জীবনানন্দের যে লাইনগুলো প্রতিনিয়ত আমার অর্ন্তগত রক্তের ভেতর খেলা করে তা শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না।
আমারে চাওনা তুমি আজ আর, জানি
তোমার শরীর ছানি
মিটায় পিপাসা
কে সে আজ! তোমার রক্তের ভেতর ভালবাসা
দিয়েছ কাহারে!
(পিপাসার গান: ধূসর পান্ডুলিপি)
পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রুপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু'জনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।
(সন্ধ্যা হয়- চারিদিকে)
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে;(সুচেতনা)
অনেক লবন ঘেটেঁ সমুদ্রের পাওয়া গেছে এ মাটির ঘ্রাণ,
ভালোবাসা, আর ভালোবাসার সন্তান;
আর সেই নীড়
এই স্বাদ-গভীর - গভীর।(পাখিরা: ধূসর পান্ডুলিপি)
নারীর হৃদয় প্রেম-শিশু, গৃহ নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়-
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অর্ন্তগত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত করে -ক্লান্ত করে;
(আট বছর আগে একদিন: মহাপৃথিবী)
ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব
ধীরে পউষের রাতে
কোনদিন জাগব না জেনে
কোনদিন জাগব না আমি
কোনদিন আর!
(অন্ধকার)
ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল
ডালিম ফুলের মত ঠোঁট যার-রাঙা আপেলের মত
লাল যার গাল
চুল যার শাওনের মেঘ, আর আঁখি গোধূঁলির মত
গোলাপী রঙিন
আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে-স্বপ্নে - কতদিন।
(ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল)
তুমি তা জান না কিছু না জানিলে
আমার সকল গান তবু- এ তোমারে লক্ষ্য করে
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে
পথের পাতার মত তুমিও তখন আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
(নির্জন স্বাক্ষর)
আলো অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়- কোনো এক বোধ কাজ করে
স্বপ্ন নয়- শান্তি নয়- ভালবাসা নয়
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জম্ম লয়!
সে আমার হাত রাখে হাতে
সব কাজ তুচ্ছ হয়-পন্ড মনে হয়
সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়।
শূন্য মনে হয়।
(বোধ)
এক দিন-একরাত; তারপর প্রেম গেছে চলে
(প্রেম)
বহুদিন আগে আমি করেছি কি ভুল
পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমাহীন গাঢ় এক রুপসীর মুখ ভালবেসে;
(এই সব ভাল লাগে)
ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে
অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে
আমারে সে ভালবাসিয়াছে
আসিয়াছে কাছে
উপেক্ষা সে করেছে আমারে
ঘৃণা করে চলে গেছে-যখন ডেকেছি বারে বারে
ভালবেসে তারে;
(বোধ)
মানবকে নয় নারী, শুধু তোমাকে ভালবেসে
বুঝেছি নিখিল বিষ কি রকম মধুর হতে পারে।
(তোমাকে)
চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল
প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে থেকে আসিতেছে ভেসে
পেচাঁ আর ইদুঁরের ঘ্রানে ভরা আমাদের ভাড়ারের দেশে
(অবসরের গান)
তুমি এই রাতের বাতাস
বাতাসের সিন্ধু- ঢেউ,
তোমার মতন কেউ
নাই আর!
অন্ধকার- নিঃসাড়তার
মাঝখানে
তুমি আনো প্রাণে
সমুদ্রের ভাষা,
রুধিবে পিপাসা
যেতেছে জাগায়ে,
ছেঁড়া দেহে - ব্যথিত মনের ঘায়ে
ঝরিতেছে জলের মতন,-
রাতের বাতাস তুমি,- বাতাসের সিন্ধু- ঢেউ,
তোমার মতন কেউ
নাই আর।
(কয়েকটি লাইন)
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
(হায় চিল)
কী কথা তাহার সাথে?-- তার সাথে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ:
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।
সুরন্জনা তোমার হৃদয় আজ ঘাস:
বাতাসের ওপারে বাতাস--
আকাশের ওপারে আকাশ।
(আকাশলীনা)
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতি দূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, এতদিন কোথায় ছিলেন?
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তথন গল্পের তরে জেনাকীর রঙে ঝিলমিল ;
সব পাখী ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন ;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
(বনলতা সেন)
আশার ঠোঁটের পরে নিরাশার ভিজে চোখ চুমি
আমার বুকের 'পরে মুখ রেখে ঘুমায়েছ তুমি ।
( প্রেম )
হয়তো গুলির শব্দ;
আমাদের তীর্যক গতিস্রোত,
আমাদের পাখায় পিস্টনের উল্লাস,
আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান!
হয়তো গুলির শব্দ আবার :
আমাদের স্তব্ধতা,
আমাদের শান্তি।
আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না;
থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;
(আমি যদি হতাম)
কিংবা.....
সকল লোকের মাঝে
আমি নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা।
হায়! আমার হৃদয়ের কথা এভাবে আর কে বলিতে পারে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

