বাংলা ভাষার অপরিমেয় সাহিত্য সম্ভার দূরে ঠেলে রেখে আমরা যদি শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দিকটির কথাই বিবেচনা করি, তাহলেও দেখব যে- বাঙালির হৃদয়ে চিরকালীন শ্রদ্ধার আসনটি রবীন্দ্রনাথেরই। কুড়ি শতকের প্রারম্ভের পূর্ব বাংলার কৃষকের প্রতি বিশ্বকবির গভীর মমত্ববোধ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়, নোবেল পুরস্কারের একটি বড় অংশ তৎকালীন পূর্ব বাংলার কৃষকের কল্যাণে ব্যয় করেছেন কবি। ছিন্নপত্রের এক জায়গায় কবি লিখেছেন, ‘অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মত দরিদ্র সুখদুঃখ কাতর মানুষ। এইসমস্ত ছেলেপিলে-গরুলাঙল-ঘরকন্না-ওয়ালা সরল হৃদয় মানুষ প্রথম থেকে আমাকে কি ভুল-ই না জানত! আমাকে এখানকার প্রজারা যদি ঠিক জানত, তাহলে আপনাদের একজন বলে চিনতে পারত।’ এই বিরাট হৃদয়ের মানুষটিই আবার ব্যাক্তিজীবনে ছিলেন বড় সৌখিন ...সেই উনিশ শতকের শেষের দিকে খোদ ইংল্যান্ড থেকে ফেনায়িত সুগন্ধী বুদ বুদ স্নানের অভিলাষে পতিসরের কাছাড়িবাড়িতে আনিয়েছিলেন ‘বাথটাব’...
পতিসরের কাছারিবাড়ি । ছবি তুলেছেন সৈয়দ জাকির হোসেন। ৪ মে, ২০১০ ... কালের কন্ঠে প্রকাশিত । ১৮৯১ সালের পর থেকে কবি এখানে বহুবার এসেছেন। এই পতিসরে কবি রচনা করেছেন 'গোরা' ও 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের অংশবিশেষ; ছোটগল্প 'প্রতিহিংসা', 'ঠাকুরদা'; 'পূর্ণিমা', 'সন্ধ্যা', 'দুই বিঘা জমি', 'তালগাছ'সহ অনেক কবিতা; 'তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা', 'বধূ মিছে রাগ করো না', 'তুমি নব রূপে এসো প্রাণে'সহ অনেক গান।
দিন কয়েক আগের এক সন্ধ্যা; ঘরে বসে টিভি দেখছিলাম। টিভিতে আজকাল দেশিও পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে চমৎকার সব তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়। পতিসর রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রটির উপস্থাপনা তেমনই আকর্ষনীয় মনে হল। মনোযোগী হয়ে উঠলাম। পতিসরের কাছারিবাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ... আলমারি, ইজি চেয়ার, আয়না ইত্যাদি। বাড়ির সম্মুখভাগে সিংহ দুয়ার। দুয়ার পেরোলেই প্রশস্ত আঙিনা। বাড়িটি ১০ একর জায়গার ওপর। আমি যেসব দৃশ্য দেখছি, এককালে রবীন্দ্রনাথও দেখেছেন বলে শিহরণ বোধ করছি। ধারাবর্ননাকারী নারীকন্ঠ বলে যাচ্ছেন:... পুত্রের নামানুসারে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউট। নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত ১ লাখ ৮ হাজার টাকা তিনি কৃষকদের উন্নয়নকল্পে প্রতিষ্ঠিত কৃষি ব্যাংকে জমা দেন।
তো, পতিসর কোথায়?
পতিসর গ্রামটি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নে। সেখানেই ছিল রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কাছারিবাড়ি। এ প্রসঙ্গে আহমেদ রফিক লিখেছেন,‘শিলাইদহ ও শাহজাদপুর যদি রবীন্দ্রনাথের জন্য যথাক্রমে কবিতা এবং ছোটগল্প রচনার চারণভূমি হয়ে থাকে তাহলে কালিগ্রাম পরগনার সদর পতিসর কবিতা রচনার পাশাপাশি হয়ে উঠেছিল স্বনির্ভর সমাজ গঠনের পরীক্ষাকেন্দ্র। (পতিসর কৃষি ব্যাংক ও রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। সমকাল। নভেম্বর, ২৪, ২০০৯) ...এমন তথ্য তথ্যচিত্রটির নির্মাতারা স্মরণে রেখেছেন দেখলাম।
নওগাঁ জেলার মানচিত্র
আত্রাই উপজেলার মানচিত্র। ডান পাশে মনিয়ারী ইউনিয়ন ও নাগর নদী। সেকালে পতিসরকে বলা হত রাজশাহীর কালিগ্রাম পরগনা ... কালিগ্রাম পরগনার সদর এই পতিসর। কবির মতে পূর্ববঙ্গের অন্য অঞ্চল থেকে এখানকার প্রকৃতি যেন বেশ খানিকটা আলাদা-ধূসর, উদাস। পতিসরে লেখা কবির কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং স্বজনদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে এই স্বতন্ত্র প্রকৃতির আভাস মেলে। কবির এই অনুভূতি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে ...কেন আত্রাই উপজেলার প্রকৃতি বেশ খানিকটা আলাদা-ধূসর, উদাস?
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য হয়ে পতিসরবাসী গর্বিত। স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিবেদক সাইফুদ্দীন চৌধুরী লিখেছেন,‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববঙ্গের জমিদারি পতিসর থেকে পাওয়া থেকে স¤প্রতি পাওয়া কবির স্বহস্তে লিখিত পত্রখানি সেখানেই সংরক্ষণ করতে চায় এলাকাবাসী। পত্রখানি পাওয়া গেছে কবির পতিসরের মুসলমান পাচক মৃত কবেজ আলি মন্ডলের রক্ষিত পুরোনো কাগজপত্রের পুঁটুলি থেকে। এখন থেকে ১১৩ বছর আগে, ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২৮ ভাদ্র তারিখে ছয় পৃষ্ঠাব্যাপী কবি এই দীর্ঘ চিঠিখানি লিখেছিলেন বোলপুর থেকে। কবির স্মৃতি রোমন্থনের নানা তথ্য আছে এতে। তবে কাকে কবি চিঠিখানি লিখেছিলেন তা ঠিক বোঝা যায় না। চিঠিখানি উদ্ধার করেছেন রবীন্দ্রপ্রেমী যুবক মতিউর রহমান মামুন। মতিউর রহমান মামুন সন্ধান পেয়েছেন আরেক দুর্লভ সংগ্রহের-কবির পতিসর ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ ও পতিসর জমিদারির আয়-ব্যয়ের খরচের খাতা। শেষোক্তটি রক্ষিত আছে পতিসরের সন্নিকটবর্তী রানীনগর উপজেলার বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের জনৈক কলেজশিক্ষকের কাছে। (প্রথম আলো। নভেম্বর, ৮, ২০০০৯)
এই সেই চিঠি...না, পতিসরবাসীর আশা পূর্ণ হয়নি। রবীন্দ্রনাথের চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে গেছেন সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা এসে-তাঁরা সেটি সংরক্ষণ করবেন তাঁদের জাদুঘরে। হিসাবের খাতাটিও চলে যাবে জাতীয় জাদুঘরে, ঢাকায়। সাধারন মানুষের ইচ্ছে ও রাষ্ট্রীয় বিধানের মধ্যে ফারাক বিস্তর ...
ক্যামেরা ঘুরে যায়। ধারাবর্ননাকারী নারীকন্ঠটি একের পর এক তথ্য দিয়ে যেতে থাকে। আমি মনোযোগী হয়ে উঠি। পতিসর সম্বন্ধে বাড়তে থাকে আমার জ্ঞান । রবীন্দ্রনাথসহ পতিসরের পরিবেশ আমার করোটির কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পতিসরের কাছারিবাড়ির সীমানা ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে কবির প্রিয় নদী নাগর । এখানে প্রতি বছর কবির জন্মজয়ন্তীতে মানুষের মেলা জমে নাকি। আমাদের ছেলেবেলায় পড়া ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’ -এই এই শিশুপাঠ্য কবিতাটি নাগর নদীকে নিয়েই লেখা জেনে শিহরিত হলাম । কেননা, দীর্ঘদিন ধরেই আমি ভাবছিলাম ঠিক কোন্ নদীকে দেখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই কবিতাখানি। কেননা, রবীন্দ্রনাথের জন্ম তো নদীবহুল গ্রামে নয়, ইঁট-পাথরের কলকাতায়। ... আর, ‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে’ কবিতাটি পতিসরের কাচারিবাড়ির সামনের তালগাছ দেখেই লেখা ...এসব তথ্য পতিসরবাসীর জানা। কাজেই তারা পতিসরের কাচারিবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত ‘রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে’ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিজড়ানো জিনিসপত্র রাখতে চায়। নওগাঁর জেলা প্রশাসক ২০০৮ সালে এখানকার এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেছেন । কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্থানীয় চাষিদের নিয়ে যে কলের লাঙল দিয়ে জমিচাষ করতেন, তাও এনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এই জাদুঘরে। এই জাদুঘরে পতিসরে কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক নিদর্শনসামগ্রীই রয়েছে-পালঙ্ক, আলমারি, ঘড়ি, আরাম চেয়ার, বাথটাব, লোহার সিন্দুক, পতিসরে ব্যবহূত কবির নাগর বোটের দরজা, আয়না ইত্যাদি।
বাথটাব এর ওপর চোখ আটকে গেল আমার, জিনিসটি খোদ ইংল্যান্ড থেকে আনিয়েছিলেন কবি ... উনিশ শতকের শেষের দিকে-ভাবা যায়? এমন সৌখিন, কবি বলেই সম্ভব হয়েছিল। পতিসরের কাছারিবাড়ি দর্শনে এসে যে কেউ বাথটাব টি দেখে ভাবতে পারে জমিদারের বিলাসব্যসনে খামতি ছিল না। প্রকৃত ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে। কবি গুরু বাথটাবে ফেনায়িত সুগন্ধী বুদ বুদ স্নান করেছেন ঠিকই কিন্তু নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ববোধ থেকে কদাপি সরে আসেননি।
(১) পতিসর কাচারির পূর্ব পাশের খোলা জায়গায় রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠা করে রেশম বস্ত্র বয়নের প্রকল্পও চালু করেন কবি ।
(২) প্রজাদের নিরক্ষতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে রাতোয়াল, কামতা ও পতিসরে মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় (১৯৩৭ সালের ২৬ জুলাই পতিসরে শেষ যাত্রার কবি শেষোক্ত মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়টি ‘রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’ নাম দিয়ে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন) এবং বেশ কটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
(৩) পতিসর কামতা ও রাতোয়ালে তিনি দাতব্য চিকিৎসালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এখানকার প্রজাদের যে তিনি কত ভালোবাসতেন, তা পতিসরের জনৈক গ্রাম-কর্মীকে লেখা চিঠি থেকেই বোঝা যায়: ‘আমাদের গ্রামের জীবনযাত্রা বড়ই নিরানন্দ হইয়া পড়িয়াছে। প্রাণের শুষ্কতা দূর করা চাই। হিতানুষ্ঠানগুলোকে যথাসম্ভব উৎসবে পরিণত করিতে চেষ্টা করিয়ো।’
আমাদের এই সময়ে কৃষিবিদ শাইখ সিরাজ এই ঐতিহ্যকেই প্রানপন আঁকড়ে ধরে রাখছেন বলে মনে হয়। তাঁর প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
অন্তরঙ্গ রবীন্দ্রনাথ
পতিসরের জমিদারি ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ৪ মে, ২০১০ তারিখে প্রথম আলোয় সাইফুদ্দীন চৌধুরী লিখেছেন, ‘কবি-পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবদ্দশায়ই একান্নবর্তী পরিবারের ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। জমিদারি ভাগ হওয়ার আগে পূর্ববঙ্গের তিনটি জমিদারি-কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর কালিগ্রাম পরগনা রবীন্দ্রনাথই দেখাশোনা করতেন। জমিদারি ভাগ হওয়ার পর কালিগ্রাম পরগনা হয় রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জমিদারি। কালিগ্রাম পরগনার সদর এই পতিসর। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কবির যোগাযোগ ছিল পতিসরের সঙ্গে। প্রজা হিতার্থে কবি এখানে গ্রামোন্নয়নমূলক বেশ কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল প্রজাদের দারিদ্র্য দূরীকরণ, চিকিৎসা বিধান, জলকষ্ট সমস্যার সমাধান, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, সুষ্ঠু বিচার-সালিসি-ব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ পতিসরে তাঁর গ্রামোন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন কয়েকজন দক্ষ সমাজকর্মীর দ্বারা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য-কালিমোহন ঘোষ, অতুল সেন, ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’খ্যাত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুঠিয়ার রাজ-এস্টেটের দেওয়ান প্রসন্নকুমার মজুমদারের পুত্র শৈলেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। এখানকার কৃষির উন্নতির জন্যই পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষ্টিতে স্নাতক করে এনেছিলেন। রথীন্দ্রনাথ পতিসরের চাষিদের সঙ্গে নিজেই যে কলের লাঙল চালিয়েছেন তা আগেই উল্লেখ করেছি। ১৯০৫ সালে কবি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’। কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল অধিক মুনাফালোভী মহাজনদের হাত থেকে গরিব চাষিদের রক্ষা করা। চাষিদের অল্প সুদে ঋণ দিতেই বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করেন। পরে অবশ্য কবি নোবেল পুরস্কারের অর্থের বড় একটি অংশ এই ব্যাংকে জমা রাখেন। প্রায় ২০ বছর ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’ কার্যকর ছিল। ’ (‘পতিসরের রবীন্দ্র স্মৃতি-নিদর্শন’।)
তরুণ বয়েসে
পতিসর কৃষি ব্যাংক সর্ম্পকে আহমেদ রফিক লিখেছেন,‘যতদূর জানা যায়, প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথ ব্যাংকের জন্য শতকরা আট টাকা সুদে টাকা ধার করেন বন্ধুবান্ধব ও মহাজনের কাছ থেকে। ঋণগ্রহীতাদের সুদ দিতে হতো ১২ শতাংশ হারে। শেষ পর্যায়ে দেখা যায়, গৃহীত ঋণের টাকা সামান্যই ফেরত এসেছে। যে কারণে ১৯১৪ সালে নোবেল পুরস্কারের টাকা থেকে বেশ বড় একটি অংশ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ১ লাখ ৮ হাজার, প্রভাত কুমারের মতে ১ লাখ ২০ হাজার এবং প্রশান্ত কুমার পালের মতে ৭৫ হাজার টাকা) পতিসর কৃষি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরও ব্যাংকের ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ 'পিতৃস্মৃতি'তে লিখেছেন, ''কৃষি ব্যাংকের কাজ বন্ধ হয়ে গেল 'রুরাল ইনডেটেডনেস আইন' প্রবর্তনের ফলে। প্রজাদের ধার দেওয়া টাকা আদায়ের উপায় রইল না।" কৃষি ব্যাংকের প্রসঙ্গে আহমেদ আরও রফিক লিখেছেন, ‘রবীন্দ্র ভবনের পূর্বোক্ত মাইক্রোফিল্ম থেকে জানা যায়, এক পর্যায়ে ঠাকুর পরিবারের কয়েকজন সদস্য-সদস্যা এবং সে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিকটজন হিসেবে পরিচিত প্রিয়ন্বদা দেবী, লাবণ্য প্রভা ঘোষ, নরেন্দ্র নন্দিনী দেবী, কামিনী সুন্দরী দেবী, নগেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী প্রমুখ ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন। অমিতাভ চৌধুরীর মতে, ব্যাংক চলেছিল পুরো ২০ বছর। আর রবীন্দ্র ভবনের মাইক্রোফিল্মে জুলাই ১৯২৩ পর্যন্ত লেনদেনের শেষ ভুক্তি দেখা যায়। মনে হয়, অমিতাভ চৌধুরীর বক্তব্যই সঠিক।’ (“পতিসর কৃষি ব্যাংক ও রবীন্দ্র সংগ্রহশালা”।)
আমরা মনে করি এমন মানবতাবাদী মানুষেরই পক্ষেই মানায় নির্জনে দীর্ঘক্ষণ বাথটাবের ফেনায়িত সুগন্ধী বুদবুদ সৌখিনতা!
মাঝে-মাঝে মনে এই প্রশ্নের উদয় হয় ... আমাদের পক্ষে এই মানুষটিকে পুরোপুরি বুঝে ওঠা সম্ভব কি না ...
এ আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম: কবির মতে পূর্ববঙ্গের অন্য অঞ্চল থেকে এখানকার প্রকৃতি যেন বেশ খানিকটা আলাদা-ধূসর, উদাস। পতিসরে লেখা কবির কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং স্বজনদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে এই স্বতন্ত্র প্রকৃতির আভাস মেলে। কবির এই অনুভূতি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে ...কেন আত্রাই উপজেলার প্রকৃতি বেশ খানিকটা আলাদা-ধূসর, উদাস? ...এরই সঙ্গে আহমেদ রফিক এর মন্তব্যটি স্মরণ করি,‘শিলাইদহ ও শাহজাদপুর যদি রবীন্দ্রনাথের জন্য যথাক্রমে কবিতা এবং ছোটগল্প রচনার চারণভূমি হয়ে থাকে তাহলে কালিগ্রাম পরগনার সদর পতিসর কবিতা রচনার পাশাপাশি হয়ে উঠেছিল স্বনির্ভর সমাজ গঠনের পরীক্ষাকেন্দ্র।’
এ দুয়ের মধ্যে কি কোনও সম্পর্ক রয়েছে?
আত্রাই উপজেলার বেশ খানিকটা আলাদা-ধূসর, উদাস প্রকৃতি এবং রবীন্দ্রনাথের উন্নয়ন কর্মকান্ড।
নতুন প্রজন্ম এ নিয়ে ভাববে আশা করি।
রবীন্দ্রনাথেরই একটি গান দিয়ে শেষ করি:
বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি।
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে
ঊধর্বমুখে নরনারী ।
না থাকে অন্ধকার, না থাকে মোহপাপ,
না থাকে শোকপরিতাপ।
হৃদয় বিমল হোক, প্রাণ সবল হোক,
বিঘ্ন দাও অপসারি ।
কেন এ হিংসাদ্বেষ, কেন এ ছদ্মবেশ,
কেন এ মান-অভিমান।
বিতর’ বিতর’ প্রেম পাষাণহৃদয়ে,
জয় জয় হোক তোমারি ।
দ্রষ্টব্য: নওগাঁ শহর থেকে পতিসর ৩৮ কিলোমিটার। বাস ভাড়া ৩৫ টাকা। জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে থাকা যায়। আবারও মনে করিয়ে দিই-কাছারিবাড়ির সীমানা ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে কবির প্রিয় নদী নাগর । ... আর এখানে প্রতি বছর কবির জন্মজয়ন্তীতে মানুষের মেলা জমে। এ ভূবনে এমন প্রাণের মেলা আর কোথায় বসে বলুন? আর এই কারণেই এই লেখাটি ৮ তারিখ কবির ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে পোষ্ট না করে অনেক আশা নিয়ে করলাম আজই ...যদি কেউ পতিসরের মেলায় গিয়ে একবার দাঁড়ায়...
কেবল বাঙালিরই নয়, রবীন্দ্রনাথ যেন গোটা বিশ্বসভ্যতারই আদর্শ
তথ্যসূত্র:
১. ৪ মে, ২০১০ প্রথম আলোয় প্রকাশিত সাইফুদ্দীন চৌধুরীর নিবন্ধ ‘পতিসরের রবীন্দ্র স্মৃতি-নিদর্শন’।
২. ২৪ নভেম্বর, ২০০৯; দৈনিক সমকাল-এ প্রকাশিত আহমদ রফিক এর নিবন্ধ “পতিসর কৃষি ব্যাংক ও রবীন্দ্র সংগ্রহশালা”।
৩. ৪ মে, ২০১০ কালের কন্ঠে প্রকাশিত ফরিদুল করিম এর নিবন্ধ: ‘কাছারিবাড়ি, পতিসর।’
৪. জোহরা শিউলীর ব্লগ ‘গন্তব্য রবীন্দ্রনাথের ‘পতিসর’।
নওগাঁ জেলা ও আত্রাই উপজেলার মানচিত্র বাংলাপিডিয়ার সৌজন্যে ...
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০১০ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



