অফিস থেকে বের হয়ে বাসার দিকে হাঁটা ধরল তৌহিদ। বাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, তারপর হুড়োহুড়ি, গুতোগতি করে মানুষ বোঝাই বাসে কোনক্রমে পা-রাখার মত একটু জায়গা করে নেওয়া, মরার উপর খাড়ার ঘা-র মত পথের জায়গায় জায়গায় ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে ভোগান্তি- এরচেয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরাটাই শ্রেয় বলে মনে করে তৌহিদ।
হাটতে হাঁটতে ঢাকার দেয়ালশিল্পগুলো পড়া অভ্যাসে পরিনত হয়েছে তার। হরেক রকমের দেয়াল লিখন, বেশিরভাগই বিভিন্ন কোম্পানীর চটকদার বিগ্যাপন কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের স্লোগান। এরকম একটি বিগ্যাপনের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ায় তৌহিদ। তাতে বড় বড় লাল অক্ষরে লেখা, ''কাদোঁ বাঙালী, কাদোঁ।'' লেখার পাশে বাংলাদেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলের অংগ-সংগঠনের নাম লিখা। বেশ অবাক হয় সে। দেশে আবার কি হলো!!!
হাজার ভেবেও এর কোন কুলকিনারা করতে পারল না সে। অগত্যা দেয়ালের সামনেই দাড়ানো এক ঝালমুড়িওয়ালাকে তৌহিদ জিগ্যাসা করে, ''ভাই, বলতে পারেন ঐযে দেয়ালে লিখা 'কাদোঁ বাঙালী, কাদোঁ', এটা কেন লিখেছে? এর মানেটা কি?'' লোকটি তার দিকে বিরস চোখে তাকিয়ে উত্তর দেয়,''কেন্, ভাইজান জানেন না, সামনে ১৫ আগস্ট আসতাছে? হেই লাইগাই তো আস্তা শহর জুইড়া এইরকম লেখায় ভইরা গেছেগা।''
জিহ্বায় কামড় দেয় তৌহিদ। ওহ্, হো, ঐদিন তো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যবার্ষিকী, একদম ভুলে গিয়েছিল। এতক্ষণে লেখাটার মরতবা বুঝতে পারে সে। নিজের বোকামীতে লজ্জা পেয়ে ঝালমুড়িওয়ালার দিকে একটা অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে হাঁটা ধরে। কিন্তু, ফের তাকে দাঁড়াতে হয় পেছন থেকে লোকটার ডাকে। ''ভাইজান, একটু শুনবেন।'' ''বলো।'' ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে তৌহিদ। দারিদ্রের করাগ্রাসে জীর্ণ-শীর্ণ শরীরে উপরের ততোধিক শীর্ণ মুখটা কাঁচু-মাচু করে লোকটি শুধায়, ''আপনে কিছু মনে না নিলে, এগডা কতা জিগাইতাম।'' তৌহিদ অভয় দিয়ে হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। ''আমরা মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ। অত-শত বুজি না। শেখ সাব বালা মানুষ আছিলো। তারে যারা এভাবে মারছে, তারা খুউব খারাপ কাম করসে। এইডা অন্যায় হইছে। কিন্তুক.......''
লোকটা একটু দম নেয়। ''কিন্তুক্, এই লাইগ্যা আমাগো কানতে কইতাসে ক্যান, হেইডাতো বুঝবার পারলাম না। বাড়ির যদি কেউ খুন হয় তাইলে বাড়ির বেবাক মাইয়ামানুষরা অন্দরে বইয়া কান্দে আর বেটাছেলেরা প্রস্তুত অয় খুনীরে খুঁইজা প্রতিশোদ নেওনের লাইগা। তাইলে কি যারা ঐ লেখা লিকছে, হেরা কি আমাগোরে কান্তে বইলা মাইয়া মানুষগো লাকান বানাইয়া রাকতে চাইতাসে যাতে আমরা সারা জীবন শুদু কাইন্দাই যাই, আর শাসকগো রঙ-তামাশা দেইখা বইয়া থাকি, কিসু যাতে কইবার ও করবার না পারি? তাগো রকম-সকম দেইখা তো ওইরহমই মনে অয়। নাইলে তো তারা কইতো, ''জাগো, বাঙালী জাগো।'' আপনে কি কন ভাইজান?''
তৌহিদ কোন উত্তর দিতে পারে না। অপ্রস্তুত চোখে লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



