আকাশ মেঘলা। সারাদিন ঝরঝর বৃস্টি। আমাদের দলের শহুরে কবিটি হয়তো লিখবেন:
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
সাঙ্গু নদী রোয়াংছড়ি রুমা থানচি লামা আলিকদম মাতামুহুরী নদী আর নাইক্ষ্যংছড়ি মিলে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলা। যারা বান্দরবান থেকে রামু গিয়েছেন। কিংবা, কেবলই বান্দরবান গিয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার সবুজ পাহাড়ের শোভা দেখে অভিভূত হয়েছেন, হয়েছেন মুগ্ধ । তামাটে, চ্যাপ্টা নাক, ছোট চোখের খর্বাকৃতির দেহের পাঙ্খোরা বাস করে বান্দরবান সেইসব পাহাড়ের কোলে।
পাঙ্খোরা, নৃতাত্ত্বিকদের মতে, মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখা । পাঙ্খোদের আদি নিবাস ছিল মায়ানমার। সেখান থেকে তারা কী কারণে বিতাড়িত হয়েছিল।
বাংলাদেশ যে কত জাতিসম্প্রদায়কে আশ্রয় দিল!
পাঙ্খোরা বৌদ্ধ। এ থেকেই পাঙ্খোদের মনের শান্ত প্রকৃতি অনুমান করা যায়। তবে পাঙ্খোরা আজও প্রকৃতির উপাসনা করে। পাঙ্খোরা সৃষ্টিকর্তার নাম দিয়েছে-‘পত্যেন’। পৃথিবীসৃষ্টিসংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনী বিশ্বাস করে পাঙ্খোরা। পাঙ্খোদের সৃষ্টিকর্তার নাম ‘পত্যেন’ হলেও পাঙ্খোদের উপাস্য দেবতার নাম কিন্তু খোজিং। খোজিং গভীর অরণ্যের দেবতা। যার পোষাপ্রাণি হল বাঘ। যে কারণে পাঙ্খোরা বাঘকে বড় সম্মান করে। তা হলে কি সাঙ্গু নদী রোয়াংছড়ি রুমা থানচি লামা আলিকদম মাতামুহুরী নদী আর নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ি অঞ্চলে বাঘ আছে? কিংবা এককালে ছিল? সে রকমই তো মনে হয়।
সে যা হোক। জুমচাষের ভালোমন্দও নিয়ন্ত্রণ করেন দেবতা খোজিং । পাঙ্খোদের বিশ্বাস গভীর অরণ্যে খোজিং দেবতার বাস। মূল খোজিং পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে শ্রাবণ মাসে । পূজায় ভাত মদ আর বনমোরগের মাংসের ছড়াছড়ি। কেননা, পাঙ্খোদের প্রধান খাদ্য ভাত আর প্রধান পানীয় মদ। বনমোরগ ছাড়াও পাঙ্খোরা ছাগল শূকর বুনো ষাঁড়ের মাংসও খায়। তবে বাঘ বা চিতার মাংস তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তার কারণ, বাঘ - অরণ্যের দেবতা খোজিং এর পোষাপ্রাণি ।
পাঙ্খোরা কৃষিজীবি। তারা পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ করে। সমতলে ধানও ফলায়। অন্যান্য শস্যাদিও ফলায়। কেউ কেউ গাছ কাটতে যায় গভীর বনে। চাষবাসে নারীপুরুষ সমান অংশ নেয়। হাটবাজার মূলত মেয়েরাই করে। পাঙ্খো মেয়েরা দারুণ পরিশ্রমী। এই কারণে পাঙ্খোসমাজে মেয়েদের বিশেষ মর্যাদা আছে।
তা হলে পাঙ্খোরা কি মাতৃতান্ত্রিক?
না।
পাঙ্খোদের পরিবারে পিতাই প্রধান। পিতার মৃত্যুর পর পুত্রসন্তানেরা পারিবারিক বিষয়আশয়ের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে। পাঙ্খোরা দুটি গোত্রে বিভক্ত। (ক) পাঙ্খো ও (খ) ভানজাঙ। তুলনামূল প্রগতিশীল পাঙ্খোরা। যেকারণে ওদের গোত্রান্তর বিয়েও হয়। পিতামাতার মতামত নিয়েই পরিনত বয়সে বিয়েটা হয়। পাঙ্খোসমাজে বাল্যবিবাহ নেই। তবে বিবাহবিচ্ছেদ ও বিধবা বিবাহের প্রচলন রয়েছে।
পাঙ্খোদের পোশাক সাদাসিধা। পুরুষেরা পরে ধুতির মতো একধরনের কাপড়। মেয়েরা পরে চাকমাদের মতো কাপড়। নাম: পিরহান বা পিনান। দেহের ঊর্ধ্বাংশ আলাদা একখন্ড কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। এসব কাপড় সবই ঘরে বোনা।
২
পাঙ্খোদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা- তবে তা মৌখিক। পাঙ্খোদের লিখিত ভাষা নেই। চমকে ওঠার মতো তথ্য হল- পাঙ্খোদের লিখিত ভাষা না থাকলেও গান আছে! বিশেষ করে প্রেমের গান। অলিখিত রুপ নিয়েই এদের লোকসঙ্গীত যথেস্ট সমৃদ্ধ। পাঙ্খোদের লিখিত ভাষা নেই, গান আছে! লিখিত ভাষা ছাড়াও গান হয় তা হলে? আরও একটা প্রশ্ন উঠে আসে। লিখিত ভাষার প্রয়োজন না থাকলেও একটা জনগোষ্ঠীর গান না হলে চলে না। কেন? ভাষা কি কেবলি ব্যবহারিক? আর, গান হৃার্দিক? ভাষা মত্ত্যের বিষয়। আর গান স্বর্গের? একটু আগেই বললাম: পাঙ্খোদের লিখিত ভাষা না থাকলেও গান আছে! বিশেষ করে প্রেমের গান। এমন সমাজ কি সম্ভব-যে সমাজে লিখিত ভাষা আছে -গান নেই। জানি সম্ভব না। কেন? বলতে পারি না। তাহলে এটাই সত্য যে-গানের কথাই সত্য বা গানটাই সত্য। ব্যবহারিক ভাষা নয়। অথচ, গানের কথা কেমন যেন অবাস্তব। কেমন, পূর্ণিমার চাঁদের আশেপাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মতন। আনরিয়েল। অথচ, গানই সত্য। আনরিয়েলটাই সত্য। কী আশ্চর্য!
৩
পাঙ্খোদের জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান করা যায় কিনা? ভাবছি। সদ্য দেশিও চলচ্চিত্রের ব্যাপ্তি বাড়ছে লক্ষ করছি। প্রবাসী। জার্মানীতে থাকেন, নামটা ভুলে গেছি, যিনি শিপব্রেকিং নিয়ে দুর্দান্ত একটি ডকু তৈরি করলেন। নির্ঝরের ‘আহা’ ও মন্দ হয়নি। ওয়াজিদ আল রহমান এর পরিকল্পনায় আদনান এম এস ফকির পরিচালিত ‘ফাইন্ডিং বাংলাদেশ’ যারা দেখেছেন তারা জানেন যে সদ্য দেশিও চলচ্চিত্রের ব্যাপ্তি বাড়ছে। সামহোয়্যার এর প্রাণদীপ্ত ব্লগার রিজওয়ানুল ইসলাম রুদ্র নির্মান করেছেন: ‘ঝরা পালক’। গত ২৪-৩০ জানুয়ারি শাহবাগের দেখানোও হল। ‘ঝরা পালকের’ শৈলীকে নতুন ঝোঁক আছে।
এসব কারণেই ভাবছিলাম। পাঙ্খোদের জীবন নিয়ে ছবি করা যায় কিনা। তুলনামূল প্রগতিশীল পাঙ্খোরা। ওদের গোত্রান্তর বিয়ে হয়। পরিনত বয়সে পিতামাতার মতামত নিয়েই বিয়েটা হয়। পাঙ্খোসমাজে বাল্যবিবাহ নেই। তবে বিবাহবিচ্ছেদ ও বিধবা বিবাহের প্রচলন রয়েছে। পাঙ্খোদের উপাস্য দেবতার নাম খোজিং। খোজিং অরণ্যের দেবতা। জুমচাষের ভালোমন্দও তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। পাঙ্খোরা বাঘকে করে সম্মান। কেননা, খোজিং এর পোষাপ্রাণি বাঘ। পাঙ্খোদের বিশ্বাস গভীর অরণ্যে খোজিং দেবতার বাস। মূল খোজিং পূজা শ্রাবণ মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
শ্রাবণ মাস; বর্ষাকাল।
দিনভর ঝরঝর বৃষ্টি। ঝরঝর বৃষ্টি।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
শহরের প্রেক্ষাগৃহের সুগন্ধী আধোঅন্ধকারে ঢুকে যাবে সেই বৃষ্টির শব্দ ও মেঘলা শীতলতা। আর, আমরা অপর একটি জীবনবলয়ের ভিতরে ঢুকে যাব। আমরা দেখব লাল পিছল মাটি ও ভিজে শালপাতা। পাঙ্খো শিশুর মুখ। ভিজে মুখ।
পাঙ্খোদের জীবন নিয়ে ছবি করা যায় না?
যায়।
আমাদের ব্যাপ্তি কেবল বাড়াতে হবে।
৪
এরপর যখনই বান্দরবান যাবেন। চোখ মেলে তাকাবেন।
সাঙ্গু আর মাতামুহুরী নদীর তীর ঘেঁষা রোয়াংছড়ি রুমা থানচি লামা আলিকদম আর নাইক্ষ্যংছড়ির নীলাভ পাহাড়ে বাস করেন দেবতা খোজিং। তিনিই তো গভীর অরণ্যের দেবতা। তিনি আর্শীবাদ করেন পাঙ্খোদের। আর, নীলাভ পাহাড়ের পাঙ্খো গ্রাম থেকে শোনা যায় গান। প্রেমের গান।
আমরা এখন কেবল বান্দরবান থেকে চিম্বুক-রুমা হয়ে বগা লেক অবধি যাওয়া শিখছি।
ধ্যারধ্যারা চান্দের গাড়িগুলি অচিরেই উঠে যাবে।
অচিরেই আমরা যাব-রোয়াংছড়ি থানচি লামা আলিকদম আর নাইক্ষ্যংছড়ি। আমরা যাব সমগ্র বান্দরবান জেলায়।
আমাদের ব্যাপ্তি তার নিজস্ব নিয়মেই বাড়বে।
একদিন আমরা বুঝতে পারব পাঙ্খোদের গান।
একদিন আমরা নত হব দেবতা খোজিং-এর চরণে।
তারপর আমরা যাব একটা পাঙ্খো গ্রামে ।
হয়তো তখন শ্রাবণ মাস।
আকাশ মেঘলা। সারাদিন ঝরঝর বৃস্টি। আমাদের দলের শহুরে কবিটি হয়তো লিখবেন:
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে একটা পাঙ্খো গ্রাম।
পাঙ্খোদের সম্বন্ধে তথ্য: বাংলাপিডিয়া।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



