somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: জীবনের রঙিন চাদর

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পেট্রোলের পোড়া গন্ধ ছাপিয়ে আতরের কড়া গন্ধ পেল রনি। তখন কে একজন, মাথায় পাগড়ী, লম্বা দাড়িওলা, জোব্বা পরা, দীর্ঘকায়, পাশে এসে বসেছে। আতরের গন্ধটা সেখান থেকেই আসছিল। কিছুদিন হল আতরের গন্ধ আর ভালো লাগে না রনির- বমি পায়। বাসে উঠলেও বমি পায় রনির। তবে ও জানে এখন ওর বমি হবে না। বাসটা হু হু করে ছুটছে। কোন্ দিকে কে জানে। রনি জানতেও চায় না। মধ্য জানুয়ারির শীতের রাত। জানালা বন্ধ। দশটার মতো বাজে বোধহয়। ওপরে ম্লান আলোর লাইট জ্বলে আছে। আতরের গন্ধটার সঙ্গে পোড়া পেট্রলের গন্ধে সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
বাবজান। কোনদিকে যান? জোব্বা পরা লোকটা জিজ্ঞেস করল। গম্ভীর মিষ্টি কন্ঠস্বর।
রনি চুপ করে থাকল। এই বুড়া লোকগুলি যে কী! এত কিউরিয়াস। খালি পরের ব্যাপারে নাক গলায়। অদ্ভুত একটা দেশ! এ লেবেল দিয়েই স্টেটস চলে যাবে রনি।
জোব্বা পরা লোকটা বলল, আমি নামব ঘিওর বাপজান। কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে আমার মোকাম।
শিট! আমি এসব কিছুই জানতে চাই না। প্লিজ লিভ মি অ্যালোন। রনি মনে মনে বলল। পাগড়ী পরা লোকটাকে ইগনোর করার চেস্টা করে। অল্প অল্প খিদে টের পাচ্ছিল ও। অন্যদিন নটা সাড়ে নটার দিকে খেয়ে নেয় ও। আজ সন্ধ্যার পর পরই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তারপর অনেকক্ষণ রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করল। তারপর বাসে উঠল।
কেক খান বাপজান। নেন। দরবেশ লোকটা বলল। একটা প্লাস্টিকের বক্স বাড়িয়ে দিয়েছে।
না। আমি কেক খাব না। কেকের সঙ্গে কী মিশিয়ে দেবে। পরক্ষণেই ভাবল-আমি মরে গেলে কী। আমার তো মরে যাওয়াই ভালো। কথাটা ভাবতেই নুজহাতের মুখটা মনে পড়ল। ইফ আই ডাই-নুজহাত কষ্ট পাবে। একা হয়ে যাবে নুজহাত- ওর ফ্যামেলিটা ডিসটার্বড। আঙ্কেল-আন্টির বনিবনা হয় না। সারাক্ষণ ঝগড়া। একে অন্যকে ডির্ভোসের থ্রেট দেয়। এসবের মধ্যেই রনিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে নুজহাতের ।
পাগড়ী পরা লোকটা বলল, আরে খান বাবা । মুশকিল হইব না, আমি ফকির মানুষ বাবা, লোকে কয় শাহবাবা। তা আপনের কী নাম বাবাজ?
আরিফুর রহমান রনি।
বেশ, বেশ। নেন কেক খান, রনিবাবা ।
পেটের ভিতরে তখন থেকে বলক উঠছিল। বাস কখন থামে কে জানে। একেবারে খালি পেটে থাকলে বমিও হতে পারে। রনি হাত বাড়িয়ে প্লাস্টিকের বক্সটা নিল। আশ্চর্য! ব্ল্যাক ফরেস্ট! বেইলি রোড-মানে, ঢাকার পশ দোকান ছাড়া পাওয়া যায় না। একজন ফকিরের কাছে এই রকম কস্টলি কেক! ও টের পায় আতরের গন্ধটা আরও ঘন হয়ে উঠেছে । আর, ঠিক তখনই বাসটা ব্রেক কষল। হর্নের আওয়াজ। পেট্রোলের পোড়া গন্ধ । কেক-এ কামড় দেয় রনি।
বাসটা প্রায় ফাঁকা। ওরা পিছনের দিকে বসেছে। শাহবাবা নীচুস্বরে গুনগুন করে গান ধরলেন- ভয় পেয়ে জন্মবিধি/সে পথে না যাও যদি/হবে না সাধন সিদ্ধি/তা শুনে মন ঝুরে/ও লালন বলে যা কর হে/ থাকতে হবে পথ ধরে। গানের কথাগুলি সবটা না-বুঝলেও ‘লালন’ শব্দটা কানে খট করে বাজল রনির। লালন শব্দটা ওর পরিচিত। সুফি মিউজিশিয়ান। মিস্টিক জনরা।
শাহবাবা বললেন, কালীগঙ্গা নদীর ধারে আমার মোকাম। চল, বেড়াইবা।
কোথায়? রনি অবাক।
আমার কালীগঙ্গার মোকামে।
রনি আপত্তি করল না। ওতো পথেই নেমেছে। ও তো আর কোনওদিনই বাড়ি ফিরে যাবে না। আজ থেকে ও ওর কনট্রোভার্সিয়াল পরিবারের কেউ না।
শাহবাবা খুশি হয়ে বললেন, আল্লার কালা ঝুলিতে আরও অনেক রঙিলা জগৎ আছে রনিবাবা-একটা দুইটা না, বেশুমার। যা দেখতেছ-এইটাই সব না।
রনি থতমত খেল। ওর বুক ধড়ফড় করে। বাস চলছে। বাসের ভিতরে পোড়া পেট্রলের গন্ধ ছাপিয়ে আতরের গন্ধ ভারী হয়ে ওঠে।
আর রনিবাবা, তোমার একখান নতুন নাম দিব ভাবতেছি।
নাম? কী।
কৃষ্ণমোহাম্মদ।
কৃষ্ণমোহাম্মদ? রনি থতমত খেল।



দরজার দিকে পা দিয়ে পাথরের মেঝের ওপর টানটান হয়ে শুয়েছিল শুভ্র তুষার । ঘরের জানালাগুলো বন্ধ। দরজাটা খোলা। বাইরের চাতালে মধ্য জানুয়ারির ঘন জ্যোস্না। মাঝে মাঝে মধ্যরাত্রির হিম বাতাসে নাড়কেল পাতারা সরসর করে ওঠে। ঘরময় ঈষৎ অন্ধকার, সেই অন্ধকারে আতরের গন্ধ। শুভ্র তুষার শীত টের পায়। শীত পাথরের ভেদ করে উঠছে -লেদারের জ্যাকেট, পুলওভার, সার্ট, গেঞ্জি ফুঁড়ে শ্যামলা ত্বকে দাঁত বসাচ্ছে। পিঠের নিচেটা অবশ অবশ লাগে। জিন্সের প্যান্টটা ভিজে ভিজে। জুতা বাইরে খুলে এসেছে। (এ ঘরে কেউই জুতা নিয়ে ঢুকে না) মোজা থেকে বিশ্রী গন্ধ ছড়িয়ে আতরের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে। সে উৎকট গন্ধটা ভুলে যেতেই কান পাতল শুভ্র তুষার। শাহবাবার মোকামটি কালিগঙ্গার এত কাছে যে জলের পাড়ের ক্ষীণ ছলাৎ আওয়াজও কানে আসে তার। মাঝরাতের শীতনদীটির কোষা নৌকার বৈঠার আওয়াজ অবধি স্পস্ট শোনা যায়। অথবা, এসবই নিছক স্বপ্ন। কালীগঙ্গা তীরে তীরে নাড়কেল গাছ। সে সমস্ত নাড়কেল গাছগুলি অবশ্য বাস্তব। মধ্যরাত্রির শীত শীত বাতাস সে গাছগুলির পাতা এলোমেলো করে দিলে সরসর শব্দ উঠছিল। এবং সেই সরসর শব্দে আবছা অন্ধকারে মৌরির ফরসা মুখটা ভেসে উঠল। ওর সমস্ত অস্তিত্ব নাড়া খেল। সিগারেট খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা হল শুভ্র তুষারের। না, তা সম্ভব না। এ ঘরে কেউ সিগারেট খায় না। সিগারেট ধরালে জ্বিনের থাপ্পড় খেতে হবে। একবার সেতু মাজি ও সখিনা তাজ এ ঘরে সিগারেট ধরাতেই জিনের থাপ্পড় খেয়েছিল। শাহবাবার এই ঘরে জ্বিন আছে ঠিকই। জ্বিনটা কখনও কখনও সাপের রুপ ধরে। সেই সাপটা এরই মধ্যে একবার এসে ঘুরে গেছে । ওটা দরজা দিয়েই ঢুকেছিল নাকি অন্য কোনও খান থেকে এসেছিল ঠিক ঠিক ঠাওর করতে পারেনি শুভ্র তুষার। আগেও দেখেছে সাপটা- দিনের বেলায়। সবজে রঙের একটা বালুবোড়া; জুবেরী সাপ চেনে, ওই বলল। আদর করে শাহবাবা বালুবোড়াটির নাম রেখেছেন ‘জালাল’। একবার ঝকঝকে রোদে সবাই চাতালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিল। তখন মসজিদের পিছন থেকে এঁকেবেঁকে ‘জালাল’ এল। শূন্যতা ঋদ্ধির কী লাফ। সখিনা তাজ ও ছিল। তবে সাপ নিয়ে ওর ইনিবিশনস্ নেই বলেই মনে হল। ঋজু বিল্লাহ, চারুকলার তরুণ প্রভাষক, থ্রি মেগার সেলফোনে জালালের ছবিটা তুলে নিয়েছিল। জুবেরী বসেছিল গিটার নিয়ে। ও বালুবেড়া দেখে নির্বিকারই ছিল। দক্ষিণের বাঁশঝাড়ের দিকে চলে গিয়েছিল জালাল। চাতালে কড়–ই গাছের নিচে একটা বড় ডেকচিতে পানি চড়িয়েছেন শাহবাবা । পাঞ্জাবি স্টাইলে খিচুরি রেঁধে খাওয়াবেন। চাতাল থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে কালীগঙ্গায়। পুরনো দিনের ঘাট, তার পুরনো ইট। কালে কালে ক্ষয়ে গিয়েছে। এককালে জমজমাট মোকাম ছিল; বজরা নৌকা ভিড়ত। ঘাটের পাশে একটা শিরিষ গাছ। দক্ষিণে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ে কবর। লোকে বলে তল্লা শার কবর। মসজিদটা উত্তরে। খেতে বসে সখিনা তাজ বলে, শাহবাবা, মোকাম মানে তো গঞ্জ, হাট। তাই না? শাহবাবা বললেন, হ, মা। এখন তোমাদের নিয়া আমি কালীগঙ্গার মোকামে হাট বসাইছি। নিকুঞ্জু কইতে পার। কিংবা, কুঞ্জ।
বছর দুয়েক আগে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে শাহবাবার সঙ্গে শুভ্র তুষারদের পরিচয় । সময়টা সন্ধ্যা। সেতু মাজির বইয়ের দোকানে বসেছিল সব। সখিনা তাজ, ঋজু বিল্লাহ, নাঈম রিজভী। শুভ্র তুষারের ‘পূর্বাহ্ণ’ পত্রিকার জন্য লেখা ঋজু বিল্লাহর একটা কবিতার সূত্র ধরে ‘তাসাউফ’ শব্দের মানে নিয়ে দারুণ তর্ক জমে উঠেছিল । সেতু মাজির ‘গ্রন্থকীট’-এর ঠিক উল্টোদিকে রঞ্জুর খানের পাঞ্জাবির দোকান:‘পরান”। সবুজ পাগড়ী আর কালো পাঞ্জাবি পরা দীর্ঘদেহী ওলি ওলি দেখতে একজন তখন ‘পরান’-এ পাঞ্জাবি দেখছিলেন।
সখিনা তাজ তখন নাঈম রিজভীকে বলল, নাঈম, আপনি যান তো ওই দরবেশকে তাসাউফ শব্দের মানে জিজ্ঞেস করে আসেন। নাঈম রিজভী যায়। যা বলার বলে। শাহবাবা তারপর নিজেই এসে তাসাউফ শব্দের মানে বুঝিয়ে দিলেন। তারপর কথায় কথায় আড্ডা জমে উঠল। শাহবাবা আগে আর্মিতে ছিলেন। নাইনটিন সেভেনটি থ্রি-র এক মধ্যরাত্রিতে স্বপ্ন দেখার পর থেকেই ওলি হওয়ার সাধনা করছেন। বাংলা ছাড়াও অনর্গল ইংরেজি হিন্দি উর্দু বলতে পারঙ্গম শাহবাবা। শাহবাগ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জ্ঞানপীঠ- কাজেই তুমুল জ্ঞানবান শাহবাবার সঙ্গে কবিদের সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। শাহবাবা তাঁর কাঁধের ঝুলিটি থেকে শুকনো খেজুর কাজু বাদাম ক্যাডবেরি চকোলেট মায় ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক অবধি বার করে সবাই কে দেদারসে বিলিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন। কথার পর গান। লালনের গান। শূন্যতা ঋদ্ধিই ধরল- যে পথে সাঁই চলে ফিরে/ও তার খবর কে করে?/যে পথে আছে সদায়/ভীষণ কালনাগিনীর ভয়/ওমনি উঠে ছোঁ মারে। গান শেষে সখিনা তাজ ধরে বসল: জ্বিন দেখব। শাহবাবা বললেন, আচ্ছা, তয় এইখানে না। আমার মোকামে আইস। তারপর শূন্যতা ঋদ্ধির গানের উচ্চারণ মানে ও তালের ভুল ধরিয়ে দিয়ে ঘিওরের কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে মোকামের ঠিকানা দিলেন। তারপর থেকে শুভ্র তুষারদের কালীগঙ্গার মোকামে আসা শুরু। মৌরি আজ আযম ইশতিয়াকের গুলশানের ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠল বলে আজ শুভ্র তুষার শাহবাবার কালীগঙ্গার মোকামে একাই এসেছে।। মৌরির সঙ্গে গত এক বছর ধরে খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছিল । প্রায় দিনই -আমি কী যে ভুল করলাম, আমি তোমাকে ডির্ভোস দিব। ইত্যাদি। একটা রিয়েল স্টেট ফার্মে উচুঁদরের চাকরি করে মৌরি। আইবিএর তুখোর ছাত্রী ছিল। ২০০৮ এর গোড়ায় গেটওয়ে পোপার্টিজ-এর মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব পেয়েছে । স্যালারি আগের তুলনায় থ্রি টাইমস বেড়েছে- প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। সংসার আর টানবে না মৌরি-২০০৮ এর মাঝামাঝি সাফ জানিয়ে দিয়েছিল । খিলগাঁওয়ে আর থাকবে না। ধানমন্ডির কাছে ফ্ল্যাট ভাড়া নেবে। অফিসটা তা হলে কাছে হয়। গত বছর অক্টোবরে মাঝামাঝি বাংলা মোটরের মোড়ে মৌরিকে একটা নীল রঙের ঝকঝকে জিপে বসে থাকতে দেখেছে শুভ্র তুষার। জিপটা জ্যামে আটকে ছিল। মৌরির পাশে গেটওয়ে পোপার্টিজ-এর জি এম আজম ইশতিয়াক। লোকটা জুবেরীর সঙ্গে পড়ত। বত্রিশেই লোকটার মাথায় টাক গজালেও লোকটার ব্যাঙ্কব্যালেন্স নাকি প্রায় দেড়শ কোটি টাকা। যা হয়-জুবেরী বলে, উঠতি মডেলদের মাসে দু’বার নিয়ে পেনাং-কাটমুন্ডু যায় আজম। মৌরির পাশে পাজেরোতে আজম ইশতিয়াককে দেখে তুষার শুভ্র মুহূর্তে জমে গিয়েছিল। যে ও এমন এক পরম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল দীর্ঘদিন ধরে। প্রকট দুঃখ আর অভিমানে ওর তামাটে শরীর পলকে পুড়ে গিয়েছিল সেদিনের অক্টোবরের রোদে। আযম ইশতিয়াকের কাছে ভালোবাসার মূল্য নেই-যেদিন মৌরি এই সত্যটা আবিস্কার করবে-ততদিনে মৌরিও মদ খেতে শিখে যাবে। লোকটা ওকে ভালো না বাসলে মৌরি কাঁধও ঝাঁকাবে না। মদের ছোবলে ওর অবশ নার্ভ ওকে কষ্টও দেবে না। মৌরি তো কখনও অপরিচিত পথে হাঁটতে শেখেনি। নতুন কাউকে খুঁজবে-যে শুভ্র তুষারের চেয়ে অনেকই ওপরের স্তরের, ঝকঝকে, অমলিন। যে লালনের গানের মানে খোঁজে না। ভ্রুনটা জমাট বাধার আগেই মৌরি চলে যাবে-এই দুঃখ। লোকে আঙুল তুলে বলবে নপুংসক কবি- এই কষ্ট। শুভ্র তুষার বছর দেড়েক দৈনিক সমকাল-এ ছিল। হঠাৎই সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মীসঙ্কোচনের পর ২০০৭ সালে জুনের পর থেকে এখন বেকার।



খোলা দরজার বাইরে ২০০৯ সালের মধ্য জানুয়ারির জ্যোস্না। জ্যোস্নায় একটি দীর্ঘ ছায়া ভেসে ওঠে । শাহবাবা? শুভ্র তুষার মুহূর্তেই উঠে দাঁড়াল। শাহবাবার পাশে কে? অল্পবয়েসি ছেলে বলে মনে হল। উবু হয়ে জুতা খুলছে। ছেলেটি কে?
তুষারে আসছো নাকি?
জ্বী। বাবা। ঘরটায় আতরের গন্ধ গাঢ় হল।
ভালো। এই দেখ, আউক্কা নাদান মেহেমান নিয়া আসলাম। বলে কাঁধের ঝুলিটা কাঁধ থেকে পাশে নামিয়ে রাখলেন। বাতি জ্বালাও নাই তুষার? বলে শাহবাবা দরজার পাশে উবু হয়ে বসলেন।
নাহ্, অন্ধকারেই ভাল লাগছিল।
মাঝে মইধ্যে আমারও আন্ধার ভালো লাগে। কব্বরের অন্ধারের আগাম পিপারেশন হইয়া যায়। তয় জালালে আইছিল নাকি তুষার?
মনে হয় ...হ্যাঁ।
হারিকেন জ্বালাতে জ্বালাতে শাহবাবা বললেন, জালালে দুধ চায়। শীতকালে তাগো খড়া লাগে।
কথাট শুনে শুভ্র তুষারের শরীর শিরশির করে ওঠে। হারিকেনের আলোয় অন্ধকার তেমন দূর হল না। শাহবাবার ‘ আউক্কা নাদান’ মেহমানের দিকে তাকালো শুভ্র তুষার। পনেরো ষোল বছরের বেশি বয়েস হবে না ছেলেটার। কালো জ্যাকেট পরেছে। প্যান্টের রংটা বোঝা গেল না। গায়ের রংটাও। তবে শ্যামলাই মনে হল। চুল উশখোখুশকো। চোখে চশমা। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
তোমরা কথা কও। আমি অজু কইরা আসি। দেখি সাপের ছাওরে পাই নাকি। বলে পাশে একটা পিঁড়িটা দেখিয়ে বললেন, রনি তুমি বস? এ হইল শুভ্র তুষার । মস্ত বড় কবি। শাহবাগের তুরুপ। ‘পূর্বাহ্ণ’ পত্রিকার এডিটর। রনি বাড়ি থিকা পালাইসে তুষার। আমিও একবার পলায়ছিলাম, পঞ্চাশ বছর আগে -আব্বায় তখন রংপুর ছিল। বাঙালির পোলা নাদান বয়েসে সবাই একবার পালায়। কথাটা ঠিক। শিবালয় থাকার সময় শুভ্র তুষারও একবার পালিয়েছিল।
ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন শাহবাবা। শুভ্র তুষার জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় পড় রনি? মাস্টারমাইন্ড। এবার এ-লেভেল দিব। রনির বাবা যে রনিকে প্রথমে আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছিল সে কথা অবশ্য রনি বলল না । শাহবাবার সঙ্গে কোথায় পরিচয়? বাসে। একা কই যাচ্ছিলে? জানি না। বাসে উঠলাম। আমিও ছেলেবেলায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে বাসেই উঠেছিলাম। নামলাম, আরিচা ঘাটে। সে আরেক কাহিনী। অন্যদিন বলব। তা তোমার বাড়ি ছেড়ে পালাবার কী কারণ? রনি ক্ষাণিক ক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলল, বাসায় আমার ভালো লাগে না। শুভ্র তুষার কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কেন? রনি আবারও ক্ষাণিকক্ষণ চুপ করে থাকে। শুভ্র তুষার বলল, প্রোবলেমটা আমাকে বলতে পার। আই অ্যাম আ পোয়েট। এনি ওয়ান কেন ট্রাস্ট আ পোয়েট। আমার আব্বা আমার আব্বা ...থেমে গেল রনি। তোমার আব্বার কী নাম? রনি নাম বলল। শুভ্র তুষার যা বোঝার বুঝল। সেও শাহবাগের অন্যদের মত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে স্বোচ্চার । রনি বলল, বন্ধুদের সামনে লজ্জা করে। সবাই জানে সেভেনটি ওয়ানে কী হয়েছিল। মিডিয়া এখন সো স্ট্রং- শুভ্র তুষার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ। আগে যা অল্প ক’জন জানত, এখন মিডিয়ার কল্যাণে সবাই সবই জেনে যাচ্ছে। ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার আজ হোক, কাল হোক, হবেই। কাতর স্বরে রনি বলল, আমার জন্ম সেভেনটি ওয়ানের আগে তুষার ভাই। আই নো। ইউ মাস্ট নট বি ওরিড । কথাটা যেন শুভ্র তুষার নিজেকেই বলল। সহসা মৌরির মুখটা মনে পড়ে গেল তার। আই বি এ-তে পড়ত মৌরি; শুভ্র তুষার পাবলিক অ্যাড-এ। পরীক্ষা আগে আগে জ্বর হত। শুভ্র তুষারের চেয়ে মৌরি এগিয়ে গিয়েছিল। তখন, শুভ্র তুষার নিজেকে বলত, ইউ মাস্ট নট বি ওরিড । মাঝে মাঝে মধুর ক্যান্টিনে বসত ওরা দুজন । কখনও রেজিস্টার বিল্ডিং-এর মল-এ। মৌরি বলত, শুভ্র, আমরা কিন্তু এখন প্রবলেমগুলো ক্যাটাগোরাইজ করতে পারি। কাজেই, আমাদের সুখি হওয়াই উচিত। আমি কিছু চাই না। অনলি আই নিড ইয়োর ট্রাস্ট। সেই মৌরি আজ আজম ইশতিয়াকের কেপ্ট। ইউ মাস্ট নট বি ওরিড শুভ্র তুষার। তোমার রয়েছে জীবনের রঙিন চাদর।
রনি বলল, কিন্তু, আমার আমার আব্বা ... আমার আব্বা ...
শুভ্র তুষার শীতল কন্ঠে বলল, এই ঘরে সাপ আছে রনি। সবুজ রঙের বালুবোড়া।
মানে? রনি এদিকওদিক তাকায়।
শুভ্র তুষার তীক্ষ্ম স্বরে বলল, মানে তুমি একা নও। আর আজ তুমি বাসে জীবনের রঙিন চাদর পেয়ে গেছ। আর মা-বাবা? মা-বাপ কিছু না। এই জগতে আমরা সবাই লোনলি ট্রাভেলার। কারও সঙ্গে দেখা হবে, কারও সঙ্গে না। তোমার বাবার অপরাধের জন্য কেউ তোমাকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবে না রনি যদি তুমি তোমার বাবার পথে না হাঁটো। শোন, রনি। শাহবাবা আর্মিতে ছিলেন। একদিন কী হল জান। এরকম শীতের মাঝরাত। শাহবাবা ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। অন্ধকার ঘরে আতরের গন্ধ। শরীর ঘেমে উঠল। ঘরের অন্ধকারে এক হোলি ভয়েস। সেই হোলি ভয়েস বললেন, চাকরি ছেড়ে পথে পথে ঘুরে ওলিগিরি। সেটা সেভেনটি থ্রি। শাহবাবা তাই করলেন। তার পর অনেক পথ ঘুরে এই কালীগঙ্গার মোকামে। তোমার বাবারা হার্ডকোর শরিয়তপন্থি হওয়ায় পীর-ফকির অপছন্দ করেন। সাদা রঙের চাদর যেমন সব কাছে লাগে না, চাদর রঙীন করার দরকার হয়, পীরফকিরা তেমনি- জীবনের রঙীন চাদর।
কথাটার মানে আবছা বুঝল রনি। তার কেবল মনে পড়ল বাসের ভিতরে তখন খিদে পেয়েছিল। শাহবাবা ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক খেতে দিলেন। একজন ফকিরের কাছে এই রকম কস্টলি কেক! ঠিক তখনই আতরের গন্ধটা আরও ঘন হয়ে উঠেছিল।
অজু সেরে শাহবাবা ঘরে ঢুললেন। মায়েরে ফোন কর রনি। তোমার মায়ে টেনসন করতেছে।
আমি মোবাইল আনি নাই আঙ্কেল।
তুষারমিঞা। তুমি রনিরে তুমার মোবাইলডা দেও।
চার্জ আছে কি না কে জানে- দেখি। বলে তুষার শুভ্র কোটের পকেট থেকে মোটরলাটা বার করল।
হ্যালো, আম্মা?...কাল সকালে চলে আসব। না, আমি যাব না। তোমরা যাও। না, আমি যাব না।
শাহবাবা জায়নামাজ পেতে বসলেন। বললেন, তুমি এতবড় দুঃখ পাইলা তুষার। মাইয়াডারে একবার আনলা না মোকামে। মাইয়াডা মোকামে আইলে তুমি আর দুক্ষু পাইতা না।
মৌরি কখনও আসতে চায় নি। শুভ্র তুষারের কন্ঠে বিষন্নতা ঝরে।
থাক। মাইয়াডা ভালা থাকব। মরণের আগে তেমন কোনও কষ্ট হইব না। বহুৎ দেশবিদেশ ঘুরব। বিদেশে মরব।
শাহবাবার কথায় শুভ্র তুষার অবাক হয় না। শাহবাবার মোরাকাবার কথা সবাই জানে। মৌরির ভবিষ্যৎ জানতেই আজ মোকামে এসেছে শুভ্র তুষার। ভবিষ্যৎ জানা হল। বিদেশে মরবে মৌরি। আর আমি বাংলা ঘাস হয়ে রব ...শুভ্র তুষার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর কথায় কথায় কখন যে রাত ফুরিয়ে যায়। ঘরে ভোরের ম্লান আলো ঢোকে। শাহবাবা উঠতে উঠতে বললেন, তুমরা এখন রওনা দাও তুষার। ঘিওর পৌঁছতে পৌঁছতে রোদ উঠে যাবে। আমি এখন মোরাকাবায় বসব। তুমি রনিরে ওগো বাসার সামানে নামায়া দিও তুষার। তারপর যেন শূন্য থেকে একটি ঠোঙা পেরে ঠোঙাটা রনিকে দিয়ে বললেন, রনিমিঞা এইটা ধর।
রনি উঠে দাঁড়িয়েছে। ও হাত বাড়ায়। কি এটা? ওর মুখটা দেখে মনে হল রীতিমতো থতমত খেয়েছে।
সামান্য তালমিছরি দিলাম। তোমার মায়েরে দিও।
আচ্ছা, দেব।



ঘর থেকে বেরিয়ে ওরা দুজন চাতালে এসে দাঁড়াল। শাহবাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন। চাতালে কুয়াশা আর শীত । নদী দেখা যায় না। বাঁশঝাড় দেখা যায় না। কেবল বাঁশঝাড়ের দিকে কাকের কলরব। ওরা দুজন সেদিকেই হাঁটে। একটু পর শাহবাবাও কুয়াশায় মিলিয়ে গেলেন। কুয়াশার ভোর হলেও সময়টা সুবেহ সাদিক। একটু পর শাহবাবার কন্ঠে আজান শোনা গেল । শুভ্র তুষার বলল, ফজরের ওয়াক্তে কালীগঙ্গার মোকামের মসজিদে কেউ নামাজ পড়তে আসে না রনি। জ্বিনরা ছাড়া।
রনি বলল, বলেন কী! আপনি জ্বিন দেখছেন?
মনে হয় তো দেখছি।
মনে হয় মানে?
মানেটা সময় হলে বুঝবা। তখন বললাম না- শাহবাবার ঘরে সাপ আছে। সবুজ রঙের বালুবোড়া। ওটাই জ্বিন।
রনি কী বলতে যাবে -বলল না। মধ্য জানুয়ারির ঘন কুয়াশায় বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে নুজহাতের মুখটা মনে পড়ল রনির। নুজহাত এখন কী করছে। কাল রাতে হয়তো ফোন করেছিল । না পেয়ে টেনশন করছে হয়তো। ফ্যাকাশে মুখ নুজহাতের। এই বয়েসেই মারাত্মক ফ্যামেলি প্রবলেমের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। নুজহাতের মা এয়ারহোস্টেস। বাবা ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার। বাবা-মা বেশির ভাগ সময়ই বাড়ি থাকে না। থাকলেও ঝগড়া করে। তুষার ভাই, আপনার ফোনে চার্জ আছে?
দেখ।
ওপ্রান্তে রিং বাজাল। হোয়ার আর ইউ? আমি এখন ঘিওর। ঘিওর? হ্যাঁ, ঘিওর। এক বন্ধুর বাড়ি। নুজহাত বলল, মা কাল ডিক্লেয়ার করেছে, বাবাকে ডিভোর্স দেবে। রনি বলল, নো প্রোবলেম। নুজহাত আতকে উঠল, হোয়াট! রনি বলল, উই হ্যাভ ফ্রেন্ডস নাও। বিট পাওয়ারফুল। নুজহাত বলল, হু। রনি বলল, দি বাউলস। আই হ্যাড মেট সাম অভ দেম। নুজহাত খেপে উঠে বলল, হোয়াট দ্য হেল রনি! হোয়াট দ্য বাউলস ডু ইন আওয়ার লাইফ! উই লিভ ইন আ রিয়েল ওয়াল্ড হ্যাভিং রিয়েল প্রবলেমস রনি। আমার ...আমার মা-বাবার ডির্ভোস হয়ে যাচ্ছে। রনি বলল, কুল ডাউন, প্লিজ, নুজ। দিস ওয়ার্ল্ড ইজ অ্যান ইলুশন- হেয়ার দি ইলুজারি গ্রিন কালাড স্নেইক ক্রলস। অ্যান্ড উই থিঙ্ক ইটস রিয়েল। দ্যাট ক্রিয়েটস প্রবলেম। উই নিড ইলুজারি পিপল, দি বাউলস। দি ড্রিমার। নাও, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? কথাগুলি শুনে নুজহাত চুপসে গেল। মিনমিন করে বলল, এখন আমি কি করব রনি? রনি বলল, কী আর করবে। তুমি একজন ট্যাভেলার। লোনলি ট্যাভেলার । আঙ্কেল-আন্টি একসঙ্গে থাকল কি থাকল না-দেট ডাজ নট ম্যাটার। ম্যাটার ইজ- তুমি তোমার গিভেন লাইফকে বোঝার চেষ্টা করছ কি না। আর আমার নাম রনি না নুজহাত। তা হলে? সুফি আঙ্কেল আমার নাম দিয়েন কৃষ্ণমোহাম্মদ। ও প্রান্তে নিরবতা। একটুপর নুজহাত বলল, ক্যান আই কাম টু মিট দ্য সেইজ? রনি হাসল। বলল, আমি তোমাকে পরে গিয়ে পরে এখানে নিয়ে আসব। বাই। রনি ফোনটা অফ করে শুভ্র তুষারকে ফেরত দিল। শুভ্র তুষার ফোনটা নিয়ে গুনগুন করে লালনের একটা গান ধরল। মানুষ গুরু কল্পতরু ভজ মন/ মানুষ হইয়া মানুষ ভজ/ পাবা মানুষে মানুষ রতন। শূন্যতা ঋদ্ধি লালনের এই গানটা প্রায়ই গায়। শূন্যতা ঋদ্ধি শিবালয়ের মেয়ে। আসল নাম খোদেজা আখতার। বিদ্রোহবশত নাম বদলে নিয়েছে। ছেলেবেলায় শিবালয়ে বেশ কয়েক বছর ছিল শুভ্র তুষার। বাবার বদলির চাকরি। উথলি হাই স্কুলে পড়ত শাহআলম। সে সময় রমেন বসাক বাংলা পড়াতেন। ভারি ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত রমেন স্যার। তিনিই শাহআলমকে কবিকে শুভ্র তুষারে বদলে দিয়েছিলেন। বলতেন, রাত্রি বস্তুটাকে উপলব্দি করার জন্য জীবনের একটি রাত জেগে থেকো তুষার। একদিন নগ্ন থেকো। একদিন অসামাজিক হয়ো। একদিন অধার্মিক হয়ো।
কবি শুভ্র তুষার শুভ্র এখন আরেক কিশোরকে বদলে দিচ্ছে। এই রিসাসত। চল, রনি। এদ্দুর যখন এসেছি তখন শিবালয়ের উথলি ঘুরেই যাই।
শিবালয় কোথায়? রনি অবাক।
এখান থেকে পশ্চিমে।
কার কাছে যাবেন? কে আছে ওখানে?
আমার এক বন্ধু। আশির মতন বয়েস। শিবালয়ের উথলিতে থাকেন। উথলির খুব কাছেই যমুনা। আমার সেই বন্ধুটি গত ষাট বছর ধরে অল্প অল্প করে যমুনা নদীর ইতিহাস লিখছেন। চল আমরা সেই অসমাপ্ত পান্ডুলিপি নিয়ে আসি।
যমুনা নদীর ইতিহাস লিখছেন। গ্রেট। চলেন যাই। রনি খুশি হয়ে উঠল।
শীতের শীর্ণ কালীগঙ্গা পিছনে রেখে ভোরের কুয়াশার ভিতর হাঁটতে হাঁটতে রমেন বসাকের মতন ভোরকে ব্যাখ্যা করতে থাকে রনির কাছে। রনি ভোর দেখেনি। ওর ঘরটা এসি। এখন ভোর দেখছে। এখনও রোদ উঠেনি। কুয়াশা কাটেনি। কুয়াশায় গাছগুলি ডুবে আছে। ডুবে আছে পথের দুপাশের কৃষকের ঘরদোরগুলো। রনি ভিজে ভিজে সবুজ গন্ধ পায়। আরও পরে, ঘিওর বাসষ্ট্যান্ডের লাগোয়া একটি রেস্টুরেন্টে পরোটা আর বুটের ডাল খেতে খেতে শুভ্র তুষার রনিকে বোঝাল - ধর্ম না, মূল হল ঈশ্বরবোধ। ঈশ্বরবোধ সব মানুষের ভিতরে অভিন্ন। ধর্মের বিধান সংঘাতে সৃষ্টি করে। আর, সব সময় বুকের ভিতর একটা মিষ্টিক মিষ্টিক ফিলিংস যেন থাকে। তা হলে সবুজ রঙের বালুবোড়াকে অর্থহীন মনে হবে না। কোন্ ধর্মগ্রন্থে কী বলেছে- সেসব গুরুত্বপূর্ন নয় রনি। কর্মকান্ডের কোনোই প্রয়োজন নেই। কর্মকান্ড হাস্যকর বিষয়। তার বদলে একটা গাছ দেখ, সবুজ রঙের বালুবোড়াকে দেখ, নদী দেখ- কালীগঙ্গা কি বুড়িগঙ্গা। তোমার দুঃখসুখের অস্তিত্বই তোমার ধর্ম। তোমার বেঁচে থাকাই তোমার প্রার্থনা। আর কিছুর প্রয়োজন নেই। কর্মকান্ড এড়িয়ে চলবে।
রনি মন দিয়ে শোনে। ঘিওর বাস্টষ্ট্যান্ডের চুমকি রেস্টুরেন্টের বুটের ডাল এত টেস্টি। নুজহাতকে নিয়ে এসে খাওয়াবে। নুজহাত তো এখন স্বাধীন। ফ্রি ট্রাভেলার।
রনির পরিবর্তন উপভোগ করছে শুভ্র তুষার। সে এখন রমেন বসাকের ভূমিকায়। রমেন স্যার প্রায়ই একটি গানের কথা বলতেন। লালনের গান। ভয় পেয়ে জন্মবিধি/সে পথে না যাও যদি/হবে না সাধন সিদ্ধি/তা শুনে মন ঝুরে/ও লালন বলে যা কর হে/ থাকতে হবে পথ ধরে। এই কথাগুলি মৌরিকে কখনোই বোঝাতে পারেনি শুভ্র তুষার। কতকাল আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টার ভবনের মলের ঘাসের ওপর বসে মৌরি বলেছিল, শুভ্র, আমরা কিন্তু এখন প্রবলেমগুলো ক্যাটাগোরাইজ করতে পারি। কাজেই আমরা সুখি হবই। আমি কিছু চাই না। বিশ্বাস করো। আই অনলি নিড ইয়োর ট্রাস্ট। আমি ... আমি তোমার বুকে মাথা রেখে মরতে চাই শুভ্র। ইত্যাদি। তখন শাহবাবা বললেন, তুমি এতবড় দুঃখ পাইলা তুষার। মাইয়াডারে একবার আনলা না মোকামে। মাইয়াডা মোকামে আইলে তুমি আর দুক্ষু পাইতা না। শুভ্র তুষার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৌরির মেয়েবেলায় ও কোনও কবিকে কাছে পায়নি পায়নি। এই আক্ষেপ। ওর কবির মন নেই -সেটি দোষের কিছু না, আধুনিক সময়ে জেনেটিক্স মানতেই হবে। তবে মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্বও কম নয়। আত্মঘাতি জঙ্গিরা তো শান্তিনিকেতন থেকে পয়দা হয় না। বিল মিটিয়ে বাইরে এসে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে দাঁড়াল। রোদ উঠেছে। একশ টাকা ভাঙ্গিয়ে পাঁচটা বেনসন কিনল। রনির জন্য দুটো মিল্ক ক্যান্ডি । একটা বাস ছাড়ছে। ওরা বাসের দিকে হাঁটে। মৌরির পরিবারের অনেকই দেশেবিদেশে ষ্টাবলিশ। অথচ ওর পরিবারে রমেন বসাক-এর মতন সেরকম আলোকময় মানুষ একজনই নেই। যে কারণে মৌরি রঙিন চাদর বুনতে শেখেনি-ওর দুভার্গ্য। কী সহজে বদলে গেল মৌরি। সস্তা স্রোতের মোহে বদলাব না, ভাঙ্গব না-এই জন্যই তো মানবজীবন। একজন বাঙালি কবির ভালোবাসাকে তুচ্ছ করল ঘন ঘন মোবাইল ফোনের মডেল বদলানো একটা মেয়ে। কী সহজে আজম ইশতিয়াকের কেপ্ট হয়ে গেল! লোকটার গুলশানের ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠল। শুভ্র তুষার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাঝে মাঝে জীবনে রঙিন চাদর জড়ানো দরকার হয় । মৌরির অবর্তমানে প্রতি মুহূর্তে পুড়ছে শুভ্র তুষার। তবে সে একেবারেই পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাবে না। যেহেতু তার একটি রঙিন চাদর রয়েছে। যে রঙিন চাদরের সন্ধান মৌরি কখনও পায়নি। মৌরি কখনও পুড়লে বোতল বোতল মদ খাবে। মদ খাবে-কেননা, জীবনের অনিবার্য দহনকে এড়ানোর আনন্দজনক উপায়ের পথ জানা নেই মৌরির। ওরা বাসে উঠল। রনি জানলার পাশে বসল। কী ঝলমলে রোদ। পুকুর। কলাগাছ। টিচার্স ট্রেইনিং কলেজের দেওয়াল। সেই দেওয়ালে খয়েরি রঙে লেখা- জামাতশিবির রাজাকার-এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়। রনি মুচকি হাসে। জামাতিদের বাংলা ছাড়ার দরকার কী। তারা বদলে গেলেই হল। ও তুষার শুভ্র কে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনার আসল নাম কি? মো: শাহ্ আলম মজুমদার। ধোঁওয়া ছেড়ে শুভ্র তুষার বলল। মাথা সামান্য টলছে। আজকাল দিনের প্রথম সিগারেটে মাথা টলে ওঠে। শুভ্র তুষার লালনের সেই গানটা ধরল। মানুষ গুরু কল্পতরু ভজ মন/ মানুষ হইয়া মানুষ ভজ/ পাবা মানুষে মানুষ রতন। কৃষ্ণমোহাম্মদ রনিও একটা নতুন নিক নেবে ভাবল। কী নিক নেওয়া যায়? মানুষ রতন। তখন তুষার ভাই বলছিলেন, তোমার বাবারা হার্ডকোর শরিয়তপন্থি হওয়ায় পীর-ফকির অপছন্দ করেন। সাদা রঙের চাদর যেমন সব কাছে লাগে না, চাদর রঙীন করার দরকার হয়, পীরফকিরা তেমনি- জীবনের রঙীন চাদর। জীবনের রঙির চাদর পেয়ে গেছে রনি। তবে ভয়ও আছে। ওর আব্বার পার্টির লোকেরা নিশ্চয়ই ওকে খুঁজছে। খুঁজুক। কাল শেখ ইবনে আল জাওয়ারি আল আসাদ আল মুখতাদিরের জন্মদিন। আজ দুপুরের ফ্লাইটে সৌদি আরব যাওয়ার কথা রনিদের ফ্যামেলির সবাই। ঐ পাথর-পাথর দেশটা ভালো লাগে না রনির। পালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ওর। পালিয়ে গেল বলেই তো সব পেল।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৩৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×