somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যখন পণ্ডিতমশাই…(২)

১৬ ই অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি যখন পণ্ডিতমশাই…(১) (২)

আমার টিউশনি জীবনের শুরুর দিকে একটা ক্লাস সিক্সের ছেলেকে গুলশান-২ এ গিয়ে পড়াতাম। সেইরকম অভিজাত এক পরিবার! দারোয়ান, কেয়ারটেকার সহ আরো কয়েকজনের কাছে জবাবদিহিতা এবং কয়েক জায়গায় সাক্ষরদান ছাড়াও গার্জিয়ান ফোনে কনফার্ম করার পরেই কেবলমাত্র বাসায় প্রবেশের অনুমতি মিলতো। যাই হোক, সবই সয়ে নিয়েছিলাম কারণ মাস শেষের প্রাপ্তিটা বেশ খুশি করার মতোই ছিলো। আর তাছাড়া আমার টিউশনির বাজারটাতেও তখন বেশ মন্দা যাচ্ছিল। তো, টিউশনির শুরুতে বলা হয়েছিলো যে, সপ্তাহে চারদিন(সাধারণত তিনদিনের বেশি পড়ানো হয় না। কিন্তু ঐ যে বললাম, বাজারে মন্দা চলছিলো।) সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত পড়াতে হবে। কিন্তু সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ভাবেই হোক, টিউশনির প্রথমদিন থেকেই আমার মহাব্যস্ত স্টুডেন্টের শিডিউল পাওয়াটা ‘লাম্বার ওয়ান ছাখিব কান’ এর শিডিউল পাওয়ার চেয়েও কঠিন কাজ হয়ে দেখা দিলো।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বুয়েটের সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ওই দুইদিন নিয়মিতই যেতাম। আর বাকি দুইদিন ল্যাব, কুইজ ইত্যাদি বিবেচনায় শিফট হত। তো, শুক্রবারদিন আমার স্টুডেন্টের রুটিন ছিলো এরকম-ভোরে উঠে শারীরিক শিক্ষকের কাছে ব্যায়াম, তারপর নাস্তা; নাস্তার পর হুজুরের কাছে কোরআন-শিক্ষা, এরপর আমার কাছে অংক করা; তারপর আমার মতোই আরেকজন পার্টটাইম পণ্ডিতমশায়ের(ইনি ঢাকা ভার্সিটির ছিলেন) কাছে অন্যান্য বিষয়গুলো পড়া। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে যেতো। তারপর বিকেল তিনটায় আবার স্পেশাল(!) কোচিং। সন্ধার পরে আবার বসতে হতো সারাদিনে নানান টিচারের কাছ থেকে প্রাপ্ত হোমওয়ার্কের সদগতি সাধনে!

ইংলিশ ভার্সন স্কুলের ছাত্র হলেও মূলতঃ ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিলো। এর আগের বছরও ক্যান্ডিডেট ছিলো, কিন্তু চান্স পায় নি(মানে ক্লাস সিক্সে এটা ওর দ্বিতীয় বছর)। তাই এবার ভীষষণ সিরিয়াস! একদিন বিকেলবেলা আমাকে হটাৎ ফোন করে বললো, “ভাইয়া, আজ পড়বো না। আজ আমার আমার বার্থডে।” আমি বললাম, “বেশ।” মনে মনে ভাবলাম, জন্মদিন ব্যাপারটা কেন বছরে একবার আসে? কেন প্রতি মাসে একবার করে আসে না? পরদিন ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এটা ছিলো ওর ১৪তম জন্মবার্ষিকী। মানে ১৪ পেরিয়ে ১৫ তে পদার্পণ।(মনে রাখবেন ও কিন্তু তখনো ক্লাস সিক্সে পড়ে! মনে আছে আমার ১৪তম জন্মবার্ষিকীর কয়েকদিন পরেই দশমশ্রেণীর ১ম সাময়িক পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আর এস,এস,সি তে ইংরেজী ২য়পত্র পরীক্ষার দিন পদার্পন করেছিলাম ১৬ বৎসরে।)

যাই হোক, এতোগুলো টিচারের এতরকম চাপে পড়ে ওর অসহায় অবস্থা দেখে আমার বেশ মায়াই লাগতো। তাই আমি আর ওর সেই চাপকে না বাড়িয়ে, যথাসম্ভব ইজি-ওয়ে তে হ্যান্ডেল করতে চেষ্টা করতাম। আর এটা নিয়ে আমাকে ওর মায়ের কাছ থেকে নানান অভিযোগও শুনতে হতো। আমি নাকি ওকে ভালো করে চাপ দিচ্ছি না, বেশি করে হোমওয়ার্ক দিচ্ছি না, ফাঁকিবাজির জন্য বকা দিচ্ছি না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবু এতকিছুর পরেও আজ ওর কথা বলতে পারছি এই জন্যেই যে, ও আমাকে হতাশ করে নি। অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে স্থান করে নিয়েছে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ।

তবুও, ও কি কোনোদিন এই গঁতবাধা শৈশবের জন্য নিজেকে বঞ্চিত ভেবে আক্ষেপ করবে না???

এদিকে, একটা কঠিন এবং নিরস টিউশনির গল্প দিয়েই এই লেখা শেষ করলে আমার কিন্তু আক্ষেপ হবে, আর পাঠকও বঞ্চিত হবে। তাই আমার পার্টটাইম পণ্ডিতমশাই হওয়ার আগের একটি ঘটনা বলেই এই লেখার ইতি টানতে চাই…

গণিত উৎসবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আহবান জানিয়েছিলেন, তিন ‘ম’ কে না বলার জন্য। আর এই তিন ‘ম’ হচ্ছে মিথ্যা, মাদক ও মুখস্থ। আর এজন্য আমিও আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সবসময় মুখস্থ না করে বুঝে পড়ার জন্য বলি। ভালো ছাত্র হওয়ার কারণে স্কুলে থাকতে(বাড়িতে থাকতে) জ্যাঠাতো-কাকাতো ভাইবোনগুলোকে পড়ানোর দায়িত্বটা সবসময় আমার কাঁধেই বর্তাতো। তো, আমার সদ্য ক্লাস সেভেনে উঠা কাকাতো বোনকে ধর্মশিক্ষা পড়াচ্ছিলাম। তো ওকে “ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা কর।” শীর্ষক প্রশ্নের জন্য পাঠ্যবই থেকে একটা প্যারা ভালো করে পড়তে এবং তারপর নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখতে বললাম। কিছুক্ষণ পর ও আমাকে যেটা লিখে এনে দেখালো তার শুরুটা এরকম, “ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ঈশ্বর অনেক। কিন্তু তাঁর শক্তির প্রকাশ বিভিন্ন……”

তো, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে, ঈশ্বর অনেক পাইলি কই?!”

সাথে সাথে ওর জবাব, “বারে, তুমি যে বললে নিজের মতো লিখতে। এক লিখলে তো বলতে সব বই দেখে দেখে লিখছি...............”
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×