক দিচ্ছি না, ফাঁকিবাজির জন্য বকা দিচ্ছি না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবু এতকিছুর পরেও আজ ওর কথা বলতে পারছি এই জন্যেই যে, ও আমাকে হতাশ করে নি। অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে স্থান করে নিয়েছে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ।
তবুও, ও কি কোনোদিন এই গঁতবাধা শৈশবের জন্য নিজেকে বঞ্চিত ভেবে আক্ষেপ করবে না???
এদিকে, একটা কঠিন এবং নিরস টিউশনির গল্প দিয়েই এই লেখা শেষ করলে আমার কিন্তু আক্ষেপ হবে, আর পাঠকও বঞ্চিত হবে। তাই আমার পার্টটাইম পণ্ডিতমশাই হওয়ার আগের একটি ঘটনা বলেই এই লেখার ইতি টানতে চাই…
গণিত উৎসবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আহবান জানিয়েছিলেন, তিন ‘ম’ কে না বলার জন্য। আর এই তিন ‘ম’ হচ্ছে মিথ্যা, মাদক ও মুখস্থ। আর এজন্য আমিও আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সবসময় মুখস্থ না করে বুঝে পড়ার জন্য বলি। ভালো ছাত্র হওয়ার কারণে স্কুলে থাকতে(বাড়িতে থাকতে) জ্যাঠাতো-কাকাতো ভাইবোনগুলোকে পড়ানোর দায়িত্বটা সবসময় আমার কাঁধেই বর্তাতো। তো, আমার সদ্য ক্লাস সেভেনে উঠা কাকাতো বোনকে ধর্মশিক্ষা পড়াচ্ছিলাম। তো ওকে “ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা কর।” শীর্ষক প্রশ্নের জন্য পাঠ্যবই থেকে একটা প্যারা ভালো করে পড়তে এবং তারপর নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখতে বললাম। কিছুক্ষণ পর ও আমাকে যেটা লিখে এনে দেখালো তার শুরুটা এরকম, “ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ঈশ্বর অনেক। কিন্তু তাঁর শক্তির প্রকাশ বিভিন্ন……”
তো, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে, ঈশ্বর অনেক পাইলি কই?!”
সাথে সাথে ওর জবাব, “বারে, তুমি যে বললে নিজের মতো লিখতে। এক লিখলে তো বলতে সব বই দেখে দেখে লিখছি...............”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


