সে যাই হোক। মুজরা আসলে এক ধরনের দেহ সর্বস্ব নৃত্য। তেমনই হওয়ার কথা। কেননা, মুগল আমলে নারীর কি-ই বা সম্মান ছিল গর্ভধারণ ও পুরুষের মনোরঞ্জন বাদে? নারীর প্রধান কাজ পুরুষের মনোরঞ্জন করা-সে সময়টায় এমনটাই ভাব হত। অনুমান করি-মুগল পুরুষরা সব ঘিরে বসে রয়েছে জলসায়। আর এক নারী নেচে চলেছে। খালি পায়ে। ওড়না বেসামাল। নারীটি সমাজের চোখে বাঈজী। তাওয়াইফ।
এবং এই পাকিস্থানের সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ!
লালন একবার একটি গানে আক্ষেপ করে বলেছেন-
হাতের কাছে হয় না খবর
কি দেখতে চাও দিল্লি লাহোর।
বাউল শ্রেষ্ঠর কথাই ঠিক। তবে মাঝে মাঝে দিল্লি-লাহোরের খবর নিতেই হয়। খবর নিয়ে জানা গেল-লাহোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন টানটান উত্তেজনা। কেননা, গত মাসে লাহোর হাইকোর্ট মুজরা নিষিদ্ধ করেছে । গত ৪০০ বছর ধরে মুজরা পাকিস্থানী সংস্কৃতির অংশ। সংস্কৃতি কখন যে ব্যবসা হয়ে ওঠে। কাজেই, মুজরা নিষিদ্ধ হওয়ায় নর্তকীরা ও তাদের পৃষ্টপোষকগন ধর্মঘটে নেমেছে।
অনেকের মতে এটি পাকিস্থানকে তালিবানিকরণের প্রক্রিয়ার অংশ। কথাটা ভাবার মত। কেননা, পাকিস্থানের সবকিছু নিয়ন্ত্রন করে পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই। তারা আবার আম্রিকার পা চাটা কুকুর। আম্রিকা আই এস আই-এর সঙ্গে একজোট হয়ে আফগানিস্থানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। সেই পাকিস্থানে তালিবানিকরণ? উলটো হয়ে গেল না?
পাকিস্থানী সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে। বিজ্ঞ আদালত এখন বলছে যে-মুজরা নাচা চলবে। তবে নাচার সময় জুতা পড়তে হবে । মুজরা খালি পায়ে নাচা হয়- যা আদালতের চোখে অশ্লীল! বিজ্ঞ আদালত আরও বলছে-কেবল জুতা পড়লেই চলবে না- নাচার সময় ঘাড়-কাঁধ প্রভৃতি শালে জড়িয়ে রাখেতে হবে। গত ৪০০ বছর ধরে মুজরা নাচার সময় বাঈজী-তাওয়াইফগন যে তা করেনি সেটি লেখাবাহূল্য। রাষ্ট্রের এহেন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একজন তো খেপে গিয়ে বলেই বসল: আপনারা কি চান তাওয়াইফগন বোরখা পরে নাচবে? মুজরা যেহেতু একশ্রেণির ব্যবসা । কাজেই, ক্ষেপার তো কথাই।
২
পাকিস্থানের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক পার্থক্যর কথা বলা হত ষাটের দশকে । এখন তো মনে হচ্ছে সাংস্কৃতিক পার্থক্যও যথেষ্টই ছিল। এখনও আছে। লাহোরের ‘লাল আলো এলাকা’ হল হীরামন্ডি। মন্ডি মানে বাজার। সব মিলিয়ে হীরামন্ডি মানে হীরার বাজার। যদিও হীরামন্ডিতে কখনোই হীরা বিক্রি হয়নি। এ হচ্ছে পাকি-মুগল ভন্ডামীর আরেকটি উদারহরণ। খুশওয়ান্ত সিং লিখেছেন,Hira Mandi was named after Hira Singh - the minister in charge of this district during the rule of Maharaja Ranjit Singh. Prior to that, it was referred to as Shahi Mohalla ("Royal Neighborhood") due to its proximity to the royal quarters of the Moghals. হীরামন্ডির আরেক নাম শাহী মহল্লা। আবারও, মুগল অনুষঙ্গ। আসলেও মুগল আমলে ওখানেই ছিল বাঈজী- তাওয়াইফদের আস্তানা। এখনও ওই প্রাচীরঘেরা এলাকাটি বাঈজী- তাওয়াইফদের হিজরাদেরও দেখা যায়। তবে হীরামন্ডির প্রধান আকর্ষন: মুজরা। যা ইউরোপের ট্যুরিস্টদের চোখে দক্ষিণ এশিয়ার ইক্সোটিক ডান্স। দিনের বেলায় হীরামন্ডিতে খাবারের দোকান, জুতার দোকান আর মিউজিক্যাল ইনসট্রুমেন্টের দোকানে থাকে খদ্দেরের ভিড়। সন্ধ্যা নামলে মুগলদের প্রেতাত্বাগুলি নামে নব্য পাকি পুরুষের ঘাড়ে চেপে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্থানের পাথর্ক্য এখানেই। বাংলাদেশে রয়েছে ধানমন্ডি-পাকিস্থানে হীরামন্ডি। কেননা, আমাদের মুগল তেমন গ্রাস করতে পারে নাই। সম্প্রতি আমি পাকিস্থানী কিশোরীদের (পেশাদার নয়) হোমমেড মুজরা দেখলাম একটা সাইটে। ধিক। বাঙালি কিশোরী মেয়েদের তেমন অশ্লীল ভঙ্গিমা ভাবাই যায় না।
এই বিকৃতরুচিদের সঙ্গে ছিলাম আমরা ২৪ বছর কেবলমাত্র ধর্মের নামে!
তাই ভাবছিলাম ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন আসলে সাংস্কৃতিক পার্থক্যেরই পরোক্ষ ফল। তবে ঢাকায় বাঈজীরা এসেছে মুগলদের হাত ধরেই। অনুপম হায়াৎ লিখেছেন-In dhaka, performance of dances and of songs by baijees began during the Mughal rule. Baijees performing dances and songs in the court of Subedar Islam Khan (in the first part of the seventeenth century) were called kanchani. The baijees were at the peak of their performance in the nineteenth century during the time of Nawab Nusrat Jang, Nawab Shamsuddowla, Nawab Quamruddowla, nawab abdul ghani and nawab ahsanullah. Baijees used to perform at the Rangmahal of ahsan manzil, Ishrat Manzil of Shahbagh, and garden house of Dilkusha. ( বাংলাপিডিয়া)
আজও ঢাকার অনেক পাকিস্থাপন্থি মুসলিম অভিজাত পুরুষ মুজরার ভক্ত, আজও তারা তাওয়াঈফ নাচায়- যেহেতু পাক মুগল সংস্কৃতিই জগতের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি! ঢাকার ডানপন্থি অভিজাত পাকিপন্থিরা এখনও “আমরা ঢাকাবাসী” নামে সংগঠন করে। তাদের অনুষ্ঠানে মুগলদের মত করে ঢাকার মেয়েদের হাতে মেহদি লাগায়। আমি অবশ্য একেবারেই মেহেদির বিপক্ষে নই, কথাটা বলা অন্য কারণে,আমরা জানি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভালোমন্দ আছে। সে দিক দিয়েও পাকিস্থানেরও উজ্জ্বল দিক কম নেই। যেমন, মেহেদি হাসান, গুলাম আলী, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং অন্যান্য শ্রদ্ধেয় মানবতাবাদীগন।
সে যা হোক। পাকিস্থানীরা বরাবরই জানত মুজরা ততটা শীলিত নয় নারীর দেহপ্রদর্শন । আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়- যা 'এক্সিবিশনিষ্ট'।কাজেই মুজরাকে শিলিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে মুজরা কেবল অশ্লীল নয়, এর মধ্যে একটা ধ্রুপদী ব্যাপারও রয়েছে। এর উত্তরে বলা হয়েছে-A common, but mistaken, opinion is that this dance form took away the more classical elements of the pure kathak dance to make it more appealing to the audience of that time, and added sensuality fitting a courtesan's dance. In fact, it has been convincingly demonstrated (by Margaret Edith Walker, in: Kathak Dance - A Critical History, PhD dissertation, University of Toronto, 2004) that there was no dance called Kathak until the 20th Century, nor a community/caste called Kathak until the 19th. Moreover, the more formalized elements of Kathak were added to the Tawaif dance form in order to classicize it and appropriate it from its original practitioners in the last century.
তখন হীরামন্ডি সংক্রান্ত পাকি ভন্ডামীর কথা বলছিলাম।
কথাকলি, কত্থক, মনিপুরী, ভারত-নাট্যম -এইসব ভারতীয় নৃত্যগুল সবই শীলিত আর শৈল্পিক; যে কারণে বিশ্বজুড়েই গভীর শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে।
আর পাকিস্থানের মুজরা?
ভারত ও পাকিস্থানের পার্থক্য এখানেই।
তখন আমি ধানমন্ডি ও হীরামন্ডির পার্থকের কথা বলছিলাম।
তারপরও ভারতেও মুজরার গভীর প্রভাব রয়েছে। হিন্দির ছবির ডান্স-যা অশ্লীল
, তাই মুজরা। বানিজ্যিক কারণে, ভারতীয় প্রযোজকরা একে ব্যবহার করেছে। যে কারণে বলা হয়েছে- Most kathak related dances in Bollywood films are mujra in reality. It has taken a new form in Pakistan by becoming less artistic and more seductive, especially in Punjabi stage dramas.
মুজরা অশ্লীল। কেন? এক রোমহর্ষক বিরাট পুরুষতান্ত্রিক পাকিস্থানের ঐতিহ্য বলেই কি? ওখানে দীর্ঘদিন ধরে শক্ত পুরুষতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র বিদ্যমান বলেই মুজরার কদর কখনোই কমেনি। আমি ভাবছি এদ্দিন পর লাহোর হাইকোর্ট কী ভেবে মুজরা নিষেধ করল- ৪০০ বছর পর? এককালে যা মুগলদের স্বাভাবিক মনে হত-তাই আজ এক শ্রেণির পাকিস্থানীদের কাছে অস্বভাবিক মনে হচ্ছে কেন?
বিশাল এক পরিবর্তন কি ঘটতে চলেছে ঐ কৃত্রিম রাষ্ট্রটিতে?
৩
মিডিয়ার কারণে আজকাল তথ্য আদানপ্রদান আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রবল দাবীর পিছনেও তথ্যের সহজলভ্যতা অন্যতম কারণ বলে আমার কাছে মনে হয়। আপনাদের মনে থাকার কথা বেনজির ভুট্টো হত্যাকান্ডের ঠিক আগে আগে প্রায় ৭০ টি পাকিস্থানী সংগঠন একাত্তরে পাকিস্থানের বর্বর আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল। যা-১৯৮০ কি ৯০ সালে লক্ষ্য করা যায়নি। এই স্বস্তিদায়ক ঘটনাটির পিছনেও তথ্যের সহজলভ্যতা অন্যতম কারণ বলেই আমার কাছে মনে হয়।
তথ্য সহজলভ্য হওয়াতেই বিশ্বের সামনে পাকিস্থানের তথাকথিত অপরিশীলিত ঐতিহ্যবাহী দিকগুলি ক্রমশ প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এই লজ্জ্বা কি কাজ করছে মুজরা নিষিদ্ধ হওয়ার পিছনে? মুজরায় শিল্প ও যৌনতা একাকার হয়ে যাওয়াটা পাকস্থানীরা ঠেকাতে পারেনি-তার ওপর বাংলাদেশে গনহত্যায় দায়, ক্ষমা না চাওয়া-এসব তো বিশ্ববাসী এখন জানে। এই গ্লানীবোধ। তার ওপর আম্রিকাপন্থি মিলিটারির খপ্পড় থেকে না বেরুতে পারার জাতীয় নৃপুংসতা? যে কারণে লেজেগোবরে পাকানো পাকিস্থান নামের কৃত্রিম রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরে বোমা হামলার উদ্দেশ্যে সহজেই মার্কিন বোমারু বিমান পাক সীমান্ত ক্রস করতে পারে?
এসবই আসলে মুগল ঐতিহ্যপ্রীতির খেসারত।
পাকিস্থান কি বদলে যাচ্ছে?
পাকিস্থানকে বদলাতেই হবে।
৪
আমি অবশ্য ভাবছি অন্য কথা। হীরামন্ডির মুজরা নর্তকীরা এখন কী ভাবে বেঁচে থাকবেন-সে কথা। কেননা, আমার জীবনদর্শন সমাজের ২য় শ্রেণির কোনঠাসা নারীর স্বার্থই আগেদেখতে নির্দেশ দেয়। লাহোর হাইকোর্টের নিধেষাজ্ঞার ফলে হীরামন্ডির নারীদের জীবনধারণ এখন হুমকীর মুখে। ওদের এখন কী হবে- ওদের তো শরীর দেখিয়ে ঝোল-রুটির ব্যবস্থা করতে হয়।
পাকিস্থানী সরকারের কাছে মুজরাশিল্পে জড়িত নারীদের পুনর্বাসনে দাবী জানাই।
পাকিস্থানী প্রশাসনের ভাব উচিত, ওই নারীরা দুভার্গজনকভাবে পুরুষের লালসার শীকার, পুরুষতন্ত্র যাদের মেয়েবেলা থেকেই ঘাড় ধরে অশ্লীল নাচটি শিখিয়েছে যেহেতু ৪০০ বছরেও পাকিস্থানী পুরুষেরা বদলায়নি, যেহেতু তাদের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্না অনেক আগেই মুজরা নিষিদ্ধ করে বাঈজী-তাওয়াইফদের বাঈজী-তাওয়াইফ হওয়ার পথ বন্ধ করেননি। কেন? যেহেতু, ওই ঐ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রটিতে একটি পুরুষতান্ত্রিক সামরিক-ধর্মেরই জয়জয়াকার; যে ধর্মে নারী বিপথগামী হলে নারীকে পাথর ছুঁড়ে মারার ব্যবস্থা আছে।
আশ্চর্য এই -গত ৪০০ বছর ধরে হীরামন্ডির মেয়েদের কেউই পাথর ছুঁড়েনি। বরং দেওয়াল তুলে হীরমন্ডিকে সযত্নে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
যেহেতু, মধ্যযুগ মানেই অপরিসীম ভন্ডামী!
কারও ক্ষতি না করে মধ্যযুগকে বিদায় জানান।
৫
একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করে আছি-
যখন পাকিস্থানে আর কোনও বালিকাকেই
বাধ্য করা হবে না
মুজরা নাচ শিখতে।
কেননা, নাচ, অপূর্ব শিল্পরুপ বলেই অশ্লীল
-যা মূলত মনোঃসংযোগের ব্যাঘাত ঘটায়-
তাই অশ্লীল হওয়া উচিত না বলেই
আমি বিশ্বাস করি।
এককালে চিনে মেয়েশিশুদের পায়ে লোহার জুতা
পরিয়ে রাখা হত, খোল হত না-যাকে করে
মেয়েশিশুটি বড় হয়ে ভালো করে হাঁটতে না পারে।
আজ সেরকম কথা চিনে কেউই ভাবে না।
৬
পরিশেষে আবারও পাকিস্থানী সরকারের কাছে মুজরাশিল্পে জড়িত নারীদের পুনর্বাসনে দাবী জানাই।
৭১ এ আমরা পৃথক হয়েছিলাম।
এখন থেকে অনেকানেক মানবিক পদক্ষেপ গ্রহন করে আমরা আবার আমাদের মৃত ও শীতল হৃদয়ের কাছে ফিরতেও পারি।
অন্যভাবে।
তথ্যসূত্র:ইন্টারনেট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

