somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অ্যাজটেক সভ্যতা ( দ্বিতীয় পর্ব)

২৭ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রথম পর্বে আলোচনা করেছি অ্যাজটেকদের উদ্ভব, টেনোকটিটলান নগর, ধর্ম, কৃষি ও বর্ষপঞ্জী সম্বন্ধে। ২য় পর্বে আমরা আলোচনা করব অ্যাজটেকদের জীবনধারা, শিক্ষা, খাদ্য ও ধ্বংসের কারণ নিয়ে ...

অ্যাজটেকদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা ছিল সাদামাটা। স্বামীই গৃহকর্তা । তার পেশা চাষবাস বা কারুকাজ। মেয়েদের দায়িত্ব ছিল কাপড়বোনা ও রান্না। স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে সংসার। সে সংসারে কখনও স্বামীর ঘনিষ্ট আত্মীয়স্বজনও থাকত । অ্যাজটেকদের প্রায় সারাদিনই কাজ করতে হত। শিশুরাও কাজ করত। ১০ বছর অবধি বাবার কাছেই পড়ত ছেলে শিশুরা। বিদ্যালয়গুলি ছিল উপসনালয়ের সঙ্গে অ্যাফিলিয়েটেড। ধর্ম ও সমরবিদ্যা। মেয়েরাও পড়ত। অথবা ঘরে থেকে মায়ের কাছে ঘরকান্না ।
বাড়িতে বসেই অ্যাজটেকরা লেনদেনের জন্য পন্য তৈরি করত। আগেই বলেছিল অ্যাজটেক সভ্যতায় মুদ্রাব্যবস্থা ছিল না বলে লেনদেন হত পন্যের। পন্য বিনিময়ের জন্য জাগুয়ার এর চামড়া ছিল লোভনীয়।



এই ছবিটি কিছু হলেও অ্যাজটেক শিল্পীর দক্ষতার ধারনা দেয়




অ্যাজটেক সূর্য ...মনে থাকার কথা ওদের প্রধান দেবতাই ছিলেন সূর্যদেব



অ্যাজটেক টাটটু; আজও জনপ্রিয়

একটু আগে বললাম মেয়েদের দায়িত্ব ছিল কাপড়বোনা ও রান্না। কাজেই এ প্রশ্ন উঁিক দেয় মনে : অ্যাজটেক দের খাবার/দাবার কি ছিল?
এর উত্তর ভুট্টা।
ইওরোপে যেমন গম; আমাদের যেমন ভাত। সেরকম ভুট্টাই ছিল অ্যাজটেকদের প্রধান খাবার।



এই জিনিসটি বঙ্গদেশে তত পপুলার নয় ...

মেক্সিকো উপত্যকায় রং, আকার ও মসৃনতা অনুযায় অনেক ধরনের ভূট্টা হত; এবং অ্যাজটেক মেয়েরা সে ভুট্টা নানাভাবে রেঁধে খেত। তার একটি হচ্ছে টামালে। ভুট্টা পিষে পানি দিয়ে রুটির মত করে ভিতরে মাংস কি মরিচ।



টামালে। আজও মেক্সিকোর লোকে খায় টামালে।

আর, ভুট্টার রুটি হচ্ছে টরটিলা।



টরটিলা। এটিও আজও মেক্সিকোর লোকে খায় । কখনও মেক্সিকো গেলে খেতে পারবেন। আমি ভাবছি হাঁসের মাংস দিয়ে টরটিলা খেতে কেমন লাগবে ...

ভুট্টা ছাড়াও অ্যাজটেক খাবারের তালিকায় ছিল নুন ও মরিচ। অ্যাজটেকরা উপবাস করত। তখন নুন ও মরিচ খাওয়া ছিল নিষেধ। অ্যাজটেকরা সীম খেত। তাছাড়া নানা জাতীয় নির্বিষ শিকড়বাকড়ও খেত। পানীয়ের মধ্যে খেত পানি। আর নানা জাতে নির্বিষ উদ্ভিদের রস। আর পালকোয়ে খেত।


পালাকোয়ে। মেক্সিকোয় একবার না গেলেই না ...

পালকোয়ে হচ্ছে ঘৃতকুমারী (সেঞ্চুরি প্লান্ট) এর রস দিয়ে তৈরি এক প্রকার ঝাজা জিনিস। মেক্সিকোয় এখন টিনের কৌটায় পালকোয়ে বিক্রি হয়। অ্যাজটেকদের সে কারিগরি বিদ্যা ছিল না।
অ্যাজটেক সমাজে মদের প্রচলন ছিল। তারা মধু ও নানান ফলের রস মিশিয়ে তৈরি করত মদ । আশ্চর্য এই- অ্যাজটেক সমাজে মদের প্রচলন ছিল ঠিকই তবে তারা মাতলামি পছন্দ ছিল না। মদ খেলে শাস্তি হত! এমনকী অ্যাজটেক অভিজাতরাও মদ খেত না! ওদের মতে মদ খায় ছোটলোকেরা! বরং তারা কাকাও থেকে তৈরি মদ খেত।


ফলন্ত কাকাও গাছ। সীমের মত এক ধরনের ফল ধরে। এ গাছ সম্বন্ধে অ্যাজটেকরা অনেক প্রশংসা করে গেছে। অ্যাজটেক যোদ্ধা, সম্রাট ও অভিজাতরা খেত কাকাও সীমের তৈরি মদ। সে মদে গন্ধের জন্য মেশাত মরিচ । মধুও নাকি মেশাত । কাকাও সীমের এত প্রশংসা যে সীম ব্যবহার হত মুদ্রা হিসেবে। (গাছের ছবি এ কারণেই দিলাম!)
মাংসের মধ্যে অ্যাজটেকরা খেত টার্কি, মোরগ/মুরগি। ইগুয়ানা ও গোলপার।



সবজে ইগুয়ানা


এই হচ্ছে গোলপার।

মাছও খেত। চিংড়ি মাছ । পতঙ্গও খেত। পতঙ্গের ডিমও খেত ।

কেমন দেখতে ছিল অ্যাজটেকরা?







এরা সব মেক্সিকোর অধিবাসী ;এই মুখগুলির মধ্যেই নিহিত অ্যাজটেক মুখ ...

যা হোক।
এবার ধ্বংস পর্ব।
অ্যাজটেকরা ভারতীয় ব্রাহ্মণদের মতেই বিশ্বাস করত মহাবৈশ্বিক যুগবিভাগে । অ্যাজটেক পুরোহিতদের মতে মহাবৈশ্বিক যুগ সর্বমোট পাঁচটি; এবং একেক যুগের একেক দেবতার
শাসন। আমরা যে সময়টার কথা বলছি, অর্থাৎ সেই ষোড়শ শতাব্দীর অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করতে যে তারা বাস করছে পঞ্চমযুগে । তো, পঞ্চম যুগের বৈশিষ্ট্য কি?
ধংস!
সত্যিই কি তাই?
আমরা জানি ঐ ষোড়শ শতকেই অ্যাজটেক সভ্যতা ধ্বংস করেছিল হেরনান করতেস! সে ছিল এক স্প্যানিশ লুটেরা। লোকে তাকে হেরনান্দো কোরতেজও বলে। তো, স্পেনে মেদেলিন বলে এক জায়গা আছে। সেখানেই ১৪৮৫ সালে লোকটার জন্ম। সালামানকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়েছিল নাকি! ১৯ বছর বয়েসে স্পেন থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসে। হিসপানিওয়ালা দ্বীপে। সে সময় আরেক স্প্যানিশ লুটেরা দিয়াগো ভেলাজকোয়েস কিউবা দখলের উদ্যেগ করছিল । কোরতেজ তার সঙ্গে যোগ দেয়।



হেরনান করতেস!

কিউবা পৌঁছে করতেস মেসোআমেরিকার ধনসম্পদের কথা শোনে। তখনই মেসোআমেরিকার অভিযানের পরিকল্পনা করেন। ১৫১৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে জাহাজ ভাসায়। ১১ টি জাহাজ। ১১০ নাবিক। ৫৫৩ জন সৈন্য। এদের ১৩ জনের হাতে হ্যান্ডগান, ৩২ জনের হাতে ক্রশবো। ১০টি ভারী কামান, ৪টি হাল্কা কামান, এবং ১৬টি ঘোড়া। ভাসিয়ে মেক্সিকো উপসাগর পৌঁছে।



মেক্সিকোর মানচিত্র। ডানদিকে ভেরাক্রজ শহর ...

মেক্সিকো উপসাগর। জাহাজ থামিয়ে নৌকা করে পাড়ে নামেন-এখন যেটি ভেরাক্রজ শহর-সেখানে। সৈন্যরা যাতে পালাতে না পারে সেজন্য নৌকাগুলি ধ্বংস করে দিলেন কোরতেজ।
তারপর টেনোকটিটলান নগরের পথে রওনা হল সে।
অ্যাজটেক সম্রাট তখন ২য় মোকতেযুমা । তিনি সবই জানতেন। তিনি সৈন্য পাঠিয়ে লুটেরা কোরতেজ কে বাধা দেননি। কেন? কারণ ...মনে থাকার কথা প্রথম পর্বে আমি একটি অ্যাজটেক উপকথা বলেছিলাম ... দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল দেখতে ছিল লম্বা, শ্বেতকায় আর দাড়িওলা। সে দেবতা অ্যাজটেকদের শিখিয়েছিল কি করে কৃষিকাজ ধাতুর কাজ আর রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল বলেছিল, আমি আবার ফিরে আসব। বলে পূর্বসমুদ্রে মিলিয়ে ...অনেক বছ র পর স্প্যানিশ লুটেরা। হেরনান্দো কোরতেজ এলে অ্যাজটেকরা বাধা দেয়নি। এভাবে উপকথা একটি সমৃদ্ধশালী সভ্যতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ...



সম্রাট ২য় মোকতেযুমা

তদুপুরি সম্রাট ২য় মোকতেযুমা জানতেন যে তারা বাস করছে পঞ্চমযুগে । যে পঞ্চম যুগের বৈশিষ্ট্য ধংস!
যা হোক। স্প্যানিশ লুঠেরা কর্তৃক ইনকাদের ধ্বংসকাহিনী শুনে খারাপ লেগেছিল।
অ্যাজটেকদের জন্য অতটা খারাপ লাগল না।
কেন?
ঐ নরবলির জন্যই।
অ্যাজটেকদের সবই ভালো; কেবল ঐ নরবলির ব্যাপারটা ...বছরে কুড়ি থেকে পঞ্চাশ হাজার নরকে বলি দিত ...

সমাপ্ত ...























































সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:৩২
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×