ঢাকায় মুঘলরা আসে ১৬০৮ সালে। তার আগে দিল্লির সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে তুর্কি -আফগান শাসকরা ঢাকা শাসন করতেন । তার আগে? তার আগে সেই সপ্তম শতক থেকেই -এখন যেটা শহর ঢাকা- তার কথা জানা যায়। ঢাকা তখন অনেকটা নগরের মতই ছিল- যখন কামরুপের বৌদ্ধ রাজারা এবং পাল বৌদ্ধ রাজারা অঞ্চলটি শাসন করত। তারপর নবম শতকে সেন রাজবংশের শাসনে চলে যায় অঞ্চলটি। সেন রাজারা ছিলেন হিন্দু-কাজেই দেবী ভক্ত। তো, সেন রাজা বল্লাল সেন ১২ শতকে ঢাকায় দেবী ঢাকেশ্বরীর মন্দির স্থাপন করেছিলেন । কারও কারও মতে অবশ্য ঢাকেশ্বরীর মন্দিরটি গুপ্তযুগের। তবে ঢাকেশ্বরীর মন্দিরের স্থাপত্য বিশ্লেষন করে পুরাতাত্ত্বিকগন মন্দিরটির অত ব্যাপক প্রাচীনত্ব অস্বীকার করেছেন। ঢাকেশ্বরীর একটা মানে, ঢাকার ঈশ্বরী বা ঢাকার দেবী। অন্য মানেটি হল, ঢাকা-ঈশ্বরী, বা হিডেন গডেস। সে যাই হোক। ঢাকেশ্বরী থেকে ঢাকা নামটির উদ্ভব নয় তো?
দ্বাদশ শতকের পর ঢাকার আশপাশের নাম হল-বাঙ্গালাহ। নগর ঢাকায় সে সময় কতগুলি বাজার গড়ে উঠেছিল। যেমন- লক্ষ্মী বাজার, শাখারি বাজার, তাঁতী বাজার, পাটুয়াটুলি, কুমারটুলি, বানিয়া নগর, গোয়াল নগর।
বুড়িগঙ্গা পাড়ের মানুষের সৌভাগ্য এই- ১৬০৮ সালে মুগলরা ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত করে। ইসলাম খান ছিলেন প্রথম সুবেদার, অর্থাৎ প্রাদেশিক শাসক। রাজধানী উদ্বোধনের দিনে নাকি ইসলাম খানের নির্দেশে ঢাক অর্থাৎ ড্রাম বাজানো হয়েছিল। অনেকের ধারনা ঢাকা নামটির উৎপত্তির পিছনে রয়েছে এই ঢাক বাজানো ঘটনাটি।
বোঝেনই তো- মুগল বাদশাদের তোষামোদ করে চলতে হয় সুবেদারদের। কাজেই সুবেদার ইসলাম খান মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের নামে ঢাকার নাম রাখলেন জাহাঙ্গীর নগর। তবে বাদশা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর নগর নামটি আর ব্যবহার করা হয়নি । কেন? এর সঠিক উত্তর আমি ঠিক জানি না। তবে-বাংলার তো একটা নিজস্ব সার্বজনীন আবেদন রয়েছে-যা অপ্রতিরোধ্য। যেমনটা আজও, বিশ্বসঙ্গীতের আগ্রাসনে টলোমলো বাংলাদেশি গানের বাজারে ফোক-সঙ্গীতের অপ্রতিরোধ্য দাপট। দেখুন না ভাটি অঞ্চলের সুরসাধক শাহ আবদুল করিম একাই কেমন রুখে দিচ্ছেন পাশ্চাত্য ধুন!
যাক। নগর বাদশা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর ঢাকা আবার ঢাকা হয়ে ওঠে।
(*) এক সময় নাকি ঢাকা ও এর আশপাশে অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ ছিল। ঢাক গাছের বৈজ্ঞানিক নাম: Butea frondosa. বুটেয়া ফ্রনডোসা নিয়ে নিশ্চয়ই শ্রদ্ধেয় উদ্ভিদপ্রেমি ব্লগার রাজামশাই কোনওদিন লিখবেন-অনন্ত লিখতে অনুরোধ করি।
অনেকের মতে, ঢাকা নামের উৎপত্তি ঐ ঢাক গাছ থেকেই!
http://banglapedia.search.com.bd/HT/D_0145.htm
এবং প্রশ্ন এই এই ঢাক গাছ এখনও ঢাকা ও ঢাকার আশে পাশে ফলে কি না।
(*) ঢাকা অঞ্চলে নাকি এক সময় ‘ঢাকা ভাষা’ নামে একটি প্রাকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। কোনও কোনও পন্ডিতের ধারনা ঢাকা ভাষা থেকেই ঢাকা শব্দটির উদ্ভব।
(*) দ্বাদশ শতকে কাশ্মীরের রাজাদের ইতিহাস নিয়ে রচিত হয়েছিল ‘রাজতরঙ্গিনী’ নামে একটি ইতিহাসগ্রন্থ। ‘রাজতরঙ্গিনী’ রচয়িতার নাম কলহন। কলহন রাজতরঙ্গিনীতে ‘ঢাক্কা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ঢাক্কা শব্দের মানে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এমন কী কি হতে পারে না যে-বুড়ি গঙ্গার পাড়টি ছিল উত্তর ভারতের শাসকদের ঢাক্কা বা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং ঢাক্কা শব্দটি থেকেই ক্রমে ক্রমে ঢাকা নামের উদ্ভব?
এমনটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
(*) মৌর্যদের পরে বাংলাসহ উত্তর ভারত শাসন করেছিল গুপ্ত রাজারা। ভারতের এলাহাবাদে গুপ্ত রাজাদের বর্ননাসমেত একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। সেখানে বলা হয়েছে সমুদ্রগুপ্তের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যের নাম ‘ডবাক’।
এই ‘ডবাক’ শব্দ থেকেই কি ঢাকা নামের উদ্ভ হয়েছে?
কে বলতে পারে?
পরিশেষে বলি-ঢাকা নামের উৎপত্তি নিয়ে বহুমত প্রচলিত। ঢাকা নামের উৎপত্তির ইতিহাস আজও গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা। কেন যেন ঢাকা তার নামের রহস্যটি উম্মোচন করতে চায় না বলেই মনে হয়।
তথ্যসূত্র: আবদুল মমিন চৌধুরী লিখিত বাংলাপিডিয়ার একটি নিবন্ধ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



