somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাটের দিন

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৫:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখন অনেক ছোট। প্রতি বৃহস্পতিবার (সম্ভবত) আমাদের এলাকা ছাইড়া কিছুটা দূরে, সখীপুরে হাট বসত। পুরা গ্রাম্য হাটের চেহারা পাওয়া যাইত সেখানে। আমি বাপের সাথে যাইতাম। পুরা সপ্তাহের কিছু কিছু বাজার কইরা নিয়া আসত বাবা। আমি সঙ্গী হিসাবে যাইতাম। মাঝে মাঝে আমাদের ক্ষেতের ধান, বাদাম ইত্যাদি বিক্রি করতে যাইতাম। সারা মাঠ ভরা কালিজিরা ধানের সৌন্দর্য যে দেখছে সে জানে ইহা কি বস্তু। ধান কাইটা গরুর গাড়ী ভইরা ধান নিয়া আসা হইত আমাদের কারখানায়। একতলা উচা ধানের গাদার উপর বইসা আসতাম। মজাই ছিল আলাদা। মাঝে মাঝে শিলা বৃষ্টি পইড়া ধানে চিটা লাইগা যাইত। সেইবার লস যাইত। ধানের চিটা এক মারাত্মক জিনিস। খেড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। পুরা মাথায় হাত অবস্থা। আবার কখনও বাদাম হইত ক্ষেতে। বাদাম ক্ষেতের গন্ধ আমার বিশেষ পছন্দ। বাদাম ভর্তাও আমার অতি প্রিয়। মারে যদি বলতাম, মা বাদাম ভর্তা খামু তবে কইত, বাদাম ছিলা দে। লোভে পইড়া, বাদাম ছিলার মত কষ্টকর কাজও করতাম। একগাদা বাদাম ছিলতাম, যাতে বেশী কইরা ভর্তা হয়। কিন্তু মা সামান্য ভর্তা বানাইয়া দিত আর কইত, পেট ব্যাথা করব। গুল্লি মারি পেট ব্যাথার, চিল্লাফাল্লা করতাম, তবুও মার মন গলত না। বাদাম ভর্তার সাথে আরেকটা ভর্তা আমার বিশেষ প্রিয়। সেইটা হইল কালীজিরা ভর্তা। পাটায় ভর্তা বাইটা বানানির পর পাটায় লাইগা থাকা অংশটুকু ভাত দিয়া মাখাইয়া খাইতে সবচেয়ে বেশী মজা। এইটা অবশ্য পাটায় বাটা সব ভর্তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তো আমি বইসা থাকতাম কখন পাটায় মাখা কালীজিরা ভর্তার ভাতটুকু মা মুখে তুইলা দিব।

ধান আইনা আমাগোর কারখানার বড় চুলায় সিদ্ধ করা হইত। সিদ্ধ ধানের গন্ধ আমার অতি পরিচিত। সিদ্ধ করার পর কারখানার ছাদে শুকাইতে দেওয়া হইত আরেকবার। মা, কাজের লোকরা পা দিয়া মাঝে মাঝে ধান নাড়াইয়া দিত। আমিও শখের বসে পা চালাইতাম ধানের মধ্যে। ফলে ধান সব উলটা পালটা হইয়া এইদিক ঐদিক ছড়াইয়া পড়ত। কামের থিকা আকাম হইত বেশী। তা ধান শুকানির পর ছালায় ভরা হইত ধান। ছালা বা বস্তা আছিল দুই রকমের। পাটের ছালাই আছিল বেশী। আর কিছু আছিল প্লাষ্টিকের ছালা। ঐগুলা ছিল আসলে ফ্যাক্টরীর জন্য আনা চিনির বস্তা। বস্তা ভইরা অটোরিক্সা ভাড়া কইরা ধান নিয়া যাওয়া হইত সখীপুরের হাটে। বেপারীর কাছে মনদরে বিক্রি করা হইত। আমার বাপে কয়, আমি নাকি হাটে গিয়া তিন ব্যাকা দিয়া খাড়াইয়া থাকতাম। পুরাই বেক্কল আছিলাম।

হাটে বাপে একদিকে ধান বেচত তার কর্মচারীগোরে নিয়া, আরেকদিকে আমি থাকতাম হাট ঘুইরা দেখনের ধান্দায়। একটু ফাক পাইলেই বাইর হইয়া যাইতাম। জিলাপী বেচত কয়েক দোকানে। সিঙ্গারা আছিল এক টেকা পিছ। ঝালমুড়ি পাওয়া যাইত, চানাচুর মাখা পাওয়া যাইত, এক টেকায় অনেকগুলা। আমি বাপের কাছে আবদার ধরতাম এইগুলার কোন একটা কিনা দেওনের লাইগা। বহুত কওয়ার পর কিনা দিত। মাঝে মাঝে গরু ছাগল বিক্রি হয় যেইখানে সেইখানে যাইতাম। কালা কালা ছাগল, হলুদ হলুদ ভেড়া আর কালা, লাল, সাদা, ময়লা সাদা গরুর এক বিশাল বাজার আছিল তহন। তহন সাধারন সাপ্তাহিক হাটে যে পরিমান ছাগল ভেড়া পাওয়া যাইত এহনকার ঈদের হাটেও তা পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ।


কোকাকোলার বোতল আছিল ছয় টেকা না সাত টেকা জানি। এই জিনিসটা আমার ছোটবেলায় আছিল স্বর্গের অমৃতের মতন। বছরে ২৫০ মিলি একটা বা দুইটা কোকের বোতল খাইতে পারতাম কিনা সন্দেহ। আমারে এক বোতল কিনা দিলে আমার ছোটবইনরেও এক বোতল কিনা দিতে হইত। তখনকার দিনে চৌদ্দ টেকা আসলেই বেশী আছিল আমার বাবা মার লিগা। পানি মিশাইয়া মিশাইয়া কোক খাইতাম। যতটা দীর্ঘায়িত করা যায় আর কি এই অমৃত পান! দেড় দুই ঘন্টা ধইরা ২৫৯ মিলি কোক খাইতাম। হাটে যাওয়ার পিছনে এই কোকের লোভও কাজ করত বৈকি! মাঝে মাঝে বাবা নিজে যাইত না হাটে। কোন কর্মচারীরে পাঠাইয়া দিত জিনিস বিক্রি করার লাইগা। আমিও ওর লগে যাইতাম। মা কইয়া দিত খেয়াল রাখবি কততে বিক্রি করে। আমি খেয়াল রাখতাম। বেচারারা ধরা খাইত। আমারে মাঝে মাঝে কোক ঘুষ দিত বেচারারা। তাও কাম হইত না। আমি চুপে চুপে মারে গিয়া সব কইয়া দিতাম। আসলে এক বেক্কইল্লা টাইপের সৎ আছিলাম। চুরি চামারি, বাটপারি করতাম না। এই কারনে পোলাপানে আমারে ক্রিকেট খেলায় সবসময় খাতায় স্কোর লেখতে দিত। বিপক্ষ পক্ষও আমারে দারুন বিশ্বাস করত। একদিন নিজের দলের নিদারুণ প্ররোচনায় সততা বিসর্জন দিলাম। আর কত সৎ থাকা যায়! ছাইড়া দিলাম স্কোর লেহা।

হাটের আবশ্যকীয় বিষয় হইল এর রোদ। কাঠফাটা রোদ পড়ে। ছাতি একটা আবশ্যকীয় বস্তু। সেই পুরান আমলের মজবুত কাঠের ডান্ডার কালা কাপড়ের ছাতি। এহনকার লুতুপুতু ফ্যাশনেবল ছাতি না। হেই ছাতি দিয়া এহনকার ছাতিরে এক বাড়ি দিলেই শেষ! "আলমের ১ নং ছাতা। রোদ বৃষ্টিতে সুরক্ষা।"

হাট শেষ করতে করতে বেলা পইড়া যাইত। সারি বাধা সব কাচা বাজারের দোকানের ডালা গুটানি হইত। গরু লইয়া গরুর ব্যাপারী ভাগা দিত। ধান যেইডি বেচা হইছে তো হইছে, আর বাকীডি নিয়া বাড়ীত ফেরত আইতাম। আমার লাভ আছিল, জিলাপা, মুড়ি, সিঙ্গারা বা এইজাতীয় কিছু একটা। বাসায় আইতে আইতে অন্ধকার নাইমা যাইত। পা না ধুইয়াই বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়তাম। মায়ে টাইনা উঠাইতো, "যা পা ধুইয়া আয়।" সহজ সরল পর্যবেক্ষক জীবন। শুধু দেইখা যাইতাম। অংশগ্রহন করতে ইচ্ছা হইত কিন্তু পারতাম না ছোড ছিলাম বইলা। এহন আর সেই সুযোগ নাই। হাটের আগের জোশ কইমা গেছে। মাঝে মাঝে আমাগোর এলাকায় সেই ছোটবেলার মত রোদ নামে, দুপুরের দিকে। আমি দেখলেই চিনতে পারি। আমার পরিবেশ স্মৃতি তীব্র। গন্ধ স্মৃতিও তীব্র। গন্ধ শুকলেই কইতে পারি যে এইডা একটা ফ্লাট বাড়ী আর এইডা একটা কারখানা। তা যহনই সেই পরিবেশ বা রোদ দেহি সোজা রাস্তায় নাইমা যাই। মনে পড়ে ছোটবেলার সেই গান। হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া দিস্কো দিওয়ানা, পাতলা পায়খানা......... ( আলী ভাইয়ের লন্ড্রীতে বাজাইতো গানড়া, উনি বেশ ইস্মার্ট আছিলেন, সবসময় ইন করা আর নায়কগোর মত একটা ওয়েষ্ট কোট জাতীয় কিছু পইরা থাকতেন)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:২০
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×