নাঈমের বউকে আমি ভালোবাসি। ব্যাপারটা মনে হয় না নাঈম টের পেয়ে গেছে; ও এমন ক্রিকেট পাগল লোক; প্রয়োজন বাদে সুন্দরী বউয়ের দিকে তাকায় কিনা সন্দেহ। এ নিয়ে শম্পার মনের মধ্যে কোনওরুপ ক্ষোভ কিংবা অভিমান আছে কিনা তারও বোঝার উপায় নেই। শম্পা, আমি যতটুকু বুঝেছি, ভারি চাপা স্বভাবের মেয়ে। তবে আমি যে শম্পাকে ভালোবাসি-শম্পা তা টের ঠিকই পেয়েছে। আমার দিকে কেমন গাঢ় চোখে তাকায়, মিটমিট করে হাসে আর যেসব প্রশ্নের উত্তর হয় না আমাকে সেসব প্রশ্ন করে। এবং আমাকে ফোন করে, কিংবা দুস্টুমি করে মিস কল দেয়। হয়তো অফিস থেকে বেরুচ্ছি, তখন, কী ভাবে যেন টের পায় শম্পা আমি একা ।
গোপনে আমি শম্পার একটা ছবিও তুলেছি। ছবিটা মাঝেমাঝেই দেখি; যখন একা থাকি, শম্পাকে নিয়ে আমি রঙীন কল্পনায় ডুবে যাই । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কবিতা লিখতাম, তেমন কিছু না। ব্যর্থ কবি বলে আমার খ্যাতি থাকলেও আমার মনের গভীরে কাব্যবোধ এখনও রয়ে গেছে। তারই মহিমায় প্রায়ই নির্জন সবুজ উপত্যকায় শম্পাকে নিয়ে চলে যাই, গাঢ় ছায়ার বিকেলের পাহাড়ি নদীর পাশে পাশে হাঁটি । শম্পা অনর্গল কথা বলে যায় ... জানেন, আমার মেয়েবেলা কেটেছে ভৈরবে ... বাবা ছিলেন রেলওয়ের ডাক্তার ... স্টেশনের খুব কাছেই কোয়ার্টার ... রাতদিন ঝমঝম করে ট্রেনের শব্দ হত। শীতের গভীর রাতে ট্রেনের শব্দ শুনতান । আমার তখন কীরকম যে লাগত। আমাদের ঘরের দেওয়ালের রং ছিল টিয়ে রঙের। সন্ধ্যার পর টিউব লাইট জ্বলতাম। আমরা খাওয়ার টেবিলে পড়তে বসতাম। পড়ব কি-বারান্দায় খাঁচায় যে ময়না পাখি, বারবার ছুটে যেতাম ... (আমি শিওর এ কথাগুলি শম্পা নাঈমকে কখনও বলেনি।)
জীবন তো কেবল স্বপ্নকবিতা নিয়ে নয়-জীবনে কামও সত্য। কাজেই আমি কখনও কখনও কোনও ছায়াময় নির্জন ঘরে কালো রঙের সোফার ওপর শম্পাকে ধীরে ধীরে নগ্ন করি। রুবিনার সঙ্গে যা করা হয়নি কখনও, শম্পার যেন তাতেই উৎসাহ। চুম্বনে চুম্বনে ওকে অস্থির করে তুলি, তারপর
গভীর মনোযোগ দিয়ে শম্পার তীব্র শীৎকার শুনতে থাকি ...
আমার পাশে রুবিনা শুয়ে থাকে। ও এসব অজাচার (কিংবা প্রেম) টের পায় কিনা কে জানে। রুবিনা কেও আজকাল কেমন উত্তেজিত দেখায়। (আমাকেও কি ক্ষেপাটে আর উত্তেজিত দেখায়?)
কার সঙ্গে যেন টেলিফোনে কথা বলে রুবিনা । ব্যাপারটা আমি টের পেলেও উপেক্ষা করি। বিয়ের পর আমি যেমন রুবিনার তলপেটে লম্বা কাটা দাগ আবিস্কার করেও নিশ্চুপ ছিলাম। যেমন আমি কাকলীর ছবিগুলি/চিঠিগুলি সব পুড়িয়ে ফেলিনি; বুক সেলফ গোছাতে ওসব রুবিনা নিশ্চয়ই দেখেছে। বলেনি কিছু। বলে কী লাভ। অতীত নিয়ে খোঁচাখুচি করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? বরং আমাদের এই বর্তমান সময়টা ভীষণই উত্তেজক। কিন্তু,কার সঙ্গে কথা বলে রুবিনা? আমার ভীষণই কৌতূহল হয়। সেই সঙ্গে ফোনের রিং বাজার পর রুবিনা বারান্দায় কি পাশের ঘরে চলে আমার খানিকটা অস্বস্তিও হয় । শম্পা সেরকম অস্বস্তিতে রুবিনাকে কখনও ফেলে না। শম্পা সময় বুঝেই ফোন করে। হয়তো রুবিনা বাথরুমে, তখন। শম্পা কী ভাবে যেন টের পায় আমি একা ।
দিন কাটছিল।
একদিন সবই কেমন ওলোটপালোট হয়ে যায়।
একদিন নাঈমের মেয়েটা হারিয়ে যায়। ওদের একটাই মেয়ে। কেয়ামনি। ক্লাস সিক্সে পড়ে। চশমা পরা ভারি কিউট একটা মেয়ে। আমাকে ‘আঙ্কেল’, ‘আঙ্কেল’ করে। কেয়ামনি ঠিক ওর মায়ের মতো হয়নি। ওর মা শ্যামলা; কেয়ামনি সেরকম হয়নি।
শেষ আশ্বিনের দিনটা কেমন মেঘলা। বারোটার মতন বাজে। আমি অফিসে বসে কাজ করছিলাম। আমার ফোনের রিং বাজল। শম্পা। ভয়ানক উত্তেজিত কন্ঠস্বর। ...ভাই, কেয়ামনিকে খুঁজে পাচ্ছি না।
খুঁজে পাচ্ছি না মানে! আমি ভীষণ অবাক হয়ে চাপাস্বরে চিৎকার করে উঠি।
শিগগির আসুন ...
আমি অফিস থেকে বেরিয়ে দ্রুত একটা ট্যাক্সি নিয়ে নাঈমের বাসায় ছুটে যাই।
বেল বাজানোর পর কাজের মেয়েটা দরজা খুলল। আমাকে দেখে খানিকটা অবাক হয়েই বলল, খালু ত অফিসে গেছে।
জানি। কেয়ামনি কই?
স্কুলে। খালাম্মা কেয়ামনিরে আনতে গেছে।
শম্পা কি আমাকে স্কুলে যেতে বলল? শম্পাকে ফোন করব কিনা ভাবলাম। কেয়ামনি স্কুলটা বাড়ির কাছেই, দুটো গলির পর । ফোন না-করে আমি সেদিকেই ছুটলাম।
স্কুল গেটের সামনে শম্পা দাঁড়িয়ে । কাঁদছিল। আমাকে দেখেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল, সামলে নিল। গলিতে আরও লোকজন ছিল ...নাঈমকে দেখলাম না। আশ্চর্য! শম্পা নাঈমকে ফোন না-করে আমাকে করেছে। হয়তো আমার অফিসটা কাছে বলেই।
কেয়ামনিকে শেষমেশ পাওয়া গেল। ঘটনা তেমন কিছুই না- শম্পার আজ স্কুলে আসতে খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে কেয়ামনি ওর এক ক্লাসমেটের সঙ্গে গেছিল কনফেকশনারিতে আইসক্রিম খেতে; কনফেকশনারিটা সামান্য দূরে বলেই শম্পা ওর মেয়েকে খুঁজে পায়নি।
শম্পার মুখচোখ টেনশনে বসে গেছে। কেমন উদভ্রান্তর মতন দেখাচ্ছিল। মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদল অনেকক্ষণ। বারবার বলল, আমায় তুই ক্ষমা করে দে মা। আমায় তুই ক্ষমা করে দে ...
আশ্চর্য! কেয়ামনি তার মাকে ক্ষমা করবে কেন? ওর মা কি করেছে?
আমি ওদের বাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে চাইলাম । শম্পা শীতল স্বরে বলল, থাক, আপনার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এর পর থেকে শম্পাকে আর আগের মেজাজে পাওয়া গেল না। আমার দিকে গাঢ় চোখে আর তাকায় না, মিটমিট করে হাসে না আর যেসব প্রশ্নের উত্তর হয় না আমাকে সেসব প্রশ্নও করে না। সময়মতো ফোনও করে না। আমার স্বপ্নেও সেভাবে আসে না। চোখ বুজে আমি শম্পাকে নিয়ে
সবুজ নির্জন উপত্যকায় বিকেলের গাঢ় ছায়ার একটি পাহাড়ি নদীর পাশে হাঁটার চেষ্টা করলে একটি শিশুর চিৎকার করে ওঠে: আমায় তুই ক্ষমা করে দে ... আমায় তুই ক্ষমা করে দে ...
রুবিনাকেও ইদানিং ভারি অন্যমনস্ক মনে হয়। চোখমুখ কেমন ফোলা ফোলা। লুকিয়ে কাঁদে মনে হয়। চুপ করে থাকলে কেমন দেখায়-তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম: কি হয়েছে?
কিছু না-বলে রুবিনা এড়িয়ে গেল।
আমিও চাপাচাপি করলাম না।
সেই অপরিচিত পুরুষটি হয়তো রুবিনাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্ন কি ভেঙ্গে গেছে? মনে হয়। হয়তো সেই পুরুষটিও ছিল ক্লান্ত; ক্লান্তি এড়াতেই ভালোবেসেছিল এক নারীকে-যেমন আমি শম্পাকে ...।
যাই হোক। আমরা দুজন আবার দুজনার কাছে ফিরে এলাম। ফিরে আসার পর একে অপরকে আরও বেশি যেন অপরিচিত মনে হল। আমাদের মধ্যে কথা কমে গেল। আসলে আমাদের মধ্যে কথা অনেক আগেই কমে গেছে। লোকে বলে, কথা কম বলা নাকি গভীর বোঝাপোড়ার লক্ষণ।
আমরা দুজন আবার দুজনার কাছে ফিরে আসার পর এক রাতে বৃষ্টির নামল। রাতের বৃষ্টি রুবিনার ভালো লাগে। আমার ভালো লাগে ভোরের বৃষ্টি । যা হোক। এসব নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনোই ঝগড়া বিবাদ হয়নি। আমরা দুজনই কমবেশি ক্লান্ত-এই যা।
আমি আর রুবিনা অন্ধকার বারান্দায় বসে। পাশাপাশি। এখন অনেক রাত। বারান্দায় অনেকটা অন্ধকার আর গ্রিলের পাতাবাহারে বৃষ্টির ছাঁট, মৃদু ঝিরঝির শব্দ। শেষ আশ্বিনের বৃষ্টি, জলময় হলেও ঝাঁজ কম, আমাদের সম্পর্কের মতো।
তবুও বৃষ্টি তো ...
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


