প্রাচীন ভারতের কোশল রাজ্যের এক রাজপুত্র ছিল বিরূঢ়ক । পিতা ও মাতৃকূলের অবহেলার কারণে ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল সে ...তার কারণেই সমূলে ধ্বংস হয়েছিল কোশল রাজ্যের রাজধানী সমৃদ্ধশালী শ্রাবস্তী নগর এবং বুদ্ধের জন্ম-নগরী সুসমৃদ্ধ কপিলবস্তু নগর; বিরূঢ়ক এর নির্মম ঘটনাটি ঘটেছিল বুদ্ধের জীবদ্দশায় ... বিরূঢ়ক বুদ্ধের সমসাময়িক ছিল বলেই তার বিধ্বংসী কর্মকান্ডে শান্তিবাদী বুদ্ধে মনে তীব্র কষ্ট পেয়েছিলেন ... এই ঐতিহাসিক নিবন্ধটি ২৫০০ বছর আগেকার ওই প্রতিশোধ পরায়ণ পাষন্ড যুবকটিকে নিয়েই ...
প্রাচীন ভারতের মানচিত্র। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ শতকে প্রাচীন ভারতে ট্রাইবাল সমাজ ভেঙে ১৬ টি বৃহদাকার জনপদ বা রাজ্য গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ সাহিত্যে এদেরকে সম্মিলিতভাবে ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ষোড়শ মহাজনপদ- এর মধ্যে অন্যতম ছিল কোসল রাজ্য। কোশল রাজ্যের রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা/ মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ...সেই শ্রাবস্তী। বর্তমান ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশের আউধ- এ ছিল সুপ্রাচীন কোশল রাজ্যের অবস্থান।
ভাস্কর্য খোচিত শ্রাবস্তী নগরের প্রাচীর
কোসল রাজ্যের রাজা ছিলেন প্রসেনজিৎ। শ্রাবস্তী নগরে তার সুরম্য প্রাসাদ। যা হোক। সেকালে যুদ্ধবিগ্রহ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কাশী রাজ্য (আরেকটি মহাজনপদ) যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন কোসলরাজ প্রসেনজিৎ । পরাজিত হন। রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। পথে এক মালাকারের বাড়ি। তার বাড়ি আত্মগোপন করে থাকলেন ক’দিন। আশ্রয়দাতা সেই মালাকারের এক পরম রুপবতী কন্যা ছিল সেই মেয়ের নাম মল্লিকা। মল্লিকাকে দেখে লালসা জেগে ওঠে কোসলরাজ প্রসেনজিৎ -এর। পরে বিপদমুক্ত হয়ে শ্রাবস্তী ফিরে এলেন কোসলরাজ প্রসেনজিৎ । মল্লিকাকে বিয়ে করলেন ।
বর্তমান নেপাল। এই নেপালেই ছিল কপিলবস্তু নগর। বুদ্ধের জন্মস্থান। উচ্চকূলজাত শাক্যবংশীয় শাসন। কপিলবস্তুর বানান কপিলাবস্তু নয়- কপিলবস্তু বা কপিলবাস্তু; দ্র; সুভাস ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘ বাংলা: লেখক ও সম্পাদকের অভিধান।’ (পৃষ্ঠা: ৫৬)
কোসলরাজ প্রসেনজিৎ এর পরে মনে হল মল্লিকা তো নীচকূলজাত। এ কোসল রাজ্যে রানী হয় কি করে! যার পিতার পেশা মালা তৈরি করা। আসলে লোকটার মল্লিকার শরীর ভোগের তৃষ্ণা মিটে গিয়েছিল। কাজেই মালাকারকন্যা মল্লিকার ভাগ্যে কি ঘটেছিল আমরা অনুমান করতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে ... এই ঘটনাগুলি পালি ভাষায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা লিখিত এবং বৌদ্ধ সাহিত্যের অর্ন্তভূক্ত । এর অনেক অসংগতি হয়তো সেইসব বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চোখে পড়েনি। আমাদের সময়ে ঘটনাগুলি আমরা আমাদের মতো করে ইন্টারপ্রিট করছি।
যুগ যুগ ধরেই নারী শক্তিমান পুরুষের খেয়াল খুশির শিকার । মালাকারকন্যা মল্লিকার করুন জীবন যেন তারই এক বিয়োগান্ত উদাহরণ।
যা হোক। কোসলরাজ প্রসেনজিৎ উচ্চকূলজাত বংশে বিয়ে করবেন বলে মনস্থির করলেন। তৎকালে হিমালয়ের পাদদেশের কপিলবস্তু নগরীর শাক্যবংশীয়া ছিল উচ্চকূলজাত। উল্লেখ্য, বুদ্ধের জন্য কপিলবস্তু নগরীর শাক্যবংশেই হয়েছিল।
মানচিত্রে কপিলবস্তু। কপিলবস্তু নগরের নাম হয়েছে সাংখ্য দার্শনিক কপিলের নামে। শ্রীমাধবচন্দ্র চাক্মা কর্ম্মী বিরচিত শ্রীশ্রীরাজনামা এবং রাজা ভুবনমোহন রায় বিরচিত চাক্মা রাজবংশের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে তুলে দিচ্ছি: “...একদা অযোধ্যা রাজ্যে অরঞ্জিত নামক এক রাজার দুইটি মহিষী ছিল। প্রথমা রানীর গর্ভে তিনটি পুত্র, একটি কন্যা, দ্বিতীয় রানির গর্ভে একটি কন্যা ও একটি পুত্র হয়। ছোট রানির প্ররোচনায় মহারাজ অরঞ্জিত প্রথমা রানির গর্ভজাত রাজকুমারগনকে অযোধ্যা রাজ্য হইতে নির্বাসিত করেন। রাজকুমারগন পিতৃসত্য পালনের জন্য দ্বিরুক্তি না করিয়া অনুরাগী প্রজাবৃন্দসহ অযোধ্যা নগর হইতে বর্হিগত হইয়া হিমালয় পর্ব্বতের সান্নিধ্যে কপিল মুনির আশ্রমে গমন করিলেন। তথায় মুনির আজ্ঞা গ্রহণ করতঃ কপিলবস্তু নামক নগর নির্মান করিয়া রাজত্ব করিতে লাগিলেন। লোক পরম্পরায় মহারাজা অরিঞ্জিত কুমারগনের এতাদৃশ রাজ্য স্থাপনের কথা শুনিয়া মন্ত্রণাকুশল মন্ত্রীগনকে এবং দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণগনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “রাজকুমারগন সেখানে বাস করিতে শক্য কিনা।” তদুত্তরে তাহারা বলিয়া উঠিল, “মহারাজ,কুমারগন উত্তম স্থান প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাঁহারা সেখানে সম্পূর্নরুপে বাস করিতে সমর্থ বা শক্য”। ইহার পর হইতে অযোধ্যা হইতে আগত সুর্যবংশীয় রাজকুমারগন শাক্য নামে বিখ্যাত হইল। কপিলবস্তুর রাজকুমারগন সকলেই শাক্য নামে অবহিত হইয়াছিল।” (পৃষ্ঠা ৪০) কপিল>কপিলবস্তু>সাক্য>শাক্য বংশ> বুদ্ধ ... প্রতিশোধ পরায়ণ বিরূঢ়ক এই শাক্যবংশই ধ্বংস করেছিল। অসাধারণ যোগাযোগই বটে!
যা হোক। কোসলরাজ প্রসেনজিৎ শাক্যবংশজাত কোনও রাজকুমারীকে বিয়ে করা জন্য কপিলবস্তু দূত প্রেরণ করেন। শাক্য গোত্রের জাত নিয়ে গর্ব ছিল অথচ শক্তিধর কোসলরাজ প্রসেনজিৎ প্রত্যাখান করতে পারে না। শাক্যদের রাজা তখন ছিলেন মহানাম। তার নাগমুন্ডা নামে এক দাসীর গর্ভে বাসবক্ষত্রিয়া নামে বিবাহযোগ্যা একটি কন্যা ছিল। কোসলরাজ প্রসেনজিৎ বাসবক্ষত্রিয়ার বিবাহ হয়। যথাসময়ে পুত্র সে পুত্রের নাম রাখা হয় বিরূঢ়ক । পরে কোসলরাজ প্রসেনজিৎ শাক্যদের ছলনার কথা জানতে পারেন। ক্রোধান্বিত হয়ে স্ত্রী-পুত্রকে ত্যাগ করেন।
বুদ্ধ। যিনি বলেছিলেন,‘জলের ফোঁটার জন্যও আমার দয়া হইত।’ তিনি তো অসহায় বাসবক্ষত্রিয়ার দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াবেনই।
বুদ্ধ তখন ভারতবর্ষে ‘ধর্ম’ প্রচার করছেন। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোসল রাজ্যেও আসতেন। শ্রাবস্তী নগরের কাছেই জেতবন নামে একটি আমবাগান। সেখানেই এক কুঠিরে বুদ্ধ তখন বাস করছেন। স্বামী হারিয়ে আশ্রয়চ্যূত বাসবক্ষত্রিয়া তখন আতঙ্কিত হয়ে ছেলে বিরূঢ়ক কে নিয়ে বুদ্ধের কাছে ছুটে গিয়ে পায়ে পড়লেন। প্রভূ, আমায় রক্ষে করুন।
কি হয়েছে?
আমার স্বামী আমায় তাড়িয়ে দিয়েছে।
তাড়িয়ে দিয়েছে? কেন?
আমি নীচকূলজাত প্রভূ। জানেনই তো আমার মা দাসী নাগমুন্ডা ।
বুদ্ধ মাথা নাড়লেন। তিনি সবই জানেন। তাঁর জন্মও কপিলবস্তুর শাক্য গোত্রে। সে গোত্রের অহঙ্কার বুদ্ধের শাক্য গোত্র পরিত্যাগ করার অন্যতম কারণ। বুদ্ধ জাতপাত মানেন না। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে চল।
কোথায়? ক্রন্দনরতা বাসবক্ষত্রিয়াকে কেমন বিমূঢ় দেখাল।
আহা, চলই না। বুদ্ধ ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন।
কিশোর বিরূঢ়ক সবই দেখছিল। সে নত হয়ে বুদ্ধের পায়ে চুম্বন করে।
বুদ্ধ আর্শীবাদ করলেন।
বিরূঢ়ক এর চোখে জল আসে। পিতার নির্মম আচরণে সে বাকরুদ্ধ। মায়ের কান্না সে সহ্য করতে পারছে না। পিতাকে হত্যা করার জন্য ফুঁসে উঠছে রক্ত।
শ্রাবস্তী নগরের কাছে জেতবন। ঠিক এই জায়গায় ছিল বুদ্ধের কুঠির। আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে এই কুঠিরেই অবস্থানরত মহামতি বুদ্ধের কাছে বিপদগ্রস্থ বাসবক্ষত্রিয়া তার ছেলেকে নিয়ে ছুটে এসেছিল ।
বুদ্ধ। বুদ্ধের জীবদ্দশায় তাঁর মানবিক ভূমিকার কথা বিশ্বের তত্ত্বদর্শী মহল অবগত। সে জন্যই তাঁর কল্পিত ভাস্কর্যটি যেন পরিনত হয়েছে শান্তির আইকনে ...৩টি কারণে বাংলার সঙ্গে বুদ্ধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। (১) প্রাচীন বাঙলার মানুষ শান্তিপ্রিয় ছিল বলেই প্রাচীন বাংলাই প্রথম তাঁর মতাদর্শ গ্রহন করেছিল। (২) ভারতবর্ষে যখন ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্তির পথে - বাংলা তখন ও বৌদ্ধ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল, একে আশ্রয় দিয়েছিল। (৩) বাংলা বৌদ্ধ দর্শনকে ব্যাখ্যা করে নারীকে প্রাধান্য দিয়ে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ভিত রচনা করেছিল।
বুদ্ধ বাসবক্ষত্রিয়া আর তার ছেলে কে নিয়ে শ্রাবস্তী নগরের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন। তারপর অবিচল কন্ঠে কোসলরাজ প্রসেনজিৎ কে বুদ্ধ বললেন, বাসবক্ষত্রিয়ার পিতা শাক্যরাজ, বিরূঢ়ক এর পিতাও কোসলরাজ। এই কারণে বাসবক্ষত্রিয়া অবশ্যই স্ত্রীর মর্যাদা পেতে পারে।
কোসলরাজ প্রসেনজিৎ বলল, প্রভূ, আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি বটে তবে আপনার অনুরোধ আমি রাখতে পারব না।
বুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
এ পৃথিবী কি কোনওকালে জাতপাতের উর্ধে উঠতে পারবে?
কোসলরাজ প্রসেনজিৎ কে চাপ দিয়ে লাভ নেই। বড় একগুঁয়ে মানুষ।
নারীদের আজও বাসবক্ষত্রিয়ার মতো বিরূপ পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হতে দেখি ...
বিষন্ন মনে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন বুদ্ধ। তাঁর পিছনে ক্রন্দনরতা বাসবক্ষত্রিয়া ও ক্রোধান্বিত কিশোর বিরূঢ়ক। চৈত্র মাস। মধ্যাহ্ন বেলা তার প্রখর সূর্যালোক আর উষ্ণতা ছড়িয়েছে। পিপাসায় কন্ঠ শুকিয়ে আসে।
বুদ্ধ বললেন, বাসবক্ষত্রিয়া।
আজ্ঞে, বলুন।
তোমাকে একটা কথা বলি শুন।
বলুন।
তুমি এখন পথে পথে কোথায় ঘুরে মরবে। তুমি বরং ছেলেকে নিয়ে একবার কপিলবস্তু যাও। হাজার হলেও কপিলবস্তুর রাজপ্রাসাদ তোমার পিত্রালয়, শাক্যরাজ মহানাম তোমার পিতা।
আমি আপনার নির্দেশ মাথা পেতে নিলাম।
বাসবক্ষত্রিয়া বলল।
বুদ্ধের নির্দেশে বাসবক্ষত্রিয়া ছেলেকে নিয়ে কপিলবস্তু রওনা হয়ে যায়।
২
এর পর বেশ ক’বছর কেটে গেছে।
এর মধ্যে বাসবক্ষত্রিয়ার সঙ্গে বুদ্ধের আর দেখা হয়নি। তবে বুদ্ধ শুনেছেন কপিলবস্তুর শাক্য পরিবার বাসবক্ষত্রিয়া আর তার ছেলে কে গ্রহন করেনি। বুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এ পৃথিবী কি কোনওকালে জাতপাতের উর্ধে উঠতে পারবে? আপন আত্মজার সঙ্গে কেমন প্রতারণা? বাসবক্ষত্রিয়ার জ ন্ম দাসীর গর্ভে বলেই কি অচ্ছুত হয়ে গেল? ছিঃ! মানুষ এত সংর্কীণ হয় কি করে। অথচ জীবনের আয়োজন উপাচার কত মহৎ কত বিশাল ...
যা হোক। বেশ ক’বছর বাসবক্ষত্রিয়ার কোনও সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে না।
বেশ ক’বছর পর বুদ্ধ বিরূঢ়ক -এর সংবাদ শুনলেন। বিরূঢ়ক তখন যুবক। যা শুনলেন তাতে রীতিমতো শিউরে উঠলেন বুদ্ধ। ক্রোধে উন্মক্ত বিরূঢ়ক নাকি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে শ্রাবস্তী নগর আক্রমন করার পর ধ্বংস করেছে। কোসলরাজ প্রসেনজিৎ মগধে পালিয়ে যাওয়ার পথে নাকি মৃত্যুবরণ করেছেন।
প্রতিশোধ পরায়ন তরুণ বিরূঢ়ক এখন নাকি কপিলবস্তু নগরী ধ্বংসের জন্য উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বুদ্ধ অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হয়ে উঠলেন।
জ্ঞাতিকূলের আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে অতিসত্ত্বর কপিলবস্তু রওনা হলেন। এবং পথিমধ্যে বিরূঢ়ক কপিলবস্তু নগরীর কাছেই ছোট্ট একটি নদীর পাড়ে সৈন্য শিবির স্থাপন করেছিল। বুদ্ধ বিরূঢ়ক কে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কপিলবস্তু নগরী আক্রমন হতে বিরত করলে।
সসৈন্য কোসল রাজ্যে ফিরে গেল।
মানচিত্রে কপিলবস্তু
বিরূঢ়ক এখন কোসল রাজ্যের নৃপতি। তা সত্ত্বেও শাক্য পরিবারের অপমান বিরূঢ়ক ভুলতে পারেনি। শোকে-দুঃ খে জর্জরিত হয়ে তার মা বাসবক্ষত্রিয়ার করুণ মৃত্যু হয়েছে। বিরূঢ়কও সৈন্য বাহিনী গড়ার জন্য বছরের পর বছর অনাহারে অর্ধাহারে শ্বাপদশঙ্কুল হিমালয়ের গভীর অরণ্যে কঠিন সময় অতিবাহিত করেছে।
কাজেই, বিরূঢ়ক আরও দু’বার কপিলবস্তু আক্রমনের উদ্যেগ নেয়।
অবশ্য বুদ্ধ তাকে নিবৃত্ত করেন।
তা সত্ত্বেও বিরূঢ়ক তার প্রতিশোধ পরায়ন আগ্রাসী মনোভাব পরিত্যাগ করেনি। সে কপিলবস্তু আক্রমনের উদ্যেগ নেয়।
এবার কপিলবস্তুর শাক্যকূলও বিরূঢ়ক এর ওপর ভয়ানক ক্ষেপে উঠল। কপিলবস্তুর কাছের সেই ক্ষুদ্র নদীর জলে বিষ মিশিয়ে দিল- যাতে বিরূঢ়ক-এর সৈন্যরা বিষ মিশ্রিত জল পান করে মৃত্যুবরণ করে। (এই ঘটনাটি কেমন অবাস্তব মনে হয় ...)
নদীর জলে বিষ মিশিয়ে দেওয়ায় বুদ্ধ মনে অত্যন্ত কষ্ট পেলেন।
এবার তিনি বিরূঢ়ক কে নিবৃত্ত করলেন না!
বিরূঢ়ক কপিলবস্তু নগর ধ্বংস করে।
এমন কী রাজপরিবারের ছোট ছোট শিশুদেরও রেহাই দেয়নি।
সুসমৃদ্ধ কপিলবস্তু ধ্বংস হয়ে যায়।
৩
সুসমৃদ্ধ কপিলবস্তু ধ্বংস করে বিরূঢ়ক সীমা লঙ্ঘন করেছিল বটে, তবে কপিলবস্তু ধ্বংসের জন্য বিরূঢ়ক এর চেয়ে অহঙ্কারী শাক্যবংশই দায়ি। কেননা:
(১) শাক্য গোত্রের জাত নিয়ে গর্ব ছিল অথচ শক্তিধর কোসলরাজ প্রসেনজিৎ প্রত্যাখান করতে পারে না। শাক্যদের রাজা তখন ছিলেন মহানাম। তার নাগমুন্ডা নামে এক দাসীর গর্ভে বাসবক্ষত্রিয়া নামে বিবাহযোগ্যা একটি কন্যা ছিল। কোসলরাজ প্রসেনজিৎ বাসবক্ষত্রিয়ার বিবাহ হয়।
(২) কপিলবস্তুর শাক্য পরিবার বাসবক্ষত্রিয়া আর তার ছেলে কে গ্রহন করেনি।
কপিলবস্তুর ধ্বংসাবশেষ।
তারপর? তারপর বিরূঢ়ক এর কি হয়েছিল?
যথাসময়েই বিরূঢ়ক-এর মৃত্যু হয়েছিল। তবে কোসল রাজ্যটি আক্রমন করে অধিকার করে নিয়েছিল পাশ্ববর্তী আরেকটি শক্তিশালী রাজ্য - মগধ; এবং তার পরাক্রমশালী সম্রাট অজাতশত্র“। সম্রাট অজাতশত্র“ ছিলেন মগধের সম্রাট বিম্বিসারের পুত্র । সম্রাট বিম্বিসার আমাদের অপরিচিত নন। পাঠ করুন:
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
হয়তো বুদ্ধ বিরূঢ়ক এর রোষ থেকে কপিলবস্তুর নগরটি রক্ষা করতে পারেন নি; তথাপি তাঁর মানবিক ভূমিকার কারণে আজও তাঁর প্রতি তাঁর ভক্ত অনুসারীর দ্বারা নিবেদিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ...
তথ্যসূত্র:
১. শ্রী শান্তিকুসুম দাশ গুপ্ত; বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম এবং প্রাচীন বৌদ্ধ সমাজ। (বিরূঢ়ক এর মূল কাহিনী এই বইতে পেয়েছি)
২. শ্রীশ্রীরাজনামা এবং রাজা ভুবনমোহন রায় বিরচিত চাক্মা রাজবংশের ইতিহাস। (কপিলবস্তুর শাক্যদের ইতিহাস এই বইতে আলোচিত হয়েছে।)
৩. সুনীল চট্টোপাধ্যায়: প্রাচীন ভারত (১ম খন্ড) (বুদ্ধযুগের ভারতবর্ষের সম্পর্কে তথ্যাদির জন্য এই বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন)
৪. ডি.ডি কোসাম্বী; ভগবান বুদ্ধ। (বুদ্ধের পরিব্রাজক জীবনের নানা কাহিনী এই বইতে তুলে ধরা হয়েছে। )
৫. রিস ডেভিস; বুদ্ধিস্ট ইন্ডিয়া । (কোশল রাজ্যের বিস্তারিত ইতিহাস এখানে রয়েছে।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



