somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?

২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১)। ফরাসী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা হলেও নেপোলিয়ন বোনাপার্ট শিল্পসংস্কৃতি ঠিকই বুঝতেন । এই ছবিটায় সে কথাও যেন স্পষ্ট। অনেকটা রোম্যান্টিক কবির মতন দেখতে বোনাপার্ট বিশ্বাস করতেন- Imagination rules the world.আহ! কাজেই, আজও ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্ব হিসেবে বোনাপার্ট গন্য । বোনাপার্টের জন্ম ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপে- জাত সৈনিক ছিলেন; অসম সাহস ও প্রখর বুদ্ধিমত্তা নিয়েই জন্মেছিলেন । ফরাসী বিপ্লবের সময়ই বীরত্ব দেখিয়ে প্রথম ফরাসী উর্ধতন সামরিক কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েন। ভীষণ রকম উচ্চভিলাষী ছিলেন নেপোলিয়ন। সে জন্যই কি ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে এক সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ফ্রান্সের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন? এই ঘটনার পাঁচ বছর পর বোনাপার্ট নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট ঘোষনা করেন। তারপর অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলিকে কুক্ষিগত করার উদ্দেশে কিংবা ফরাসী বিপ্লবের সাম্য মৈত্রী সৌর্হাদ্য ছড়িয়ে দিতেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে দিগি¦জয়ে বের হলেন। যা হয়-নিয়তির অদৃশ্য সুতার টানে প্রথম প্রথম নেপোলিয়ন ঠিকই জিতছিলেন । কিন্তু, ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া আক্রমনের পরপরই তাঁর ওপর শনির কোপ পড়ল । ১৮১২ খিস্টাব্দের পর থেকেই সম্রাটের সৌভাগ্যের চাকা উলটো দিকে ঘুরতে শুরু করল। রাশিয়া থেকে সম্পূর্নত বিপর্যস্ত হয়েই পিছন হটে আপন ঘরে লুকোলেন বোনাপার্ট-হিটলারের ক্ষেত্রেও বহুবছর পর তাই হয়েছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা কেউই নেয় না। যা হোক। ওদিকে ইউরোপের যৌথ বাহিনী উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছিল। সে সুযোগ এল। সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনী ফ্রান্স আক্রমন করল। বোনাপার্ট একবার বলেছিলেন যে, The word impossible is not in my dictionary. কথাটা কি সত্যি? সত্যি হলে সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমনের কাছে হেরে গেলেন কেন বোনাপার্ট? জোটবাহিনী বোনাপার্টকে হত্যা না করে বরং তাঁকে ‘এলবা’ দ্বীপে নির্বাসনে পাঠাল। কেন? কেন তারা বোনাপার্টকে হত্যা করল না? এই প্রশ্নটা নিয়ে প্রায়শ আমি ভাবিত হই। যা হোক। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বোনাপার্ট বুদ্ধি করে এলবা দ্বীপ থেকে গেলেন পালিয়ে। তারপর কী ভাবে যেন ফ্রান্সে পৌঁছলেন। কী ড্রামাটিক! ফ্রান্সে পৌঁছেই পুনর্বার শক্তি সঞ্চয় করলেন বোনাপার্ট। অবশ্য এবারও ওয়াটারলুর যুদ্ধে হেরে যান। এবার তাঁকে ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানে নির্বাসিত করা হল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে । নির্বাসনের আগে বোনাপার্টকে জিজ্ঞেস করা হল: অন্তরীণ জীবনে কি বেছে নেবেন? উত্তরে বোনাপার্ট বলেছিলেন- বই, বই আর বই। বুঝুন তা হলে! তো প্রায় ৬ বছর ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানে অন্তরীণ রইলেন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। ১৮২১ সালে মারা যান বোনাপার্ট। আজকাল অবশ্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন যে, প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে অল্প অল্প করে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল নেপোলিয়নকে। কি বিষ? আর্সেনিক। বোনাপার্ট একবার বলেছিলেন:England is a nation of shopkeepers.কথাটা কি ঠিক বলেছিলেন বোনাপার্ট? ইংল্যান্ড কি কেবলিই বেনিয়াদেশ? ইংল্যান্ড কি শেলি কীটস শেকসপীয়র বায়রন জন্মাননি? আর দোকানদারি কি এমন খারাপ শুনি। তা হলে? ব্যবসা তো সবাই করে-তা হলে কেবল ইংল্যান্ডেরই অপবাদ দেওয়া কেন?
ইংরেজরা উপনিবেশ গড়ে শোষন করেছে?
কেন? ফরাসীরা আলজেরিয়া মৌরতানিয়া কম্বডিয়া ভিয়েতনাম তছনছ করেনি ? তা হলে?
তা হলে কেন তিনি বললেন- England is a nation of shopkeepers.
এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?

সেদিন একটা লেখার সূত্রেই ফরাসী বীর যোদ্ধা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কিছু খোঁজখবর করতে হল। লিখছিলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগরের মা ভগবতী দেবী সম্বন্ধে; প্রসঙ্গ- ছেলের ওপর মায়ের প্রভাব। অনেক আগেই আমি জানতাম যে- সন্তানের জীবনে মায়েদের ভূমিকা নিয়ে দারুণ এক উক্তি করেছিলেন নেপোলিয়ন:
The future destiny of the child is always the work of the mother.
যদিও আমি বিশ্বাস করি যে, যে কোনও মানুষের জীবনেই ভাগ্যের ব্যাপারে মায়েরদের ভূমিকা ছাড়াও আরও অনেক অনেক ফ্যাক্টর থাকে। যেমন: জিন। তারপরও যে কোনও মানুষের জীবনে মায়ের ভূমিকাই যে প্রধান-এমন এটা নিপাট সত্যকথা স্বীকার করায় নেপোলিয়নের ওপর রীতিমতো শ্রদ্ধান্বিত হয়ে উঠি। আর কি কি বলেছিলেন নেপোলিয়ন? এমন এক গভীর কৌতূহলে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় আমি ইন্টারনেটে সার্চ করতে থাকি এবং নেপোলিয়ন-এর অনেকগুলি উক্তি একসঙ্গে পেয়ে যাই এবং সেসব পড়তে পড়তে উক্তিগুলির স্ববিরোধীতা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা উপলব্দি করে রীতিমতো শিহরিত হয়ে উঠি এবং তখনই নেপোলিয়ন সম্বন্ধে লিখব বলে সিদ্ধান্ত নিই।



নেপোলিয়ন কি গান শুনতেন? শুনতেন অবশ্যই। তা না হলে তিনি কেনই বা বলবেন-
Music is the voice that tells us that the human race is greater than it knows. কী অসাধারন উক্তি। মানেটা বোঝা অবশ্য তত সহজ না। তবে উক্তিটি পড়ে আমি তো রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গেলাম । অতি গভীর কথা। কোথায় যেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ উঁকি দেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি জগৎখানি / তখন তারেই জানি। প্রাসঙ্গিক বলেই হয় তো আমার সঙ্গীত সম্বন্ধে কনফুসিয়াসের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল:Music produces a kind of pleasure which human nature cannot do without.অসাধারণ। নেপোলিয়নের কথার সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে! তা হলে তো দেখা যাচ্ছে অন্তত সঙ্গীত ভাবনার ক্ষেত্রে নেপোলিয়ন রবীন্দ্রনাথ কনফুসিয়াসের সগোত্র। তা হলে? আমার কপালে ভাঁজ পড়ল। অথচ আমরা তাঁকে চিনি মূলত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই। তো সেই রাজনীতি নিয়ে নেপোলিয়নের একটা উক্তি এরকম:A leader is a dealer in hope. তরুণ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ঘন ঘন বলছেন এই কথাটিই বলার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হল। গতকালের উপজেলা নির্বাচনটি লেজেগোবরে হয়ে গেল। এখন দেখা যাক কী হয়। উপজেলা নির্বাচনে স্পষ্টই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় ‘আমাদের সময়ের’ সম্পাদক খুব ক্ষেপেছেন। আবদুন নূর তুষারের সামনে নাঈমুল ইসলাম খান খুব ঝারলেন গতকাল সন্ধ্যায়। উপজেলা নির্বাচনকে নাঈমুল ইসলাম খান বললেন, পচা। আশা করি আপনারা আর টিভির ‘রোড টু ডেম্যোক্রাসি’ দেখেন? নেতারা যে ‘আশার’ ব্যবসা করেন-অনুষ্ঠানটি দেখে তাই মনে হয় আমার। প্রণাম নেপোলিয়ন।
যাক, এই ফাঁকে আমি মাননীয় বানিজ্যমন্ত্রীকে নেপোলিয়নের এই কথাটি মনে করিয়ে দিই -In politics stupidity is not a handicap. টিসিবি সংক্রান্ত তাঁর মূর্খ সিদ্ধান্তটি কোনওমতেই অর্থব নয়। কারণ তিনি তো পলিটিশিয়ান। তরুণ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ এর প্রতি নেপোলিয়নের উপদেশ-In politics... never retreat, never retract... never admit a mistake. কাজেই, উপজেলা নির্বাচনে তলে তলে যাই ঘটুক না কেন- সে সমস্ত কিছুতেই স্বীকার করা চলবে না!
সংবিধান নিয়ে নেপোলিয়ন বক্তব্য আশ্চর্য রকম মরমী।
কেননা, তিনি বলেছেন: A Constitution should be short and obscure.
এই কথার মানে আমি সত্যিই বুঝিনি। সংবিধান ছোট হতে পারে কিন্তু দুর্বোধ্য হবে কেন? আমার তো মনে হয় না সংবিধান সংক্রান্ত নেপোলিয়নের মন্তব্যটির মানে বিজ্ঞ ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ কিংবা রফিক উল হক টিভির টক শোয়ে দর্শকস্রোতাকে বোঝাতে পারবেন ! আমি ভাবতে থাকি- ’৭২ এর সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল সংক্ষিপ্ত। সেটি ড়নংপঁৎব হওয়াই কি পরে তাতে পরিবর্তন আনা হল? কে জানে? ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র তো সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীদের বোঝার কথাই না।
যা হোক। নেপোলিয়ান যে- The word impossible is not in my dictionary-এই কথাটি বলেছিলেন তা আমরা অনেকেই কমবেশি জানি। এখন এই দাম্ভিক উক্তিটি খানিক বিশ্লেষন করা যাক। আগস্ট মাসের ১৫তারিখে জন্মেছিলেন বলেই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন সিংহ রাশির জাতক । আমার আশেপাশে যে সমস্ত সিংহ রাশির জাতকজাতিকারা রয়েছে তারা প্রায়ই প্রবল আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তা বলে থাকেন। কাজেই রাশিগত তাড়নাই কি বোনাপার্ট ওই কথা বলেছিলেন? তবে আমি যদ্দুর জানি সিংহরা সিংহই বটে-তবে দে ক্যান নট ফ্লাই। যে কারণে দু দুবার নেপোলিয়নের ভরাডুবি আমরা দেখেছি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল-নব নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সিংহ রাশির জাতক - ঐ আগস্ট মাসের ৪ তারিখে জন্মেছেন বলেই । নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতন আমরা দেখেছি। ওবামার পতনও কি আমরা দেখতে যাচ্ছি? যে দায়িত্ব বারাক ওমাবা পালন করতে পারবেন না সে দায়িত্ব তিনি দম্ভভরে কাঁধে তুলে নিলেন কেন? রাশিগত ফুটানি?
যাক। এবার নেপোলিয়নের কিছু স্ববিরোধীতার কথা না হয় বলি। জীবনভর যুদ্ধ করলেও নেপোলিয়ন ছিলেন যুদ্ধবিরোধী।
কী!
হ্যাঁ। নেপোলিয়ন যুদ্ধবিরোধী ছিলেন বলেই বলেছিলেন- War is the business of barbarians.এ কেমন স্ববিরোধীতা! জীবনভর কি তিনি যুদ্ধ করেননি? যুদ্ধকে বর্বরদের কাজ মনে করলে কর্সিকা থেকে ফরাসী বিপ্লব উত্তর সাংঘর্ষিক প্যারিস নগরে তার যাওয়ার কী দরকার ছিল? তার বদলে কৃষিকাজ করে কর্সিকায় নিরিবিলি একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন না কেন তিনি? কিংবা সঙ্গীতরচনা করে? তার বদলে সৈন্য হবেন বলে প্যারিসে এলেন! এ কীরকম স্ববিরোধীতা? নাকি ভন্ডামী? তা ছাড়া, নেপোলিয়ন ছিলেন উচ্চাভিলাষী। যে কারণে বলেছিলেন, France has more need of me than I have need of France.যে কারণে বলেছিলেন, I have only one counsel for you - be master.যে কারণে বলেছিলেন, I am the successor, not of Louis XVI, but of Charlemagne. তা হলে? তা হলে তিনি কি উচ্চাভিলাষী ছিলেন না? ওপরে উঠতে হলে তো ছোটখাটো অনেক যুদ্ধ করতে হয়, সংকীর্ণ হতে হয়, অন্যকে বঞ্চিত করতে হয়। সেরকম যুদ্ধ কি তিনি করেন নি। তা হলে? তা হলে বোনাপার্ট কেন বললেন- War is the business of barbarians? তাছাড়া তিনি বলেছিলেন, The surest way to remain poor is to be an honest man.তা হলে? তা হলে তিনি কর্সিকা ছেড়ে ঝঞ্ছাবিক্ষুব্দ প্যারিসে এলেন কেন? কেন আমৃত্যু বাঁশি বাজালেন না বোনাপার্ট কর্সিকার পাথরউপকূলে বসে ? কেন তুললেন না সাগর পাড়ে কাঠের একটি বাড়ি? কেন তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে বলে বর্বর রক্তাক্ত যুদ্ধে লিপ্ত হলেন!
এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?



তা যুদ্ধ করুন আর নাই করুন। মানুষ হিসেবে মনে হয় ভালোই ছিলেন নেপোলিয়ন। নৈলে তিনি কেন বলবেন-A true man hates no one. আহ! কী আশ্চর্য গভীর বেদান্তিক উক্তি! যেন প্রাচীন কোনও ভারতীয় ঋষির অমোঘ বাণী। ব্রাহ্মী লিপিতে ভূর্জপত্রের ওপর লেখা। নেপোলিয়ন নিজে কি সেরকম সত্যপুরুষ ছিলেন? নাঃ। কেননা, তিনি বলেছিলেন: England is a nation of shopkeepers.
এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?
A true man hates no one. এই কথা বলায় নেপোলিয়নকে তো পরম ভগবত বিশ্বাসী বলেই মনে হওয়ার কথা। অথচ, নেপোলিয়ন ছিলেন, যাকে বলে যারপরনাই অ-ধার্মিক-তাই। ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর তিনটি উক্তি পেয়ে আমি তো রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম।

(ক) All religions have been made by men.
(খ) Religion is excellent stuff for keeping common people quiet.
(গ) Religion is what keeps the poor from murdering the rich.

কী সর্বনাশ! দেলোয়ার হোসেন সাঈদীরা যে এত খুনখারাপি ঘটতে দিচ্ছেন না- তা কে জানত। চতুররা অবশ্য বলবেন-নেপোলিয়ন খ্রিস্টবিরোধী ছিলেন-ঠিক ইসলাম নয়? তবে নেপোলিয়নের ধর্মবিষয়ক মন্তব্য তিনটি নিয়ে নবীন প্রজন্মের ভাবা অবশ্যই উচিত। Religion is excellent stuff for keeping common people quiet. আরেক অ-বিশ্বাসী কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে। তারও কত আগে কত সত্য কথা বলে ফেলেছেন নেপোলিয়ন। অথচ, বাংলাদেশে দারিদ্রকে যাদুঘরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ভাবে মদদ দিচ্ছি। কাজেই এবার হিসেব কষতে বসি জাতি হিসেবে আমরা নেপোলিয়নের থেকে কতটা পিছিয়ে? অথচ, আমরা ফ্রান্সের মতন উন্নত হতে চাই। আজকাল ডিজিটাল বাংলাদেশের ধোঁওয়া তোলা হলেও- আপামর মানুষের মগজের কোষে কোষে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীদেরই জয়জয়াকার-তিনি জনতাকে নিশ্চুপ রাখছেন।
উল্লেখ্য, নেপোলিয়নের ধর্মবিরোধী উক্তি পেলেও ঈশ্বরবিরোধী একটি উক্তিও আমি পাইনি। এটিও একটি ইনটারেসটিং পয়েন্ট। কেননা, জগতের বিদ্যমান ধর্মগুলির বিপক্ষে অবস্থান অতি সহজেই নেওয়া গেলেও ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তেমন অবস্থান নেওয়া সহজ নন ঈশ্বরের বৈশিষ্টের কারণেই। কথাটা ভাবতে ভাবতে ভাবলাম- তুমি কেমন মানুষ বোনাপার্ট?
ধর্মবিরোধী ছিলেন বলেই কি দারুণ শিল্পরসিক ছিলেন নেপোলিয়ন? বলেছিলেন:A picture is worth a thousand words. শুনেছি বহু বিখ্যাত পেইনটিংস নাকি বেডরুমে রেখে দিতেন। আর, picture শব্দটাকে আজকের দিনের ‘গ্রাফিকস’ ধরে নিলে নেপোলিয়ন যে বিজ্ঞানমনস্কও ছিলেন -তাও মানতে হয়। এমন গভীর প্রজ্ঞাবান একজন মানুষের তো ঠিক ধর্মবিশ্বাসী হওয়ার কথাই নয়।
যা হোক। ইতিহাস সম্বন্ধে দুটি তির্যক মন্তব্য পেলাম নেপোলিয়নের।

(ক) History is a set of lies agreed upon.
(খ) History is the version of past events that people have decided to agree upon.

প্রায়ই একই ধরনের কথা, তবে খাঁটি কথা। ব্যাখ্যা করছি। প্রায় ছ’ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা করেছি আমি। সেই সময়টা জুড়ে আমাদের ইতিহাস বিভাগের মৌলানা ছাহেবরা আমাদের মতন কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন যে -বাংলার আসল ইতিহাসের শুরু ১৩ শতকের পর থেকেই।
তার আগে কি ছিল স্যার?
তার আগে ছিল ধুয়া।
ধুয়া?
হ্যাঁ। ধুয়া।
আমরা ক’জন অবশ্য এসব অর্বাচিন মুসল্লিদের কথায় বিশ্বাস না করে বরং তাদের থাবা থেকে পিছলে বেরিয়ে এসেছিলাম এবং অনেক পরে জেনেছিলাম মানবতাবাদী তুর্কি ঔপন্যাসিক ওরহার পামুককে প্রায় একই ধরনের মানসিক নির্যাতনে শিকার হতে হয়েছিল। আমাদের শৈশবে কঠিন অসা¤প্রদায়িক শিক্ষা ছিল। সে মহৎ শিক্ষাকে উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মৌলবী ছাহেবরা আমাদের মগজে কলুষ ঢুকিয়ে কিছু স্থির মিথ্যা ধারনা দেওয়ার অপ্রচেস্টায় লিপ্ত হয়েছিল । সে জন্যই বলছিলাম যে নেপোলিয়সের কথাটা খাঁটি।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে সবা শিক্ষকই মুসল্লি ছিলেন না। যেমন, মেজবা কামাল, আহমেদ কামাল। আমাদের আধুনিক ইউরোপ পড়াতেন অধ্যাপক মোফাকখারুল ইসলাম। অত্যন্ত উচুুঁমানের শিক্ষক। তখন শুনেছিলাম যে-অক্সফোর্ডে তাঁর একটি বই নাকি টেক্সট। প্রায়ই ক্লাসে মোফাকখার স্যার বলতেন, এই যে এখন যে কোনও শহরেই বাড়ি বাড়ি নাম্বার রয়েছে-এই নিয়া কে প্রথম ভাবছিল জান। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। যুদ্ধ ক্ষেত্রেও এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাবতেন নেপোলিয়ন । সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখছিলেন, প্যারিস শহরের সব বাড়ির নম্বর বসাইতে হবে। চিন্তা কর! বলে মোফাকখার স্যার কিছুটা ক্ষুব্দস্বরে বলতেন, নেপোলিয়নের জন্য সিলেবাস এত কম। শুধু নেপোলিয়নের উপরই ১০০ নম্ভর হওয়া উচিত।



অনলাইনেই নেপোলিয়নের একটা উক্তি পড়ে মুচকি হাসলাম। নেপোলিয়ন বলেছেন যে-A celebrated people lose dignity upon a closer view.কী সত্যি কথা। এই জন্যেই আমি সম্প্রতি একজনকে আমার টেলিফোন নম্বর দিইনি। টেলিফোনে কথা কয়ে কয়ে তিনি আমার সঙ্গে ঘনিষ্ট হবেন, তারপর ফ্ল্যাটের ঠিকানা চাইবেন। তারপর আমার ঘরে ঢুকে আমার পাকা চুল দেখে নির্ঘাৎ মর্মাহত হবেন। আমাকে তিনি দূর থেকে দেখছেন। সেই ভালো, সেই ভালো। মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে লাইন দুয়েক পদ্য লিখেছিলাম-ভালোবাসা এসেছিল কাছে/পাকাচুল দেখে সরে গেছে।
ব্যাক্তিগত জীবন ছাড়াও, রাজনৈতিক জীবনেও তো A celebrated people lose dignity upon a closer view.-এই কথাটা সত্য। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কথাই একবার ভাবুন না। একাত্তরে তাঁর কী ভূমিকা ছিল আর এখন তিনি উন্নয়নের নামে কী করছেন! কিংবা ভাবুন তারেক রহমানের ছোট ভাইটির কথা। বিশদ ব্যাখ্যার কি প্রয়োজন?
A celebrated people lose dignity upon a closer view.
তুমি কেমন মানুষ বোনাপার্ট?



অন লাইনে নেপোলিয়নের এই উক্তিটি পড়ে আমি রীতিমতো স্তব্দ হয়ে গেলাম-Women are nothing but machines for producing children. ফরাসী সেই বীর পুঙ্গবটি তা হলে মনে করতেন যে-নারী কেবলই একটি সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র! আশ্চর্য! অথচ, ইতিহাস,ধর্ম, রাজনীতি এবং অন্যান্য বিষয়ে নেপোলিয়নের ধারনা যুগের তুলনায় কত অগ্রসর। অথচ, নারীভাবনায় বীর পুঙ্গবটি কী রকম সীমাবদ্ধ দেখুন! ছিঃ, পুরুষতন্ত্র একেই বলে।
Women are nothing but machines for producing children.
তাই স্যার?
একুশ শতক প্রশ্নের তীর ছুঁড়ল নেপোলিয়নের দিকে।
Imagination rules the world. এই কথাটা বলায় লোকটার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছিল তখন। এখন সে শ্রদ্ধাবোধ কপূর্বেরর মত উবে গেল। সঙ্গীত সম্বন্ধেও নেপোলিয়ন এক তুমুল মন্তব্য করেছিলেন:Music is the voice that tells us that the human race is greater than it knows. যে কারণে নেপোলিয়ন অন্তত সঙ্গীতভাবনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কনফুসিয়াসের সমকক্ষ। অথচ, নারীকে ‘কেবলই সন্তান উৎপাদনের মেশিন’ ভাবার পর নেপোলিয়নের ওপর আর শ্রদ্ধা রাখা যায় কি? তবে নারীকে যে নেপোলিয়ন ঠিক ঘৃনা করতে তা নয়। সন্তানের জীবনে মায়েদের ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তা ছাড়া খুব কাছ থেকে একটা হতদরিদ্র মেয়ের অসহায় অবস্থা অনুভব করেছিলেন নেপোলিয়ন। তরুণ বয়েসে। কথাটা আমি একেবারেই বানিয়ে বলছি না- বহু আগে নেপোলিয়নের একটা জীবনীতে কথাটা আমি পড়েছিলাম। যে দিন প্রথম কর্সিকা থেকে প্যারী নগরে এলেন নেপোলিয়ন-সেদিনকার কথা- শীত। ঝিরি ঝিরি তুষার পড়ছিল। সন্ধ্যা উতরে গেছে অনেকক্ষণ। রাস্তায় পাশে পার্কের রেলিং ঘেঁষে হাঁটছিল তরুণ নেপোলিয়ন। চোখ শহরের রাস্তায়, ঘোড়াগাড়ি, ম্লান পথবাতি, দু-একটা মানুষ ও বাড়িঘরের দেওয়ালের ওপর। ‘এ শহরটা আমাকে জয় করতে হবে।’ নেপোলিয়ন শ্বাস টানল। হঠাৎ চোখ গেল পার্কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের ওপর-বেশভূষাই বলে দেয় মেয়েটির পেশা। খদ্দেরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি? কেমন মনে হল- মেয়েটা ক্ষুধার্ত, না খেয়ে আছে। নেপোলিয়নের বুকটা টনটন করে ওঠে। শীতের রাত, তুষার ঝরছে, মেয়েটি খদ্দের পাবে কি না সন্দেহ। এদের জীবন এমন অনিশ্চিত? পকেটে হাত ঢোকাল। আমার কাছে তো হাতে গোনা টাকা। যা হোক। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ ঝেড়ে মেয়েটির দিকে পা বাড়াল নেপোলিয়ন।
সেই একই মানুষ কীভাবে বলে-Women are nothing but machines for producing children?
এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?
নেপোলিয়কে আমরা মূলত যোদ্ধা হিসেবেই জানি। অথচ, তিনি বিশ্বাস করতেন- War is the business of barbarians.
এ কেমন মানুষ বোনাপার্ট?
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৮:২৮
২৩টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×