somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাহ আবদুল করিম: বঙ্গীয় ভাবসাধনার ধারাবাহিকতায়।

২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৩:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শাহ আবদুল করিম। লোকে বলে বাউল সম্রাট। আমি বলি-করিম এমন একজন মানুষ যিনি বাংলার ভাব বাংলার প্রকাশের বাংলার লোকজ সঙ্গীতের ধারাকে আত্মস্থ করেছেন অনায়াসে; অনায়াসে ভাটি অঞ্চলের সুখদুঃখ তুলে এনেছেন গানে। নারীপুরুষের মনের কথা ছোট ছোট বাক্যে প্রকাশ করেছেন আকর্ষনীয় সুরে । আমার সবচে ভালো লাগছে এই ভেবে যে- বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম করিমের বিদগ্ধ আত্মাটির সন্ধান পেয়ে গেছে। করিমের চিন্তার যে একটি কল্যাণকর দিক রয়েছে- সেটিও নতুন প্রজন্ম বুঝে গিয়েছে। আমার আত্মতৃপ্তি এখানেই। এখন প্রয়োজন করিমকে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের ধারার সঙ্গে গ্রহিত করা।

লালন যে নারীবাদী ছিলেন-তা যেমন তাঁর গান শুনলে বোঝা যায়, তেমনি লালনবিষয় ফরহাদ মজহার-এর লেখাগুলি পড়লেই বোঝা যায়। তানভীর মোকাম্মেল-এর ‘লালন’ ছবির লালনের সেই বিখ্যাত সংলাপটি আজও কানে বাজে- ‘নারী হও, নারী ভজ।’ কী অসাধারন উপদেশ। কিন্তু, এই কথার কী মানে? মানে- নারীর অনুভূতি পুরুষের হৃদয়ে সঞ্চালিত হলেই তবে জগতে শান্তি আর কল্যাণ প্রতিষ্ঠা হবে। নারী জন্মদানের ব্যথা সহ্য করতে সম্মত বলেই জগৎ ও জীবের প্রতি তার থাকে অপার করুণা। যে কারণে, বুদ্ধ ও খ্রিস্টকে তত্ত্বজ্ঞানীর নারী বলেই বোধ হতে পারে। খ্রিস্ট নারীর প্রতি পাথর ছুঁড়তে দেননি। আর, প্রাচীন বৈশালী-শ্রাবস্তীর যৌনকর্মীরা সকালে ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরের বদলে বুদ্ধের নাম নিতেন।
তা হলে কে নারী নয়? তার ব্যাখ্যার আর কী প্রয়োজন। একুশ শতক সে নিগূঢ় রহস্যের উদ্ঘাটন করতে চলেছে বলেই মনে হয়।
এখন প্রশ্ন এই - লালন কেন নারীবাদী? লালন নারীবাদী-যেহেতু বাংলা মাতৃতান্ত্রিক। তার মানে বাংলা মাতৃতান্ত্রি বলেই লালনও নারীবাদী। বাংলার অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে বাংলা ক্রমশ মাতৃতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। যে কারণে, সেই অস্টম শতকেই নারীবাদী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগন বলছেন-

এস জপহোমে মন্ডল কম্মে
অনুদিন আচ্ছসি বাহিউ ধম্মে।
তো বিনু তরুণি নিরন্তর ণেহে
বোধি কি লব্ ভই প্রণ বি দেহেঁ।

কী এই সান্ধ্যভাষার মানে? মানে-মিছিমিছি ধর্মের অন্ধ অনুকরণ করে কী লাভ। (অনুদিন আচ্ছসি বাহিউ ধম্মে।= সারাদিন (অনুদিন) বাহ্যিক ধর্মে আছিস।) বরং মেয়েদের নিরন্তর স্নেহ লাভ করে আলোকিত হই। লক্ষ্য করুন-স্নেহ, কাম নয়। এইই বাংলার সাধনা। বড় কঠিন; কঠিন ও নিস্কাম।
অস্টম শতকের পর দশম শতক। দশম শতক ছিল অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের কাল। অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন বৌদ্ধ। তবে বৌদ্ধ তান্ত্রিক। কথাটা সামান্য বোঝার দরকার আছে। উত্তর ভারতের বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুন বললেন-সব কিছুর উৎপত্তি শূন্য থেকে। বাংলার (এখনকার মুন্সিগঞ্জের) বৌদ্ধ দার্শনিকেরা বললেন-সব কিছুর উৎপত্তি বজ্র থেকে। বজ্র নারীরই গুণ। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে-

বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি- সে কি সহজ গান।

এই কবিতায় সবার অলখে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বর বলছেন-অর্ধনারীশ্বর। বা, নারীরই ঈশ্বর। লালন অন্যভাবে বলেছেন-

পুরুষ পরওয়ারদিগার
অঙ্গে ছিল প্রকৃতি তার
প্রকৃতি প্রপিতি আর সংসার
সৃষ্টি সবজনা।


এমনতরো উক্তি করতে বাংলার মনিষার কি বুক কাঁপে না? না। এবং একুশ শতক এ সকল নিগূঢ় রহস্যের উদ্ঘাটন করতে চলেছে। যা হোক। বৌদ্ধ দার্শনিকগন নারীবাদী হওয়ার কারণেই বাংলায় মধ্যযুগে তন্ত্রের উদ্ভব হল। তন্ত্র জিনিসটা আবার নারীর ভজনা না করে হয় না। যে কারণে বলা হয়েছে- সব কিছুর উৎপত্তি বজ্র থেকে।
দশম শতবের পর চতুদর্শ শতক। চতুদর্শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেব ভক্তি গানে গানে ভরিয়ে তুললেন বাংলা । তাঁর বিখ্যাত উক্তি-‘আমার অন্তরে রাধা বহিরঙ্গে কৃষ্ণ।’ কে কোথায় ভেবেছে এমন? রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর যেমন নারী, তেমনি পুরুষ চৈতন্যের দেহের ভিতরে নারীরপ রাধা বাস করেন। ফলে, নারীর অনুভূতি পুরুষের হৃদয়ে সঞ্চালিত হল ফলে জগতে শান্তি আর কল্যাণ প্রতিষ্ঠা হল।
(কেননা, নারী জন্মদানের ব্যথা সহ্য করতে সম্মত বলেই জগৎ ও জীবের প্রতি তার থাকে অপার করুণা।) এমন চিন্তা বাংলাতেই সম্ভব। চিন্তাটা শুরু করেছিলেন অস্টম শতকের নারীবাদী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগন-যারা আলোকিত হওয়ার জন্য নারীর স্নেহ
প্রার্থনা করেছিলেন।
শ্রীচৈতন্যের পর লালন। তাঁর কথা আর কি বলব? শুধু এইটুকু বলি, আধুনিক সময়ে, অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি লালনই প্রথম লিখলেন বিশ্বের নারীবাদী গান-

নিগূঢ় বিচারে সত্য গেল যে জানা
মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা।

পুরুষ পরওয়ারদিগার
অঙ্গে ছিল প্রকৃতি তার
প্রকৃতি প্রপিতি আর সংসার
সৃষ্টি সবজনা।

নিগূঢ় খবর নাহি জেনে
কেবা সে মায়েরে চেনে
যাহার ভার দীন দুনিয়ায়
দিলেন রাব্বানা।

ডিম্বুর মধ্যে কেবা ছিল
বাহির হইয়া কারে দেখিল
লালন কয় সে ভেদ যে পেল
ঘুচল দিনকানা।
নিগূঢ় বিচারে সত্য গেল যে জানা
মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা।



শুরুতে বলছিলাম। শাহ আবদুল করিম লালনের সুযোগ্য শিষ্য। কেন? কারণ-শাহ্ আবদুল করিম তাঁর স্ত্রীকে মনে করতেন মুর্শিদ। ‘মুর্শিদ’ শব্দটার অর্থ-নেতা (আধ্যাত্মিক অর্থে অবশ্য)। শাহ আবদুল করিমের স্ত্রীর নাম ছিল আবতাবুন্নেছা। করিম আদর করে ডাকতেন: 'সরলা।'
স্ত্রীকে ‘মুর্শিদ’ মনে করাটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষিত আধুনিক পুরুষও এক্ষেত্রে পিছিয়ে। কেন? ঈশ্বর পুরুষ বলেই?। করিম কেন পারলেন? করিম বাউল বলেই পারলেন। বাউল বাংলার ধর্ম- বাংলা মাতৃতান্ত্রিক বলেই।
আর, এই কথাগুরি বলাও সহজ না-লালন যা অনায়াসে লিখেছেন।

নিগূঢ় খবর নাহি জেনে
কেবা সে মায়েরে চেনে,
যাহার ভার দীন দুনিয়ায়
দিলেন রাব্বানা।

শাহ আবদুল করিম লালনের সুযোগ্য শিষ্য বলেই- বলতে পারলেন- সরলা আমার মুর্শিদ। এবং, একুশ শতক আরও আরও নিগূঢ় রহস্যের উদ্ঘাটন করতে চলেছে বলেই মনে হয়।



১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের ধিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্মেছিলেন শাহ আবদুল করিম।
ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ শাহ্ আবদুল করিমের ৯৪ তম জন্মদিন।
ভক্তগন প্রদীপ কোথায়?
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৮:২৬
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×