somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাপ্পোর কবিতা

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রাচীন গ্রিসের লেসবস দ্বীপের কবি শাপ্পো মানবসভ্যতার প্রথম আধুনিক কবি হিসেবে বিবেচিত। শাপ্পো মূলত গীতিকবি ছিলেন। গানের জন্য রচিত কবিতাকে বলা হয়: গীতিকবিতা। গীতিকবিতা রচনায় সে যুগে বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন শাপ্পো- নির্মান করেছিলেন নিজস্ব নতুন ছন্দ- যা ‘শাপ্পো-ছন্দ’ নামে সেকালে পরিচিত ছিল। শৈলী ও প্রকরণের দিক দিয়ে গীতিকবিতার নবায়ন করেছিলেন শাপ্পো- যা হয়ে উঠেছিল গীতিকবিতার এক নবতর রীতি। তাঁর কবিতা ছিল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, সুরেলা, প্রেমকাতরাতায় পূর্ন আর স্মৃতিচারণমূলক। তৎকালীন গীতিকবিরা শাপ্পোর গীতিকবিতার নির্মানশৈলীতে অশেষ প্রেরণা লাভ করেছিলেন নিশ্চয়ই। কেননা, শাপ্পোর গীতিকবিতায় দেবতার প্রশস্তি ছেড়ে ব্যক্তিজীবনের সুখদুঃখ উঠে এসেছিল। নারী সমকামী শাপ্পোর কবিতার কেন্দ্রে যে নারী-তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। লিখেছেন-

মেয়েটির মুখ কী ভীষন নম্র
লাজুক অ্যানিমোন ফুলের চেয়েও নম্র
ও যখন আমার গালে ঘঁষে ওর গাল
বেগুনি ছায়ারা তখন দীর্ঘায়িত হয় ...

শাপ্পোর কবিতা অবশ্য তাঁর সে যুগে ‘হোমোইরোটিক’ বলে নিন্দিত হয়নি কেননা ঐ সময়ে সমকাম নিন্দনীয় ছিল না । পরের যুগের নীতিবাগীশ ইউরোপীয় সাধুরা অবশ্য শাপ্পোর কবিতাকে অশ্লীল বলে অবহিত করেছেন।




আমার প্রেমিকার বাড়ির সামনে
একটি মেডলার গাছ।
সারাদিন সে গাছে বাতাস ঝিরঝির ঝির ঝির শব্দ তোলে ।
গোধূলি সন্ধ্যায় বসে থাকি নীল আকাশের
তারাদের পানে চেয়ে।



আমায় যদি ভালো না বাস তুমি
আমি এমনিই রয়ে যাব দেখ।
কখনও কেউ আমায় পাবে না।
একা তুমি কুড়াবে নম্র ফুল
ভাঙ্গবে তার সুগন্ধীগুলি ক্রোধে
আগর কাঠের মত?
তোমার মনে পড়বে আমার কথা?
ভবিষ্যতের বিবর্ন সব দিন
অহংকারের শান্ত আবেগ ক্ষত।



তোমার চুলে মালা জড়াও দিকা
এই নমনীয় কুঁড়ির সুঘ্রান!
হা, এই নমনীয় কুঁড়ির সুঘ্রান!
নম্র যুগল হাত।
মালা যে জড়ায় সে তো ঈশ্বর কে পায়
যার চোখ নিষ্ঠুর সে তো মালার জন্য নয়!



যখন
জোছনা রাতে
নতুন বেদি ঘিরে
নাচে ক্রিট দ্বীপের দাসী
নম্র ঘাস দলে দলে নাচে
তখন কী যে আনন্দ জাগে!

আফ্রোদিতির শিশুরা!
ওর কাছে বর চাও
আজ এই গ্রীস্মের রাতে ওর বিবাহ।



ঘুমোও তুমি সঙ্গীনির নরম বুকে
যখন ছলোছল জলেরা
করে ফিসফাস
যখন করবীরা ঝিকিমিকি জ্যোøালোকে
শীঘ্রই লাজুক পাখিরা
করে উঠবে কলরব
আর বাগানের ওপর জাগবে
ভোররাত্রির নক্ষত্রটি ...

সকলই ফুরায়ে যায়




আপেলের ডালপালায় শীত
গুঞ্জন
ধূসর পাতারা ওড়ে
তখনও সবাই ঘুমে

দুপুরে এই বাগানে
তোমার পায়ের শব্দের অপেক্ষায় আছি
গোধুলি অবধি।

বিবর্ন গোলাপ পাঁপড়ি ঝরে
ঝরনা জলে;
বাঁশীর তীক্ষ্ম স্বর
বিদ্ধ করে নোনা স্তব্দতা।
আমি অপেক্ষা করি।
নুড়ি বিছানো পথে
ফাহোনের পায়ের শব্দ।



এ বাড়ির উঠানটি বেশ বড়।
দিন শেষেও কেমন শীতল থাকে।
তখন কেবলি পাতার মর্মর শব্দ
তখন কেবলি পাতার মর্মর শব্দ
আর জলের শব্দ

মেয়েটির মুখ কী ভীষন নম্র
লাজুক অ্যানিমোন ফুলের চেয়েও নম্র
ও যখন আমার গালে ঘঁষে ওর গাল
তখন দীর্ঘায়িত হয় বেগুনি ছায়ারা।



চিরদিন ঝুঁকে থাকা হলুদ শষ্যের মতন
কিংবা জলস্রোতের দ্রুতগামী জলের মতন
পুরুষের হৃদয়।

শক্তিময় অজানা নিঃশ্বাসের মত সে আসে
আসে সে সমুদ্রের বিখ্যাত বাতাসের মতন
সে আসার আগেই আমরা নতমুখী হই।
কেন?
আমরা জানি না।



গোধূলি ঘন হয়ে উঠেছে।
চারপাশে আবছা আঁধার।
মাইটিলিনি* নগরে
একে একে জ্বলে উঠছে আলো।
উঠানে গুঞ্জন, একটি ব্যস্ত দিনের শেষ
বাচ্চারা চিৎকার করছে
ঘরে ফিরছে ভেড়ার পাল

ছায়াময় গভীর কোণে
প্রেমিকপ্রেমিকার গুঞ্জন
তারপর নীরব গোধূলিতে
সহসা অট্টহাসি
ব্যস্ত রাস্তা থেকে প্রবেশমূখে
এখনই আমার প্রেমিকা ঢুকবে
আবেগ থরথর বাঁশীর স্বরকম্পনে ...

* মাইটিলিনি= লেসবস দ্বীপের রাজধানী। ও নগরেই শাপ্পো জন্মেছিলেন।

১০

তুমি আমার বুকে তখন মাথা রেখে শুয়েছিলে
দীর্ঘ নীল রুপালি জ্যোøালোকে
তোমার ছিল ঘন অনুভূতি
এখন হায় অস্ত গেছে চাঁদ
মৃত রাত্রিও শেষ
প্রহরগুলি শেষ।
চলে গেছে প্লেইয়াদস
আমি বিছানায় একা ।

১১

দীর্ঘকাল আগে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম আথিস
যখন ফুটত করবী
বি¯তৃত প্রান্তরে যখন ছড়িয়ে থাকত রোদ
রুপালি জলে পাশে
গোধুলিতে আমরা পাশাপাশি হাঁটতাম।
যখন ঘাসের নম্র শীর্ষে মাখত শিশির
আর অপসৃত আলোয় বিবর্ণ কুয়াশা।
তোমার কন্ঠস্বর ছিল বিষন্ন ও সুখি
প্রেমের অপূর্ব দহনে আমি পুড়ছিলাম

আমার একাকীত্ব নির্জনতাকে ভারাক্রান্ত করে
আমার একাকীত্ব নির্জনতাকে ভারাক্রান্ত করে
আমার একাকীত্ব নির্জনতাকে ভারাক্রান্ত করে

আর মিষ্টি দীর্ঘস্থায়ী সংলাপ
তিক্ত তৃষ্ণা আর গভীর আকঙ্খা
হে আমার নির্জন দিনের সঙ্গী
পৃথিবীর মন্থর সৌন্দর্য
অবর্ননীয় তৃপ্তির স্বাদ
রাত্রির পবিত্র শিয়রে

ও ! আথিস আমি তোমায় কী যে ভালোবাসতাম
সেই ক্ষয়িষ্ণু গ্রীষ্মের সমুদ্রপাড়ে!

১২


আমরা কী করব সেথোরিয়া?*
সুদর্শন আদোনিস* মুমূর্ষ।

আহ! আমরা আর্তনাদ করি!
আহ! আমরা আর্তনাদ করি!
আহ! আমরা আর্তনাদ করি!

সে কি ফিরবে বসন্ত দিনে?
যখন লাল ও নীলে সাজে লেসবস?
যখন আঙুর বাগানে সূর্য ঘুমায়?

সে কি ফিরতে যখন শীত
কুন্ডলী পাকায় ভেড়াদের ভিড়ে?
যখন শিকারে বেরয় অরিওন* ?

আহ্, তোমার রুপ আদোনিস!
নম্র বসন্তের দখিনা বাতাস
হে প্রেম, হে আকাঙ্খা!

*সেথোরিয়া =আফ্রোদিতি=গ্রিক প্রেমের দেবী।
*আদোনিস =গ্রিক মরমী ধর্মের পুরোধা।
*অরিওন=নক্ষত্রপুঞ্জ।

১৩

হে প্রেম, বাতাসকে কাঁদতে দাও
কৃষ্ণকালো পাহাড়ে বাতাসকে কাঁদতে দাও
ঝুঁকে থাকা হে ওক গাছ
হে দীর্ঘ হেমলক
তোমার ভরাট কন্ঠস্বর
আমি কী যে ভালোবাসি

নীল গিরিখাদে অনাদি ঝংকারের মত
জলস্রোত বয়ে যাক
ধূসর কুয়াশায়
আমি কী যে ভালোবাসি

শঙ্খের দীর্ঘ ছন্দ
সমুদ্রকে দোলায়।
প্রভূ ও ভূপাতিতদের বল
আমি ওকে ভালোবাসি।

প্রেম, গাছ ঝিঁঝির ডাক
তরুণ ঘাসের মতন সবুজ সুন্দর প্রাণি
কী চমৎকার ধ্বনিত সুর।
আমি তোমায় ভালোবাসি।

আনন্দিত পাখিটিকে গাইতে দাও প্রান্তরের ওপর
মেদুর গানের কথা
তরল রুপা
জীবিতরা জানুক
আমি তাকে ভালোবাসি।

সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে
নিশ্চিত সুন্দর
পূর্ন আবেগে
ফিসফিস
তোমার হৃদয় বলে ভালোবাসি।

মূল গ্রিক থেকে ইংরেজি অনুবাদ: ব্লিস কারমান।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৩১
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×