জীবনের অপর নাম জল বলেই সম্ভবত প্রাচীন সভ্যতাগুলি নদ-নদীর পাড়েই গড়ে উঠতে দেখি। মানবসভ্যতায় নদ-নদীর অবদান অপরিসীম। নীল-সিন্ধু-গঙ্গার অববাহিকার সভ্যতাসমূহ এ সত্যকে ধারন করে আছে। নদী কেবল জলের উৎসই নয়-যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাথমিক অবকাঠামোটিও নির্মাণ করে দেয় । স্থলপথের পূর্বে জলপথই ছিল প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।
প্রাচীন ইরানের ইলাম সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির অন্যতম । ইলাম সভ্যতাটির অবস্থান ছিল পারস্য সাগরের উত্তরে আর তাইগ্রিস নদীর পুবে যেটি এখন ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের খুজিস্তান প্রদেশ।
প্রাচীন ইলাম রাজ্যের রাজধানী সুসা। এখানেই বাস করত ইলামাইট বা ইলামিয় জাতি। গ্রিকরা ইলাম সভ্যতাকে বলত সুসিয়ানা বা ইলিমাইস; ইলাম সভ্যতার লোকজন অবশ্য নিজেদের বলত হালতামটু, পারসিকরা ওদের বলত হুওয়াজা। সুমেরিয় ভাষায় আর হিব্রুতে ইলাম। ইলাম সভ্যতার লিখিত ভাষা ছিল না। লিখবার কায়দাকানুন ইলামিয়রা ধার করেছিল সুমেরিয়দের কাছ থেকেই। উল্লেখ্য ইলাম ভাষার পাঠোদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি!
প্রাচীন ইরানের ইলাম সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কারুন নদীর অববাহিকায়। নদীটির উৎপত্তি খুজিস্থানের জারদ কুহ পাহাড়ে। ৪৫০ মাইল দীর্ঘ কারুন নদীটি ইরানের একমাত্র নৌ-চলাচলযোগ্য নদী। হিব্রু বাইবেলে এই নদীর নাম গিহন । (দ্র: জেনেসিস) গার্ডেন অভ ইডেন-এ যে চারটে নদীর কথা হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে গিহন (কারুন) ছিল একটি। উপরোন্ত, হিব্র“ বাইবেল ইলাম শব্দটিও রয়েছে। নুহ নবীর এক ছেলের নাম ছিল শেম। শেম-এর এক ছেলের নাম ছিল ইলাম। নুহ নবী, শেম ও ইলাম কথা সেমেটিক ভাষায় বললেও ইলামিয়রা কথা বলত অ-সেমেটিক ভাষায় । এই বৈপরীত্যের মানে কি? এ ব্যাপারে অবশ্য ইহুদি পন্ডিতগন মোটেও বিব্রত নন। তাদের খাড়া যুক্তি হল: ইলামিয়রা কথা বলত অ-সেমেটিক ভাষায়-এতে অবাক হওয়ার কি আছে । ব্যাবিলনের টাওয়ার অভ বাবেল থেকেই তো ভাষা বৈচিত্রের উদ্ভব হয়েছিল!
ব্যাবিলনের পুবেই ছিল ইলাম রাজ্যটি।
ইলাম রাজ্যের রাজধানী ছিল সুসা; বর্তমানে ইরানের দক্ষিপশ্চিমের খুজিস্থানের শুশ শহর। পারস্য উপসাগরের ১৫০ মাইল উত্তরে অবস্থিত সুসা নগরটি গড়ে উঠছিল আজ থেকে ৭০০০ বছর আগে ।
হিব্রু বাইবেলে সুসাকে বলা হয়েছে শুশান। হিব্রু বাইবেলের বুক অভ ইশতার-এর ঘটনা এখানেই ঘটেছিল। এত বছর পর নগরীটি এখন মাত্র ৩ মাইল পরীধি বিশিষ্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত অঞ্চলমাত্র ।
ইলাম সভ্যতার বুনিয়াদ ছিল কৃষি। সেচের পানি যোগাত কারুন নদী।
ইলাম সভ্যতার অন্যান্য নগরগুলি হল আওয়ান, সিমাশ, মাডাকটু এবং ডার-উনটাশ।
খ্রিস্টপূর্ব ৫ থেকে ৭ হাজার বছর পূর্বেই মধ্যপ্রাচ্যের জনমানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে কৃষিকাজ ও সেচপ্রনালী আবিস্কার করে ফেলেছিল। সভ্যতায় প্রথম গমের আবাদ করা হয়েছিল ঐ কারুন নদীর জলসিক্ত উর্বরা অঞ্চলেই । সভ্যতার প্রথম রুটি প্রস্তুতকারকও প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের সেইসব পরিশ্রমী ও সৃজনশীল জনগন।
জাগ্রস পাহাড়
অনুমান করি ইলামবাসীর প্রধান আহার্য ছিল গমের রুটি, জাগ্রস পাহাড়ের মধু ও ভেড়ার মাংশ ইলাম অঞ্চলটি ছিল পর্বতময় এবং বিখ্যাত জাগ্রস পাহাড়টি ছিল সুসা নগরের নিকটেই। জাগ্রস পাহাড়টি সরবরাহ করত কাঠ মার্বেল আলাবাসটার লাপিস লাজুলি বিবিধ আকরিক ধাতু ও মূল্যবান পাথর।
লাপিস লাজুলি খোচিত ঘুঘু পাখি
কারুন নদীর অববাহিকায় পরিশ্রমী মানুষ কৃষির উদবৃত্ত থেকে গড়ে তোলে নগর, গড়ে তোলে ইলাম সভ্যতা। ইলাম শাসনতন্ত্রে উত্তরাধিকারের ধরনটি ছির মাতৃতান্ত্রিক; আর সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা, পিতৃতান্তিক সমাজে উত্তোরনের আগে মানবসমাজটির ধরন ছিল মাতৃতান্ত্রিক। ইলামিয় রাষ্ট্রে বোনের ছেলে হত নতুন শাসক! প্রধান শাসক বাস করতেন সুসা নগরী। সুসা ছিল অনেকটা ইলাম রাজ্যের ফেরাডেল রাজধানীর মতন। মনে থাকবার কথা: ইলাম সভ্যতার অন্যান্য নগরগুলি হল আওয়ান, সিমাশ, মাডাকটু এবং ডার-উনটাশ।
ইলামিয় আর্ট
প্রধান শাসকের সমবয়েসী ভাইও রাজ্য শাসন করত। সে ছিল অনেকটা ভাইসরয় বা উপরাজ। আরও একজন শাসন ভাগ করত- সে হল রাজপুত্র । প্রধান শাসক ছেলে অথবা ভাইয়ের ছেলে। প্রধান শাসক এর নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজ্যের জায়গিরদারদের ওপর। উত্তরাধিকার এবং ক্ষমতার বন্টনের ওপর ইলাম সভ্যতা টিকে ছিল ।
সুসা নগরে প্রাপ্ত নারীমূর্তি। দেবী কিরিরিশা?
আদি কৃষিসভ্যতার ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য সাধারনত হত বহু ঈশ্বরবাদী । ইলামও তার ব্যাতিক্রম ছিল না। কিরিরিশা নামে দেবীর কথা জানা যায়। সম্ভবত উর্বরতার দেবী ছিলেন কিরিরিশা। সুসা ও অন্যান্য নগরীতে কিরিরিশা দেবীর উপাসনালয় গড়ে উঠেছিল। কালের গ্রাসে সেসব আজ বিলীন হয়ে গেছে।
ইলামিয় পানপাত্র। পরবর্তীকালে পারস্যের শিল্পরীতিকে প্রভাবিত করেছিল। পারসিক পানপাত্রকে বলে রাইটনস।
কত কত রাজ্য যে ইলাম আক্রমন করেছিল! যেমন হয়: প্রাচীন ইলাম সভ্যতার সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও ছিল আক্রমন ও প্রতি-আক্রমনের ইতিহাস। টাইগ্রিস বা দজলা নদীর তীরে ছিল প্রাচীন সুমের। সেই সুমের- এ ছিল উর নগর, জায়গাটা বর্তমান দক্ষিণ ইরাকের নাসিরিয়ার ২০ কিমি পশ্চিমে। উর নগর উদ্ভব ও বিকাশ কাল ছিল ৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪০০ খ্রিস্টপূর্ব। উর সম্বন্ধে এত কথা বলছি, কারণ, ২২০০ খ্রিস্টপূর্বে ইলাম অধিকার করে নেয় উর । এর ২০০ বছর পর ইলামিয়রা সংঘবদ্ধ হয়ে উর-এর নিয়ন্ত্রণ ছিন্ন করে ও উর নগর ধ্বংস করে। ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বে ব্যাবিলন অবরোধ করে কাসাতি নামে এক জাতি। তারা ইলাম আক্রমন করে দখল করে নেয়।
প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য। সংঘাত ও সভ্যতার লীলাভূমি ...
১১৬০ খ্রিস্টপূর্বে ইলামরাজ শুটরুক -নাহ্হুনতে ইলাম থেকে কাসাতি জাতি তাড়িয়ে দিয়ে ইলাম এর হৃতগৌরব পুনুরুদ্ধার করেন । অবশ্য এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি। কেননা, ১১২০ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিলনের রাজা ১ম নেবুচাদনেজার ইলাম আক্রমন করে তছনছ করে। ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বে নতুন ইলাম সাম্রাজ্য পূর্নবার প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্বের গৌরব আর ফিরে আসেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৬৯২ থেকে ৬৩৯ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত আসিরিয় সম্রাট আশহুরবানিপাল সুসা আক্রমন করে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেন। সুসার দালানকোঠাগুলি সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ও ধনসম্পদ লুঠ করা হয়। ইলামের উর্বর জমিতে লবন ছিটিয়ে নাকি জমির উর্বরতা নষ্ট করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আসিরিয় সম্রাট আশহুরবানিপাল!
ইতিহাস এহেন বর্বরতার সাক্ষীও বৈ কী!
যাক। এর পরপরই ইলামিয় সভ্যতা বিলীন হয়ে যায়, সভ্যতাটি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ।
এরপর পারস্যের আকামেনিদ রাজবংশের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট ইলাম রাজ্যকে পারস্য সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করে নেন।
ইলামিয় পানপাত্র।
সুসা
সুপ্রাচীন ইলাম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


