
সাঁওতালরা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ নৃগোষ্ঠী। এদের নিবাস প্রধানত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ায়। বাংলাদেশের বাইরে পশ্চিম বাংলার রাঢ়বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার অরণ্য অঞ্চল ছোটনাগপুর এবং সাঁওতাল পরগনায় এরা বাস করে।
সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলিয় জনগোষ্ঠীর বংশধর। এদের গায়ের রং কালো, উচ্চতা মাঝারি, চুল কালো ও কোঁকড়ানো, ঠোঁট পুরু। এরা বংলার প্রাচীনতম অধিবাসী ও এতদঞ্চলে কৃষিসংস্কৃতির জনক ও ধারক। এদের প্রধান উপাস্য সূর্য (সাঁওতালী ভাষায় সিং বোঙ্গা); তবে পর্বত দেবতাও (মারাং বুরু) এদের গ্রামদেবতা।
সাঁওতাল পুরাণকথার নাম হল: ‘হড়কারেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃক কাথা’। ১৮৭০ এর দশকে স্কেসরাড নামে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক সাঁওতালপুরাণ সংগ্রহ করে রোমান হরফে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। ১৯৫১ সালের আদমশুমারির সময়ে প্রয়াত অশোক মিত্র বৈদ্যনাথ হাঁসদাকে দিয়ে তার বাংলা অনুবাদ করেন।

সাঁওতাল পুরাণকথা ‘হড়কারেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃক কাথা’ শুরু হচ্ছে এভাবে-
সূর্য যেই দিকে উঠে সেই দিকে মানুষের জন্মস্থান। আদিতে সমস্ত জলময় ছিল এবং জলের নীচে মাটি ছিল। তখন ঠাকুরজীউ (ভগবান) জলজীব, কাঁকড়া, হাঙ্গর, কুমির, রাঘববোয়াল, শাল, চিংড়িমাছ, কেঁচো, কচ্ছপ ইত্যাদি সৃষ্টি করিলেন। তারপর ঠাকুর বলিলেন: অতঃপর কাহাদের সৃষ্টি করিব? মানব সৃষ্টি করিব।
সাঁওতাল ভাষায় ‘হড়’ মানে মানুষ। হড় বা মানব সৃষ্টির জন্য ঠাকুরজীও প্রথমে মাটি দিয়ে একটি মূর্তি গড়েছিলেন। কিন্তু, সূর্যের ঘোড়া তা ভেঙে দেয়। তখন ঠাকুর দুঃখিত হয়ে বললেন-
মাটি দিয়া গড়িব না। পাখি সৃষ্টি করিব। তারপর হাঁস-হাঁসলি পাখি গড়িলেন নিজের বক্ষস্থলের ময়লা দিয়া। তারপর হাতের উপর রাখিলেন, বড় সুন্দর দেখাইতে লাগিল। তখন ফুঁ দিলেন। অতঃপর তাহারা সজীব হইয়া উঠিল। ...(পাখি দুটি) উড়িয়া উড়িয়া বেড়ায়, কোথাও বসিবার স্থান পায় না।
তখন মাটি গঠনের জন্য ঠাকুর একে একে কুমির, চিংড়িমাছ, রাঘববোয়াল এবং কাঁকড়া ডাকলেন। কিন্তু তারা কেউই জল থেকে মাটি তুলতে পারল না। ‘সমস্ত মাটি গলিয়া গেল।’ অবশেষে কচ্ছপের সাহায্যে এই কাজটি সম্পন্ন করল কেঁচো। কচ্ছপ জলের ওপর স্থির হয়ে রইল আর কেঁচো জলে নেমে:
মুখের দ্বারা মাটি খাইতে লাগিল ও তাহা কচ্ছপের পিঠে বাহির করিতে লাগিল। (মাটি) সরের মত বসিল । ...তারপর ঠাকুর মই দেওয়াইয়া মাটি ঠিক করিলেন। মই দিতে মাটি আটকাইয়া স্তুপ হইয়া গেল। তাহাই পর্বত হইয়া গেল।
এইভাবে মাটি গঠনের পরও জলের যে ফেনা অবশিষ্ট ছিল, ঠাকুর তা-তে বেনা বীজ বুনলেন; তারপর দুর্বাঘাস, করমগাছ, শাল, মহুয়া ইত্যাদি ‘সর্বপ্রকার গাছ’ । তখন সেই বেনাঝোপে হংসযুথ বাসা বাঁধল এবং হাঁসুলির ডিম থেকে দুটি মনুষ্যসন্তান জন্মাল। তাঁদের নাম পিলচু হারাম আর পিলচু বুড়ি। প্রথমে তাহারা উলঙ্গ ছিলেন, তাহাদের লজ্জ্বাবোধ ছিল না। ক্রমে হাড়িয়ার প্রভাবে তাঁদের মধ্যে লজ্জ্বা আর আসঙ্গলিপ্সা জন্মাল। তাঁদের মিলনে সন্তানসন্ততি হল। সাত ছেলে, সাত মেয়ে।
পৃথিবীতে এই ভাবে মানববংশ সৃষ্টি হল।

সূত্র: দলিতের আখ্যানবৃত্ত; সংকলন/সম্পাদনা; সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
এবং
বাংলাপিডিয়া।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

