১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি এক বিনম্র আলোর ভোরে পাকিস্তানি মিলিটারি লঞ্চের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেজর জুলফিকার কামরান এর ছোড়া গুলিতে নিহত হয় নদীর পাড়ে নৃত্যের ভঙ্গিমায় থাকা একটি কিশোরী । লঞ্চটি একটি চরের পাশ ঘেঁষে যাচ্ছিল; চরের নাম, শুভগাছা-, দু’পাশে প্রবাহিত যমুনার কালচে জল । এপ্রিল মাসের পর থেকেই ক্রমশ বিপদজনক হয়ে উঠছিল যমুনা- রাতদিন পাকিস্তানি মিলিটারি লঞ্চের টহল। জেলেদের ছদ্মবেশে স্থানীয় সশস্ত্র যুবকেরা আছে ছোট নৌকায় । দু’পক্ষের সংঘর্ষে প্রচন্ড বিস্ফোরনে প্রায়শ কেঁপে কেঁপে উঠছে নির্জন নদী। আবহমান কাল থেকে এ নদীটি অনেক সংঘাত ও মৃত্যুর সাক্ষী- কিন্তু, এ রকম মরণপন লড়াই নদীটি এর আগে কখনও দেখেনি।
ভটভট শব্দে চর শুভগাছার খুব কাছে চলে আসা মিলিটারি লঞ্চের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেজর জুলফিকার কামরান ১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি এক বিনম্র ভোরের আলোয় সবুজ শাড়ি পরা একটি শ্যামলা মেয়েকে নৃত্যের ভঙ্গিতে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন । এত ভোরে নদীপাড়ে ঐ কালো মেয়েটি নাচছে কেন? মেয়েটি কি হিন্দু? হিন্দুই মনে হয়। মুসলিম মেয়ে হলে নাচবে কেন। যেন লাহোরের হীরামন্ডির মুজরো-নাচা মেয়েরা মুসলিম নয়-বিজাতীয়। আর একটু পরেই বলা হবে যে- পাকিস্তানি মেজর জুলফিকার কামরান এর শরীরে পূর্বপুরুষের মুগল রক্ত প্রবাহিত ...সে মুগল রক্তের শরীর এখন পৃথিবীর এ প্রান্তের বদ্বীপের একটি নদীমাতৃক অঞ্চলে রক্তের হোলি উৎসবে মেতে উঠেছে।
লঞ্চের পিছনের ডেক থেকে ধস্তাধস্তির আওয়াজ ভেসে এল। মেজর জুলফিকার কামরান নাক দিয়ে অদ্ভূত এক শব্দ করলেন। কাল রাতে সার্চ লাইট আর খান সেনাদের চোখ এড়িয়ে এড়িয়ে চলমান লঞ্চে কয়েকজন মুক্তি উঠে পড়েছিল । ছোট বোটে করে এসেছিল তারা; ধরা পড়ে যায়; স্থানীয় জেলে কৃষক এরা, একেবারেই সংঘটিত নয় - আবেগের বশে লঞ্চ আক্রমন করতে চেয়েছে। লঞ্চের পিছনের ডেকের ওপর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে মুক্তিদের । তীব্র মানসিক আতঙ্কে রাখার জন্যেই এখনও হত্যা করা হয়নি, বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এটি এক ধরনের খেলা। ভয়ঙ্কর খেলা। ড্যাগার দিয়ে কারও চোখ তুলে ফেলা হচ্ছে। প্লায়ার্স দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে কারও পায়ের আঙুল; আজ সকালে রোদ উঠলে এদের একজনকে অন্যজনের সামনে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হবে।
এত কাছে থেকে কাউকে হত্যা করতে ভালো লাগে না মেজর জুলফিকার কামরান-এর । দূর থেকে গুলি করে জান নিতে ভালো লাগে মেজরের। মেজরের নিশানা কখনও মিস হয় না। নিশানা ঠিক রাখতে ভোরবেলা নিয়মিত পাখি শিকার করেন মেজর । পাকিস্তানের মূলতানের আকবরপুরে জন্ম তার; শৈশব থেকে চেনাব নদীর পাড়ে পাখি শিকার করে করে বড় হয়েছেন। বড় হাসিন নদী চেনাব- দু-পার্শ্বে নানাবর্ণের পক্ষীর বাস। কতকাল আগে হিন্দুস্থান দখল করার উদ্দেশ্যে চেনাব নদীর পাড়েই মুগল সৈন্যরা শিবির স্থাপন করেছিল । মেজর জুলফিকার কামরান-এর পূর্বপুরুষ দুর্ধর্ষ লড়াকু মুগল; মেজরের তাকৎ এর উৎসও তাই। ছ’ফুট উঁচু বলিষ্টকায় গড়নের মেজর জুলফিকার কামরান একাই খালি হাতে গর্জনরত শেরকে শায়েস্তা করার হিম্মত রাখেন।
তবে যমুনা নদীর বিশালতা মেজরের মনে নিদারুন ভয়ের উদ্রেক করেছে।
প্রথম দিন নদীটি দেখে বহুত ডর লেগেছিল মেজরের। এ রকম বিশাল প্রশস্ত নদীকে বশ করে হাজার হাজার বছর ধরে বেঙ্গলিরা বেঁচে আছে! বেঙ্গলিদের পরাজিত করা সহজ হবে তো? মেজরের মনে আজকাল এই প্রশ্নটি উঁকি দেয়। এ রকম বিশাল নদীকে বশ করে হাজার হাজার বছর ধরে বেঙ্গলিরা কী ভাবে বেঁচে আছে? বেঙ্গলিরা হাফ হিন্দু বলেই কি? হিন্দুরা তো অনেক তন্ত্রমন্ত্র জানে। তন্ত্রমন্ত্র দ্বারা কি নদীকে বশ করা যায়?
মেজর জুলফিকার কামরান বিভ্রান্ত বোধ করেন।
একটু আগে নদীর পাড়ে এক শ্যামলা কিশোরী আপন খেয়ালে নাচছিল বলে বিভ্রান্ত বোধ করেছেন । ভোরের বিনম্র আলোর ভিতর সেই বিচিত্র দৃশ্যটি দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন মেজর জুলফিকার কামরান । ভটভট শব্দ তুলে চরের খুব কাছ দিয়ে লঞ্চটি যাচ্ছিল। হিন্দু মেয়েটির ওপর মেজর ক্রোধান্বিত হয়ে উঠছিলেন। মেয়েছেলে নাচবে কেন? হিন্দু নাকি? মেজরের শরীরের মুগল রক্ত খলবল খলবল করছিল। মেয়েটিকে হত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন মেজর। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পৃথিবীর এ প্রান্তের বদ্বীপের অর্ধ-হিন্দুদের গনহারে হত্যা করার মিশনেই তাকে পাঠানো হয়েছে ।
মেয়েটি খেয়াল করেনি যে মৃত্যু ঘনিয়ে আসছিল; নৃত্যের আরাধনায় মগ্ন ছিল বলেই টের পায়নি।
মেজর জুলফিকার কামরান ইঙ্গিত করলে একজন সৈনিক তাকে একটি সেমি-অটোমেটিক মাউজার পিস্তল এগিয়ে দেয়। জার্মান মাউজার মেজরের প্রিয় মারণাস্ত্র। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে মেজর জুলফিকার কামরান-এর অব্যর্থ নিশানার সুনাম আছে। মেজরের তাক নাকি কখনও মিস হয় না। আবাল্য চেনাব নদীর পাড়ে পাখি শিকার করতে করতে এই দক্ষতা অর্জন করেছেন মেজর। পাখির বদলে আজ মানুষ শিকার করবে মেজর ।
মেয়েটির কপাল তাক করেন মেজর। মেয়েটি স্থির নয় বলে লক্ষটিও স্থির নয় । তবে চলমান পাখি শিকার করে অভ্যস্থ মেজর।
একটু পর গুলির শব্দে যমুনা পাড়ের নির্জনতা খানখান হয়ে ভেঙ্গে যায়।
জলের কিনারে বসে থাকা একটি কানি বক আকাশে ডানা মেলে।
উঁচু পাড় থেকে মেয়েটি ঢলে পড়ে যমুনার কালচে জলের কিনারায়।
খান সেনারা হাততালি দিয়ে মেজর এর নির্ভূল নিশানার তারিফ করে । নদীজলে মেয়েটির উষ্ণ লাল রক্ত মিশেছে। ততক্ষণে ভোরের বিনম্র আলো ভেদ করে অদৃশ্য দিগন্ত রাঙিয়ে সূর্য উঠছিল।
ভটভট শব্দে লঞ্চটি চলে যেতে থাকে উত্তরে ।
আর, পিছনে যমুনার কিনারায় পড়ে থাকে একটি মৃত ভোর ও মহাকালের অলীক মহিমা প্রাপ্ত মৃত এক কিশোরীদেহ।
মেজর জুলফিকার কামরান যা জানতেন না
চর শুভগাছার এক চতুর্থাংশ জমি দেখেশুনে রাখা ছিল রমজান আলী দেওয়ান এর কাজ । ক্ষেতখামারিও কিছু করত মধ্যবয়সী লোকটা। চরের সবটাই যে বালি আর পানি-তা কিন্তু নয়; শশা-বাঙ্গি -তরমুজ-এর চাষবাস হয় চরে । তবে ধান হয় না। ধানচাল কিনতে হয় কাজীপুরের গঞ্জ থেকে। সে পয়সা দেন কাজীপুরের সুলতান জোতদার। লোকটার নুন খায় রমজান আলী দেওয়ান । রমজান আলী দেওয়ান-এর পূর্বপুরুষ ছিল লাঠিয়াল। অবশ্য অনেক কাল হল ঐ খুনে পেশাটি রক্তপাতহীন হয়ে এসেছে। অনেক কাল হল দেশে জমিদার নেই, তবে কাজীপুরের সুলতান জোতদার জমিদারের চেয়ে কম যান না; যমুনার চরাঞ্চলে তিনি দোদর্ন্ড প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন সেই সঙ্গে চর শুভগাছার এক চতুর্থাংশ জমি নিজের দখলে রেখেছেন। দুঃসংবাদ এই যে-মে মাসের ২য় সপ্তাহে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্রাশ ফায়ার করে কাজীপুরে নিজ বসতভিটায় সুলতান জোতদারকে সহপরিবারে হত্যা করেছে । সুলতান জোতদারের দুই স্ত্রীসহ, পোষ্য ও জ্ঞাতিগুষ্টি চাকর-বাকর, কামলা-দাসী মিলিয়ে বিশাল পরিবার। আটত্রিশ জনের একজনও নাকি বেঁচে নেই। দুঃসংবাদটি পেয়েই রমজান আলী দেওয়ান গভীর শোকের বদলে বরং গোপন সুখই অনুভব করেছিল। সম্ভবত লোকটার শরীরে পূর্বপুরুষের লেঠেল রক্ত প্রবাহিত বলেই লোকটা খানিক নিষ্ঠুর আছে। সুলতান জোতদার আর বেঁচে নেই - এখন চরের এক চতুর্থাংশ সম্পত্তির মালিক তো সে নিজেই; সে নিজেই একা ভোগ করবে।
পাঁচটি পুত্রসন্তান বাদেও দুটি কন্যা সন্তানের জনক রমজান আলী দেওয়ান । বড় মেয়েটির নাম জুলেখা। ঢলোঢলো স্বাস্থবতী ফর্সা শান্তশিষ্ট মেয়েটি মায়ের মতো নামাজী। বছর দুয়েক হল ডাগর হয়েছে জুলেখা । কাজে কাজেই গত ১১ চৈত্র রোজ বৃহস্পতিবার সরিষাবাড়ির ব্যাপারি সালাম মীর্জার মেজো ছেলে লোকমান মীর্জার সঙ্গে জুলেখার বিবাহের কথা পাকা হল মীর্জাবাড়ির বৈঠকখানায় বসে। দীর্ঘক্ষণ বাকবিতন্ডার পর বিয়ের তারিখ স্থির হয় ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮ রোজ বুধবার মোতাবেক ২৬ মে ১৯৭১।
১১ চৈত্র রাত্রে পাক সেনারা ঢাকায় আগুন দিল ।
সে আগুন সরিষাবাড়ি পর্যন্ত গড়াল । মীর্জাবাড়ির কেউ বেঁচে নেই। রমজান আলী দেওয়ান-এর বিশ্বাস: দুঃসংবাদটি জুলেখা জানে না। তারপরও জুলেখা কান্দে আর কান্দে। রমজান আলী দেওয়ান মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কান্দিস না রে মা। দেশে রোজ পাক জানোয়ার গো গুলি খাইয়া কত লোক মরতেছে, তাগো দুঃখে কে কান্দে?
জুলেখা কি বলবে। সে কান্দে আর কান্দে। এই দুঃসময়েও বেদেদের নৌকা চরের ঘাটে ভিড়ে। মরম বাইদ্দার কাছে মীর্জাবাড়ির গনহত্যার কথা শুনেছে জুলেখা। তারপর থেকে জুলেখা কান্দে আর কান্দে। হায় আল্লা, ছেলের মুখও দেখলাম না!
দেশজুড়ে গনহত্যার কথা প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এমন কী রমজান আলী দেওয়ানও একবার পালানোর কথা ভাবল। কিন্তু, পরিবার-পরিজন নিয়ে যাবে কোথায়। ধুনট সরিষাবাড়ি কাজীপুর গান্দাইল - এমনকী সিরাজগঞ্জ সদর থেকেও ভয়ার্ত মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে চলে আসছে । কাজীপুরের সুলতান জোতদারের আকস্মিক মৃত্যুতে প্রাপ্ত চরের বিস্তর জমাজমি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না রমজান আলী দেওয়ান । না, রমজান আলী দেওয়ান কোথাও যাবে না। মরলে সে এখানেই মরবে।
গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধারাও দুই-একজন আসে তার কাছে । রমজান আলী দেওয়ান তাদের পূর্ণ সমর্থন দেয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানিরা বিতাড়িত হলে চরের চার ভাগের একভাগ জমির একচ্ছত্র মালিকানা তো তারই।
এভাবেই চিরকাল যমুনার দু’পাশের জনজীবনের পেশা ও শ্রেণি-চরিত্র বারবার বদলে গেছে কালের বিচিত্র ভূমিকায় ।
রমজান দেওয়ানের ছোট মেয়েটির নাম রোকেয়া।
শ্যামল ছিপছিপে ও দীর্ঘাঙ্গি রোকেয়ার মুখটি পান পাতার মতন মিষ্টি; চোখ দুটি টানা টানা। চরবাসীদের কাছে রোকেয়া এক পরম বিস্ময়। অনেকে বলে রোকেয়ার সঙ্গে নাকি জিন আছে। নইলে সারাক্ষণ গুনগুন করে গাইবে কেন রোকেয়া? আর নাচবেই-বা কেন? রোকেয়ার সঙ্গে জিন না থাকলে এমন হয়? নামাজ-কালামের ধার ধারে না। এই নিয়ে জুলেখার সঙ্গে কথা বন্ধ। জায়নামাজে মন বসে না রোকেয়ার; মন ভারি উদাস থাকে সারাক্ষণ। কেউ কেউ বলে রোকেয়ার শরীরে সাপের বাতাস লেগেছে। অভিযোগটি কি মিথ্যে? নইলে বেদেদের নৌকা চরের ঘাটে ভিড়ছে শুনে রোকেয়াই-বা ছুটে যায় কেন? মরম বাইদ্দার বাজানো বীণের সুরে ডুবে যায় কেন? মরম বাইদ্দার একবার হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল: আমাগো লগে যাবি নি রুকু?
কেঁপে উঠেছিল রোকেয়া।
আমার কাছে বীণ শিখবি?
না।
তয়?
শরীরে হিল্লোল তুলে ঘাট ছেড়ে পালিয়ে যায় রোকেয়া ।
রোকেয়ার শেষরাতের স্বপ্নে জেগে ওঠে মরম বাইদ্দা । ভিজে তলপেটের কাছে পিছলে যায় আঙুল। অন্ধকারে লোনা গন্ধ পায়। রোকেয়ার শরীরে অশেষ তৃষ্ণা; পাশে জুলেখা ঘুমায়, জুলেখার অত তৃষ্ণা নেই। গভীর তৃষ্ণায় রোকেয়া ঘুমাতে পারে না। অত্যন্ত কাতর হয়ে কল্পনার একটি রৌদ্রময় বেদেনৌকায় মরম বাইদ্দা কে নগ্ন করে। ঠোঁটে চুম্বন করে অনেকক্ষণ ধরে। পুরুষালি স্তনবৃন্তে জিভ রাখে। হাঁটু গেড়ে বসে তলপেটের নিচের ঘনকালো কালো কেশের ঘ্রান নেয়। স্পর্শ করে পাটল রঙের একটি উত্থিত শিশ্ন; ...তারপর অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে দেখে ভাদ্রের অতি উজ্জ্বল রৌদ্রের ভিতরে দেখে নিক্ষিপ্ত বীর্যের শ্বেত রং মিশে যায়। রাত ভোর হয়ে আসে; রোকেয়ার ঘুম আসে না। ভিজে কেশ ও যোনির স্পর্শে ওর আঙুল ভিজে যায়। পাশে জুলেখা ঘুমিয়ে; অন্ধকারে আলতো করে জুলেখার ভরন্ত একটি ঘামে ভেজা স্তন স্পর্শ করে অন্ধকারে শঙ্খিনীর মতো মৃদু হাসে রোকেয়া।
রমজান দেওয়ান এর মেজো মেয়ে রোকেয়া কিছু হলেও যে ছিটগ্রস্থ তা চর শুভগাছার কমবেশি সবাই জানে। মেয়েবেলা থেকে রোকেয়া আপন খেয়ালে নাচে আর আপনমনে গান গায় ।
মেজর জুলফিকার কামরান:-
চিররহস্যময় মহাকাল যে পৃথিবীর এ প্রান্তের বদ্বীপের নিভৃত এক চরের এক শ্যামল কিশোরী শরীরে নৃত্যের স্পন্দনহিল্লোল দান করেছেন এটি শিল্পচর্চাবঞ্চিত রক্ষণশীল চরবাসীর পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়। চরের রক্ষণশীল সমাজে নৃত্যগীত তেমন গ্রহনযোগ্য নয়। বীণের সুরে বিরক্ত হয়ে কখনও কখনও চরের ধর্মান্ধ দলটি লাঠিসোটা নিয়ে বেদেদের নৌকার দিকে তেড়ে যায়। রোকেয়া তখন মরম বাইদ্দার অমঙ্গল আশঙ্কায় আতঙ্কে হিম হয়ে যেত।
চর শুভগাছায় সুর বলতে কেবল মুয়াজ্জ্বিন শরীফ হাজীর মাইকবিহীন আজানের সুললিত ধ্বনি।
অথচ মহাকালের আর্শীবাদে রোকেয়া লাভ করেছিল
আকাশমাটিজল ও আলোর তৈরী ছন্দ ও ধ্বনি;
মহাকাল থেকে প্রাপ্ত সেই নৃত্যভঙ্গিমা
এবং শরীরের তরঙ্গঢেউ কিছুতেই
প্রতিহত করতে না পেরে
এবং একটি রক্ষণশী বাড়ির উঠানে নৃত্যরত হওয়া সম্ভবপর নয় বলেই
ভোরবেলার শিশির ভেজা মাঠ ও কুয়াশা অতিক্রম করে
ওকে যেতে হত নদীর নির্জন পাড়ে । তারপর নৃত্যের নিজস্ব ভঙ্গিমা ও মুদ্রা
আবিস্কার করতে করতে আত্মমগ্ন হত ।
রোকেয়ার শরীরে যেমন বইত পূর্বপুরুষ লাঠিয়ালের রক্ত-
তেমনি, মহাকালের ইঙ্গিতে
নৃত্যের মতন এক আদিম আবেগও নিহিত ছিল ওর শরীরে;
আকাশমাটিজল ও আলোয় তৈরি যে আবেগ
শরীরের অনিবার্য তরঙ্গঢেউ কিছুতেই উপেক্ষা
করতে না পারে প্রদোষকালে নদীটির নির্জন পাড়ে
নৃত্যতৃষ্ণার বশবর্তী হয়ে ছুটে যেত ।
সময়টি ১৯৭১ বলেই নদীর সমূহ বিপদ সম্বন্ধে সচেতন ছিল রোকেয়া ।
তবুও নৃত্যশীল হওয়ার অমোঘ আকর্ষনে নদীর বিপদ বিস্মৃত হয়েই
বিনম্র ভোরের আলোয় নদীপাড়ে নৃত্যরত হত ।
মেজর জুলফিকার কামরান:-
আসন্ন মৃত্যুর চেয়ে ঐ মৃত মেয়েটির শরীরের ভিতরকার অলীক স্পন্দনের তাড়নায় শরীরময় নৃত্যের তৃষ্ণায় পরিস্ফূট ও শ্যামল কোমল তনুটির বাঁকে বাঁকে মধুবর্ণের লোনা ঘাম ঝরানোই ছিল যেন মহাকালের নির্দেশ ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

