এই যে নিন।
কি?
একটা টিকিট।
কিসের টিকিট?
শট্ ফিলমের টিকিট?
শট্ ফিলম? কি নাম?
লোহিত জলস্রোত।
লোহিত জলস্রোত? ভারি অদ্ভূত নাম তো ।
হ্যাঁ। অদ্ভূত বৈ কী ।
ছবিটা কোন্ হলে চলছে? পত্রিকায় বা টিভিতে তো এই নামের কোনও ছবির বিজ্ঞাপন দেখিনি।
দেখবেন কি করে- লোহিত জলস্রোত ছবিটা তো এখনও মুক্তিই পায়নি।
মুক্তি পায়নি? বলেন কি! তাহলে টিকিট বিক্রি করছেন যে?
করছি। কারণ পরিচালকের কাছে ছবিটা বানানোর মতন পয়সা নেই; অগ্রীম টিকিট বিক্রির টাকায় ছবির পরিচালক ছবি নির্মান করবেন। এই টিকিটও পরিচালকের এক বন্ধুর প্রেসে ফ্রি ছাপা হল।
ওহ্। লোকে কিনছে?
কেউ কেউ কিনছে বৈ কী; আবার কেউ কেউ এড়িয়েও যাচ্ছে।
তা ছবির পরিচালকের কি নাম?
শ্যামল মামুন।
নামটা তো কখনও শুনিনি।
শোনার কথাও নয়। কারণ শ্যামল মামুন তেমন বিখ্যাত কেউ নন ।
বুঝলাম। কিন্তু, যে ছবি রিলিজই হয়নি তার অগ্রীম টিকিট আপনি বিক্রি করছেন?
হ্যাঁ।
লোকে টিকিট কেন কিনবে? যাকে চেনে না।
হুমম। অস্বীকার করব না যে আপনার কথাটা সত্যি।
আর পরিচালক শ্যামল মামুন যদি অগ্রীম টিকিট বিক্রির টাকা পেয়ে ছবি নির্মান না করেন? তখন?
করবেন। করবেন। শ্যামল মামুন হলেন ছবিপাগল এক মানুষ; অনেকটা ক্ষেপাটে, তিনি শিল্প ছাড়া অন্য কিছু বোঝেন না। আর এ জন্যেই পরিচালক শ্যামল মামুন একজন সৎ মানুষ।
কোথায় থাকেন তিনি?
এ শহরেই।
এমনিতে কি কাজ করেন তিনি?
কাজ বলতে যা বোঝায় ঠিক সেরকম কিছু তিনি করেন না। এখন অনেকটা বাউন্ডুলে জীবন যাপন করছেন । চাকরি-বাকরি ভাল্ লাগে না। ভালো লাগবে কেন- আকন্ঠ শিল্পে ডুবে আছেন। তবে শ্যামল মামুন এককালে পড়ত চারুকলায় ।
ওহ্, তার মানে তিনি একজন শিল্পী?
শিল্পী তো বটেই।
আচ্ছা। শ্যামল মামুন নামটি কি ছদ্মনাম?
আংশিক।
আংশিক?
হ্যাঁ। আংশিক।
কী রকম?
পরিচালক শ্যামল মামুন-এর আসল নাম মামুন মিদ্দা মানে মামুন মৃধা । এ কারণেই তার ছদ্মনামটি আংশিক সত্য।
দেশের বাড়ি?
চাঁদপুর।
তারপর?
তারপর মেঘনা পাড়ের বিষ্ণুপুর নামে এক গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম এক শিশুর। জন্মের পর শিশুটির নরোম পাটল শরীরে মেঘনাপাড়ের রোদজল আর আলো মেখে বেড়ে ওঠা। প্রথম প্রেম মায়ের মুখ, প্রথম গন্ধ মাতৃদেহের শাল দুধের ও সর্ষের তেলের; নদীপাড়ের বাতাস এসে মিদ্দা বাড়ির উঠানে লুটোপুটি খেত, দাওয়ার ওপর পাতা থাকত পাটি। সে পাটিতে শুয়ে শিশু মামুন হাত-পা ছুঁড়ত। শিশুটির দৃষ্টি ছিল উৎসূক, চলায় ছিল ছন্দ। ছিল সৌন্দর্যপ্রেমি- কেননা সে দোয়েল পাখির সাদাকালো সুন্দর লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে যেত; কান পেতে শুনত গরুর হাম্বা রব । ... কখন যে শিশুটি হয়ে ওঠে বালক। বালকটি নদীর ধার ঘেঁষে দৌড়াতে দৌড়াতে সহসা কিশোর হয়ে ওঠে আর আবিস্কার করে যে সেও পাখির মতন ডানা মেলে উড়তে চায়। সে আরও আবিস্কার করে যে সে কাঠকয়লা দিয়ে ছবি আঁকতে পারে। জীবনে প্রথম সে একটি দোয়েল আঁকার চেষ্টা করে এবং সফল হয়; তখন সে স্কুলে পড়ে ক্লাশ এইটে। বিষ্ণুপুর স্কুলের বাংলার শিক্ষক মোহাম্মদ হান্নান বললেন: বাহ্, দোয়েল আমারও অত্যন্ত পছন্দের পাখি। মনে রেখে মামুন দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি এবং দোয়েলের ইংরেজি নাম: ম্যাগপাই রবিন। আর যে দোয়েলটির উপরিভাগ চকচকে নীলাভ কালো- সেটি পুরুষ; আর মেয়ে দোয়েলের দেহের কালো অংশগুলি বাদামি এবং ময়লা বালির মতো দেখায়। জান কি দোয়েল অন্যান্য পাখির ডাক নকল করতে পারে? (মামুন মাথা নাড়ে।) শিক্ষক মোহাম্মদ হান্নান বললেন: ডিম পাড়ার সময় হলে পুরুষ দোয়েল খুব ভোরে ও পড়ন্ত দুপুরে সুরেলা গলায় অত্যন্ত জোরে গান গায়। দোয়েলের ডিম দেখেছ কখনও? (মামুন মাথা নাড়ে।) বিষ্ণুপুর স্কুলের বাংলার শিক্ষক মোহাম্মদ হান্নান বললেন: দোয়েলের ডিমের রং ফ্যাকাশে। কথাগুলি মাথায় গেথে নিয়েছিল মামুন। পরে স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ হান্নানই বলেছিলেন শহর যেতে এবং আঁকা শেখার স্কুলে ভর্তি হতে । হ্যাঁ, মেধা যতই থাক-কমবেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চাই। এই কথার পর চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছে লঞ্চে ওঠা। ঢাকা শহরে এসে দেখে যে বিচিত্র সব রাস্তাঘাট, ঘোড়াগাড়ি আর দরদালান; সে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। যা হোক। এক পরিচিত আত্মীয়ের বাড়ি উঠেছিল মামুন । তারপর ভর্তি হয়েছিল চারুকলায়।
হু। বুঝলাম । তা লোহিত জলস্রোত ছবির থিম কি?
একটি দোয়েল পাখির মৃত্যু।
মানে?
মানে। ধরুন যে একটি নদী। তার পাড়ে জলস্রোত; জলস্রোতের রং রুপালি। মেঘনার জল ঘোলাটে হলেও আপনাকে ধরে নিতে হবে যে মেঘনার জলের রং রুপালি। নদীর পাড়ে বটের একটি গাছ। তার ছায়ায় একজন গ্রামীণ মেষপালক। শ্যামল সে ছেলে দিনেরবেলায় বসে থাকে নদীর পাড়ে । অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে রুপালি জলস্রোত দিকে। কখনও রাতদুপুরের জোছনায় অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে রুপালি জলস্রোত দিকে। গোচরণ মাঠে দেখে গোপীগনের নাচ শোনে কীর্তনের সুর; অত্যন্ত ঘোর লাগে তার । একদিন দুপুরে সেই শ্যামল মেষপালক দেখল রুপালি জলস্রোত রং বদলে যেতে থাকে। মেষ পালক অবাক হয়। দূরে একটা মিলিটারি লঞ্চ। তার ভটভট ভটভট আওয়াজ । মেষপালক ভীত হয়ে ওঠে। সে উঠে দাঁড়ায়; লুকিয়ে পড়ে বটের আড়ালে। শেষদৃশ্যে বোঝা যায় না মেষপালক নিহত হয় কি না। তবে রুপালি জলস্রোত রং বদলে যেতে লোহিত বর্ণের হয়ে উঠতে থাকে।
হুমম। প্রতীকবাদী মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ। আরও কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে ছবিটায়।
যেমন?
যেমন, ছবির মধ্যে দর্শকদের ইনভলভ করা। কাজেই সবটা বলা হবে না। যেমন, শেষদৃশ্যে বোঝা যায় না মেষপালক নিহত হয় কি না। কিংবা মেষপালক কে? কি তার নাম? কোথায় তার বাড়ি। মিলিটারি লঞ্চটি কাদের। এসব বিষয়ে ডিটেইলস বলা হবে না। তা ছাড়া ছবিতে গান কি কৃত্রিম সংগীত ব্যবহার করা হবে না। শুধুমাত্র ন্যাচারাল সাউন্ড ধারণ করা হবে।
তা হলে কি ছবিটা প্রামাণ্যচিত্র হয়ে যাবে না?
দেখা যাক। ছবির কাজ এখনও শুরুই হয়নি। শেষ হওয়ার পর বোঝা যাবে প্রামাণ্যচিত্র হয়ে উঠল কিনা। প্রকৃত শিল্পী বলেই ছবির আঙ্গিক নিয়ে সারাক্ষণ দারুণ উৎকন্ঠায় থাকেন পরিচালক শ্যামল মামুন। তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান বাস্তবতা নিজেকে অবিকৃতভাবে তুলে ধরতে পারে কিনা।
তা কি করে সম্ভব?
কেন?
যে বিষয়ের ওপর শুটিং হয় সে সময়টা তো অনেক আগেই অতীত হয়ে গেছে।
হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি আপনি কি বলতে চান। সময় বহমান। বাস্তবতাও বহমান। কাজেই সত্যেরও বদলে যাওয়ার কথা। আসলে এখনও ছবির পুরো আইডিয়াটা আছে শ্যামল মামুন এর চিন্তাচেতনায়; যেমন বটগাছের পাতার আড়ালে একটি দোয়েল পাখির গতিবিধির ওপর সাড়ে তিন মিনিট দৃশ্যায়ন, সমান্তরালে একটি মিলিটারি লঞ্চের ভট ভট ভট ভট শব্দ। গাছের নিচে প্রশস্ত ছড়ানো কান্ডের ওপর বসে রয়েছে এক উদাসী তরুণ-যেনবা তরুণ লালন।
ওহ্।
তরুণ লালন বললাম। তবে দৃশ্যটি গ্রহন করা হবে বাউল গানের আবহসংগীত ছাড়াই। দেখানো হবে গুলির শব্দে একটি দেয়েল পাখি চমকে উঠে কী ভাবে মারা গেল।
গুলি কি দোয়েলের গায়ে লাগবে?
না না। গুলির শব্দেই মারা যাবে পাখিটি; কেননা বোঝানো হবে নির্জন গ্রামীন পাখিটি এর আগে এত কাছ থেকে কখনোই এত মর্মান্তিক আর বিকট শব্দ শোনেনি। এ কারণেই ছবির নাম এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ছবির নাম লোহিত জলস্রোত ছাড়া হতে পারে: “একটি দোয়েলের মৃত্যু।” দোয়েলের মৃত্যুটি অবশ্য সিম্বলিক।
হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি।
পরিচালক শ্যামল মামুন তাইই বিশ্বাস করেন: প্রকৃতিতে যে ধরনের নির্মম ঘটনা ঘটে চলচ্চিত্রের উচিত তার সত্যাসত্য পরীক্ষা করে দেখা । তা ছাড়া ছবির শুটিং চলাকালীন সময়ে একটি দোয়েলের মৃত্যুও ঘটানো হতে পারে। তবে সেটা করা উচিত হবে কিনা সে বিষয়েও চলছে জোর তর্ক । পরিচালক শ্যামল মামুন এর বন্ধুবান্ধবরা সব পরিবেশ সচেতন। পরিচালক শ্যামল মামুন নিজেও নির্মল বাতাস, সবুজপাতা আর রোদ ভালোবাসেন। আসলে খড়কূটো দিয়ে কৃত্রিম দোয়েল বানিয়ে কৃত্রিম মৃত্যুর দৃশ্য দেখাতে চাইছেন না শ্যামল মামুন। আসলে হলভর্তি দর্শকদের একটি দোয়েল পাখির মৃত্যু যন্ত্রণা টের পাইয়ে দিতে চান পরিচালক শ্যামল মামুন।
বুঝলাম। তারপর কি হবে?
তারপর কী হবে মানে?
ছবি শেষ হলে সিনেমা হল থেকে দর্শক যখন বেরিয়ে যাবে। তারপর?। তারপর তো সেই অভ্যস্ত জীবন, নানারকম অন্যায় মেনে নেওয়া, মনে মনে প্রতিবাদ করে নিজেকে সাহসী ভাবা; কেউ-বা পাখিদের হত্যাকারী হয়ে ওঠা। মুরগীও তো পাখি। ধরেন যদি সে রাত্রে কারও ডিনারে চিকেন থাকে তো?
স্বীকার করছি। আপনার কথাগুলি ভাববার মতো।
তা সব মিলিয়ে ছবির ডিউরেশন ঠিক কতক্ষণের হতে পারে?
দৈর্ঘ্যও এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে কুড়ি মিনিটের বেশি হবে না।
মাত্র কুড়ি মিনিটের জন্য দর্শক সিনেমাহলে যাবে?
যাবে। এখন তো অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। তবে দর্শকদের প্রতি পরিচালক শ্যামল মামুনের একটি বিনীত অনুরোধ থাকবে।
কি?
ছবি শেষ হওয়ার পর দর্শকরা যেন অন্তত দশ মিনিট- সম্ভব হলে আরও অনেকক্ষণ চুপচাপ সিটে বসে থাকে।
কেন?
কারণ। হলভর্তি দর্শকদের একটি দোয়েল পাখির মৃত্যু যন্ত্রণা টের পাইয়ে দিতে চান পরিচালক শ্যামল মামুন। দোয়েল পাখির মৃত্যু যন্ত্রণা অনুধাবন করার জন্য দর্শকরা অন্তত দশ মিনিট-সম্ভব হলে আরও অনেকক্ষণ চুপচাপ সিনেমা হলের সিটে বসে থাকা দরকার।
ওহ্। তা ছবি শেষ করতে কত টাকা লাগবে?
লো বাজেট মুভি। অন্তত লাখ খানেক তো লাগবেই । কিনবেন টিকিট?
হ্যাঁ কিনব। তা কতদিন লাগবে ছবি শেষ করতে?
তা তো জানি না। আপাতত টিকিট বিক্রি করছি। দেখা যাক। লোহিত জলস্রোত কিংবা একটি দোয়েলের মৃত্যু ছবিটা শ্যামল মামুন একদিন না একদিন শেষ করবেনই। আসলে গল্পটা ওর গ্রামের স্কুলের শিক্ষক এর মুখে শোনা।
কার কথা বলছেন?
ঐ যে বললাম-বিষ্ণুপুর স্কুলের বাংলার শিক্ষক মোহাম্মদ হান্নান।
ওহ্ ।
অনেক অনেক বছর আগে, মোহাম্মদ হান্নান তখন তরুণ, বসে ছিলেন মেঘনা নদীর তীরে। মাঝে মাঝেই এ রকম বসে থাকেন। কখনও বসে থাকতে থাকতে ঘোর লাগে। মোহাম্মদ হান্নান একজন ঘোর লাগা মানুষ। পূর্ব বাংলায় সময়টা তখন অত্যন্ত দুঃসময়। ভটভট শব্দে একটা মিলিটারি লঞ্চ আসছিল। মোহাম্মদ হান্নান প্রথমে আত্মমগ্ন থাকায় টের পাননি। পরে সচকিত হয়ে মিলিটারি লঞ্চ দেখে ভীত হয়ে ওঠেন। গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে যাবেন- ঠিক তখুনি রাইফেলের গুলি ছোড়া হল মিলিটারি লঞ্চ থেকে। মোহাম্মদ হান্নান বেঁচে গেলেও গুলির বিকট শব্দে একটি দোয়েল বট গাছ থেকে পড়ে ছটফট করতে করতে মরে যায়।
ওহ্। ... টিকিট আমি নিলাম।
হ্যাঁ। নিন। ছবিটা শেষ হলে আপনি ঠিকই খবর পেয়ে যাবেন। টিকিটটা যতœ করে রাখবেন।
রাখব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


