নিউ ইয়ার পালন করলাম। পূর্ণ চন্দ্র দেখা গেল নিউ ইয়ারের রাত্রে। খুবই ভাল লাগল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর আতশবাজীর খেলা দেখতেছিলাম হোষ্টেলে আমার বারতলার রুমের বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে। নিচে অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে কিশোররা আতশবাজীতে আগুন দিচ্ছিল। আমি চিতকার ছুড়ে দিলাম ওদের প্রতি, "সি নোভিম গোদম"!! (নতুন বছরের শুভেচ্ছা) ওরাও ফিরতি জবাব দিল। আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আবার সিগারেট টানায় মন দিলাম।
ভৌগলিক কারনে এখানে সূর্যের দেখা খুব কম পাওয়া যায়। তাই রুশরা সূর্যকে খুব ভালবাসে। শীতের দেশের মানুষ হয়েও শীতকে এরা অপছন্দ করে। চাঁদের আলো ঠান্ডা। তাই চাঁদ এদের কাছে শীতের প্রতীক। এরা চাঁদকে পছন্দ করে না। আমাদের দেশে যেমন প্রেমিক তার প্রেমিকার সৌন্দর্য বন্দনায় চাঁদের উপমা দেয় এরা তা করে না। এরা প্রেমিকাকে ডাকে সূর্য বলে, কাউকে আদর করে বলে "আমার ছোট্ট সূর্যটি"। ভৌগলিক কারণে মানুষের উপমাগুলোও কত অদ্ভুতরুপে পালটে যায়! এক স্থানের জনপ্রিয় চাঁদ আরেক স্থানে এসে রুপ নেয় অপছন্দের প্রতীকে। শীত আসলেই অসহ্য, সবার কাছেই।
কিন্তু আমি তো বঙ্গসন্তান। চাঁদ আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করবে। আমি তাই নতুন বছরের মূহুর্ত চাঁদের সাথে ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলাম। কত কত কাল ধরে সে পৃথিবীর সাথে তার জীবন যাপন করে চলছে! কত রথী মহারথী, কত পূণ্যবান, কত শত মহামানব, অগণিত সাধারণ মানুষ, কত হাজার ব্যার্থ মানুষের জীবনের এক নীরব সাক্ষী! কত কত নতুন বছর তার বুকে আকা রয়েছে কে জানে! এবারের নতুন বছরের উদযাপনে চাঁদ আমার প্রধান সঙ্গী।
আতশবাজীকে এরা বলে "বেঙ্গলস্কি আগুন" মানে "বাংলার আগুন"। কিভাবে এ নাম হল জানিনা। রুশে "আগুন" কে "আগুন"ই বলে। আমাদের অঞ্চলের একটা শব্দ এদের ভাষায় ঢুকে গেছে। এর কারণ এদের ভাষার উৎপত্তিমূল। তবে "বেঙ্গলস্কি" বা "বাংলা" কিভাবে ঢুকল জানি না।
চারপাশে "বেঙ্গলস্কি আগুন"-এর বিশাল সমারোহ। সারা শহর মেতে উঠেছে আনন্দ উল্লাসে। হোষ্টেলের অন্যান্য ফ্লোরের বারান্দাগুলোও ছাত্র-ছাত্রীতে ভরে যেতে লাগল। আমরা এক বারান্দা থেকে আরেক বারান্দাকে উদ্দেশ্য করে "সি নোভিম গোদম" বলে চিৎকার করতে লাগলাম। স্পীকারে ছাড়লাম আমার কয়েকটা প্রিয় গান।
বেশীরভাগই পুরান আমলের গান। অল্পবয়সে শোনা কিন্তু মাথায় গেথে গিয়েছে। এখনও ভাল লাগে শুনতে। বাকী জীবনও হয়তো লাগবে।
চারপাশে আনন্দ। এক বারান্দা থেকে দেখলাম রকেট ছুড়ছে। তিনটা ছোড়ার পর বললাম "দয়া করে সাবধানে ছোড়"। উত্তর এল "দুশ্চিন্তা করো না"। সবাই আনন্দে মশগুল। এই নতুন বছর উদযাপন এদের সবচেয়ে বড় উৎসব। উৎসব হতে শেষ আনন্দটুকুও যেন নিংড়ে চুষে নিতে পারে তার জন্য সবাই তৎপর। আমাদের ফ্লোরের পাশের ব্লকের রান্নাঘরে যেয়ে দেখি জানালার কাচ ভাঙ্গা। ফ্লোরের করিডোরে আগেই রক্ত দেখেছিলাম। বুঝলাম অতি আনন্দে কেউ একজন এই ভাঙ্গাভাঙ্গির কাজটা করেছে এবং রক্তটা উনারই। কিছুক্ষণ পরে দেখি এক ছেলে এস আয়োডিন চাইল, হাত দেখিয়ে। ব্যান্ডেজের কাপড় দিয়ে হাত পেচানো, আঙ্গুলগুলো রক্তে মাখামাখি। বুঝলাম ইনি সেই গুণধর। গুনধরকে বললাম আয়োডিন নাই তবে অন্য কেমিক্যাল আছে। গুণধর কিছুটা টাল বোঝা গেল। উনি ঠিক ঠিক আয়োডিনই চান, অন্য কিছুতে উনার হবে না। আমি বোঝালেও কাজ হল না। আমি তখন বললাম "দুঃখিত"। গুণধর তখন প্রত্যেক ঘরে ঘরে হানা দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত ঠিক ঠিক "আয়োডিন" পেয়ে গেলেন।
একটা মুরগী ছিল। আগেই রান্না করে খেয়ে নিয়াছিলাম। ভরা পেটে ঠান্ডায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে জীবনের উচ্ছাস দেখতে লাগলাম। টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। কতক্ষণ দেখলাম। সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। তারপরে ঘুম। আর কিছু জানিনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



