আমি কি বেঁচে আছি শওকত ভাই? না, আমি বেঁচে নেই। আমি মরে গেছি। কণা বলল। বলে চুপ করে থাকল। ওর কন্ঠস্বরে দুঃখ ঝরে ঝরে পড়ে।
শওকত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটে টান দিয়ে দূরের গাছপালার দিকে তাকালো। এখন মাঠজুড়ে শেষ বসন্তের ঝলমলে রোদ; গাছের পাতায় রোদ, ডালে রোদ, ঘাসের ওপর রোদ। ওপারের আকাশটা ফ্যাকাশে নীল। সাদা মেঘ, চিল আর দু-তিনটে ঘুড়ি উড়ছিল কেবল। লাটাই হাতে বালকেরা সম্ভবত মাঠের শেষে বাড়িগুলোর ছাদে। মাঠটা যে-কারণে শান্ত হয়ে আছে। মাঠে বালকদের হল্লা নেই।
কিন্তু, কণাকে কে কষ্ঠ দিল? ও কাকে ভালোবেসেছিল? ইস্, ওর কত কষ্ট!
শওকত দিশেহারা বোধ করে। সিগারেটে টান দেয়। কণার শরীর থেকে বেলী ফুলের গন্ধ পায়। আজই প্রথম কণার সঙ্গে বেরুল সে। আজিম ভাইয়ের দিলু রোডের বাড়িতে কণাকে প্রথম দেখেছিল শওকত- রুমি ভাবী দুজনকে চোখে চোখে রাখছিল। তার কারণ হয় তো এই- কণা সুন্দরী, ফরসা, লম্বা; অবিকল উপবনের দেবীর মতন দেখতে ... রুমী ভাবী কিছুতেই শওকতকে কণার সৌন্দর্যে জগতে অনায়াসে প্রবেশ করতে দেবে না। ইর্ষা? তা সত্ত্বেও কণা কী এক গূঢ় কারণে শওকতের প্রতি ঝুঁকছিল।
ওমা, ‘হৃদয়হীনা’ নাটকটি আপনিই লিখেছেন?
কবি হলেও টিভি নাটক লিখে ইদানিং নাম করেছে শওকত। সুতরাং, অতি ভদ্রভাবে ফোন নম্বর বিনিময়। কৌশলে। রুমা ভাবী তখন কিচেনে ...
শওকতের প্রতি কণার আগ্রহের আরও কিছু কারণ ছিল ।
শওকত লম্বা, ফরসা; ধানমন্ডিতে থাকে- একটা গাড়িও আছে; কালো ভক্সওয়াগান। কণার গাড়ি নেই-ওর বাবার ছিল। তো, কণার বাবার গাড়িটা কণার তিন ভাইয়ের ভাগে পড়েছে; তারা গাড়িটা বেচে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কণা লালমাটিয়ায় একটা মেয়েদের কলেজে পড়ায় । ছাত্রীদের মধ্যে খুবই পপুলার কণা হক । ঈষৎ শ্যামলা হলেও সুন্দরী, গম্ভীর, চশমা-পরা কণা ম্যাডাম অনেক ছাত্রীর আইডল । এই কথাটা কণার কানে পৌঁছেছিল। না, না! তোমরা আমার মত হয়ো না প্লিজ! আমার মত হয়ো না; আমার আমার অনেক দুঃখ!
কিন্তু, কে কণাকে কষ্ট দিল? ও কাকে ভালোবেসেছিল? ইস্, ওর কত কষ্ট!
শওকত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধোঁওয়া ছেড়ে দূরে তাকাল। মাঠের শেষে একটা পিচ রাস্তা। এই মুহূর্তে একটা হলুদ ভোক্সাওয়াগান চলে যাচ্ছে । ওপাশে দূতাবাসের সাদা দেওয়াল। দেওয়ালে প্রতিফলিত রোদ; তার আলোয় একটা রিক্সা, বস্তা কাঁধে দুটো বালক; হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছে, হাত নাড়ছে। একটা সাদা কুকুর। ছড়ি হাতে একজন বৃদ্ধ। জামরুল গাছের নিচে সঙ্গীহীন গ্যাসবেলুনওয়ালা।
কণা নাক টানল। সাদা একটা রুমাল দিয়ে মুছল। হলুদ শাড়ি পড়েছে আজ। কপালে লাল টিপ। উপবনের দেবীর মতন লাগছে কণাকে। আমি কি বেঁচে আছি শওকত ভাই? না আমি বেঁচে নেই। আমি মরে আছি। মাহাবুব আমাকে যথেস্ট দুঃখ দিয়েছে। ও আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে।
বেলী ফুলের তীব্র গন্ধ পায় শওকত; এবং সে কবি বলেই সে আরেকটা বসন্তের বিকেল দেখতে পায়। যে বিকেলে এই মাঠেই বসে আছে কণা ... পরনে হলুদ শাড়ি ... ওর সামনে একজন পুরুষ বসে ... সিগারেট টানছে ... কণা বলছে, আমি কি বেঁচে আছি জামিল ভাই? না, আমি বেঁচে নেই। আমি মরে গেছি। শওকত আমাকে যথেস্ট দুঃখ দিয়েছে। ও আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে। বলে চুপ করে থাকল কণা। ওর কন্ঠস্বরে দুঃখ ঝরে ঝরে পড়বে।...তখন মাঠের পাশের পিচ রাস্তা দিয়ে একটা হলুদ ভক্সওয়াগান চলে যাবে শেষ বসন্তের ধূলা উড়িয়ে। ওপাশে দূতাবাসের সাদা দেওয়ালে প্রতিফলিত হতে থাকবে একটা দিনের শেষ রশ্মি; একটা রিক্সা চলে যাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে; বস্তা কাঁধে দুটো বালক হেঁটে যাবে কথা বলতে বলতে, হাসতে হাসতে। একটা সাদা কুকুর। ছড়ি হাতে একজন বৃদ্ধ। জামরুল গাছের নিচে গ্যাসবেলুনওয়ালা দাঁড়িয়ে থাকবে। একা।
কণার শরীরের বেলী ফুলের তীব্র গন্ধ পায় শওকত । আজ হলুদ শাড়ি পড়েছে কণা। কপালে লাল টিপ। অবিকল উপবনের দেবীর মতন লাগছে কণাকে ।
এর আগে কে বসেছিল এখানে? এই ঠিক আমার জায়গায়? কণার মুখোমুখি? মাহাবুব?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



