সকালবেলায় চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়েছি। তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে । আজ উজ্জ্বল রোদের একটা দিন। সেই সঙ্গে কনকনে হাওয়াও আছে। এ শহরের আজ একটি করুনতম ঘটনা ঘটতে চলেছে। অথচ দিনটা আজ ভয়ানক রৌদ্রকরোজ্জ্বল।দিনটা আজ কুয়াশাময় কালচে ধূসর হলেও পারত।
কাল সারারাত আমার ঘুম হয়নি। আমার এখন ঘুম পাচ্ছে। বেকার বলেই কিনা কে জানে- দিনের বেলায় ঘুম পায় আমার। আপাতত আমি বেকার। মাস দুয়েক আগেও আমি একটা দেশি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে রাতদিন ব্যস্ত ছিলাম । আমার সেই ব্যস্ততা ছিল অর্থহীন; কেননা, জানালার ওপাশের নীলাকাশ ও সোনালি রোদগুলি আমাকে নিঃশব্দে ডাকত। এসব কারণেই চাকরি-বাকরি আমার ভালো লাগে না। দু-তিন মাস একটানা চাকরি করলে আমার হাঁপ ধরে যায়। সেসব কথা শুভ্রকে বলি । শুভ্ররও চাকরি-বাকরি ভালো লাগে না-ওর ভালো লাগে গাছপালা আর রোদ-জল-বিল-পাখি। শুভ্র আমার অনেক পুরনো বন্ধু। আমি না হয় এম এটা অন্তত পাস করেছি; এইচ এস সি পাস করে শুভ্র আর পড়ল না। তবে চমৎকার ছবি আঁকে শুভ্র। আর এরইমধ্যে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। আর খুব ঘুরে বেড়ায় শুভ্র। আমিও কখনও কখনও ওর ভ্রমনের সঙ্গী হই। আজমিরিগঞ্জ- বানিয়াচং -লাখাই -বাহুবল- চুনারুঘাট কিংবা পানছড়ি-দীঘিনালা-মাটিরাঙ্গা-মহালছড়ি -রামগড় ... কখনও ঢাকার অদূরে গাজীপুর সদরের পশ্চিমে কালেশ্বর বিল। বর্ষার সময়ে কালচে জল ও পদ্মপাতায় মোড়ানো জলজ সবুজ বিলটি শুভ্রর বড় প্রিয়। বিলটির দক্ষিণে প্রায় ২ কিলোমিটার ঘন বৃক্ষরাজীর বিস্তার । স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ে কালেশ্বর বিলের জলে ও দক্ষিণ পার্শ্বস্থ জঙ্গলে অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে শুভ্র। সেই অভয়ারণ্যের আদিম অন্ধকারে শুভ্র আচমকা চিৎকার করে ওঠে-
আমরা দেবতার তৃষ্ণার জল
আমরা তার প্রিয়
আমাদের ঘাম ও রক্তও তার প্রিয় ...
শুভ্র অভয়ারণ্যের নাম দিয়েছে পাখিপুর। পাখিপুরের পুরোহিত শুভ্র । সে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রাকৃতিক ধর্মে দীক্ষা দেয়। সমবেত লোকসকলের উদ্দেশ্যে শুভ্র বলে: বল যে আমরা দেবতার তৃষ্ণার জল
সমবেত লোকসকল বলে: আমরা দেবতার তৃষ্ণার জল
সমবেত লোকসকলের উদ্দেশ্যে শুভ্র বলে: বল যে: আমরা তার প্রিয়
সমবেত লোকসকল বলে: আমরা তার প্রিয়
সমবেত লোকসকলের উদ্দেশ্যে শুভ্র বলে: আমাদের ঘাম ও রক্তও তার প্রিয় ...
সমবেত লোকসকল বলে: আমাদের ঘাম ও রক্তও তার প্রিয় ...
রিজওয়ানা, শুভ্রর প্রেমিকা- আমার বড় মামার মেয়ে । রিজওয়ানার সঙ্গে শুভ্র সারাজীবন কাটিয়ে দেবে পাখিপুরে। শুভ্র- রিজওয়ানার সম্পর্ক অনেক দিনের, বস্তুত আমার সঙ্গে শুভ্রর সম্পর্ক যতদিনের পুরনো, রিজওয়ানার সঙ্গে শুভ্রর সম্পর্ক ঠিক ততদিনের । ওদের বিবাহবাসরের পর পাখিপুরে রিজওয়ানার ভূমিকা হবে মাছ, পদ্মপাতা ও পাখিদের মা। শুভ্রর কবি ও পুরোহিতের। তবে শুভ্রর শঙ্কা এই: স¤প্রতি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানী চোখে পড়েছে পাখিপুর । প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিদের হাত করে পাখিপুরের দখল নিতে চাইছে চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা । কালেশ্বর বিলের দক্ষিণ পাড়ে কে বা কারা রাতারাতি একটি সাইনবোর্ড বসিয়েছে। তাতে লেখা: অত্র এলাকাটি ‘গ্রিন নেস্ট’ প্রপার্টিজ এর সংরক্ষিত এলাকা। অত্র এলাকায় জনসাধারনের প্রবেশ নিষেধ।
২
এই রনি। ওঠ!
উঁহু।
তোর বড় মামা বারবার ফোন করছে।
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা যখন ঠেলে আমার ঘুম ভাঙ্গল, তখন বেলা দেড়টা।
আজ রিজওয়ানার বিয়ে। বিয়েতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না আমার। দীর্ঘদিন ধরে আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছি। কমিউনিটি সেন্টারে দেখাসাক্ষাৎ হলে নানান উটকো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কি করা হয়? কি জবাব দেব? আমি আর শুভ্র যে গত অক্টবরে হাকালুকি হাওর গিয়েছিলাম ... সে কথা কি বলা যাবে? সৌম্য চৈতন্য নামে কবিতা লেখে শুভ্র। ওর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম: “ আমরা দেবতার তৃষ্ণার জল?” সে কথা কি বলা যাবে?
মায়ের পীড়াপীড়িতে কমিউনিটি সেন্টারে যেতেই হল ।
সি এন জিতে মা বলল, কাল তোর বড় মামা বলল কল্যাণপুরের জমিটা আমরা রিজওয়ানার শ্বশুরকে দিতে পারি। এখন ওরা আমাদের আত্মীয় যখন- ঠকার ভয় নেই। তুই কি বলিস?
আমি চুপ করে থাকি। দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শুভ্রর মুখটি আমার মানসপটে ভেসে উঠল। আত্মীয় বলেই ভালো হয়ে গেল? ‘গ্রিন নেস্ট’ প্রপার্টিজ এর চেয়ারম্যান সাত্তার মির্জা এখন বড় মামার বেয়াই । ‘গ্রিন নেস্ট’ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাকে এসব বুঝিয়ে লাভ নেই। গাজীপুরের কালেশ্বর বিলের একাংশ অবৈধভাবে দখলে নিয়ে ‘স্বপ্নের নীড়’ আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে যাচ্ছে ‘গ্রিন নেস্ট’ ।
আমার বড় মামা একজন বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট। যথেষ্ট অর্থ ও যশ অর্জন করেছেন। এখন একমাত্র মেয়ের বিয়েতে সেসব ঢেলে দিচ্ছেন । ঘিয়ে রঙের সাফারি স্যুট পরে শশব্যস্ত হয়ে ঘুরছেন। আমাকে এক ফাঁকে দেখলেন। কথা বললেন না। আমি একটার পর একটা চাকছি নিচ্ছি আর কিছুদিন পরেই ছেড়ে দিচ্ছি। পরিবার-পরিজনের কাছে দিন দিন ‘অস্বাভাবিক’ হয়ে উঠছি। ‘অস্বাভাবিক’ লোকের সঙ্গে ‘প্রতিষ্টিত স্বাভাবিক’ লোকে কথা বলবে কেন।
রিজওয়ানা এখন কোথায়?
খোঁজ নিয়ে জানা গেল বিউটি পারলার থেকে এখনও আসেনি কনে।
শুভ্র এখন কি করছে?
আজ শুভ্রর ফ্লাইট। বিকেল ৫টায়। ওর সঙ্গে আসন্ন বিচ্ছেদের জন্য অত্যন্ত বিষন্ন বোধ করছি। শুভ্র আর কোনওদিন এ শহরে ফিরবে না বলেছে।
এমন করে কি দূরে চলে যাওয়া যায়-যখন আমরা আমাদের ভবিতব্যকে জানি না? এই প্রশ্নটি কয়েকদিন আগে শুভ্রকে করেছিলাম।
শুভ্র চুপ করে থাকে।
আরও বললাম, যেখানে যাচ্ছিস, সেখানেও তো সম্পর্কের বেড়াজাল তৈরি হবে। কেউ সুখ দেবে, কেউ দুঃখ দেবে। তখন?
শুভ্র চুপ করে থাকে। আমি ওর মনোভাব জানি। ভূমিদস্যুরা রিজওয়ানা কে লুঠ করে নেবে-শুভ্র তা সইতে পারবে না। এরচে অনেক অনেক দূরে হারিয়ে যাবে ও। পাখিপুরও তো হাতছাড়া হয়ে গেল। শুভ্র আমার প্রিয়তম মানুষের একজন। আমি ওর জীবনের সমস্ত ঘটনা জানি। কোথায় ওর সুখ, কোথায় ওর দুঃখ। ঠিক কবে রিজওয়ানার সঙ্গে ওর পরিচয়, রিজওয়ানাকে কতটুকু ভালোবাসে। তারপরও আজ আমি ওকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্ট যাব না। আমি পারব না। আমার সে সাহস নেই। আজ আমার দূরে কোথাও লুকিয়ে থাকার ইচ্ছে ছিল। রিজওয়ানার বিয়েতেও আসার ইচ্ছে ছিল না। মায়ের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আসতে হল।
ধীরে ধীরে অতিথিরা আসছে। মূল্যবান শীতবস্ত্রের প্রদর্শনী চলছে। শাল-ব্লেজার ও কোট। কান পেতে অতিথিদের মূল্যবান কথাবার্তা শুনছি। এবারের শীত ...উহ্ ...আর বলবেন না ... যাক, আজ রোদ উঠল ... বুঝলেন একে বলে জলবায়ূ পরিবর্তন ... জলবায়ূ পরিবর্তন ... উত্তরাঞ্চল শীতে ...আরও কম্বল লাগবে ...সরকার বুঝতে চাইছে না ... ইত্যাদি ...
আমার দেখে যাওয়া ছাড়া কি আর করার আছে?
আমি প্রেমহীন একটি দিনের উৎসবে ঘুরছি।
ঘড়ি দেখলাম। দুটো বেজে এগারো মিনিট।
উঁকি মেরে দেখলাম ভিতরের একটি ঘরের ডিভানের ওপর রিজওয়ানা ডানাকাটা শুভ্র পরীর মতো সেজে বসে আছে। ঘরটায় মেয়েদের ভিড়। ওদিকে আর গেলাম না। অথচ যাওয়ার দরকার ছিল। রিজওয়ানাকে একটা কথা বলার ছিল আমার। বিকেল ৫টায় শুভ্রর ফ্লাইট । কথাটা শুনে রিজওয়ানা কি চমকে উঠবে। ও কি কাতর হয়ে উঠবে? আমি ঠিক শিওর না। শুভ্র কবি। কবিদের একা থাকাই ভালো। না, শুভ্র ঠিক কবি না। শুভ্র পুরোহিত, পাখিপুরের পাখিদের পুরোহিত। পুরোহিতের সঙ্গে সম্পর্কটা আগুনের। নারী আগুন নয়- আগুন ও নারীর সম্পর্কটা বৈরী।
বরপক্ষ এল।
ভিড়ের ভিতরে রিজওয়ানার বর কামরান মীর্জাকে দেখলাম। আগেই একবার দেখেছিলাম টিভিতে। একটা শোরুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিল। লম্বা ফরসা যুবক। চোখে চশমা। অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রভাষকের মতন দেখতে । কে বলবে এই সুদর্শন তরুণটিই ভূমিদস্যুদের একজন। বাংলাদেশের শোষক-পরিবারগুলি দিনদিন সফিসটেকেটেড হয়ে উঠছে। তিরিশ বছর আগে এরা এত মোলায়েম ছিল কি? গাজীপুরের কালেশ্বর বিলের আবাসন প্রকল্পটি নাকি কামরান মীর্জাই দেখাশোনা করছে। বিলপাড়ে কটেজ তুলেছে যুবকটি। বিয়ের পর রিজওয়ানাকে নিয়ে নিশ্চয়ই ওখানে বেড়াতে যাবে । এবং রিজওয়ানা দেখবে শীত শেষে ঝাঁক ঝাঁক পাখি ফিরে যাচ্ছে সাইবেরিয়ার উদ্দেশে। ওরা আর ফিরে আসবে না ...
পাখিপুর ছারখার হয়ে যাচ্ছে রিজওয়ানা!
আমার ভিতরে কে যেন নিঃশব্দে চিৎকার করে ওঠে।
মা বারবার করে বলেছে, আমি যেন খাওয়ার সময় তদারকি করি- তোর বড় মামার সম্মান। সম্মান না ছাই! মার এখন বড় মামার মধ্যস্থতা প্রয়োজন। কল্যাণপুরের আড়াই কাঠা জমিসহ পুরনো দোতলা বাড়িসহ জমিটা রিজওয়ানার শ্বশুর সাত্তার মির্জার হাতে তুলে দেবে মা । দশফুটি গলির গলির ভিতরে অতটুকু জমি কোনও ডেভেলাপার নিতে চাইছে না। তার ওপর দীর্ঘদিনের ভাড়াটে উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না, ভাড়াও বাড়ানো যাচ্ছে না। মা জানে, ‘গ্রিন নেস্ট’ প্রপার্টিজ কল্যাণপুরের ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করতে বেগ পেতে হবে না।
অতিথিরা খেতে বসে গেছে। আমি এ টেবিল থেকে ও টেবিল ঘুরঘুর করছি। খানসামাদের এটা ওটা নির্দেশ দিচ্ছি। বাইরে থেকে দেখে আমাকে শান্ত ও স্বাভাবিক লাগার কথা।
৩
আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করল না। আধ গ্লাস বোরহানি খেয়ে কমিউনিটি সেন্টারের বাইরে চলে এলাম। বমি বমি লাগছে। কপালের বাঁ পাশের রগটা টিপ টিপ করছে। অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি। ধরালাম একটা। সিগারেটের ধোঁওয়া কাগজ পোড়া মনে হল। ফুটপাতের ওপর একটা উদ্বাস্তু পরিবার টায়ার পুড়িয়ে রান্না করছে। আমার বমির ভাবটা বেড়ে যায়। টক টক ঢেঁকুর উঠছে।
শীতের দিনটা আজ কেন যেন ভয়ানক উজ্জ্বল। আর সেই সঙ্গে বইছে কনকনে বাতাস । আজ দিনটা কেন কুয়াশায় ঘোলা হয়ে রইল না? আজ যখন এ শহরের একটি করুনতম ঘটনা ঘটতে চলেছে।
ভূমিদস্যুদের হাতে লুঠ হয়ে যাওয়ার আগে রিজওয়ানাকে আমি শুভ্রর সঙ্গে পাখিপুরে পালিয়ে যেতে বলেছিলাম । রিজওয়ানা চুপ করে ছিল। টিভির ঝলমলে বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়েছে কি সহজ সরল মেয়েটি? তাছাড়া পালিয়ে গেলেই-বা কি লাভ হত? কামরান মীর্জারা ঠিকই বার করে ফেলত। অন্যভাবে। এদের হাত অনেক দীর্ঘ। ওদের হাত থেকে পাখিদের মা কিংবা প্রকৃতি উপাসকদের রক্ষা নেই। কারা যেন দাবী করছে, পৃথিবীর স্থলভাগ নাকি এ শতকেই তলিয়ে যাবে সমুদ্রের গভীরে। তেমনই তো হওয়ার কথা। পৃথিবী অনেক আগেই কামরান মীর্জাদের দখলে চলে গেছে । একজন পাখির প্রেমিকের আজ আর পৃথিবীর ওপর বিন্দুমাত্র অধিকার নেই!
রিজওয়ানা যখন ওর বরের গাড়িতে উঠল তখন বিকেল ৫টা।
শুভ্র ঠিক এ মুহূর্তে প্লেনের সিটে বসে কি ভাবছে কে জানে।
ফুলে ফুলে শোভিত সাদা রঙের বিএমডাবলিউটি বেরিয়ে গেল কমিউনিটি সেন্টারের বাইরে।
রাস্তার ওপাশের একটি পাতাশূন্য গাছে হাজার হাজার কাক ডাকছে।
শীতের বেলা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
পাখিপুরে রাত নামছে।
(উৎসর্গ: স্বপ্নচারী রিয়াদ )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



