জিগুরাট। প্রাচীন ইরান ও ইরাকের প্রধান দেবতার বৃহদাকার উপাসনালয়। কয়েকটি ধাপ সম্বলিত, সিঁড়িযুক্ত প্রায় দেড়শ থেকে তিনশ ফুট উঁচু জিগুরাট এর আকার ও গঠন আজও মানুষের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এ অব্দি ৩২টি জিগুরাট-এর কথা জানা গেছে; এর মধ্যে ২৮টি ইরাকে এবং ৪টি ইরানে অবস্থিত। অনেকে মধ্য আমেরিকার মায়া-অ্যাজটেক জিগুরাট-এর কথা বলে। ওসব আসলে জিগুরাট নয়, অন্যকিছু। কেননা, জিগুরাট শব্দটি আককাদিয় ভাষার শব্দ। এর অর্থ, উঁচু স্থানের নির্মান।
জিগুরাট নির্মিত হয়েছিল সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয় সভ্যতায় । ব্যাবিলনিয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মধ্য ও দক্ষিণ ইরাকের ব্যাবিলন নগরকে কেন্দ্র করে । ব্যাবিলন নগরের দক্ষিণে ছিল উর; সেই নগরটিও ছিল ব্যাবিলনিয় সভ্যতার অর্ন্তগত । ধ্বংসপ্রাপ্ত সুমের ও আককাদ সভ্যতার ওপর সম্রাট হাম্মুরাবি (খ্রিস্টপূর্ব ১৬৯৬-১৬৫৪) ব্যাবিলনিয় সভ্যতার ভিতটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেসময় রাষ্ট্রীয়কার্যে লিখিত ভাষারুপে ব্যবহৃত হত সেমিটিক আককাদিয় ভাষা; তবে ব্যাবিলনের ধর্মীয়জীবনের ভাষা ছিল সুমেরিয়। সুমেরিয় ভাষা কথ্য ভাষা ছিল না, মানে যখন সম্রাট হাম্মুরাবি ব্যাবিলনিয় সভ্যতার ভিতটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই সময়। ব্যাবিলনিয়ার ধর্মীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছিল সুমের ও আক্কাদ ।
ইরাকের মানচিত্র। বাগদাদ। এখানেই ছিল প্রাচীন ব্যাবিলন নগর।
সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয়ায় তখনও একেশ্বরবাদ গড়ে ওঠেনি। (একেশ্বরবাদী আব্রাহাম এর জন্ম হয়েছিল উর নগরে; ওই প্রাচীন পুরুষের সময়কাল ধরা হয় ২০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব। আমি আরও আগের কথা বলছি।) সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয়ায় ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যটি ছিল বহুঈশ্বরবাদী। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেত সে ধর্ম, যে কারণে উপসনালয়গুলি রাষ্ট্রীয় উদ্যেগেই গড়ে উঠত । আর, ব্যাক্তিজীবনে ছিল যাদুটোনা আর তুকতাক । নগরে ছিল নগর দেবতা। তবে দেবতাদের মর্যাদা সমান ছিল না, কেননা, নগরের প্রভাবশালী পুরুষদের মর্যাদা সমান ছিল না।
ব্যাবিলন। দজলা (তাইগ্রিস নদী)
সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয়ার প্রধান দেবতা ছিলেন মারদুক। এবং তার পুত্র নাবু। স্বভাবতই পুত্র নাবুর স্থান ছিল পিতা মারদুক-এক পরেই, যেমন সম্রাটের পরেই ছিল প্রধান পুরোহিতের দোদর্ন্ড প্রতাপ। ব্যাবিলনিয়ার অসংখ্য নগরে ছিল এদের উপসনালয়, বহু নগরের রাজনৈতিক উত্থানপতনের পিছনে ছিল ভিন্ন মতালম্বীদের সংঘাত। কেননা, একেক সম্প্রদায় বিচিত্র উপায়ে পিতাপুত্রের আরাধনা করত এবং একেক সম্প্রদায় মনে করত যে তাদের উপাসনা পদ্ধতিই সঠিক।
প্রধান দেবতা মারদুক। প্রধান দেবতা মারদুক কে নিয়ে রাজনীতিও কম হয়নি কিন্তু। সম্রাট আলেকজান্দার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ৩৩১খ্রিস্টপূর্বের অক্টোবর মাসে ব্যাবিলন নগরে প্রবেশ করেন। ব্যাবিলনবাসীকে খুশি করার গূঢ় উদ্দেশ্যেই তিনি মারদুককে ঈশ্বর মেনেছিলেন! মিশরেও একই কাজ করেছিলেন সেই যুদ্ধবাজটি!
মারদুক- এর প্রতীক
প্রধান দেবতা মারদুকের অন্যনাম বেল (বা বাল) মারদুক। এর মানে প্রভূ মারদুক। তিনিই ছিলেন ব্যাবিলন নগরের প্রধান দেবতা। অন্যান্য দেবতাদের উপাসনালয় থাকলেও কেবল তারই রয়েছে জিগুরাট। জিগুরাট শব্দটি আককাদিয় ভাষার শব্দ। এর অর্থ, উঁচু স্থানের নির্মান। ব্যাবিলন নগরে জিগুরাট নির্মিত হয়েছিল নগরের মাঝখানে। সাতটি ধাপ, ধীরে ধীরে উঠে গেছে, মাঝখানে সিঁড়ি, উঁচুতে ওঠার জন্য। লোকে বলত, এসগালিয়া। এই শব্দটি অবশ্য সুমেরিয়; অর্থ, উপসনালয়। তখন বলেছি, ব্যাবিলনিয়ার ধর্মীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছিল সুমের ও আক্কাদ । যা হোক। ব্যাবিলনবাসীর ধারণা ছিল জিগুরাট নির্মান করেছেন স্বয়ং দেবতা। একেক স¤প্রদায় অবশ্যি ঘটনাটি ব্যাখ্যা করত একেকভাবে।
মারদুক এর ড্রাগন
সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয়ায় প্রজ্ঞার দেবতা ছিলেন য়েয়া: তারই ছেলে মারদুক । অত্র অঞ্চলে কী ভাবে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল: মারদুক উদিত সূর্যের দেবতা । তা কীভাবে তিনি কৌলিন্য লাভ করলেন? কথিত আছে দুরাত্মা টিয়ামাৎ আক্রমন করেছিল ব্যাবিলনিয়ার প্রাচীন দেবতাদের, মারদুক সেই নারীকে পরাজিত করেছিলেন। দুরাত্মা টিয়ামাৎ তাহলে নারী? স্বাভাবিক। তখন নারীর ক্ষমতা লোপ পাচ্ছিল, কৃষির উদবৃত্ত থেকে গড়ে উঠছিল নগর, নারীকে ভয় পাচ্ছে পুরুষতন্ত্র ...নারীকে বর্ণহীন করার চেষ্টা চলছে .. যা হোক। মারদুক সেই নারীকে পরাজিত করে অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ দেবতার স্থান । এই শ্রেষ্ঠত্ব আসলে আশেপাশের নগরের তুলনায় ব্যাবিলন নগরেই শ্রেষ্ঠত্ব। উদিত সূর্যের দেবতা ছেলের নামটি বলা হয়েছে আগেই। ছেলে ত আর আকাশ থেকে পড়েনি; কাজে কাজেই স্ত্রীর নাম, সারপানিতু। উদিত সূর্যের দেবতার সৌভাগ্য সংখ্যা ১০; গ্রহ, মঙ্গল। রং? সম্ভবত লাল। কেননা, অন্যএক সূত্রে জেনেছি মঙ্গল-এর রং লাল।
উদিত সূর্যের দেবতা মারদুক এর পীঠস্থান জিগুরাট
অনেক অনেক পরে মারদুককে মনে করা হল ইউফ্রেতিস-টাইগ্রিস উপত্যকার সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণকারী; ...মানে, ব্যাবিলন কে শাসন করবে-সেটি নির্ভর করে মারদুকের ইচ্ছায় অনিচ্ছার ওপর । আরও অনেক কাল পরে মনে করা হল বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং মারদুক । মানবসভ্যতা বহুদেবোপাসনা থেকে একেশ্বরবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পরবর্তীকালে হিব্রুভাষীদের ইয়াওয়ের (হিব্রু ঈশ্বর) ধারনার পিছনে কার্যত সক্রিয় ছিল ব্যাবিলনের উদিত সূর্যের মারদুক দেবতা। প্রাচীন মিশরে যে সূর্যদেব -এর উপাসনার হত তা সেই একই ধারণার বিস্তার মাত্র; একেশ্বরবাদী মোজেজ যথাসময়ে গ্রহন করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে একেশ্বরবাদ সভ্যতার একটি অধ্যায় মাত্র, চূড়ান্ত কোনও কিছু নয়; অস্টাদশ শতকে সভ্যতা একেশ্বরবাদ থেকে বাঁক নিয়ে নিরেশ্বরবাদের দিকে চলেছে বলেই বোধ হয়...
ব্যাবিলন নগরে বিশুদ্ধ স্বর্নে নির্মিত মারদুকের একটি ভাস্কর্য ছিল । এছাড়াও আরও অনেক অলংকৃত মূর্তি ছিল তার। দেবতার সোনার মূর্তি? ব্যাবিলনবাসী তাহলে সচ্ছল ও ধনী ছিল? তা কি করে হয়, স্বচ্ছল ও ধনী ছিল কেবল জনসংখ্যার ৫% । বাদবাকিরা? শোষিত শ্রমজীবি। তাদের নিস্তেজ চেতনায় পুরোহিতগনের দ্বারা সচেতনভাবে পরকালের স্বপ্ন সঞ্চারিত হচ্ছিল। ‘তোমরা উদিত সূর্যের দেবতা এবং সম্রাটগনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিও না ... কেননা, সম্রাটগনের ভোগবিলাস এবং কর্তৃত্ব উদিত সূর্যের দেবতার ইচ্ছায় অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল ।’ যাক। ব্যাবিলনিয় নববর্ষে মারদুককে বহন করে নগর প্রদক্ষিণ করত ব্যাবিলনবাসী । জিগুরাট-এর নির্মাণ শ্রমিকেরাও নিশ্চয়ই উদিত সূর্যের দেবতার সে আনন্দযজ্ঞে যোগ দিত। উৎসবে ডুবে থেকে ভুলে থাকত চিরব্যথার ক্ষুধা-বাস্তবতা!
উদিত সূর্যের দেবতার প্রভাব ব্যাবিলনবাসীর মনে ছিল তীব্র হিপনোটিক; যে কারণে উদিত সূর্যের দেবতার আসন ব্যাবিলনবাসীর হৃদয়ে ছিল সুগভীর। ১৫৯৫ খ্রিস্টপূর্বে হিট্টি সম্রাট প্রথম মুরসিলিস (হিট্টি সাম্রাজ্যটি ছিল ব্যাবিলনের উত্তর-পশ্চিমে) ব্যাবিলন আক্রমন করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান ; তারপর তিনি ব্যাবিলনবাসীর মানসিক শক্তি ধ্বংস করার জন্যই দেবতা মারডুকের স্বর্ননির্মিত মূর্তিটি নিয়ে যান। মূর্তিটি কাসিতরা উদ্ধার করে পুনরায় ব্যাবিলনে স্থাপন করে ব্যাবিলনবাসীর মন জয় করে নেয় । তো, কারা কাসিত? কাসিতরা ছিল প্রাচীন পারস্যের একটি গোত্র। ব্যাবিলন জয় করে তারা ৪৫০ বছর শাসন করেছিল। কাসিত সভ্যতার সময়কাল: ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দ । এ কারণেই আমি বলছিলাম উদিত সূর্যের দেবতার আসন ব্যাবিলনবাসীর হৃদয়ে ছিল সুগভীর। কাসিতরাও জিগুরাট নির্মান করেছিল। কাসিতদের রাজধানী ছিল দুর কুরিগালজু। জায়গাটা ব্যাবিলনের কাছেই।
দুর কুরিগালজু।
এবার জিগুরাট প্রসঙ্গে আসি। বলেছি। এ অব্দি ৩২টি জিগুরাট-এর কথা জানা গেছে; এর মধ্যে ২৮টি ইরাকে এবং ৪টি ইরানে অবস্থিত। প্রাচীন ব্যাবিলনিয়ার যে কোনও নগরে জিগুরাটই ছিল সবচে বড় ধাপবিশিস্ট বিশাল কাঠামো। একেবারে শীর্ষে উদিত সূর্যের দেবতার উপাসনালয়। নগরে কেউ এলে প্রথমেই তার চোখের দৃষ্টি যেত জিগুরাটের দিকে। কাজেই সেই বিশালাকার স্থাপনাটি কেবল ধর্মস্থানই নয় নগরের গৌরবের প্রতীকও বটে। অনেক অনেক দূর থেকে দেখা যেত জিগুরাট। যেটির নির্মানের বিশালত্ব আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ব্যাবিলনিয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট হাম্মুরাবির (খ্রিস্টপূব১৬৯৬-১৬৫৪) কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তার সময়ে জিগুরাটের উচ্চতা ছিল প্রায় ১৫০ ফুট। পরবর্তী সময়ে নির্মিত জিগুরাটগুলির উচ্চতা দ্বিগুন হয়ে উঠতে থাকে, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ ফুট।
মনে রাখতে হবে। জিগুরাট কেবল ব্যাবিলন নগরেই নির্মিত হয়নি, অন্যান্য নগরেও নির্মিত হয়েছে। যেমন উর নগরের জিগুরাট বিখ্যাত। উর নগরের এক রাজার নাম ছিল উর-নামমু। সময়কাল? ২১১২-২০৯৫ খ্রিস্টপূর্ব। সম্রাট উর-নামমু-এর আমলেই প্রথম জিগুরাট গড়ে উঠছিল। সেসব জিগুরাট ছিল তিন ধাপ বিশিষ্ট। পরে অবশ্য জিগুরাটগুলি হয়ে ওঠে সাত ধাপের। প্রথম ধাপের উচ্চতা ১১০ ফুট উঁচু । তারপর ওপরের দিকে উচ্চতা কমে গেছে। যেমন সপ্তম ধাপ-এর উচ্চতা, ৫০ ফুট।
উর।
এখন প্রশ্ন এই, উঁচু করে কেন নির্মিত হত জিগুরাট? আকাশ ছোঁওয়ার জন্য। কেননা, আকাশে উদিত সূর্যের দেবতা বাস। মারদুকের যে মূর্তিটি দেখি, সে তো উদিত সূর্যের দেবতা প্রতীক। দেবতার যত কাছে যাওয়া যায় তত মঙ্গল নয় কি? তবে মাটিতেও উদিত সূর্যের দেবতার আরাধনা করা যায়; তবে আকাশ বলে কথা। এ বিষয়ে লালনের একটা তির্যক গান আছে-
কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা
দেখায় আশমানে?
এমন উদ্ভট ধারণার সূত্রপাত তাহলে উর নগরের সম্রাট উর-নামমু-এর আমলেই এবং যে ধারনাটি পরে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। যাক। মেঘবৃষ্টির পিছনের কারণ না ভেবে তখনকার লোকে এমনটাই ভাবত।
যা হোক। জিগুরাট নির্মানের প্রধান উপকরণ ছিল পায়ে দলা কাদা । বাইরের দিকটা হত ইটের। ওপরে যাওয়ার জন্য চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ি ৩০ ফুট চওড়া হত। নিচে পুরোহিতের বাসস্থান, আর ছোট ছোট কোঠা। শষ্যভান্ডার। ব্যাবিলনের হিপনোটিক জনগন উদিত সূর্যের দেবতাকে অর্ঘ্য দিত। সেসব তো পুরোহিতের ভোগেই লাগত। আর, জিগুরাট নির্মাণশ্রমিক? শ্রমসাধ্য জিগুরাট নির্মানকালে শ্রমিকের মৃত্যু যে হত না তা নয়, উপরোন্ত তারা ন্যয্য পাওনাও বোধহয় পেত না। এসব নিয়ে তৎকালে কে আর ভাবত। এতকাল পরে আমরাই ভাবি না! বিদ্রোহ করলে তো নরকবাস।
উর এর জিগুরাট
ব্যাবিলন নগরের জিগুরাট
জিগুরাট এর মডেল
ওপর থেকে
জিগুরাট এর মডেল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

