রাজু বলল, দাদু, তুমি কেবল প্রকৃতির সুন্দর দিকটাই দেখ, কেন যে তোমার চোখে প্রকৃতির ভয়াল রুপ পড়ে না ? এই সিডরের কথাই ধরো না কেন? কত লোক মারা গেল সিডরে। জান প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বজুড়ে কত মানুষ মারা যায়? ঈশ্বর থাকলে তা কি করে সম্ভব হত?
চৌধুরী সাহেব চুপ করে রইলেন।
জান দাদু, উদ্ভিদেরও ক্যান্সার হয়?
চৌধুরী সাহেব চমকে উঠতে উঠতে সামলে নিলেন। মলিন হাসলেন। চশমা খুলে পাঞ্জাবীর কোণে মুছলেন। তারপর চশমা পরে কিশোর নাতির মুখের দিকে তাকালেন। মায়ের কাটাকাটা চোখ-নাক পেয়েছে রাজু, রংটা অবিশ্যি বাপের মতন ফরসা; একমাথা কোঁকড়া চুল; কালো ফ্রেমের চশমা মুখে পড়–য়া পড়–য়া বুদ্ধিদীপ্ত ভাব এনেছে। নাতির সবই ভালো তবে সৃষ্টিকর্তার ওপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। প্রতিদিনই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নাতির সঙ্গে তর্ক
-বিতর্ক হয়। নাতির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে চৌধুরী সাহেব ভারী আমোদ পান । তাঁর এখন চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস গাঢ় হয়ে উঠছে, তাঁর বিশ্বাস এত সহজে টলবে না।
চারিদিকটা সকালবেলার রোদে ঝলমল করছিল । তিনতলার ছাদের ওপর বাগান। তারই এককোণের শেডয়ের তলায় বেতের চেয়ারে বসে আছেন নাতির মুখোমুখি; এদিকটায় কতগুলি টব। ডালপালার ঘন সবুজ ঘ্রান পাচ্ছেন। এসবই মিছে? এই ঘ্রান? ওদিকটায় ছোট সবজীর ক্ষেত। টমাটো, সীম, মটরশুঁটি বুনেছেন। ধনে পাতা দিয়ে টমাটোর সালাদ খেতে ভালোবাসেন চৌধুরী সাহেব-তার স্বাদ, এসবই কি মিছে? রাজুর যা বয়েস, ঠিক হয়ে যাবে। একদিন ও ঠিকই বিশ্বাস করবে। রাজু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে। চৌধুরী সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। রাজু তাঁর বড় ছেলের একমাত্র ছেলে। বড় ছেলে সিদ্দিক মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করে। কেমিষ্ট। বেতন ভালোই- তবে দেশে খুব কমই আসতে পারে। রাজু পড়ে ক্যাডেট কলেজে; আগামী বছর এইচ এস সি দেবে। সেও বছরে দু-একবারের বেশি আসতে পারে না। বৃদ্ধ বয়েস কেমন নিঃসঙ্গ থেকে গেলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চৌধুরী সাহেব। তবে রাজু এলে হইচই হয় । ছেলেটা আল্লাখোদায় বিশ্বাস করতে চায় না। বিজ্ঞানের নামে কী সব বলে-চৌধুরী সাহেবের হাসি পায়। আরে বইয়ের ভিতর দিয়ে জীবন বিচার করলে চলে? বেঁচে থাকাটা উপাদেয় করার জন্য দরকার সত্যের সঙ্গে মিথ্যা কল্পনার মিশেল । রাজুরা এটাই বোঝে না। জীবনে শুধু সত্য সত্য করলে জীবন পানসে হয়ে যায় না?
রাজু বলে যাচ্ছিল, তোমরা যে কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের ভিতর সৃষ্টিকর্তার মাহাত্ব্য দেখ, প্রকৃতির ভয়াবহতা উপেক্ষা কর-একে সিলেকটিভ অবজারভেশন বলে দাদু। ফর এভরি নিউ বেবি মিরাকুলাসলি বর্ন ইন দ্য মেটারনিটি ওয়াড, দেয়ার ইজ, ডাউন টু দ্য হল, আ লোনলি ওল্ড ম্যান ডায়িং আ টরচরাস ডেথ ইন দ্য ক্যান্সার ওয়াড। সদ্য পড়া বই থেকে মুখস্ত বলল রাজু।
নাতির মুখে ইংরেজি কথা শুনতে শুনতে চৌধুরী সাহেব দূর থেকে বউমাকে আসতে দেখলেন। বউমার হাতে ট্রে। চা এনেছে। এই সময়টায় শেডের তলে তিনজনে বসে চা খায়। টেবিলের ওপর ট্রেটা রেখে রাশেদা বসল। তারপর অনুযোগের সুরে বলল, দেখেন তো বাবা, আপনার নাতি কদ্দিন পরে মায়ের কাছে এল, এখনও বন্ধু বন্ধু করে অস্থির। বুধবার বন্ধুদের সঙ্গে কই যেন যাবার প্ল্যান করছে। আমি রাসেলকে ফোন করেছিলাম। রাসেল এড়িয়ে গেল। আজকালকার ছেলে-কেমন শয়তান!
চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে চৌধুরী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কই যাবি রে বুধবার?
কালেশ্বর বিল দাদু। রাসেল জিপ নিয়ে আসবে। নাহিদ আর সাইদরাও যাবে।
তো, যাক না বউমা।
অন্য সময় হলে রাশেদা অ-রাজী হতেন না। শ্বশুরের বিরুদ্ধে যাওয়া তার ধাতে নেই -শ্বশুরের সঙ্গে সর্ম্পক বেশ মোলায়েম। তবে আজ কী হল রাশেদার, বেঁকে বসল। তীক্ষ্মস্বরে বলল, না! তুই বুধবার কালেশ্বর বিল যেতে পারবি না। গেলে আমার মরা মুখ দেখবি।
চৌধুরী সাহেব ভীষণ চমকে উঠলেন। রাজুর মুখও কালো হয়ে উঠল। বলল, আচ্ছা মা, আমি যাব না।
যাবি না, না যাবি,সে তোর ব্যাপার। বলে রাশেদা চা না-খেয়েই উঠে চলে যায়।
চৌধুরী সাহেব গম্ভীর। নরম সুরে বললেন, না গেলে কি এমন হয় রে? মায়ের জন্য স্যাক্রিফাইস করতে পারবি না?
বললাম তো আমি যাব না।
চৌধুরী সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
বুধবার দুপুর বেলা। রাজু ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একা। কী কারণে তাকে ভীষণ অস্থির আর বিষন্ন লাগছিল। ওপাশে সার সার নাড়কেল গাছ। কি এর মানে? যদি ঈশ্বর না-ই থাকে। নাড়কেল পাতায় ঝলমলে রোদের দুলুনি। রেলিংয়ের ওপাশে একটা টেনিস বল; হঠাৎ চোখ গেল। সবুজ রঙের। একেবারে নতুন। আরে টেনিস বল এল কোত্থেকে? কোনওকিছু না-ভেবেই রাজু রেলিং টপকালো। এমন সময় ফোনটা বাজল। পকেট থেকে সনি এরিকসনটা বার করে রাজু। হ্যালো ... হ্যালো ... শোন ...তমা ... শোন ... ভীষণ বিরক্ত হয়ে ফোনটা অফ করে টেনিস বলটা নিতে ঝুঁকল, কী কারণে মাথা টলে উঠল, পায়ের নিচে ঘন শ্যাওলা ... ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল । গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল দারোয়ান। দৃশ্যটা দেখতে পেয়ে সে চিৎকার করে উঠল। নিচতলার ভাড়াটে উকিল সাহেবের ড্রাইভার খেতে বসেছিল। চিৎকার শুনে ভাত ফেলে ছুটে আসে। রাজুর রক্তমাখা অচেতন শরীর দ্রুত গাড়িতে তুলে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
লাভ হয়নি।
ঘটনার আকস্মিকতায় চৌধুরী সাহেব নির্বাক হয়ে গেলেন। শরীরের সমস্ত শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে। অনেক কষ্টে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে বড় ছেলেকে টেলিফোন করলেন। ছেলে অঝোরে কাঁদল। কাজের ভীষণ চাপ, আসতে পারবে না। ঘোরের মধ্যে চৌধুরী সাহেব নাতির শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন। ক’দিন চারিপাশের দৃশ্য রংশূন্য সাদাকালো দেখলেন। চোখের রং ধীরে ধীরে ফিরে এলেও টের পেলেন পানির পিপাসা একেবারে নিভে গেছে। সকালের দিকে হাঁটতে যেতেন, এখন আর সেরকম ইচ্ছে করে না। সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে থাকেন।
রাশেদা পাথর। কাঁদতে পারে না। দিন কয়েক আগে রাশেদার ছোট বোন বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছে। রিনার শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুর, দুদিন থেকে চলেই যেত- বড় বোনের বিপদ দেখে থেকে গেল। ছোটবোনকে জড়িয়ে রাশেদা বারবার বলতে লাগল, আমিই ওকে মেরে ফেললাম। ও ওর বন্ধুদের সঙ্গে কালেশ্বর বিল যেতে চেয়েছিল। আমি যেতে দিলাম না। যেতে দিলে ... যেতে দিলে আমার ছেলে ওভাবে মারা যেত না।
রিনা বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, থাক রাশু। সবই আল্লার ইচ্ছে। মনে কর তোর ছেলেকে আল্লা নিয়ে গেছেন।
এই কথায় মায়ের কী সান্ত্বনা হয়।
এক ফাঁকে চৌধুরী সাহেবের ঘরে এল রিনা। বলল, জানেন খালুজান। আমি কিন্তু গাজীপুর আসার আগে ভীষন খারাপ স্বপ্ন দেখছি।
কি দেখছ?
দেখছি, গাজীপুরে ভূমিকম্প হইছে। আর আপনার বাড়িটা নাই, সেই যায়গায় খাল। রুপার মতন পানি খলখল করতেছে, আর একটা সাদা রঙের গাভী, গাভীর গায়ে আগুন ...
চৌধুরী সাহেব শিউড়ে উঠলেন।
একটু চুপ করে রিনা বলল, খবর নিয়ে দেখেন ...
কী দেখব?
আপনার ছেলে-
আমার ছেলে কি?
আমার মনে হয় খালুজান সিদ্দিক দুলাভাই ছৌদি আরবে আরেকখান বিয়া করেছে
চুপ কর! ফাজিল মেয়ে কোথাকার! চৌধুরী সাহেব চিৎকার করে উঠলেন। ময়নার মা এ বাড়ির পুরনো ঝি। চিৎকার শুনে সে ছুটে এল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, আমারে কিছু বলেন খালুজান? চৌধুরী সাহেব কি বলবেন। তাঁর শরীর রীতিমতো কাঁপছে। বোনের শ্বশুরের ধমক খেয়ে রিনার মুখ শুকিয়ে যায়। চৌধুরী সাহেব আর কিছু বললেন না। রাশেদার কানে যাবে। বাইরের লোকের জন্য ঘরে অশান্তি করা ঠিক না। চৌধুরী সাহেব রাগ হজম করলেন।
পরদিন রাশেদা এসে চৌধুরী সাহেব কে বলল, বাবা।
বল মা। বুকটা অল্প অল্প কাঁপছে। রিনা সম্ভবত অন্যরকম ইঙ্গিত করেছে।
ময়নার মা গতকাল রাতে কী যেন দেখল।
কী দেখল মানে?
অল্প বয়েসি ছেলে। রান্নাঘরের অন্ধকারে দাঁড়ায় ছিল। কালরাতে একবার কারেন্ট গেল না, তখন ...
হুমম।
বাবা? রাশেদা বলল।
বল।
মৌলবী ডেকে খতম পড়ালে হয় না?
ঠিক আছে। বলছ যখন ...
পরদিন। বাদ আসর মিলাদ। তার আগে স্থানীয় মাদ্রাসার বারোজন ছাত্র এসে সুর করে সারাদিন কোরান তেলোয়াৎ করল। দুপুরে মিসকিন খাওয়ালেন চৌধুরী সাহেব। এক ফাঁকে রাশেদা বলল, ছেলেটাকে রিনাও দেখেছে। অল্প বয়েসি একটা ছেলে সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। একটুপর দেখে নাই।
কথাটা শুনে চৌধুরী সাহেবের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়।
সন্ধ্যার পর রিনারা চলে গেল । চৌধুরী সাহেব জানেন রিনা আসলে ভয় পেয়েছে। অপঘাতে মারা গেলে ভূত হয় .. লোকের এমনই বিশ্বাস।
শোক কিছুটা স্তিমিত হলে চৌধুরী সাহেব রাজুর ঘরে এলেন। দক্ষিণমুখি ঘরটা ছোট, তবে সুন্দর করে সাজানো। খাট, আলমারী, টেবিল। এক কোণে একটা গিটার। বিছানায় অনেক বই ছড়িয়ে। চৌধুরী সাহেব বিছানার ওপর বসলেন। এক এক করে বইগুলো দেখছেন। ডেভিড মিলস এর ‘আথিস্ট ইউনিভারস’; স্তেফান এইনহর্ন এর ‘আ কনসিলড গড’; জেমস ডি স্টেইন এর ‘এর হাউ ম্যাথ এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়াল্ড’ ব্রিয়ান রিগ্যাল এর ‘হিউম্যান এভ্যুলেশন’ কার্ল সাগান এর ‘দি কসমিক কানেকশন’; স্টিভেন ওয়েনইবার্গ এর ‘দি ফাস্ট থ্রি মিনিটিস’; প্রতিটি বইয়ে বৃত্তাকার নীল রঙের সিল: ফ্রি থিঙ্কার্স; কনডাকটেড বাই: মাহাবুবুল আলম । কে মাহাবুবুল আলম? অন্যমনস্ক হয়ে ডেভিড মিলস ‘আথিস্ট ইউনিভারস’ বইটা তুলে নিলেন। বইয়ের ভিতর থেকে একটা কী পড়ল, একটা ছবি, কিশোরী মেয়ের ছবি। কার? চৌধুরী সাহেব বিস্মিত। বিছানার পাশে রাখা ল্যান্ড ফোনটা ঝন ঝন করে বাজল। চমকে উঠলেন। ঝুঁকে রিসিভার তুলে বললেন, হ্যালো।
ও প্রান্তে কেউ কথা বলল না ।
অনেকক্ষণ ওপ্রান্ত নীরব থাকলে রিসিভার রেখে দিলেন চৌধুরী সাহেব। ডিসপ্লেতে একটা অপরিচিত নাম্বার। মনে গেথে নিলেন। ছবিটা দেখছেন। চশমা পড়া শ্যামলা মিষ্টি মুখ।
হঠাৎ লক্ষ করলেন ছবি পিছনে ছোট ছোট করে লেখা:“ তমা, আমি যেমন সেভাবেই যদি তুমি আমাকে গ্রহন না কর তাহলে আমি ঠিকই কালেশ্বর বিলে ডুবে মরব।” শেষে রাজুর নামটা লেখা। চৌধুরী সাহেব ভীষণ চমকে উঠলেন। রাজু কি তা হলে আত্বহত্যা করল?
পরদিন। সকালের দিকে একতলার মেন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন চৌধুরী সাহেব। মেন গেটের কাছে নাড়িকেল গাছ। দারোয়ান গাছের গোড়া পরিস্কার করছে।
একটা কালো রঙের জিপ এসে থামল।
চৌধুরী সাহেব মুখ তুলে চাইলেন। জিপ থেকে সতেরো-আঠারো বছরের কিশোর নামল। রাসেল। রাজুর বন্ধু। দূর থেকেই সালাম দিল রাসেল । মুখটা শুকনো। স্বাভাবিক। জীবন থেকে বন্ধু ঝরে গেল।
দু-এক কথার পর চৌধুরী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মাহাবুবুল আলম কে বলত?
মুহূর্তেই রাসেলের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল। আমাদের স্যার। ফিজিক্স পড়ান। খুবই পপুলার। ভীষণ এনলাইটেড মানুষ।
কোয়াটারেই থাকেন?
হ্যাঁ। স্যারের বাড়িতেই আমাদের ক্লাব।
ক্লাব মানে?
মাহাবুব স্যারকে সভাপতি করে আমরা একটা ক্লাব করেছি। ফ্রি থিঙ্কারর্স ক্লাব। কেন রাজু আপনাকে বলেনি?
চৌধুরী সাহেব চুপ করে থাকেন।
আমরা সবাই রিলিজিয়াস ডগমা আর মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই
করছি। মাহাবুব স্যারের লাইব্রেরিতে অনেক বই আছে। রাজুর কাছেও তো অনেক বই আছে। আপনি দেখেননি?
হ্যাঁ। দেখেছি। তা তোমাদের স্যারের ছেলেমেয়ে ক’জন?
স্যারের তিনি মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটা ছোট, নাম ফিদেল, ক্লাস ওয়ানে পড়ে ।
আর?
স্যারের বড় মেয়ে রুখসানা আপার গত বছর বিয়ে হয়ে গেছে। বাকি দুই মেয়ে পড়াশোনা করে ঢাকায় । রুমা আর তমা। এরা যমজ। এরা দুজনই আমাদের সঙ্গে আগামী বছর ইন্টারমিডিয়েট দেবে । রুমা অবশ্য আমাদের ক্লাবে সদস্য তবে তমা ...।
হ্যাঁ। বল, তমা?
তমা ... তমা ওর বাবার যুক্তিবাদী শিক্ষা সত্ত্বেও ছোটবেলা থেকেই কী এক কারণে ডিপলি রিলিজিয়াস । তমা আমাদের কাছে এক রিডল। সো ... সো মাহাবুব স্যার মেয়ের ওপর খুব একটা প্লিজড না।
ও, আচ্ছা বুঝেছি।
সেদিন সন্ধ্যায় ছাদে একা বসেছিলেন চৌধুরী সাহেব। বাগানের ওপর বেলাশেষের ছায়া পড়েছে। আকাশেও শেষবেলার নানারকম আলো। রাজুর মৃত্যুর কারণ অনেকটাই পরিস্কার। রাজু লিখেছিল: “তমা, আমি যেমন সেভাবেই যদি তুমি আমাকে গ্রহন না কর তাহলে আমি ঠিকই কালেশ্বর বিলে ডুবে মরব।” তমার সঙ্গে কথা বলা দরকার। নম্বরটা মনে আছে। তমা সম্ভবত রাজুকে বিশ্বাসের পথে ফেরাতে চেয়েছিল। একদিকে স্বাধীন চিন্তার আকর্ষন, অন্যদিকে কিশোর বয়েসের ভালোবাসা-এই দ্বন্ধই সম্ভবত সহ্য করতে না পেরে ...
মাগরিবের আজান শুনতে পেলেন। নামাজ পড়বেন। অজু করাই ছিল। সিঁড়িঘরের দিকে যেতে থাকেন। সিঁড়ি ঘরে আবছা অন্ধকার। ঘরে ঢোকার আগে একবার ফিরে তাকালেন। কে যেন ওখানে দাঁড়িয়ে মনে হল। কিশোর বয়েসি ...
দ্রুত ঘরে ফিরে এলেন চৌধুরী সাহেব। রাশেদা আগরবাতি জ্বালাচ্ছিল।
বউমা? বউমা?
বলেন বাবা।
সিঁড়িতে কি যেন দেখলাম।
কি ...কি দেখলেন বাবা!
কি দেখলাম ঠিক বুঝতে পারলাম না তবে ...কথাটা শেষ না করে নিজের ঘরে চলে এলেন চৌধুরী সাহেব ।
আজকাল রাতের বেলায় চৌধুরী সাহেবের খুব একটা ঘুম হয় না। অনেক রাত অবধি তিনি রাজুর ঘরে বসে থাকেন। তমা নামে একটি কিশোরীর ফোনের অপেক্ষায় থাকেন... তখন টের পান কে যেন ঘরের অন্ধকারে এসে দাঁড়ায়-অবশ্য মনের ভুলও হতে পারে ...
আসলে জীবনের শেষবেলার মানুষ নানারকম আলো দেখে ।
তিনিও দেখছেন ...
উৎসর্গ: আকাশ পাগলা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

