
হাইপাশিয়া; আলেকজান্দ্রিয়া নগরের অসামান্য প্রতিভাবান গণিতবিদ, জ্যোর্তিবিদ ও দার্শনিক। নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন হাইপাশিয়া । যে কারণে নারীর পোশাক নয়, পুরুষ পন্ডিতদের পোশাকই পড়তেন হাইপাশিয়া। আলেকজান্দ্রিয়া নগরে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতেন; পুরুষের মতো রথ নিজেই চালাতেন। ছিলেন উদার, পোষন করতেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ... এসব কারণেই খুন হয়েছিলেন খ্রিস্টান মৌলবাদীদের দ্বারা ...অথচ, তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষনাকর্ম পরবর্তীযুগের দেকার্ত, নিউটন ও লাইবনিজ গভীর মনোযোগ অধ্যায়ন করে সভ্যতাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।
সিরিল
সময়টা ৪০০খ্রিস্টাব্দ।
খ্রিস্টান ধর্মের উত্থান ও বিকাশেরও ততদিনে ৪০০ বছর পেরিয়ে গেছে। ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন মিলান এডিক্টের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্মকে বৈধ ঘোষনা করেছেন। তারপর থেকে ভূমধ্যসাগরের চতুর্দিকে তো বটেই- মিশরেও খ্রিস্টান ধর্মটি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছিল।
মিশর তথা আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসীরা প্রায় বেশির ভাগই ছিল প্যাগান (অ-খৃস্টান অর্থে) আর ছিল ইহুদিরা। কাজেই, আলেকজান্দ্রিয়া খ্রিস্টধর্মটি জোরদার হতে থাকলে প্রায়ই দাঙ্গা লেগে যেত।
আলেকজান্দ্রিয়ার গর্ভনর অরেস্টেস । তিনি এসব দাঙ্গাউদ্ভূত অরাজক পরিস্থিতি নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছেন।
হাইপাশিয়া সদ্য আলেকজান্দ্রিয়া নগরের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি গর্ভনর অরেস্টেস-এর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। অনেকটা সৌজন্য সাক্ষাত। হাইপাশিয়া অবশ্য আগে থেকেই গর্ভনর অরেস্টেস-এর বন্ধু ও শুভাকাঙ্খী। দুজনে তারা নগরের উন্নয়ন ও শান্তি স্থাপনের নানান পন্থার কথা আলোচনা করেন। সেই সঙ্গে তত্ত্বালোচনাও করেন। গর্ভনর অরেস্টেস জ্ঞানবিজ্ঞানে অত্যন্ত কৌতূহলী।
গর্ভনরের কক্ষটি বিশাল। ঈষৎ বাদামী রঙের পাথরের দেওয়াল ও মেঝে। উত্তর দিকে বড় একটি জানালা। সেই জানালা দিয়ে ফারোস দ্বীপের বাতিঘরটি চোখে পড়ে। চোখে পড়ে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের কিয়দংশ ও ভূমধ্যসাগরের অপার নীল। ভূমধ্যসাগরের সেই অপার নীলের ওপর অপরাহ্নের সোনারং রোদ ঝলমল করছিল। জানালার নিচেই কার্নিশ। ওখানে কতগুলো কালো পায়রা গুমগুম গুমগুম করছে। এ ছাড়া চারিদিকে শান্ত নির্জনতা। কে বলবে এ নগরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ধর্মীয় বিষবাস্প।
গর্ভনর অরেস্টেস রোমান। তেমনই তো হওয়ার কথা-কেননা, আলেকজান্দ্রিয়া তো এখন রোমেরই অধীন। ভদ্রলোক মধ্যবয়েসী। তামা তামা গায়ের রং। মাথার সামনের দিকে টাক পড়ে গেছে। চওড়া কপাল। গর্ভনর অরেস্টেস উদার মানুষ। তিনি জনগনের সমানাধিকারে বিশ্বাস করেন। তবে এই মুহূর্তে গর্ভনর অরেস্টেস মুখখানি কেমন থমথমে লাগছে। হাইপাশিয়া জানেন, এ জন্য দায়ী সিরিল। সিরিল আলেকজান্দ্রিয়ার নব্যখ্রিস্টানদের ধর্মীয় নেতা। লোকটা ভীষনই উগ্র । পরমত, পরধর্ম একেবারেই সহ্য করতে পারে না। প্রায়ই সে নগরে দাঙ্গার উস্কানি দিচ্ছে। সিরিলের ডান হাত তরুণ এক খ্রিস্টান যুবক পিটার । পিটার প্রায়ই নানা ষড়ষন্ত্র করে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। তারপর ইহুদি বা সেফারিসপন্থীদের দোষ দিয়। সেফারিসপন্থীরা প্রায় ৭০০ বছর ধরে মিশরে আছে। সম্রাট আলেকজান্দারের মৃত্যুর পর মিশর শাসন করে টলেমি রাজবংশ । তাদেরই ধর্ম সেফারিসবাদ । ধর্মটি আসলে গ্রিক ও প্রাচীন মিশরিয় ধর্মমতের মিশ্রণ। সিরিল মনে করেন ইহুদিরা ও সেফারিসপন্থীরা বিপথগামী, তার মতই জগতে একমাত্র সত্য। হাইপাশিয়া জানেন, মূল খ্রিস্টানধর্মটি এতদিনে নানা ধারায়-উপধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। যেমন কোপটিকবাদ; নিট্রিয়ানবাদ ইত্যাদি। সিরিল নিট্রিয়ানবাদী। সে আবার কোপটিকদের বিপথগামী মনে করে। হাইপাশিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরা যদি এসব ছেড়ে নক্ষত্রময় রাত্রিবেলায় দূর আকাশে তাকাত ...
অরেস্টেস মৃদুস্বরে বললেন, খ্রিস্টানদের ধর্মনেতা সিরিল চায় আমি যেন আালেকজান্দ্রিয়া থেকে ইহুদিদের বহিস্কার করি।
হাইপাশিয়া সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ধ্যাত, তাই হয় নাকি! সবারই যে কোনও নগরে বাস করার সমান অধিকার আছে।
অরেস্টেস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, একদল মানুষ মনে করে তাদের ধর্মমতটাই সঠিক। কিন্তু তা কী ভাবে সম্ভব! জগতে এত ধর্মমত।
হু। বিশ্বাসের চেয়ে বিশ্বাসের উৎস খোঁজা ভালো। ধর্মীয় অনুষ্ঠান এড়িয়ে নির্জরে বিশ্বজগতের রহস্য নিয়ে ভাবা ভালো। হাইপাশিয়া বললেন।
আমিও তাই মনে করি। অরেস্টেস মাথা নাড়লেন।
কিছুটা সময় নিরবে কাটল।
একটু পর হাইপাশিয়া নরম স্বরে বললেন, আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছি। আামার বাবার জন্যই সব সম্ভব হল।
অরেস্টেস বললেন, হ্যাঁ, আপনার বাবা, মহান থেঅন; আলেকজান্দ্রিয়া নগরের জ্ঞানী থেঅন। অসাধারণ মানুষ। ইতিহাস তাঁর কথা মনে রাখবেন। তাঁকে নিয়ে ভবিষ্যতের কৌতূহলী মানুষরা গবেষনা করবে। বলে হাইপাশিয়ার তিরিশ বছর বয়েসী ঝলমলে মুখের দিকে তাকালেন অরেস্টেস । মুখটা কেমন বিষন্ন । জানালায় চোখ গেল তার। ওখানে ঝলমলে রোদ। নির্জনতা। কার্নিসে কেবল কালো পায়রাদের খুনসুঁটি।
হাইপাশিয়া বললেন, জানেন বাবা আমায় মেয়েবেলাতেই বিশ্বের ধর্মগুলি সম্বন্ধে খুঁটিনািটি ধারনা দিয়েছিলেন। যে কারণেই আমি ধর্মান্ধ হয়ে উঠিনি। পরমত সহিষ্ণু হয়েছি। আসলে শিশুদের সব ধর্ম সম্বন্ধেই শিক্ষা দেওয়া উচিত। তবে ধর্মশিক্ষা না দিলেই সবচে ভালো । তারা বড় হয়ে খুঁজে নেবে তারা কী বিশ্বাস করবে।
অরেস্টেস বললেন, হ্যাঁ, আমিও সে রকমই মনে করি। আর ধর্ম ব্যাপারটা অতন্ত জটিল। আমি লক্ষ করেছি প্রতিটি ধর্মেরই একটি মূলধারা থাকে। পরে সেই মূলধারাটি নানা ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা নিয়ে নানা ধরা-উপধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেইসব উপধারার নেতৃত্বে থাকে একজন প্রভাবশালী ধর্মনেতা। তার অনুসারীদের কাছে মূলধর্মের চেয়ে তার ব্যাখ্যাই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ন। যেমন সিরিল নিট্রিয়ানবাদী। সে সাধু নিট্রিয়ানের ব্যাখ্যা করা খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী।
হ্যাঁ।
সে আবার ভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায় কোপটিকদের বিপথগামী মনে করে। সেফারিসদেরও। অরেস্টেস বললেন।
হ্যাঁ।
অরেস্টেস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যাই হোক। আমি অবশ্য মনে করি। খ্রিস্টকে অবশ্য ক্রশবিদ্ধ করা উচিত হয়নি।
হ্যাঁ। কাজটা ভারি অন্যায় হয়েছে। হাইপাশিয়া বললেন। জগতের প্রত্যেকের অধিকার আছে তার বিশ্বাস প্রচারের...আশ্চর্য ৪০০ বছর কেটে গেছে - তারপরও যিশু মানুষটা আজও কত শক্তিশালী।
হবে না। মানুষ যে গল্পে বিশ্বাস করে। অরেস্টেস এর কন্ঠে শ্লেষ।
হ্যাঁ। আমি লক্ষ করেছি। সূর্যগ্রহন সম্পর্কে মানুষ কত যে কুসংস্কার। অথচ মাইলেটাসের মহান বিজ্ঞানী থালেস সূর্যগ্রহনের অব্যর্থ ভবিষ্যবানী করেছিলেন আজ থেকে ৯০০ বছর আগেই।
অরেস্টেস মাথা নাড়লেন। বললেন, বেশিরভাগ মানুষই মহাবিশ্বের রুঢ় বাস্তবতা মেনে নিয়ে পারে না। সে বিশ্বাস করে পরম দয়াময় এক শক্তি তে। যে শক্তি তাকে জাগতিক বিপদআপদ থেকে বাঁচাবে। এ জন্য মানুষ জগতের রুঢ় বাস্তবতাকে মায়ায় ঘিরে ফেলে। তৈরি করে রুপকথা।
হ্যাঁ, তাই। বলে হাইপাশিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি এখন যাই গর্ভনর। বিকেলে একটা ক্লাস আছে।
যাবে? আচ্ছা আবার দেখা হবে তাহলে। বলে অরেস্টেসও উঠে দাঁড়ালেন।
অরেস্টেস দরজা অবধি এগিয়ে দিলেন হাইপাশিয়াকে। জ্ঞানী নারীর পাশে দাঁড়ালে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় তাঁর। হাইপাশিয়া স্নিগ্ধ। লম্বা। ছিমছাম। সোনালি চুল। মনে মনে দূরতম দ্বীপে চলে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে। অরেস্টেস বললেন, আচ্ছা, সেদিন আইরিন মানে আমার স্ত্রী বলছিল- দার্শনিক ইসিডোরের সঙ্গে তোমার কী রকম সম্পর্ক আছে।
কথাটা শুনে মুখ টিপে হাসলেন হাইপাশিয়া। জানেন তো দার্শনিক ইসিডোরের বাড়ি এথেন্সে; আলেকজান্দ্রিয়া এলে দেখা হয়। ভীষন লাজুক। সম্পর্ক কী হে ব বলেন-
ও আমিও তাই বলি।
হাইপাশিয়া চলে যাওয়ার পর অরেস্টেস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তখনও বাতাসে কী এক ফুলের গন্ধ ভাসছে। হাইপাশিয়ার সঙ্গে মেলামেশা খ্রিস্টানরা ভালো চোখে দেখছে না। আমার ইচ্ছেকে মনে করছে হাইপাশিয়ার ইচ্ছে।
যা হোক। উগ্র মৌলবাদী সিরিল অরেস্টেস ও হাইপাশিয়ার নির্মল বন্ধুত্ব নিয়ে দুর্নাম রটিয়েছিল।
অথচ, আলেকজান্দ্রিয়া নগরের অপরাপর খ্রিস্টানরা হাইপাশিয়াকে গভীর শ্রদ্ধা করত। এমন কী পরের যুগের খ্রিস্টান লেখকরা লিখেছেন: হাইপাশিয়া ছিলেন নির্মল বিশুদ্ধতার প্রতীক এক চিরকুমরী।
যাহোক। হাইপাশিয়া নাকি বিশ্বাস করতেন, দৈহিক প্রেমে সৌন্দর্য নেই। একবার নাকি এক লোক তাকে প্রেম নিবেদন করেছিল। হাইপাশিয়া কাপড়ে ঋতুকালীন রক্তের দাগ দেখিয়ে নিরস্ত করেছিলেন। ঘটনাটি হয়তো এ সময়ের মূল্যবোধে ঘা দিতে পারে। আমি অন্য এক সময়ের কথা বলছি।
আমি বলছিলাম যে, উগ্র খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা সিরিল চায় আালেকজান্দ্রিয়া থেকে গর্ভনর অরেস্টেস ইহুদিদের বহিস্কার করুক। অরেস্টেস এহেন অমানবিক প্রস্তাবে সঙ্গতভাবেই সম্মত ছিলেন না।
সিরিলের ইঙ্গিতে কতিপয় খ্রিস্টানসাধু অরেস্টেস কে হত্যা করেছিল!
আমরা হাইপাশিয়ার ক্ষোভ অনুমান করতে পারি।
তারপর মৌলবাদীরা টার্গেট করে হাইপাশিয়াকে। তার কারণ আছে। একে হাইপাশিয়া অ-খ্রিস্টান প্যাগান। তাদের মতে, জ্ঞানী হয়েও হাইপাশিয়া শান্তির ধর্ম গ্রহন করেননি। তার কারণ। দ্বিতীয়ত: হাইপাশিয়ার অবিশ্বাসী শিক্ষা প্রচার করত। যা কে বলা হয়, পরীক্ষামূলক জ্ঞানবিজ্ঞান। আর, মেয়ে হলেও ছেলেদের মতন স্বাধীন চলাফেরা করে। এসব কারণে ধর্মান্ধ খ্রিস্টানরা চটে ছিল।
৪১৫ খ্রিস্টাব্দ। মার্চ মাস। নিজস্ব রথে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন হাইপাশিয়া । হঠাৎই এক দঙ্গল লোক রথটি ঘিরে ফেলে। হাইপাশিয়া রথ থামাতে বাধ্য হল। ভয়ানক উত্তেজিত লোকেরা তাকে টেনেহিঁচড়ে রথ থেকে নামায়। কাপড় ছিঁড়ে নগ্ন করে ফেলে । লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। কয়েকজন উন্মাদ লোকদের হাতে ছিল ভাঙ্গা মৃৎপাত্র ...সেসব দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হাইপাশিয়াকে রক্তাক্ত করে। সে কী যন্ত্রণা ...তখনও বেঁচে ছিলেন; মুমূর্ষ ... নিথর দেহটা রাস্তার ওপর দিয়ে টানতে থাকে। তখনও বেঁচে ছিলেন। তারপর তারা ৪৫ বছর বয়েসী নারী-শরীরটি ছিঁড়ে ফেলে। কেউ একজন আগুন ধরিয়েছিল। খন্ডবিখন্ড শরীরে তারপর আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিররণ অনুযায়ী: খুনি জনতার নেতৃত্ব দিয়েছিল সিরিলের সহকারী পিটার ।
থেঅন
আলেকজান্দ্রিয়া নগরটি মিশরের উত্তরে; ভূমধ্যসাগরের পাড়ে।

মিশরের মানচিত্র; উত্তরে আলেকজান্দ্রিয়া
ভূমধ্যসাগরে নৌআধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সম্রাট আলেকজান্দ্রার ৩২২ খ্রিস্টপূর্বে নগরটি নির্মান করেন। আলেকজান্দ্রিয়া নগরের নগরপরিকল্পনাবিদের নাম ছিল ডিনোক্রাটেস। আলেকজান্দারের মৃত্যুর পর টলেমিরা শাসন করতে থাকে। আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে ওঠে তৎকালীন সভ্যবিশ্বের প্রাণকেন্দ্র।
আলেকজান্দার নগরীটিকে তিনভাগে ভাগ করেছিলেন।
১/ব্র“চিয়াম: অনেকটা অভিজাত আবাসিক এলাককার মতন। অভিজাত গ্রিকরা বাস করত।
২/ইহুদি মহল্লা;
৩/রাখওটিস্: মিশরীয়
নগরের কেন্দ্রে দুটি ২০০ ফুট রাস্তা একটি অপরটিকে অতিক্রম করে চলে গেছে। রাস্তার দু-ধারে গাছ। রাস্তা দুটি যেখানে ক্রশ করেছে- সেখানেই আলেকজান্দারের মাওসোলিয়াম বা সমাধিসৌধ। ফারোস দ্বীপটি নগরের কাছেই -মেনল্যান্ড থেকে ১ মাইল। বাতিঘরটি ওখানেই। এ ছাড়া নগরে ছিল রাজকীয় প্রাসাদ, থিয়েটার, দেবতা পোসাইদোনের উপাসনালয়, জিমনাসিয়াম আর মিউজিয়াম বা বিশ্ববিদ্যালয়। মিউজিয়ামের অর্থ হল: হাউজ অভ মিউজ বা দেবীদের ঘর। এই মিউজিয়াম বা বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল গ্রিক ও রোমান যুগে ইওরোপের শিক্ষাদীক্ষার কেন্দ্র । মিউজিয়ামটি নির্মান করেছিল টলেমিরা যা রোমান শাসন অবধি টিকে ছিল। মিউজিয়ামেই ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম সেরা গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটি নির্মিত হয়েছিল গ্রিক দার্শনিক আরিসটোটলের লাইসিয়ামের আদলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল রাজকীয় প্রাসাদের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে এক জায়গায় লেখা ছিল: “আত্মার অসুকের নিরাময়ের স্থান।” (দ্য প্লেস অভ দ্য কিউর অব দ্য সোল।) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ছিল অনেকগুলি বিদ্যালয়, পাবলিক মিলনায়তন। গ্রন্থাগার। আর ছিল
পায়চারী করার জায়গা, বাগান, খাবার ঘর, পড়ার ঘর, লেকচার হল, সভা কক্ষ; আসলে এটিই পরবর্তীকালের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভিত হিসেবে কাজ করেছে। লাইব্রেরিতে ছিল প্রচুর বই আর কর্মী। কর্মীরা বইয়ের ক্যাটালগ তৈরি করত। মূল লাইব্রেরি রুমে অনেকগুলি তাক ছিল। তাকে ছিল পান্ডুলিপি। পান্ডুলিপি মানে আসলে প্যাপিরাসের কুন্ডলী। যাকে বলা হত বিবলিওথেকাই।
থেঅন ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গ্রিক পন্ডিত। তাঁর সময়কাল ৩৩৫/৪০৫ খ্রিস্টাব্দ। ৩০ খ্রিস্টপূর্ব থেকেই আলেকজান্দ্রিয়ায় রোমানরা শাসন করছিল। থেঅন অভ আলেকজান্দ্রিয়া হিসেবে পরিচিত ছিলেন থেঅন। তিনি মূলত ছিলেন গণিতবিদ। ইনি ইউক্লিডের ‘এলিমেন্ট’ সম্পাদনা করে ৩৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেছিলেন। এটিই পরবর্তী সকল সংস্করনের ভিত হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া অন্যদের লেখার টীকাভাষ্য রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য টলেমির “আলমাজেস্ট। ” সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করবার জন্য অ্যাসট্রোল্যাব আবিস্কার করেছিল। অ্যাসট্রোল্যাব যন্ত্রটির ওপর হাইপাশিয়ার বাবা থেঅন-এর জ্ঞান ছিল গভীর ।
থেঅন ছিলেন নিওপ্লাটোনিস্ট দর্শনে বিশ্বাসী। নিওপ্লাটোনিজম এক ধরনের রহস্যবাদী চিন্তাভাবনা। প্লেটোর চিন্তার সঙ্গে ইহুদীখ্রিস্টান ও প্রাচ্যের মরমীবাদের মিশ্রণ। এরা ‘পরম অধরা বাস্তবতার’ ওপর জোর দেয়। যাকে বলে আনরিচেবল আলটিমেট রিয়ালিটি। প্রধানত প্লেটোর শিক্ষার ওপরই নিওপ্লাটোনিজম ধ্যানধারনার ভিতটি দাড় করেছিলেন দার্শনিক প্লটিনাস (২০৪/২৭০)। ।
যা হোক । গণিতবিদ থেঅন ছিলেন অসাধারণ এক মানুষ।
কেন?
এঁর এক মেয়ে ছিল। হাইপাশিয়া। ৩৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছিলেন হাইপাশিয়া ।
তখনকার দিনে মেয়েরা উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা কোনওরুপ শিক্ষাই পেত না। মেয়েদের কাজ ছিল ঘরগৃহস্থালী সামলানো। এভাবে মেয়েদে র জীবন সমস্ত কর্মদক্ষতা হারিয়ে গভীর অন্ধকারে অধঃপতিত ছিল। মহান গণিতবিদ থেঅন তাঁর মেয়েকে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেননি। বরং তাঁর সমকালে লভ্য প্রায় সব শিক্ষাই মেয়েকে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে দর্শন, গণিত ও জ্যোর্তিবিদ্যা। বাবা কন্যাকে শেখাতেন বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের কথা ; মানুষের জীবনের শব্দের গভীর প্রভাব-সেইসব। মেয়েটিরও অজানকে জানা বাসনা ছিল অদম্য। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকগন একমত হয়েছেন যে-অল্প বয়েসেই বিদ্যাবুদ্ধিতে বাবাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন হাইপাশিয়া।
৪০০খ্রিস্টপূর্ব। আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিযুক্ত হলেন হাইপাশিয়া। তখন বললাম, থেঅন ইউক্লিডের এলিমেন্ট সম্পাদনা করে ৩৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেছিলেন। কাজটা মেয়েকে নিয়েই করেছিলেন থেঅন।
আসলে গণিতবিদ থেঅন ছিলেন অসাধারণ এক মানুষ।
তাঁর প্রতি নিবেদন করছি গভীর শ্রদ্ধা।
পড়ানোর আকর্ষনীয় স্টাইল হাইপেশিয়াকে করে তুলেছিল অসম্ভব জনপ্রিয় । প্লেটো ও আরিসটোটল পড়াতেন হাইপেশিয়া। তাঁর ছাত্ররা অনেকেই ছিল খ্রিস্টান । বিদেশিও ছিল অনেকে। অন্যান্য বিষয় ও গণিতের ওপরও বই লিখেছেন হাইপাশিয়া। সমালোচনা করেছেন বিদ্যমান দার্শনিক ও গাণিতিক ধারণার । সমকালীন পন্ডিতদের সঙ্গে বিনিময় করেছিলেন পত্রাদি। সেসব পত্র আজও আছে- যা পাঠ করলে বোঝা যায় নারীকে অকারণে দীর্ঘকাল অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছে পুরুষবাদ। ইতালি ও গ্রিসও ভ্রমন করেছেন হাইপাশিয়া। মধ্যযুগের এক বিশ্বকোষ অবশ্য হাইপাশিয়াকে দার্শনিক ইসিডোরের স্ত্রী বলে উল্লেখ করেছে। হতে পারে দার্শনিক ইসিডোরকে মনে মনে ভালোবাসতেন হাইপাশিয়া। ঘর বাঁধতে ভয় পেতেন। দার্শনিক ইসিডোর এর বাড়ি এথেন্সে হলেও প্রায়ই আসতেন আলেকজান্দ্রিয়া। ওটাই তো তখন গ্রিকবিশ্বের জ্ঞানতীর্থ।
নক্ষত্রের মানচিত্র করেছেন হাইপাশিয়া। তরলের ঘনত্ব ও আপেক্ষিক ভর বের করার জন্য আবিস্কার করেছেন হাইড্রোমিটার। এ ছাড়াও সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করবার জন্য গ্রিক জ্যোর্তিবিদেরা যে অ্যাসট্রোল্যাব যন্ত্রটি আবিস্কার করেছিলেন-সেটিরও প্রাথমিক ধারনাটি নাকি হাইপাশিয়ারই। যন্ত্রটির মূল আবিস্কারক অবশ্য সাইনেসিয়াস;ইনি ছিলেন সাইরিনির এক খ্রিস্টান ধর্মযাজক। ইনি আলেকজান্দ্রিয়ার মিউজিয়ামে হাইপাশিয়ার লেকচারে যোগ দিয়েছিলেন।
লক্ষ করুন, সাইনেসিয়াস ছিলে খ্রিস্টান ধর্মযাজক।
নিয়তি কী নির্মম-একদল বিপথগামী উগ্র ধর্মান্ধ খ্রিস্টানদের হাতেই ৪১৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে নিহত হতে হয়েছিল হাইপাশিয়াকে ।
হাইপাশিয়ার মৃত্যুর পর হাইপাশিয়ার ছাত্ররা পালিয়ে যায় এথেন্স। তারপর এথেন্সে নিওপ্লেটোনিক দর্শন, জ্যোর্তিবিদ্য ও গণিত বিস্তার লাভ করে। অবশ্য আরবরা ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়া দখল করা অবধি আলেকজান্দ্রিয়াতেও নিওপ্লেটোনিক ধ্যানধারণা টিকে ছিল।
হাইপাশিয়া কে নিয়ে লেখা ব্লগার ম্যাভেরিকের একটি পোস্ট
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৮:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


