somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: শরমের কথা

০২ রা আগস্ট, ২০১০ বিকাল ৪:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

না। নূর মোহাম্মদের কপালে তার স্ত্রীটি মোটেও ভালো জোটেনি। এ কথা বলার অবশ্যই কারণ আছে। নূর মোহাম্মদ ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তি। তাবলীগ জামাত করেন। প্রতি মাসে ‘নিছাব’ অনুযায়ী একবার তিন দিনের তাবলীগে যেতেই হয়; তখন পারভীন বেগম মেয়েকে নিয়ে সিনেমা দেখতে বেরিয়ে যান। কিংবা বিরিয়ানি হাউজে ঢুকে বিরিয়ানি খান। পারভীন বেগমের একটাই মেয়ে। ফুটফুটে চেহারার ফাতেমা আখতার এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে এবং সিনেমার ভীষন পোকা। (সাকিব খানের ফ্যান )। ঘরে খবর-টবর দেখার জন্য একটা রঙীন প্যানাভিশন টেলিভিশন আছে বটে, যদিও নূর মোহাম্মদ টেলিভিশনকে বলেন ‘শয়তানের বাক্স’ ... তবে ‘বাবায়’ (নূর মোহাম্মদ) ঘরে থাকলে সেটি মা-মেয়ের তেমন দেখা হয় না। তবে মাঝে মাঝে রাতের বেলায় ঘুম না এলে অনেক রাত পর্যন্ত ‘স্টার জলসা’ দেখেন নূর মোহাম্মদ । এই নিয়ে পারভীন বেগম স্বামী ঠেস মারতেও ছাড়ে না। নূর মোহাম্মদ হাসেন। লোকটা এমনিতে ভালোই; চাকরি করেন মতিঝিলের একটি বীমা কোম্পনীতে । পারভীন বেগম জানেন, তার স্বামীর অফিসেও ভালো লাগে না, বাড়িতেও ভালো লাগে না। তাবলীগে গিয়ে তিন দিন টেনশন মুক্ত থাকেন । এই তিন দিন মা ও মেয়ে স্বাধীন ও মুক্ত জীবন উপভোগ করে।
নূর মোহাম্মদ তাবলীগে চলে গেলে পারভীন বেগম ফাতেমাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হন। ঘরে থাকে গৃহস্থকর্মী নাজমা। কিশোরী মেয়েটি অতি বিশ্বস্ত । তবে সব ব্যাপারে নাজমাকে মা-মেয়ে বিশ্বাস করে না। যেমন
সিনেমা দেখতে যাওয়া আর বিরিয়ানি হাউজে ঢুকে বিরিয়ানি খাওয়ার কথা কখনও নাজমাকে বলে না। যাওয়ার আগে পারভীন বেগম বলেন, পুরান ঢাকায় যাইতেছি রে নাজমা। ঘরের দিকে খেয়াল রাখিস। পুরান ঢাকায় আমার এক নানীজান থাকে। সেই নানীজানের অসুখ। নানীরে দেখতে যাই। বলে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যান পারভীন বেগম।
নাজমাও কী কারণে মুখ টিপে হাসে।
তো, এই মুহূর্তে ফাতেমা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। হাতে লন্ড্রী থেকে আনা কাপড়চোপড়। অন্য সময় লন্ড্রীতে নাজমাই যায়। তো, নাজমা এখন রান্নাঘরে। ভীষণ ব্যস্ত। তাবলীগে যাওয়ার আগে ধার দেনা করে হলেও খাওয়া-দাওয়ার বিস্তর এন্তেজাম করেন নূর মোহাম্মদ। মুরগী কমন। গরুর গোস্ত তো আছেই। ফাতেমা বলে, আম্মা, এখন নাকি তাবলীগে আব্বারা চাইনিজও খায়।
পারভীন বেগম বলেন, তোর বাবায় আগে এমন ছিল না। আমারে বলাকা ছিনেমা হলে নিয়া কত বই দেখাইছে। যখন মীরপুরে ছিলাম, চিড়িয়াখানায় নিয়া কত চটপটি বাদাম খাওয়াইছে।
বাবায় তাইলে এমন হইয়া গেল ক্যান?
কেমনে কই ক। হয়তো টেনশনে। তোর বাবার টেনশন আবার বেশি। আমার আবার অত ভয়ডর নাই। আমরা নদীনালার দেশের মানুষ।
ফাতেমা হঠাৎ বেলি ফুলের গন্ধ পেল। মুখ তুলে দেখল নাসরীন আপা নামছে। নাসরীন আপারা চারতলায় থাকে। ফাতেমা দাঁড়িয়ে পড়ল। নাসরীন আপা আজ লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি পরেছে। লাল ব্লাউজ । খোপায় বেলি ফুলের মালা। নাসরীর আপার স্বামী নাছির দুলাভাই কুয়েত থাকেন। ‘নাসরীন’স গার্ডেন’ নামে পাড়ায় একটি বিউটি পারলার আছে নাসরীন আপার । ফাতেমার সঙ্গে বেশ খাতির। ফাতেমাকে রূপের রানী বলে ডাকে নাসরীন আপা।
ফাতেমাকে দেখে নাসরীন আপা দাঁড়াল। তারপর গাল টিপে বলল, কি রে রূপের রানী, তর হাতে কি রে?
আব্বার কাপড়। আব্বায় আজ তাবলীগে যাইব।
তাইলে তো তোগো তো আজ ঈদ। সিনেমা দেখতে যাবি জোনাকি হলে। কাচ্চি বিরিয়ানি খাবি ধানমন্ডি গিয়া।
ওদের গোপন অ্যাভভেঞ্চারের কথা একমাত্র নাসরীন আপাই জানে।
ফাতেমা হাসে।
দুপুরের আগেই নূর মোহাম্মদ তাবলীগে রওনা হয়ে যান।
স্বামী বেরিয়ে যেতেই মরিয়ম বেগম বোরখা পরে নিলেন। তারপর মেয়েকে নিয়ে বেরুলেন। নাজমাকে বললেন, ঘরের দিকে খেয়াল রাখিস নাজমা। ঘর খুইলা কোথাও যাবি না। আমিরুল আসলে বলবি বাসায় কেউ নাই। বলবি বিকালে আসতে। ঘরে ঢুকতে দিবি না।
আইচ্ছা। বলে নাজমা হাসে।
স্থানীয় মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসার তরুণ শিক্ষক মোঃ আমিরুল মোমেনিন । বাড়ি সাভার। মাদ্রাসার শিক্ষক হলে কী হবে দারুন স্মার্ট ছেলে। নূর মোহাম্মদের সঙ্গে দারুন খাতির। ‘মামা’, ‘মামা’ করে ডাকে। যখন-তখন বাড়ি আসে। পারভীন বেগম কে ‘মামী’, ‘মামী’ বলে ডাকে। ফাতেমাকে ‘বোনটি।’ পারভীন বেগম ছেলেটাকে দিয়ে এট ওটা আনায়। তবে আমিরুল গুণি ছেলে। ফ্রিজ-টেলিভিশন মেরামতের কাজ জানে। পারভীন বেগম অবশ্য আমিরুলের সঙ্গে নিভৃতে সুখদুঃখের আলাপও করেন। তবে সে রকম সুযোগ কমই মেলে।
যা হোক। বরিশাল জেলার মেয়ে পারভীন বেগম, জীবনের অনেকটা বছর কেটেছে মেহেন্দীগঞ্জ; কাজেই রান্নার হাত ভালো। তবে মাঝেমধ্যে হোটেল/রেস্তোঁরার খাবার না খেলে হয়। ফাতেমাদের বাড়িটা খিঁলগাওয়ের তালতলা । গোরান টেম্পুস্ট্যান্ডের হাড়ভাঙা রোডে ‘মুক্তা বিরিয়ানি’। এই দোকানের গরুর চাপ এর বিরিয়ানি খিঁলগাও এলাকায় খুবই বিখ্যাত। বেশ স্বাদ ঝাল স্বাদ। মসলার প্রয়োগও অপূর্ব । গরুর চাপের বিরিয়ানি ৭০ টাকা প্লেট। বোরহানী গ্লাসপ্রতি ১০ টাকা । পারভীন বেগম ভূনা খিচুরী খেতেও ভালোবাসেন। আগে এই অভ্যেসটি ছিল না। ঢাকা শহরে আসার পর হয়েছে। ঢাকা শহরের সবাই জানে মতিঝিলের সুবিখ্যাত ‘ঘরোয়া হোটেল’ এর নাম। ওখানকার ভূনা খিচুরীর বেশ সুনাম। তবে দাম বেশ চড়া। ১২০ টাকা বোরহানী ২০ টাকা। তবে মরিয়ম বেগম এ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে কার্পন্য করেন না। ফাতেমার আবার পছন্দ কাচ্চি বিরিয়ানি। সে জন্য খানিকটা দূরে যেতে হয়। ধানমন্ডি ঝিগাতলা বাস্টষ্ট্যান্ড এর উলটোদিকে সুনামী রেস্তোঁরা। কাচ্চি বিরিয়ানির জন্য সুবিখ্যাত । ৮৫ টাকা প্লেট। বোরহানি ফ্রি।
গলিতে মা মেয়ে পাশাপাশি হাঁটছে। চড়া রোদ। ফাতেমাও বোরখা পরেছে। ফাতেমা বলল, আম্মা চল একটা সিএনজি নিয়া নিউমার্কেট যাই ।
ক্যান?
বলাকা সিনেমা হলে সাকিব খানের ‘অবুঝ হৃদয়’ চলতেছে।
পারভীন বেগম বললেন, এখন আমার বিরানি খাইতে ইচ্ছা করতেছে। চল, আজ কে ভোলা ভাইয়ের বিরিয়ানি খাই। অবুঝ হৃদয় কালকে দেখব। নিউমার্কেটেও যাব। আমার ব্যাগ ছিঁড়া গেছে। একটা ব্যাগ কিনতে হবে।
তাইলে আমারেও একজুড়া স্যান্ডেল কিন্যা দিও।
আচ্ছা দিমুনে।
পারভীন বেগম রিকশা ডাকেন।
‘ভোলা ভাই বিরিয়ানি’র দোকানটি খিঁলগাও রেলগেট থেকে গোড়ান এর দিকে যাওয়ার রাস্তায়। এখানে গরুর চাপ এর বিরিয়ানির প্লেট ৭০টাকা এবং বোরহানী ১৫ টাকা।
রিকশায় ওঠার সময় নাসরীন আপার ‘নাসরীন’স গার্ডেন’-এর দিকে চোখ গেল। ভিতর থেকে সুন্দরী এক মহিলা বেরিয়ে আসছেন। সুন্দরী হলেও মহিল থলথলে, অবশ্য ফরসা। সম্ভবত কোনও বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন। ইস্ ! ম্যাডাম কি সুখী! ইচ্ছা মতন বিউটি পারলারে আসতে পারে সাজতে পারে। ফাতেমার খুব শখ বিউটি পারলারে কাজ শিখে। ও কি আর সে রকম কপাল নিয়ে জন্মেছে । একবার চুল খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল ...পিঠের ওপর আব্বার কি দুম দুম বারি ...
‘ভোলা ভাই বিরিয়ানি’র দোকানে বেশ ভিড়। তবে পিছনের দিকে বসার জায়গা পাওয়া গেল। ৭০ টাকা করে গরুর চাপ এর বিরিয়ানির আর ১৫ টাকা করে বোরহানীর অর্ডার নিয়ে গেল ওয়েটার।
খেতে খেতে পারভীন বেগম ফাতেমাকে জিগ্যেস করেন, লাস্টে কি হয় রে?
কী সের লাস্টে কি হয়? ফাতেমা অবাক।
অবুঝ হৃদয়ের লাস্টে কি হয়? ক্যান বৈশাখী তোরে কিছু বলে নাই? বৈশাখী না অবুঝ হৃদয় দেখছে। বলে পারভীন বেগম বাঁহাতে বোরহানীর গ্লাস তুলে চুমুক দেন। আহ্ ! এই না বলে সুখ ... এই না বলে শান্তি। আর ফাতেমার বাপে ...ইচ্ছা করে ...
ওঃ, বৈশাখী বলছে। ফাতেমা মাথা নাড়ে। লাস্টে সাকিব খান পপির কোলে মাথা রাইখা মারা যায়।
আজকে বলাকায় না গিয়া তা হইলে ভালো হইছে ।
ক্যান? ফাতেমা অবাক।
পারভীন বেগম বলেন, আজ ভোর থেকে আমার মন ভালো। তর আব্বায় তবলীগে গেছে। আজ আমার কান্না আসত না।
আমারও। বলে ফাতেমা গরুর চাপে কামড় দেয়। চারিদিকে তাকায়। সুখি মানুষ দেখে।
বেরুনোর সময় ফাতেমা ভোলা ভাইয়ের বিরিয়ানির ম্যানেজারকে প্রায় ধমকের সুরে বলল, আপনারা বোরহানীর দাম ১৫ টাকা রাখেন ক্যান? ৫ টাকা কমায় রাখতে পারেন না। ‘মুক্তা বিরিয়ানি’ তে বোরহানীর দাম ১০ টাকা রাখে।
বলে কি! ফাতেমার ধমক খেয়ে তো ম্যানেজারের চোখ ছানাবড়া। হাসতে হাসতে টাকা গুনতে গুনতে ফেরৎ দিতে দিতে ম্যানেজার বলে, আপা, আমাগো দোকানের বোরহানী টেস্টি বেশি। মুক্তায় পানি মিশায়।
হ, পানি মিশায়। আপনারে কইছে।
ম্যানেজার হাসে। পারভীন বেগম কে টাকা ফেরৎ দেয়। তারপর হাত তুলে বলে, আপা ওই দেখেন।
ফাতেমা মুখ ঘুরিয়ে চেয়ে দেখে দু’জন ফরেনার আসছে। একজন কম বয়েসী তরুণী, অন্যজন মাঝবয়েসী পুরুষ। ম্যানেজার গদগদ স্বরে বলে, দেখছেন আপা, আমাগো দোকানের বোরহানীর টেস্ট করতে আসছে। গিয়া দেখেন আপা মুক্তায় ফরেনার নাই।
হ। আপনারে কইছে। ধানমন্ডি ঝিগাতলার সুনামী রেস্তোঁরায় বোরহানি ফ্রি দেয়। আপনারা দিতে পারেন না?
ফাতেমা ফুটফুটে বলেই ম্যানেজার বিরক্ত হয় না। বরং উৎসাহ ভরে বলে, আপনি তো জানেন না আপা, তারা ময়দা আর তেঁতুল গুলাইয়া বোরহানি বানায় আপা। সাধে কি আর দুকানের নাম দিসে সুনামী।
হ। আপনারে কইছে।
এ্যাই ছেড়ি! তুই এত কথা কস ক্যান! আয়! পারভীন বেগম মেয়েকে ঝারি মারেন। তারপর মেয়ের হাত ধরে টান দিয়ে ‘ভোলা ভাই বিরিয়ানি’র দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন ।
ফাতেমার মুখ গনগনে হয়ে ওঠে। মেয়ের রাগ ভাঙাতেই যেন ফাতেমাকে পাশে কনফেকশনারীতে নিয়ে গিয়ে একটা কোন আইসক্রীম কিনে দিলেন পারভীন বেগম। পারভীন বেগম নিজেও একটা ললি নিলেন। স্বামী নূর মোহাম্মদ এইসব ‘রঙীলা মিষ্টি বরফ’ দুই চক্ষে দেখতে পারে না। ইচ্ছা করে ...
ফাতেমা রিকশায় বসে আইসক্রীম খায়। ভোলা ভাই বিরিয়ানি ও বোরহানীর প্রশংসা করে। বলে, আব্বারা তবলীগে যাইয়া কত কষ্ট কইরা রান্দে। না রাইন্দা তাবলীগের খাবার ভোলা ভাইয়ের বিরিয়ানি হাউস থেকে নিলেই তো পারে। তারা চাইনীজ খাইতে পারলে বিরানি কি দোষ করল।
পারভীন বেগম হাসেন।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়াল।
কলিং বেল চাপার পর নাজমার বদলে দরজা খুলল আমিরুল ।
তুমি! পারভীন বেগম মাথায় রক্ত উঠে আসে।
জ্বী। মামী। আমিরুল অতি বিগলিত স্বরে বলে।
ড্রইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে পারভীন বেগম মনে মনে বললেন, কী শরমের কথা । আমরা কেউ ঘরে নাই আর এই ছেলেটা ... নাজমায় কই ...
পারভীন বেগম ফাতেমাকে বললেন, দেখ তো, নাজমা কই ।
মায়ের নির্দেশ পেয়েই ফাতেমা বেশ দ্রুত পায়েই পাশের ঘরে চলে গেল। বোঝা গেল ওর ভিতরেও চাপা উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়ে গেছে।
আমিরুল দরজা বন্ধ করে। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা সুদর্শন দাড়িওয়ালা তরুন। মরিয়ম বেগম দ্রুত বোরখা খুলে ফেলেন। মাঝবয়েসী ফরসা শরীরটি থলথলে হলেও চোখমুখ কাটা কাটা । মনে হয় সুলতান হারুনুর রশীদের হেরেমের সুন্দরী আরমেনীয় বাঁদি। আজ সবুজ পারের সাদা সুতির শাড়ি পরেছেন। কালো ব্লাউজ। আমিরুল অবাধ্য চোখ কালো ব্লাউজের ওপর আটকে যায়। তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধের উপক্রম হয়। সে নির্দেশ মতো নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। বলে, গতকাল এশার ওয়াক্তে মসজিদে মোহাম্মদ মামার সঙ্গে দেখা। মোহাম্মদ মামা বললেন: টিভির সাউন্ড নাকি আপনা আপনি বেড়ে যায় । খবর -টবর দেখতে সমস্যা হয়। আজ দুপুরে অবসর পাইলাম দেখে আসলাম।
ওহ্ । খবর না ষ্টার জলসা। পারভীন বেগম মুখ টিপে হাসেন। বাইরে থেকে এসেছেন। একবার বাথরুম যাওয়া দরকার। সামলে নিয়ে সোফায় মোহনীয় ভঙ্গিতে বসলেন।
আমিরুলও মুখোমুখি বসে।
পারভীন বেগম বললেন, তা তোমাগো শয়তানের বাক্স ঠিক হইল?
জ্বী মামী। ঠিক হইছে। ১৩০ টাকার পাটস্ লাগছে।না, না টাকা দিতে হবে না। বলে আমিরুল হাসে। মামীর কন্ঠস্বর কী মোলায়েম। গলার নীচে কি মোলায়েম সাদা ... মোহাম্মদ মামাকে তার ঈর্ষা হয়। সামলে নিয়ে সে বলে, কোথায় গেছিলেন মামী? ডাক্তারের কাছে?
না রে বাপ। গেছিলাম গোপীবাগ, আমার এক নানী থাকে। নানীর অসুখ।
নানী এখন কেমন আছে? আমিরুলকে ভয়নক উদ্বিগ্ন দেখায়।
ভালো না। শরীরের থেকে লবন কইমা যায়। ঘন ঘন মুরুব্বীদের স্বপ্ন দেখতেছে। বাঁচব না মনে হয়।
ফাতেমা ঘরে ঢুকল। বোরখা খুলে এসেছে। নীল রঙের সালোয়ার-কামিজে টলটলে লাগছিল। এবার আমিরুলের অবাধ্য চোখ ফাতেমার ওপরে ঘোরে।
ফাতেমা নালিশের সুরে বলল, আম্মা, শয়তানটা বাথরুমের ভিতর। গোছল করে মনে হইল।
কস কী! হারামজাদী! দরজায় ধাক্কা মার। ধাক্কা মার। বাইর হইলে চা বানাইতে ক।
মামী কি চা খাবেন? মোলায়েম স্বরে আমিরুল জিগ্যেস করে।
হ। বাবা। বস। তুমিও খাও। এত কষ্ট কইরা টেলিভিশন ঠিক করলা। যন্ত্রপাতির দাম নিবা না। তোমারে ভালোমন্দ খাওয়াইতে পারি না, মা-বাপ ফেলাইয়া ঢাকা শহরে থাক। এই শহরে মানুষ থাকে!
আমিরুল মধুর স্বরে বলে, ফাতেমা, বোনটি, যাও তো আমারে ভিতর থেকে ফ্ল্যাক্স আইন্যা দাও। আমি মোছলেমের হোটেল থেকে দুধ চা আইন্যা দেই মামী।
পারভীন বেগম নরম হলেন। মোছলেমের হোটেলের দুধ চা অপূর্ব। বললেন, তাইলে বিশ টাকার পুরীও আইনো।
আইচ্ছা। আমিরুল বিগলিত হয়ে বলে।
বিকাল বেলা হোটেলের চা যে ডালপুরী ডুবিয়ে খেতে ভালোই লাগে পারভীন বেগম এর। স্বামী নূর মোহাম্মদ এসব বুঝতে পারে না।
পারভীন বেগম ব্যাগটা তুলে নিলেন। নাও টাকা নাও।
না, না মামী। টাকা লাগবে না। আমি আপনার ছেলের মতো। আমিরুল বিগলিত হয়ে বলে। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমিরুল বলে।
এই কথা শুনে পারভীন বেগম হাসলেন।

তিনদিন পর সকাল বেলা নূর মোহাম্মদ তাবলীগ থেকে ফিরে এলেন।
তার আগে মা ও মেয়ে বলাকা হল থেকে ‘অবুঝ হৃদয়’ দেখে এল।
সিনেমা শুরুর মিনিট বিশেক পর ফাতেমা কাঁদতে শুরু করে।
এই, তুই কান্দস ক্যান। সাকিব খান তো এখনও মরে নাই। কি সুন্দর পপিরে নিয়া নাচতেছে দ্যাখ।
কান্নাভরা কন্ঠে ফাতেমা বলে, এখনও মরে নাই বইলা কি আর মরব না? বলে দুলে দুলে কাঁদে।
যা হোক। নূর মোহাম্মদ সঙ্গে এক তাবলীগের সাথী নিয়ে এসেছেন। প্রতিবারই তাই করেন। এবারের সাথীটি বেশ বয়স্ক ব্যাক্তি। বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ। আমার স্ত্রীও ওইদিকের। এই বলে বৃদ্ধের সঙ্গে খাতির করেছেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন না। বৃদ্ধ আফজাল মাষ্টার দীর্ঘদিন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। কিঞ্চিৎ জমিজমাও আছে। দুই ছেলে এক মেয়ে। আগৈলঝারার এক লঞ্চ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দিয়েছেন। দুই ছেলেই মালয়েশিয়ায় কর্মরত। বছর দুই হল স্ত্রী আরাফাত বিবি এন্তেকাল করেছেন। এখন সংসারের মোহমুক্ত হয়ে দ্বীনের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন আফজাল মাষ্টার । নূর মোহাম্মদে সঙ্গে আল্লাই দেখা করায় দিল। এখন আল্লার দোয়ায় চোখে ছানির চিকিৎসার দায় দায়িত্ব নূর মোহাম্মদ নিলে হয়।
তাবলীগ থেকে ফিরে আসার পর নূর মোহাম্মদের ধমকের মাত্রা বেড়ে যায়। আজও স্ত্রীকন্যাকে বকলেন। তুমরা বুরখা পর নাই কেন? ঘরে মুরুব্বী আসছেন। এই ফাতেমা তোর চুল দেখা যায় কেন? বুরখা পর। বুরখা পর।
মা আর মেয়ে বোরখা পরতে পরতে মুখ টিপে হাসে।
নূর মোহাম্মদ ভাত খেয়ে অফিস চলে যায়।
সকাল এগারোটার মতো বাজে। ফাতেমা বোরখা পরে নীচে নেমে আসে। আজ নাসরীন আপার ‘নাসরীন’স গার্ডেন’-এ তেমন ভিড় নেই। আপা বসে বসে টিভি দেখছে। স্টার জলসা।
আপা।
কি রে রূপের রানী?
তুমি মাগনা আমার একটা কাম করে দাও না।
কি কাম রে?
পয়সা পরে দিমু কিন্তু।
এই ছেড়ি, তোর কাছে আমি পয়সা চাইছি ।
ফাতেমা হাসে। এবং কাজ শেষ হলে ফাতেমা বাড়ি ফিরে আসে। মায়ের সামনে বোরখা খুলে ফেলে। মেয়ের দিকে চেয়ে পারভীন বেগম অবাক হলেও হাসলেন। জিগ্যেস করলেন, তোর বাপে জিগাইলে কি কইবি?
বলব খুশকি হইছে। বলে ফাতেমা হাসে। ভারি সুন্দর লাগে ফাতেমাকে। কেমন বিদেশি বিদেশি । পারভীন বেগম নিশ্চিত - ফাতেমা মডেলিং করলে মানাত।পারভীন বেগম মুখ টিপে বললেন, মেহেমানের জন্য রুহ আফজা দিয়া শরবত বানাইছি। যা নিয়া যা।
ফাতেমা বলে, আমার মাথায় এখন চুল নাই, আম্মা আমি আর বুরকা পরুম না।
পারভীন বেগম হাসেন।
ট্রেতে শরবতের গ্লাস নিয়ে মেহমানের ঘরে ঢুকল ফাতেমা।
আফজাল মাষ্টার কী বই পড়ছিলেন। দরজায় শব্দ হতেই তাকালেন। এবং অবাক হলেন। ফাতেমা ট্রে নামিয়ে রাখে।
মাথার চুল কামায়া ফেললা মা।
হ। কি করুম। আপনারা আমার চুল সহ্য করতে পারেন না।
অ।
ফাতেমা শাদা রঙের কামিজ পরেছে। ফুটফুটে কিশোরী। ফুলের মতন নরম। আফজাল মাষ্টার ছানি পরা চোখ ফাতেমার শরীরে ঘোরাঘুরি করে।
ফাতেমা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ছিঃ, নানাজান, আপনাগো জ্বালায় আমার এত সুন্দর চুলগুলা কাইটা ফেললাম। আপনার এত বয়স হইছে। আপনি আমার দিকে এমন করে তাকান ক্যান? কী শরমের কথা।
শেষ বয়সে পৌঁছে পুঁচকে এক মেয়ের কথায় আফজাল মাষ্টার ডাঙায় তোলা কাতলা মাছের মতন খাবি খেতে থাকেন।
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×