somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরতাম যেইবার কিন্তু বেচে গেছি

২৫ শে জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবনে কয়বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ছি ঠিক বলতে পারছি না। হিসাব মতে তিনবার। প্রথম বার আমার জন্মের সময়। মায়ের পেটে উলটো হয়ে গিয়েছিলাম। বাচার আশা প্রায় নাই। অপারেশন করা লাগবে। ডাক্তাররা মা ছেলে কারোরই নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। তখনকার সময়ে এত উন্নত ব্যাবস্থা ছিল না। মা বললেন আমি মরি সমস্যা নাই, আমার ছেলেটাকে বাচান। ওটি তে ঢোকার আগে আমার মা আমাকে আমার খালার হাতে সোপর্দ করে যান। আমার মা বলেন, "বোন আমার ছেলেটাকে দেখে রাখিস"। শালা কি জীবন হইত পারত আমার আর কি হইছে। কপাল একখান বটে! মা বলেন, "তুই মধ্যে মধ্যে আমার কলিজার মধ্যে লাত্থি দিতি, পুরা কোকাইয়া উঠতাম। আমি যখন ওটি ঢুকি তখন মনে হচ্ছিল একটু বাতাশ আমার নাকের কাছে এসে ঠেকে আছে। এই বাতাশটুকু যদি ছেড়ে দিই তাইলেই মরে যাব। অনেক কষ্ট করে আমি ঐ বাতাশটুকু ধরে রেখেছিলাম।" যাই হোক সেই যাত্রা বেচে যাই, আমরা মা বেটা। আমার জন্মের দিন ছিল ভরা পূর্ণিমা। পুরানো পঞ্জিকায় আমি দেখেছি। আমার জন্মের সময়ের একটা মোটা পঞ্জিকা আমাদের বাসায় এখনো আছে। আমার জন্ম উপলক্ষে কেনা। সেখানে আমার রাশি লেখা কুম্ভ ( প্রাচ্য মতে )। আর ঐদিনের রাশিফল লেখা - কষ্ট। জীবন শুরু করলাম কষ্ট আর মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে। খারাপ না কি বলেন!

আমাদের কারখানার পাশে একটা ধানখোলা ( রাইস মিল ) ছিল। ঐখানে সারাদিন পড়ে থাকতাম। ধানখোলার শ্রমিকদের ছেলে মেয়েদের সাথে খেলতাম সারাদিন। ধানখোলার ধান শুকাবার জন্য বিশাল ঢালাই করা মাঠ ছিল। গোল্লাছুট খেলতাম, ফুটবল বা ছোয়াছুয়ি ছিল খুব জনপ্রিয় খেলা। মাঝে মাঝে টেনিস বল দিয়ে বোম্ববাষ্টিং খেলতাম। একটা টেনিস বল থাকত, একজন আরেকজনের গায়ে সজোরে ছুড়ে মারত। কেউ কাউকে ছুড়ে মারল আর যদি সে সেটা ধরে ফেলতে পারে তাহলে সে আবার ছুড়ে মারার সুযোগ পেল। নির্মম কিন্তু মজাদার খেলা। এই রাইসমিলে ধান সিদ্ধ করার জন্য বড় দুটি হাউজ ছিল। ধানের মৌসুমে প্রতিদিন সকালে ধান সিদ্ধ করা হত। ধান সিদ্ধ শেষ হয়ে গেলে অথবা সিদ্ধ শুরু করার আগে হাউজে পানি থাকত ভর্তি। পোলাপান ঐ পানিতে সাতার কাটত। আমি সাতার জানতাম না। তাই কখনো ঐ পানিতে নামার সাহস পাই নাই। তাছাড়া হাউজ আমার উচ্চতার তুলনায় অনেক গভীর ছিল। কিন্তু একদিন কোন বেক্কলামীতে কেউ যখন আশে পাশে নেই আমি তখন ভরা হাউজে লাফ দিলাম। ভাবলাম, সাতারটা একা একা শিখে ফেলি। ভাইরে ভাই লাফ দিয়ে যখন ঢুবে গেলাম তখনই বুঝলাম কি ভুলটা করেছি। বুঝলাম যে আমার দিন শেষ। আর আশে পাশেও কেউ নাই যে আমাকে বাচাবে। হাউজের চারপাশ খালি। আমি তখন পানির নীচে শুধু অন্ধকার দেখছিলাম। কিছুক্ষন পরে দেখি একটা হাত পানির উপর থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ঐ হাতটা ধরলাম। আমাকে টেনে উঠালো ঐ হাতটা। আমি এর মধ্যেই বেশ পানি খেয়ে ফেলছি আর কতক্ষন পরেই পরপারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কোত্থেকে যে ওই হাত এসে আমাকে বাচালো আমি জানিনা। উঠার পর দেখি হাত বাড়ান লোকটা আমার কাকা। আমি তখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে অযাচিতভাবে ফিরে আসা এক ছেলে। আমার তখন কথা বলারও ঠিক অবস্থা নাই। কাকা আমার হাত ধরে নিয়ে বাড়ী চললেন। দেখি বাবা একটা লাকড়ি কাঠ নিয়ে বসে আছেন। সারাদিন পড়াশোনা বাদ দিয়ে ধানখোলায় সময় কাটানোর কারণে উনি সবসময়ই বকা ঝকা প্যাদানীর উপর রাখেন। আসলে ঐ বয়সটাই হল প্যাদানী খাওয়ার বয়স এবং প্যাদানি খেয়ে সব ভুলে যেয়ে আবার প্যাদানী খাওয়ার কাজে লেগে যাওয়ার বয়স। বাবাকে কাকা সব বললেন। আমি যে ডুবে মরতে ছিলাম এবং উনি যে হঠাৎ করে কি মনে করে হাউজের দিকে আমাকে খুজতে যেয়ে পানির নীচে আমাকে আবিষ্কার করলেন সেটাও বললেন। বাবার রাগ আর বেড়ে গেল। বললেন, নাকে খত দে যে আর কোনদিন ধানখোলায় যাবি না। আমার কাছে বাকী জীবন বোনাস। নাকে খত কেন প্যাদানি দিয়ে পিঠ ফুলিয়ে দিলেও আমার তখন কিছুই যায় আসে না।

কাকা সেইদিন বেড়াতে এসেছিলেন। বাবা কি মনে করে অতি ক্রোধে কাকাকে সেই মূহুর্তেই আমাকে কানে ধরে নিয়ে আসার জন্য বলেছিলেন। দুই মিনিট পরে যদি উনি আসতেন তাহলে আজকে আর এই রঙ্গ রসের ব্লগ লেখা বের হয়ে যেত আমার।


আমি বরাবরই রোগ শোক ভালবাসি। দুনিয়ার তাবৎ রোগ আমার পছন্দের। তাই তারা ঘুরে ফিরে আমার কাছেই আসে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, মামপস, একনি, জন্ডিস এমন হেন কোন রোগ নাই যা আমার হয় নাই। মোটামুটি সব রোগ ভোগ করা হয়ে গেছে। অঙ্গহানীর মধ্যে খাটো হয়ে গেছি আর মাথার ঘন চুল পাতলা হয়ে গেছে। সবচেয়ে খারাপ রোগ আমার কাছে মনে হয়েছে জন্ডিস। একশ ছয় ডিগ্রী জ্বর ছিল। টানা দু সপ্তাহ ঘুমাতে পারি নাই। সারারাত মা অথবা বাবা আমার পাশে পাশে রয়েছেন। একদিন রাতে মাথা চরমভাবে বিকৃত হয় গেল। প্রচন্ড পানির তৃষ্ণা পেতে লাগল। হঠাৎ মনে হতে লাগল আমি ভগবান শিব। দেবতা শিব আমার বরাবরেই পছন্দের চরিত্র। একসময় শখ ছিল সাপ গলায় ঝুলিয়ে ত্রিশুল হাতে করে শিব হয়ে যাব। ঐদিন নিজেকেই ভগবান বলে ঘোষনা দিয়ে ফেললাম। বলতে লাগলাম, আমি ভগবান শিব। পানি দে পানি খাব। মা বাবা ব্যাস্ত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিলেন। পানি দেওয়া হল। আমি বললাম, আমাকে সম্মান কর। আসলে পৌরাণিক কাহিনীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই ভয়ংকর। আমাকে পানি খাওয়ানো হল, মাথায় বালতি বালতি পানি ঢালা হল। মাথা ঠান্ডা হলে বুঝলাম যে আমি আসলে শিব না। /:)

এই জন্ডিস অনেক ভুগিয়েছিল। সাধারণ ডাক্তারী চিকিৎসা করে জন্ডিসের কিছুই হয় না। সর্দির যেমন কোন ওষুধ নেই তেমন জন্ডিসেরও নেই। এক মহিলা কবিরাজের দাওয়াই খেয়ে সেই যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলাম। দাওয়াই খাওয়ার পরে খুব বমি আর পারলা পায়খানা হয়েছিল। বমির সাথে ভিতরে জমে থাকা এক চাকা পুরানো রক্তের দলা বের হয়েছিল। ঐটা ছিল শরীর পরিষ্কারক দাওয়াই। দুই মাস সাধারণ চিকিৎসা করেও যা হয়নি দুইদিন দাওয়াই খেয়ে আমি দুই সপ্তাহের মাথায় উঠে বসলাম। চিকিৎসাবিজ্ঞান বড়ই রহস্যময়।

তবে জন্ডিস নয় আমাকে মৃত্যুর কাছে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এক অজানা রোগ। সারা শরীরে র‌্যাশ উঠে গিয়েছিল। লাল লাল চাকা জমে গিয়েছিল রক্তের চাকের মত। কোন ডাক্তারই কিছু করতে পারে না। উনারা ধরতেই পারে না যে আসলে এটা কি রোগ। আমার অবস্থা মরো মরো। বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন। আমার বাবা আসলে সন্তানদের জন্য উপর দিয়ে যতটা কঠিন ভিতর দিয়ে তার তিনগুন বেশী নরম। আমাদেরকে যতই মারুক পিটাক আমাদের কিছু হলে উনার মাথা আউলা ঝাউলা হয়ে যায়। দরকার হলে উনি সব কিছু বিক্রি করে নিজের কিডনী হার্ট বিক্রি করে হলেও সন্তানদের বাচাবেন। আমাকে নিয়ে বাবা মা ছোটাছুটি আরম্ভ করলেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে, এক ডাক্তার থেকে আরেক ডাক্তারের কাছে। সবাই অনুমানের উপর অষুধ দেয় কিন্তু আমার সুস্থ হবার কোন লক্ষন দেখা যায় না। শেষ পর্যন্ত পিজি হাসপাতালের হেমাটোলজির ডীনের কাছে গেলাম। উনি আমাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন আর আমি উত্তর দিতে লাগলাম।

গতকাল রাতে কি জ্বর ছিল?

রাতের দিকে রারোটার সময় ছিল তিনটার সময় চলে গেছে।

হ্যা বা না দিয়ে উত্তর দাও। হ্যা অথবা না।

আমি বুঝলাম যে এই লোক সেই লোক না। বেটা শুধু শুধু ডীন হয় নাই। আসলে বড় বড় মানুষের কার্যপদ্ধতিই অন্যরকম। তাদের সাথে অন্যদের ঠিক মিলে না। আমি বরাবরই গবেষক, বিজ্ঞানীদের ভক্ত। সেইদিন আবার ভক্ত হয়ে গেলাম।

সবাই বলছে আমি আর বাচবো না। যদি বাচি তবে সেটা একটা নজীর। বাবা উন্মাদপ্রায় হয়ে গেলেন। আমি সেইবার বাচার জন্য কোন তাগিদ অনুভব করি নাই। সেইবার পুরা দার্শনিক হয়ে গিয়েছিলাম। বাচলেই কি আর মরলেই কি। মৃত্যু আমার কাছে তেমন একটা কঠিন জিনিস বা ভয়ংকর জিনিস বলে মনে হচ্ছিল না। আমি ছিলাম নির্লিপ্ত। বাবা মায়ের আকুতিটাও আমাকে তেমন ছুয়ে যাচ্ছিল না। সন্নাসীরা বোধহয় এভাবেই সন্ন্যাসী হয়। তারা থাকে পুরোপুরি নির্লিপ্ত। জগতের কোন কিছুই তাদের আকর্ষন করে তারা। সব কিছুই তাদের কাছে নিছক মায়া বলে মনে হয়। আমি সেইবার সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরেও সেইবারো আমি ফিরে আসি। না আসলেই বা কি এমন হতো? মানুষ আসে আর যায়। মাঝখানে কিছুদিন মায়ায় জড়ায়। এই তো!

পরে জেনেছিলাম ওটা ছিল একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ছোটবেলায় ষ্টেরয়েড জাতীয় অষুধ বেশী সেবন করার ফলে এই জিনিসটা ঘটে। প্রচুর এন্টিবায়োটিক খেয়েছি এই জীবনে। কট্টিম থেকে শুরু করে এজিথ পর্যন্ত। আরও কত খাওয়া লাগে কে জানে!
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:২২
২৭টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×