প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে আমরা বেশ মুগ্ধ ।
রুকসার সিগারেট টানছিল। ওকে গম্ভীর দেখায়। আমার ভিতরেও কাঁপা কাঁপা তিরতিরে অনুভূতি। শহর ছাড়িয়ে আসার অনুভূতি। গায়ে তাত লাগছে। বেশ লাগছে। সিগারেট টানছিলাম আমিও। ঘামছিলাম। মৃদু উদ্বেগ বোধ করছি। চোখ, নৌকার ওপর, পাথরশ্রমিকদের কর্মকান্ডের ওপর। জীবনের দুটি রুপ দেখছি যেন। একদিকে অবারিত উজ্জ্বল রৌদ্রময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে পাথর তুলে প্রকৃতিকে বিপর্যস্ত করার কদর্য রুপ-যে কারণে পাথর তোলার দৃশ্যটি যেন একেবারেই মানায় না। ভাবলাম: উপায় কি- শ্রমিকেরা খাবেই কি? জীবিকার টানে বাংলাদেশের নানাপ্রান্ত থেকে এসেছে। আমি অত্যন্ত বিষন্ন বোধ করতে থাকি। তখনও আমি জানতাম না যে গানের মাধ্যমে অনুভূতিটি অনেকের কাছে ছড়িয়ে যাবে। বিষন্নতার অনুভূতি নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম: নিভৃতে বুনি দুঃখের গান। আর সে কবিতা সুর করেছিল জন। অবশ্য অনেক বছর পর। ২০০০ সালে।
রুকসার নৌকা ভাড়া করছে ; পানিতে নামবে, সে প্রস্তুতি আমরা নিয়েই এসেছি। ডাউকির জল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও অগভীর। পানির নিচে অজস্র পাথর দেখা যায়। আমি নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে শার্ট খুলছি, পানিতে নামব, তার আগে লুঙ্গি পরব। গায়ে তাত লাগছে। বেশ লাগছে। ঘাম হচ্ছে। ওপরে তাকিয়ে দেখি-ওজোন লেয়ারের ওপাশে ... আকাশে পূর্বাহ্ণের সূর্য। আমার মনে হচ্ছিল ... (সূর্যটা) তাকিয়ে আছে মৃত্যুর এপারে ...এসব ভেবেই পরে লিখেছিলাম-
তাকিয়ে আছে মৃত্যুর এপারে (ওজোন লেয়ার যেন জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা)
জীবনের সুতীব্র উল্লাস দেখি আমি
সাদা রৌদ্রে ভাসছে সবি।
এপ্রিল মাস। তারপরও নদীর পানি কি শীতল! এতটা শীতলতা আশা করিনি। মুহুর্তেই উবে গেল শরীর ও মনের দাহ। পাথের নিচে পিছল পাথল। শ্যাওলার গন্ধ। ডুব দিলাম। তবে জলে নেমেও উদ্বেগ কাটল না। বারবার মনে হচ্ছিল আমার: নদী থেকে অবিরাম পাথর তোলা তো পরিবেশের ক্ষয়-নদীর ধর্ষন। সভ্যতার অন্তিম পরিণতিটি যেন দেখতে পাচ্ছি।
নদীর ধর্ষন লক্ষ করে মাথার ভিতরে অনেক কথা গুনগুন করছিল। পরে সিলেট ফিরে সে রাতেই লিখে রাখলাম-
ছায়ারা সরে যাবে, জানি সূর্য উঠবে।
মৃতসব গাছের নিচে আগুন জ্বলবে।
বুকের ভিতরে নদী; কুয়াশা কুয়াশা ...
পাথরের ওপর বসে দেখছি এসবি।
তাকিয়ে আছে মৃত্যুর এপারে
জীবনের সুতীব্র উল্লাস দেখি আমি
সাদা রৌদ্রে ভাসছে সবি।
পায়ে পায়ে ফিরে আসি আবার
নিভৃতে বুনি দুঃখের গান।
অনন্ত আগুনে পোড়ে অনিদ্র চোখ।
আমার বিবেক পোড়ে সূর্যের নিচে।
অনেক অনেক বছর পর জন আমার কাছে গানের কথা চাইল। ‘আমার পৃথিবী’ নামে ওই কবিতাই দিলাম। বললাম পরিবেশ সংক্রান্ত গান। চলবে তো?
জন মাথা নাড়ল। গিটারে ডি মেজর কর্ড ধরল। তারপর গুনগুন করে গাইতে লাগল-ছায়ারা ... আমি ...যাকে বলে মুগ্ধ। যে মুগ্ধতার ঘোর এত বছরেও কাটেনি।
জন
জন বলল: কম্পোজিশনটা কিছুটা রাগা টাইপ।
আমি টের পেলাম- ও যাকে রাগা টাইপ বলল আমি পেলাম রাগ ইমন এর ছোঁওয়া।
তখন তাহাসান ব্যান্ডের ভোকাল। জন বলল: গানটা ডুয়েট হবে।
ছায়ারা সরে যাবে, (তাহাসান) জানি সূর্য উঠবে (জন)।
মৃতসব গাছের নিচে (তাহাসান )আগুন জ্বলবে (জন)।
বুকের ভিতরে নদী; (তাহাসান) কুয়াশা কুয়াশা (জন)...
পাথরের ওপর বসে (তাহাসান) দেখছি এসবি (জন)।
গানটির কম্পোজিশনে জাহানের সেতারের কথা না বললেই না। জাহান তখন সেতার শিখছিল। ‘আমার পৃথিবীতে’ অসাধারন বাজাল।
জাহান; ডান দিকে
আমার পৃথিবীই ওদের প্রথম টিভি পারফর্মেন্স।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


