প্রসঙ্গঃ উপেন্দ্রকিশোর রায়।
০১ লা মার্চ, ২০০৮ রাত ২:৫৬
একদা ছেলে সুকুমার রায় লিখেছিলেন এক বিখ্যাত বাক্য!
ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল!
বাবার বেলাতে ঠিক তাই ঘটেছিল কিন্তু। ছিলেন কামদারঞ্জন, হয়ে গেলেন উপেন্দ্রকিশোর!
ঘটনাটা অবশ্য অবশ্য বিস্ময়কর কিছু নয়। ময়মনসিংহ জেলার সমূয়া গ্রামের বনেদি রায় পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা কালীনাথ রায় তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য পরিচিত ছিলেন মুন্সী শ্যামসুন্দর নামে। তাঁই দ্বিতীয় পুত্র কামদারঞ্জন। ভারি ফুটফুটে মিষ্টি চেহারা। এই পরিবারের আর এক শাখার নিঃসন্তান জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী দত্তক নিলেন তাঁর নিকট আত্মীয়ের এই রূপবান সুন্দর ছেলেটিকে। তখন তাঁর বয়স চার কি পাঁচ। কিন্তু বাড়ি বদল হলেও একেবারে পাশের বাড়ি। আর পরিবার বদলের ফলে নামবদল। ব্যস, সেই থেকে কামদারঞ্জন রায় হয়ে গেলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। বর্তমান বাংলা শিশুসাহিত্যের পিতৃপুরুষ উপেন্দ্রকিশোর!
জন্ম ১৮৬৩ সালের ১০ই মে, বাংলা ১২৭০ শে বৈশাখ। বাল্যজীবন কেটেছে মসূয়ার নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে, পুকুর নদীনালা বাঁশের ঝাড় আর ঘন আম-কাঁঠালের বনে ভরা স্নিগ্ধতার পরিমণ্ডলে। আর ছিল বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া উদ্দাম ব্রপুত্র নদ, তাঁর দুরন্ত বাল্য-কৈশোরের সঙ্গী। অদ্ভুদ স্বভাবের ছেলে উপেন্দ্রকিশোর। লেখাপড়ায় বিশেষ মন নেই, কিন্তু পরীায় সব সময় ভাল ফল করেন। যত টান বাঁশি বাজানোর দিকে। পরে পরে জুটল বেহালা। সারাণ সঙ্গীত চর্চা দেখে অভিভাবকরা চিন্তিত। কিন্তু কে কার কথা শোনে! এর পাশাপাশি আবার পেয়ে বসল ছবি আঁকার নেশা। খাতায়, বইয়ের পাতায়, টুকরো কাগজে যেখানে সেখানে ছবি। মস্ত বড় সাহেব এসেছেন স্ড়্গুল পরিদর্শনে। পেছনের বেঞ্চে বসে উপেন্দ্রকিশোর দিব্যি এঁকে চলেছেন সাহেবের ছবি। সে ছবি চোখে পড়তে সাহেব তো বেজায় খুশি। বকুনি দেওয়ার বদলে তিনি বলেছিলেন, ছবি আঁকাটা কখনো ছেড়ো না তুমি।
ছাড়েন নি উপেন্দ্রকিশোর। বরং নতুন করে ধরেছেন অনেক কিছু। ফটোগ্রাফি, ছবি ছাপার কলাকৌশল, ব্রাধর্ম। আর সবকিছু ছাড়িয়ে ছোটদের জন্য তুলনাহীন সেই সব লেখালেখি, যা শুধু সেকালে কেন-একালেও ভাবতে অবাক লাগে।
পড়ুয়া ছেলে না হয়েও ময়মনসিংহ জেলা স্ড়্গুল থেকে প্রবেশিকা পরীায় বৃত্তি পেয়ে পাশ করলেন উপেন্দ্রকিশোর। মসূয়া ছেলে কলকাতা এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে। নিভৃত মফস্বল থেকে এলেন এক বিশাল সম্ভাবনার জগতে। আশায় আকাঙ্কায় উদ্দীপনায় তারুণ্যে নূতনের স্বপ্নে সাধনায় তখন টগ্বগ্ করে ফুটেছে কলকাতা। নিজের জায়গা পেয়ে গেলেন উপেন্দ্রকিশোর। বিচিত্র প্রতিভা বিকাশের এই তো পীঠস্থান! দেশে থাকতেই স্ড়্গুলের এক সহপাঠীদের মাধ্যমে নতুন ব্রাধর্মের উদার ও মুক্ত চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। কলকাতা এসে কিছুদিনের মধ্যে ঘটিষ্ঠতা বাড়ল ব্রাসমাজের সঙ্গে। যোগাযোগ ও যাতায়াত ঘটল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। সেখানকার ও সঙ্গীতচর্চায় অনুপ্রাণিত হলে উপেন্দ্রকিশোর। ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘বালক’, শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত ‘মুকুল’ প্রভৃতি ছোটদের কাগজ তাঁকে উদ্বৃদ্ধ করল শিশুসাহিত্য সৃষ্টিতে। নতুন জন্ম নিলেন ছোটদের প্রাণের লেখক, মনের লেখক অদ্বিতীয় উপেন্দ্রকিশোর!
তখনই আলাপ তাঁর চেয়ে দু’বছরের বড় সদ্য-তরুণ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। আলাপ থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। সে বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিল। শোনা যায়, পরবর্তী সময়ে এই বন্ধুত্বের টানে জোড়াসাঁকো থেকে উপেন্দ্রকিশোরের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসায় মাঝে মাঝে চটি পায়ে চলে আসতেন রবীন্দ্রনাথ। জমে উঠত সন্ধ্যার গান বাজনার আসর। এই বন্ধুত্বের ও অন্তরঙ্গতার পরিচয় পাওয়া যায় উপেন্দ্রকিশোরের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ছেলেদের রামায়ণ’-এ গ্রন্থকার লিখিত ভূমিকা থেকেঃ
‘শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এই পুস্তক প্রণয়ন বিষয়ে আমাকে যেরূপ উৎসাহ দান ও সহায়তা করিয়াছেন, সে ঋণ পরিশোধ করিতে আমি সম্পূর্ণ অম। পুস্তকের পাণ্ডুলিপি এবং গ্রুফ তিতি আদ্যোপান্ত সংশোধন পূর্বক অনেক ক্রটি দূর করিয়া দিয়াছেন।’
অপরপ েউভয়ের এই বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে আমরা পেয়ে যাই আর এক স্মরণীয় নিদর্শন। রবীন্দ্রণাহের ‘নদী’ কবিতায় যে চিত্ররূপ দিয়েছেন উপেন্দ্রকিশোর, ছবি ও কবিতার যুগলবন্দীতে সে সৃষ্টি এক অসামান্য চমৎকারিত্ব লাভ করেছে।
‘ছেলেদের রামায়ণ’ আবার প্রথম প্রকাশ করেছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের আর এক দিক্পাল যোগীন্দ্রনাথ সরকার। উপেন্দ্রকিশোরের চেয়ে বছর তিনেকের ছোট তিনি।
কিন্তুু তার অনেক আগেই একুশ বছরে বি· এ· পাস করেছেন উপেন্দ্রকিশোর। পিতৃ-পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মনে দুঃখ দিয়ে ব্রাধর্ম গ্রহণ করেছেন। তেইশ বছর বয়সে বিয়ে করেছেন তৎকালীন বিখ্যাত ব্রানেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে বিধুমুখীকে। সংসার পেতেছেন ১৩নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের ভাড়াবাড়িতে। লিখছেন তখনকার উঠেছেন গানবাজনা, ছবি আঁকা, সাহিত্যেলোচনা আর সমাজসংস্কারের নতুন আদর্শে। লিখেছেন তখনকার দিনের ছোটদের পত্রিকা ‘সখা’, ‘সাথী’, ‘মুকুল’,-এ। কিন্তু মন ভরছে না তাঁর। ঐ সব পত্রিকার বেশির ভাগ লেখাই বিদেশী গল্প প্রবন্ধ ইত্যাদির ছায়া অবলম্বনে রচিত। বাংলা শিশুসাহিত্যের নিজস্ব চরিত্র তখনো কিছু গড়ে ওঠে নি। উপেন্দ্রকিশোরের হাতেই যেন ঘটল তাঁর প্রথম প্রাণপ্রতিষ্ঠা। ছোটদের মনের মত ভাষা, গল্প, কাহিনী, উপকথা, রূপকথা, দিদিমা-ঠাকুমাদের মুখে মুখে ফেরা কতকালের সে সব গল্পকথা এক নূতন জন্ম নিল যেন। বাঙালি শিশুদের শৈশব-কৈশোর মধুর ও মূল্যবান হয়ে উঠল তাঁর রচনার সরস প্রসন্নতায়।
শুধু ছোটদের মনের মত লেখাই নয়, তার সঙ্গে চাই শোভন সুন্দর মতমাতানো ছবি। ছোটদের মনটাকে ভাল ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, ধরতে পেরেছিলেন তিনি। তাই তাঁর কলমে তুলিতে আঁকা হতে লাগল কত মজাদার, কত চমৎকার সব ছবি। কিন্তু হলে হবে কি, আমাদের কি ছাপার পদ্ধতি যে একেবারে সেকেলে! ছাপার পর আর ছবির মজাটা খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ ছোটদের লেখায় ভাল ছবি যে চাই-ই চাই! তাই নিজেই কোমর বাঁধলেন উপেন্দ্রকিশোর। নিজের পয়সায় বিলেত থেকে আনলেন ছবি ছাপার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বইপত্র। নিজের বাড়িতে সুরু করে দিলেন ছবি ছাপার নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা। আবিস্কার করলেন হাফটোন ছবি ছাপার উন্নত পদ্ধতি। বাঙালি শিশুদের এবার চোখ জুড়িয়ে গেল সে সব ছবি দেখে।
শেষমেশ নিজের বাড়িতেই তিনি খুলে ফেলফেল এক ছাপাখানা। ইউ রায় এ্যাণ্ড সন্স্। ঠিকানা প্রথমে ৭নং শিবনারায়ণ দাস লেন, পরে ২২নং সুকিয়া স্ট্রিট, তারপর ১০০নং গড়পার রোডে জমি কিনে নিজের বাড়ি বানিয়ে। এখানেই ঘটল বাংলা শিশুসাহিত্যের সেই ঘটনা। ১৯১৩ সালের এপ্রিল, অর্থাৎ বাংলা ১৩২০ সনের বৈশাখ থেকে প্রকাশিত হতে লাগল শিশুসাহিত্যের সেই কিংবদন্তীতুল্য পত্রিকা ‘সন্দেশ’। সম্পাদক, প্রকাশক, মুদ্রক, লেখক ও চিত্রকর স্বয়ং উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী! যেন এক কল্পলোকের মায়াবী দরজা খুলে গেল ছোটদের সামনে। কত রঙ্, কত বাহার, কত বৈচিত্র্য তার! এমনটা ভাবা যায় নি কখনো!
সত্যি ভাবা যায় না টুনটুনির বই’এর সেই ছেলে ভুলানো গল্পগুলোর কথা, ছোট্র রামায়ণের সেই মন-কাড়া বর্ণনা, ছেলেদের রামায়ণ ও মহাভারতের সরস কৌতুকময় গদ্যভঙ্গি। ছড়া কবিতা গান খুব বেশি লেখেন নি তিনি। গদ্য রচনাই তাঁর প্রধান সাহিত্য-কর্ম। আর সে গদ্য যে কতখানি স্বাদ উজ্জ্বল আর অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতে পারে, উপেন্দ্রকিশোরের প্রতিটি রচনাই তার অনন্য প্রমাণ। ইতিহাস বিজ্ঞান প্রাণীতত্ত্ব প্রভৃতি শিক্ষামূলক জটিল বিষয়ও ছোটদের কাছে কেমন রমণীয় হয়ে উঠেছে তাঁর নির্ভার কথকতায়। ছোটরা বোধহয় সেই প্রথম সাহিত্যের স্বাদ পেতে শিখল, খুঁজে পেল নিজেদের ভাবনা কল্পনার একটা আলাদা জগৎ। খেলাধূলা লেখাপড়ার বাইরে আশ্রয় পেল আর এক আনন্দলোকের মাঝখানে।
শুধু নিজেই লিখলেন না, ‘সন্দে’ পত্রিকা ঘিরে তৈরী করলেন ছোটদের নতুন ধারার নতুন লেখক-গোষ্ঠী। উপেন্দ্রকিশোরের প্রেরণায় সেকালের অনেক খ্যাতনামা লেখক লেখিকা যেমন কলম ধললেন ছোটদের জন্য, তেমনি তাঁর পরিবারের লোকজনও। ঠাকুর পরিবারের মত এই আর এক অবাক-করা গুণী পরিবার! বড় ছেলে সুকুমার তো সবার সেরা, তাঁর সঙ্গে আছেন যেময়ে সুখলতা, পুণ্যলথা। ছেলে সুবিনয়, সুবিমল। ছোটভাই কুলদারঞ্নন, প্রমদারঞ্জন। সে এক জমজমাট লেখক পরিবার, যার ধারা বাংলা শিশুসাহিত্যের পরবর্তী পর্যায়কে আজও সমৃদ্ধ করে চলেছে।
১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর। সুন্দর চেহারা, সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী উপেন্দ্রকিশোর ডায়াবেটিস রোগে ভুগে মারা যান মাত্র ৫২ বছর বয়সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধার ফলে বিলেত থেকে ওষুধ আসা বন্ধ তখন। ভাল ওষুধ তখনো তেমন কিছু আবিস্কৃত হয়নি। তাই এমনি অসহায় ভাবে অকালে বিদায় নিতে হল এমন অসামান্য প্রতিভাধর মানুষটিকে।
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
রাশেদ বলেছেন:
আইচ্ছা।
বর্ণমালা বলেছেন:
ঘিরে রাখবে আরও অনেককে। ধন্যবাদ।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুন্ড
তাহাতে ডুবায়ে ধরে পাতকীর মুন্ড।