somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষের স্থাপত্যভাবনায় যে ভাবে ছাপ ফেলে যায় অতীতের ঐতিহ্য

২৮ শে এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইরাকের সামারা নগরে অবস্থিত আল-মুতাওয়াককিল মসজিদের মিনার। মিনারটির নাম মালউইয়া। মানুষের স্থাপত্যভাবনায় যে অতীতের ঐতিহ্য ছাপ ফেলে যায় তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত মালউইয়া মিনার। তার কারণ, ব্যাবিলনের ‘টাওয়ার অভ বাবেল’-এর আদলে নির্মিত হয়েছিল মালউইয়া মিনার ...

সামারা নগরটি ইরাকের উত্তরে অবস্থিত । সেখানেই রয়েছে একটি অতুলনীয় মসজিদ- মসজিদটিকে বলা হয় ‘দি গ্রেট মস্ক অভ সামারা।’ ৮৪৮ সালে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়, মসজিদ নির্মাণ শেষ হয় ৮৫১ সালে । বর্তমান ইরাক তখন পারস্যের অর্ন্তগত ছিল, পারস্য শাসন করছিল আব্বসীয় রাজবংশ। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াককিল (৮৪৭-৮৬১) এর সময়ে আল-মুতাওয়াককিল মসজিদের নির্মাণ কাজশেষ হয়।




ইরাকের সামারা নগরে অবস্থিত আল-মুতাওয়াককিল মসজিদের মিনার।

একটা সময় ছিল। যখন ‘দি গ্রেট মস্ক অভ সামারা’ই ছিল বিশ্বের সর্বাপ্রেক্ষা বৃহত্তম মসজিদ। তবে এর মালউইয়া মিনারটি আজও অতুলনীয় বলে স্বীকৃত। মিনারটি দেখতে চোঙার মতন। শামুক আকারের মিনারটি ৫২ মিটার উঁচু ও ৩৩ মিটার চওড়া। ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে ঢালু সর্পিল পথ।



মালউইয়া মিনার।



ইরাকের মানচিত্রে সামারার অবস্থান । তাইগ্রিস নদীর পাড়ে এ জায়গাটি বাগদাদের ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে।

মালউইয়া মিনারটি আমাদের পুরাকালের এক স্থাপত্যকাঠামোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এককালে, হিব্রু বাইবেলের বুক অভ জেনেসিস অনুযায়ী, ব্যাবিলন নগরের উপান্তে নির্মাণ করা হয়েছিল টাওয়ার অভ বাবেল, আরবিতে বুর্জ বাবিল। ব্যাবিলন নগরের অবস্থান ছিল বর্তমান কালের বাগদাদের ৫৫ মাইল দক্ষিণে। বাইবেলমতে মহাপ্লাবনের পরে নূহ নবীর বংশধরেরা উত্তর-পুবের আর্মেনিয়া থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের ব্যাবিলন নগরে চলে এসেছিল। তারা এক অভিন্ন ভাষায় কথা বলত। যা হোক। ব্যাবিলন তখন লোকে লোকারণ্য এক বৃহৎ নগরী হয়ে ওঠে। কখনকার কথা এটি? আধুনিক ঐতিহাসিক রীতি অনুযায়ী সন-তারিখ স্থির করা কঠিন। তবে আমরা যে নমরুদের কথা জানি, বাইবেলমতে টাওয়ার অভ বাবেল নির্মানের সময়টি নমরুদের শাসনামলের গোড়ার দিকে। ব্যাবিলনবাসী ঠিক করল তারা ব্যাবিলন নগরে একটি উঁচু স্তম্ভ নির্মান করবে, স্তম্ভটির শীর্ষ থাকবে স্বর্গে -যা ঘোষনা করবে মানুষের অহঙ্কার।



টাওয়ার অভ বাবেল, আরবিতে বুর্জ বাবিল।



ঈশ্বর ইয়াওয়ে কনফিউশন সৃষ্টি করছেন। ছবিটি এক বিখ্যাত ইউরোপীয় শিল্পীর আঁকা

মানুষের পরিকল্পনাটি ঈশ্বর ইয়াওয়ের পছন্দ হয়নি । তিনি ভাবলেন মানুষ স্তম্ভ নির্মাণ করলে সরে যাবে তার আরাধনা থেকে। কিন্তু, স্তম্ভ তৈরি বন্ধের জন্য কি করা যায় ... ঈর্ষান্বিত ইয়াওয়ে তখন ব্যাবিলনবাসীর ভাষায় বিভেদ গড়লেন তুললেন। অনতিবিলম্বে ব্যাবিলন শহরে নানা ভাষার উদ্ভব হল। (আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে ২২ কিলোমিটার পরপর মানুষের বাকরীতির পরিবর্তন আসে) ...তখনকারদিনের ব্যাবিলন শহরের প্যারামিটার ২২ কিলোমিটার ছিল বলে মনে হয়না। যাক, এতো বাইবেলিয় উপকথামাত্র। ইংরেজি Babel শব্দের দুটো মানে আমরা পাই। (১) বিভ্রান্তপূর্ন শব্দ। (২) শব্দপূর্ন এলাকা। যা হোক, ঈশ্বর ইয়াওয়ে ভাষার প্রভেদ গড়লেন। ব্যাবিলনবাসী একে অন্যের কথা বুঝল না। কাজেই বুর্জ বাবিল আর তৈরি হয়নি।



অসমাপ্ত টাওয়ার অভ বাবেল। ছবিটি এক বিখ্যাত ইউরোপীয় শিল্পীর আঁকা

নবম শতকে বর্তমান ইরাকের সামারা শহরে আব্বসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াককিল (৮৪৭-৮৬১) এর তৈরি হল দি গ্রেট মস্ক অভ সামারা।মসজিদটির মিনার তৈরির সময় তৎকালীন স্থাপত্যবিদদের ব্যাবিলনের অতীত ইতিহাস স্মরণ হয়েছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, মিনার তৈরি হবে বুর্জ বাবিল এর আদলে, যে বুর্জ বাবিল ইহুদি ঈশ্বর ইয়াওয়ের হস্তক্ষেপে শেষ হয়নি, সেটিই আব্বাসীয় রাজকীয় তত্ত্বাবধানে শেষ হল। তাইই ভাবছিলাম, মানুষের স্থাপত্যভাবনায় ছাপ ফেলে যায় অতীত ঐতিহ্য। শ্রদ্ধা জানাই সেই সব স্থপতি, কারিগর ও নির্মাণ শ্রমিকদের-যারা নবম শতকের খ্রিস্টপূর্ব যুগের সদূর অতীতকে পুর্ননির্মান করেছিলেন।



দি গ্রেট মস্ক অভ সামারা। আজও এক অনন্য কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে


আগ্রাসী মার্কিন সেনারা ২০০২ সালে ইরাকে অনুপ্রবেশ করে। একে একে ইরাকী নগরগুলি দখল করে নেয়। দখল করে নেয় সামারা শহরও। মার্কিন সেনারা মিনার শীর্ষে অবস্থান করে আশেপাশের অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করত। ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল বোমার আঘাতে মালউইয়া মিনার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ইউকিপিডিয়া লিখেছে ‘বিদ্রোহীরা’ মালউইয়া মিনার আক্রমন করত। আমরা বলব মালউইয়া মিনার ক্ষতির জন্য দায়ী মার্কিন সামরিক প্রশাসন।



২০০৫ সালের ১ এপ্রিল বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ মালউইয়া মিনার। ইঙ্গমার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ঈশ্বর ইয়াওয়ের মত কি ঈর্ষিত নয়?



সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে মালউইয়া মিনার
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×