ইনি সেন্ট উরসুলা। ব্রিটিশ খ্রিস্টান নারী সাধু। নিস্পাপ ও নির্মল চরিত্রের জন্য সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। মহামান্য পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে ১১ জন কুমারীকে নিয়ে রোমে গিয়েছিলেন সেন্ট উরসুলা। ফেরার পথে জার্মানির কোলন-এ বর্বর হুনদের আক্রমনের শিকার হলেন। সময়টা ৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ । নৃশংস হুনেরা ১১ জন কুমারীকে একে একে শিরোচ্ছেদ করে হত্যা করে। হুন রাজা আত্তিলা সেন্ট উরসুলার রুপে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করতে চাইলেন। সেন্ট উরসুলা ঘৃনাভরে অস্বীকার করলে আত্তিলা নিস্পাপ সাধিকাকে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করে। এ হল হুনদের বর্বরতার উদারহরণ । বর্বর যাযাবর ট্রাইব হুনদের শিক্ষাদীক্ষা ধর্ম কিংবা শিল্পকলায় আগ্রহ ছিল না। তারা কেবল ধ্বংসই করতে জানত। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ৫ম শতক অবধি তারা এশিয়া ও ইউরোপে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম রেখেছিল ।
হুন যোদ্ধা
তুর্কি গোত্রের বাস ছিল মধ্য এশিয়ায়। হুনরা এদেরই একটি শাখা। যে কারণে হুনদের ভাষা ছিল তুর্কি। এদেরই আরেকটি শাখা পরবর্তীতে তুরস্কে অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। যা হোক, হুনরা চিনাদের কাছে জিঅং-নু নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে তারা চিনা সাম্রাজ্য আক্রমন করতে থাকে। হুনদের আক্রমনে চিনারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এদের উৎপাত থেকে রক্ষা পেতেই সম্রাট শি হুয়াং তি চিনের প্রাচীর নির্মানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রাচীর তুলে চিনারা হুনদের প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়। সে সময় হুনদের নেতা ছিল মাও-তুন। তারই নেতৃত্বে হুনরা নিরাপদ বাসভূমির সন্ধানে চিন ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে ।
দলটি ছোট ও বড় -এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ছোট দলটি ভারত অভিমূখে যাত্রা করে। বড় দলটি যেতে থাকে সাইবেরিয়ার উত্তর পশ্চিমে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সম্ভবত পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে রাশিয়া পাড় হয়ে খ্রিস্টীয় ৩৫০ শতকে শক দের (আরেকটি বর্বর ট্রাইব) ধ্বংস করে ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয় এবং বর্তমান হাঙ্গেরি তে স্থায়ী বাসভূমি গড়ে তোলে। হাঙ্গেরিয়ার আশেপাশে বাস করত ভিসিগথ অসট্রোগথ প্রভৃতি জার্মানিক ট্রাইব। হুনদের আক্রমনের মুখে পড়ে তারা পশ্চিম ও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে। এবং রোমান দের মুখোমুখি হয়। হুনদের আক্রমনে এরা কেউই টিকে থাকতে পারেনি। প্রতিপক্ষের ওপর হুনদের আধিপত্যের অন্যতম কারণ হুনরা ঘোড়ার রেকাব আবিস্কার করেছিল। রেকাব হল অশ্বারোহীর পা রাখার নির্দিষ্ট স্থান। রেকাবে পা রেখে যুদ্ধ করতে সুবিধা।
হাঙ্গেরির মানচিত্র; Hungary শব্দটির মধ্যে Hun শব্দটি এখনও আছে।
ইউরোপে তখন রোমানদের শাসন। রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম-এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমের রাজধানী ইটালির রোম। পুবের কনসটানটিনোপোল।
দুভাগে বিভক্ত রোমান সাম্রাজ্য
রোমান সাম্রাজ্য
হুন নেতা রুগুলাস ৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য আক্রমন করে। রোমান শাসকদের
তারা বাধ্য করেছিল কর দিতে। কর দিতে হত স্বর্নে। হুনদের আগ্রাসন ও তান্ডব রোমান সাম্রাজ্যের আতঙ্ক ও ঘৃনার সৃষ্টি করেছিল। রোমান ঐতিহাসিক অ্যামিয়ানুস মারসেলিনিয়াস লিখেছেন : ইহারা মানবের মতন দেখিতে বটে তবে মোটেও সভ্যভব্য নয় কেননা ইহারা আগুনের ব্যবহার জানে না। ইহারা কোনওপ্রকার স্বাদগন্ধযুক্ত আহারাদি প্রস্তুতে অপারগ এবং পথের পার্শ্বের মূল খাইয়া বাঁচিয়া আছে; উপরোন্ত ইহারা যে কোনও প্রাণির অর্ধপক্ক মাংশ ভক্ষন করে। প্রতিপক্ষকে আক্রমনের সময় হুনগন কখনও যথার্থ সমরনীতির কৌশল প্রয়োগ করে আবার কখনও যথার্থ সমরনীতির কৌশল প্রয়োগ করে না। মাঝেমধ্যে তাহারা সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে, আবার কখনও তাহারা কর্কস চিৎকারধ্বনি করিয়া স্বর্গ মর্ত তোলাপাড় করিয়া ফেলিয়া শক্রপক্ষের ভীতির সঞ্চার করে। ইহারা দ্রুত রণক্ষেত্র হইতে ছড়াইয়া পড়ে, আবার চোখের পলকে ফিরিয়া আসিয়া কিছু বুঝিয়া উঠিবার আগেই শক্রর ওপর ঝাঁপাইয়া পড়ে। প্রতিপক্ষ যদিবা তরবারি লইয়া কাটিয়ে আসে তো হুনগন জাল ছুঁড়িয়া মারিয়া প্রতিপক্ষকে বধ করে।
অশ্বারোহী হুনযোদ্ধা
৪১৮ খ্রিস্টাব্দ। রোমের সঙ্গে হুনদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল। সম্পর্ক ভালো রাখতে হুনরা রোমানদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ন ব্যাক্তি বিনিময় করে। এক হুন কিশোর ২ বছর রোমে গিয়ে থাকে। রোমের জৌলুষ দেখে কিশোরের বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল। সে একদিন বিজয়ের বেশে রোমে ফিরবে শপথ নেয়। পরিনত বয়েসে কিশোরটি হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য হুন যোদ্ধা আত্তিলা ।
আত্তিলা । ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ব্যাক্তি
৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে হুনদের রাজা রুগুলাস মারা যায়। তার ভাইয়ের ছেলে আত্তিলা (জন্ম ৪০৬ খ্রিস্টাব্দ ) ও ব্লেডা হুনদের নেতা নির্বাচিত হয় । আত্তিলার নিষ্ঠুরতা ছিল ভীতিকর। ৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইকে হত্যা করে আত্তিলা হুনদের একক নেতা হয়ে ওঠে।
আত্তিলাকে নিয়ে অনেক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। সে নাকি যুদ্ধের দেবতা মঙ্গলের তরবারি পেয়েছিল। সম্ভবত সে মৃত এক হুন যোদ্ধার তরবারি পেয়েছিল । তার মতন নিষ্ঠুর যোদ্ধা ইতিহাসে খুব কমই আছে। নির্বিকারে নগরের পর নগর ধ্বংস করেছে, নারী ধর্ষন করেছে। আত্তিলা ছিল অত্যন্ত ক্ষমতালোভী। ক্ষমতার লোভে আপন ভাইকে হত্যা করতে পিছপা হননি। নিয়মিত ঘোটকির দুধ রক্ত ও মাংস খেত। পোশাক ছিল পশুর তৈরি চামড়া। ঘোড়ার রেকাবে পা রেখে দাঁড়িয়ে তীর ছোঁড়ার দক্ষতা ছিল। নরমাংসখাদকও নাকি ছিল। তবে প্রমাণ মেলেনি। তবে রোমানরা আত্তিলাকে বলত ঈশ্বরের অভিশাপ।
আত্তিলার অধীনে সংঘবদ্ধ হয়ে হুনরা ধ্বংযজ্ঞ চালাতে থাকে। ৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট ২য় থিওডোসিয়াস আক্রমন না করার শর্তে বাৎসরিক ৬৬০ পাউন্ড সোনা প্রদানের অঙ্গিকার করেন।
৪৪০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ বাধল। রোমার বিশপ মারগাস দানিয়ুব নদী পাড় হয়ে হুনদের রাজকীয় সমাধি লুঠ করে। ক্ষিপ্ত হয়ে হুনেরা ঝড়ের গতিতে রোমান সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে। আত্তিলা অধিক পরিমানে কর দাবী করে।
হুন সাম্রাজ্য
এক রোমান রোমান রাজকুমারীর হঠকারী সিদ্ধান্তে ইউরোপের জনগনের ওপর নেমে এসেছিল মৃত্যুর অভিশাপ। জাস্টা গ্রাটা অনোরিয়া ছিল রোমান সম্রাট ৩য় কনসটানটিয়াস এর একমাত্র কন্যা। মা গালা প্লাসিডিয়া। ভাই রোমান সম্রাট ৩য় ভালেনটিনিয়ান (৪২৫-৪৫৫)। রাজকুমারী অনোরিয়া ছিল উচ্চভীলাষী ও ভাইকে মনে করত দূর্বল ।
জাস্টা গ্রাটা অনোরিয়া
ইউজেনিয়াস নামে এক রাজকীয় কর্মচারী ছিল, তার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে অনোরিয়া। পরিকল্পনা ফাঁস। মায়ের অনুরোধে সম্রাট ৩য় ভালেনটিনিয়ান অনোরিয়াকে হত্যা না করে কনসটানটিনোপলের কনভেন্টে পাঠিয়ে দেয়। ঘটনা শুরু এখানে। অনোরিয়া আগুন নিয়ে খেলবে ঠিক করল। আত্তিলার কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠাল। সঙ্গে এনগেজমেন্ট রিং। আত্তিলা ভাবল অনোরিয়া তাকে বিয়ে করতে চায় । বিয়ের যৌতুক হিসেবে সে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অর্ধেক দাবী করে বসল।আত্তিলার অধীনে হুনরা এই প্রথম ইউরোপের গভীরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নারীযোদ্ধাও ছিল হুন সৈন্যবাহিনীতে ।
চালোন জায়গাটি উত্তর ফ্রান্সে। এখানেই রোমান দের মুখোমুখি হয় হুন সৈন্যরা। ইতিহাসে এই যুদ্ধের নাম: ‘দ্য ব্যাটেল অভ কাটালাউনিয়ান প্লেইনস।’ রোমান জেনারেল ছিলে ফ্লাভিয়াস এইটিয়াস। তার সঙ্গে জোট বেধেছিলেন ভিসিগথ রাজা প্রথম থিওডোরিক। ৪৫১ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত যুদ্ধে রোমান ও ভিসিগথদের কাছে হুনরা পরাজিত হয়।
পরাজিত আত্তিলা ক্ষিপ্ত হয়ে ইটালীর রোম নগর ধ্বংস করার উদ্যেগ নেয় । পোপ লিও ১ তাকে নিরস্ত করে। প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে রোম তখন বিধস্ত নগরী । যা হোক, আত্তিলা রোম আক্রমন না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
মনে থাকার কথা ১১ জন কুমারীকে নিয়ে রোমে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ খ্রিস্টান সেন্ট উরসুলা । ৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ ফেরার পথে জার্মানির কোলন-এ হুনদের আক্রমনের শিকার হওয়ার পর ১১ জন কুমারীকে তৎক্ষনাৎ শিরোচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। আত্তিলা সেন্ট উরসুলা রুপে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করতে চাইলে সেন্ট উরসুলা অস্বীকার করেন, সেন্ট উরসুলাকে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করে আত্তিলা ...আত্তিলা ঐ বছরই অর্থাৎ ৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে বিয়ে করে । এর আগে ছজন স্ত্রী ছিল, ৭ম স্ত্রী হিসেবে আইলিকোকে বিয়ে করে। বিয়ের রাতে পানাহার চলল,আত্তিলা যে খুব মদ খেত তা কিন্তু নয়। কী মনে করে সে রাত্রে খেল। পরের দিন সকালে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেল। নাকে রক্তপাত হয়েছিল। রক্তে নিঃশ্বাস আটকে যায়। সন্দেহ নতুন স্ত্রীকে। যদি তাইই হয়-কেন হত্যা করল?
সব কথা তো ইতিহাসে লেখা থাকে না।
আত্তিলার মৃত্যুর পরেই ইতিহাস থেকে হুনেরা মুছে যায়।
নির্মল হৃদয়ের অধিকারীণি সেন্ট উরসুলাকে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করেছিল বর্বর আত্তিলা। যে দৃশ্যটি শিল্পীর মনকে করেছিল বিচলিত ...
হাঙ্গেরিতে পাওয়া হুন কড়াই
হাঙ্গেরি: ছিল একদা হুনদের বাসভূমি
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


