দের একাংশ। উপনিষদ তাই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিল মানবসভ্যতার শ্রেষ্ট
গ্রন্থগুলির অন্যতম। কেননা, এই গ্রন্থ নিরাকার এক ঈশ্বরের কথা বলে, বর্ণাশ্রমের
ধারণাও নেই উপনিষদে, বরং রয়েছে ত্যাগের সঙ্গে ভোগ করার কথা; অযাথা সন্ন্যাসের ওপরও গুরুত্ব দেয়নি উপনিষদ। উপনিষদের ঋষিগনই একদা উচ্চারণ করেছিল, 'একমেবাদ্বীতিয়াম।' এক ছাড়া দুই নাই। তা হলে কাকে তুমি আঘাত কর?
কষ্ট দাও? রক্তাক্ত কর? উপনিষদের গভীর শান্তিবাদী বানীর ওপরই ভারতীয় অহিংসবাদ দাঁড়িয়ে- যা পরবর্তীত মহাত্মা গান্ধির জীবনের প্রতিফলিত হয়েছিল অমলিন সূর্যালোকের মতন।
এর আগে আমি বেদ নিয়ে লিখেছিলাম। তা হলে তো উপনিষদ নিয়ে লিখতেই
হয়। তাহলে বেদ আর উপনিষদের মধ্যে সম্পর্ক কি? পার্থক্যই বা কোথায়?
বেদ আর উপনিষদের মধ্যে সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গি। ১২ টি উপনিষদের মধ্যে ৮টিই হল বেদভিত্তিক । তা হলে পার্থক্য? পার্থক্যও আছে। উপনিষদকে বলা হয়-
বেদান্ত। এর দর্শনকে বলা হয় বেদান্ত দর্শন। বেদান্ত মানে বেদের ‘অন্ত’ বা পে
র। কাজেই, বেদের যুগের পরেই রচিত হয়েছিল উপনিষদ । ব্যাখ্যাও যদিও ইষৎ
বদলে গেছিল। যেমন বেদ-এ আমরা পাই বহুদেবতাবাদ; আর উপনিষদে সর্বেশ্বরবাদ। মানে, ঈশ্বর ও জগৎ যেখানে একাকার। বিচ্ছিন্ন নয়। এই হল উপনিষদের মূলকথা। যে ভয়ঙ্কর বিষধর সাপকে দেখি-সেও ব্রহ্মা। কাজেই, এক ছাড়া দুই নাই। তা হলে কাকে তুমি আঘাত কর? কষ্ট দাও? রক্তাক্ত কর?
অসাধারণ চিন্তা সন্দেহ নেই- যদিও এই কনসেপ্টটি তিনটি আব্রাহামিয় ধর্মের একেবারেই বিপরীত।
কিন্তু, উপনিষদ কারা রচেছিলেন?
প্রাচীন ভারতের উদারহৃদয় প্রাজ্ঞ ঋষিগন।
সময়কাল?
এ বিষয়ে বহুমত প্রচলিত। তবে সার্বিক বিচারে যিশুর জন্মের সাতশ বছর আগে স্থির করা যায়। এবং, আমারও সেরকমই মনে হয়। বেদ-উপনিষদ নিয়ে জীবনভার গবেষনা করেছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। এঁর মতও সেরকমই। উপনিষদের রচনা সমাপ্ত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের মধ্যেই।
উপনিষদ সব মিলিয়ে বারোটি। তবে আরও আছে। সেসব উপনিষদ বলে গন্য হবে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।আগেই বললাম-১২ টি উপনিষদের মধ্যে বেদভিত্তিক হল ৮টি। যেমন-ঈশ,ঐতরেয়, কৌষীতকি, তৈত্তিরীয়, বৃহদারণ্যক, কেন, ছান্দোগ্য, ও প্রশ্ন। বৈদিক যুগের পরে রচিত উপনিষদগুলি হচ্ছে - কঠ, শ্বেতাশ্বতর, মুন্ডক ও মান্ডুক্য।
অতীব দুঃখের কথা এই যে-সনাতন ধর্মের অনুসারী যারা-তারা উপনিষদ তেমন পাঠ করেন না। তারা মনে করেন উপনিষদ তথা বেদান্ত দর্শন পন্ডিতদের বিষয়। তারা পাঠ করেন ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ নামে দুটি মহাকাব্য;যেখানে, দুঃখজনক হলেও সত্যি- কিছু হলেও বর্ণবাদের লাঞ্ছন রয়েছে। উপনিষদ তেমন নয়। যে কারণে তখন বলছিলাম মানবসভ্যতার শ্রেষ্ট গ্রন্থগুলির অন্যতম উপনিষদ।
বর্ণবাদী মহাকাব্য পাঠ করা ছাড়াও সনাতন ধর্মের অনুসারীরা অকারণে মায়াবাদে বিশ্বাস করে। উপনিষদে কিন্তু মায়াবাদের ধারনাই নাই; বরং, এই গ্রন্থ নিরাকার এক ঈশ্বরের কথা বলে, ত্যাগের সঙ্গে ভোগ করার কথা বলে; অযাথা সন্ন্যাসের ওপর জোর দেয়নি উপনিষদ। বলেছে, ত্যাগের সঙ্গে ভোগ কর। যে কারণে, মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এই একটি মাত্র বাক্যই বদলে দিতে পারত মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ!
তথ্যসূত্র:
ড. আর, এম দেবনাথ রচিত “সিন্ধু থেকে হিন্দু।”
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৮:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



